Showing posts with label অজয় দাশগুপ্ত. Show all posts
Showing posts with label অজয় দাশগুপ্ত. Show all posts

20220905

‘‘জুতোটা ঠিক জায়গায় লেগেছে তো?’’


অজয় দাশগুপ্ত
 

সেদিন অফিসে ঢুকতেই অভীকদা বললো, ‘‘একবার ওবাড়িতে যাও। বিমানদা তোমাকে ডেকেছেন!’’

আমি ব্যাগটা রেখে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আলিমুদ্দিনে ছুটলাম।

বিমানদা আমাকে দেখেই বললেন, ‘‘শোনো, তোমাকে কাল একবার জ্যোতিবাবুর বাড়ি যেতে হবে। ৩১ তারিখের সমাবেশের জন্য ওনার একটা শুভেচ্ছা বার্তা আনতে হবে।’’

২০০৯ সালের ৩১আগস্ট খাদ্য আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে বামফ্রন্ট ধর্মতলায় বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। তার দু’দিন আগের এই ঘটনা।

আমি বিমানদাকে বললাম, ‘‘জ্যোতিবাবুর একটা লেখা তো করে এনেছি। সেটা ৩১তারিখ গণশক্তিতে ছাপা হবে।’’

বিমানদা বললেন, ‘‘হ্যাঁ, জানি সেটা। এটা শুভেচ্ছা বার্তা, সমাবেশে পাঠ করা হবে। জ্যোতিবাবু তো তোমার কথা বললেন।’’

বলে বিমানদা হাসতে লাগলেন, ‘‘জ্যোতিবাবু বললেন, ‘তোমার ওই মোটা ছেলেটাকে পাঠিও, ও নিয়ে যাবে।’ উনি মোটা ছেলেটা বলতে কাকে বলেন, সেটা আমি জানি। যাইহোক, তুমি কখন যাবে, সেটা জয়ের সঙ্গে কথা বলে নিও।’’

**********************

অফিসে এসে জয়কৃষ্ণ ঘোষকে ফোন করলাম। পরদিন সকাল দশটায় ইন্দিরা ভবনে যেতে বললেন। নিয়মমতো দশটার আগেই পৌঁছে গেলাম। কাঁটায় কাঁটায় দশটার সময় উনি বাইরের ঘরে এলেন। এসেই বললেন, ‘‘বিমান এসেছিল। ও বললো, যা প্রস্তুতির খবর এসেছে, তাতে বিশাল সমাবেশ হবে। এত মানুষ আসবেন, আপনি একটা শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিলে ভালো হয়আমি বলছি, তুমি লিখে নাও।’’

উনি খুব সংক্ষেপে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিলেন। খুব তাড়াতাড়িই আমার কাজ শেষ হয়ে গেল। 

**********************

 

                                                  সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ

১৯৫৯ সালের ৩১আগস্টের ঘটনার পর ২১ সেপ্টেম্বর বিধানসভার অধিবেশন শুরু হলে খাদ্য আন্দোলনের ফলে পুলিশী আক্রমণে নিহত ৮০ জন শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালনের দাবি জানানো হলে তা মানতে অস্বীকার করে শাসক কংগ্রেস ও পিএসপি-র সদস্যরা। তখন তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। এমনকি জুতো ছোড়াছুড়িও হয়েছিল বলে জানা যায়হইচই থামলে জ্যোতিবাবু খাদ্য আন্দোলনের প্রসঙ্গে মুলতবি প্রস্তাব এনে তৎকালীন রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বিধানসভায় ভাষণ দেন। পরে বিধান রায় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে বিরোধী দলের সদস্যরা। ২৮ সেপ্টেম্বর অনাস্থা প্রস্তাবের ওপরেও ভাষণ দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু।

সেদিনের গণশক্তিতে জ্যোতিবাবুর ২১ সেপ্টেম্বরের বক্তৃতাটিই পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছিল। আমি ওঁর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যই ওনাকে ওই বক্তৃতাটা ছাপানোর কথা বললাম।

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘হ্যাঁ, জয় আমাকে বলেছে। তোমরা তো অনেক কিছু ছেপেছো।’’

তারপর উনি সেই অধিবেশনের ঘটনার কথা বলতে শুরু করলেন। একেবারে ফোটোগ্রাফিক মেমোরি!

‘‘ওইদিন তো খুব গোলমাল হয়েছিল হাউসে। চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিলো। কংগ্রেসের এমএলএ’রা বললো, আমি নাকি জুতো ছুড়ে মেরেছি। আমি পা থেকে জুতো খুলে দেখিয়ে বললাম, আমার জুতো আমার পায়েই আছে। আমি জুতো ছুড়িনি। আসলে মণিকুন্তলা ছুড়েছিল।’’

তারপর একটু থেমে বললেন, ‘‘সাউথ ইন্ডিয়া থেকে আমাদের পার্টির কয়েকজন নেতা এখানে এসেছিলেন। তাঁরা সেদিন অধিবেশন দেখতে বিধানসভায় ভিজিটার্স গ্যালারিতে ছিলেন। তাঁরা পরে পার্টি অফিসে এসে বললেন, বিধানসভায় এসব আবার কী হচ্ছে?’’

জ্যোতিবাবু একটু পরিহাসের সুরেই বললেন, ‘‘আসলে এখানকার মানুষের তখন ক্ষোভ কতটা বেশি ছিল, সে সম্পর্কে ওঁদের কোনো ধারণাই ছিল না। বিধানসভায় তখন একজন নির্দল এমএলএ ছিলেন, আন্দোলনে আমাদের সঙ্গেই ছিলেন, নামটা এখন মনে পড়ছে না। উনি পরে আমাকে বলেছিলেন, বিধানসভাতেও বলেছেন একটা ঘটনার কথা। উনি বাজারে মাছ কিনতে গেছেন। মাছওলা ওনাকে প্রশ্ন করেছেন, জুতোটা ঠিক জায়গায় লেগেছে তো? সেই সময় মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।’’

 

*********************

 

                                        ২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় বামফ্রন্টের 
                                          সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

ইন্দিরা ভবনে থেকে ফিরে তড়িঘড়ি কম্পোজ করে পার্টি অফিসে দিয়ে এলাম। ঘন্টাখানেক বাদে আবার ওবাড়ি থেকে ফোন। ওপারে বিমানদা। বললেন, ‘‘শোনো, তুমি আরেকবার ইন্দিরা ভবনে যাও। কম্পোজ কপিটার নিচে জ্যোতিবাবুর সই করিয়ে আনতে হবে। প্রেসকে আমরা সেটার কপিই দেবো।’’ বিমানদা আরও বললেন, ‘‘আমি জ্যোতিবাবুকে বলে রেখেছি। তুমি গেলেই সই করে দেবেন।’’

কী আর করা! আবার বিকেলে ছুটলাম। আমাকে দেখেই জ্যোতিবাবুর সস্নেহ হাসি, ‘‘কি, তোমায় আবার আসতে হলো তো! বিমানের যতসব কান্ড!’’

জয়কৃষ্ণ ঘোষ আগে থেকেই একটা সিগনেচার স্ট্যান্ড আনিয়ে রেখেছিলেন। সাদা কাগজের প্যাডও ছিল।

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘সই-টই করা এখন খুব ঝামেলার ব্যাপার!’’

জয়দা বললেন, ‘‘আপনি ওই সাদা কাগজে তিন-চারবার মকসো করে নিন। তারপর ওই বার্তাটায় সই করবেন।’’

জ্যোতিবাবু তাই করলেন। আমি গোটা তিনেক কপি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সবগুলোতেই সই করিয়ে নিলাম।

জয়দা আমাকে বললেন, ‘‘আসলে এখন বছরে একবার সই করতে হয় ওনাকে। প্রাক্তন বিধায়ক হিসেবে যে পেনশন পান, সেটা পার্টির রাজ্য কমিটিকে চেক লিখে দিয়ে দেন। ওটাই বছরে একবার করতে হয়’’ 

 জ্যোতি বসুর স্বাক্ষরিত এই সেই বার্তা

********************

 

                                ২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় বামফ্রন্টের  সমাবেশ

২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় সেবার যে সমাবেশ হয়েছিল, তা সঠিক অর্থেই ছিল ঐতিহাসিক। ‘‘অনুগত’’ সংবাদমাধ্যমে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা হলেও ধর্মতলায় অতবড় সমাবেশ এখনও পর্যন্ত কোন দলই ক্ষমতায় থাকতে বা না থাকতে করতে পারে নি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রধান বক্তা ছিলেন। বামফ্রন্টের নেতারা বক্তব্য রেখেছিলেন।

সমাবেশের শুরুতেই জ্যোতিবাবুর শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করে বিমানদা কাগজটা সমবেত জনতাকে দেখিয়ে বললেন, ‘‘এটা জ্যোতিবাবুর শুভেচ্ছা বার্তা, এই যে দেখুন ওনার সই করা আছে।’’

লাখো লাখো জনতা মুখরিত সখ্যে সেই বার্তা গ্রহণ করলেন।

********************

সংযোজন: ১৯৫৯ সালের ২৮সেপ্টেম্বর বিধানসভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যাচ্ছে, পিএসপি বিধায়ক (১৯৫৭ সালে নির্বাচনে জেতার পর নিজেকে দলের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে চলছিলেন) সুধীর চন্দ্র রায়চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘....গুলি চালিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপর্যস্ত করে বসে থাকা মোটেই সম্মানের কাজ নয়। এখানে জুতো ছোড়াছুড়ি নিন্দনীয়, নিশ্চয়ই এবিষয়ে কোন ভুল নেই, কিন্তু সাধারণ মানুষ এতে খুব দুঃখিত হয়েছে তা নয়। এক ভদ্রলোক আমাকে সেদিন বললেন — আচ্ছা, কালীবাবুর মুখে কি জুতা গিয়ে পড়েছিলো? আমি বললাম, অত তো লক্ষ্য করিনি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন — প্রফুল্লবাবু কি তখন ঘরে ছিলেন না? আমি বললাম — হ্যাঁ, ছিলেন। তখন তিনি বললেন — তার মুখে একটা পড়তে পারল না। এটা একজন সাধারণ মানুষেরই কথা, আমার বানান কথা নয়।’’

স্কেচ সৌজন্য: ইন্দ্রজিৎ নারায়ণ

************

#MartyrsDay

#HistoricalFoodMovement

#LeftFront

#JyotiBasu

 

20210719

নারদাকান্ডে সিবিআই-র শীতঘুম ভাঙা: অজয় দাশগুপ্ত

১৮মে, ২০২১

নারদাকান্ডে পাঁচ বছর শীতঘুমে থাকার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী পরিচালিত সিবিআই দপ্তর আচমকা জেগে উঠেছে! ভোটে হারার প্রতিক্রিয়া কিনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনা হলো, ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ নারদ ‘এক্স ফাইলস’-এর ভিডিও ফুটেজে সৌগত রায়, সুব্রত মুখার্জি, ববি হাকিম, শুভেন্দু অধিকারীসহ তৃণমূলের ১৬ জন সাংসদ ও বিধায়ককে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা যায়। ভিডিও ফুটেজের সত্যতা ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও একজনের বিরুদ্ধেও দলীয় স্তরে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নিযদিও ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে মমতা ব্যানার্জি নিজেই কবুল করেছিলেন, ‘‘আগে জানলে টিকিট দিতাম না।’’ কিন্তু নির্বাচনের পর তাদেরকেই আবার মন্ত্রী করেছেন এবং পরের নির্বাচনেও টিকিট দিয়েছেন। তুলনাহীন দ্বিচারিতায় উনি সবকিছুতেই ছাপিয়ে গেছেন, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

এদিকে, তৃণমূল সাংসদ-বিধায়কদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য লোকসভায় গঠিত এথিক্স কমিটির কাছে নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার ৫বছর বাদেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার। এই ঘটনার পিছনে কোন বোঝাপড়ার অঙ্ক কাজ করছিল সেই রহস্য এখনও অন্ধকারে।

২০১৮সালের ১২সেপ্টেম্বর সংসদের নীতিবিষয়ক (এথিক্স) কমিটি পুনর্গঠিত করেন লোকসভার তৎকালীন অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন এবং নারদ ঘুষকান্ডের তদন্তে গত তিন বছরে একটিও মিটিং না ডেকে শীতঘুমে থাকা এই কমিটির চেয়ারম্যান আবার হন বিজেপি-র প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। সেবছরই ১আগস্ট দিল্লিতে সংসদ ভবনে তাঁর কক্ষে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রণাম করার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা ‘সৌজন্যমূলক’ আলাপচারিতায় ব্যস্ত ছিলেন, বলেও আমরা সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানতে পেরেছিলাম! বাবরি মসজিদ ভাঙার নায়ক লালকৃষ্ণ আদবানিকেই মমতা ব্যানার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, এটাও মিডিয়ার অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে যেতে চান! তার পিছনে কোন অঙ্ক কাজ করছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

লোকসভা নির্বাচনের পর আদবানিহীন সংসদে নতুন করে এথিক্স কমিটি গঠিত হলেও তার বৈঠক কেন ডাকা হলো না, তার উত্তর মোদী-শাহ সরকারকে দিতে হবে। বৈঠক ডাকলেই সাংসদদের সদস্যপদ যে বাতিল করতে হবে, তার উদাহরণ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত লোকসভা দেখিয়ে দিয়েছে। সদ্য বিজেপি'তে যোগ দেওয়া, অথবা যোগ দিতে অপেক্ষমান সাংসদদের বাঁচাতে গিয়ে যে একাজ করা হচ্ছে না, এই প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৬এপ্রিল সিবিআই লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে সাংসদদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল। মোদী সরকারই তা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে।

এদিকে, আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে মমতা ব্যানার্জি দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তার অব্যবহিত পরেই সিবিআই সারদা, রোজভ্যালি এবং নারদা মামলার তদন্তকারী সমস্ত কর্মকর্তাদের বদলি করে, যারা তখনই কেস গুটিয়ে এনেছিলেন

নাটক এখনও শেষ হয়নি। নতুন অঙ্ক শুরু হয়েছে। দেখতে থাকুন।

সূত্র: 

১। আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮এপ্রিল, ২০১৬;   ‘‘আগে জানলে টিকিট দিতাম না:

২। The Hindu, Kolkata, 16th January, 2020;  CBI transfers officers probing Saradha, Rose Valley and Narada scams


(এই চমকপ্রদ ছবিটি সমকালীন চিত্র সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম সেরা অমিত ধরের তোলা। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।)


 

20200807

JB & HKS: Living Legends of Indian Communist Movement

অজয় দাশগুপ্ত

 

২০০৫সালে সিপিআই(এম)-র দিল্লি পার্টি কংগ্রেস ছিল সবদিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রে তখন বামপন্থীদের সমর্থনে ইউপিএ সরকার চলছে, আর বামপন্থীদের মধ্যে মূল শক্তি সিপিআই(এম)-ই। ফলে পার্টি কংগ্রেসে সিপিআই(এম) কী আলোচনা করে তারদিকে নজর ছিল সবার। পার্টির অষ্টাদশ কংগ্রেসের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকেই তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন প্রতিবেদন প্রকাশ, আলাপ-আলোচনা চলছিল। এফডিআই বা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ, সোজাকথায় দেশীয় শিল্পে বিদেশী পুঁজির বিনিয়োগ নিয়ে পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে; বিশ্বব্যাঙ্ক, এডিবি বা আইএমএফ-র প্রকল্পগুলিকে পার্টি পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি কীভাবে গ্রহণ করবে; এনজিও-গুলিকে কী চোখে দেখা হবে, তাতে পার্টিকর্মীরা কী ভূমিকা নেবেন ইত্যাদি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পার্টির নীতি অভিমুখ এই পার্টি কংগ্রেসেই ঠিক হয়। 

দিল্লি পার্টি কংগ্রেসে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন অথবা অনেকদিন ধরে লেফট-বিট করছেন, সেইসব সাংবাদিকদের অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, তখন দিল্লিতে সিপিআই(এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর একে গোপালন ভবনকে পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষে লাল আলো এবং লাল পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছিল। একে গোপালন ভবনে ঢোকার ঠিক মুখেই একটা বিশাল হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল। তাতে জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ-এর ছবি লাগিয়ে লেখা ছিল: “Living Legends of Indian Communist Movement” অর্থাৎ ‘‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তী’’। বিশেষণ সঠিক হলেও, কমিউনিস্ট পার্টিতে জীবিত অবস্থায় এধরণের সম্মাননা ছিল একেবারেই ব্যাতিক্রমী।

এই দুই জীবন্ত কিংবদন্তীর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল খুবই গভীর এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধামিশ্রিত। দুজনের এই সম্পর্কের একটি বিরল ও অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, যা চিরকাল মনে থাকবে। ২০০৮সালের ১আগস্ট কমরেড হরকিষেণ সিং সুরজিতের জীবনাবসান হয়। তারআগে সেবছরই মে মাসে একবার তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। ঘটনাটি সেই সময়ের।

 ২০০৮সালেরই ১৭মে শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে সুরজিৎকে নয়ডার মেট্রো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছিল যে কেন্দ্রীয়ভাবে যারা কাজ করেন, পার্টির সেই সব পলিট ব্যুরো সদস্যকে দিল্লিতেই থাকতে বলা হয়েছিল, রাজ্যগুলিকেও বড় ধরণের কর্মসূচি স্থগিত রাখতে বলা হয়। ১৮মে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নিজে হাসপাতালে গিয়ে সুরজিৎকে দেখে আসেন।

এধরনের পরিস্থিতিতে সব সংবাদমাধ্যমেই কিছু আগাম কাজ সেরে নেওয়া হয়। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য, ছবি এবং জীবনপঞ্জী চূড়ান্ত করা ছাড়াও তাঁর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিচারণা সংগ্রহ করা। স্বাভাবিকভাবেই আমার ওপরে ভার পড়েছিল সুরজিৎ সম্পর্কে জ্যোতি বসুর একটি লেখা তৈরি করার। জয়কৃষ্ণ ঘোষের সঙ্গে কথা বলে ২১ তারিখ সকালে ইন্দিরা ভবনে পৌঁছে গেলাম। নির্দিস্ট সময়ে জ্যোতিবাবুর ঘরে আমাকে জয়দা পৌঁছে দিলেন।

আমি জ্যোতিবাবুকে বললাম, ‘‘কমরেড সুরজিৎ হাসপাতালে খুবই সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন। বিমানদা বললেন, আপনার কাছথেকে একটা বার্তা নিতে।’’

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘ও কি আছে, না নেই?’’ তারপর জয়কৃষ্ণ ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘তুমি যে বললে, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।’’

জয়দা বললেন, ‘‘আমাকে তো সিসি অফিস থেকে তাই জানালো একটু আগে।’’

জ্যোতিবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘ও তো আমার থেকেও বয়সে ছোট। ওর আগে যাওয়ার কথা নয়।’’

তারপর বললেন, ‘‘ঠিক আছে, তুমি এসেছ যখন, আমি একটা মেসেজ দিচ্ছি। তুমি বিমানকে দিও, ও পাঠিয়ে দেবে।’’

এরপর গড়গড় করে ইংরেজীতে বলতে শুরু করলেন। আমি গণশক্তির হয়ে ২০০০সাল থেকে জ্যোতিবাবুর বিভিন্ন লেখার ডিকটেশন নিয়েছি, কিন্তু তার সবই বাংলায়। হঠাৎ ইংরেজীতে নিতে গিয়ে একটু ঘাবড়েই গেছিলাম সেদিন। কারণ, ওঁকে তো আর রিপিট করতে বলা যায় না! যাইহোক, উনি যা বললেন, আমার সীমিত ইংরেজী বিদ্যায় তা লিখে নিলাম। নোট দেওয়ার পরেও কিছু কথা বললেন সুরজিৎ সম্পর্কে এবং তা লেখার জন্য নয়, সেটাও বলে দিলেন।

জ্যোতিবাবুর ঘর থেকে বের হওয়ার পর জয়দা আমাকে বললেন, ‘কি, তুমি যা চাইছিলে, তা পেলে না তো? উনি এরকমই, ডেথ নিউজ না পেলে কিছু বলবেন না।’’ আমি বললাম, ‘‘যা পেয়েছি, তা একটা দুর্লভ ব্যাপার!’’

ইন্দিরা ভবন থেকে সোজা গণশক্তি অফিসে এলাম। অভীক দত্ত অফিসেই ছিল, তাঁকে গোটা ঘটনাটা বললাম। অভীকদা সব শুনে বললো, ‘‘তাই নাকি! এতো অসাধারণ ঘটনা! তাড়াতাড়ি লিখে ফেলো, বিমানদাকে দেখিয়ে আনি!’’ দ্রুত কম্পোজ করে প্রিন্ট-আউট বের করে দিলাম। একটু পরে অভীকদা আলিমুদ্দিন থেকে ফিরে এসে বললো, ‘‘বুদ্ধদা পার্টি অফিসেই ছিলেন। উনি এই ঘটনা শুনে, আর লেখাটা দেখেই দিল্লিতে প্রকাশ কারাতকে ফোন করলেন। প্রকাশদাও লেখাটা এক্ষুনি পাঠিয়ে দিতে বললেন।’’ দিল্লিতে পাঠানোর পর বারতিনেক ফোন করে লেখাটার ইংরেজী গঠনগত (যা কিনা আমারই ভুল) ছোটখাটো কিছু সংশোধন করলেন প্রকাশ কারাত। তারপর জানালেন, এই মেসেজটা পার্টির সমস্ত পত্রিকাতে ছাপানোর জন্য আইএনএন থেকে পাঠানো হচ্ছে। পরদিন গণশক্তিতেও তা প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদ আকারে।

মূল ইংরেজী লেখাটা এবং পরে বাংলা অনুবাদটা এখানে দিলাম:

Beloved Comrade Surjeet,

I am deeply grieved to hear about your continued illness. I was just now reminiscing how for long years we have been working together particularly after the split of the party. I can never forget the role you played in organising and giving leadership to the Party.

I particularly remember the day when due to my illness I wanted to leave the responsibility given to me by the Party, as Chief Minister of West Bengal. You came and met me in my house. Then you seemed to be nervous, thought that this may adversely affect the Party. After discussion then we worked out a formula that we would create a new post of Deputy Chief Minister, who will later on be the Chief Minister and I shall not stand for election. That formula worked very well. Buddhadeb Bhattacharjee was very well accepted both by the Party and the people of West Bengal. So, at the end of my tenure, I resigned and Buddhadeb took over the Chief Ministership. I also remember with pride how you helped the Party to flourish in different provinces.

I also remember how you did agree with me that the unity of the Left parties in West Bengal is essential and I feel proud that the Left Front government carried on thirtyone years with the support and love of the people of the state.

I remember you also played host to my family when we went to Punjab. Though I am older than you and now almost bedridden, I am confident that our Party will go forward from success to success in many parts of India. Despite many crests and ebbs people will finally emerge victorious and go in for a classless society free from exploitation of any form.

At the end, I want to remember with pride the role you played in the new political situation in country to keep the communal BJP at bay. We extended our outside support to Congress, incumbent upon the basis of the Common Minimum Programme and the interests of the people and the country.

Jyoti Basu

Kolkata,

May 21, 2008

From India News Network (INN)

Kolkata, May 21, 2008

................

প্রিয় কমরেড সুরজিৎ,

আপনার ধারাবাহিক অসুস্থতার খবরে আমি খুবই বেদনাহত হয়ে পড়েছি। আমার এখনই মনে পড়ছিল, কত দীর্ঘ সময় ধরে আমরা একসাথে কাজ করেছি, বিশেষ করে পার্টি ভাগ হওয়ার পর থেকে। পার্টিকে সংগঠিত করা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমি কখনই ভুলতে পারবো না।

বিশেষ করে আমার সেই দিনের কথা মনে হচ্ছে, যখন অসুস্থতার কারণে পার্টি আমাকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যে দায়িত্ব দিয়েছিল, তা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আপনি এলেন এবং বাড়িতে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। আপনাকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল, হয়তো ভাবছিলেন যে পার্টির ওপরে এর প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। আলোচনা করে আমরা একটু সূত্র বের করলাম যে প্রথমে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে, যিনি পরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে আমি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না। এই সূত্র খুব ভালো কাজ করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পার্টি এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং আমার টার্ম শেষ হওয়ার মুখে আমি ইস্তফা দিলাম এবং বুদ্ধদেব মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। বিভিন্ন প্রদেশে পার্টির বিকাশ ঘটাতে আপনি কিভাবে সাহায্য করেছেন, আনন্দের সঙ্গে আমার সেকথাও মনে পড়ছে।

আমার এটাও মনে পড়ছে, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী দলগুলির ঐক্য কতটা জরুরী সেই প্রশ্নে আপনি আমার সঙ্গে একমত ছিলেন এবং এই রাজ্যের মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসার ফলে বামফ্রন্ট সরকার যে ৩১বছর ধরে চলছে সেকথা ভেবে আমি গর্বিত বোধ করি।

আমি সপরিবারে যখন পাঞ্জাবে গিয়েছিলাম তখন আপনার আতিথেয়তায় যে ছিলাম, সেকথাও আমার মনে পড়ছে। যদিও আমি আপনার থেকে বয়সে একটু বড় এবং এখন প্রায় শয্যাগত হয়ে আছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের পার্টি ভারতের বিভিন্ন অংশে আরও সাফল্য অর্জন করার জন্য এগিয়ে যাবে। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী এবং যে কোন প্রকারের শোষণমুক্ত শ্রেণীহীন সমাজ অবশ্যই তৈরি হবে।

পরিশেষে, দেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক বিজেপি-কে ক্ষমতা থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে আপনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, সেকথা আমি স্মরণ করতে চাই। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে এবং দেশের জনগণের স্বার্থে আমরা বর্তমান কংগ্রেস সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছি।

জ্যোতি বসু

কলকাতা,

২১মে, ২০০৮

ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক (আইএনএন)

২২ মে, ২০০৮ গণশক্তিতে প্রকাশিত এই খবরের লিঙ্ক:

http://archive.ganashakti.co.in/shownews.php?w=665&h=576&year=2008&month=5&date=22&page=7&dpn=165809

 

 

তৃণমূলের শ্যামাপ্রসাদ ভজনা! : অজয় দাশগুপ্ত

অনেকেই অবাক হচ্ছেন, তৃণমূলের শ্যামাপ্রসাদ জন্মজয়ন্তী পালনের বহর দেখে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই, ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’-র দৌড়ে ‘রামনবমী’ আর ‘হনুমানজয়ন্তী’র পর এখন বিজেপি-র সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তৃণমূলও বেশ কিছুদিন ধরে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মজয়ন্তী পালন করা শুরু করেছে। কলকাতা বন্দরে নেতাজী সুভাষের নামে ডক থাকলেও তার নামকরণ শ্যামাপ্রসাদের নামে করায় তাতে আপত্তি করার কোনো কারণ খুঁজে পাননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভাইপো সাংসদ তো রীতিমত সার্টিফিকেট দিয়ে টুইট করেছিলেন!

আরএসএস-র ‘দুর্গা’, আরএসএস-র একজন প্রথম সারির সেবককে অস্বীকার করতে পারেন! তৃণমূল-বিজেপি যে ‘মেড ফর ইচ আদার’ তা কি ভুলে যাচ্ছেন!!

একটু খতিয়ে দেখুন, তাহলেই বুঝবেন অন্য পরিচয়ের আড়ালে আসলে কে এই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়? শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জনসঙ্ঘের জন্মদাতা, যা পরে ভারতীয় জনতা পার্টিতে পরিণত হয়। আরএসএস-র মতই তিনিও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহযোগিতার নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। ব্রিটিশ আমলে তিনি যখন বাংলা প্রদেশের মন্ত্রী ছিলেন, তখন হিন্দু মহাসভা আর মুসলিম লিগের পক্ষ থেকে ১৯৪২ সালের ২৬জুলাই ব্রিটিশ সরকারের গভর্নর স্যার জন হার্বার্টকে এক চিঠিতে লেখেন: “Let me now refer to the situation that may be created in the province as a result of any widespread movement launched by the Congress. Anybody, who during the war, plans to stir up mass feeling, resulting in internal disturbances or insecurity, must be resisted by any Government that may function for the time being” (Leaves from a diary. Oxford University Press, p. 179) (বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়া কংগ্রেসের আন্দোলনের ফলে এই প্রদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে সে সম্পর্কে এবারে বলি। সরকারের উচিৎ যে কোন লোক, যে যুদ্ধ চলাকালীন জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলে আভ্যন্তরীণ অশান্তি বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করার পরিকল্পনা করে, তাকে আটকানো)।

গভর্নরকে লেখা ওই চিঠিতে ছিল, “প্রশ্ন হল বাংলায় এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে (ভারত ছাড়ো) কিভাবে লড়া হবে। প্রশাসন এমনভাবে চালানো দরকার যাতে কংগ্রেসের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও এই প্রদেশে তা শেকড় ছড়াতে না পারে। আমাদের, বিশেষ করে দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের, জনগণকে একথা বলতে পারা উচিৎ যে কংগ্রেস যে স্বাধীনতার দাবিতে ভারত ছাড়ো আন্দোলন শুরু করেছে, জনপ্রতিনিধিদের সেই স্বাধীনতা ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। তবে হয়ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেই স্বাধীনতা জরুরী অবস্থার কারণে সীমায়িত করা হয়েছে। ভারতীয়দের উচিৎ ব্রিটিশদের বিশ্বাস করা। ব্রিটেনের ভালর জন্যে নয়, এই প্রদেশের সুরক্ষা এবং স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্যেই। গভর্নর হিসাবে আপনি এই প্রদেশের সাংবিধানিক প্রধানসুলভ কাজই করবেন এবং সম্পূর্ণভাবে আপনার মন্ত্রীদের পরামর্শ অনুযায়ী চলবেন।” (The RSS and the BJP: A Division of Labour. LeftWord Books. pp. 56–57).

…………………

To compete with RSS-BJP with the similar weapon of communalism, the TMC has started observing date of birth & death of Syama Prasad Mookerjee apart from armed procession of RamNavami and Hanuman Jayanti. Never before such things happened in Bengal. BJP has introduced which is being followed by the TMC in competition.

Who is this Syama Prasad Mookerjee? Abetted and dictated by RSS he became the founder of JanaSangh, the political wing of RSS. JanaSangh became Bhartiya Janata Party led by the RSS. Like RSS Mookerjee also opposed Indian Freedom Movement. Just prior to Quit India Movement, he wrote to British Governor Sir John Herbert on July 26, 1942 on behalf of Hindu Mahasabha and Muslim League as a Minister in the cabinet of Muslim League Government in Bengal Province that, " Let me now refer to the situation that may be created in the province as a result of any widespread movement launched by the Congress. Anybody, who during the war, plans to stir up mass feeling, resulting in internal disturbances or insecurity, must be resisted by any Government that may function for the time being " (Leaves from a diary. Oxford University Press, p. 179) (The RSS and the BJP: A Division of Labour. LeftWord Books. pp. 56–57).

This is what Syama Prasad Mookerjee wrote as a Minister to the imperialist Governor of Bengal, Sir John Herbert on July 26, 1942 about 'Quit India Movement':

“The question is how to combat this movement in Bengal? The administration of the province should be carried on in such a manner that in spite of the best efforts of the Congress, this movement will fail to take root in the province. It should be possible for us, specially responsible Ministers, to be able to tell the public that the freedom for which the Congress has started the movement already belongs to the representatives of the people. In some spheres it might be limited during the emergency. Indians have to trust the British, not for the sake of Britain, not for any advantage that the British might gain, but for the maintenance of the defence and freedom of the province itself. You as Governor will function as the constitutional head of the province and will be guided entirely on the advice of your Ministers.

As one of your Ministers, I am willing to offer you my whole-hearted cooperation and serve my province and country at this hour of crisis. The conditions which I have mentioned above are of a general character. They are mentioned not for creating any obstacle. They indicate to you, who are after all a foreigner, how an Indian would like to cooperate with you in the service of his country that is threatened with imminent danger.” “Let me now refer to the situation that may be created in the province as a result of any widespread movement launched by the Congress. Anybody, who during the war, plans to stir up mass feeling, resulting in internal disturbances or insecurity, must be resisted by any Government that may function for the time being.”


 

20200720

আমতার ‘ডি ভ্যালেরা’ সমর মুখার্জি ছিলেন ‘গড’স্‌ ওন ম্যান’ : অজয় দাশগুপ্ত




জ্যোতি বসু প্রায়শই তাঁর সম্পর্কে বলতেন, উনি হচ্ছেন ‘গড’স্‌ ওন ম‌্যান’। ইংরাজী পরিভাষায় যার অর্থ হচ্ছে, সমস্ত দিক থেকে নিখুঁত একজন ব‌্যক্তি। পার্টি থেকে যখন সমর মুখার্জিকে যখন যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তিনি তা এতটাই নিখুঁত ও দক্ষতার সঙ্গে পালন করতেন যে তা সকলের কাছে শিক্ষণীয় ছিল। 

১৯৭১ সালে সমর মুখার্জি লোকসভায় পার্টির সহকারী দলনেতা থাকার সময় তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন প্রকাশ কারাত। তিনিই সমর মুখার্জি সম্পর্কে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জ্যোতি বসুর এই মন্তব্যের কথা বলেছিলেন তাঁর শততম জন্মদিন উদযাপনের দিন। পরে তিনি তা পিপলস্‌ ডেমোক্রেসি পত্রিকায় লিখেছিলেন (Comrade Jyoti Basu used to say that Samarda is “God’s own man”.  This saying in English denotes a selfless person who has all the virtues of a good human being.)

আমতা পীতাম্বর হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র সমর মুখার্জিকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল স্কুল থেকে। অপরাধ, গান্ধীজীর ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনে ছাত্র ধর্মঘট এবং গেটে পিকেটিং করা। তাঁর নেতৃত্বেই আমতার ছাত্ররা মদের দোকানে পিকেটিং করে, বিদেশী কাপড় পুড়িয়ে আইন অমান্য করেছিল ব্রিটিশ পুলিস সমর মুখার্জি এবং তাঁর তুতো ভাই বারীন মুখার্জির বিরুদ্ধে ১০৭ ধারায় মিথ্যা মামলা দায়ের করে। তাঁদের এক বছর কারাদণ্ড হয়। তাঁদের প্রেসিডেন্সি জেলে আটক করা হয়েছিল। এটাই ছিল সমর মুখার্জির প্রথম কারাবাস। মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে সমর মুখার্জি এবং বারীন মুখার্জি আদালতে পালটা অভিযোগ করেন। ফলে ছয়দিন কারাবাসের পরই তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। ১৯৩১ সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তির পর তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।

জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যাবার ইচ্ছায় আবার স্কুলে ভর্তি হবার চেষ্টা করেনকিন্তু খুব ভালো ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক কারণে বহিষ্কৃত ছাত্রকে কোনো স্কুলই ভর্তি করার সাহস পায়নি। এই সময়ে ১৯৩২ সালে হাওড়ার পানপুরে কৃষকদের এক সমাবেশে বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি, সমর মুখার্জিকে বলেন, ‘তুমি তো আমতার ডি ভ্যালেরাতিনিই তখন লেখাপড়ায় আগ্রহ দেখে বউবাজার হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক গিরীন্দ্রনাথ ব্যানার্জির কাছে তাঁকে পাঠান। গিরীনবাবু সমর মুখার্জিকে তাঁর স্কুলে দশম শ্রেণীতে ভর্তি করে নেন। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে সমর মুখার্জি সিটি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন এবং ইউনিভার্সিটি লকলেজে ভর্তি হন।

১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার পর থেকে ৭৩ বছর ধরে পার্টি অফিস বা পার্টি কমিউনেই জীবন কাটিয়েছেন সমর মুখার্জি একজন কংগ্রেসকর্মী থেকে হাওড়া জেলা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক, কমিউিনস্ট পার্টির সদস্য থেকে কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সম্পাদক, পার্টির রাজ্য কমিটি, কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিট ব্যুরো সদস্য, সিআইটিইউ-র সাধারণ সম্পাদক ইত্যাদি জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন সমর মুখার্জি। বিধায়ক, সাংসদ হয়েছেন, সংসদে দলের নেতাও ছিলেন দীর্ঘদিন। সাংসদ হিসেবে তাঁর মাসিক ভাতার অধিকাংশটাই পার্টি তহবিলে জমা দেওয়ার পরেও যা অবশিষ্ট থাকতো, সেই টাকাও প্রতিবছর কোনো এক সময়ে কখনো ৫০হাজার, কখনো ৬০হাজার টাকা পার্টি তহবিলে জমা দিয়ে দিতেন।  ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সেই টাকা তিনি কখনো ব্যয় করতেন না। রাজ্য দপ্তরেও এভাবে টাকা জমা দিতেন। এই অনুকরণীয় জীবনধারা ছিল শেষদিন পর্যন্ত 

আবার ওপার বাংলা থেকে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের জন্য লড়াই করতে সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদ (ইউসিআরসি) তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন তিনি। উদ্বাস্তুদের ন‌্যায়সঙ্গত দাবি নিয়ে কখনো দিল্লি, কখনো কলকাতায় সরকারের কাছে গিয়ে হাজির হতেন তিনি। একজন পশ্চিমবঙ্গীয় হয়েও পুর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু মানুষের স্বার্থে আজীবন তিনি যে লড়াই করেছেন, তা এককথায় অসাধারণ!

শেষদিকে, কলকাতায় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি বা পলিট ব্যুরোর বৈঠক হলে শীর্ষ নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন দিলখুসা স্ট্রিটের কমিউনে। ২০১০ সালের ৯জানুয়ারি ভিএস অচ্যুতানন্দন দেখা করতে গিয়েছিলেন কমিউনে। তারই একটি মুহূর্তের ছবি নিবন্ধে যুক্ত করা হয়েছে।