Showing posts with label সাম্প্রদায়িকতা. Show all posts
Showing posts with label সাম্প্রদায়িকতা. Show all posts

20200719

ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বন্ধ হোক


জ্যোতি বসু
(১৯৪৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় আইনসভায় ভাষণ)


মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আমি মনে করি শ্রমিক শ্রেণীর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এই আলোচনায় আমার অবশ্যই অংশগ্রহণ করা উচিত। যে কেন্দ্রে হিন্দু, মুসলমান উভয় ধর্মালম্বীই আছেন। গোটা শহর জুড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানি এই মহানগরীকে হতমান করেছে এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্করভাবে আমাদের রাজনৈতিক জীবনকে কালিমালিপ্ত করেছে, তখন কলকাতা ও শহরতলির শ্রমিকশ্রেণী এই ঘটনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দূরে থেকেছেন। আসুন, এর জন্য তাঁদের আমরা সম্মান জানাই।

হাজার হাজার মানুষ কীভাবে নৃশংসতা, কাপুরুষতা ও অমানবিকতায় পতিত হয়েছিল তার বিশদ ব্যাখ্যা আমি করছি না। বরং আমি সভার সমস্ত সদস্য ও দেশবাসীকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এটাই বলব যে, এক মুহূর্তের জন্যও ভুলবেন না, আমরা যাই বলি, যাই করিনা কেন, তার উদ্দেশ্য হবে উদ্ধারকার্য। তার প্রতি দৃষ্টি রেখেই সমস্ত বক্তব্য এবং কাজ করার জন্য আন্তরিক আবেদন জানাবো। এই মুহূর্তে সমস্ত শুভেচ্ছা সহ দেশবাসীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি উদ্দীপনা ও শক্তিকে নির্ভর করে ও সাম্রাজ্যবাদী কৌশল মোকাবিলায় এবং স্বাধীনতার জন্য তাঁদের নিঃসংশয় সংকল্পকে স্মরণে রেখেই যা কিছু করতে হবে। যে লক্ষ্য আইনের জন্যই হিন্দু ও মুসলিম ক্ষুধা তৃষ্ণা ও যন্ত্রণার মোকাবিলা করেছেন। বাংলায় মুক্ত জীবন ও স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র পথ ইউরোপীয়ানদের বাদ দিয়ে একটি প্রগতিশীল কর্মসূচির ভিত্তিতে কোয়ালিশন সরকার গঠন। এই লক্ষ্য অর্জন ভোটের মাধ্যমে হবে না। সম্ভব আলোচনার মধ্য দিয়েই, মন্ত্রিসভাকে ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য অভিযুক্ত করার আগে, আসুন পর্যায়ক্রমে আমরা বিষয়গুলি আলোচনা করি। যদিও এই মন্ত্রিসভা বহুবিধ অপকর্ম করেছে। যাই হোক, দেখুন আমাদের বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত ছলের মূল পান্ডা কারা; যাবতীয় ঘৃণার সঙ্গেই আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই আমাদের পয়লা নম্বর শত্রু। তারা আমাদের অবদমিত করেছে, পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, জনগণকে ভুল পথে চালিত করেছে এবং এখন সগর্বে কলকাতায় নিদারুণ শ্মশানের শান্তি বজায় রাখলেও, যে কোনো সময় তা ভেঙে যেতে পারে।

অতীতে যখনই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে তখনই আমরা, সঠিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদকে তার প্রধান উস্কানিদাতা হিসেবে ভৎর্সনা করেছি এবং আমরা দেখেছি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে দেশবাসী কীরকম অসহায় দুর্বল দাবার বোড়েতে পরিণত হয়। এবারেও দাঙ্গা সম্পর্কে আলাদা করে কিছু ভাবনার কোনো কারণ নেই। প্রভাবিত করতে পারে এমন সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তির সঙ্গে আমিও এই দাঙ্গার প্রধান অপরাধীদের অভিযুক্ত করছি। যাঁরা হোয়াইট হল অথবা দিল্লি অথবা কলকাতার গভর্নর হাউসে আত্মতৃপ্তি নিয়ে অবস্থান করছে এবং সুতোর টানে আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। গত ছ'মাসে ক্যাবিনেট মন্ত্রী কি নিখুঁত খেলাই না খেললেন। কখনো কংগ্রেস এবং কখনো লীগের কানে অমৃতবাণী বর্ষণ করেছেন। এমন সব প্রস্তাব তারা পেশ করলেন যেগুলিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সবশেষে স্বাধীনতাও নয়, এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকার বা স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেবার পরিবর্তে তারা যা করল, আমাদের দেশবাসীর এক সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্য সম্প্রদায়ের বিরোধকে পরিকল্পিতভাবে জিইয়ে রাখা ও জনমানসকে বিষিয়ে তোলা এসবের চূড়ান্ত পরিণতি হলো কলকাতার মারাত্মক দাঙ্গা। 

মাননীয় উপাধ্যক্ষ, এই সমস্ত কিছুর সঙ্গেই আমার প্রশ্ন, ভাইসরয়ের সভাপতিত্বে গভর্নরদের সম্মেলনের কি গোপন পরিকল্পনা আলোচিত হয়েছিল যার ফলে কলকাতার গভর্নর ঠিক তার বিপরীত কাজ করলেন? কি কারণেই বা কলকাতায় সরকার দুদিনের জন্য আক্ষরিক অর্থে অপসৃত হয়েছিল এবং যার ফলে পুলিস তার নির্ধারিত কাজের বদলে লুঠ ও অগ্নিসংযোগের কাজে সহায়তা করেছিল? পুলিস কিভাবে ধর্মঘট ভাঙে আমরা সবাই জেনেছি। রশিদ আলি দিবসে আমাদের বিপ্লবী যুবকদের মিছিল ভেঙে দিতে তারা কিভাবে তৎপর হয়েছিল তাও আমরা দেখেছি। অর্থাৎ কিভাবে তারা গণঅভ্যুত্থান দমন করে! আমাদের অভিজ্ঞতা আছে, কেমন করে ১৯৪২ সালে সরকারকে অন্ধকারে রেখে কিভাবে পুলিস তার সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। কিন্তু এই দাঙ্গার সময় জনগণ ছিল বিচ্ছিন্ন এবং পুলিসবাহিনী বুঝে নেয় যে তাদেরই জমানা আরো জোরদার হবে। সুতরাং এই স্বৈরতান্ত্রিকদের সংবিধানিক রীতির আড়ালে আশ্রয়ও নিতে দিলে হবে না। যদি ইংরেজরা পথিমধ্যে আক্রান্ত হতেন বা তাদের সম্পত্তি লুঠ হতো কিম্বা মিলিটারি ট্রাক জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, তাহলেও কি তারা একই আচরণ করতেন? উত্তর সহজেই অনুমেয় এবং চোখে পড়বার মতো বিষয়। সিআইডি’র তান্ডবের নারকীয় প্রক্রিয়া পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া অনুমান করাও অসম্ভব। কারণ দাঙ্গার প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্ভাবত তারা ওয়াকিবহাল ছিল। সুতরাং, মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছি যে, গভর্নর এবং পুলিস কমিশনারের ছদ্ম-নিরপেক্ষতা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত।

মিঃ সুরাবর্দি এবং তাঁর মন্ত্রীরা বলার চেষ্টা করছেন যে, তাঁদের দায়িত্ব কেবল আদেশ করা, আর তা পালন করা পুলিস কমিশনারের কাজ। কিন্তু মিঃ সুরাবর্দি জানেন, তাঁর গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন ১৬আগষ্ট দুপুরবেলা যে জনসমাগম তা কেমন করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। তাঁরই অধীনস্থ পুলিস কমিশনার দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা দেখা মিঃ সুরাবর্দির দায়িত্ব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে তাঁর ডেপুটি কমিশনারদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কথা ভাবছেন? তাঁর সে সাহস নেই কারণ তিনি নিজের ব্যর্থতা তদোপরি সরকারের শোচনীয় ব্যর্থতার কথা জানেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার মুসলিম লীগ দল থেকে পৃথক নয় এবং শেষোক্তটিকে অবশ্যই ত্রুটি-বিচ্যুতির দায়িত্ব নিতে হবে। এসব সত্ত্বেও আমি মনে করি, সাম্রাজ্যবাদী নীতি কখনোই আমাদের এমন দুর্দশা করতে পারতো না, যদি না লীগ এবং কংগ্রেস সেই অশুভ চক্রান্তের শিকারে পরিণত না হতো।

আমি প্রথমে লীগের দায়িত্ব সংক্ষেপে উল্লেখ করার চেষ্টা করছি:

১) ১৬ আগস্টের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৫ আগস্ট ‘আজাদ’ সম্পাদকীয় লিখেছিল যে ওইদিন পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ শুরু হবে।

২) সারা ভারত লীগ কাউন্সিল ব্রিটিশ এবং কংগ্রেস উভয়কেই শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

৩) মৌলানা আক্রম খান এবং ওসমান সাহেব মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দায়িত্ব স্মরণ করে দিয়েছিলেন।

৪) পরহিতব্রতী নাজিবুদ্দিন সাহেব বারংবার ঘোষণা করেছেন, মুসলিমরা অহিংসতার প্রতি অঙ্গীকার বদ্ধ নয়।

৫। সাহসী সুরাবর্দি ঘোষণা করেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের সঙ্গে একতরফা বোঝাপড়া করলে তিনি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ অবজ্ঞা করবেন এবং বাংলাকে স্বাধীন ঘোষণা করবেন।

৬। সারা ভারত লীগ কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ ছিল ১৬মে ক্যাবিনেট মিশনের বিজ্ঞপ্তি মেনে নিতে কংগ্রেসকে বাধ্য করার জন্য। এই বিজ্ঞপ্তিতে কাউকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি এবং মানুষের ভোট ছাড়াই সম্প্রদায়ভিত্তিক আসন বিভাজন নীতিকে মেনে নেওয়া। (এই অবস্থায় সদস্য তাঁর নির্ধারিত সময়সীমা পৌঁছান)

মহাশয়, আমি আর কয়েক মিনিট পেতে পারি?
উপাধ্যক্ষ:...
শ্রী জ্যোতি বসু : মহাশয়, মাননীয় অধ্যক্ষ আমাকে দশ মিনিট সময় বরাদ্দ করেছিলেন। আপনি কি অনুগ্রহ করে আমাকে দুমিনিট সময় দিতে পারেন ?

উপাধ্যক্ষ :...
শ্রী জ্যোতি বসু : আমি আর দুমিনিট সময় চাই। এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে স্যার, যে মুসলিমদের একাংশ তাঁদের নেতাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের হাতে কলমে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং এরই পরিণতিতে এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। এর দ্বারা ব্রিটিশ আমাদের উপর নতুন করে শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে একমাত্র ব্রিটিশ সম্পত্তি সুরক্ষিত হয় এবং হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরকে শঙ্কা ও অবিশ্বাস নিয়ে দেখবে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন সংগঠিত করার বদলে কংগ্রেস ব্রিটিশ পরিকল্পনাকেই গ্রহণ করেছে। এবং এটা জেনেবুঝেই যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ভারত ত্যাগ করছে না, রাজন্যবর্গের নিয়ন্ত্রণকারী আধিপত্য থাকছে এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা ব্রিটিশের হাতেই রয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই ব্রিটিশ পরিকল্পনায় কংগ্রেস মুসলিম লীগের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে এবং কংগ্রেসকে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এই কারণেই মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ’ কংগ্রেসের কাছে ভীতিকর হয়ে উঠেছিল এবং একটি সফল হরতাল তাদের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। সুতরাং ১৫ আগস্ট দেশপ্রিয় পার্কের জনসভায় ১৬ আগস্টের বিরুদ্ধে আবেগ সঞ্চারিত করা হয়েছিল।

এমনকি, এখনও সমস্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা বলছি যে, ব্রিটিশ সেনা আমাদের শান্তি দিতে পারে না; কার্ফিউ ঘোষণা, ১৪৪ ধারা জারি এবং নাগরিক স্বাধীনতা অপহরণ কখনোই ভ্রাতৃপ্রতিম আস্থা এবং সহানুভূতির জন্ম দেয় না। ভাইসরয়ের কাছে এই মন্ত্রীসভার অপসারণ চেয়ে আবেদন-নিবেদনে ফল হবে না। সরকার ফেলে দেবার চেষ্টাও আমাদের সমস্যার সমাধান করবে না। কারণ মানুষ প্রশ্ন করবেন ‘এরপরে কি’কেন্দ্রে কোয়ালিশন ছাড়া বাংলায় কোয়ালিশন সম্ভব নয়, লীগের এই যুক্তি অর্থহীন। তাদের অনুধাবন করতে হবে, একদলীয় সরকারের আমলে দেশবাসী কী দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিলেন। একমাত্র দেশপ্রেমের উদ্দীপনা থেকে রাজনৈতিক দলগুলি একযোগে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে বাংলাকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করতে পারে। আমি উল্লেখ করেছি, ইউরোপীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই সরকারের কর্মসূচি হবে প্রগতিশীল আইন। বাঁচার মতো মজুরি, ইউনিয়নের সুরক্ষা, জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, পাটের ন্যায্য ন্যূনতম মূল্য, সকলের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও বস্ত্র, সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং অবশিষ্ট রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিদান।

আমরা সেই কারণে অনাস্থা প্রস্তাবের এই বিতর্কে কোনো পক্ষেই ভোট দেব না কারণ এটা কেবলমাত্র ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে ঘৃতাহুতি দেবে। আমরা হিন্দু, মুসলমান সকল সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সকল শক্তি সংগঠিত করতে আবেদন করছি। যাতে তারা বারংবার না পারস্পরিক খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েন। এতে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ভেঙে যায়, মজুরি বৃদ্ধির এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতির লড়াই ভেঙে পড়ে, আর ইউরোপীয় অশুভ শাসন শক্তিশালী হয়। রশিদ আলি দিবসনৌবিদ্রোহ, আইএনএ, বন্দীদের বিচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২৯জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটের উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত মানুষ, সংঘবদ্ধ মানুষই নেতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে বাধ্য করবেন। মানবতার বিভিন্ন আদর্শ অগ্রসর হবে শান্তি এবং স্বাধীনতার পথে। এই মুহূর্ত, তারা বলুন, ‘কখনোই আমরা আর ভাইয়ের বিরুদ্ধে উদ্যত হবো না; কখনোই আমরা আর তাদের বরদাস্ত করব না, যারা হিন্দু ও মুসলিম পার্থক্যের ভিত্তিতে কথা বলে এবং আমাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়।’
.........................................................................................................................
ফুটনোট: (১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দিবস’পালনের ডাক দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ, দাবি ছিল পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন। সেদিন থেকে পরপর অন্তত তিনদিন কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল জঘন্যতম ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। ১৯৪৫-এর নভেম্বরে আইএনএ বন্দীদের দাবিতে উত্তাল কলকাতা, ১৯৪৬-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি আইএনএ দিবস পালন উপলক্ষে মহানগরী, নৌবিদ্রোহের সেনানীদের প্রতি হিন্দু-মুসলিম মিলিত সংহতির সাক্ষী এই শহর, ১৯৪৬-এর ২৯জুলাই অবিস্মরণীয় হরতালের সহমর্মী কলকাতা শিউরে উঠেছিল ৪৬-এর মধ্য আগস্টের রক্তস্নানে। অবিভক্ত বাংলায় তখন এইচএ সুরাবর্দির নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার। বাংলা প্রদেশের আইনসভায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। ১২ সেপ্টেম্বর বাংলা বিধানসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল কংগ্রেস। বিতর্ক চলেছিল বেশ কয়দিন। ১৯ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার জ্যোতি বসু বক্তব্য রেখেছিলেন। বসুর ভাষণের সময় সভা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উপাধ্যক্ষ তাফাজ্জল আলি। বসুর ভাষণের পর বিকেল ৫.২৫ মিনিটে সভা সেদিনের মত মুলতুবি হয়। ভাষণের শিরোনামটি যুক্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২২ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় কংগ্রেস অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে। ১৩ সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় জ্যোতি বসু রূপনারায়ণ পাল এবং রতনলাল ব্রাহ্মণ, বিধানসভায় তিন কমিউনিস্ট সদস্যের যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয় তার বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো : ‘‘আমরা, বিধানসভার কমিউনিস্ট সদস্যরা, মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করিনি। আমাদের যুক্তিগুলি খুবই সহজ সরল। একদলীয় মন্ত্রিত্ব হচ্ছে গৃহযুদ্ধের স্থায়ী প্ররোচনা কিন্তু এই মন্ত্রিত্ব অপসারিত করাও ঠিক একই ব্যাপার। এই পরিস্থিতিতে বাঁচার একমাত্র উপায় সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা এবং একে অপরকে দোষারোপ করে তা সম্ভব নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি অভিন্ন কর্মসূচীতে উপনীত হবার জন্য অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান যা বাংলাকে বাঁচাবে। কলকাতা সম্প্রতি পারস্পরিক হত্যার নজিরবিহীন তান্ডবের মধ্য দিয়ে গেছে। এবং প্রদেশের সর্বত্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রবল। রাস্তাঘাট সৈন্যবাহিনীর হাতে তুলে দিলে ঝগড়া বিবাদ চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমরা জমিউনিস্টরা কখনোই ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করি না বরং অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের একত্রিত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করি।

লীগ নেতাদের কেউ কেউ মনে হয়, ভাবছেন যেহেতু কংগ্রেস অন্যান্য প্রদেশে একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেছে, বাংলাতেও একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করার অধিকার তাদের রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্দ্যেশ্যে কংগ্রেস সভাপতির সঙ্গে লীগ নেতাদের বৈঠক সম্পর্কে লীগ সমর্থক একটি দৈনিক বিরক্তি প্রকাশ করেছে।

আমরা আশা করি, বাংলা-কংগ্রেসের যেমন, ঠিক তেমনই বাংলা-লীগের প্রধান অংশ বাংলা প্রদেশে সম্মিলিত মন্ত্রিসভা গঠনের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই তাঁরা গত দুর্ভিক্ষের সময়ে একদলীয় লীগ মন্ত্রিসভা গঠনে অক্ষমতার কথা ভুলতে পারেন না। আজ যদি তাঁরা মন্ত্রিসভার দুটি আসন অথবা মন্ত্রকের বিতরণ নিয়ে দর কষাকষি করেন এবং তা লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুসলমানদের দ্বিতীয় দুর্ভিক্ষের কবলে ফেলে দেয়, যদি তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী আমলাতন্ত্র এবং কায়েমী স্বার্থের বিপক্ষে রুখে দাঁড়াতে পারে এমন শক্তিশালী মন্ত্রিসভা গঠন করতে অস্বীকার করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের বাংলা, হিন্দু ও মুসলমানদের বাংলা, তাঁদের ক্ষমা করবে না।

আমরা বিশ্বাস করি যে বাংলায় কংগ্রেস লীগ কোয়ালিশনের ভিত্তি ডঃ কুমুদ শঙ্কর রায়ের বিবৃতি মতো হতে পারে। কংগ্রেস নেতা, শ্রী কিরণশঙ্কর রায় এবং লীগ নেতা শাহেদ সূরাবর্দি সাম্প্রতিক বিবৃতিতে যে সকল বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলি সহজেই দলগুলির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ন আলোচনার মাধ্যমে মিটে যেতে পারে। পার্টি যে-কোনো রকম গঠনমূলক কার্যে, এবং সাম্রাজ্যবাদী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে - কোনো ধরনের সংগ্রামে, জমিদারদের বিরুদ্ধে, কায়েমী স্বার্থান্বেষী এবং মুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে এবং কোনো ধরনের বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, বিধানসভার ভিতরে এবং বাইরে কমিউনিস্ট পার্টি তাঁদের পূর্ন সমর্থনের আশ্বাস দিচ্ছে।’’)

20171226

৬ই ডিসেম্বর — অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে

সূর্য মিশ্র

আজ থেকে ২৫ বছর আগে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল সঙ্ঘ পরিবারের করসেবকরা।  ওই দিনটি ভারতের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক দিন। আজকের ভারতে সেই সাম্প্রদায়িক ও দক্ষিণপন্থী শক্তি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই বিপদকে প্রতিহত করতে পারে গণসংগ্রাম ও গণপ্রতিরোধ। সেজন্য প্রস্তুত হতে হবে সংগঠনকে । সে কথাই লিখেছেন লেখক।

এবারের ৬ই ডিসেম্বর কালাদিবসের তাৎপর্য অন্যান্যবারের তুলনায় অ‍‌নেকখানি আলাদা। ২৫ বছর ও ভারতের সংবিধান প্রণেতা বাবাসাহেব আম্বেদকারের মৃত্যুবার্ষিকী ছাড়াও যেটা মনে রাখা দরকার যে নানাবিচারে এবছর, ৬ই ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপট ও পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের একটা অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। তামাম দুনিয়ার পটভূমিটাই দ্রুত বদলাচ্ছে।

হোয়াইট হাউসে এর আগে ট্রাম্পের মতো একজন রাষ্ট্রপতি এই প্রথম। ঠিক যেমন ভারতে মোদীর মতো একজন প্রধানমন্ত্রী বা উত্তর প্রদেশে যোগীর মতো মুখ্যমন্ত্রী। এরা সবাই কার্যত ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ট্রাম্পের ঘোষণা আমেরিকা কেবল শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের জন্য। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী মুখে যাই বলুন না কেন ব্রেক্সিটের মূল কথা হলো ব্রিটেন কেবল ব্রিটিশদের জন্য। মোদীর ভারত মানে হিন্দুস্থান কেবল হিন্দুদের জন্য। ইউরোপের সাংসদদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখন নিজ নিজ দেশের উগ্রদক্ষিণপন্থী ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করেন। ‘মান্থলি রিভিউ’ পত্রিকার সম্পাদকীয় (১লা জুন, ২০১৭) রচনায় জন বেলামি ফস্টার যে নামে ডাকা হোক না কেন সাধারণভাবে এদের সকলের আর্থ-সামাজিক গণভিত্তি, রাজনীতি এবং বংশপঞ্জির অনুসন্ধান করেছেন। দেখা যাচ্ছে যে উগ্র ফ্যাসিবাদী ইতালীয় দার্শনিক জুলিয়াস ই‍‌ভোলা (Julius Evola) (১৮৯৮-১৯৭৪) মুসোলিনিকে জাতি, জাতিবাদ ও তাঁর মতবাদের পক্ষে প্রভাবিত করতে সক্ষম হন। তিনি কেবল দর্শন নয়, রাজনীতি, অর্থনীতি-আধাসামরিক দলীয় সংগঠন এমন কি সামরিক বিষয়েও মুসোলিনির পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করতে করতে জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের সময় নাৎসিবাদকেই ইতালির তুলনায় উন্নততর ফ্যাসিবাদ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে মুসোলিনির পতনের সময় তিনি বার্লিনে হিটলারের জেনারেল হেড কোয়ার্টারেই অবস্থান কর‍‌ছিলেন। যুদ্ধোত্তর পর্বে তিনিই ইউরোপ থেকে আমেরিকার সমস্ত নয়া ফ্যাসিবাদীদের ‘আধ্যাত্মিক জনক’ (স্পিরিচুয়াল ফাদার) হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে‍‌ছিলেন। ইভোলার রচনাবলি ও জীবনীকারদের বিবরণ এই প্রবন্ধের আ‍‌লোচ্য বিষ‌য় নয়। এককথায় তিনি ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের কারণগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুলত্রুটিমুক্ত বিশুদ্ধ ফ্যাসিবাদের দিশারি বলে তাঁর অনুগামীদের কাছে স্বীকৃতি পেয়েছেন। অধুনা পরিত্যক্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান উপদেষ্টা স্টিভ ব্যানন তথা আমেরিকার ফ্যাসিবাদের নবতম সংস্করণ ‘অলট-রাইট’ অর্থাৎ বিকল্প দক্ষিণপন্থীদের ইভোলার উত্তরসূরি বলা যায়। এই ধারাবিবরণীর সঙ্গে মোদী বা মোহন ভাগবতের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এঁদের পূর্বসূরি মু‍‌ঞ্জে যখন মু‍সোলিনির ইতালিতে ফ্যাসিবাদের পাঠ নিতে গি‍‌য়েছিলেন তখন তাঁদের গুরুর গুরুদেব ইভোলারের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল কিনা সেটা গবেষণার বিষয়বস্তু হতে পারে। ৬ই ডিসেম্বরের ২৫ বছরে যা প্রাসঙ্গিক তা হলো বিশ্বব্যাপী বর্তমান (২০০৮-১৭) দীর্ঘ সময় জুড়েমন্দার প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের অধুনা প্রজন্মের উত্থান যা প্রায় নয় দশক আগের মহামন্দা কবলিত ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উদ্ভবের ঘটনা‍কে মনে করিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বিশ্বায়ন নয়া উদারবাদী অর্থনীতিজনিত সংকট, বৈষম্য ও বেকারির বিপুল বৃদ্ধি, ধান্দার ধনতন্ত্রর অবাধ লুটতরাজ ও ক্রমবর্ধমান জনরোষকে উগ্র দক্ষিণপন্থা বিভাজনের রাজনীতিকে ব্যবহার করে বিপথে পরিচালিত করতে মরিয়া হয়ে পড়েছে।

কর্ণাটকের উদুপিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আয়োজিত ধর্ম সম্মেলনের মঞ্চ থেকে মোহন ভাগবতের ঘোষণা আসলে দেশজোড়া সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও সংঘাতকে তীব্রতর করার মরিয়া আর্তনাদ। এবছর ৬ই ডিসেম্বরের প্রেক্ষাপটে এটাই হলো নবতম সংযোজন। আসলে গুজরাট ও তার পরবর্তী রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনগুলিতে যে কোনও মূল্যে ওঁদের সোনার হরিণ চাই। অযোধ্যার বিতর্কিত জমিতেই রামমন্দির চাই। যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল তার পুরোটাই চাই। সেখানে অন্য কোনও কাঠামো না-থাকা চাই। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলেও কুছ পরোয়া নেই। রায়ের জন্য অপেক্ষা করা তো দূরের কথা শুনানি শুরু হওয়ার পূর্বেই চাপ সৃষ্টির অসদুদ্দেশ্যে মন্দির নির্মাণের সময়সূচি ঘোষিত হয়েছে। শেষপর্যন্ত কবে কি হয়, হ‍‌বে তা নিয়ে আশঙ্কার কারণ রয়েছে। ৫ বছরে বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রত্যক্ষ মদতদাতাদের গুজরাট গণহত্যার নায়কদের কারুর কোনও সাজা হয়নি। গোরক্ষকবাহিনী, অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াড, লাভ জিহাদের অভিযোগ তুলে স্বনিযুক্ত খাপ পঞ্চায়েতসহ সঙ্ঘ পরিবারের নানান নামে বিভিন্ন অবতারের নিজস্ব ঘাতকবাহিনী মৃত্যুদণ্ডের রায় দিচ্ছে ও তা কার্যকর করছে। গৌরী লঙ্কেশ হত্যাকাণ্ড যে নরেন্দ্র দাভোলকার বা গোবিন্দ পানসারের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার পুনর্নির্মাণ মাত্র। কেবল সংখ্যালঘু নয় দলিত, আদিবাসী, অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মানুষ, নারী, শিশু এদের রামরাজত্বে কারুর রেহাই নেই। দেশের সংবিধান, আইনকানুন, বিচারব্যবস্থা, সংসদ, সংবাদমাধ্যম ইত্যাদি কোনও কিছু পরোয়া করার দরকার নেই। রাজ্যসভায় প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোটাই পাল‍‌টে ফেলার অভিযান শুরু হয়েছে। এসব নিছক একনায়কতন্ত্র নয়। কোনও সন্দেহ নেই যে এটা ধান্দার ধনতন্ত্রের বর্তমান পর্বে—লগ্নিপুঁজির সর্বাধিক প্রতিক্রিয়াশীল অংশের সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের পথে যাত্রার সূচনা মাত্র। এই একনায়কত্ব আমাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সব চাইতে নির্ভরযোগ্য মিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। এদের হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সর্বাপেক্ষা উগ্র জাতীয়তাবাদী অবস্থানের পরিপূরক।

এসবের অর্থ এই নয় যে ভারতে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম হয়ে গেছে। একটি ফ্যাসিবাদী দলও এককভাবে কেন্দ্রে যদি সরকার গঠন করে তাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যন্তরে তাদের পরিকল্পিত অনুপ্রবেশ বৃদ্ধি পাবে যেমনটা এখন হচ্ছে। কিন্তু সেটাই ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগঠনের জন্য যথেষ্ট নয়। ভারতে চিরায়ত অর্থে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব যদি তা কোনও সাম্রাজ্যবাদী দেশের ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সামরিক জোটের শরিক না হয়। এসব তাত্ত্বিক বিতর্কের চাইতে নির্দিষ্ট দেশে নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার উপাদানগুলির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণের গুরুত্ব বেশি। যে সব দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছিল, যেমন ইতালি ও জার্মানিতে, তাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের রূপ এক ও অভিন্ন ছিল না। তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হলো ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিকাশের প্রথম লক্ষণগুলি প্রকাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার গতিরোধ করতে ব্যাপকতম প্রতিরোধের মঞ্চ গড়ে তোলা। কবে ফ্যাসিবাদ পূর্ণাঙ্গ রূপে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হবে তার অপেক্ষায় দিবানিদ্রার বিলাসিতার অর্থ হলো ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করে দেওয়া। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিপদ এখনই দরজায় কড়া নাড়ছে। ভারতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যা আমাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান বা বাংলাদেশের চাইতে বেশি। সঙ্ঘ পরিবার ও কেন্দ্রীয় শাসকদলের কল্যাণে আমাদের দেশসহ প্রতিবেশী দুই দেশে আই এস আই এস এবং অন্যান্য মুসলিম সন্ত্রাসবাদী শক্তিগুলির ভিত্তি প্রসারিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ, সংঘাত, দাঙ্গার প্রতিটি ঘটনা এদেশে হিন্দুরাষ্ট্রের ধ্বজাধারীদের শক্তি জোগাবে। বাম, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলি দুদিক থেকে আক্রান্ত হবে। জাতি, ধর্ম, ভাষার ভিত্তিতে পরস্পরের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত জনগণের জীবন-জীবিকার সংগ্রামে যে জোয়ার সৃষ্টির সম্ভাবনাময় পরিস্থিতি কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির আর্থিক নীতি ও দুর্নীতির ফলে সৃষ্টি হয়েছে সেগুলি পর্দার আড়ালে চলে যাবে। সেগুলি দমনপীড়নের জন্য রাষ্ট্রীয় শক্তির প্রয়োজন হবে না। তখন নোট বাতিল, জি এস টি, খাদ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি ইত্যাদি ইস্যুগুলিকে চাপা দেওয়ার জন্যই ধান্দার ধনতন্ত্রের উপাসকদের রামমন্দির নির্মাণের এই বেপরোয়া তোড়জোড়। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে যুদ্ধোন্মাদনা সৃষ্টি ষোলকলা পূর্ণ করবে।

সারা দে‍‌শে এখন যা ঘটছে তার বাংলা সংস্করণের প্রকাশ ২০১১ সালে। সিঙ্গুরে ‘অনিচ্ছুক’ কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ার বিল দিয়ে প্রস্তাবনা — যে জমিতে এখন যে কেউ সরষে ফুল দেখতে পারেন। শিল্পে খরা, কৃষকের আত্মহত্যা, বেকারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি, টেট থেকে চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি। সর্বোপরি স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসের রাজত্বে হামলা, মিথ্যা মামলা, ধর্ষণ, খুন, নির্বাচনে প্রহসন দৈনন্দিন বিষয় হয়ে দাঁড়ালো। এসবের মধ্যে সঙ্ঘের শাখা ও কর্মতৎপরতা নিরাপদ আশ্রয়ে বিস্তার লাভ করছিল। সীমান্তের ওপার থেকে সন্ত্রাসবাদীরা খাগড়াগড়ে শাসকদলের অফিসের ওপরতলায় ঠাঁই পেল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদী দিল্লির লাড্ডু নিয়ে এলেন মুখ্যমন্ত্রীর জন্য। প্রতিদানে বি জে পি রাজ্যে আবার ২টি আসন পেল। মুখ্যমন্ত্রী আদাজল খেয়ে নামলেন বি জে পি-কে প্রধান বিরোধীদলের জায়গা করে দিতে। শুরু হলো প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার গড়াপেটা ম্যাচ। ধুলাগড়ে শাসকদলের এক হিন্দু বিধায়ক অপরদিকে এক মুসলমান বিধায়ক টস করে মাঠ ভাগ করে নিলেন। শাসকদলের দুই বিধায়কের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে দুই বামপন্থী সাংসদ সীতারাম ইয়েচুরি ও মহম্মদ সেলিমের শান্তি মিছিল আটকানো হলো। এরকম অনেক ধুলাগড়, নোয়াপাড়া, বসিরহাট, চোপড়া, ধূপগুড়ির উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। তাই জ্যোতি বসু যাদের অসভ্য বর্বর বলেছিলেন, সেই বি জে পি মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায় তাঁদের ‘স্বাভাবিক মিত্র’ — আগেও ছিল, এখনো আছে। ট্রাম্প, মোদী বা ইনি যে অদৃশ্য সূত্রে সাতপাকে বাঁধা তার পোশাকি নাম ধান্দার ধনতন্ত্র বা ক্রনি ক্যাপিটালিজম। এঁদের সবার স্বামী-স্ত্রী, মেয়ে-জামাই, পুত্র-পুত্রবধূ, ভাই-ভাইপোরা সেই অর্থে একই পরিবারভুক্ত। কেউ বড় শরিক, কেউ মেজো আবার কেউ বা নিতান্তই ছোট শরিক মাত্র। তাই হাস্যকর হলেও এটাই সত্য যে ট্রাম্প যেমন ক্রনি ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে প্রকা‍‌শ্যে যুদ্ধ ঘোষণা করেন বা মোদী যেমন কালো টাকা উদ্ধারের জন্য চোখ ছলছল করে ফেলেন ইনি তখন রাজ্যে বুথপিছু গড়ে ১০৫ জনের কাজ দিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করতে পারেন। প্রতি ঘণ্টায় ১৫৪জন কাজ পেয়েছেন! পাহা‍‌ড়, জঙ্গলমহল, সুন্দরবন, ডুয়ার্স — সবাই হাসছে তো হাসছেই। এমন কি যাদবপুর, বেহালার পৈশাচিক লালসার শিকার শিশুকন্যার পরিবার, স্বাস্থ্যভবনে বিক্ষোভরত কর্মচারীর মৃতদেহ, ডেঙ্গুতে মৃত বা আত্মঘাতী কৃষকের পরিবার, বন্ধ চা বাগান ও কলকারখানার শ্রমিক কাঁদলেও রাজ্যজুড়ে অট্টহাসির কলরোলের তা এত তুচ্ছাতিতুচ্ছ যে সব চাপা পড়ে যাচ্ছে। হাসাহাসির তালিকা এত দীর্ঘ যে তার স্থান সংকুলান করা এই পরিসরে অসম্ভব। গোয়েবলসীয় প্রচার এখন ‘উত্তর সত্য’ নাম ধারণ করেছে। সংকট জর্জরিত জনগণের সামনে ইন্দ্রজালের কায়দায় সবরকম প্রচারমাধ্যম ব্যবহার করে মিথ্যার মোহজাল নির্মাণের প্রতিযোগিতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা।

কেবল এসবের সাতকাহন নিয়ে এবারের ৬ই ডিসেম্বর নয়। এবার ৬ই ডিসেম্বর এসবের বিকল্প নির্মাণের শপথ নেওয়ার দিন। উত্তর সত্যের বিপরীত নির্মাণ। সত্য হলো মার্কিন মুলুকে ট্রাম্পের চাইতে জনসমর্থনের ঢল বার্নি স্যান্ডারস-এর দিকে যিনি সমাজতান্ত্রিক বিকল্পের কথা বলেন। তিনি প্রার্থী হলে ট্রাম্প হয়তো পরাস্ত হতেন। ব্রিটেনে বিরাট জয়ের লক্ষ্য নিয়ে থেরেসা মে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ডাক দিলেন। তাঁর শক্তি ক্ষয় হলো। শক্তি বাড়লো করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টির যিনি টনি ব্লেয়ারের নয়া উদারবাদী নীতির বিরোধী। ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বামপন্থীদের সমর্থনে লি পেঁ-কে আটকে দেওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের দ্বন্দ্ব যা এতদিন স্তিমিত ছিল তাতে এখন চিড় ধরেছে। ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া, ইকুয়েডরে বামপন্থীদের জয় জয়াকার। লড়াইয়ের সামনের সারিতে কিউবা। আছে বলিভিয়া, ব্রাজিল। স্পেন, গ্রিস, সাইপ্রাসে বামপন্থীরা এগচ্ছে। আমাদের দেশের রাজধানীতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট কার্যত প্রথমে শ্রমিক ও পরে কৃষকরা, সবমিলে ৫দিন দখল নিয়েছিল। রাজ্যে নবান্ন অভিযান বি পি এম ও-র পদযাত্রা, সংগ্রামের নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছে। কলকাতা এখন প্রায়শ শ্রমিক, উদ্বাস্তু, আদিবাসী, সামাজিক ন্যায়মঞ্চ লোকশিল্পী, যুব, প্রতিবন্ধী কোনও না কোনও মিছিলে কল্লোলিত হচ্ছে। কিন্তু সামনে অগ্নিপরীক্ষা। ‘তৃণমূল হঠাও বাংলা বাঁচাও, বি জে পি হঠাও দেশ বাঁচাও’ এই আহবান এখন আরও প্রাসঙ্গিক। সংগ্রাম ও সংগঠন গণপ্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত কিনা তার পরীক্ষা দিতে হবে। এবারে ৬ই ডিসেম্বর সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শপথ দিবস।

গণশক্তি, ৬ই  ডিসেম্বর ২০১৭