Showing posts with label চন্দন দাস. Show all posts
Showing posts with label চন্দন দাস. Show all posts

20220712

বুথ দখলেও ভরসা নেই, ভোটই আটকাতে চান মমতা

চন্দন দাস

রাজ্যের পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাত্রা বদলে গেছে। গ্রামের সরকারগড়ার সংগ্রাম পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। বোমায় ক্ষতবিক্ষত নলহাটির খেতমজুর হীরু লেট সেই যুদ্ধের নিশান।
রাজ্যের অষ্টম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন শুরু আগামী ১লা মে। একমাসও বাকি নেই। পঞ্চায়েত নির্বাচন গ্রামের সরকারগড়ার নির্বাচন। নির্বাচন একটি রাজনৈতিক লড়াই। ফলে গ্রামের উন্নয়ন সম্পর্কে কোনও রাজনৈতিক দল বা পার্টির কী নীতি তার সংগ্রামই পঞ্চায়েত নির্বাচন। স্বাভাবিক ভাবেই গ্রামের উন্নয়ন, শাসকদলের নেতা কর্মীদের দুর্নীতি, গ্রামের বিকাশে রাজ্য সরকার এবং সরকারে আসীন দলের ভূমিকাই এই নির্বাচনের প্রধান বিচারের বিষয়। আর সেক্ষেত্রে গ্রামের মানুষই প্রধানত সেই বিচারের দায়িত্বে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ গত সাত বছর এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আছে। দিন যত যাচ্ছে, সেই পরিস্থিতির সংকট বাড়ছে, বিপদ ছড়াচ্ছে। এখন, পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে তা ঘনীভূত। এখন, এই পরিস্থিতিতে আমরা এক যুদ্ধে আছি। শুধু গ্রামের যুদ্ধ আর নেই তা। নিঃসন্দেহে গ্রামবাসীদের দিকেই অধীর অপেক্ষায় রয়েছে সময়। তবু, এই পরিস্থিতিতে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে রাজ্যের প্রায় দশ কোটি মানুষ পাশাপাশি এক যুদ্ধে আছি। যুদ্ধ সরকার গড়ার নয় এই সংগ্রাম আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের।
যুদ্ধে দুটি পক্ষ থাকে। দুটি পক্ষেরই কিছু মিত্র শক্তি থাকে। এই শেষ বসন্তে, এপার বাংলার প্রতি ইঞ্চি জমিতে যুযুধান দুই পক্ষ। একদিকে তৃণমূল কংগ্রেস। আর একদিকে মানুষ ছোট দোকানদার, কৃষক, চাকরিজীবী, খেতমজুর, দিনমজুর, অসংগঠিত শ্রমিকসহ আরও অনেকে। গরিব, মধ্যবিত্ত, ছোট ব্যবসায়ী আর তৃণমূল কংগ্রেস মুখোমুখি।
তৃণমূল কংগ্রেসের মিত্র শক্তি আছে সংগোপনে, কৌশলে। নাম বি জে পি। বি জে পি-র পিছনে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরঙ দল। আর সম্মিলিত জনতার বন্ধু কারা? যাঁরা ২৮শে মার্চ কাজের দাবিতে মিছিল করেছেন, তাঁরা রাজ্যের জনতার মিত্র শক্তি। যাঁরা রামনবমীর আগে শোভাযাত্রা করেছেন, স্লোগান দিয়েছেন — ‘ধর্ম যার যার/ দেশ সবার’ — তাঁরা মানুষের পক্ষে। তাঁরা বামপন্থী, তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ। তাঁরাই দেশপ্রেমিক।
কী আশ্চর্য সমাপতন! গত ২৫শে মার্চ ছিল রামনবমী। যদিও ২৪শে মার্চ থেকে পরের প্রায় সাতদিন রামনবমী পালিত হয়েছে রাজ্যে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং সেই রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার অনুমতি দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, স্বাধীনোত্তর ভারতে প্রথম কোনও শাসকদল রামনবমী পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। রামনবমী একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান। ধর্মের সঙ্গে প্রশাসনকে এইভাবে মিলিয়ে দেওয়ার কাজ দেখা গেল স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্রবর্তী ঘাঁটি পশ্চিমবঙ্গে সেটিও তৃণমূল কংগ্রেসের দৌলতে। আলিপুরদুয়ারের মতো বেশ কিছু জায়গায় বি জে পি আর তৃণমূল কংগ্রেস মিলিতভাবে রামনবমীর ধর্মীয় শোভাযাত্রা করল। কাঁকিনাড়ায় শাসকদলের মিছিলেই খাপখোলা তরবারি দেখা গেল। রাজ্যে দাঙ্গা হলো বেশ কয়েকটি জায়গায়। অন্তত তিনজনের প্রাণ গেল সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায়। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল।
হিন্দুত্বের উগ্র বাসনা ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেল। অস্ত্র নিয়ে উন্মত্ত প্রকাশ বৈধতা পেল। প্রশ্ন উঠল সেই একটি পক্ষ থেকে, যারা মানুষের পক্ষে, দেশের পক্ষে। সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্র বললেন,‘‘মুখ্যমন্ত্রী কী বাংলায় মোদীর গুজরাট মডেলের প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে চান?’’ আর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগকে স্বাগত জানালেন। কেন? কারণ — ‘গুজরাট মডেলহালে পানি পাচ্ছে মমতা ব্যানার্জির উদ্যোগে।
রাজ্যে যখন এমন সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পরিবেশ, ঠিক তখন পঞ্চায়েত নির্বাচনের সূচি ঘোষিত হলো। অথচ আগের বার, ২০১৩-তে এই মুখ্যমন্ত্রীই পঞ্চায়েত নির্বাচনকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন জুলাইয়ে। নির্বাচনের সূচি নিয়ে মামলা পৌঁছেছিল সুপ্রিম কোর্টে। পঞ্চায়েতগুলি গঠিত হয়েছিল আগস্ট-সেপ্টেম্বরে। এবার তার প্রায় বিপরীত। ধর্মীয় শোভাযাত্রার নামে আস্ফালনের পরেই, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলাকালীনই পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু। গ্রামে হিন্দুত্ববাদীদের প্রভাব, চিহ্নকে ভোটের হিসাবে মান্যতা দেওয়া, বি জে পি-কে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মমতা ব্যানার্জির এত তৎপরতার কারণ কী? তাঁর নিজের লুটের শাসন আরও কিছুদিন টিকিয়ে রাখা নিশ্চয়ই একটি কারণ। আর একটি কারণ? নরেন্দ্র মোদীর শাসনে বিপর্যস্ত দেশের সামনে প্রকৃত বিকল্প হাজির করার লক্ষ্যে অটল বামপন্থীরা। সেই লড়াই নয়া মাত্রা পেতে চলেছে মুম্বাইয়ে কৃষকদের লঙ মার্চ তার একটি বহিঃপ্রকাশ। এমন সময়ে পশ্চিমবঙ্গে ধারাবাহিক লড়াইয়ে থাকা বামপন্থীদের কৌশলে দুর্বল প্রতিপন্ন করা আসলে বি জে পি এবং মমতা ব্যানার্জির যৌথ কর্মসূচি।
দেশের আগামীকাল পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের উপর নির্ভর করছে। পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের অন্তর্জলি যাত্রা দেশে ফ্যাসিবাদের আগ্রাসনকে আরও শক্তি জোগাবে। তাই পশ্চিমবঙ্গের এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচন জন্মভূমি রক্ষার সংগ্রামে সম্পৃক্ত।
উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছে। এমন সময়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন। সেই নির্বাচনে হাঙ্গামা, সশস্ত্র হামলা চলছে। যে কন্যাশ্রীবা যুবশ্রীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছেন, পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন, তিনি কী দেখেছেন? আমরা, যাঁরা মমতা ব্যানার্জির পাঁশকুড়া-লাইন দেখেছি, কিংবা যাঁরা অবরুদ্ধ-নন্দীগ্রামের কথা জানি, তাঁরা বাইকবাহিনীর হামলায় গ্রাম দখল দেখেছি। একটি সাধারণ, স্বাভাবিক অঞ্চল কিভাবে দখলিকৃত এলাকাহয়ে ওঠে, আমরা দেখেছি। আস্ত ব্লক এলাকার প্রতিটি পঞ্চায়েত শুধু বোমা, বুলেটের দাপটে মাসের পর মাস দাবিয়ে রাখা যায়? তালপাটি খাল কিংবা কংসাবতীর পাড় তা জানে। সবই পশ্চিমবঙ্গের জানা হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সৌজন্যে।
কিন্তু ব্লক অফিস দখল? মহকুমাশাসকের দপ্তর অস্ত্রের দাপটে অবরোধ? এবার দেখা গেল। কৃতিত্ব’ — সেই তৃণমূল কংগ্রেসের। সদ্য বাবাকে হারানো পাঁশকুড়ার যুবক গেছেন ব্লক অফিসের দিকে। পৌঁছাতে পারেননি ব্লক অফিসের দরজায়। সেই যুবকের দরকার মৃত বাবার কিছু নথিতে সরকারি আধিকারিকের সই। তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মমতা ব্যানার্জির দামালছেলেরা আঙুল উঁচিয়ে বলেছে,‘‘বাড়ি যা। এখন ঢোকা যাবে না এখানে। সব ৯ তারিখের পরে।’’ এমন আরও অভিজ্ঞতা হয়েছে অনেকের। কেন ৯ তারিখসেদিন পর্যন্ত রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে। আর ততদিন ব্লক অফিস পাহারা দেবে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা, কর্মীরা। তাদের জন্য ক্যাম্প হয়েছে ব্লক অফিসের রাস্তায়। সেই ক্যাম্পে ঢালাও খানা এবং পিনার ব্যবস্থা হয়েছে। আর হাতে হাতে ধরানো হয়েছে বোমা, মাস্কেট, পিস্তল।
গত সাত বছর রাজ্যে সরকার পরিচালনা করছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই বছরগুলিতে তাঁর সরকার রাজ্যের জন্য কী কী উন্নতি ঘটিয়েছেন, তার একটি বিচার এবারের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হওয়ার কথা। মমতা ব্যানার্জির দাবি তিনি ৮১লক্ষের উপর চাকরি দিয়েছেন। তাঁর আমলে গ্রামে অনেক রাস্তা হয়েছে। অনেক ভাতা চলছে। মানুষ নানা নামের প্রকল্পে ঘর পাচ্ছেন। এমন সময়ে মানুষ তাঁর এবং তাঁর সরকারের পাশে দাঁড়াবেন সেটিই স্বাভাবিক। যদি নিজের দাবির প্রতি তাঁর ভরসা থাকে, তাহলে তাঁর সুষ্ঠু পঞ্চায়েত নির্বাচন হওয়ার জন্য বাড়তি দায়িত্ব নেওয়ার কথা। কিন্তু তা হলো না। তাঁর দলের সশস্ত্র কর্মীরা ব্লক অফিস অবরুদ্ধ করল রাজ্যের প্রায় প্রতিটি জায়গায়। কারণ আশঙ্কা আছে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করবে। পূর্ব মেদিনীপুরের ভগবানপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা নান্টু প্রধানের গ্রামবাসীদের রোষে মৃত্যুর ঘটনা কী নিশ্চিত অশনি সংকেত? বর্ধমানের কিছু গ্রামে চোরতৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের গ্রামবাসীদের সম্মিলিত তাড়া করা, আটকে রাখা, তোলাবাজির টাকা আদায় করার ঘটনা কী কোনও ইঙ্গিত? গ্রামে মানুষ ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন কাজ না পেয়ে, প্রাপ্য টাকা না পেয়ে, ন্যায্য বাড়ি না পেয়ে। তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাদের তোলার টাকা দিতে দিতে, নান্টু প্রধানের মত লোকদের কাছে নিজের জমি হারিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়া মানুষ ব্যালটে জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। তাই কোথাও মনোনয়নপত্র জমা পড়ুক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক চাননি মমতা ব্যানার্জি। বুথ দখল করে ভোটে জেতা অভ্যাস হয়ে গেছে তৃণমূল কংগ্রেসের। ফলে গ্রামবাসীদের কোনও অংশকেই তারা আর ভরসা করতে পারছে না। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতারই মুখোমুখি হতে চাইছেন না মমতা ব্যানার্জি। গত ২২শে মার্চ মেদিনীপুরে প্রশাসনিক সভা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সেদিন তিনি বলেন যে, পঞ্চায়েত শাসকদলের হাতে না থাকলে কিভাবে কাজ হবে? তাই তাঁর আহ্বান ছিল পঞ্চায়েত নির্বাচনে জিতিয়ে কাজের সুযোগ দেবেন।
উন্নয়নের প্রতীকযিনি, তাঁর এই আহ্বানের মানে কী? সব পঞ্চায়েতে, সব আসনে জিততে হবে। ভোট লুট তো পরের কথা। ভোটই আটকাও — ‘উন্নয়নের জন্য।কার উন্নয়ন? গণতন্ত্র খুন করে উন্নয়নের লালন? হতে পারে না। কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্তর কথায়,‘‘বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনে অনেক সময় সাধারণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব হয় না। পঞ্চায়েত নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সাধারণ মানুষকেই নির্বাচিত করতে চাই। সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত করতে চাই।’’(১৯৭৮, ১৯শে এপ্রিল, কলকাতা)।
গ্রামের সরকার গড়ার সংগ্রামের গুরুত্ব এখানে। রাজ্যের উন্নয়ন সেই গণতন্ত্রের বিকাশের উপর নির্ভরশীল। তাই-ই রক্তাক্ত। নলহাটি লড়ছে। ভাঙড় লড়ছে। লড়ছে আরও অনেক জনপদ।
এ লড়াই শুধু নির্বাচন নয় গণতন্ত্র রক্ষার যুদ্ধ! নলহাটিতে বোমায় ক্ষতবিক্ষত খেতমজুর হীরু লেটের শরীর সেই যুদ্ধের প্রতীক।


গণশক্তি, ৭ই এপ্রিল, ২০১৮

20200721

মমতাই প্রমাণ করেছেন ‘২১শে জুলাই’ এক ধাপ্পার দিন!


চন্দন দাস


‘২১ শে জুলাই’-র মামলা এখনও চলছে। সরকার মামলা প্রত্যাহার করেনি। ‘২১শে জুলাই’ কমিশন গড়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে। সেই রিপোর্ট জমা পড়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ‘২১ শে জুলাই’-র হলফনামা পেশকারী মনীশ গুপ্তকে নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ পর্যন্ত বানিয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। কিন্তু ‘২১শে জুলাই’-র কমিশনের সুপারিশগুলির কিছুই করতে পারেনি তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার।

মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ‘২১শে জুলাই’-এ কিছু ঘোষণা করেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। যেমন ‘দু’ বছরে দশ লক্ষ চাকরি দেবো।’ ন’ বছর কেটে গেছে। সেই প্রতিশ্রুতিও পালিত হয়নি। গত ন’ বছরে পশ্চিমবঙ্গে কাজের সুযোগ প্রচুর কমেছে। ২০১১-র ‘২১ শে জুলাই’-এ একটি চমৎকার শপথ বাক্য নেতা, কর্মীদের পাঠ করিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। বলেছিলেন, ‘‘..বিশৃঙ্খলা কিন্তু বরদাস্ত করা হবে না। বলুন, চুরি করবেন না। কেউ অন্যায় করলে আটকাবেন।’’ সেই ঘোষণা এখন একটি মস্করায় পরিণত হয়েছে। এখন মমতা ব্যানার্জি ভুল করেও এই কথা মুখে আনেন না। সেই ‘২১ শে জুলাই’ থেকে গত ন’ কতরকমভাবে চুরি করা যায় তা দেশকে হাতে কলমে শিখিয়েছে মমতা ব্যানার্জির দল। সব চুরিই ‘বরদাস্ত’ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী। চুরি করে শাস্তি পেয়েছে এমন তৃণমূলীর অস্তিত্ব নেই রাজ্যে! বরং উল্টোটাই শোনা গেছে গত কয়েক বছর।


২০১৯-র ‘২১ শে জুলাই’-র আগে রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসীদের কাটমানির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছিল। ক্ষুব্ধ, ঠকে যাওয়া মানুষ তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের বাড়ি ঘিরছিল কাটমানি ফেরতের দাবি নিয়ে। চারিদিকে হুলস্থুল। রাজ্যের ভাবমূর্তিতে দেশময় কালি ছিটছে তখন। তেমন সময়ে, ২০১৯-র ‘২১শে জুলাই’-র মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে বলতে শোনা গেছিল ২০১১-র উলটো কথা। সেদিন তিনিই বলেছিলেন, ‘‘টাকা চেয়ে তৃণমূলের লোকজনের বাড়ি গেলে এবার আমরা স্ট্রং ব্যবস্থা নেবো।’’ অর্থাৎ বিক্ষুব্ধ, প্রতারিত মানুষের বিরুদ্ধেই পুলিশী, প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। আরও কী বলেছিলেন গত বছর? কাটমানি নিয়ে ভাষণ দিতে দিতে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‘...বলছে নাকি আমাদের লোকদের টাকা ফেরত দিতে। ওরা বলছে কাটমানি ফেরত দাও। কতগুলো কুঁচো চিংড়ি আর কতগুলো ল্যাটা মাছ, তাদের আবার বড় বড় কথা।’’ তৃণমূল কংগ্রেসের চোর নেতা, কর্মীদের কাটমানি দিয়ে প্রতারিত মানুষকে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছিলেন ‘কুঁচো চিংড়ি’ আর ‘ল্যাটা মাছ।’


এবার কাটমানির ইস্যুই আছে। তবে আরও বড় আকারে। গত এক বছরে কাটমানির সঙ্গে জুড়েছে করোনায় বিপর্যস্ত মানুষের জন্য বরাদ্দ চাল লুট, আমফানে বিধ্বস্ত মানুষের ত্রিপল, চাল চুরি, আমফানে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ টাকা দেদার লুট, পান বরোজের ক্ষতির টাকা চুরি — এমন নানা তৃণমূল কংগ্রেসী তস্করবৃত্তি। এই চুরিগুলিকে ইতিমধ্যেই নবান্নে সরকারী চেয়ার থেকে মমতা ব্যানার্জি  ‘তাড়াতাড়ি কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুল’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে রেখেছেন। এবার ‘২১ শে জুলাই’-র দলীয় মঞ্চ থেকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী এই জালিয়াতিগুলিকে কী বলেন, তা মঙ্গলবারই স্পষ্ট হবে। প্রসঙ্গত, ২০১৮-তে দখলের পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরের ‘২১ শে জুলাই’-এ তৃণমূল কংগ্রেসের বার্তা ছিল,‘‘তৃণমূল দখল করবে দিল্লি, দিদি হবেন প্রধানমন্ত্রী।’’


গত বছর, অর্থাৎ ২০১৯-র ‘২১শে জুলাই’-এ মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন,‘‘২০২১’র ভোট দেরি আছে। পরের বার বলব।’’ অর্থাৎ মঙ্গলবার তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর আগামী বিধানসভা নির্বাচন নিয়ে বলার কথা। আশা করা যায় বলবেন। গতবছর তিনি দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন,‘‘কানে কানে সবাইকে বলে দেবেন, তৃণমূল ভয় পায় না।’’ তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা প্রকাশ্যে, চুরির দায়ে কান মুলছেন, হাত জড়ো করে ক্ষমা ভিক্ষা করছেন, বাঁশবাগানে লুকিয়ে রাত কাটাচ্ছেন — এসব রাজ্য দেখেছে গত কয়েক মাসে। মানুষের বিক্ষোভের সামনে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতারা ভয় পেয়ে ঘরে ঢুকে গেছে — কানে কানে নয়, সারা রাজ্য জোরে জোরে বলছে এই কথা। এবার মমতা ব্যানার্জি দলের নেতাদের ভোট লুটের যোগ্য করে তুলতে কী ভোকাল টনিক দেন — সেটাই প্রধান আকর্ষণ মঙ্গলবারের ভার্চুয়াল সভার।


কিন্তু ’২১ জুলাই’-র কমিশন, মামলার কী হলো? আর কিছু না পারুন, তার কোনও হিল্লে করবেন মমতা ব্যানার্জি — এটা আশা করাই যায়। তাও পারেননি স্বঘোষিত অগ্নিকন্যা১৯৯৩-র ২১শে জুলাই ধর্মতলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব, মনীশ গুপ্ত সেই ঘটনা সম্পর্কে হাইকোর্টে হলফনামা দিয়েছিলেন। সেই হলফনামায় বলা হয়েছিল,‘ওই দিন (১৯৯৩-র ২১শে জুলাই)-এ জমায়েতে বহু সশস্ত্র দুষ্কৃতী (অ্যান্টিসোশ‌্যাল) নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জড়ো হয়েছিল।’ তারা মহাকরণের দিকে ছুটতে থাকে। পুলিশ প্রথমে নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জনতাকে শান্ত করতে চেষ্টা করে। ‘জনতা’ পুলিশকে লক্ষ্য করে পাইপগান থেকে গুলি ছোঁড়ে। ইট, পাথর, সোডার বোতলও ছোঁড়া হয় যথেচ্ছ। পুলিশ তখন লাঠি চালায়। ৩৪১ রাউন্ড কাঁদানে গ্যাসের শেলও ফাটায় পুলিশ। পরে রাইফেল থেকে ৭৫ রাউন্ড ও রিভলভার থেকে ৪৬ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। মনীশ গুপ্তর হলফনামা আরও জানিয়েছিল, সেদিন ৩টি বাস পোড়ানো হয়েছিল। ৩৫টি গাড়ি ভাঙচুর হয়েছিল। সব মিলিয়ে জখম হয়েছিলেন ২১৫ জনেরও বেশি পুলিশ। তাঁদের মধ্যে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ডিসি (সদর), ৭জন ডিসি, ১০ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার রয়েছে। ৩৪ জন পুলিসকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ হাসপাতালে। তাঁদের অনেকেরই পাইপগানের গুলি এবং বোমার স্প্লিন্টার লেগেছিল। তালতলা থানার সার্জেন্ট ডি কে ঘোষালের গুলি লেগেছিল। এক সাব ইনস্পেক্টর কালাচাঁদ সমাদ্দারের শরীরে আঘাত ছিল বোমার। কলকাতা পুলিসের গোয়েন্দা বিভাগের সাব ইনস্পেক্টর একে গাঙ্গুলিকে এস এস কে এম হাসপাতালের সামনে মেরে মাথা ফাটিয়ে, হাত ভেঙে দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। অর্থাৎ সেদিন ‘আন্দোলনকারীরা’ বোমা, পাইপগান নিয়ে এসেছিল! তারা মহাকরণ দখল করতে ছুটছিল। গুলি ছুঁড়ছিল, বোমা মারছিল।

সেদিন সাংবাদিকও পিটিয়েছিল মমতা ব্যানার্জির দলবল। দুপুর পৌনে তিনটে নাগাদ ধর্মতলায় স্কুটার আরোহী ওই সাংবাদিক, সঈদ আহমেদকে মমতা ব্যানার্জির কর্মীরা ঘিরে ধরে মেরেছিল। মারাত্মক আহত হন তিনি। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুটি অভিযোগ পুলিশ দায়ের করে। একটি পার্ক স্ট্রিট থানায়। আর একটি হেস্টিংস থানায়। অভিযোগের মধ্যে ছিল সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, অস্ত্র আইন লঙ্ঘন, খুনের চেষ্টা, পুলিশকে মারধর ইত্যাদি। সেদিন রেডরোডে, ছদ্মবেশে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর গাড়ি আটকানোর চক্রান্ত হয়েছিল, তা জানা গেছে সোনালি গুহর লেখায়। সেই ‘দায়িত্ব’ সোনালি গুহদের নিজের বাড়িতে ডেকে দিয়েছিলেন স্বয়ং মমতা ব্যানার্জি। তিনি এখন মুখ্যমন্ত্রী। সেদিনের ঘটনা সংক্রান্ত দুটি মামলা আজও চলছে। সাতাশ বছর। অভিযুক্তদের আইনজীবী অলোক কুমার দাস সোমবার জানিবেছেন, ‘‘মামলাটি এখনও চলছে। তারিখ পে তারিখ চলছে। চিহ্নিত ১৫-১৬ জন এখনও হাজিরা দেন ডেট পড়লে। আমি আদালতের কাছে এবং রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছি মামলটা খারিজ করতে।’’ এই আইনজীবী দু’বার তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আইনমন্ত্রীদের কাছে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছেন। কিন্তু আশ্বাস ছাড়া কিছুই জোটেনি।


‘২১ শে জুলাই’-র প্রয়োজন ফুরিয়েছে চম্পলা সর্দার, কিষেণজীর মত। ফলে সেদিনের স্বরাষ্ট্র সচিব মনীশ গুপ্তর মন্ত্রী, সাংসদ হওয়া হয়ে গেলেও মামলায় ‘তারিখ পে তারিখ’ থামছে না। মমতা ব্যানার্জির ঘোষণা ছিল ‘২১শে জুলাই’-এ ঘটনায় ‘দায়ী’ সিপিআই(এম) নেতা, মন্ত্রী, পুলিশ কর্মীদের শাস্তি দেবেন। এখন সে কথা বলেননও না। সিপিআই(এম)-কে কিছু করতে হয়নি। মমতা ব্যানার্জিই প্রমাণ করে তুলেছেন — ‘২১শে জুলাই’ এক বিরাট ধাপ্পার দিন!


 ২০ জুলাই, ২০২০