Showing posts with label মোদী সরকার. Show all posts
Showing posts with label মোদী সরকার. Show all posts

20220711

ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো ...মমতা ব্যানার্জির ঘৃণ্য রাজনীতির পথেই চলছে মোদী সরকার

কাজ শুরু বামফ্রন্টের সময়েই, মমতার বাধাতেই প্রকল্পে কালক্ষেপ

-------------------

নিজের ওষুধই এখন তেতো মুখ্যমন্ত্রীর কাছে!

২০০৯সালের ২২ফেব্রুয়ারি ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রয়েছেন প্রণব মুখার্জিসুভাষ চক্রবর্তীমহম্মদ সেলিম সহ আরও অনেকে। (ফাইল চিত্র)

উন্নয়ন নিয়ে মমতা ব্যানার্জির ঘৃণ্য রাজনীতির পথেই চলছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।সোমবার কলকাতায় ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে অবহেলা করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে দিয়ে সল্টলেক থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত পরিষেবার উদ্বোধন করার ঘোষণা করেছে রেল মন্ত্রক। রবিবার অবশ্য শেষ মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণের কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষুব্ধ তৃণমূল সংকীর্ণ রাজনীতির অভিযোগ তুলে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোকে মমতা ব্যানার্জির পরিকল্পিত প্রকল্প বলে বর্ণনা শুরু করেছে।

কিন্তু তেরো বছর আগের তথ্য বলছে, বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যই হাওড়া থেকে সল্টলেক ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন এই প্রকল্পকে ঠেকাতে মমতা ব্যানার্জি সবরকম চেষ্টা করেছিলেন, কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রের সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, রাজ্যে বসে নৈরাজ্য তৈরি করে প্রকল্পের রূপায়ণে বাধা দিয়েছেন এবং সর্বোপরি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রীর পদে বসে এবং তারপরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসে তাঁর একের পর এক পদক্ষেপে প্রকল্প রূপায়ণে বিলম্ব ঘটিয়েছেন।

সোমবার সল্টলেক থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত মেট্রোরেলের যে প্রকল্পের উদ্বোধন হবে তাকে ‘মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প’ বলে দাবি করে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, ‘মমতা ব্যানার্জিই রেলমন্ত্রী থাকাকালীন প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর প্রকল্পে তাঁকেই বাদ দিয়ে উদ্বোধন? বাংলার মানুষ এটা মেনে নেবে না।’

বিজেপি’র মতোই ইতিহাসকে নিজের মতো করে লিখছে তৃণমূল। শিলান্যাসের পরদিন, অর্থাৎ ২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সমস্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে লেখা আছে যে ২২ ফেব্রুয়ারি সল্টলেক স্টেডিয়ামে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও। সেই সময় রেলমন্ত্রকের হাতে ছিল না প্রকল্পটি, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ প্রকল্প ছিল এটা। সংবাদপত্রের পুরানো পাতা থেকেই দেখা যাচ্ছে, সেদিন প্রণব মুখার্জি বলেছিলেন, আমাদের মতো গরিব দেশে উন্নয়নে অনেক বাধা। টাকার অভাব, প্রযুক্তিও সবসময় থাকে না। কিন্তু তার সঙ্গে যদি আত্মকৃত বাধা এসে জোটে তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু থাকে না। উন্নয়নকে সংকীর্ণ রাজনীতির বাইরে রাখতে না পারলে এগোনোর পথে অনাবশ্যক কাঁটা ছড়ানো হয়। তাতে নিজেদেরই পা ক্ষতবিক্ষত হয়।’

প্রণব মুখার্জির এই মন্তব্যের কারণ ছিল মেট্রো প্রকল্পে মমতা ব্যানার্জির বাধা। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ইউপিএ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগেই বলেছিলেন, ‘ঋণভারে জর্জরিত রাজ্যকে কেন্দ্র কেন এত টাকা দিচ্ছে? রাজ্য সরকারকে মদত দেওয়া বন্ধ করুন। লোকসভার ভোট চলে এসেছে, এখনও সিপিএম’কে তোয়াজ করছেন কেন?’

সেদিন দুপুরে সল্টলেকে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের যাওয়ার পথে কালো পতাকা দেখানোর চেষ্টা করেছিল তৃণমূল কর্মীরা। আর শিলান্যাস অনুষ্ঠানে প্রণব মুখার্জির ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিকালে পার্থ চ্যাটার্জিকে সাংবাদিক বৈঠকে বসান মমতা ব্যানার্জি। দলনেত্রীর নির্দেশে সেদিন প্রণব মুখার্জিকে ‘সিপিএম’র পদলেহনকারী বাংলার এক নায়ক’ বলে সম্বোধন করেছিলেন পার্থ চ্যাটার্জি। তারপরে বলেছিলেন, ‘সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের সময় যাকে দেখা যায়নি, বাংলার মানুষের পাশে যিনি দাঁড়াননি, তাঁকে এখন কথা বলতে শোনা যাচ্ছে।’

উদ্বোধনের আগের দিনরবিবারশিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের ছবি।


সেই ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো নাকি এখন মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প! ২০০৯ সালে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের ছবি এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও প্রণব মুখার্জির নাম লেখা ফলকের ছবি এখন সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শিলান্যাস মঞ্চ থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন, হাওড়া ময়দান থেকে গঙ্গার তলা দিয়ে (ভারতে নদীর তলা দিয়ে প্রথম ট্রেনলাইন) শিয়ালদহ হয়ে বিধাননগরের সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত এই মেট্রো প্রকল্পের কাজ ২০১৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

হয়নি কেন? ২০২২ সালের জুলাই মাসে এসে প্রকল্পের আংশিক উদ্বোধন করতে হচ্ছে কেন স্মৃতি ইরানিকে? বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কৃতিত্বকে মমতা ব্যানার্জির ঝুলিতে ঠেলে দেওয়ার মিথ্যা রাজনৈতিক প্রচারের থেকেও ঘৃণ্য সেই কাহিনি।

শিলান্যাসের কিছুদিন পরেই কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তারপরেই রেলমন্ত্রককে কাজে লাগিয়ে হাওড়া ও শিয়ালদহে মেট্রো স্টেশনের পরিকল্পনাকে বানচাল করতে উঠেপড়ে লাগেন তিনি। অথচ হাওড়া ও শিয়ালদহ রেল স্টেশনের সঙ্গে যাত্রাপথে সংযোগ না হলে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের মূল সুবিধাই নিতে পারবেন না যাত্রীরা। তাই বামফ্রন্ট সরকার সেদিন কেবলমাত্র প্রকল্পটির রূপায়ণের স্বার্থে এই কদর্য রাজনীতিকে মর্যাদার লড়াইতে নিয়ে যায়নি। বরং উন্নয়নের স্বার্থে গোটা প্রকল্পটি রেলমন্ত্রকের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়ে যায়। ‘কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগেই হোক, অথবা রেলের মাধ্যমেই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্প চালু হলেই নাগরিকদের লাভ।’ ২০১১ সালের গোড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের পরিবহণ সচিব সুমন্ত্র চৌধুরি সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী প্রকল্পটি হস্তান্তরিত হয় রেলমন্ত্রকের হাতে। তারপর? কলকাতার কিছু ব্যবসায়ী, জমি মাফিয়াদের স্বার্থে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর রুটটাই পালটে ফেলে মমতা ব্যানার্জির সরকার। ইঞ্জিনিয়ার ও ভূবিজ্ঞানীদের যাবতীয় সমীক্ষার থেকে বেশি গুরুত্ব পায় তৃণমূল নেতাদের মরজি। ফলাফল? প্রকল্প ব্যয় হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে, দশ বছর সময় নষ্ট হয়ে গেছে, তবুও শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। বরং মধ্য কলকাতায় বাড়িতে বাড়িতে ফাটল দেখা দিচ্ছে মেট্রোর নতুন রুটের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে।

স্থায়ী প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রাজনীতি করেছেন মমতা ব্যানার্জি। এখন বিজেপি’কে সেই অপকর্মের জন্য দোষারোপ করছেন তিনি। ইউপিএ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে বামপন্থীরা সমর্থন তুলে নেওয়ার পরেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমন্ত্রণে প্রণব মুখার্জি এসেছিলেন প্রকল্প শিলান্যাসে। লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগেও তাঁরা পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করার বদলে উন্নয়নকে গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। আর এখন স্মৃতি ইরানিরা সেই আচরণই মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে করছেন যা তৃণমূল করেছিল বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে। রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়কে আমন্ত্রণ জানালেও সোমবার ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর অনুষ্ঠানে তাঁরা মমতা ব্যানার্জিকে আগে থেকে আমন্ত্রণ জানাননি।

২০০৯ সালেরই আগস্ট মাসের কথা কি মমতা ব্যানার্জির মনে পড়ছে? তখন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারে সদ্য রেলমন্ত্রী পদে বসেই মমতা ব্যানার্জি টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া সম্প্রসারিত মেট্রো রেল প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন। সেদিন তিনি রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে পাশে বসিয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানাননি। অথচ টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া মেট্রো সম্প্রসারণ আদৌ রেলমন্ত্রকের একার প্রকল্পই ছিল না, ঐ সম্প্রসারণের কাজে ৩৩ শতাংশ ব্যয়বহন করেছিল পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার।

ক্ষমতায় বসে কেউ ব্যস্ত ইতিহাস থেকে নেহরুদের নাম মুছতে, কেউ ব্যস্ত বামপন্থীদের নাম মুছতে। এরা কি আদৌ অক্ষয় হয়ে থাকবে ভবিষ্যতে?

.........................

গণশক্তি, ১১ জুলাই, ২০২২

.......................... 

20200720

সমমর্যাদা, স্বাধীন অবস্থান নিয়ে চীনের সঙ্গে কথা বলুক ভারত



পিপলস ডেমোক্র্যাসি পত্রিকায় সম্পাদকীয়
---------------------------------------

      
নয়াদিল্লি, ২৭ জুন— সমমর্যাদা ও স্বাধীন অবস্থান নিয়ে চীনের সঙ্গে কথা বলার দৃঢ়তা থাকতে হবে ভারতের। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বাস্তবতা বুঝতে হবে, দেশের মূল স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। মার্কিন রণনীতির অংশ হওয়া ভারতের স্বার্থরক্ষায় অনূকূল নয়। ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধ সম্পর্কে এই অবস্থান জানিয়েছে সিপিআই(এম)। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মুখপত্র ‘পিপলস ডেমোক্র্যাসি’র সম্পাদকীয়তে এই অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, গালওয়ান নদীর উপত্যকায় সীমান্ত সংঘাতে ২০ জন ভারতীয় জওয়ানের প্রাণহানি স্বাভাবিকভাবেই দেশবাসীর মনে ক্রোধের সঞ্চার করেছে। এই ঘটনা মর্মান্তিক, নিন্দাযোগ্য। বিশেষ করে ৬ জুন উভয় পক্ষের পদস্থ সামরিক অফিসারদের মধ্যে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় উত্তেজনা হ্রাস ও সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হওয়ার পরেও এই ঘটনা ঘটেছে। ১৫ জুন রাতে ভারত ও চীনের সেনাদের মধ্যে কোন পরিস্থিতিতে শারীরিক সংঘাত ঘটল তার অনেক কিছুই আজও অজানা। সরকার সে বিষয়ে স্পষ্টতা দিতে কোনও উদ্যোগই নেয়নি।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ১৯ জুন সর্বদলীয় বৈঠকে সব রাজনৈতিক দলই বলেছে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে দেশ ঐক্যবদ্ধ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে লাদাখের চলতি সমস্যা এবং আমাদের অবস্থান কী ছিল তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই করা যাবে না। যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, শিক্ষা নিতে হবে। তাহলেই সরকার এবং দেশ সামনের দিনে এগতে পারবে।

পিপলস ডেমোক্র্যাসি বলেছে, ১৭ জুন ভারত ও চীনের বিদেশ মন্ত্রীদের মধ্যে টেলিফোনে কথা হয়। নিজেদের অবস্থানের কথা দু’দেশই বলে। কিন্তু তারপরেও তাঁরা এই মতৈক্যে পৌঁছায় যে, দায়িত্বশীলভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করা হবে, উভয় পক্ষই ৬ জুনের সেনা সরানোর সমঝোতাকে আন্তরিক ভাবে রূপায়ণ করবে। তাছাড়াও, ‘উভয় পক্ষই এমন কিছু করবে না যাতে উত্তেজনা বাড়ে, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও প্রোটোকল মেনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখবে।’ সর্বদলীয় বৈঠকে এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সিপিআই(এম) সমর্থন করেছে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিশোধ ও সামরিক প্রত্যাঘাতের জিগিরমুখী আওয়াজকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। যে রাজনৈতিক মনোভাবেরই হোন না কেন, কোনও বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষই এই রকমের অবাস্তব ও অপরিণত অবস্থানের শরিক হতে পারেন না।

আরও কেউ কেউ বলছেন চীনের সঙ্গে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সমস্ত চুক্তি অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় সীমান্ত প্রশ্নে একাধিক চুক্তি হয়েছে। ১৯৯৩সালে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চুক্তি হয়। এরপরে ১৯৯৬, ২০০৫, ২০১৩, ২০১৫-তে আরও চুক্তি হয়েছে। কংগ্রেস ও বিজেপি উভয় সরকারের আমলেই এই চুক্তিগুলি হয়েছে। এইসব চুক্তি এবং তার অধীনে মতপার্থক্য ও সংঘাত মোকাবিলার যে ব্যবস্থার কথা স্বীকৃত হয়েছিল তার ফলেই হিমালয়ের উচ্চতায় শান্তি বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। ৪৫ বছর আগে ১৯৭৫ সালে শেষ সশস্ত্র সংঘাতে প্রাণহানি ঘটেছিল। এই সমস্ত প্রয়াসকে একবারে নস্যাৎ করে দেওয়া ভুল হবে। বরং, দরকার হলো অতীতের এই চুক্তিগুলির ওপরে আরও শক্তপোক্ত চুক্তির দিকে যাওয়া।

এখন সামনে এগতে হলে আশু করণীয় কাজ উত্তেজনা প্রশমন। তা করতে গেলে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলোচনা শুরু করতে হবে। কিন্তু তার জন্য স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদী স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিভঙ্গি চাই।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, লাদাখের সমস্যাকে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছেন ‘সালামি স্লাইস’ বা অল্প অল্প কেটে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতিতে ভারতীয় ভূখণ্ড নিয়ে নিতে চাইছে চীন। কিন্তু কেবল কিছু এলাকা দখলের চেষ্টা হিসাবে এই ঘটনাকে দেখা ঠিক হবে না। সীমান্তে এই গোলমালের পিছনে গভীরতর কারণ রয়েছে। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় সাধারণ সংঘাতের বাইরেও ভূ-রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। আরও মৌলিক ব্যাপার হলো, ভারত ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছু মাত্রায় অবিশ্বাস ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে

পিপলস ডেমোক্র্যাসি বলেছে, চীনের তরফে মর্মান্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ভারত সরকারের অবস্থানও এমন পরিস্থিতির সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে। জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে দেওয়া এবং জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখকে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত এলাকায় পরিণত করার প্রতিক্রিয়া পড়েছে দেশের বাইরেও। চীন তাদের অবস্থান থেকে এই ঘটনাকে দেখেছে। চীন দু’বার ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে চীনের দাবি রয়েছে এমন এলাকায় প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তন হিসাবেই এই পদক্ষেপকে তারা দেখছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক বেসরকারি বৈঠকে চীন এই প্রসঙ্গ তোলার পরেও ভারত সরকার এড়িয়ে গেছে।

এই পদক্ষেপ নিয়ে সরকারের শীর্ষ পদাধিকারীদের রাজনৈতিক চমক দেখানোর চেষ্টাও প্রভাব ফেলেছে। ৬ আগস্ট জম্মু কাশ্মীর পুনর্গঠন নিয়ে সংসদে আলোচনার সময়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেন, ‘‘আমি নথিভুক্ত করে রাখতে চাই যখনই আমি সংসদে জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য বলব তার মধ্যে পাক অধিকৃত কাশ্মীর এবং আকসাই চিন অন্তর্ভুক্ত।’’ গত সেপ্টেম্বরে বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ‘একদিন পাক অধিকৃত কাশ্মীর বাস্তবেই দখলে আসবে’ বলে মন্তব্য করেন।

সিপিআই(এম)’র মুখপত্র বলেছে, মোদী সরকারের দ্বিতীয় দফার প্রথম বছরে ভারত সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণনীতির সঙ্গে সংযুক্ত হতে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই রণনীতির লক্ষ্য চীনকে প্রতিহত করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়ার চতুর্দেশীয় আঁতাতকে গত সেপ্টেম্বরে মন্ত্রীপর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। নিউইয়র্কে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময়ে চার দেশের বিদেশ মন্ত্রীরা বৈঠকে বসেছিলেন।

চলতি মহামারীর সময়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য অধিবেশনে চীনকে কোণঠাসা করার জন্য মার্কিন উদ্যোগের সঙ্গেই ভারত সুর মিলিয়েছে। একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মার্কিন অভিযোগের প্রতিধ্বনি করে দাবি করেছেন চীনের গবেষণাগারে করোনা ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে।
এসবই লাদাখে সমস্যাকে বাড়িয়েছে বলে মনে হয়। দৌলতবাগ ওল্ডি পর্যন্ত সড়ক ও তার উত্তরমুখী শাখা সড়ক নির্মাণ ভারত বৈধভাবেই করেছে সীমান্ত পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য। কিন্তু চীন এখন তা পৃথক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, সরকারকে নিজেকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে কেন আমাদের প্রতিবেশিদের সঙ্গে সমস্যা বাড়ছে। চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে জটিল সীমান্ত সমস্যা তো রয়েইছে, নেপালও এখন কালাপানি এলাকা নিয়ে বিতর্ক তুলেছে। আরেক বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশি বাংলাদেশ ক্রমাগত বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে বাগাড়ম্বর এবং সিএএ-এনআরসি পরিকল্পনায় এইসব ‘ঘুনপোকাকে’ বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় অস্বস্তির বৃত্তে পড়ে গিয়েছে। এসবই চীনের নকশার ফলে হচ্ছে, একথা ধরে নেওয়া নিজেকেই মোহাবিষ্ট করার শামিল। বাস্তব হলো, বিজেপি-আরএসএস’র অতি জাতীয়তাবাদী হিন্দুত্বের বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে।

সিপিআই (এম)’র মুখপত্রে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে চলতি সংঘাতের সমাধান ছাড়াও বকেয়া সমস্যা সমাধানের রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে ভারতকে। উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হস্তক্ষেপেই তা সম্ভব। চীন সম্পর্কে আমাদের স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিভঙ্গির পুনর্বিবেচনা করা দরকার। প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এমকে নারায়ণন একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে সম্প্রতি সওয়াল করেছেন ভারতের স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষা করতে হলে চীন-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ভারতের জোটনিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া উচিত। পশ্চিমী শক্তিগুলির অনুরাগী স্ট্র্যাটেজিক বিশেষজ্ঞ ও দালালদের ক্রমবর্ধমান দাবির তুলনায় নারায়ণনের পরামর্শ অনেক বিবেচনাপ্রসূত। মোদী সরকার মার্কিনীদের ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্কও বাড়িয়ে চলেছে। সরকারের ভেবে দেখা উচিত চীনের বিরুদ্ধে জোট বেঁধে আমাদের স্বার্থ রক্ষা হবে কিনা।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, সমমর্যাদা ও স্বাধীন অবস্থান নিয়ে চীনের সঙ্গে কথা বলার দৃঢ়তা থাকতে হবে ভারতের। আমাদের মূল স্বার্থ পরিত্যাগ করার কোনও প্রয়োজন পড়ে না। দরকার এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যারা বাস্তবতা উপলব্ধি করে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ ও স্বাধীনতা রক্ষায় কাজ করতে সক্ষম।

গণশক্তি, ২৮ জুন, ২০২০

20180226

আজকের জগৎ শেঠ ও আজকের মীরজাফর


শ্যামল চক্রবর্তী

যুদ্ধে পরাজিত করে দেশ দখলের নীতি এখন বদলে গেছে। যুদ্ধে না জিতেও দেশের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো আসল ক্ষমতা। ইতিহাসের দুই চরিত্র জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী-আম্বানির তুলনা এই লেখা।

বাংলার বণিকরা জগৎ শেঠের নেতৃত্বে ইংরেজদের দিয়ে সিরাজউদ্দোল্লাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সেই সময় বাংলা ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য। এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য গড়ে উঠেছিল সুবিস্তৃত বাজার। বাংলা ছিল সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে ভালো কৃষি ব্যবস্থার অধিকারী। ফরাসি বণিকরা বাংলাকে বলতেন জান্নাতুল বিলাত’, অর্থাৎ প্রদেশগুলির স্বর্গ। মুঘল ফরমানে তৎকালীন বাংলাকে ভারতবর্ষের স্বর্গহিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় বাংলায় একটি ব্যাঙ্কিং বাণিজ্য গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এই জমিদার বণিক শ্রেণিকে বণিক রাজা বলা হতো। নবাবি দরবারে তারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়ে যায়। এই প্রভাব বলয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল জগৎ শেঠ পরিবারের। এরা পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। জগৎ শেঠ ছিল একটা উপাধি। মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ারের এক ফরমান বলে জগৎ শেঠকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বাঁ পাশের আসন গ্রহণে ক্ষমতা বা মর্যাদা দেন। নবাব যেন তার কথা উপেক্ষা না করেন সেই মর্মে ফারুখশিয়ার ফরমানও জারি করেন। পদমর্যাদায় জগৎ শেঠ নবাবের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। ২০০০ ঘোড়সওয়ার তার বাড়ি পাহারা দিতো (অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদ্দৌলা, দে ১৮৯৭ পৃঃ ১১৭)
জগৎ শেঠের উদ্দেশ্য কী ছিল? জগৎ শেঠ এবং অন্যান্য বণিকদের হাতে এত  সম্পদ জমে গিয়েছিল যে তৎকালীন সময়ে অতিরিক্ত বাজার ছিল না। তাই বাজার পাওয়ার জন্য জগৎ শেঠরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারফত দেশের অন্যত্র এবং বিদেশের সঙ্গেও বাণিজ্য করতে চাইল। কিন্তু তাদের সে আশায় বাধ সাধলেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজরা কলকাতা এবং তার চারপাশে একটি দস্তকবা মোগল বাদশাহদের অনুমতিপত্র নিয়ে এখানে বিনা শুল্কে ব্যবসা করত। তারা বিনা শুল্কে ব্যবসা করত কিন্তু বাংলার ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় শুল্ক দিতে হতো। এই অসম ব্যবস্থায়  রাজকোষের ক্ষতি হতো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও বিপন্ন হতো। সিরাজদ্দৌলার মনোগত ইচ্ছা ছিল ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু হাত-পা বাঁধা ছিল। কারণ ফরমান ছিল দিল্লির বাদশাহের।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা মোঘল বাদশাহের দেওয়া দস্তকের (বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি পত্র) অপব্যবহার করে। কোম্পানির অফিসাররা দস্তক অপব্যবহার করে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও ব্যবসা শুরু হয়।  এরফলে রাজস্বের ভীষণ ক্ষতি হয়। বিনা শুল্কে বাণিজ্য চালাতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা এটাই বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলার স্বার্থে। কিন্তু জগৎ শেঠদের চাহিদা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের নিজস্ব ব্যবসা বাণিজ্যকে প্রসারিত করা এবং সঞ্চিত ধন সম্পদের অনেক বেশি লাভজনকভাবে  ব্যবহার করা। সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে দিতে চাইছিলেন না। এজন্য তিনি দুর্গ তৈরি করতে নিষেধ করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মীরজাফরকে সিংহাসনে বসানো হয়। কারণ মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ইংরেজদের সেই সুযোগ দেবেন। ইতিহাস বলছে মীরজাফর ক্লাইভকে তার হাত ধরে সিংহাসনে বসিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। তারপর ব্যবসা বাণিজ্য সবটাই তো ইংরেজদের দখলে চলে গেল।
ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করবার অধিকার নিয়ে সিরাজদ্দৌলার মনোবেদনা থাকলেও তিনি বিনা শুল্কের অধিকার কেড়ে নিতে পারেননি। কারণ দিল্লি বাদশাহের ফরমান। তিনি চেয়েছিলেন দস্তকের অপব্যবহার রুখতে। আজ ২৫০ বছর পর আজকের জগৎ শেঠরা, আদানি, আম্বানি প্রভৃতিরা একইরকমভাবে নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে চাহিদা অনুযায়ী দেশের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছে। কাজে নিজেরা বিদেশিদের তাঁবেদার হতে চেয়েছে। জগৎ শেঠরা যেমন নিজেদের স্বার্থে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তেমন করে আদানি আম্বানিরা মোদীকে ভারতের সিংহাসনে বসিয়েছে। বিদেশি বণিকদের সুবিধার জন্য দশ হাজার পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।অপরদিকে ‘‘মেড ইন ইন্ডিয়া’’ নাম দিয়ে ভারতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত অন্তঃশুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় ভারতের মাঝারি ছোট শিল্পপতিদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন, সংকট সারা দেশজুড়ে।
সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ তৈরি করতে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরা ভারতে বিমানঘাঁটি-নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে, যৌথ বিমান মহড়া হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাজেটিক সামরিক চুক্তি করছে, যুদ্ধবাজ ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, ট্রাম্পের ড্রাম বাজাচ্ছে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে।   কর্পোরেট সংস্থাগুলো এই প্রথম একযোগে পরিকল্পনা করে নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তথাকথিত ভাইব্র্যান্ট গুজরাটে সম্মেলনে মোদীই তাদের উপযুক্ত প্রার্থী বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন মীরজাফর বসেছিল ক্ষমতায় এবং ইংরেজদের সব আবদার পূরণ করত, তেমনি মোদীও সাম্রাজ্যবাদের সব আবদার রাখার জন্য ভারতের দরজা খুলে দিয়েছে। চীনকে ঘিরে ফেলার জন্য জাপান-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে। আদানি-আম্বানি অন্যান্য কর্পোরেটদের অবাধ লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। কংগ্রেস আমলে কর্পোরেটদের আক্ষেপ ছিল যে মনমোহন সিংয়ের আমলে সংস্কারের কাজ অর্থাৎ কর্পোরেট লুটের সুযোগ করে দেওয়ার কাজ খুব শ্লথ গতিতে হচ্ছিল। মোদীকে দিয়ে সেই গতিকে ত্বরান্বিত করিয়ে নিচ্ছে। তবে একটাই পার্থক্য ভারতীয় শিল্পপতিরা নিজেদের শিল্পের বাজারও পাচ্ছে। এবং কিছু স্বাধীনভাবেও পাচ্ছে। একেবারে বিদেশিদের দারোয়ান হয়ে যায়নি। বিশ্বস্ত মোদী নিষ্ঠার সঙ্গে কর্পোরেটদের ইচ্ছাপূরণ করে চলেছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দস্তক পেল কি করে?
দেশীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দিল্লির বাদশাহের এই ফরমান বা দস্তক পাওয়ার দুটো ইতিহাস আছে। বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার এই ফরমান ইংরেজরা পেল মোগল সম্রাটদের কাছ থেকে।
১৬৪৪ সাল শাহজাহানের রাজত্বে তাঁর প্রিয় এক কন্যা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তৎকালীন ভারতীয় চিকিৎসকরা তাকে নিরাময়ে ব্যর্থ হন। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জেন Gabriel Bughton ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হোপওয়েল জাহাজের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি নবাব কন্যাকে সারিয়ে তুললেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি চাইলেন ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করবার কারখানা তৈরি করবার অনুমতি। এর আগে অনেক নিয়ন্ত্রণ রেখে ব্রিটিশদের ব্যবসা করতে হতো, তাতে লাভ হচ্ছিল না। অনুমতি পাওয়া গেল। এই সময় আবার বাউটন বাংলায় এলেন দিল্লির সম্রাটের ফরমান নিয়ে। সুলতান সুজা তখন বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত।
সম্ভবত কোন একজন বেগমের অসুখ বাউটন নিরাময় করে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ব্রিটিশদের বাংলায় স্থায়ীভাবে বাণিজ্য কারখানা করার অনুমতি দিলেন। এই সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেকগুলি কারখানা খুলে ফেলল। বছরে খুব সামান্য তিন হাজার টাকা করের ভিত্তিতে কার্যত প্রায় বিনা শুল্কে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা শুরু করলো। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুবে বাংলার নবাব ছিলেন শায়েস্তা খান। শায়েস্তা খানের চাপে জব চার্নক মাদ্রাজে (চেন্নাই) চলে গেছিলেন। কিন্তু বাংলার পরবর্তী নবাব ইব্রাহিম খানের আমন্ত্রণে জব চার্নক কলকাতায় সুতানুটিতে বসতি স্থাপন করেন। তারপর নানাভাবে হাত বদলে আলিবর্দী খান পরে তার দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলার হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেবের দৌহিত্র ফারুকশিয়ার  নিজের রাজত্বকালে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজপুতানার রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ব্রিটিশ ডাক্তার হ্যামিলটনের চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করেন। হ্যামিলটন বাংলায় ইংরেজদের পাওয়া সুবিধাকে আরও বৃদ্ধি করার আবেদন জানান আর ফারুক শিয়ারের কাছ থেকে গঙ্গার দুপারের ৩৮টি গ্রামের জায়গির লাভ করেন মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশাল তৈরি করেন। ইতিমধ্যে কলকাতা একটি বড় বন্দর নগরী হিসেবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বাদশাহ ফারুক শিয়ার জগৎ শেঠকে অপরিসীম অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন।

আদিম সঞ্চয়ের জন্য লুট
ইংরেজরা বাংলায় ঢুকেই অবাধ লুটের ব্যবস্থা করল। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের জন্য আদিম পুঁজি সংগ্রহ করা হয়েছিল ভারতসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলি লুট করে। মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে আদিম পুঁজির সঞ্চয় বলেছেন যে, উপনিবেশগুলিকে লুট করেই আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে আমেরিকার বাজারে দাস হিসাবে বিক্রি করে প্রচুর সোনা রূপা নিয়ে আসত। সেই অর্থ এবং ভারত এশিয়া-আফ্রিকার অন্যান্য উপনিবেশ থেকেও ধনসম্পদ লুট করে ইংল্যান্ড ইউরোপের শিল্পায়নের জন্য পুঁজি জোগাড় হয়। বঙ্গ প্রদেশ থেকে টাকা লুট হয়, বিনা শুল্কে ভারতের পণ্যদ্রব্য অন্যান্য উপনিবেশগুলোতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়, এছাড়া রাজস্ব আদায় করা হয় নির্মমভাবে। এর ফলে বাংলা-বিহারের বিশাল অংশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষ ৭৬- মন্বন্তর নামে পরিচিত।
জওহরলাল নেহরু, ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া (১৯৮৬ সংস্করণ, পৃঃ ২৯৭) গ্রন্থে বলেছিলেন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের প্রচার ছিল যে, মুসলমান শাসনের দুর্দশা দূর করে পলাশির যুদ্ধের পর যে ইংরেজ শাসন শুরু হলো তাতে বাংলা নাকি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। নতুন জাতীয়তাবাদী ইতিহাস দেখিয়ে দিল যে, বরং‍‌ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছিল, ক্লাইভ হেস্টিং- লুটপাটের ফলেই বাংলায় ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটেছিল (১৭৭০) তৎকালীন বাংলা বিহারের প্রায় তিনভাগের একভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছিলেন।
নেহরু আরও বলেন (ডিসকভারি ২৯৭, ২৯৮) বাংলা লুট করে তার অর্থেই আদিম সঞ্চয় হিসাবে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল এই সত্যের উন্মোচন শুরু হয়েছিল দাদাভাই নত্তরোজির ১৯০১ সালে প্রকাশিত বই (পভার্টি অ্যান্ড অল ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) এবং নতুনভাবে বিকশিত হয় রজনীপাম দত্তের ইন্ডিয়া টুডেগ্রন্থে। এই চিন্তায় নতুন অবদান রচনা করেন বিপানচন্দ্র পাল রাইজ অ্যান্ড গ্রোথ অফ ইকনমিক ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া (নিউদিল্লি, ১৯৬৬) বইটিতে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের অপব্যাখ্যা থেকে ভারতের ইতিহাসকে মুক্ত করেছেন। এখন ভারতের ইতিহাস অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
উৎসা পট্টনায়ক তাঁর এক লিখিত প্রবন্ধে বলেছেন ১৭৬০ সাল থেকে ১৮২০ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রভূত পরিমাণে অর্থ জমা হয়। সবই হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশ লুটের টাকা। এই অর্থ ইংল্যান্ডের শিল্প স্থাপনের কাজে লাগে। উৎসা পট্টনায়ক অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে একে বলেছেন বিনি পয়সার ভোজ (ভারততত্ত্ব, এন বি , সুকুমারী ভট্টাচার্য সম্মাননা গ্রন্থ)
বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন সারা দুনিয়াব্যাপী যে লুঠ হচ্ছে একেও আদিম সঞ্চয়ের মতো শোষণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমার দেশ ভারতেও এখন আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের সময়ের মতই  বেপরোয়া লুট করে মানুষকে নিঃস্ব করা হচ্ছে।
আকাশ বিক্রি হয়ে গেল। আকাশ বিক্রি হওয়ার প্রক্রিয়াতে ,৭৬,০০০ কোটি টাকা। বিদেশিদের হা‍‌তে এখনকার সময়ের দস্তক দিয়ে দিয়েছেন ভারত সরকার, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি সংস্থায় অঙ্গীভূত হওয়ার জন্য। একেই বলে বিশ্বায়ন। ভুবনগ্রামের অর্থ হলো বিনা শুল্কে অন্যদেশে বাণিজ্যের অধিকার। ভারতে ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।খনি দুর্নীতিতে আরও বেশি টাকা লুট হলো। কর্ণাটকে খনি দুর্নীতিমধ্য প্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারি, মহারাষ্ট্রের আবাসন কেচ্ছা এসবের মধ্যে দিয়ে লুট চললো অব্যাহতগতিতে। পশ্চিমবাংলাও পিছিয়ে নেই। বি জে পি-তৃণমূল পরোক্ষ আঁতাতের সুযোগে তৃণমূল সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা চিট ফান্ডের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করল।  এসব কিছু যেন আদিম পুঁজিরই মতো লুটপাট করে সংগৃহীত হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ ভিখারি হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া, জনগণের নির্ভরতা পেনশন ফান্ড শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া, নোট বন্দী করে কালো টাকা উদ্ধারের নামে ব্যাঙ্কে সব ৫০০-১০০০ টাকার পুরানো নোট বাতিল করে নতুন নোট নিতে বলা হয়। সেখানে রোদে লাইন দিতে ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মোদীর মন্তব্য ছিল কালো টাকা সন্ত্রাসবাদীরা ব্যবহার করছে। নোট বন্দির ফলে কালো টাকা তারা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল উলটো। কালো টাকা সাদা হয়ে গেল। আসলে কালো টাকাকে সাদা করে দেওয়া হলো এই প্রক্রিয়ায়। সন্ত্রাসবাদী উৎপাত কমলই না। বরং সীমান্তে হামলা বাড়লো, আমাদের সেনাবাহিনীর জীবন ক্ষয় হতে থাক‍‌ল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। এরপরে নিয়ে আসা হল জি এস টি। ছোট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জি এস টি  ব্যবসায়ীদের নিচের অংশটা  নিঃস্ব হতে শুরু করল।
সম্প্রতি মোদী সরকার লোকসভায় তাড়াহুড়ো করে এফ আর ডি আই বিল পাশ করাতে চাইছে। কর্পোরেটদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ধার দিয়েছ মন্ত্রীসভার আনুকূল্যে। সেই ধার তারা শোধ ‍‌রেনি এমনকি সুদও দেয় না। ব্যাঙ্কের টাকায় শতকরা ৮৫ ভাগ কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তদের সঞ্চিত টাকা। ফলে ব্যাঙ্কগুলোকে এখন রুগ্ দেউলিয়া করে নানা কায়দায় ব্যাঙ্কে জনগণের গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। আজকের জগৎ শেঠরা-আদানি-আম্বানি-জিন্দল-মিত্তাল-গোয়েঙ্কা কর্পোরেট নিজেরা তো বটেই সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনার হয়ে লুটের ছোট তরফ বনতে চাইছে। ফলে এখন তারা পররাষ্ট্র নীতিকেও প্রভাবিত করছে। এখন তো আর জোর করে দেশ অধিকারের দরকার হয় না। দেশের অর্থনীতি রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই তা সম্ভব। মীরজাফর নতুন মুখোশ নিয়েছে, আর জগৎ শেঠের দলও আদানি-আম্বানি চেহারা চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই নতুন জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরদের বিরুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত লড়াই ছাড়া আর কোন গতিপথ নেই। জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডে পালটে যায়।
গীতায় কৃষ্ণ বলেছিলেন দুর্বৃত্ত দমনের জন্য সৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করবো। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সম্পদ লুটপাট করে নিঃস্ব করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য জগৎ শেঠরাও বারবার জন্মগ্রহণ করছেন। জগৎ শেঠরা যুগের আদানি-আম্বানি অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। সঙ্গে সহজন্ম নিয়েছেন তখনকার মীরজাফর আজকের নরেন্দ্র মোদী। তাই এই মুহূর্তে লুটপাট চালিয়ে ভারতের আদানি, আম্বানি, মিত্তাল, জিন্দাল, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কা প্রমুখ শতকরা ভাগ মানুষের হাতে ৭৩ ভাগ সম্পদ জমা হয়েছে।
রাজদণ্ড এখন তাদেরই হাতে।

গণশক্তি, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮