Showing posts with label তৃণমূল সরকার. Show all posts
Showing posts with label তৃণমূল সরকার. Show all posts

20220712

মেরুদণ্ড: শমীক লাহিড়ী

 

 ৩০ মার্চ। সকাল ৮ টা নাগাদ বিষ্ণুপুর থানার কোম্পানির পুকুরে আমতলা-বারুইপুর রোডের খালের ধারে  পথচলতি গ্রামের মানুষ এক যুবকের মৃতদেহ দেখতে পান। যুবকের মাথাটা খালের জল-কাদার মধ্যে ডোবানো ছিল। তাই কার মৃতদেহ প্রথমে কেউই বুঝতে পারেন নি। পরে সবাই বোঝেন, এই দেহ স্থানীয় যুবক বিদ্যুৎ মন্ডলের। পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে মৃতদেহ তুলে নিয়ে যায়, আর যথারীতি সাজানো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়ে দেয়। 

তারপর থেকে ঘটনাস্থল, বিদ্যুৎ-এর বাড়ি বা গ্রামে কোথাও পুলিশ যায়নি। গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ-এর চটি ছাড়া আরও একজোড়া জুতো, একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ আর দুটো মোবাইল ফোন খুনের ঘটনাস্থল থেকে পেয়ে পুলিশে জমা দিয়ে আসেন। ঘটনাস্থলে কাদায় ধ্বস্তাধস্তির চিহ্ন ছিল স্পষ্ট। পুলিশ কিন্তু ভুলেও আর ঐ রাস্তায় যায়নি। পুলিশের কুকুরও যায় নি। 

কেন? এই প্রশ্ন ওঠা কি অস্বাভাবিক?

এই খুনের খবর ছবি ভিডিও সহ এগিয়ে-পিছিয়ে থাকা সহ, নানা নম্বর সম্বলিত সংবাদমাধ্যমগুলোকে পাঠানো সত্ত্বেও তা বেমালুম চেপে দেওয়া হ'ল? কেন? 

এই প্রশ্ন তোলা কি অগণতান্ত্রিক?

বিদ্যুৎ-এর ভাই ও বিধবা মা পুলিশে অভিযোগ করতে যান। এই অভিযোগ নিতেও বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ গড়িমসি করে, এমনকি উপস্থিত সিপিআই(এম) নেতাদের সাথে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করে। তা সত্ত্বেও জেদ ধরে দীর্ঘ সময় বসে থেকে পুলিশকে অভিযোগ নিতে বাধ্য করে, বিদ্যুৎ-এর ভাই সহ স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতৃত্ব। 

পুলিশে অভিযোগ জানাতে চাওয়াটাও কি খুবই অন্যায় কাজ? 

৩০ মার্চ থেকে পুলিশ ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার জন্যই একবারের জন্যও কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি, কাউকে আটক করেনি, কোনও তৎপরতা দেখায়নি, খুনের ঘটনার তদন্ত করার প্রশ্নে। কেন করেনি? এই প্রশ্ন তোলা অপরাধ?

কেন খুন হ'লো বিদ্যুৎ? 

একটি নাবালিকা মেয়েকে জবরদস্তি বিয়ে করতে চায় একটি ছেলে, যে কিনা স্থানীয় তৃণমূলের এক জমি মাফিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ায় বিদ্যুৎ। পুলিশের কাছে পরিবারটির সদস্যদের নিয়ে যায় বিদ্যুৎ, এই বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে। যেহেতু শাসকদলের জমি মাফিয়ার ঘনিষ্ঠ এই অন্যায় কাজে যুক্ত, তাই পুলিশ এই অভিযোগকে আমল দেয়নি স্বাভাবিকভাবেই।নাছোড়বান্দা বিদ্যুৎ জাতীয় মহিলা কমিশন সহ বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠিপত্র লিখে, পুলিশকে বাধ্য করায় অভিযোগ নিতে এবং লোকদেখানো সাময়িক সময়ের জন্য হলেও ছেলেটি ও তার পরিবারের কয়েকজনকে পুলিশ বাধ্য হ'য়ে গ্রেপ্তার করে।

বিদ্যুৎ কি অন্যায় করেছিল? বিদ্যুৎ ডিওয়াইএফআই ও সিপি আই(এম) কর্মী। তাই দলের শিক্ষায়- নীতিতে উদ্বুদ্ধ বিদ্যুৎ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অসহায় দরিদ্র নাবালিকার পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। এটা কি অপরাধযোগ্য কাজ? 

এইবার শাসকদলের মাফিয়ারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ দীর্ঘ ৬ মাসের বেশি সময় ধরে বাড়ি ও গ্রামছাড়া হতে বাধ্য হয়।

নাবালিকার বিয়ে আটকানোর জন্য বাড়িছাড়া, কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন- সংবাদমাধ্যম নীরব, নিশ্চুপ সব জানা সত্ত্বেও - এটা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতা? কোথায় যাচ্ছে বাংলা? প্রশ্নটা কি খুবই অশালীন? 

এরপর স্থানীয় কিছু তৃণমূল নেতা সালিশি সভা ডেকে নিদান দেয়, ২লক্ষ টাকা জরিমানা দিলে গ্রামে ঢুকতে দেওয়া হবে বিদ্যুৎকে। এটা খাপ পঞ্চায়েত নয়? সারা বাংলাজুড়ে এই খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা জরিমানা তুলছে তৃণমূলীরা - এটা জানে না পুলিশ? থানায় এর প্রতিকার চাইতে গেলে পুলিশ কি বলে না, কিছুটা কম করে দিচ্ছি, টাকা দিয়ে মিটিয়ে নিন? এটা কে না জানে? কোনও সান্ধ্যকালীন আলোচনা এই নিয়ে হয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে? খুব অস্বস্তিকর, শালীনতার মাত্রা ছাড়ানো প্রশ্ন হয়ে গেল - তাই না!!

নাবালিকাকে বেআইনিভাবে বিয়ে করা আটকানোর জন্য বাড়িছাড়া, তারপর আবার ২লক্ষ টাকা জরিমানা - এই হ'লো তৃণমূলের খাপ পঞ্চায়েতের নিদান। কিন্তু পুলিশ প্রশাসন সংবাদমাধ্যম সব জেনেও নীরব। এটাই বর্তমানে গণতন্ত্রের 'বাংলা মডেল'।

বিষ্ণুপুর থানার আন্ধারমানিক, জুলপিয়া সহ ৪/৫ টা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা সম্পূর্ণভাবে তৃণমূলী জমি মাফিয়াদের দখলে। কেউ বিরোধিতা করতে পারে না। মেরে, ঘর জ্বালিয়ে জমি কেড়ে নিয়ে সব সিপিআই(এম) কর্মীদের  গ্রামছাড়া করেছে এই জমি মাফিয়ারা পুলিশের  প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ২০১১ সালের পর থেকেই। এমনকি যে তৃণমূল কর্মী বা সমর্থকরা প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদেরও একইভাবে অত্যাচারিত হ'তে হয়েছে। এখানে সব তৃণমূলী জমি মাফিয়াদের হাতে পিস্তল। সমগ্র দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার পুলিশের কাছে মোট যা আগ্নেয়াস্ত্র আছে তার কয়েকগুণ বেশী আগ্নেয়াস্ত্র আছে ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রের ভাইপো নিয়ন্ত্রিত তৃণমূলী মাফিয়াদের হাতে। পুলিশ মন্ত্রী, পুলিশ, প্রশাসন, সংবাদমাধ্যম - কে জানে না একথা? কিন্তু প্রশ্ন তোলা যাবে না। তাতে মাফিয়া- পুলিশ- তৃণমূল, আর তাদের ধামাধারীদের আঁতাতকে নাকি খুব অসম্মান করা হয়!!

বিদ্যুৎ সাহস করে বাড়ি ফিরেছিল বিধবা মা'র কাছে থাকবে বলে। কপর্দকহীন বিদ্যুৎ জরিমানা না দিয়ে গ্রামে ঢোকার অপরাধে খুন হ'লো। 

বিদ্যুৎ-এর খুনের প্রতিবাদে গত ৫ এপ্রিল প্রায় হাজারখানেক গ্রামবাসীকে নিয়ে থানা ঘেরাও করে সিপিআই(এম)। সেইদিন পুলিশের কর্তারা ১ মাস সময় চেয়েছিলেন, খুনের কিনারা করার জন্য।

১মাস অপেক্ষা করার পর ৭মে প্রতিবাদ সভা হয় বিদ্যুৎ-এর গ্রামের অদূরেই কয়ালের মোড়ে। 

খুব অন্যায় হয়েছে এই সভা করা? যেখানে ২০১১-এর পর সিপিআই(এম) কেন, কোনও বিরোধী দলকে গায়ের জোরে কোনও কর্মসূচী করতে দেওয়া হয়নি, সেখানে জমি মাফিয়াদের মুক্তাঞ্চলে ৩ হাজার গ্রামবাসী নিয়ে সভা করার সাহস হয় কিভাবে সিপিআই(এম)-এর!? ভয়ংকর অগণতান্ত্রিক কাজ তাই না!

এই সভার আগের রাতে ২জন পুলিশ শহীদ কমরেড  বিদ্যুৎ-এর মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, তিনি কাকে সন্দেহ করছেন। অমলাদেবী বলেন, আপনারা পুলিশ এতদিন বাদে এসেছেন? আপনারা কি তদন্ত করছেন যে, এখনও আমার ছেলের খুনের কিনারা হ'লো না? 

আসলে পুলিশের উদ্দেশ্য ছিল, যদি কোনো তৃণমূল নেতা বা তাদের ঘনিষ্ঠ কারোর নাম অমলাদেবী বলেন, সাথে সাথে সেই নাম স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তাহলে টাকার টোপ বা ভয় দেখিয়ে অথবা অত্যাচার চালিয়ে সাক্ষ্যদান থেকে বিরত করা হবে বিদ্যুৎ-এর  বেঁচে থাকা ভাই, বিধবা মা' অথবা সাক্ষ্যদানে আগ্রহী গ্রামবাসীদের। 

এসব বুঝতে কারোরই অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যদি না টিঁকিটা কালিঘাটে বাঁধা থাকে।

পুলিশের কুকুরও গন্ধ শুঁকে খুনীদের শনাক্ত করে দিতে পারে দ্রুত, আর ৩৭ দিনের মাথায়ও পুলিশ বিদ্যুৎ খুনের কিনারা করতে পারে না? তাহলে এত অর্থ ব্যয় করে পুলিশ রাখার অর্থ কি? এর বদলে কুকুর রাখলেও তো কিছু কাজ হ'তে পারতো, আর মানুষের ট্যাক্সের টাকাও কম খরচ হ'তো - এই সভায় এই প্রশ্ন তোলা খুবই অশ্লীল? 

বিদ্যুৎ খুনের খবর দেখানো হয় না, অথচ কালো টাকা সাদা করার জন্য তৈরি করা ফুটবল ক্লাবের খবর ঘটা করে দেখানো হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর লুচির তাপমাত্রা কত ছিল, সেটাও খবর হয়। 

পুলিশের কুকুর খুনের কিনারা করতে পারে, কিন্তু পুলিশ করে না বা করতে পারে না - এই প্রশ্ন তুলে কি ভয়ানক অশালীনতার পরিচয় দিয়েছেন সিপিআই(এম) নেতৃত্ব!! তাহলে কী বলা উচিত ছিল? 

আনিস খান খুনের কিনারা ১৫ দিনে হবে - মূখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা ঘটা করে ঘন্টাখানেক, ৯,১৮,২৪ সর্বত্র প্রচার করা হ'লো। কিন্তু আজ ৭৮ দিনের মাথাতেও কিছুই হ'লো না। মীনাক্ষী সহ ১৬ জন আধমাস জেল খেটে আসলেন, বাম ছাত্র-যুব- মহিলারা কয়েকবার গ্রেপ্তার হ'লো, আর খুনীরা দিব্যি ফুরফুরে হাওয়ায় ঘুরছে।  এর প্রতিবাদে সান্ধ্যকালীন কোনও আলোচনার আসর বসে না কেন সংবাদমাধ্যমে? কি উচ্চ মানের শালীনতাবোধ এটা - তাই না!!

খুনীর গ্রেপ্তার চেয়ে বামকর্মীরা জেলে যায়, আর খুনীদের আড়াল করা সরকার ফূর্তিতে কেন থাকে? তাহলে পুলিশ-পুলিশ মন্ত্রী এদের কাজ কি? নীরব সংবাদমাধ্যমই বা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ কেন? খুব অশালীন প্রশ্ন হ'য়ে গেল, তাই না!?

কোথায় পুলিশকে খুনের কাজে লাগানো হচ্ছে বা খুনীদের আড়াল করতে কাজে লাগানো হচ্ছে - সংবাদমাধ্যম জানে না? 

একবারও তো বলা হচ্ছে না আনিস হত্যার ৭৮ দিন পরে বা বিদ্যুৎ হত্যার ৩৮ দিন পরেও কেন খুনের কিনারা হয় না?

এটা বুঝতে কারোর অসুবিধা হওয়ার তো কথা নয়, যদি না বিজ্ঞাপন বা খামের লেনদেন থাকে। 

আর কালিঘাটে দাসখত দেওয়া থাকলে পুলিশ না পুলিশের কুকুর, কার মান- সম্মান বেশি সেই নিয়ে অযথা বিতর্ক তুলে, খুনীদের আড়াল করার চেষ্টা করাটা বাধ্যতামূলক হয় - এটাও বুঝতে কারোরই বিশেষ অসুবিধা হয় না।

তবে খুনীদের আড়াল করতে গিয়ে অযথা যারা কু-তর্ক জুড়লেন তাঁদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। কারণ ক্ষেতমজুর বিদ্যুৎ মন্ডলের হত্যার খবর চেপে রেখেছিল যেসব সংবাদমাধ্যম এতদিন, আজ অযথা কু-তর্ক তুলে তাঁরা অন্তত এই নৃশংস খুনের ঘটনাকে প্রকাশ্যে এনে ফেললেন নিজেদের অজান্তেই। আন্তরিক ধন্যবাদ আপনাদের।

বিদ্যুৎ মন্ডলদের লড়াই খবর হয় না, কারণ ওরা ১০ আঙুল  ভরা হীরেখচিত আংটি ডুবিয়ে ফুলকো লুচি খাবার ক্ষমতা ধরে না। বিদ্যুৎদের বাড়ির উঠোনে রোলস রয়েস- মার্সিডিস-পোর্শে গাড়ি থরে থরে সাজানো থাকে না। ওরা কোটি কোটি টাকা ব্যাঙ্কের থেকে নেওয়া ঋণ ফেরত না দিয়েও নানা মন্ত্রী/আমলার সাথে প্রাতরাশ বা নৈশভোজ  করার সুযোগ পায় না। সর্বোপরি খবর ছাপা বা চাপার জন্য কর্পোরেট মিডিয়াকে বিজ্ঞাপন বা খাম দেওয়ার ক্ষমতা ধরে না।

তবে এই পৃথিবীতে সবাই শুধু পকেট বা পাকস্থলীর জন্যই বাঁচে না, মেরুদণ্ডটার গুরুত্ব বিদ্যুৎ -দের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তাইতো এক বিদ্যুৎ শহীদ হ'লে হাজার বিদ্যুৎ-এর ঝলক আকাশের অন্ধকারকে ফালাফালা করে দেয়।

…..............

৮ মে, ২০২২

লেখক সিপিআই (এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও পার্টির দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলা কমিটির সম্পাদক

20180513

গর্বের পঞ্চায়েতঃ গড়েছে বামফ্রন্ট, ধ্বংস করছে তৃণমূল-২


ভূমিসংস্কারের উলটো পথে তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গে যথাসম্ভব ভূমিসংস্কারের কর্মসূচী দেশে-বিদেশে উচ্চপ্রশংসিত হলেও ক্ষমতায় এসেই উলটো পথে চলতে শুরু করে মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। ২০১১সালের ১৮ই অক্টোবর (মেমো নম্বর-আই আর সি/৬২৪/১১) একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে তৃণমূল সরকার বলে, ‘‘ভূমিহীনদের মধ্যে মূলত কৃষিজমি বন্টনের যে ধারায় আগের ভূমিসংস্কার চলেছে, তা থেকে সরে আসতে হবে এবার।’’ আরো আগ্রাসী ভাষায় রাজ্য সরকারের জমি নীতি সুপারিশকারী কমিটি বলেছে, ‘‘জমির অবৈধ দখলদারিকে কখনো ভূমিসংস্কার বলা যায় না। বরং এটিকে জমি-ডাকাতি বলা যায়। এই জমি-ডাকাতি বন্ধ করতে সরকার যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’’
এর পরেই রাজ্যের গ্রামে গ্রামে সক্রিয় হয়ে ওঠে পূর্বতন জমিদার, জোতদার এবং লুকোনো জমির মালিকরা। শুরু হয়ে যায় বর্গাদার, পাট্টাদার, এমনকি রায়তি জমির মালিক গরিব কৃষকদের উচ্ছেদের ঘৃণ্য অভিযান। তবে গরিব কৃষকের প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটছে লক্ষ্যনীয়ভাবে।

পঞ্চায়েত ঠুঁটো জগন্নাথপশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের গ্রামবাসীকে যুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক ও বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কাঠামোর যে ব্যবস্থা সারা দেশকে পথ দেখিয়েছিলো, ক্ষমতায় এসেই তা ভাঙতে শুরু করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতায় এসেই তিনি কলকাতার টাউন হলে রাজ্যের ৩৪১টি ব্লকের বিডিও, ৬৫জন এসডিও-র সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সভায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘এবার থেকে প্রতিটি জেলায় তিনটি করে কমিটি হবে। ব্লক পর্যায়ে কমিটির মাথা হবেন বিডিও-রা। মহকুমা স্তরে মহকুমাশাসক বা এসডিও-রা। জেলা পর্যায়ে কমিটির কর্তা হবেন জেলাশাসকরা। প্রতিটি পর্যায়ের কমিটিতেই সদস্য হবেন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অফিসাররা। এই কমিটিগুলিই গ্রামোন্নয়নের কাজের তদারকি ও নজরদারি করবে।’
এর ফলে গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। উন্নয়নের কাজে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা রূপায়নের আসল ক্ষমতা চলে গেলো আমলাদের হাতে। জনগণের সঙ্গে যাদের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। ফলে ক্ষমতা হারালেন গ্রামের সাধারণ মানুষও। অথচ এতদিন গ্রাম সংসদের মাধ্যমে তাঁরা উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও রূপায়ণের কাজে রীতিমতো বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতেন।

কৃষক আত্মহত্যার যে ঘটনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত ছিলো না, বাংলায় তা এখন অহরহ ঘটছে। গত ছ’বছরে রাজ্যে দেড়শোর বেশি কৃষক ফসলের দাম না পেয়ে, ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে নিয়ে সরকার কৃষকদের এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়নি। তারা বরং খেলা মেলা উৎসবে এবং ক্লাবগুলোকে টাকা বিলোনোয় বেশি উৎসাহ দেখিয়েছে। কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। ধান, আলু, পাট থেকে পান, সরষে, ডালশস্য— রাজ্যের প্রতিটি ফসলের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। সরকার এখন ফড়েদের থেকে ধান কিনছে, পঞ্চায়েত ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে ধান কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন খরচ বাড়ছে অথচ ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকরা বিপদে পড়ছেন। সারের দোকানের ঋণ, প্রতিবেশীর কাছে ঋণ, মহাজনের ঋণ নিয়ে চাপের মুখে আত্মহত্যা করছেন অনেকেই। নাবার্ডের ফোকাস পেপার, ২০১৬-১৭তে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজীবী পরিবারগুলি প্রতি মাসে গড়ে ১৯০৮টাকার ঋণ জালে জড়াচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে কৃষিতে বিপর্যয়, কখনো বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি, কখনো অনাবৃষ্টিতে, কখনো পোকার আক্রমণে। কিন্তু বাংলার কৃষকদের সামনে এখন বীমার ক্ষতিপূরণের সুযোগ নেই। শস্যবিমার বিধি ব্যবস্থাকে লাটে তুলে দিয়ে কৃষকদের আরও বেশি করে আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে তৃণমূল সরকার।

ভোটের নামে প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল সরকার। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে যে পঞ্চায়েত ভোট কার্যত উৎসবের পরিবেশে হতো, সেই ভোটই এখন রীতিমতো প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মমতা ব্যানার্জির শাসনে পরপর দু’টি পঞ্চায়েত নির্বাচনই বেপরোয়া সন্ত্রাস, বিরোধী প্রার্থী খুন, ভোট-লুট, আদালতের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি বিশৃঙ্খলার জন্য ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে।
তৃণমূল আমলে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৩-র জুলাইয়ে। রাজ্যে মোট ৪৮,৮০০টি পঞ্চায়েত আসন। নির্বাচনের আগেই, আতঙ্ক সৃষ্টি করে ৫,৩৫৬টি আসন দখল করেছিলো তৃণমূলতারপরেও যেগুলিতে নির্বাচন হয়েছিল, সেগুলিতেও জিততে দেদার ছাপ্পা, ভোট লুঠ, বিরোধীদের মেরে বের করে দেওয়া, বেপরোয়া বুথ দখল চালায় শাসকদল। গণনার সময়েও চলে ব্যাপক জালিয়াতি ও বলপ্রয়োগ। তবুও বামফ্রন্ট জয়ী হয়েছিলো ১৫,৫৯৩টি আসনে। শতাংশের বিচারে ৩২% কেন্দ্রীয় বাহিনী এনে (???) যথাসম্ভব সুষ্ঠু নির্বাচন করাতে গিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ বাধার মুখে পড়েছিলেন তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পান্ডে। প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিলো। আদালতের লড়াইয়ে জিতলেও, ভোটের দিন কিন্তু শাসকের সশস্ত্র দুষ্কৃতী বাহিনীর তান্ডব আটকাতে ব্যর্থ হন তিনি।

বেআইনী দখলদারি-র নির্লজ্জ অভিযানে নজির গড়লো তৃণমূল। তীব্র সন্ত্রাস আর আক্রমণ চালিয়েও ২০১৩সালে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদে তৃণমূল জিততে পারেনি। একইভাবে বহু পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতেও বিরোধীদের জয় হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি! নির্বাচনের পরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে শুরু হয় নতুন খেলা। দল ভাঙিয়ে পঞ্চায়েতের তিন স্তরেই দখলদারি শুরু হয়। যেখানে বামপন্থীরা পঞ্চায়েত গঠন করেছিলো, অঙ্ক কষে সেখানে খুনও করা হয়েছে। সভাপতি হিসাবে কাজ শুরুর আগেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে উত্তর ২৪পরগণার হাসনাবাদ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম গাজিকে। এরপর সেই সমিতি দখলও করে শাসকদলফরাক্কায় খুন হন পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত সদস্য হাসমত শেখ। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলদিয়া পৌরসভায় সন্ত্রাস চালিয়ে, কাউন্সিলারদের অপহরণ করে ১৫মাসের মধ্যেই দখল করে নেয় তৃণমূল।
তৃণমূলের দখলের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদএই জেলায় ২৬টির মধ্যে একমাত্র সাগরদিঘি পঞ্চায়েত সমিতিতে জয়ী হয়েছিলো তৃণমূল। এখন তৃণমূলের দখলে ১৮টি পঞ্চায়েত সমিতি! আর জেলা পরিষদ? মোট ৭০টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জয়ী হয়েছিল মাত্র ১টি আসনে। বাকি সবই ছিল বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের হাতে। এখন নানা কৌশলে মোট ৪৩ জনকে ভাঙিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ চালাচ্ছে তৃণমূল! ভয় দেখিয়ে দল ভাঙিয়ে দখলদারির এই ফরমুলা সারা রাজ্যেই চালু করেছে মমতার দল।

মুখে গামছা-বাঁধা ‘উন্নয়ন’ দেখছে এখন গ্রামাঞ্চল! তৃণমূলের আমলে দ্বিতীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের (২০১৮) সন্ত্রাস অতীতের সব নজির ছাড়ালো। আগেরবার ভোট লুঠ, নির্বাচনের পর সন্ত্রাস চালিয়ে বোর্ড দখলে নজির গড়েছিলো তৃণমূল। এবার একেবারে মনোনয়ন পর্ব থেকেই গ্রামবাংলায় মুখে গামছা-বাঁধা সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। মনোনয়ন পেশের কেন্দ্রগুলি ঘিরে রেখেছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তৈরি পুলিশ-তৃণমূলের যৌথ বাহিনী। প্রার্থীকে খুন, জখম, অপহরণ, সন্ত্রাস চালিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো— সবই হয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের অসহায় চোখের সামনে! বিরোধীদের আবেদনের ভিত্তিতে বারেবারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে হাইকোর্টকে। শাসকের সশস্ত্র গুন্ডাদের মার খেয়ে, রক্ত ঝরিয়ে তবু বিরোধী দলের কিছু প্রার্থী মনোনয়ন পেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনুব্রত মন্ডল নামে মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য দুষ্কৃতী-নেতার কথায়, ‘মমতা ব্যানার্জির উন্নয়ন আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সবই হচ্ছে সেই কারণে।’ গ্রামাঞ্চলের রাস্তায় রাস্তায় প্রকাশ্য দিনের আলোয় গামছায় মুখ ঢাকা এমন ‘উন্নয়ন’ সারা দেশে সত্যিই বেনজির!

দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছে তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলি। সাধারণ মানুষকে হটিয়ে পঞ্চায়েতগুলি দখল করেছে অর্থলোলুপ কিছু তোলাবাজ। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, যে কোন সরকারি প্রকল্পের সুযোগ পেতে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতাশালী নেতাদের এখন ‘কমিশন’, ‘তোলা’ দিতে হয়। পঞ্চায়েতের কাজের আগেই ১০থেকে ১৫শতাংশ টাকা শাসকদলের নেতাদের পকেটে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকাদাররা।                      নীতি-আদর্শহীন তৃণমূল মূলত ধান্দা-নির্ভর একটি দল। তাই পঞ্চায়েতগুলিও এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে টাকা কামানোর ক্ষেত্র। একশ’ দিনের কাজ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা ইত্যাদি প্রকল্পে চলছে দেদার চুরি। বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, আদিবাসী বা তফসিলী মানুষের হকের টাকা ‘পাইয়ে দেওয়ার’ নাম করে কাটমানি খাচ্ছে তৃণমূল নেতারা। মানুষের ভুরিভুরি অভিযোগ জমা পড়লেও কোন প্রতিকার করছে না তৃণমূল সরকার।

গণশক্তি, ১৩ই মে, ২০১৮ 

20180409

গড়ে তোলো মানুষের পঞ্চায়েত


মিনতি ঘোষ

মহাত্মা গান্ধী স্বপ্ন দেখেছিলেন পঞ্চজনারপঞ্চায়েত অর্থাৎ গ্রাম স্বরাজের কথা। সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে হবে নতুন ভারত গড়ার কাজ। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। পরিচালনায় কংগ্রেস দল। বারবার আ‍‌লোচনা হয় দেশ গঠনের, তার উন্নতির জন্য কোন পথে গেলে ভালো হয়। তারপর সংবিধানের নির্দেশাত্মক নীতিতেই স্থান পায় পঞ্চায়েত। আসল সমস্যাতো সেই প্রয়োগের ক্ষেত্রে। জমিদার, জোতদার, উঁচু জাতের (সংখ্যালঘু ধনী ব্যক্তিসহ) প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দখলে সমষ্টি উন্নয়ন অফিস, (বি ডি ও অফিস) পঞ্চায়েত।
অর্থ যেটুকু সরকার থেকে পাওয়া যেত ভাগাভাগি হয়ে যেত তাদের মধ্যেই। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির সামনে একটি কুয়ো অথবা টিউবওয়েল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সামান্য পাকা রাস্তা, দূরদূরান্তে প্রাইমারি অথবা হাই স্কুল। জেলায় বড়জোর একটি দুটি কলেজ। ধনীর কুয়োর/টিউবওয়েলের জলে অধিকার ছিল না সংখ্যালঘু, আদিবাসী, বাউরি, বাগদিসহ তথাকথিত নীচুজাতের। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পুকুর, খালবিল। লেখাপড়ার সুযোগও তাদের ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল অধরা স্বপ্ন। সাইকেলও বড়লোকের বাড়িতে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার চিন্তা গরিব বাড়ির মেয়েদের কমই ছিল। বসন্ত, যক্ষ্মা, কলেরা, ম্যালেরিয়া ছিল নিত্যসহচর।
একদিকে হাতে গোনা সুবিধাভোগী অপর দিকে হাড়-জিরজিরে নিরন্ন মানুষযাদের বান-বন্যা, খরা-শুখা মরশুম অর্থাৎ প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বাঁচতে হতো। স্বাধীনতার আসল স্বাদযখন সাধারণ মানুষ বুঝেছেন তখনই তাঁরা জোট বাঁধতে শুরু করেছেন। তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৭, ১৯৬৯ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র নেতৃত্বে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে। টিকল না দুটি সরকার। ১৯৭১ সালের সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। সারা দেশে জনবিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো। ঠিক আজকের মতো গণতন্ত্রকে হত্যা করা হলো, বাক্‌স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলো। আমাদের রাজ্যে এগারোশো কর্মীকে খুন করা হয়েছে। শহীদের তালিকাতে সিংহভাগই গরিব, দলিত, সংখ্যালঘু মানুষ। সীমাহীন অত্যাচারের শিকার মহিলারা।
১৯৭৭ সালে আবার নির্বাচন। এরাজ্যে সি পি আই (এম) সর্বাধিক ভোট পেয়ে গঠন কর‍‌ল বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রে জনতা সরকার।
পরিবর্তনের ভরকেন্দ্রে কিন্তু অগণিত গরিব কৃষক, মধ্যবিত্ত, মহিলা, বেকার যুবক। তাঁরা কংগ্রেস সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। সেই ভূমিহীন কৃষক যাঁরা যুক্তফ্রন্টের আমলে স্লোগান দিয়েছিলেন—‘লাঙল যার জমি তারনেতৃত্বে সারা ভারত কৃষকসভা। কৃষক রমণী ছিলেন তাঁদের সাথি।
ওপরের কথাগুলো হয়তো ‘‘ধান ভানতে শিবের গীত’’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষইতো বামফ্রন্ট সরকার গড়ল। তাঁদের দীর্ঘকালের বিশ্বাস লালঝান্ডা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। করেও ছিল। সরকার গঠনের পরই সিদ্ধান্ত করে ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে বাস্তবে কার্যকর করেছে। এতদিন গরিব মানুষের মাথার উপর কোনও ছাদ ছিল না। এবার তারা সেই নির্ভরতার জায়গাটা খুঁজে পেল। বামফ্রন্ট যার নেতৃত্বে সি পি আই (এম) তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। নির্বাচনী প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিতে চলার ফলে। মূল মিত্রকে চিনে নিতে তাই কোনও পক্ষেরই ভুল হয়নি।
ভূমিসংস্কারের সাফল্য : ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার প্রায় ১৪ লক্ষ ৪ হাজার ৯১ একরের বেশি জমিকে খাস করেছে। কৃষিযোগ্য জমি ১৩ লক্ষ ১৪ হাজার একরের বেশি। ভূমিসংস্কারের ফলে বিলি হওয়া পাট্টার ৫৫ শতাংশ তফসিলি জাতি ও আদিবাসী মানুষ পেয়েছেন। সংরক্ষিত নন অথচ সংখ্যালঘু মানুষের ৩৬.২৪ শতাংশ মানুষ জমি পেয়েছেন।
এরাজ্যে গড়ে যদিও ২৭ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষ বাস করেন।
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বলছেরাজ্যে ৫৮.৭ শতাংশ থেকে ৭২.৬ শতাংশ তফ‍‌সিলি জাতি প্রধান ব্লক রয়েছে ১২টি। বেশিরভাগই জলপাইগুড়ি, বাকিটা মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। তফসিলি উপজাতি ৪১.৩ শতাংশ থেকে ৫১.৫ শতাংশ প্রধান ৭টি ব্লক। ৩১.০ শতাংশ থেকে ৪১.৩ শতাংশ ৯টি ব্লকে। এমনভাবেই সারা রাজ্যে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় তাঁরা সীমাবদ্ধ নেই। সংখ্যালঘু মানুষের বাস সবচেয়ে বেশি মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। প্রায় ১০ কোটি মানুষের বাস পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী, সংস্কৃতিগত বৈচিত্রের মধ্যেও তাঁদের অবস্থান। একারণেই উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের নিরিখে কোনও জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে চিহ্নিত করা যায় না।
প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ১২ লক্ষের বেশি মানুষ বর্গাদার হিসাবে নথিভুক্ত হলো। বাস্তুজমি পেয়েছেন ২.৭৭ লক্ষ মানুষ।
প্রথম বামফ্রন্ট আমলে গ্রামবাংলার জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলি রূপায়িত হয়েছিল তার জন্য ছিল : ১৯৭৭২৯শে সেপ্টেম্বর : বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গ ভূমিকা (সংশোধনী) বিল গৃহীত। ১৯৭৭৭ই নভেম্বর : ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের দিনই ঘোষণা করা হলো—‘‘চাষ করবেন যিনি, ফসল নেবেন তিনি’’১৯৭৭১৮ই নভেম্বর : ‘‘বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তকরণের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে গাইড লাইন প্রকাশ করে বামফ্রন্ট সরকার। যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্ত আমূল পালটে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের চেহারা। মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে মহিলাদেরএকক পাট্টা পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৮৩৭ জন মহিলা। যৌথ পাট্টা৬ লক্ষ ৩ হাজার ৯৮৭টি পরিবার।
এটা কোনও মামুলি খতিয়ান নয়। সরকার গঠনের পর একটি সিদ্ধান্তরূপী মজবুত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দিশাকে সামনে রেখে এগিয়ে চলার শপথের নামই বামফ্রন্ট সরকার। যা আজ তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ভুলিয়ে দিতে চাইছে, যে তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল কংগ্রেসের মধ্যে থাকা হিংস্র একটি অংশকে নিয়ে। দেশি, বিদেশি বামবিরোধী শক্তি, কর্পোরেটদের একটি অংশ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক শক্তির একটি বড় অংশ ৩৪ বছরের বাম-সরকারকে হটিয়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদসহ আদর্শহীন একটি দলকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছে। গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মাঝেই ১৯৭৮ সালে বাস্তুঘুঘুর বাসা ভেঙে দিয়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন হলো। জিতলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ, অসংরক্ষিত পদে দুশোর মতো মহিলা।
একদিকে গ্রামবাংলায় এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে প্রবল ভূমিকম্পে সব ওলট পালট হয়ে গেল। ওধারেরমানুষের হাতের ক্ষমতা এধারেরঅগণিত মানুষের হাতে এসে গেল। এর মাঝেই ১৯৭৮-এর বিধ্বংসী বন্যার মুখোমুখি সরকার। পঞ্চায়েত সরকার ও মানুষের মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ করল; ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ৮১৩ জনের মৃত্যুর হাহাকারের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
পঞ্চায়েত হলো ভরসার জায়গা। তখনতো মুখ্যমন্ত্রী সাঙ্গোপাঙ্গ, মন্ত্রী, আমলাদের নিয়ে জেলা চষে বেড়াতেন না। একহাতে সব দপ্তরও সামলাতেন না। নীতি নির্ধারণ করবে মন্ত্রীসভা। তদারকি করবেন প্রশাসক।
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসুর নির্দেশ ছিলগ্রামের একজন নেংটিপরা মানুষকে আপনি বলা, থানা বা সরকারি অফিসে গেলে চেয়ারে বসতে দেওয়া। এই শ্রেণিচেতনার সাথে আজকের ফারাক সহজেই অনুমেয়।
পঞ্চায়েতের বিরাট সাফল্য তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত গ্রামবাংলার চেহারা বদলে দিয়েছে। সমবায়, ল্যাম্পস, সেচ, বিদ্যুৎ, পাশাপাশি বীজ, মিনিকিট বিতরণ, খেতে না পাওয়া মানুষের জন্য কাজের বদলে খাদ্যকর্মসূচি সহায়তা দিয়েছে গরিব মানুষকে। আজকের মতো টাকা লুট হয়নি। বখরা নিয়ে প্রকাশ্য গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামনে আসেনি। কারণ ৩৪ বছরে গ্রামের মানুষের ধারাবাহিক অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারই ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছে। দরিদ্রতম ঘরের সন্তানেরা স্কুলে গিয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্র থেকে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আজও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ আছে। ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে উন্নয়নের কোনও চোখ ধাঁধানো প্রচার ছিল না। জনগণের সরকার একটি অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অস্বাভাবিক যা তা হলো পুরানো সমস্ত সাফল্যকে নষ্ট করে অথবা নিজের বলে আত্মসাৎ করা। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক দপ্তরের অর্থ অন্য দপ্তরে খরচ করে লাগামহীন উৎসব, মেলা, খেলা, ক্লাবের মধ্যদিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করা। মস্তানবাহিনী তৈরি করে গ্রামের নব্যধনী, তোলাবাজ, সিন্ডিকেটরাজ, প্রশাসনের একটি বড় অংশকে যুক্ত করে ভোট লুট করা। নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউ দিয়ে যোগ্য চাকরি প্রার্থীরা কাজ পাচ্ছে না।
বেলাগাম একটি সরকার চলছে। ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে বি জে পি-র নেতৃত্বে চলা কেন্দ্রীয় সরকার সংগত করে চলেছে। দুটি দলই আদ্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। ধর্মীয় মেরুকরণের পৃষ্ঠপোষক। দেশের পক্ষে ভয়ংকর বিপদ বি জে পি এবং তৃণমূল।
এরাজ্যে শিল্প, কলকারখানা বন্ধ অথবা বন্ধের মুখে। নতুন কোনও শিল্প স্থাপন হয়নি। কৃষিক্ষেত্রে ভয়ংকর সংকট। নজিরবিহীনভাবে এরাজ্যে কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। সারা দেশের মধ্যে নারী নির্যাতনে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। দুকোটি আর দশলক্ষ বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি কেন্দ্র, রাজ্য সরকারের ফাঁকা আওয়াজ। ভোটের আগে ধর্মের জারক রসে এরাজ্যের মানুষকে জারিত করছে। যার সবচেয়ে বড় শিকার মহিলারা। বামফ্রন্ট সরকার মর্যাদা দিয়েছিল নারী, আদিবাসী, তফসিলিদের। নারী সুরক্ষার অন্যতম শর্ত সমাজের সব ক্ষেত্রেই সমান মর্যাদা নিয়ে মহিলাদের উপস্থিতি। লোকসভা, বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের দাবিতে প্রগতিশীল মহিলা সংগঠনগুলি আন্দোলন করে আসছে। ৭৩তম সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হয়।
তার বহু পূর্বেই এরাজ্যে মহিলা, তফসিলি, আদিবাসী পেছিয়ে পড়া এই তিন অংশের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়। ধীরে ধীরে পদাধিকারী সংরক্ষণ-এর মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। এই যুগান্তকারী পরিবর্তন কোন মামুলি বিষয় নয়। যার ফলে   পথেঘাটে, অফিসে, স্কুল কলেজে, খেতখামার, ব্যাঙ্ক, আদালত সর্বত্র মহিলাদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অসংখ্য কাজের সুযোগ সংগঠিত, অসংগঠিত ক্ষেত্রে। আই সি ডি এস, আশা, এস এস কে, এম এস কে, মিড ডে মিল থেকে বিড়ি, দড়ি, তাঁত কত যে কাজ সৃষ্টি হয়েছিল। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মধ্যদিয়ে ১ কোটি নিরক্ষর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলা উৎপাদনের কাজে যুক্ত হয়েছেন। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাঁচার প্রেরণা বামফ্রন্ট সরকার দিয়েছিল।
আজ শুধু উন্নয়নের ঢক্কানিনাদে সাধারণ মানুষ বিমূঢ়। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকার অর্থনীতির যে দৃঢ় বনিয়াদ তৈরি করে গিয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে সৌন্দর্যায়ন, উপরিকাঠামোর রং বদলমাত্র। ভেতরে পোড়া ছাই। তাই গণতন্ত্র হত্যা, বাক্‌স্বাধীনতা স্তব্ধ করে দেওয়া, হামলা, মামলা, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে জেলে পাঠানো, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দখলের রাজত্ব চলছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির আক্রমণের সাথে মানুষের মনোজগৎকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ তলানিতে। মিডিয়ার অবিরাম প্রচার সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, একটা সাময়িক উচ্ছ্বাসের মধ্যে রেখে দেওয়া আজকের কর্পোরেট মিডিয়ার মূল লক্ষ্য। চা বাগিচায় মৃত্যু মিছিল, ডিজিটাল রেশন কার্ডের নামে প্রকৃত প্রাপকের নাম বাতিল। বিধবাভাতা, বার্ধক্যভাতা পাচ্ছেন না গরিব মানুষ। ১০০ দিনের কাজ ৩২ দিনে নেমেছে। মজুরি অনিয়মিত। ইন্দিরা আবাস যোজনায় ব্যাপক দুর্নীতি। আমাদের করের টাকায় যে প্রকল্প আসছে তার নাম বদলে নিজের বলে চালানোর মতো অনৈতিক কাজ এ সরকার করে চলেছে। সর্বত্র একটি চকচকে মুখের ছবি বদলে যাচ্ছে অবিরত। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে বাধ্য করছে মকর সংক্রান্তির দিন লোকশিল্পীদের মঞ্চে এনে (সবাই প্রকৃত শিল্পী নন) সরকারের বন্দনা গাইতে। নগদ মজুরি, ব্যাঙ্কে ১০০০০০ টাকা রাখা।
সর্বত্র ব্যক্তিগত উপভোক্তা তৈরি করে চলেছে এই সরকার।
এই অবস্থা বেশিদিন চলে না। স্বৈরতন্ত্র একদিন পরাস্ত হবে‍‌ই। একনায়কতন্ত্রীদের একদিন মানুষ ছুঁড়ে ফেলে দেবেনই। কন্যাশ্রীর ২৫ হাজার টাকা, ‘সবুজসাথীরসা‍‌ইকেল, ‘খাদ্যসাথীর রেশনে পচা চাল সরবরাহ, রূপশ্রীর মধ্যদিয়ে কন্যার রূপ আর তার শেষ পরিণতি বিবাহনামক পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলার চক্রান্ত, বিউটি পার্লারের আরও বেশি অর্থ অনুমোদন, রাস্তার ধারের মদের দোকান খোলার অনুমোদন, হাজার হাজার শিলান্যাস মানুষের মস্তিষ্ককে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ঠিক-বেঠিক হারিয়ে যেতে বসেছে। ভোগবাদী পণ্য সংস্কৃতি আজ গ্রাস করছে সমগ্র সমাজকে। যে কোনও মূল্যে নিজের ভালো চাই।
আমাদের লড়াই ‘‘আমরার’’ লড়াই। আমাদের লড়াই রাজ্য বাঁচানো, দেশ বাঁচানো, শ্রমজীবী মানুষের চুরি হয়ে যাওয়া অধিকার ফেরত পাবার লড়াই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে আমাদের মূল স্লোগান ‘‘বি জে পি হটাও, দেশ বাঁচাও, তৃণমূল হটাও রাজ্য বাঁচাও’’-এর সাথে দুটি শক্তিই যে একে অপরকে সাথি করে এরাজ্যে মানুষকে বোকা বানাতে চাইছেতা বোঝানো।
আমরাই পেরেছিলামআমরা পারবএই প্রত্যয় নিয়ে আমাদের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
তথ্যসূত্র: ফিরে দেখাবুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
লুঠের পঞ্চায়েতঅধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই

গণশক্তি, ৪ঠা এপ্রিল ২০১৮

20180210

নরেন্দ্র মোদী সরকারের নীতি বদলের দাবিতে ২০শে ফেব্রুয়ারি আইন অমান্য ও জেলভরো

অনাদি সাহু

মোদী সরকারের জনবিরোধী দেশবিরোধী নীতির প্রতিবাদে শ্রমজীবী মানুষের লাগাতার লড়াই চলছে। আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলাতে আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি নিয়েছে শ্রমিকশ্রেণি শিল্পভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা করেছেন লেখক।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী দেশবিরোধী নীতির প্রতিবাদে, গত ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের দেশব্যাপী সফল ধর্মঘটের পর, আরও বড় লড়াইয়ের পথে দেশের শ্রমিকশ্রেণি শিল্পভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে দেশব্যাপী আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

আমাদের রাজ্যে, আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবাংলার সমস্ত‍‌ জেলাতে আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি, রাজ্যের সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যাঙ্ক, বিমা, বি এস এন এল-সহ শিল্পভিত্তিক ফেডারেশনগুলি এবং ১২ই জুলাই কমিটি এই কর্মসূচিতে শামিল হবেন। কলকাতায় রানি রাসমণি রোডে ঐদিন দুপুরে জমায়েত আইন অমান্য কর্মসূচি পালিত হবে। রাজ্যে জোরকদমে তার প্রস্তুতি চলছে।

এই কর্মসূচির ১২ দফা দাবিগুলি হলো :
‍‌ মূল্যবৃদ্ধি রোধ, সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের ফাটকা ব্যবসা বন্ধ।বেকার সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।শ্রমআইন সঠিকভাবে লাগু করতে হবে শ্রমআইন ভঙ্গকারী মালিকদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।সমস্ত শ্রমিকদের জন্য সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০০ টাকা (মাসিক) দিতে হবে এবং তা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সূচকের সাথে যুক্ত করতে হবে।প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের জন্য মাসিক পেনশন ন্যূনতম ,০০০ টাকা করতে হবে।স্থায়ী কাজে ঠিকাশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং সমকাজে সমবেতন দিতে হবে।বোনাস এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে মজুরি/বেতনের পরিমাণের উপর সর্বোচ্চ সীমা যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা তুলে দিতে হবে, গ্র্যাচুইটি আইন সংশোধন করে গ্র্যাচুইটির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে।শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমআইন সংশোধন করা চলবে না।রেল, প্রতিরক্ষা এবং বিমা ক্ষেত্রে ‍‌(FDI) বিদেশি পুঁজি‍‌ বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে।আবেদনের ৪৫ দিনের মধ্যে ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন দিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে আই এল কনভেনশনের ৮৭ ৯৮ নম্বর ধারাকে অনুমোদন দিতে হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের শেয়ার বিক্রি করা চলবে না। রাজ্যে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সংস্থা, কয়লাখনি, বেঙ্গল কেমিক্যাল, অ্যালয় স্টিল, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ, বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সাঁতরাগাছি প্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলি বেসরকারিকরণ করা চলবে না।

গত সাড়ে তিন বছর পূর্বে নরেন্দ্র মোদী  সবকা সাথ সবকা বিকাশএবং আচ্ছে দিনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের স্বার্থে, একের পর এক বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতার পথ গ্রহণ করেছে। দেশ জাতীয় স্বার্থবিরোধী ঘৃণ্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারে পরিণত হওয়ার জঘন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। ফলে দেশের আর্থিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষকের ফসলের লাভজনক দাম না দেওয়া, নোটবন্দি, জি এস টি, এফ আর ডি আই বিলের মতো জাতীয় স্বার্থবিরোধী‍‌ সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের জীবনে চরম অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার বৃহৎ শিল্পপতিদের ঋণখেলাপিদের আড়াল করতে চাইছে। প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা বকেয়া ঋণের ৮৫ শতাংশই বৃহৎ শিল্পপতিগোষ্ঠীর। নরেন্দ্র মোদী সরকার গত বছরে লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকার এই ঋণখেলাপিদের টাকা মকুব করেছে। শিল্পপতি গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করতে এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করতে চাইছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, বিমা, বি এস এন এল, প্রতিরক্ষা, রেল, বিমানবন্দর, য়লাখনির বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হবে। রাজ্যে বেঙ্গল কেমিক্যাল, অ্যালয় স্টিল, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ, বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সাঁতরাগাছি প্রেসের মতো সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত পুনরায় হাজার হাজার মানুষের কর্মহীনতার বিপদ দেখা দিয়েছে এবং রাজ্যকে শিল্পশূন্য করার পরিস্থিতি‍‌ তৈরি করছে।

মূল্যবৃদ্ধি রোধ : মূল্যবৃদ্ধি রোধের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন না করে, পেট্রোপণ্যের উপর উচ্চহারে সেস বসিয়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী খাদ্যপণ্য, তেল, চাল, ডাল, শাকসবজি, সমস্ত পণ্য-সামগ্রীর দাম গত সাড়ে তিন বছরে বহুগুণ বাড়তে ইন্ধন জুগিয়েছে। অথচ চাষিরা ফসলের দাম পাননি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সমস্ত ক্ষেত্রে লাগামছাড়াভাবে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটেছে।

বেকার সমস্যা প্রসঙ্গে : বছরে কোটি বেকারের কাজ, যে নির্বাচনী ভাঁওতা ছিল তা ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদী বুঝিয়ে দিয়েছেন। পর পর ৪টি বাজেটের পর ২০১৭-১৮ সালের বাজেটও হয়ে গেল। কিন্তু সরকার উদাসীন। আমাদের দেশের প্রতি জন মানুষের মধ্যে জন ৩৫ বছরের নিচে, তাদের জন্য প্রতি মাসে ১০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান প্রয়োজন। পর পর ৫টি বাজেট হয়ে গেছে, কিন্তু বেকার যুবকরা সেই অন্ধকারে থেকে গেল। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৮টি শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল .৩১ লক্ষ, ২০১৫ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল .৫৫ লক্ষ মাত্র, আর ২০১৬ সালের শেষে ডিমনিটাইজেশনের ধাক্কায়, সারা দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে কর্মহীন হয়েছিলেন। জানুয়ারি, ২০১৬ থেকে এপ্রিল, ২০১৭ পর্যন্ত দেশব্যাপী ১৫ লক্ষ মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছিলেন নোটবন্দির কারণে (Centre for monitoring Indian Economy).

রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বেসরকারিকরণ : নয়া উদারনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বেসরকারিকরণ, ১৯৯১ সাল থেকেই ইউ পি সরকারের সময় তা ছিল কিছুটা ধীরে ধীরে। অতীতে পূর্বতন অটল‍‌বিহারী বাজপেয়ীর বি জে পি সরকার এই নামেই একটা দপ্তর খুলে বসেছিল, আর বর্তমান বি জে পি সরকার ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে পরিকল্পনা পর্ষদ তু‍‌‍‌লে দিয়ে ‍‌এন আই টি আই আয়োগ ‍‌(National Institution for Transforming India) তৈরি করেছে। এর কাজ হচ্ছে, দেশের জনগণের যে সম্পত্তি যাকে আমরা বলি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র, সেগুলিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দ্রুত হাত বদ‍‌লের ব্যবস্থা করাপ্রতিরক্ষা, ইস্পাত, রেল, বিদ্যুৎ, ব্যাঙ্ক, বিমা, ওষুধ, বিমানসংস্থা, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, ভারী ইঞ্জিনিয়ােরিং শিল্প, নির্মাণ শিল্প, কয়লাখনি, পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্র ইত্যাদির আগেই অনেকগুলি বেসরকারিকরণ শেয়ার বিক্রি চলছে। নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে তাই এই দেশবিরোধী কাজকে আড়াল করতে এখন জাতীয়তাবাদে স্বঘোষিত দেশপ্রেমিক সাজতে হচ্ছে।



১৮,০০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি, সমকাজে সমবেতন, অস্থায়ী ঠিকাশ্রমিকদের স্থায়ীকরণ, স্কিম-ওয়ার্কার্সদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই:
আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং উদার অর্থনীতির আক্রমণের মধ্যে, শ্রমিকদের প্রচলিত সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করার মালিকশ্রেণি এবং কেন্দ্রীয় রাজ্য সরকারগুলির চক্রান্তে লক্ষ লক্ষ অস্থায়ী ঠিকাশ্রমিকদের অবস্থাও করুণ, এদের না আছে ন্যূনতম মজুরি, না আছে সামাজিক সুরক্ষা। প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও এরা পরিবারের সকলের মুখে সামান্য দুমুঠো ভাত, ডাল, সবজি তুলে দিতে পারছেন না। স্কিম ওয়ার্কার্সদের অবস্থা আরও কঠিন।

তাই ২০১৬ সাল থেকে দেশের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি এদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১৮,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে, তার সাথে ন্যূনতম বেতনকে ভোগ্যপণ্যের মূল্যসূচকের সাথে যুক্ত করারও দাবি করছে।

সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা : উদার অর্থনীতির আক্রমণের পরিণতিতে দেশের  সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমছে। বর্তমানে দেশের সংগঠিত ক্ষেত্রের এক ক্ষুদ্র অংশের শ্রমজীবী মানুষের জন্য কিছু সামাজিক সুরক্ষা চালু আছে পি এফ, এস আই, গ্র্যাচুয়িটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, পেনশন ইত্যাদি। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের শ্রমজীবী মানুষ অবশ্য সেই সুযোগ পান না। অপরদিকে দেশের ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কার্যত কোনও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, অথচ দেশের জি ডি পি- ৬০ শতাংশ হলো এঁদের অবদান। সেই তাঁরাই আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। পশ্চিমবাংলা, কেরালা, ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অবশ্য কিছু কিছু অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য প্রকল্প আছে। নির্মাণ, বিড়ি, খনি, সিমেন্ট শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের জন্য আইনগতভাবে কিছু ব্যবস্থা থাকলেও এই শিল্পগুলির সাথে যুক্ত অধিকাংশ শ্রমিকরা প্রাপ্য সুযোগগুলি পান না।

দেশি-বিদেশি বৃহৎ কর্পোরেটগুলিকে এবং পুঁজিপতিদের খুশি করতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ ব্যাপক ছাঁটাই করা হয়েছে। গরিবদের জন্য চালু বিভিন্ন স্কিমগুলিকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলন তাই আরও তীব্রতর করতে হবে।

শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমআইন সংশোধনের বিরুদ্ধে : কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক শ্রমআইন সংশোধন করে চলেছে, দেশের মালিকদের স্বার্থে ৪৪টি শ্রমআইন সংশোধন করে ৪টি লেবার কোড তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়ে‍‌‍‌ছে, পার্লামেন্টে একের পর এক  বিল পেশ করা হচ্ছে, ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র-শিল্প সংস্থাআইনসংশোধন করে বলা হয়েছে ৪০জন পর্যন্ত শ্রমিক নিযুক্ত আছে এমন সংস্থাগুলি সবই ছোট সংস্থা হিসাবে গণ্য হবে, এবং ফ্যাক্টরি অ্যাক্টের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই আইনের ফলে ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট, বোনাস অ্যাক্ট, মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট, প্ল্যানটেশন লেবার অ্যাক্টসহ ১৬টি প্রধান প্রধান শ্রমআইনের সুযোগ সুবিধা থেকে কারখানা শ্রমিকরা অর্থাৎ দেশের সংগঠিত ক্ষেত্রের ৮০ শতাংশ শ্রমিককে শ্রমআইনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চক্রান্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই দেশের মালিকদের সন্তুষ্ট করতে অ্যাপ্রেন্টিস অ্যাক্টের সংশোধন করা হয়েছে।

শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, বি জে পি পরিচালিত সমস্ত রাজ্য সরকারগুলিও একের পর এক শ্রমআইন সংশোধন করে মালিকদের স্বার্থ পুষ্ট করে চলেছে, শ্রমিকবিরোধী এবং মালিকদের স্বার্থ পুষ্ট করতে এমন সরকার স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণি প্রত্যক্ষ করেনি। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিথ্যা প্রচার চলছে। শিল্পে বিনিয়োগের স্বার্থে শ্রমআইন সংশোধনের নাম করে বি জে পি শ্রমিকশ্রেণির অর্জিত মৌলিক অধিকার লুণ্ঠনের চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি হ্রাস, কাজের ঘণ্টা বৃদ্ধি, হায়ার অ্যান্ড ফায়ার নীতিতে ছাঁটাই, স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগকে মদত দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে, সমকাজে সমবেতন না দেওয়ার মতো অপরাধ কেন্দ্রীয় সরকার করছে। শিল্পক্ষেত্রে একটা মধ্যযুগী বর্বর ব্যবস্থা চালু করে সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে দাসশ্রমি‍‌কে পরিণত করতে চাইছে। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির স্বার্থে, বি জে পি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ এই ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এদের অন্তরে হিন্দুত্ববাদ মনুবাদের মতো মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন আর মুখে Digital India, Skill India Make in India, Start up India, ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ ‘আচ্ছে দিনের’, মুখোশও।

কেন্দ্রীয় বাজেট প্রসঙ্গে : গত ১লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ নরেন্দ্র মোদী সরকারের পঞ্চম বাজেট পেশ করা হয়েছে। এই বাজেটে অনেক গোলাপি প্রতিশ্রুতি থাকলেও, শ্রমিকশ্রেণিকে উপেক্ষা করা হয়েছে পেট্রোল-ডিজেলের উপর সেসের হার কমানো, মূল্যবৃদ্ধি রোধ, কালো টাকা উদ্ধার, লাভজনক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারিকরণ বন্ধ, স্কিম ওয়ার্কার্সদের কাজের স্থায়ীকরণ, ন্যূনতম মজুরি প্রদান, কাজের নিরাপত্তা, শ্রমআইন সংশোধন বন্ধ করা শ্রমিকশ্রেণি জনগণের সমস্ত দাবিই উপেক্ষিত থেকে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর গ্রাম সড়ক যোজনাতেও কো‍‍‌নও অর্থ বরাদ্দ হয়নি (,০০০ কোটি টাকা) প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনায় গরিব মানুষের জন্য কোনও বরাদ্দ বাড়েনি, উলটে কমেছে কেবলমাত্র মিড ডে মিলে ৫০০ কোটি টাকা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসংস্থান প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ,৮০১ কোটি টাকা। কৃষকদের সমস্যা সমাধানের প্রশ্নেও প্রতিশ্রুতি ছাড়া সদর্থক কোনও পদক্ষেপ নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের দাবি, শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০০ টাকা, সকলের জন্য পি এফ, পেনশন, মেডিক্যাল বেনিফিটসহ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা, সমকাজে সমবেতন প্রদান, কন্ট্রাক্ট লেবারদের স্থায়ীকরণ, তাদের আইনগত সুযোগ-সুবিধা প্রদান, লক্ষ লক্ষ স্কিম ওয়ার্কার্সদের ভাতা বৃদ্ধি, তাদের কাজের স্থায়ীকরণ ইত্যাদি সমস্ত বিষয়গুলিকে  কেন্দ্রীয় সরকার উপেক্ষা করেছে। একটা  অমানবিক মনোভাব নিয়ে এই সরকার চলছে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এই লড়াইকে নীতি পরিবর্তনের লড়াইতে পরিণত করতে হবে। গত ৮ই আগস্ট, ২০১৭ ‍‌দিল্লিতে অনুষ্ঠিত যৌথ জাতীয় কনভেনশন, -১১ই নভেম্বর, ২০১৭ দিল্লির সংসদ ভবনের সামনে পার্লামেন্ট স্ট্রিটে, ১২ দফা দাবিতে ৩দিন ব্যাপী ঐতিহাসিক  ধরনার পর সারা দেশের সাথে আমাদের রাজ্যে আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবাংলায় প্রতিটি জেলায় আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচিকে সফল করে নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে।


আগামী দিনে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতিতে শ্রমিকশ্রেণি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।