Showing posts with label সিপিআই(এম). Show all posts
Showing posts with label সিপিআই(এম). Show all posts

20200807

JB & HKS: Living Legends of Indian Communist Movement

অজয় দাশগুপ্ত

 

২০০৫সালে সিপিআই(এম)-র দিল্লি পার্টি কংগ্রেস ছিল সবদিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ এবং উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রে তখন বামপন্থীদের সমর্থনে ইউপিএ সরকার চলছে, আর বামপন্থীদের মধ্যে মূল শক্তি সিপিআই(এম)-ই। ফলে পার্টি কংগ্রেসে সিপিআই(এম) কী আলোচনা করে তারদিকে নজর ছিল সবার। পার্টির অষ্টাদশ কংগ্রেসের খসড়া রাজনৈতিক প্রস্তাব প্রকাশিত হওয়ার সময় থেকেই তা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন প্রতিবেদন প্রকাশ, আলাপ-আলোচনা চলছিল। এফডিআই বা প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ, সোজাকথায় দেশীয় শিল্পে বিদেশী পুঁজির বিনিয়োগ নিয়ে পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে; বিশ্বব্যাঙ্ক, এডিবি বা আইএমএফ-র প্রকল্পগুলিকে পার্টি পরিচালিত রাজ্য সরকারগুলি কীভাবে গ্রহণ করবে; এনজিও-গুলিকে কী চোখে দেখা হবে, তাতে পার্টিকর্মীরা কী ভূমিকা নেবেন ইত্যাদি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পার্টির নীতি অভিমুখ এই পার্টি কংগ্রেসেই ঠিক হয়। 

দিল্লি পার্টি কংগ্রেসে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছেন অথবা অনেকদিন ধরে লেফট-বিট করছেন, সেইসব সাংবাদিকদের অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, তখন দিল্লিতে সিপিআই(এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর একে গোপালন ভবনকে পার্টি কংগ্রেস উপলক্ষে লাল আলো এবং লাল পতাকা দিয়ে সাজানো হয়েছিল। একে গোপালন ভবনে ঢোকার ঠিক মুখেই একটা বিশাল হোর্ডিং লাগানো হয়েছিল। তাতে জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ-এর ছবি লাগিয়ে লেখা ছিল: “Living Legends of Indian Communist Movement” অর্থাৎ ‘‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের জীবন্ত কিংবদন্তী’’। বিশেষণ সঠিক হলেও, কমিউনিস্ট পার্টিতে জীবিত অবস্থায় এধরণের সম্মাননা ছিল একেবারেই ব্যাতিক্রমী।

এই দুই জীবন্ত কিংবদন্তীর মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কও ছিল খুবই গভীর এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধামিশ্রিত। দুজনের এই সম্পর্কের একটি বিরল ও অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী থাকার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল, যা চিরকাল মনে থাকবে। ২০০৮সালের ১আগস্ট কমরেড হরকিষেণ সিং সুরজিতের জীবনাবসান হয়। তারআগে সেবছরই মে মাসে একবার তিনি প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। ঘটনাটি সেই সময়ের।

 ২০০৮সালেরই ১৭মে শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে সুরজিৎকে নয়ডার মেট্রো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছিল যে কেন্দ্রীয়ভাবে যারা কাজ করেন, পার্টির সেই সব পলিট ব্যুরো সদস্যকে দিল্লিতেই থাকতে বলা হয়েছিল, রাজ্যগুলিকেও বড় ধরণের কর্মসূচি স্থগিত রাখতে বলা হয়। ১৮মে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নিজে হাসপাতালে গিয়ে সুরজিৎকে দেখে আসেন।

এধরনের পরিস্থিতিতে সব সংবাদমাধ্যমেই কিছু আগাম কাজ সেরে নেওয়া হয়। সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য, ছবি এবং জীবনপঞ্জী চূড়ান্ত করা ছাড়াও তাঁর সম্পর্কে ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিচারণা সংগ্রহ করা। স্বাভাবিকভাবেই আমার ওপরে ভার পড়েছিল সুরজিৎ সম্পর্কে জ্যোতি বসুর একটি লেখা তৈরি করার। জয়কৃষ্ণ ঘোষের সঙ্গে কথা বলে ২১ তারিখ সকালে ইন্দিরা ভবনে পৌঁছে গেলাম। নির্দিস্ট সময়ে জ্যোতিবাবুর ঘরে আমাকে জয়দা পৌঁছে দিলেন।

আমি জ্যোতিবাবুকে বললাম, ‘‘কমরেড সুরজিৎ হাসপাতালে খুবই সঙ্কটজনক অবস্থায় রয়েছেন। বিমানদা বললেন, আপনার কাছথেকে একটা বার্তা নিতে।’’

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘ও কি আছে, না নেই?’’ তারপর জয়কৃষ্ণ ঘোষের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘তুমি যে বললে, অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।’’

জয়দা বললেন, ‘‘আমাকে তো সিসি অফিস থেকে তাই জানালো একটু আগে।’’

জ্যোতিবাবু আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘‘ও তো আমার থেকেও বয়সে ছোট। ওর আগে যাওয়ার কথা নয়।’’

তারপর বললেন, ‘‘ঠিক আছে, তুমি এসেছ যখন, আমি একটা মেসেজ দিচ্ছি। তুমি বিমানকে দিও, ও পাঠিয়ে দেবে।’’

এরপর গড়গড় করে ইংরেজীতে বলতে শুরু করলেন। আমি গণশক্তির হয়ে ২০০০সাল থেকে জ্যোতিবাবুর বিভিন্ন লেখার ডিকটেশন নিয়েছি, কিন্তু তার সবই বাংলায়। হঠাৎ ইংরেজীতে নিতে গিয়ে একটু ঘাবড়েই গেছিলাম সেদিন। কারণ, ওঁকে তো আর রিপিট করতে বলা যায় না! যাইহোক, উনি যা বললেন, আমার সীমিত ইংরেজী বিদ্যায় তা লিখে নিলাম। নোট দেওয়ার পরেও কিছু কথা বললেন সুরজিৎ সম্পর্কে এবং তা লেখার জন্য নয়, সেটাও বলে দিলেন।

জ্যোতিবাবুর ঘর থেকে বের হওয়ার পর জয়দা আমাকে বললেন, ‘কি, তুমি যা চাইছিলে, তা পেলে না তো? উনি এরকমই, ডেথ নিউজ না পেলে কিছু বলবেন না।’’ আমি বললাম, ‘‘যা পেয়েছি, তা একটা দুর্লভ ব্যাপার!’’

ইন্দিরা ভবন থেকে সোজা গণশক্তি অফিসে এলাম। অভীক দত্ত অফিসেই ছিল, তাঁকে গোটা ঘটনাটা বললাম। অভীকদা সব শুনে বললো, ‘‘তাই নাকি! এতো অসাধারণ ঘটনা! তাড়াতাড়ি লিখে ফেলো, বিমানদাকে দেখিয়ে আনি!’’ দ্রুত কম্পোজ করে প্রিন্ট-আউট বের করে দিলাম। একটু পরে অভীকদা আলিমুদ্দিন থেকে ফিরে এসে বললো, ‘‘বুদ্ধদা পার্টি অফিসেই ছিলেন। উনি এই ঘটনা শুনে, আর লেখাটা দেখেই দিল্লিতে প্রকাশ কারাতকে ফোন করলেন। প্রকাশদাও লেখাটা এক্ষুনি পাঠিয়ে দিতে বললেন।’’ দিল্লিতে পাঠানোর পর বারতিনেক ফোন করে লেখাটার ইংরেজী গঠনগত (যা কিনা আমারই ভুল) ছোটখাটো কিছু সংশোধন করলেন প্রকাশ কারাত। তারপর জানালেন, এই মেসেজটা পার্টির সমস্ত পত্রিকাতে ছাপানোর জন্য আইএনএন থেকে পাঠানো হচ্ছে। পরদিন গণশক্তিতেও তা প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদ আকারে।

মূল ইংরেজী লেখাটা এবং পরে বাংলা অনুবাদটা এখানে দিলাম:

Beloved Comrade Surjeet,

I am deeply grieved to hear about your continued illness. I was just now reminiscing how for long years we have been working together particularly after the split of the party. I can never forget the role you played in organising and giving leadership to the Party.

I particularly remember the day when due to my illness I wanted to leave the responsibility given to me by the Party, as Chief Minister of West Bengal. You came and met me in my house. Then you seemed to be nervous, thought that this may adversely affect the Party. After discussion then we worked out a formula that we would create a new post of Deputy Chief Minister, who will later on be the Chief Minister and I shall not stand for election. That formula worked very well. Buddhadeb Bhattacharjee was very well accepted both by the Party and the people of West Bengal. So, at the end of my tenure, I resigned and Buddhadeb took over the Chief Ministership. I also remember with pride how you helped the Party to flourish in different provinces.

I also remember how you did agree with me that the unity of the Left parties in West Bengal is essential and I feel proud that the Left Front government carried on thirtyone years with the support and love of the people of the state.

I remember you also played host to my family when we went to Punjab. Though I am older than you and now almost bedridden, I am confident that our Party will go forward from success to success in many parts of India. Despite many crests and ebbs people will finally emerge victorious and go in for a classless society free from exploitation of any form.

At the end, I want to remember with pride the role you played in the new political situation in country to keep the communal BJP at bay. We extended our outside support to Congress, incumbent upon the basis of the Common Minimum Programme and the interests of the people and the country.

Jyoti Basu

Kolkata,

May 21, 2008

From India News Network (INN)

Kolkata, May 21, 2008

................

প্রিয় কমরেড সুরজিৎ,

আপনার ধারাবাহিক অসুস্থতার খবরে আমি খুবই বেদনাহত হয়ে পড়েছি। আমার এখনই মনে পড়ছিল, কত দীর্ঘ সময় ধরে আমরা একসাথে কাজ করেছি, বিশেষ করে পার্টি ভাগ হওয়ার পর থেকে। পার্টিকে সংগঠিত করা এবং নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা আমি কখনই ভুলতে পারবো না।

বিশেষ করে আমার সেই দিনের কথা মনে হচ্ছে, যখন অসুস্থতার কারণে পার্টি আমাকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে যে দায়িত্ব দিয়েছিল, তা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। আপনি এলেন এবং বাড়িতে আমার সঙ্গে দেখা করলেন। আপনাকে একটু চিন্তিত দেখাচ্ছিল, হয়তো ভাবছিলেন যে পার্টির ওপরে এর প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। আলোচনা করে আমরা একটু সূত্র বের করলাম যে প্রথমে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর একটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে, যিনি পরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করবেন এবং পরবর্তী নির্বাচনে আমি আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো না। এই সূত্র খুব ভালো কাজ করেছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পার্টি এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। সুতরাং আমার টার্ম শেষ হওয়ার মুখে আমি ইস্তফা দিলাম এবং বুদ্ধদেব মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলেন। বিভিন্ন প্রদেশে পার্টির বিকাশ ঘটাতে আপনি কিভাবে সাহায্য করেছেন, আনন্দের সঙ্গে আমার সেকথাও মনে পড়ছে।

আমার এটাও মনে পড়ছে, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী দলগুলির ঐক্য কতটা জরুরী সেই প্রশ্নে আপনি আমার সঙ্গে একমত ছিলেন এবং এই রাজ্যের মানুষের সমর্থন ও ভালোবাসার ফলে বামফ্রন্ট সরকার যে ৩১বছর ধরে চলছে সেকথা ভেবে আমি গর্বিত বোধ করি।

আমি সপরিবারে যখন পাঞ্জাবে গিয়েছিলাম তখন আপনার আতিথেয়তায় যে ছিলাম, সেকথাও আমার মনে পড়ছে। যদিও আমি আপনার থেকে বয়সে একটু বড় এবং এখন প্রায় শয্যাগত হয়ে আছি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের পার্টি ভারতের বিভিন্ন অংশে আরও সাফল্য অর্জন করার জন্য এগিয়ে যাবে। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের জয়ই অবশ্যম্ভাবী এবং যে কোন প্রকারের শোষণমুক্ত শ্রেণীহীন সমাজ অবশ্যই তৈরি হবে।

পরিশেষে, দেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক বিজেপি-কে ক্ষমতা থেকে দুরে সরিয়ে রাখতে আপনি যে ভূমিকা পালন করেছেন, সেকথা আমি স্মরণ করতে চাই। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে এবং দেশের জনগণের স্বার্থে আমরা বর্তমান কংগ্রেস সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছি।

জ্যোতি বসু

কলকাতা,

২১মে, ২০০৮

ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক (আইএনএন)

২২ মে, ২০০৮ গণশক্তিতে প্রকাশিত এই খবরের লিঙ্ক:

http://archive.ganashakti.co.in/shownews.php?w=665&h=576&year=2008&month=5&date=22&page=7&dpn=165809

 

 

20190401

নির্বাচনের পরে রাজ্য-রাজনীতিতে সৃষ্টি হবে নতুন পরিস্থিতি: সূর্য মিশ্র


সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যের মানুষও সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের মুখোমুখি। এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে কোন আবেদন নিয়ে যাচ্ছেন বামপন্থীরা? কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের মধ্যে মেরুকরণের চেষ্টা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক প্রচার, নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার চেষ্টা, এসবের মোকাবিলা করে বামপন্থীরা কী তাদের বিকল্পের সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে পারবে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে? গণশক্তিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্তারিতভাবে মতামত জানিয়েছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। নির্বাচনের পরে এরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রসূন ভট্টাচার্য: 
-----------------------


প্রশ্ন: এবারের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বামপন্থীরা কী আবেদন জানাবে? এই নির্বাচনে এরাজ্যের মানুষ কেন বামপন্থীদের সমর্থন করবেন?

মিশ্র: এই নির্বাচনে দেশের ও রাজ্যের মানুষের সামনের প্রধান বিষয়গুলির থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের কর্মসংস্থানের সমস্যা। ৪৫ বছরের মধ্যে এমন খারাপ অবস্থা হয়নি। কাজ ছিলো  যাদের তাদেরও কাজ চলে যাচ্ছে। মোদী বলেছিলেন, প্রতি বছরে দুকোটি বেকারকে কাজ দেবেন। এখানে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বেকারী শতকরা চল্লিশ ভাগ বেকারী কমে গেছে রাজ্যে। যে যা খুশি বলছেন। কিন্তু জাতীয় নমুনা সমীক্ষার সর্বশেষ তথ্য যা সরকার চেপে রাখার চেষ্টা করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ৫বছরে ৫কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ১কোটি ৮০লক্ষ মানুষ শিল্প ও পরিষেবার থেকে কাজ হারিয়েছেন মূলত নোটবন্দী ও জিএসটি’র কারণে এবং ধারাবাহিক শিল্পমন্দার কারণে। তার সঙ্গে প্রায় ৩কোটি ২০লক্ষ মানুষ যারা কৃষিকাজে স্থায়ীভাবে না হলেও যুক্ত ছিলেন তাঁরা কাজ হারিয়েছেন। শিল্প কৃষি দুটোতেই নজিরবিহীন সঙ্কট। ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কারখানার বেসরকারীকরণ করে দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়েই শূন্যপদে নিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে। এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আবার শিক্ষায় ইন্টার্ন নিয়োগের কথা বলেছেন যেগুলো আদৌ স্থায়ী কর্মসংস্থান নয়। কেন্দ্রীয় সরকারও রেল এবং অনেক ক্ষেত্রে এই কাজই করছে। কৃষিতে স্বাধীনতার পরে এমন সঙ্কট আসেনি। ফসলের দাম না পাওয়ায় চাষের খরচও উঠছে না, কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ফসলের দাম দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার করেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুন করবেন। আর মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কৃষকদের আয় তিনগুন হয়ে গেছে। দুটোই হাস্যকর দাবি। কৃষকরা দুরবস্থার মধ্যে আছেন। ফসলবীমার নামে ৫টা কর্পোরেট সংস্থা ৭হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। অন্যদিকে এরাজ্যে অকাল বৃষ্টিতে আলুর ক্ষতি হয়েছে, আলু নিয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কেজি প্রতি ৭টাকার কম দাম হলে কৃষকদের লাভ হয় না, অথচ আলুচাষীরা ২-৩টাকা দাম পাচ্ছেন। সরকার সমস্যাটা স্বীকারই করতে চাইছে না। তেলেঙ্গানা সরকার রায়তবন্ধু নামে, কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকসম্মান নামে আর এরাজ্যের সরকার কৃষকবন্ধু নামে প্রকল্প যা করেছে তাতে ফসলের দাম, বীমা, ঋণ এসবের সমাধান না করে কৃষকদের হাতে থোক টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এতে সমস্যা মিটবে না। তাছাড়াও সরকারের জনবিরোধী নীতির জন্য মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ বাড়ছে। শিক্ষা স্বাস্থ্যে সরকারের বেসরকারীকরণের জন্য মানুষের খরচ বাড়ছে, বোঝা বাড়ছে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ফোন পেয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেদেশের মোটরসাইকেলের ওপর শুল্ক তুলে নিচ্ছেন। আর আমেরিকা এখানকার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়ামে শুল্ক চাপাচ্ছে। দেশের শিল্প পরিষেবা রক্ষায় সরকারের নজর নেই। এই সব জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বামপন্থীরা।

এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি। কেন্দ্র ও রাজ্য দুই জায়গাতেই দুর্নীতি। ওখানে রাফালে দুর্নীতি, এখানে সারদা নারদ দুর্নীতি। ওখানে ওরা থাকলে যে এখানে এরা নিরাপদ তা এখন প্রমাণিত হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পাঁচ বছর হয়ে গেলো কেন্দ্রীয় সরকারের সিবিআই, ইডি কেউ সারদার নারদার আসামীদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করেনি, তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমরা স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে বলছি, এই সব বিষয়ে বামপন্থীদের বিকল্প রয়েছে। আমরা যে দাবি নিয়ে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট করেছি, ব্রিগেডে সমাবেশ করেছি, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং দিল্লির বুকে শ্রমিক, কৃষক, আশা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের নিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন করেছি, ইশতেহার প্রকাশ করে উল্লেখ করেছি, সেইসবই আমাদের বিকল্প। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে। আদিবাসীদের এবং তফসিলি জাতির মানুষের উন্নয়ন কর্মসূচী কেন্দ্রীয় সরকার ছাঁটাই করছে, নারী ও শিশুকল্যাণে বরাদ্দ ছাঁটাই করেছে, দলিত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, আর এরাজ্যে মহিলাদের নিরপত্তার হাল তো সবাই জানেন। সংখ্যালঘু দলিতদের ওপরে আক্রমণের ঘটনা বারবার দেখা যাচ্ছে সারা দেশে। আমাদের বার্তা হলো এই যে এসবের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা বিকল্পের দাবিতে যে লড়াই আন্দোলন করছে তার কন্ঠস্বর সংসদে পৌঁছে দিতে হবে। সেটা যে করা যায় ২০০৪ সাল তার একটা দৃষ্টান্ত। সেই সময়ে সংসদে বামপন্থীরা যখন শক্তিশালী ছিলো তখন কাজের অধিকার, আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার, বীমা ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণ রোধ, খাদ্য ও শিক্ষার অধিকারের নিশ্চয়তা এসব করা গেছিলো। এখনকার পরিস্থিতি ২০০৪ সালের থেকেও কঠিন, আক্রমণ আরও তীব্র, কিন্তু এখনও বামপন্থাই বিকল্প। আমরা মানুষের কাছে বামপন্থীদের বিকল্পের লড়াইয়ের কন্ঠস্বর সংসদে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আবেদন করবো।

প্রশ্ন: জনজীবনের সমস্যার সমাধানের জন্য যে বিষয়গুলিকে আপনারা বামপন্থীদের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরছেন, সেই বিকল্পের জন্য বামপন্থীরা এরাজ্যে আন্দোলন সংগ্রাম কতটা করতে পেরেছে? তার কোনো প্রভাব নির্বাচনে পড়বে কি?

মিশ্র: এরাজ্যে এবং সারা দেশে এই সময়কালে যদি কেউ লড়াইয়ের ময়দানে থেকে থাকে তাহলে তা বামপন্থীরাই। আমরা নিরন্তর আন্দোলনেই আছি। গত আগস্ট মাসে সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যের জেলাগুলিতেও আইন অমান্য আন্দোলন হয়েছে। শত শত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, বামপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে। জনজীবনের দাবি নিয়ে বামপন্থী গণসংগঠনগুলি, তাদের সংগঠন বেঙ্গল প্ল্যাটফর্ম অব মাস অর্গানাইজেশন একাধিক পদযাত্রা করেছে। তারপরে ৪৮ ঘন্টার সাধারণ ধর্মঘট হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের সরকারগুলি যা করেনি এরাজ্যের তৃণমূল সরকার সেই আক্রমণ করেছে ধর্মঘট ভাঙতে। আইনী এবং বেআইনী পদক্ষেপ নিয়ে ধর্মঘট ভাঙতে চেষ্টা করেছে, আক্রমণের রেকর্ড তৈরি করেছে। কিন্তু মানুষের বার্তা স্পষ্ট ছিলো, ঐতিহাসিক ধর্মঘট হয়েছে। তারপরে সেই বার্তা নিয়ে ব্রিগেড সমাবেশ হয়েছে বামফ্রন্টের। ব্রিগেডের সমাবেশ প্রমাণ করেছে, বামপন্থীরাই শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করছে। নির্বাচনে নিশ্চয়ই এর প্রতিফলন ঘটবে।

প্রশ্ন: এটা কেন্দ্রের সরকার গঠনের নির্বাচন। কিন্তু এরাজ্যের রাজনীতিতে এর তাৎপর্য্য কী? বিশেষ করে বামপন্থীরা যখন কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকদলেরই বিরোধিতার কথা বলছে, তখন এই নির্বাচন কি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আসতে পারে?

মিশ্র: আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ২মাসের মধ্যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার হঠে যাবে, মোদী আর গদিতে থাকবেন না। কেন্দ্রে একটা বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার তৈরি হবে এবং বামপন্থীদের শক্তি সংসদে বাড়বে। এরমধ্য দিয়ে সারা দেশে মানুষের দাবির লড়াই আরও প্রসারিত হবে। এরাজ্যেও নির্বাচনের পরে তার প্রভাব পড়বে, তৃণমূল কংগ্রেস আরও দু’বছর সরকার চালাতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ তৃণমূল দলটাই ভেঙে যাচ্ছে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দল ভেঙে বিজেপি’তে যোগ দিচ্ছে। আরও অনেকে ভেতরে ভেতরে যোগাযোগ রাখছে চলে যাবে বলে। কারণ যারা লুটপাটের মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন তাঁরা আধিপত্য রাখার জন্য আনুগত্য বদলাতে চাইবে। এই অবস্থায় বর্ধিত শক্তি নিয়ে বামপন্থীদের লড়াই হবে বিজেপি যাতে মাথা তুলতে না পারে এরাজ্যে, তার জন্য নতুন পর্বের সংগ্রামের সূচনা হবে।

প্রশ্ন: কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি এবং এরাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার করছে। এই মেরুকরণের মোকাবিলা করে কীভাবে বামফ্রন্ট নির্বাচনে লড়াই করবে?

মিশ্র: বিজেপি বলছে গণতন্ত্র আক্রান্ত। ঠিকই তো। কিন্তু গণতন্ত্র তো ২০১১ সাল থেকেই আক্রান্ত। আমরা তখন থেকেই বলছি, বিজেপি তখন কী করছিলো? বিজেপি সরকারের তো পাঁচবছর হয়ে গেলো, অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও চিটফান্ডে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? কেন প্রতারকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে প্রতারিতদের টাকা ফেরৎ দেওয়া হলো না? নারদ টেপ তো ফরেনসিকে প্রমাণিত, ওটা জাল নয়। সংসদে এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আদবানি। কেন একদিনও সেই কমিটি বসতে পারলো না এটা নিয়ে? এটা বোঝাপড়া নয় তো বোঝাপড়া কাকে বলে! আর গণতন্ত্র নিয়ে বিজেপি কী বলবে, এখানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা ৩৪শতাংশ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় দেখেছি, ত্রিপুরায় বিজেপি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে প্রায় ৯৯শতাংশ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় করে। রামনবমীতেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে দুটো দলকেই দেখো গেছে। নীতি, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, যে কোনো প্রশ্নে তৃণমূল এবং বিজেপি একে অপরের পরিপূরক, কোনো ফারাক নেই। এই যে সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো’র স্ত্রীকে নিয়ে বিমানবন্দরের ঘটনাটা ঘটলো। উনি নাকি ২কেজি সোনা নিয়ে এসেছিলেন। তা কাস্টমস সেটা আটক করলো না কেন? কাস্টমস্‌ কারা চালায়? নতুন ফেডারেল কাঠামোয় ওটাও রাজ্যের হাতে চলে এসেছে নাকি! কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু করার নেই? কাজেই বিজেপি’র প্রতিবাদ করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। ত্রিপুরার মতো গোটা তৃণমূল দলটা যদি এখানেও বিজেপি’তে চলে যায় অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপি’কে ভোট দেওয়া একই ব্যপার। তাই আমরা নির্বাচনে দুটো দলের বিরোধী ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করার আহবান জানিয়েছি।

প্রশ্ন: যেভাবে যুদ্ধোন্মাদনা এবং জাতীয়তাবাদের ভাবাবেগ জাগানো হচ্ছে তাতে জনসাধারণের রুটিরুজির সমস্যা কি নির্বাচনের মুখে এসে চাপা পড়ে যাচ্ছে? কাশ্মীরেরর ঘটনা, জওয়ানদের মৃত্যু এবং সীমান্তে সেনা কার্যকলাপ কি এরাজ্যেও ভোটদানের সময় জনসাধারণকে চালিত করবে?

মিশ্র: ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ রাজ্যে, বিশেষত রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের মতো বিজেপি’র শক্ত ঘাঁটিতে তাদের পরাজয়ের পরেই আমরা সিপিআই(এম)’র পক্ষ থেকে বলেছিলাম বিজেপি অপরাজেয় নয় প্রমাণিত হলো। কিন্তু তখনই সতর্ক করেছিলাম এরা আরও তুরুপের তাস বের করবে। বাস্তবে তাই করেছে। রামমন্দির ইস্যুকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এনআরসি এবং নাগরিকত্ব বিল নিয়ে সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে দেওয়ার কথা বলে মেরুকরণের চেষ্টা করেছে। আর সেই সঙ্গে কাশ্মীর ও পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করে সারা দেশে তার ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা করেছে। আমরা এই বিষয়গুলি নিয়ে ডিসেম্বর মাসেই সতর্ক করেছিলাম। কাশ্মীরে বিজেপি পিডিপি’র সঙ্গে সরকারে ছিলো, সেই সরকারকে ভেঙে দিলো। ওখানকার মানুষের আস্থা নষ্ট করছে, তাঁদের অধিকার খর্ব করছে। পুলওয়ামায় ঘটনার জন্য দায়ী তো সরকারের গাফিলতি। বিজেপি সরকারের আমলে দেশে নিরাপত্তা রক্ষীরা বেশি সংখ্যায় প্রাণ দিয়েছে, আর সীমান্ত পার থেকে অনুপ্রবেশও বেশি সংখ্যায় হয়েছে। এই সরকার দেশের নিরাপত্তা, সংবিধান, ঐক্য সবকিছু রক্ষাতেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এখন সেগুলো থেকে নজর ঘোরাতে বায়ুসেনার কর্মী অভিনন্দনের ছবি দেখিয়ে ভোট চাইতে হচ্ছে! এতই দেউলিয়া অবস্থা বিজেপি’র। কিন্তু ওরা মানুষের প্রকৃত বিষয়গুলি থেকে নজর ঘোরাতে চাইলেও আমরা বামপন্থীরা প্রকৃত বিষয়গুলি নিয়েই প্রতিদিনের লড়াইতে আছি। এই যে ধর্মতলায় এসএসসি উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েরা অনশনে বসে মুখ্যমন্ত্রীর তথাকথিত ‘অনশন’এর রেকর্ড ভেঙে দিলেন সেটা কী এইসব মেরুকরণ করে নজর ঘুরিয়ে আটকাতে পারলো? আলুচাষীদের বিক্ষোভকে আটকাতে পারলো? পারবে না। তবে আমরা মনে করি, স্বাধীনতার পরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে দুবার এরকম চ্যালেঞ্জ এসেছিলো। ১৯৭৭ সালে এবং ২০০৪ সালে। দুবারই দেশের নির্বাচকমন্ডলী প্রমাণ করেছেন যে সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ মোকাবিলায় তাঁরা সক্ষম। 

প্রশ্ন: আমাদের শেষ প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচন সহ বিভিন্ন নির্বাচনে শাসকদলের সন্ত্রাস দেখা গেছে। মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এবার অবাধে ভোট দিতে পারবেন কিনা। লোকসভা নির্বাচনে কি এর জন্য আপনারা নির্বাচন কমিশনের ওপরেই ভরসা করছেন?

মিশ্র: আমরা বারবার বলছি, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা এসব নিয়ে কোনো অতিরিক্ত মোহ রাখবেন না। তার মানে এই নয় যে কমিশনে অভিযোগ জানাবেন না। অভিযোগ জানাতে হবে, লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। সুযোগের ব্যবহার করতে হবে। অভিযোগ করে কিছু তো আদায় করা সম্ভব হয়। যেমন গতবার তো পরিচিতি পত্র ছাড়াই বুথ শ্লিপ দিয়ে ভোট দিয়েছিলো। এবার কমিশন আমাদের দাবি মেনেছে। কাজেই মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে, অধিকার রক্ষার লড়াইতে মানুষকে সংগঠিত করাটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি বলতে চাইছি, যে এটা পঞ্চায়েত নির্বাচন নয়। ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় যে সব নির্বাচন এই সময়ে হয়েছে সব অবাধ হয়েছে এমন মোহ আমি রাখতে বলছি না। কিন্তু আমি বলছি, বাস্তবতা হলো, তৃণমূল ভয় পেতে শুরু করেছে। পঞ্চায়েতে ৩৪শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেও এমন শতাধিক পঞ্চায়েত আছে যেখানে তৃণমূল জিতেও কর্মকর্তা নির্বাচিত করতে পারছে না। তৃণমূলের হাতে তৃণমূলই আক্রান্ত। তৃণমূলের নেতাদেরই নিরাপত্তা নেই। এমনকি বিধায়কদেরও নেই। কেউ ছাড় পাচ্ছে না, নিজেদেরই হাতে আক্রান্ত হচ্ছে, বোমা ফাটছে, খুন হচ্ছে। তৃণমূলের এত দ্রুত ক্ষয় ২০১১ সালের পরে কখনো দেখা যায়নি। এই অবস্থায় প্রত্যেক বুথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ লাল পতাকা তুলে ধরবেন, বামপন্থী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাবেন। মানুষ যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে ওরা পালাবে। এটাই বাস্তবতা। কাজেই আমি বলিষ্ঠ আশাবাদে বিশ্বাসী। মানুষ শপথবদ্ধ হচ্ছেন, মরিয়া হয়ে তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এটাই সুষ্ঠু ভোটের সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি হতে পারে। 

গণশক্তি, ১লা এপ্রিল, ২০১৯