Showing posts with label অশোক মিত্র. Show all posts
Showing posts with label অশোক মিত্র. Show all posts

20200909

অশোক মিত্র: অনন্য মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস

 



অজয় দাশগুপ্ত

আচমকাই সুযোগ হয়ে গিয়েছিল অশোক মিত্রের সান্নিধ্যে আসার। রাজনৈতিক জীবনের গোড়া থেকেই যাঁর বক্তৃতা ও লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত, তাঁর কাছে নিয়মিত যেতে হবে শুনেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। পয়লা মে সকালে মৃদুলদা(দে) যখন ফোনে জানালেন ওঁর মৃত্যুসংবাদ, তখন একরাশ কথা ভিড় করে এলো। শুন্যতা তো বটেই!

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি থেকে আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ‘গণশক্তি’-র রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় লেখা ওঁর বাড়ি থেকে আনার। টানা প্রায় দু’বছর আলিপুর পার্ক রোডে সোনালী অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি সপ্তাহে দু’বার করে যেতে হতো। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা! প্রথমে টেলিফোন করে ওঁর সময় নিতে হতো, তারপর যথার্থই যথাসময়ে (এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না) পৌঁছে যেতে হতো। প্রথমে উনি টানা বলে যেতেন, যার দ্রুত নোট নিতে হতো। পরের দিন সেটা কম্পোজ করে নিয়ে গেলে তার ওপর উনি কাটাছেড়া করতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘আমি প্রথমবার ভাবনাটা বলি, পরেরবার লিখি।’

গণশক্তির বানান নিয়ে ওঁর প্রশ্ন ছিল। একদিন উনি ডিকটেশন দেওয়ার সময় কোনো লেখায় ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি বলেছিলেন। আমাদের তখন সংসদ বাংলা অভিধান অনুসরণ করা হতো, সোমেনদা(পাল) আমাকে একদিন ওই অভিধান দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে’ অশুদ্ধ প্রয়োগ, ওটা ‘ইতোমধ্যে’ হবে। আমিও তাই সেই অনুসারে ‘ইতোমধ্যে’-ই লিখেছিলাম। উনি লেখাটার কম্পোজ প্রুফ দেখার সময় আমাকে বললেন, ‘তোমরা ইতিমধ্যে-কে ইতোমধ্যে লেখো কেন?’ আমি ‘সংসদ বাংলা অভিধান’-এর কথা বলতে উনি বললেন, ‘তোমাদের প্রুফ কি বাংলা ভাষার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকরা দেখেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইতিমধ্যে’ ব্যবহার করেছেন, সেটাও তাঁরা মানবেন না?’ ওঁর নোট নিতে গিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি তো বটেই, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগ নিয়েও অনেককিছু শিখতে পেরেছিলাম বলে ধন্য হয়েছি। একই শব্দ একই লেখায় দু’রকম প্রয়োগ করা নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে ওঁর সহাস্য মন্তব্য, ‘আমি দুটোই লিখি, একটা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আরেকটা লিখি।’

ওঁর বিশাল লাইব্রেরি কাম ড্রয়িং রুমে বসে জ্ঞানভান্ডারের বহরে নিজেকে কার্যত হারিয়ে ফেলতাম। মাঝেমাঝে টুকরো-টাক্‌রা কথাবার্তা হতো। আমার বাড়ি গড়িয়াতে জেনে বলেছিলেন, ‘ওখানে উজ্জ্বল (চ্যাটার্জি) আছে, খুবই উদ্যমী ছেলে।’

‘আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট’ বলে যিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তিনি কিন্তু ব্যক্তিগত আচারে অত্যন্ত সুভদ্র ছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি অনেকের কাছেই। প্রত্যেক অতিথিকে উনি লিফটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, নগণ্য হলেও আমার ক্ষেত্রে কোনোদিন তার অন্যথা হয়নি। আপাতকঠিন, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পিছনে যে একজন স্নেহশীল পিতার মনন লুকিয়ে আছে, সেটা একটা ঘটনায় টের পেয়েছিলাম। গণশক্তি থেকে ২৩০নং বাসে চেপে শেষ স্টপেজ চিড়িয়াখানায় নেমে হেঁটেই চলে যেতাম আলিপুর পার্ক রোডে। ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে একদিন রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। রাস্তা খোঁড়া হচ্ছিল, চারদিকে ইটের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ছিল। ব্যস্‌, হাত-পা ছড়ে গেলো, রক্ত বের হচ্ছিলো। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমি কোনমতে ধুলে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। বেল টিপতে দু’মিনিট দেরি হয়ে গেছিল, দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছিলাম। ‘আজ একটু দেরি হয়ে গেলো’ বলতে বলতেই উনি আমার হাত লক্ষ্য করে বললেন, ‘কী হয়েছে, ছড়ে গেছে মনে হচ্ছে!’ আমি বললাম, ‘ও কিছু না, পড়ে গিয়ে একটু লেগেছে।’ উনি আমাকে ঘরে বসিয়ে সোজা ভেতরে চলে গেলেন। তারপর একটা ক্রিম(সম্ভবত ‘ভোলিনি’ জাতীয় কিছু একটা হবে) নিয়ে এসে নিজে লাগিয়ে দিতে লাগলেন, হাতে-পায়ে। আমি তো সঙ্কোচে ‘না, না’ করতে লাগলাম। কিন্তু কার্যত ধমকে আমাকে বললেন, ‘তুমি চুপ করে বসো, নিজে নিজে মলম লাগানো যায় না।’ তারপর আমি সেদিন লিখতে পারবো কিনা, অন্যদিন আসবো কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘কিছুই তো হয়নি, আমি পারবো, আপনি বলুন।’ সেদিন লেখা শেষ করে ফেরার সময় উনি মলমের টিউবটা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও। পরে আরেকবার লাগিয়ে নেবে।’ ওঁর এই স্নেহশীল ভূমিকা দেখে আমি রীতিমত অভিভূত হয়েছিলাম সেদিন। 

ওই সময়েই আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ‘গণশক্তি’-র নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। তারিখটা ১৯৯৭সালের ২রা জানুয়ারি। আমি তখন নিয়মিত ওঁর বাড়িতে যাচ্ছি। পরে আমাকে কথায় কথায় কয়েকবার বলেছিলেন, ‘তোমাদের নতুন দপ্তরে আমার যাওয়া হয়নি।’ আমি বলেছিলাম, ‘চলুন না একদিন।’ কিছুদিন বাদে উনি আমাকে একদিন বললেন, ‘তোমাদের দপ্তরের কাছেই যাচ্ছি, এনআরএস আকাদেমি হলে একটা কর্মসূচী আছে।’ আমি ওঁকে সেদিন এনআরএস আকাদেমি হল থেকে নিয়ে এসেছিলাম গণশক্তি দপ্তরে। প্রয়াত কমরেড দীপেন ঘোষ তখন আমাদের সম্পাদক। উনি আমাদের দপ্তরের সম্পাদকীয় বিভাগ দেখে বললেন, ‘আমি নিউইয়র্ক টাইমস্‌-এর দপ্তরেও গেছি, ম্যানহাটনে। ওখানেও তোমাদের মতই ব্যবস্থা, সবাই সবাইকে দেখতে পায়। কোনো ঘেরাটোপ নেই।’ 

ওঁর রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় পড়ার জন্য বহু মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকতেন। গণশক্তি-র রবিবারের প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে সেটাও একটা কারণ ছিল বলে মনে হয়। পরে ওঁর রবিবারের সেই লেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য কর্মসূচীতে যখনই দেখা হয়েছে, ডেকে কথা বলেছেন। আমায় বলতেন, ‘তোমরা সাংবাদিকরা সঙ্গে একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘোরোনা কেন? কোনো ঘটনা ঘটলে তুমি নিজেই তার ছবি তুলে নিতে পারবে, চিত্রসাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।’

অনেকেই মার্কসবাদ ও রবীন্দ্রনাথকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখতে বা দেখাতে চান। অশোক মিত্র’র বিভিন্ন লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির কথা বারেবারে উঠে এসেছে। তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ ‘আপিলা চাপিলা’-য় একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন: ‘‘এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে দুটি আলাদা চরিতার্থবোধ: এক রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমার জন্ম; দুই, আমার চেতনাজুড়ে মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস।’’ যারা এই পরস্পরবিরোধিতাকে উপজীব্য করে থাকেন, অশোক মিত্র যেন তাদের উদ্দেশ্যেই নিজের এবিষয়ে উপলব্ধির কথা লিখেছেন: ‘‘...নিজেকে মার্কসবাদী বলে গর্বিত প্রচার করি, মার্কসীয় বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজের জিজ্ঞাসা-বিবর্তন বিশ্লেষণে নিমগ্ন হই, মার্কসীয় ধারণার প্রেক্ষিতে অর্থশাস্ত্রের গহনে শ্রেণীদ্বন্দ্বের অন্বেষণ করি। অথচ সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার অভিভূত গরিমাবোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় জন্মগ্রহণ করেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি, তাঁর কবিতায় গানে প্রতিনিয়ত অবগাহিত হয়ে অধরার সন্ধান পাই, আমার চেতনা জুড়ে, মার্কসের পাশাপাশি সব সময়ই রবীন্দ্রনাথের আনন্দনিষ্যন্দিত উপস্থিতি।....আমরা হাসি, কাঁদি, গল্পগুজব করি, কেচ্ছা ছড়াই, গানে গুনগুনিয়ে উঠি, কলহে প্রবৃত্ত হই, সব-কিছুরই প্রকাশের পথ বাতলে দেয় রবীন্দ্রনাথ দ্বারা নির্মিত-চর্চিত, রূপমন্ডিত বাংলা ভাষা। ভাষার দার্ঢ্য এবং সেই সঙ্গে বিস্তার না থাকলে চিন্তা এলিয়ে পড়ে, যুক্তির সারণি বেপথুমান হয়, ভাবনাকে সংহত রূপ দিতে আমরা অসমর্থ হই। রবীন্দ্রনাথ-দত্ত ভাষার ভেলায় ভেসেই আমরা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞানের স্তরের পর স্তর অতিক্রম করতে সমর্থ হই। হাটে-মাঠে-ঘাটে যখন মার্কসবাদী হিসেবে নিজের বিশ্বাসের কথা অন্যদের শোনাতে যাই, তখনো তো আমার প্রধান অবলম্বন আমার মাতৃভাষা, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষা, রবীন্দ্রনাথ যা ভূষণে-রতনে আমাদের জন্য রচনা করে দিয়েছেন, অথচ ভূষণরত্নের ভারে প্রসাদগুণ বিমূঢ় হয়নি।...’’

কয়েক বছর আগে ‘আমার মৃত্যুর পর’ নিবন্ধেও তিনি লিখে গেছেন: "...যে-বয়সে পৌঁছেছি, মৃত্যুচিন্তা এড়ানো অসম্ভব, এবং সেজন্যই ইচ্ছাপত্র গোছের কিছু বাসনার কথা ব‍্যক্ত করছি। ধরে নিচ্ছি আমার মৃত্যুকালে তখনো কয়েকজন বন্ধু অবশিষ্ট থাকবেন। উদ্ধত সাহসের সঙ্গে আরো ধরে নিচ্ছি, তাঁরা হয়তো আমার জন্য একটি ক্ষুদ্রায়তন স্মরণসভার আয়োজন করবেন। সেই সভায়, আমার বিনীত অনুরোধ, স্মৃতিচারণ ধাঁচের বক্তৃতাদি একেবারে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান, একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই কিছু গান যেন গাওয়া হয়।..." (নিবন্ধ সংকলন: ‘‘সমাজ, স্মৃতি, সাহিত্য’’)।

*************

‘একুশ শতক’, জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত

20200825

বাজার যখন সুবোধ রায়কে খুঁজে পেল

 


অশোক মিত্র

প্রচারবিমুখ মানুষটি পার্টি-অফিসের এক কোণে বসে নীরবে কাজ করে গিয়েছেন সারা জীবন। তাঁকেই নায়ক বানিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রে সেই সুবোধ রায়কে খোঁজার চেষ্টা অনর্থক।

......................................................... 


কী আর করা, এত এত বছর ধরে জড়ো হওয়া স্তূপ, স্মৃতিপটের কোনাঘুপচিতে হয়তো কয়েক হাজার কবিতার পঙক্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, হঠাৎ-হঠাৎ একটি-দু’টি আচমকা মাথা ঝাঁকুনি দেয়কবে কোথায় কোনও কলেজ ম্যাগাজিনে কী বা নগণ্যতর এক পুস্তিকায় এই কাব্যপ্রয়াস চোখে পড়েছিল, এখন আর কিছুতেই মনে আনতে পারি না: ‘অনেকটা সেই সিন্ধুবুকে গর্জনেরে ছাড়ি’। রেডিয়োতে নাটক শুনে বেজায় তারিফ তারই...’ কিংবা এরই কাছাকাছি জোড়া পঙক্তিযোজন। একটি সামাজিক মন্তব্যও যেন লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়েছিল: আসলে আমাদের অশ্রদ্ধা, অথচ নকল নিয়ে দুর্দান্ত মারামারি। কলেজ ম্যাগাজিনে পেশ করা সমাজদর্শনকে কী করে যেন সম্প্রতি একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্তিত হতে দেখলাম। 

চট্টগ্রাম বিদ্রোহের তরুণতম নায়ক সুবোধ রায়, বাড়ির সবাই ঝুঙ্কু বলে ডাকত। ১৯৩০ সাল, মাত্র চোদ্দো বছরের আদরের মাসতুতো ভাইটিকে কল্পনা দত্ত মাস্টারদার কাছে হাজির করিয়েছিলেন। কিশোরটি মুহূর্তের মধ্যে উৎসর্গীকৃত বিপ্লবী সেনানীতে রূপান্তরিত, অনেক শৌর্যের, অনেক মৃত্যুবরণের অধ্যায় পেরিয়ে বিপ্লবের প্রদীপ্ত শিখা ক্রমে স্তিমিত হয়ে এল, সুবোধ রায় ধরা পড়লেন, আন্দামানের সেলুলার কারাকক্ষে দীর্ঘ এক দশকের নির্বাসন। কারাভ্যন্তরেই যৌবনের উন্মেষ, সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে নিজেকে পুরোপুরি বিলীন করে দেওয়া। ছাব্বিশ বছর বয়সে মুক্তিলাভের পর মুহূর্তমাত্র দ্বিধা না করে কমিউনিস্ট পার্টির দফতরে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে প্রবেশ। অনবচ্ছিন্ন সাড়ে ছয় দশক ধরে সুবোধ রায় পার্টির সব সময়ের সাধারণ কর্মী-ই থেকে গিয়েছিলেন। আদর্শনিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রিত জীবন, কোনও দিন স্বার্থচিন্তা করেননি, সংসারে গুছিয়ে বসার কথা ভাবেননি, সর্বক্ষণের দলীয় কর্মী, দলীয় দফতরই দশকের পর দশক জুড়ে তাঁর আশ্রম তথা জীবনযাপনের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বরাবরের মন্ত্র: সম্ভোগ নয় সংবরণ। কর্মী থেকে নেতৃত্বে পৌঁছবার বাসনাবিহীন। সাধ্যের প্রত্যন্তে গিয়ে দলীয় সংগঠনের কাজে কর্তব্য সম্পাদনে প্রতিনিয়ত তাঁর অধ্যবসায়। শেষ বছরগুলি পর্যন্ত নিজের জামাকাপড় নিজে কেচেছেন, রোদে মেলেছেন, ইস্ত্রি করেছেন। যে ঘরে থাকতেন, নিজেই ঝাড়তেন, পুঁছতেন, জীবন নির্বাহের অতি সামান্য যে ক’টি উপকরণ, আশ্চর্য নিপুণতায় গুছিয়ে রাখতেন। নিজের জন্য ন্যূনতম রান্না সাধারণত নিজেই করতেন, অন্যথা মাঝেমধ্যে দলীয় কমিউনে আহার্যের সামান্য চাহিদা মেটানো। কৃচ্ছ্রসাধনায় দৃঢপ্রতিজ্ঞ, অন্তরঙ্গতর অনুরাগীরা কখনও-সখনও একটু-আধটু উপহারসাগ্রী তাঁকে পৌঁছে দিতেন, বিব্রত সুবোধ রায় বিপন্নতার সঙ্গে তা গ্রহণ করতেন, দু’দিন বাদে অনুরাগীদের মধ্যেই ফের বিলিয়ে দিতেন। 

মানুষটি বরাবর আত্মপ্রচারের বাইরে থেকেছেন। যাঁদের পছন্দ করতেন, তাঁদের কাছে ডেকে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের রোমাঞ্চকর বিভিন্ন কাহিনি শোনাতে ভালবাসতেন। সর্বস্তরের সকলের সঙ্গে নয়, ঈষৎ নিচুতলার দলীয় কমরেডদের সঙ্গেই তাঁর নিবিড়তর সখ্য, যাঁরা দলের গাড়ি চালান, যাঁরা ঘরে ঘরে কাগজপত্র বা চা-মুড়ি পৌঁছে দেন, যাঁরা অপেক্ষাকৃত উঁচু মহলের নেতাদের নির্দেশাদি পালন করেন, ইত্যাকার কমরেডদের নানা সমস্যা মেটাতে সুবোধ রায় অহরহ ব্যস্ত। পাশাপাশি দলীয় দফতরে অনেক খুঁটিনাটি সাংগঠনিক দায়িত্বও তাঁকে সামলাতে হয়েছে। জেলা দফতরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, বিনিময়-প্রতি-বিনিময়, কিংবা কেন্দ্রীয় দফতর বা অন্যন্য রাজ্য দফতরের সঙ্গে চিঠিপত্রের মধ্যবর্তিতায় সেতুবন্ধনের কাজ। দীর্ঘ দশকগুলি জুড়ে পার্টি অনেক ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, বিভিন্ন ঋতুতে মতাদর্শের অনেক টানাপোড়েন, অঢেল তর্ক-বিতর্ক, পঁয়ষট্টি বছর ধরে সুবোধ রায় অনেক ইতিহাস তৈরি হতে দেখেছেন। অনেক নেতার উত্থান দেখেছেন, তাঁদের প্রস্থানও পর্যবেক্ষণ করেছেন। দলের ভাবাদর্শ ও কর্মসূচির অবৈকল্য রক্ষায় তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিক দার্ঢ্য। কিন্তু কর্মী থেকে নেতাতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রবৃত্তি তাঁর কদাপি ছিল না। দলের শৃঙ্খলা থেকে কোনও দিন বিচ্যুত হননি, কিন্তু স্পষ্টবাদিতায় তাঁর জুড়ি নেই, ছোট-মাঝারি-বড় নেতাই হোন, কিবা নেতৃত্বে তখনও পৌঁছয়নি কিন্তু পৌঁছুতে আঁকুপাকু করছেন, কারও আদর্শগত বা আচরিক স্খলন তাঁর দৃষ্টিগোচর হলে সরবে সমালোচনা করেছেন। তাঁকে তাঁকে তাই ঘাঁটাতে সাহস পেতেন না অনেকেই। দলের মধ্যে ক, খ বা গ তরতর করে সোপান বেয়ে উন্নতি ও মর্যাদার বেলাভূমিতে পৌঁছে গেছেন। সুবোধ রায় একা পড়ে থেকেছেন। তাঁর হাঁটুর বয়সিরা দ্রুততার সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হয়েছেন, দলের মধ্যে কেষ্টবিষ্টু বলে বিবেচিত হয়েছেন, তাঁরা ফরমান জারি করেছেন, দলীয় অনুশাসন মেনে সুবোধ রায় সেই ফরমান মান্য করে নিজের কর্তব্য নিঃশব্দে পালন করে গেছেন। 

এমনি করেই একটা গোটা জীবন অতিবাহন। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের বীর যোদ্ধা, পার্টির অন্যতম প্রাচীন সদস্যদের এক জন। বহু বছর ধরে দলীয় ইতিহাস ধাপে-ধাপে সুশৃঙ্খল লিপিবদ্ধ করেছেন, কয়েক খণ্ডে যা প্রকাশিত হয়ে দেশে-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তা হলেও দলের এক জন নিতান্ত সাধারণ কর্মী, নতুন প্রজন্মের দলীয় সদস্যরা তাঁর পরিচয় জানেন না, তাঁদের কাছে নিতান্ত হেজিপেঁজি কে এক জন বৃদ্ধ পার্টি দফতরে ঘাড় গুঁজে কর্মরত। তাঁর কোনও দাবিদাওয়া নেই, তাই তাঁর আলাদা আদর সম্ভাষণও নেই। 

নব্বই বছর বয়স অতিক্রান্ত, অবশেষে সুবোধ রায় জড়ার শিকার হলেন। রোগগ্রস্ত অবস্থায় কলকাতাস্থ একটি সরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হল। তাঁর জন্য পাঁচতারা হাসপাতালের ব্যবস্থা করার প্রশ্ন ওঠে না, নিজেও সেটা অবশ্যই ঘোর অপছন্দ করতেন। হাসপাতালের একটি নিরাবরণ ঘরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি নির্জীব পড়ে রইলেন, তিনি তো কোনও নামী-দামি নেতা নন, তেমন কেউ দেখতেও আসেন না। দু’এক জন কাছের মানুষ যাঁরা আসেন, সামান্য চেতনা থাকলে তাঁদের চিনতে পারেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারেন না। এক সায়াহ্নে সুবোধ রায়ের জীবনদীপ নির্বাপন, গুটিকয়েক সংবাদপত্রে দায়সারা খবর ছাপা হল। অধিকাংশ পত্রিকার বিচারে তাঁর প্রয়াণ উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হল না। 

সুবোধ রায়ের মৃত্যুর পর ছ’বছর কেটে গেছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত, অপ্রয়োজনীয় কাহিনি। বিশ্বায়িত ভারতবর্ষ জোর কদমে এগিয়ে চলেছে, পুরনো দিনের পাঁচালিতে কারও উৎসাহ নেই। সময়ও নেই। সুবোধ রায় স্বভাবতই নিশ্চিন্ত বিস্মৃতির অতলে অবস্থান করছিলেন। 

এমন সময় কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পের এক বিত্তবান প্রযোজকের যেন কী খেয়াল চাপল, এক পরিচালকের সনির্বন্ধ অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি চিটাগাং বিদ্রোহ নিয়ে একটি রংচঙে রোমান্টিক ছবি তৈরি করেছেন। ছবিটির প্রধান চরিত্র তরুণ বিপ্লবী সুবোধ রায়। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে নিশ্চয়ই কয়েক শো কোটি টাকা ব্যয়িত হয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সে-মাল্টিপ্লেক্সে মহার্ঘ টিকিট কেটে ছবিটি ব্যবস্থা হয়েছে। যেহেতু ‘চিটাগাং’ চলচ্চিত্রটির প্রযুক্তিগত চতুরালি তথা অভিনয় উৎকর্ষ নিয়ে খবরের কাগজে ভাল ভাল কথা ছাপা হয়েছে, ব্যস্ত তরুণ-তরুণীকুল সময় করে ছবিটি দেখে আসছেন। যে তারকা সুবোধ রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তাঁর উপর পর্যাপ্ত প্রশংসা বর্ষিত হচ্ছেআর কিছু না হোক, একটু মুখ বদলানো তো হচ্ছে। বলিউডি নর্তন-কুন্দনে ক্ষণিক যতি দিয়ে দেশপ্রেম বোধের সঙ্গে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার উত্তেজনা।

 বেদব্রত পাইন পরিচালিত ‘চিটাগং’ ছবিতে সুবোধ রায়ের ভূমিকায় দিলজাদ হিওয়ালে।

মাল্টিপ্লেক্সের মধ্যবর্তিতায় তাঁর প্রয়াণের ছ’বছর বাদে সুবোধ রায় অতএব পুনরুজ্জীবিত হলেন। যত দিন জীবিত ছিলেন অখ্যাত হয়েই ছিলেন। খ্যাতিবিহীনতাই তাঁর পছন্দ ছিল। কিন্তু লালটলিখন এড়াবার উপায় নেই, যেহেতু কেউ কিশোরকালে বিপ্লবের পবিত্র আবেগে ভেসে গিয়ে অবিমৃশ্যকারী সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তাঁকে চলচ্চিত্র শিল্পের বধ্যভূমিতে পৌঁছতেই হবে, মৃত্যুতেও নিস্তার নেই। তথ্য-প্রযুক্তি অধ্যুষিত পৃথিবীতে সনাতন ধ্যানধারণা অবশ্য বর্জনীয়, ব্যক্তিগত রুচি-অভিরুচিও গ্রাহ্য নয়। সুবোধ রায় এখন থেকে চলচ্চিত্রশিল্পের এক নন্দিত চরিত্র, আদি সুবোধ রায়ের সঙ্গে এই বিকিকিনি-কেন্দ্রিক সুবোধ রায়ের কতটা মিল, সে প্রশ্ন অবান্তর। মুম্বই চলচ্চিত্রশিল্প যা রচনা করেছে, তা-ই সত্য। বিশ্বায়নের এটাই জাদু। কলেজ-ম্যাগাজিনে পড়াপদ্যপংক্তিদ্বয় যা বলতে চেয়েছিল, আসলকে টেক্কা মেরে নকল এগিয়ে যাবে। আসলকে আর নকল থেকে আলাদা করে চেনা যায় না, চেনার চেষ্টাও বিধেয় নয়।

আদি অগ্রাহ্য-অগ্রহণীয়, কৃত্রিমই শ্রেয় ও বরণযোগ্য, এই প্রত্যয়ের পক্ষে আঁটোসাটো যুক্তিমালা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। পৃথিবীর পরিভাষা পাল্টে গেছে। পরিবেশ ও পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ অন্য রকম। চট্টগ্রাম বিপ্লব-কাহিনি যদি হালের ছেলেমেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় করতে হয়, পরিবেশনের প্রকরণে যথাযথ নতুন বিন্যাস প্রয়োজন। সংযম, আত্মত্যাগ, পরচিকীর্যা ইত্যাদি ভারী ভারী শব্দ এখন অচল, গম্ভীর-গম্ভীর দেশপ্রেম-উদ্দীপক বক্তৃতার বন্যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অসহ্য,একটু রঙ-বেরঙে ভূষিত না-করলে ছবিটি বাজারে মার খাবে, ছবিটি মার খেলে বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাস-সচেতন হওয়ার প্রয়াসও মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রাচীনপন্থীদের মেনে নিতে হবে এটা বিজ্ঞাপনের যুগ। বিজ্ঞাপনের সুবোধ রায় আদি ও অকৃত্রিম সুবোধ রায়ের কাছ থেকে শুধু নামটুকর জন্য ঋণী, সেই নামটিকে বিখ্যাত করতে গেলে বাজারের পছন্দ-অপছন্দদের কথাও মাথায় রাখতে হবে, মানতে হবে ক্রেতাদের কাছে যা গ্রহণীয়, তাই-ই গ্রাহ্য, অন্য সব কিছু বাতিল। 

পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাওয়া সুবোধ রায় তো আর আপত্তি জানাতে পারছেন না, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ন্যূনতম এনতার মানবাধিকার খারিজ হয়ে যায়, মানহানির ঝামেলা পোয়াতে হয় না কোনও পক্ষকেই। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে বলে নাকিকান্নাও সমান অর্থহীন, অতীতকে মাঝে মধ্যে নতুন করে বিশ্লেষণের প্রয়াস জ্ঞানচর্চার অন্যতম অঙ্গ নয় কি? সুবোধ রায়কে তাঁর জীবদ্দশায় চিনতে-জানতেন-ভালবাসতেন-গভীর শ্রদ্ধা করতেন এমন মুষ্টিমেয় যে ক’জন এখন আছেন, তাঁদের তাই মেনে নিতে হয় যখন যেমন তখন তেমন। একটি গুজব যা বলে আসছে শুনে অন্তত তাই মনে হয়। তরুণতর, তরুণতম প্রজন্মকে নাকি উৎসাহ দান করা, মাল্টিপ্লেক্স মাল্টিপ্লেক্সে ভিড় জমাও, মহার্ঘ মূল্যের টিকিট কেটে দেখে এসো, নিজেরা দেখ, বন্ধুবান্ধবদের দেখতে প্ররোচিত করো, জীবিত অবস্থায় পার্টি দফতরের এক নিভৃত কোণে তিনি যখন নীরবে নির্দেশিত করণীয় সংকল্প করে যেতেন, কারও ঠাহর হয়নি তিনি কত বড় কাজের মানুষ ছিলেন, চলচ্চিত্রটির কল্যাণে এখন তা প্রতীয়মান হচ্ছে। এই নবলব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে, জনে-জনে কচিকাঁচাদের ধরে নিয়ে তাদের বোঝাতে হবে। চলচ্চিত্রের দীপ্তিতে প্রজ্জলিত এই চরিত্রটি আমাদের দলভুক্ত সৈনিক ছিলেন। আমরা ফ্যালনা নই। 

প্রয়াণেও নিশ্চিন্তি নেই, সুবোধ রায় ব্যবহৃত হয়েই যাচ্ছেন। কী আর করা, বাজারের প্রয়োজন, বাজারই নাকি শেষ কথা বলে। 

সৌজন্য:

আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১২

http://archives.anandabazar.com/archive/1121121/21edit3.html

20160412

কী সৌভাগ্য, খোদ মহিলাটির বিরুদ্ধেই ভোট দিতে পারব

ভোটের দিবসে নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাব, আমার মতো শারীরিক অসমর্থদের জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা যদি না-ও থাকে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ভোট-পরিচালকের সামনে উপস্থিত হয়ে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করব।

অশোক মিত্র
আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ এপ্রিল, ২০১৬, ০০:২৭:৪৭

একটি বিশেষ মহিলা সততার প্রতীক বলে তিনি স্বয়ং এবং তাঁর অনুগামীরা গত দুতিন দশক পশ্চিম বাংলাকে অবিশ্রান্ত তোলপাড় করে দিয়েছেন। শহরে গ্রামে ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ অভাবী মানুষজন, বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, গ্রামে কিছু কিছু কৃষক যাঁরা আগে নেহাতই খেতমজুর ছিলেন, তাঁরা এক ছটাক দুছটাক করে হয়তো জমি পেয়েছেন, কিন্তু তা চাষ করে স্বচ্ছন্দ বেঁচে থাকার উপায় নেই, শহরে ও শহরতলিতে শিল্পবাণিজ্যের প্রসার সীমিত, কোনও ক্রমে বেঁচে থাকার তাগিদে ক্রমবর্ধমান গরিব মানুষদের উদ্ভ্রান্ত ছোটাছুটি। সততার প্রতীক মহিলাটি খাঁটি প্রাকৃত ভাষায় তাঁদের যথার্থ শত্তুর বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেনওই গোলগাল চেহারা, অ্যাম্বাসাডর চড়নেওয়ালা, নধর বেটাগুলোই সব সর্বনাশের জন্য দায়ী, তিনি সততার প্রতীক, তাঁকে যদি সর্বগোত্রের অভাবী মানুষগুলি সমর্থন জ্ঞাপন করেন, তা হলেই পশ্চিম বাংলা স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হবে, সততা, সততা, সততা: সততার বাইরে থেকে গেলে, সততাকে পরিপূর্ণ সমর্থন না জানালে কৃষক মজুর মধ্যবিত্তের আর কোনও আশা নেই। মধ্যবিত্ত পরশ্রীকাতরতা দিনদরিদ্রদের মানসে অনুপ্রবেশ ঘটানোর কাজে ওই বিশেষ ভাষা ব্যবহার আশ্চর্য সাফল্য এনে দিল, এমনকী লেখাপড়া-জানা অতি-বামপন্থী বলে খ্যাত কিছু মানুষজনও এই সততার প্রতীকে মজে গেলেন।

অথচ মহিলাটির পূর্ব ইতিহাস এমন তো অজানা ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে হাতেখড়ির মুহূর্তে তিনি ডক্টর পদবিটি সযত্নে ব্যবহার করতেন, মার্কিন কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি নাকি ডক্টরশ্রী-তে ভূষিত হয়েছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটিত, ও-রকম নামে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ই নেই। তাতে কী? পৃথিবীতে প্রতারকদের তো অভাব নেই, সততার প্রতীক তাদেরই কারও খপ্পরে পড়ে একটু বিব্রত, সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, তিনি রাজ্যের শাসনভার হাতে পেলেই সমস্ত অন্যায় বিলুপ্ত হবে, ন্যায়ের বন্যায় পশ্চিম বাংলা প্লাবিত হবে। পাঁচ বছর আগে রাজ্যের ভোটদাতাদের একটি অ-তুচ্ছ অংশ এ-রকম প্রতীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে সততার প্রতীকটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপুল ভাবে জয়ী করলেনস্বপ্নরাজ্য এখন হাতের মুঠোয়।

তার পর অবশ্য অবিশ্বাস্য উলটপুরাণের অধ্যায়ের পর অধ্যায়। সততার স্বরূপ যে কত বিভঙ্গে, কত বৈচিত্রে বিচ্ছুরিত হতে পারে, গোটা পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষ ক্রমে-ক্রমে হাড়ে-হাড়ে টের পেতে শুরু করলেন। অর্থব্যবস্থার আলোচনা থেকেই শুরু করা যাক। কী কৃষিতে, কী শিল্পে বা পরিষেবায়, গত পাঁচ বছরে এই রাজ্যে উন্নয়নের ছিটেফোঁটা হয়নি। পরিবর্তে চোখ-ছানাবড়া-করা আজব নানা ঘটনা। কালিম্পঙের উপকণ্ঠে এক শোখিন অতিথিশালায় নিভৃত বৈঠকে কে কে এবং কী কারণে উপস্থিত ছিলেন, তা নিয়ে অনেক বয়ান, অথচ কোনও একটিকেও সততার প্রতীক মহিলা ডাহা মিথ্যাবলে সোচ্চার হননি। কিন্তু মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-অতিনিম্নবিত্ত মানুষগুলি তাঁদের সামান্য সঞ্চয় যে একটি-দুটি অসাধু বিনিয়োগ সংস্থার কাছে গচ্ছিত রাখতে শুরু করেন, শাসক দলের নেতানেত্রীদের প্রবল উৎসাহে ও প্ররোচনায় তা উধাও হয়ে গেল, মাসে মাসে যে টাকা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা, তা-ও পুরোপুরি বন্ধ।

পাশাপাশি, অন্য একটি গভীর ব্যঞ্জনাপূর্ণ তথ্য, বহু বছর ধরে ডাকঘরে-জমা-পড়া স্বল্পসঞ্চয়ে পশ্চিমবঙ্গ দেশে সর্বাগ্রগণ্য। এই সঞ্চয়ের দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্য সরকারের ঋণ হিসেবে প্রাপ্য, রাজ্য সরকার তাই এই প্রকল্পের ব্যাপ্তিসাধনে বরাবর সচেষ্ট থেকেছেন। দিদিমণির মুখ্যমন্ত্রিত্বে প্রথম দুবছর অন্য ইতিহাস রচনা করল। রাজ্যে ডাকঘরে-জমা-পড়া অঙ্কের পরিমাণ অতি সংকুচিত, অথচ কালিম্পঙের উপকণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক সভায় যে যে বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির মালিকরা উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা, তাদের সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় একশো গুণ বেড়ে গেল। যে বেকার বা গৃহবধূদের সম্প্রদায় ডাকঘরের জন্য টাকা তুলতেন, তাঁরা বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির জন্য অর্থ সংগ্রহে শশব্যস্ত। সব মিলিয়ে বিভিন্ন অসাধু সংস্থা কত হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে, তার নানা হিসেব। সাধারণ মানুষের অসন্তোষ চাপা দিতে সংস্থাগুলির চাঁইদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হল। ক্রমশ অভিযোগ প্রকাশ পেল, উধাও হওয়া মধ্যবিত্ত গরিব মানুষের টাকা কিছু কিছু সততার প্রতীক দলটির নেতানেত্রীদের কুক্ষিগত। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মাননীয় সাংসদ, কেউ কেউ হয়তো বা প্রখ্যাত শিল্পী বা অভিনেতা-অভিনেত্রী। 

আরও বিচিত্র দৃশ্যের সম্মুখীন আমরা। দুরাচারী এক বিনিয়োগ সংস্থার কারাগারে আটক নায়ক আদালতে আবেদন পেশ করলেন: হুজুর ধর্মাবতার, কী সব আজেবাজে গুজব শুনছি, যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মহান ব্রতে নিযুক্ত ছিল, কেউ কেউ নাকি বলছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে নিয়ে মামলাটি খোদ সর্বোচ্চ আদালতের হাতে অর্পণ করা হোক। বন্দিমহোদয়ের আকুল আবেদন: আমি হলফ করে বলছি, রাজ্য সরকার আমার বিরুদ্ধে অতি দক্ষতার সঙ্গে মামলাটি পরিচালনা করছে, সুতরাং সুপ্রিম কোর্টে সরিয়ে নেওয়ার মতো বিদঘুটে ব্যাপার দয়া করে হতে দেবেন না।

শেষ পর্যন্ত যদিও সেই মামলা এখন দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের নির্দেশে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে, কবে সেই মামলা শেষ হবে, কেউ জানে না। সত্যের প্রতীক দলটির আরও অনেক নেতানেত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এক জন রাজ্য মন্ত্রীকে জামিন না দিয়ে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে। যদিও তিনি আর মন্ত্রী নেই, তেমন ক্ষতি নেই তাতে, বন্দিশালায় তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুরোপুরি ভোগ করছেন।

আর্থিক দুরাচারের আরও এত এত দৃষ্টান্ত ক্রমশ উদ্ঘাটিত, কোনটা ছেড়ে আগে কোনটা বলব? এখন তো দেখা যাচ্ছে, দলের নেতা মন্ত্রী সাংসদরা প্রায় প্রকাশ্যে উৎকোচ গ্রহণ করছেন। দলের মহানেত্রী শখ করে মাঝে মধ্যে ছবিটবিও আঁকেন। তাঁর ছবির বাজারদর খোলাবাজারে দশ-বারো টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে নাকি একটি বিশেষ ছবি কেড়ে নিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা দাম ধরিয়ে দিয়েছে কোনও বেসরকারি সংস্থা। রাজ্য প্রশাসনের প্রত্যেকটি দফতর থেকে এটা-ওটা-সেটা উপলক্ষ করে বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে অর্থব্যয় করা হয়। ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, প্রকল্পের সুযোগ পেতে হলে দলের কোনও না কোনও কেউকেটাকে দস্তুরি দিতে হয়। সর্বশেষ উদাহরণ জোড়াসাঁকোর ভেঙে-পড়া উড়ালসেতু।

এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা থেকে পাঠকদের অব্যাহতি দিয়ে সততার প্রতীক নেত্রীর স্পষ্ট ঘোষণায় পৌঁছে যাওয়া যাক। তিনি গর্বসহকারে নিজেই জানিয়েছেন, এন্তার সমাজবিরোধীর ওপর তিনি কর্তালি করেন। প্রকৃত অর্থেই তাঁর দল সব গোত্রের সব স্তরের সমাজবিরোধীদের আশ্রয়দাতা। রাজ্যের শাসনকারী দলের সাংসদ প্রকাশ্যে গলা ফুলিয়ে বলছেন, যদি কেউ তাঁর বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে, তাঁর ছেলেরা গিয়ে সেই উদ্ধত ব্যক্তির বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের ধর্ষণ করে আসবে। সাংসদটির বিরুদ্ধে কোনও কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা দূরে থাক, ধর্ষণ নাকি বড়জোর দুষ্টু ছেলের সামান্য নষ্টামি। কোনও বহিরাগত গিয়ে যদি কোনও কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যাপককে পেটায়, তা হলে যে পেটাল তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে অধ্যক্ষ বা অধ্যাপক বেচারিকে লাঞ্ছনার উদ্যোগ। পার্ক স্ট্রিটের ধর্ষণটি নাকি সাজানো ঘটনা, কামদুনির ধর্ষণ তথা খুন সিপিএম-মাওবাদীদের চক্রান্ত। বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথের বাংলাকে সভ্যতা সংস্কৃতির কোন অতলে গত পাঁচ বছরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, তা অবলোকনে নির্বাক না হয়ে উপায় নেই। ন্যায়পরায়ণতা সম্পূর্ণ অদৃশ্য। মানবাধিকার কমিশনকে মুখ ভেঙচিয়ে তার নির্দেশকে কলা দেখানো হচ্ছে, মহিলা কমিশনেরও একই অভিজ্ঞতা। এমনকী মাননীয় বিচারপতি যদি শাসকের প্রসাদধন্য সমাজবিরোধীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন, পুলিশের ঘাড়ে কটা মাথা, তার কাছাকাছি যায়?

পুলিশ নিছক নিষ্ক্রিয় নয়, এখন শাসক দলের অনুশাসনেই তার ঘোরাফেরা। গোটা প্রশাসনই সেই পথের পথিক। রমেশচন্দ্র দত্ত থেকে শুরু করে অন্নদাশংকর রায় পর্যন্ত রাজপুরুষরা ঋজু, বলিষ্ঠ ন্যায়নিষ্ঠ প্রশাসনের যে ঐতিহ্য স্থাপন করে গিয়েছিলেন, তা এখন ক্লেদাক্ত ধুলোয় লুটোচ্ছে। গোটা প্রশাসন জুড়ে জো-হুজুর-তালিমকারীদের ঠাসাঠাসি ভিড়। একদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রী, কঠিন পরীক্ষায় সসম্মান উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে প্রবেশ, তাঁরা কেন সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাঠে নৈতিকতা তথা আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়েছেন, তা অবশ্যই গভীর গবেষণার বিষয়। সব মিলিয়ে একটি আশ্চর্য নবদর্শন পশ্চিম বাংলায় গত পাঁচ বছরে রচিত: মিথ্যা মানে সত্য, অন্যায় মানে ন্যায়পরায়ণতা, বেআইনিই আইন, অজ্ঞতাই প্রজ্ঞা, যে অত্যাচারিত, সে-ই আসলে অত্যাচারী, আসল অত্যাচারী পারিতোষেকরই যোগ্যতা অর্জন করেছে।

এই উপাখ্যান, মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, সত্যিই অন্তহীন। পাঁচ বছর আগে মহিলাটি দাবি করেছিলেন, জঙ্গলমহলে কোনও মাওবাদী নেই, সিপিএমই মাওবাদী সেজে গোলমাল পাকাচ্ছে। আজ তিনি বলছেন, জঙ্গলমহলে একমাত্র তিনি আছেন আর মাওবাদীরা আছে, আর কেউ নেই। আসানসোলের হিন্দিভাষী-প্রধান এলাকায় নির্বাচনী সভায় পৌঁছে শাসাচ্ছেন: জো হামসে লড়েগা, চুরচুর হো জায়েগা। একটু বাদেই কুলটিতে গিয়ে হাতজোড় করে সকাতর প্রার্থনা: ভুলত্রুটি করে থাকলে ক্ষমা করবেন, মুখ ফিরিয়ে নেবেন না।

এখন মনে হয়, ঘৃণার একটি মস্ত সামাজিক সার্থকতা আছে। জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে আমি স্পষ্টোক্তি করে অত্যন্ত শান্তি পাচ্ছি, মস্ত তৃপ্তি পাচ্ছি: এই স্বৈরাচারিণীকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা, ঘৃণা, ঘৃণা। আমার ঘৃণা প্রকাশ পড়শিদেরও ঘৃণা-নিষ্কাশনের সাহস সঞ্চার করে। কী সৌভাগ্য, সেই ঘৃণাকে ব্যক্ত করার একটি সুযোগ বর্তমান রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন আমাকে এনে দিয়েছে। যে এলাকায় আমার বসবাস, এখন তা ভবানীপুর কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। ভোটের দিবসে যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাব, আমার মতো শারীরিক অসমর্থদের জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা যদি না-ও থাকে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ভোট-পরিচালকের সামনে উপস্থিত হয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে পর্দায় ঘেরা যন্ত্রে মহিলাটির বিরুদ্ধে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করব।