Showing posts with label বিজেপি. Show all posts
Showing posts with label বিজেপি. Show all posts

20210213

শ্রেণি আক্রমণ মোকাবিলায় চাই শ্রেণি প্রত্যাঘাত

 

সীতারাম ইয়েচুরি

 

ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে শ্রেণি আগ্রাসন তীব্র করতে চাইছে বিজেপি। শোষিত শ্রেণিগুলি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের পালটা শ্রেণি আক্রমণ দিয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা করতে হবে।

=================

 কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কৃষক সংগঠনের নেতাদের ৩০ ডিসেম্বরের আলোচনাতেও অভূতপূর্ব কৃষক প্রতিবাদের মুখ্য বিষয়গুলির সমাধান হয়নি। কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্মত হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল পর্যালোচনা ও বায়ু দূষণ আইন থেকে কৃষকদের অব্যাহতি দেবার বিষয়ে আপাতত রাজি হয়েছে। ৪জানুয়ারি আরেক দফা আলোচনা হবে বলে ঠিক হয়েছে। 

কৃষি আইন প্রত্যাহারে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকারের টানা একগুঁয়েমির জন্য এই বিরাট শান্তিপূর্ণ কৃষক প্রতিবাদের অচলাবস্থা কাটছে না। 

সমস্ত দিক থেকেই দিল্লির সীমান্তে, দিল্লিমুখী জাতীয় সড়কে কৃষকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তাঁরা নজরকাড়া দৃঢ়তা, প্রত্যয় দেখিয়েছেন। দিল্লির সংলগ্ন রাজ্যগুলি ছাড়াও মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরাখণ্ডের মতো দূরের রাজ্যগুলি থেকেও কৃষকরা এসেছেন। দেশের অন্যান্য অংশে, প্রায় সব রাজ্যে, পাটনা থেকে রায়পুর, গুলবর্গা থেকে থাঞ্জাভুর কৃষকরা লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। 

এই কৃষক সংগ্রামের পাশে শ্রমিক শ্রেণি, ট্রেড ইউনিয়ন সক্রিয় সংহতি জানিয়েছে। দেশের অন্নদাতাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের অন্য অংশের মানুষ— মহিলা, ছাত্র, যুবকরা। 

এই প্রতিবাদ আন্দোলনের দাবিগুলি সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিবোধ থাকলে যে কোনও সরকার তা গ্রহণ করে নেবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে বলা হচ্ছে এখন এই আইনগুলি প্রত্যাহার করে নিয়ে কৃষকদের, কৃষি সম্পর্কিত সমাজ, কর্পোরেট, সমস্ত অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করো, তার ভিত্তিতে নতুন আইন বানিয়ে সংসদে পদ্ধতি মেনে আলোচনা ও বিতর্ক করে তা চালু করো। এই পদক্ষেপ নিতেই প্রধানমন্ত্রী মোদী একগুঁয়ের মতো রাজি হচ্ছেন না। (বস্তুত এই রকম চাপ আসতে পেরে ভেবেই কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের শীতকালীন অধিবেশন বাতিল করে দিয়েছে, জবাব দেওয়ার ও দায়বদ্ধতার দায়িত্ব পরিহার করেই এই কাজ তারা করেছে।) 

অসত্য প্রচার 

প্রবল শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে এই বিরাট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলছে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খলভাবে। তাকে বদনাম করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার বিষাক্ত অসত্য প্রচারে নেমেছে। প্রথমে তারা প্রতিবাদীদের খালিস্তানি, পাকিস্তানি, চীনের দালাল, শহুরে নকশাল, টুকরো টুকরে গ্যাঙ এইসব বলে চিহ্নিত করেছে। তারপর কুৎসা ছড়ানো হলো বিরোধী দলগুলি কৃষকদের বিপথে পরিচালিত করছে। বাস্তব সত্য হলো এই আন্দোলন পরিচালনা করছে সংযুক্ত কৃষক মোর্চা, যা দেশব্যাপী ৫০০-র বেশি সংগঠনকে নিয়ে তৈরি, কোনও রাজনৈতিক দলেরই যোগাযোগ নেই। 

প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে এই জাতীয় প্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করছেন বিরোধী দলগুলি নিজেদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে কৃষি সংস্কারের কথা বলে এখন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করছেহ্যাঁ, সিপিআই(এম) সব সময়ে কৃষিতে সংস্কার দাবি করেছে। অন্য অনেক দলও করেছে। কিন্তু কী ধরনের সংস্কার? সিপিআই(এম) ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার জন্য, সমস্ত মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে, কৃষকদের ফসলের লাভজনক মূল্য, ক্রেতাদের ন্যায়সঙ্গত দামে শস্য পাবার জন্য শক্তিশালী গণবণ্টন ব্যবস্থা চায়। চায় কৃষিক্ষেত্রের আরও উন্নতি। সেই লক্ষ্যে সিপিআই(এম) সংস্কার চায়। 

প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংস্কার যা এই কৃষি আইনগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে তা উলটো। ভারতের কৃষিকে, তার বাজার ও উৎপাদিত ফসলকে বহুজাতিক কৃষি বাণিজ্যের রাঘববোয়াল, দেশি-বিদেশি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেবার জন্য এই সংস্কার। তা ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুতর বিপর্যয় ডেকে আনবে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বিপুল মজুতদারির অনুমোদন দেওয়ায় কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট তৈরি করে চড়া হারে মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো হবে। গণবণ্টন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, সাধ্যের মধ্যে দামে খাদশস্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এই আইনগুলিতে ভারতের কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস হবে, জনগণের দুর্দশা আরও বাড়বে। এই কারণে অনেক বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দল এই বিলগুলির বিরোধিতা করেছিল, কৃষক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করছে, তাদের দাবি মেনে নিতে সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারের কাছে দাবি, এমন সংস্কার করুন যা ভারতের জনগণের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের কাজে লাগে, দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের অতি মুনাফার লক্ষ্যে সংস্কারের পথে হাঁটবেন না। 

স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট কি রূপায়িত হচ্ছে? 

প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন তাঁর সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট রূপায়ণ করছে। সত্য হলো স্বামীনাথন কমিশন সি২+৫০ শতাংশ হারে এমএসপি নির্ধারণ করতে বলেছে। সরকার বড়জোর এ২+৫০ শতাংশ হারে এমএসপি নির্ধারণ করছে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। এ২ প্রকৃত মিটিয়ে দেওয়া খরচ (অ্যাকচুয়াল পেইড আপ কস্ট)। সি২-র মধ্যে রয়েছে নিজের জমির খাজনার মূল্য, নিজস্ব মূলধনী সম্পদের ওপরে সুদ। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এমএসপি আদৌ দেওয়া হচ্ছে না, কমিশনের অন্য সুপারিশ তো উপেক্ষা করাই হচ্ছে। 

সিপিআই(এম)’র ২০১৯-র নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ‘কৃষি সংস্কার’ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে প্রথমেই বলা রয়েছে সমস্ত কৃষককে এমএসপি-তে ফসল বিক্রির আইনি অধিকার দিতে হবে। ২০১৭ থেকে সিপিআই(এম) সাংসদরা বারবার এই দাবি সংসদে উত্থাপন করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার এমন আইন আনেনি। বলা হয়েছিল, এমএসপি’র অধীনে সমস্ত কৃষিপণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, সমস্ত কৃষককে তার পরিধিতে আনতে হবে। বর্তমানে মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক এর আওতায় পড়েন। তাছাড়াও কার্যকরী সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছাড়া এমএসপি অর্থহীন। সরকারি বা বেসরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা দেশজুড়ে সর্বজনীন করতে হবে। 

বিরোধী দলের রাজ্য সরকারগুলিকে আক্রমণ 

প্রধানমন্ত্রী মোদী সম্পূর্ণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধীদের রাজ্য সরকারগুলিকে বিশেষ করে কেরালার এলডিএফ সরকারকে আক্রমণ করে বলেছেন তারা কৃষকদের স্বার্থ দেখছে না অথচ কেন্দ্রীয় আইনের বিরোধিতা করছে। কেরালা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাভাষণকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে সারা ভারত কৃষকসভা। কেরালায় ধান, তরিতরকারি, ডাল, কলা ইত্যাদিতে হেক্টরপ্রতি ভালোই ভরতুকি দেওয়া হয়। কেরালার কর্ষিত জমির ৮২শতাংশে অর্থকরী ফসল উৎপাদন হয় যার দাম পণ্য বোর্ড নিশ্চিত করে দেয়, রাজ্য সরকারের অধীনে নিলামের ব্যবস্থা রয়েছে। 

নজর ঘোরাতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ 

বিপুল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে বিজেপি তাদের রাজ্য সরকারগুলির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্র করতে উঠেপড়ে লেগেছে। উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশে জারি করা হয়েছে ‘লাভ জিহাদ’ আইন, ‘গোরক্ষা আইন’ জারি করা হয়েছে। এইসবকে ব্যবহার করা হচ্ছে হেনস্তা, হয়রানি, ও সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগ তৈরির জন্য। মধ্য প্রদেশের উজ্জয়িনী, ইন্দোর, অন্যান্য জায়গায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। এর বিপর্যয়কর অস্থিরতার প্রভাব পড়বে দেশে। 

নয়া উদারনীতির আগ্রাসী অভিযান 

বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে। নয়া উদারনীতির পথে সংস্কার যে এই সঙ্কটের কোনোই সমাধান করতে পারে না, সম্পূর্ণ দেউলিয়া তা উন্মোচিত হয়েছে। ধনতন্ত্রে লুটেরা প্রবৃত্তির মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য তাই কাড়াকাড়ি তীব্রতর হয়েছে। বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার কর্পোরেটের মুনাফা সর্বোচ্চকরণের লক্ষ্যে বৃহত্তর সুযোগ করে দিতে নয়া উদারনীতির সংস্কার আগ্রাসী ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য দরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন নতুন এলাকা ও নতুন বাজার দখল করা। এই লক্ষ্যেই দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে কৃষিকে তুলে দেবার চেষ্টায় নতুন আইনগুলি আনা হয়েছে।

ভারতের শাসক শ্রেণিগুলির শক্তিবৃদ্ধির মুখ্য এজেন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় সংস্কার রূপায়ণের কাজ করছে তারা। 

শ্রেণি প্রভাব 

বিশ্ব সঙ্কট ছাড়াও ভারতের অর্থনীতি নোটবাতিল ও পণ্য পরিষেবা কর রূপায়ণের পদ্ধতিতে ভারতের অর্থনীতি দুর্বিপাকে পড়েছে। গত কয়েক বছরে লাগাতার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার অধোগতিতে পড়েছে। অর্থনীতিতে মন্দা, কোভিড মহামারীর প্রভাব, অপরিকল্পিত হঠাৎ লকডাউনের প্রেক্ষিতে ভারতের শাসক শ্রেণিগুলি নিজেদের মুনাফা বজায় রাখতে, সর্বোচ্চ করতে আরও রাস্তা খুঁজছে। 

বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বুর্জোয়া-ভূস্বামী শাসক শ্রেণিগুলি নয়া উদারনীতির পথে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের প্রয়াস চালিয়ে গেছে। জাতীয় সম্পদের লুট, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিপুল আকারে বেসরকারিকরণ, খনির মত জনগণের সম্পত্তি এবং জনপরিষেবা বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসাবেই শ্রমিকদের অধিকার রদ করা হচ্ছে। 

কৃষকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ভারতের শাসক শ্রেণিগুলির নেতৃত্বের মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে কৃষিতে কর্পোরেট দখলদারির ঘটনাকে স্পষ্ট ভাবে সামনে এনে দিয়েছে। 

এক নতুন শ্রেণি দ্বন্দ্ব সামনে আসছে। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির সঙ্গে সহযোগিতায় বৃহৎ বুর্জোয়া বনাম ধনী কৃষক ও জোতদার-সহ সমগ্র কৃষকের দ্বন্দ্ব। 

দ্বিতীয়ত, শাসক শ্রেণির শরিকদের মধ্যে সংঘাতও দেখা যাচ্ছে। একদিকে বৃহৎ বুর্জোয়া, অন্যদিকে অ-বৃহৎ বুর্জোয়া, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের মধ্যে দ্বন্দ্ব। 

তৃতীয়ত, বিজেপি দেশে পূর্ণ রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করছে, তার বদলে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। রাজ্য সরকার পরিচালনা করে এমন কিছু আঞ্চলিক দল সংসদে বিজেপি-কে সমর্থন করত, কিছু দোদুল্যমান ছিল এবং মূলত বিজেপি-কে সমর্থনের উদ্দেশ্যে সংসদে নিরপেক্ষ থাকত। তারাও বিশেষ করে এই কৃষক সংগ্রামের সময়ে বিজেপি’র এই আধিপত্যকামী অভিযানের ফলে বিরোধিতায় বাধ্য হচ্ছে। 

শাসক শ্রেণিগুলির শরিকদের মধ্যে এই ধরনের সংঘাত কিছু সম্ভাবনা তৈরি করে যা শোষিত শ্রেণিগুলিকে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি, গরিব কৃষক, খেতমজুরদের বুর্জোয়া-ভূস্বামী শ্রেণি কাঠামোর বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রাম তীব্র করার লক্ষ্যে এই সম্ভাবনাকে ব্যবহার করতে হবে। 

শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে শ্রমিক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, কৃষক ও খেতমজুরদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পেতে থাকায়। অনেক আগেই এই কাজ শুরু হয়েছিল, ২০১৮ থেকে এইসব অংশের যৌথ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ২৬ নভেম্বর সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল, তা কৃষক সংগঠনগুলির ২৬-২৭ নভেম্বর দিল্লি চলো অভিযানের সঙ্গে মিশে গেছে। আগামী দিনগুলিতে সংগ্রামের এই ক্রমবর্ধমান ঐক্য নিশ্চয়ই আরও মজবুত হবে। 

একই সঙ্গে শাসক শ্রেণিগুলি শ্রেণি আক্রমণ তীব্রতর করছে, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্রতর করছে, ভারতীয় সংবিধানকে খর্ব করছে। এর ফলে বর্তমান বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম বৃদ্ধি পাওয়ার জমি তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনগুলিতে একদিকে যৌথ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অন্যদিকে মহিলা, ছাত্র, যুব, দলিত, আদিবাসীদের মতো জনগণের বিভিন্ন অংশের নিজস্ব দাবিদাওয়ার আন্দোলন তীব্রতর হতে বাধ্য। এই আন্দোলনগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে শ্রেণি আগ্রাসন তীব্র করতে চাইছে বিজেপি। শোষিত শ্রেণিগুলি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের পালটা শ্রেণি আক্রমণ দিয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা করতে হবে।

=================

গণশক্তি, ১জানুয়ারি, ২০২১

 

 

 

20201119

বিজেপি-কে হারাতে গেলে তৃণমূলকে বিচ্ছিন্ন ও পরাস্ত করতে হবে: সীতারাম ইয়েচুরি

 


তৃণমূলের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে, লড়াই না করলে লাভবান হবে বিজেপি-ই। পশ্চিমবঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির এটিই বাস্তবতা। বুধবার গণশক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বললেন সিপিআই(এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেবাশিস চক্রবর্তী। 

গণশক্তি: সদ্যসমাপ্ত বিহার নির্বাচনের শিক্ষা কী?

ইয়েচুরি: বিহার নির্বাচন থেকে অনেকগুলি কার্যকরী শিক্ষা আমরা নিতে পারি। প্রথম কথা ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সম্ভাব্য বৃহত্তম ঐক্য গঠন করা গিয়েছিল। তা বিজেপি-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আরজেডি-কংগ্রেস মহাগটবন্ধনের সঙ্গে বামপন্থীরা সামিল হয়েছিল। তিন বামপন্থীদলের এই যোগদান বিহারের নির্বাচনী প্রচারের চিরায়ত ধারাকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। মানুষ সাড়া দিয়েছেন। বিশেষ করে বেরোজগারীর প্রশ্নে যুবকদের সাড়া পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, সারা দেশই জানে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বামপন্থীরাই সবচেয়ে জোরদার কণ্ঠ। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াইয়ে বামপন্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। তার প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ভোট এক জায়গায় পড়েছে। আমরা প্রচারে বলেছিলাম বিজেপি-কে পরাস্ত করা বিহারের পক্ষে জরুরী, ভারতের পক্ষে জরুরী। বাস্তবে বিজেপি-জেডি(ইউ) জোট শেষ পর্যন্ত মাত্র ০.০৩ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছে। বিজেপি যে অপরাজেয় নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে।

গণশক্তি: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন কয়েক মাসের মধ্যেই হবে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিন্যাস নিয়ে কথাবার্তা শুরুও হয়ে গেছে। সিপিআই(এম)-র রাজনৈতিক রণকৌশল কী হবে?

ইয়েচুরি: সিপিআই(এম)-র পার্টি কংগ্রেসে রাজনৈতিক রণকৌশলগত লাইন নির্ধারিত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিজেপি-কে পরাস্ত করা, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার থেকে তাদের অপসারণ করা। পশ্চিমবঙ্গেও প্রাথমিক লক্ষ্য বাংলা ও ভারতের স্বার্থে তাদের পরাস্ত করা। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এই লক্ষ্য পূরণ করা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিজেপি-কে পরাস্ত করতে গেলে তৃণমূল কংগ্রেসকে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, পরাস্ত করতে হবে। তৃণমূল বাংলায় বিজেপি-কে প্রবেশের রাস্তা করে দিয়েছে। তাদের ওপরে নির্ভর করেই বিজেপি বাংলায় পা রেখেছে। তৃণমূল বিজেপি-র সঙ্গে আঁতাত করেছিল, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এনডিএ সরকারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। বিজেপি-র বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে শূন্য।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে গভীর জনঅসন্তোষ রয়েছে। তৃণমূলের হিংসা ও শাসানির রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। কেউ যদি বলেন বিজেপি-কে পরাস্ত করতে তৃণমূল সহ সকলকে নিয়ে চলতে হবে তা হবে আত্মঘাতী। সেক্ষেত্রে সমস্ত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, শাসক দলের বিরোধী ভোট বিজেপি-র কাছে চলে যাবে। এই ধরনের কৌশল বিজেপি-র জয়কেই উলটে নিশ্চিত করবে। বাংলায় প্রয়োজন বিজেপি-বিরোধী, তৃণমূল-বিরোধী সমস্ত ভোটকে সর্বোচ্চ সম্ভব এক জায়গায় জড়ো করা। এই লক্ষ্য নিয়েই চলার কথা সিপিআই(এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গণশক্তি: কোনো কোনো মহল থেকে কথা উঠছে ‘প্রধান শত্রু’ কারা। সিপিআই(এম) তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রচার করায় বিজেপি-র সুবিধা হচ্ছে। কীভাবে এই প্রশ্নকে আপনি দেখছেন?

ইয়েচুরি: প্রধান শত্রু বিজেপি। সারা ভারতেই এবং বাংলায় প্রধান শত্রু বিজেপি। রণকৌশলের মুখ্য প্রশ্ন হল এই শত্রুকে আমরা কীভাবে হারাতে পারি। আমি আগেই বলেছি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই না করলে, প্রচার না করলে শাসক-বিরোধী ভোটের একটাই রাস্তা খুলে যাবে। তা হলো ভোট চলে যাবে বিজেপি-র কাছে। যে লক্ষ্যের জন্য আমরা কাজ করব, সেই লক্ষ্যই পরাস্ত হবে। এমন কোনো কৌশল নিলে বিজেপি-ই লাভবান হবে।

বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়েই চায় দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার একটি ভাষ্য তৈরি হোক। হয় বিজেপি, না হয় তৃণমূল। উভয় শক্তিই এই মেরুকরণকে মদত দিচ্ছে। যাতে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য জায়গা না থাকে। এই দ্বিমেরুর আখ্যানে শেষ পর্যন্ত লাভ হবে বিজেপি-র। জনগণ কোনো বিকল্প না পেলে বিজেপি-র দিকে যাবেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের নীতি জনস্বার্থবিরোধী। বিজেপি-র নীতি থেকে তা পৃথক নয়। উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তৃতীয় এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি হবে।

গণশক্তি: এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বেশি মনোযোগ দেয়।

ইয়েচুরি: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হবে না?  সরকার তৃণমূলের। জনগণের জীবনজীবিকা, তাঁদের ন্যায্য দাবিদাওয়ার জন্য লড়াই চলছে। মানুষের বিক্ষোভকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছে সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা। কিন্তু শুধু রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে, এটি বাজে কথা। কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করছে সিপিআই(এম)। লকডাউনের সময়ে লড়াই কার বিরুদ্ধে হয়েছে? ২৬নভেম্বরের সাধারণ ধর্মঘট কাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে? রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারীকরণ, শ্রম আইনে শ্রমিক-বিরোধী সংশোধনী, নয়া কৃষি আইনের বিরুদ্ধে একটানা লড়াই হচ্ছে। মোদী সরকারের গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ, সংবিধানকে ধ্বংস করার প্রয়াসের বিরুদ্ধে সিপিআই(এম) একটানা লড়াই চালাচ্ছে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে না বলা একেবারেই অসত্য, বিভ্রান্তিকর কথা।

বিপদের কথা আগেই বলেছি। বিজেপি এবং তৃণমূলকে আমরা এক করে দেখছি না। দেশের কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিজেপি-র সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। বিজেপি সংবিধান ও সাধারণতন্ত্রের কাঠামোকেই ভেঙে দিতে উদ্যত। কিন্তু তৃণমূলের রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের মোদী সরকার উভয়ের বিরুদ্ধেই সিপিআই(এম) লড়ছে।

গণশক্তি: পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে কীভাবে দেখছে সিপিআই(এম)? বিশেষ করে বাংলার পূর্ব ইতিহাস এবং জনবিন্যাসের প্রেক্ষিতে?

ইয়েচুরি: বাংলায় দেশভাগের সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, অত্যন্ত বিষাদময় ও নৃশংস ইতিহাসের সাক্ষী থাকতে হয়েছে বাংলার মানুষকে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনেও গান্ধীজী কলকাতায় অনশন করছিলেন। নোয়াখালির বর্বর দাঙ্গার জন্য তিনি যেতে চেয়েছিলেন। যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি লালকেল্লায় ত্রিবর্ণ পতাকা তুলতে যাননি, কলকাতায় অনশন করছিলেন। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ক্ষত গভীর ভাবেই বাংলার মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্টরা ও বামপন্থীরা দীর্ঘ সময় তা সংযত করে রাখতে পেরেছে, এমনকি অনেকাংশে মুছেও দিতে পেরেছে। অর্ধশতক ধরে বাংলায় আন্দোলন-সংগ্রাম, জীবনজীবিকার লড়াই, প্রগতিশীল রাজনীতি, সাংস্কৃতিক প্রবাহ সেই ক্ষত মুছতে সাহায্য করেছে। সংখ্যালঘুরা পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পেয়েছেন। বাবরি মসজিদের সময়ে গোটা দেশে দাঙ্গা হলেও পশ্চিমবঙ্গে হয়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বাংলায় আশ্রয় নিয়েছেন। গোটা দেশে যখন সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তার অভাবে ভুগেছেন, তখন বাংলায় সংখ্যালঘুরা জীবনজীবিকা উন্নত করার প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির জোর হিসাবে কাজ করেছে সাম্প্রদায়িক সংহতি। এই যে নিরাপত্তাবোধ তা কোনো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিকে মদত দিয়ে পাওয়া যাবে না। বিজেপি চেষ্টা করছে অতীতে ফিরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে জাগিয়ে তোলার। বাংলায় ওদের প্রচারের অন্যতম উপাদানই তাই। সিপিআই(এম) দৃঢ় ভাবে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়িয়ে থাকবেও।

গণশক্তি: সিপিআই(এম) ও বামফ্রন্ট কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ায় যাচ্ছে। এ কি কেবল ভোট বাড়ানোর লক্ষ্যে?

ইয়েচুরি: প্রথম কথা সিপিআই(এম) কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ায় যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। সিপিআই(এম)-র দেশব্যাপী অবস্থানই হল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক কাঠামো, সাধারণতন্ত্র রক্ষায় যে-সমস্ত শক্তি ইচ্ছুক, তাদের ঐক্য গড়ে তোলা। একেক রাজ্যের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার চেহারা স্থির হবে। সিপিআই(এম) কারোর অধীনস্থ নয়, কারোকে আমাদের অধীনস্থ হতেও বলছি না। বিহারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের ঐক্য হয়েছে। তামিলনাডুতে আমরা ডিএমকে-র সঙ্গে ঐক্য গঠন করব। পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির ঐক্য গঠনের আলোচনাই চলছে। বিজেপি-বিরোধী, তৃণমূল-বিরোধী শক্তিগুলির ঐক্য গঠনের প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। একে শুধু কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য বলে দেখা উচিত নয়। এই হল সিপিআই(এম)-র অবস্থান।

***********

গণশক্তি, ১৯ নভেম্বর, ২০২০

20191219

আন্দোলনের বর্শাফলক থাকুক মানুষের শত্রু আরএসএস-বিজেপি’র দিকে



শমীক লাহিড়ী

ভারতবর্ষের নাগরিক কারা এবং কারা ভবিষ্যতে নাগরিক হতে পার‍‌বেন — এই নিয়ে কে‍‌ন্দ্রের বিজেপি সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে — ‍‌(১) জাতীয় নাগরিক পঞ্জি নতুন করে তৈরি করা এবং (২) ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সং‍‌শোধন করা।

নতুন সংশোধিত আইন

১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন এখনও পর্যন্ত ৬ বার সংশোধিত হয়েছে — ১৯৮৬, ১৯৯২, ২০০৩, ২০০৫, ২০১৫ এবং ২০১৯। ১৯৮৬ সালের সংশোধনী অনুযায়ী ১৯৮৭ সালের ১ জুলাইয়ের পূর্বে যিনি ভারতবর্ষে জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি ভারতবর্ষের নাগরিক হিসাবে গণ্য হবেন। এরপর যাদের জন্ম হয়েছে তাঁদের পিতা অথবা মাতা যেকোনও একজন সন্তানের জন্মের সময় ভারতের নাগরিক হলে, সন্তান এদেশের নাগরিকত্ব পাবে। ২০০৩ সালের সংশোধনী অনুযায়ী যে সমস্ত শিশু ৩ ডিসেম্বর ২০০৪ সালের পরে জন্মগ্রহণ করেছে, তাঁদের পিতা এবং মাতা উভয়কেই ভারতবর্ষের নাগরিক হতে হবে, তবেই সেই শিশু ভারতের নাগরিক হিসাবে গণ্য হবে।

বিদেশে জন্মগ্রহণকারী এবং বিদেশে বসবাসকারী ভারতীয়দের ক্ষেত্রে আইন পৃথক। সর্বশেষ সংশোধনী (CAA) বিদেশে বসবাসকারী অ-ভারতীয়দের ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য করা হয়েছে। অর্থাৎ যাঁরা ভারতবর্ষের নাগরিক নন, তাঁদের মধ্যে যাঁরা ভারতবর্ষের নাগরিকত্ব পেতে চান তাঁদের জন্য নাগরিকত্ব আইনের এই সংশোধনী। কিন্তু পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তের যে কোনও দেশের মানুষ এবং যে কোনও ধর্মাবলম্বী মানুষ এই সর্বশেষ আইন অনুযায়ী ভারতবর্ষের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন না। কেবলমাত্র ৩টি প্রতিবেশী দেশ— পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশে বসবাসকারী অ-মুসলমান মানুষেরা ভারতবর্ষের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবে। অর্থাৎ এই আইনটি এককথায় বিদেশিদের জন্য তৈরি, ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

সঙ্গতভাবেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমত, কেবলমাত্র ৩টি প্রতিবেশী দেশকে বেছে নেওয়া হলো কেন? নেপাল, মায়ানমার (পূর্বতন বার্মা), ভূটান, চীন, শ্রীলঙ্কা ইত্যাদি দেশগুলিও ভারতবর্ষের প্রতিবেশী দেশ। এদের বাদ দেওয়া হলো কেন? এর কোনও সঙ্গত উত্তর প্রধানমন্ত্রী অথবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেননি অথবা দিতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, আমাদের দে‍‌শের নাগরিকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় থেকে ধর্ম-ভাষা-জাতি কখনই বিচার করা হয়নি। দেশ বিভক্ত হওয়ার পর প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তান ধর্মের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেও আমাদের দেশ সেই রাস্তায় হাঁটেনি। আমাদের দেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই দেশে বসবাসকারী হিন্দু-মুসলমান-শিখ-জৈন-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-পার্সি-নাস্তিক সহ সব ধর্মের মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে এই সংবিধানকে দু’হাত তুলে সমর্থন করেছিলেন এবং এই ধর্মনিরপেক্ষ-গণতান্ত্রিক দেশকেই তাঁদের মাতৃভূমি বা পিতৃভূমি রূপে গণ্য করে, এই দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে, এই দেশেই বসবাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন।

স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরে আজ হঠাৎ ধর্ম বিচার করে নাগরিকত্বদানের প্রশ্নটিকে আরএসএস-বিজেপি সামনের সারিতে নিয়ে আসতে চাইছে কেন? এরা যুক্তি দিচ্ছেন আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলিতে ধর্মীয় কারণে নিপীড়িত মানুষদের প্রতি দায়বদ্ধতা রয়েছে, তাই এই নিপীড়িত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই এই আইন আনা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দুটি প্রশ্ন সামনে উঠে আসছেপ্রথমত, সমস্ত প্রতিবেশী দেশগুলির উৎপীড়িত নাগরিকদের জন্য এই আইন না এনে কেবলমাত্র ৩টি দেশকে কেন বেছে নেওয়া হলো? দ্বিতীয়ত, ভাষাগত জাতিগত অথবা রাজনৈতিক নিপীড়িতদের বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ধর্মীয় উৎপীড়িতদের জন্য কেন এই আইন? তৃতীয়ত, এই উপমহাদেশের অন্যান্য ধর্মের মানুষকে এই সুযোগ দেওয়া হলেও মুসলমানদের বাদ দেওয়া হলো কেন?

পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ এই ৩টি দেশকে বেছে নেওয়া হয়েছে তার মূল কারণ এই দেশগুলিতে মুসলমান মানুষরা সংখ্যালঘু নন। শ্রীলঙ্কা-চীন-নেপাল-ভুটান-বার্মা এই সব প্রতিবেশী দেশে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ সংখ্যালঘু। যদি এই দেশগুলির নাগরিকদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয় তাহলে এই সব দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ ভারতবর্ষের নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারে— যেটা প্রবল মুসলমান বিদ্বেষী আরএসএস-বিজেপি চায় না। শ্রীলঙ্কার তামিল সমস্যা আমাদের কারুর অজানা নয়। যদি প্রতিবেশী দেশের উৎপীড়িতদের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন প্রকৃত কারণ হতো তাহলে শ্রীলঙ্কার তামিল কিংবা মায়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা থেকে কখনই দৃষ্টি ফেরাতে পারত না আমাদের দেশের সরকার।

আসলে দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার দীর্ঘ লালিত আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যেই এই আইন সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং গায়ের জোরে বিজেপি সরকার তৈরি করতে চেয়েছে। হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের প্রাক্‌শর্ত রূপে প্রথমত, দেশের মানুষকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন দ্বিতীয়ত, বিভাজনকে তীব্র করার জন্য ঘৃণা তৈরি তৃতীয়ত, এই ঘৃণাকে স্থায়ী রূপ দিতে দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি বাহিনী। যে কারণে সমস্ত যুক্তি-তর্ক এড়িয়ে গায়ের জোরে এবং অসত্যকেই ভিত্তি করেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। কেন সব প্রতিবেশী দেশ নয়, কেন জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে যে কোনও উৎপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো নয় — এইসব প্রশ্নের কোনও উত্তর এরা দিচ্ছেন না। সিপিআই(এম) দেশ ভাগের পর থেকেই শরণার্থীদের পাশে সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এই বাংলায় কমিউনিস্টরা লাগাতার লড়াই করেছে। যাঁরা এদেশে এসেছেন তাঁদের নাগরিকত্ব দেবার দাবিও তুলেছে। কিন্তু ধর্মীয় বিচার না করেই এই নাগরিকত্ব দিতে হবে। অন্যথায় সংবিধানের মৌলিক ধারণাই বিপর্যস্ত হবে।

নতুন জাতীয় নাগরিক পঞ্জি তৈরি কেন?

সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িয়ে আছে এই সরকারের নাগরিকপঞ্জি তৈরির ঘোষণার সাথে। আসামে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করার ক্ষেত্রে কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছেসেখানে মুসলমানদের তাড়িয়ে দেবে আর তাদের জমি-বাড়ি-সম্পত্তি-চাকরি সব হিন্দুরা পাবে, এই প্রচার চালিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল। নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯ লক্ষের মধ্যে ১২ লক্ষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের নাম নাগরিকপঞ্জি থেকে বাদ পড়ায় সেখানকার মানুষদের সামনে বিজেপি’র স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে গেছে। মানুষ সেখানে বিজেপি’র বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে বিক্ষোভ জানাচ্ছে।

১৬০০ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি নাগরিকপঞ্জি কার্যত একটি ব্যর্থ কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেবলমাত্র জনগণের দেয় করের অর্থ অপচয়ই নয়, প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষকে গড়ে ২০-২৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করতে। কোনও কোনও মানুষের ক্ষেত্রে নিজের পকেটের থেকে এই খরচের পরিমাণ ৫০ হাজার টাকাও ছাড়িয়েছে। যে সব হতদরিদ্র মানুষ এই পরিমাণ অর্থ খরচ করে নথিপত্র তৈরি করতে পারেননি, এদে‍‌শে জন্মগ্রহণ করলেও তাঁরা অনুপ্রবেশকারী বিদেশি হিসাবেই চিহ্নিত হয়েছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আসামের অভিজ্ঞতার নিরিখে সমগ্র দেশে এক গভীর অস্থিরতা তৈরি হয়েছে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করাকে কেন্দ্র করে। এটি কোনও সাধারণ আর পাঁচটি সমস্যার মতো নয়, এটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, সম্পত্তি রক্ষা করার অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি। অর্থাৎ একজন মানুষ এবং তাঁর সমগ্র পরিবারের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত নতুন করে নাগরিকপঞ্জি তৈরির বিষয়টি।

মানুষের আসল সমস্যা লুকোতে চাইছে

আমাদের দে‍‌শের বেকার সমস্যা— কৃষি জীবনের সমস্যা— শিল্প কলকারখানার সমস্যা— দারিদ্র দূরীকরণের সমস্যা— অশিক্ষার সমস্যা-মহিলাদের উপর ক্রমবর্ধমান নির্যাতনের সমস্যা- অর্থনীতির অধোগতির সমস্যা, এই সবের সাথে অথবা দে‍‌শের উন্নয়নের সাথে কোনও সম্পর্ক কি আছে নতুন নাগরিকত্ব আইন অথবা নাগরিকপঞ্জি নতুন করে তৈরি করার? তাহলে এই বিষয় দুটিকে টেনে এনে সমগ্র দেশজুড়ে আগুন লাগানোর অর্থ কি? উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সমগ্র ভারত উদ্বেলিত। রাস্তায় ক্ষোভ আছড়ে পড়ছে। জায়গায় জায়গায় আগুন জ্বলছে। পুলিশের গুলি চলছে। মিলিটারি নামাতে হচ্ছে। বিদেশিদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্য কোনও বুদ্ধিমান, যুক্তিবাদী, সভ্য সরকার নিজের দেশে আগুন জ্বালাতে  পারে— এটা বিজেপি শাসিত ভারতবর্ষকে দেখেই সমগ্র পৃথিবী জানল। এই আগুন জ্বালানো বিজেপি’র জন্য এত জরুরি হয়ে পড়ল কেন?

এক ঢিল, তিন পাখি

আসলে ঘৃণা এবং বিভেদের রাজনীতি হলো আরএসএস-বিজেপি’র মূল মতাদর্শ। এই দুটি আইনের মাধ্যমে একইসাথে অনেকগুলি ঢিল মারতে চাইছে আরএসএস-বিজেপি বাহিনী।

প্রথমত, দেশজুড়ে এই দাঙ্গার পরিস্থিতিতে ধামাচাপা পড়ে গেল পেঁয়াজের দাম ১৫০ টাকা, সরকারি ব্যাঙ্কগুলো ধুঁকছে কারণ বিজেপি ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিরা টাকা ঋণ নিয়ে পালিয়েছে অথবা ফেরত দিচ্ছে না, দেশের কয়লাখনি-তেলের কোম্পানি-রেল সব বেচে দেওয়া হচ্ছে, গত পাঁচ দশকের মধ্যে সবচাইতে বেশি বেকারত্ব, কৃষক আত্মহত্যা করছে ঋণের জালে জড়িয়ে গিয়ে, দেশের অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ার মুখে।

দ্বিতীয়ত, এই আইনের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা যাবে, ঠিক যেমন নোট বন্দির সময় হয়েছিল। ১৩৩ কোটি মানুষকেই এখন নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কাগজপত্র তৈরি করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। ঠিকঠাক কাগজ তৈরি করতে না পারলে আপনি সহ আপনার বাপ-ঠাকুরদা এদেশে জন্মে থাকলেও, নাম কাটা পড়বে— সে আপনি হিন্দুই হোন অথবা মুসলমান-জৈন-শিখ,পার্সি-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান-নাস্তিক যাই হোন না কেন। হিন্দু বলে কেউ ছাড় পাবেন না। তাঁদেরও যদি কাগজপত্র না থাকে, তাহলে স্থায়ী ঠিকানা হবে ডিটেনশন ক্যাম্প। এখন প্রশ্ন হলো যে দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী হলফনামায় নিজেকে এমএ পাশ বলে দাবি করেন, অথচ সেই নথি হারিয়ে যাওয়ায় জমা দিতে পারেন না, সেই দেশে বন্যায় হাজার হাজার গ্রাম-শহর ভেসে যাওয়া অথবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাড়িঘর সব নষ্ট হয়ে যাওয়া, দরিদ্রতম মানুষেরা কিভাবে তাঁদের নথিপত্র খুঁজে পাবেন অথবা নথিপত্র নতুন করে বানাবার জন্য অর্থই বা কোথা থেকে পাবেন? তাই আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিপত্র জোগাড়ের জন্য দৌড়াদৌড়ি করুক আর লাইনে দাঁড়াক, এক বুক আতঙ্ক নিয়ে, এটাই চাইছে আরএসএস-বিজেপি বাহিনী।
তৃতীয়ত, এর মধ্যে দিয়ে তীব্র ঘৃণার রাজনীতি এবং হিন্দু মুসলমান বিভেদের পরিস্থিতিও তৈরি করা যাবে। সেই পরিস্থিতির দিকে দ্রুত এগচ্ছে দেশ। আতঙ্কগ্রস্ত মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ কেবল রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে, তাই নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল  জুড়ে আগুন জ্বলছে কোথাও অসমীয়া এবং অ-অসমীয়া বিভেদকে কেন্দ্র করে, কোথাও উপজাতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। এর ফলে বিভেদের রাজনীতি সামগ্রিকভাবে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছে বিজেপি।

বিজেপি’র এই ঘৃণ্য বিভেদকামী রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক ভাবে জঙ্গী আন্দোলন গড়ে তোলাই দেশের মানুষের মূল কর্তব্য। কোথাও আগুন লাগিয়ে অথবা ভাঙচুর  চালিয়ে আন্দোলন পরিচালিত হলে তা বিজেপি’র উদ্দেশ্যকেই সফল করবে। ফলে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে আন্দোলনের বর্শা ফলক আরএসএস-বিজেপি  বাহিনীর দিকেই থাকে। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি প্রতিবেশি দেশের উৎপীড়িতদের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি করতে হবে নাগরিকত্ব আইন।

এনআরসি-এনপিআর-সিএএ

এনআরসি অর্থাৎ  নাগরিকপঞ্জি নতুন করে তৈরি করা এবং সিএএ নাগরিকত্ব আইন সংশোধন এই দুটি বিচ্ছিন্ন নয়। এজন্যই দেশজুড়ে এই প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ২০২৪ সালের  মধ্যে নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ শুরু করার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এরই প্রাথমিক ধাপ হিসাবে এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি তৈরি করার কাজ শুরু হবে ১ এপ্রিল, ২০২০। এর মধ্যে জনগণনার কোনও সম্পর্ক নেই। জনগণনা করা হয় ১৯৪৮ সালে তৈরি সেনসাস অ্যাক্ট অনুযায়ী। এই আইন অনুযায়ী ২৮ জুন, ২০১৯ ভারতবর্ষে রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনার  গেজেট নোটিফিকেশন জারি করে জানিয়ে দিয়েছেন, ২০২১ সালে দেশে জনগণনা হবে।

এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি তৈরি করার নির্দেশিকা জারি করেছেন Registrar General of Citizen Registration and Census Commissioner, India, এই নির্দেশিকা অনুযায়ী ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই কাজ হবে। এই নির্দেশিকা জারি হয়েছে ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনীর ৩ নম্বর ধারার ৪ নম্বর উপধারা অনুযায়ী। এই আইন অনুযায়ী একটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে নাগরিকদের দেওয়া হবে। এর থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জনগণনা এবং জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি তৈরি এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক নেই।

মনে এক, মুখে আর এক

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বারে বারে হুঙ্কার ছাড়ছেন—এরাজ্যে এনআরসি বা জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কোনওভাবেই তৈরি করতে দেওয়া হবে না। এই প্রশ্নে জনগণের দেয় করের টাকায় নিজের বিশাল ছবি সহ বিজ্ঞাপনও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দিয়ে চলেছেন। অথচ একইসাথে নবান্ন থেকে  নির্দেশিকা জারি করে এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যাপঞ্জি তৈরির কাজে নিজের সরকারের আধিকারিক এবং কর্মচারীদের বাধ্যতামূলকভাবে যোগদান করতে বলেছেন। একইসাথে শোনা যাচ্ছে রাজারহাট এবং বনগাঁতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মতো ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরির জন্য জমি চিহ্নিতকরণের কাজ প্রায় সেরে ফেলেছেন। এসবই রাজ্যের মানুষ দেখছেন। একদিকে দিল্লির সরকারের প্রবল সংখ্যালঘু বিদ্বেষ এবং অন্যদিকে হিজাব টানা মুখ্যমন্ত্রীর প্রতারণা রাজ্যের সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রবল আতঙ্ক তৈরি করেছে, যার প্রতিফলনে রাজ্য জ্বলছে।

ঐ‍‌ক্যের রক্ষক

রাজ্যে ৩৪ বছর বামফ্রন্ট সরকারের সময় কোনও মৌলবাদী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। বাবরি মসজিদ ভাঙার পর আসমুদ্র হিমাচলে আগুন লেগেছিল, কিন্তু জ্যোতি বসুর সরকার সেই আগুন এরাজ্যে ছড়াতে দেয়নি। জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সাহস হয়নি বাংলা থেকে ২ কোটি বাঙালিকে তাড়ানোর হুমকি দেওয়ার। বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের সময়েও কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সাহস হয়নি এই কথা বলার অথবা প্রবল বিভেদকামী আইন পাশ করার, কারণ সংসদে তখন বামপন্থীরা সংখ্যায় অনেক ছিল, আর তিনটি রাজ্যে বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। বামপন্থীরা দুর্বল হলে দেশে ঘৃণার রাজনীতি আগুন জ্বালাতে পারে, দেশের সম্পদ বিক্রি করে দিতে পারে শাসকদল।

আন্দোলনের বর্শা ফলক

আরএসএস-বিজেপি’র ঘৃণ্য ও বিভেদকামী রাজনীতির  বিরুদ্ধে চাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন অথবা এনআরসি কেবলমাত্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সমস্যা নয়। এই সমস্যা জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীর। তাই কেবলমাত্র ধর্মের নাম করে কোনও আন্দোলন পরিচালিত হলে তা আরএসএস-বিজেপি’কে রুখতে পারবে না। বরং তাতে দাঙ্গার উত্তাপ ছড়াবে, আর এটাই চায় আরএসএস-বিজেপি। ধর্ম এবং রাজনীতিকে এক করতে চায় আরএসএস-বিজেপি। এটা দেশের ঐক্যের পক্ষে বিপজ্জনক। এদের ফাঁদে পড়া হবে আত্মহত্যার শামিল। সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ করে নয়, বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেই আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই আন্দোলনের বর্শা ফলকের অভিমুখ থাকুক আরএসএস-বিজেপি’র ঘৃণা ও বিভেদের রাজনীতির প্রতি। দাবি উঠুক ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব নয়, স্বাধীনতার ৭৩ বছর পরে দেশের ১৩৩ কোটি মানুষকে নাগরিকত্ব প্রমাণেই লাইনে দাঁড় করানো চলবে না। লড়াই হোক শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি, কৃষকের ফসলের দাম, বেকারের কাজ, স্বল্পমূল্যে সবার শিক্ষার দাবিতে। লড়াই হোক ক্রমবর্ধমান মূল্যবৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি বিক্রি, ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া কৃষকের আত্মহত্যা, ব্যাঙ্কে আমার/আপনার সঞ্চিত টাকা লুট, ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে। লড়াই হোক লুটে খাওয়াদের বিরুদ্ধে, খেটে খাওয়া মানুষের।

গণশক্তি, ১৭ডিসেম্বর, ২০১৯



20181205

#দিদিভাই-মোদীভাই: ফ্রেন্ডশিপ আনলিমিটেড



অজয় দাশগুপ্ত   

গত ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮। পেট্রল-ডিজেলের দামে আগুন, বাজারে জিনিসপত্রের দামও একইভাবে হুহু করে বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থী দলগুলিসহ প্রায় সমস্ত বিরোধী দল ভারত বনধ্‌-এর ডাক দিলো। তৃণমূলের অবস্থান ছিল দেখার মতো, একেবারে ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ গোছের! বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বন্‌ধ-এ ওদের ‘না’ (যদিও বামফ্রন্ট সরকারের সময় এরাজ্যে মুড়ি-মুড়কির মতো বনধ্‌ ডাকতো তৃণমূল); কিন্তু বিজেপি-বিরোধী হিসেবে নিজেদের প্রতিপন্ন করার আপ্রাণ চেষ্টায় নাম কা ওয়াস্তে পড়ন্ত বিকেলে একটা ছোটোখাটো প্রতিবাদ মিছিল। শুধু কি তাই, বিজেপি-র কাছে নাম্বার বাড়াতে বন্‌ধ ব্যর্থ করার মরিয়া চেষ্টায় নামলো তৃণমূলী প্রশাসন, পুলিশ ও ঠ্যাঙারেবাহিনী। ভারতের কোনো রাজ্যে, এমনকি বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতেও যেটা হয়নি, সেই ‘ডায়াস-নন’ নামে সরকারী ও আধা-সরকারী কর্মচারীদের স্বার্থবিরোধী ফতোয়া জারি করলো তৃণমূল সরকার! সরকারী বাস-ট্রাম অন্যদিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চালিয়ে সচল রাখার চেষ্টা। যদিও সে চেষ্টা সফল হয়নি।

সে যাইহোক, এই আনুগত্যের ফলাফল কিন্তু হাতেনাতে পেয়েছে তৃণমূল। এর দুদিনের মধ্যেই, গত ১২ই সেপ্টেম্বর সংসদের নীতিবিষয়ক (এথিক্স) কমিটি পুনর্গঠিত করলেন লোকসভার অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন এবং নারদ ঘুষকান্ডের তদন্তে গত আড়াই বছর ধরে একটিও মিটিং না ডেকে শীতঘুমে থাকা এই কমিটির চেয়ারম্যান আবার হলেন বিজেপি-র প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। গত ১লা আগস্ট দিল্লিতে সংসদ ভবনে তাঁর কক্ষে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রণাম করার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা ‘সৌজন্যমূলক’ আলাপচারিতায় ব্যস্ত ছিলেন, বলেও আমরা সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানতে পেরেছিলাম! 

আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ২০১৭সালের ২১শে নভেম্বর ভদ্রেশ্বর পৌরসভার তৃণমূল বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোজ উপাধ্যায় খুন হলেন। এই ঘটনায় বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বললেন, ‘‘মনোজ উপাধ্যায়কে অনেকদিন ধরে চিনি। উনি দীর্ঘদিনের আর এস এস কার্যকর্তা। উনি রামনবমীর মিছিলও করেছেন।’’ এরকম আরও অনেক আর এস এস স্বয়ংসেবক তৃণমূলের মধ্যে যে কাজ করছে, তা তৃণমূলের উদ্যোগে রামনবমী, গণেশপুজো, জন্মাষ্টমীর বহর দেখলেই বোঝা যায়সদ্য দলত্যাগী, তৃণমূলের একদা ‘সেকেন্ড-ইন কম্যান্ড’ মুকুল রায় কিছুদিন আগেই সাংবাদিক সম্মেলনে খোলসা করে বলেছেন, ‘‘জন্মলগ্ন থেকেই বি জে পি-র সহযোগিতা, সাহায্য নিয়েই এগিয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের যে সাংগঠনিক শক্তি এত বেড়েছে তা বি জে পি-র সাহায্যেই হয়েছে।’’

এটা কোনও গোপন বিষয় নয়, সবারই জানা। তবুও তৃণমূলের নেতানেত্রীরা এবং তাদের প্রসাদপুষ্ট মিডিয়া বারবার মানুষের মধ্যে এই ধারণাই গড়ে তুলতে চায়, যে বি জে পি-র বিরুদ্ধে লড়ছে একমাত্র তৃণমূলই! এই লক্ষ্যেই বামপন্থীদের সমস্ত আন্দোলন-কর্মসূচির খবর কর্পোরেট মিডিয়া ব্ল্যাক আউট করার অঘোষিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে ‘মহাপডাও’ বা এরাজ্যে বি পি এম ও পদযাত্রার মতো কয়েকটি ঘটনায় এটা প্রমাণিত। অথচ, এটা ঘটনা যে বি জে পি এবং তৃণমূল, এরাজ্যে এই দুই দলই কাজ করছে পরস্পরকে পুষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে, ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’র কৌশল অবলম্বন করে।

(২)

আসলে, পশ্চিমবাংলায় বি জে পি-আর এস এস-এর ভিত তৈরির জন্যই কংগ্রেস ভেঙে জন্ম হয়েছিল তৃণমূল নামে দলটার। তৃণমূল তৈরির আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই দল এবং দলের সুপ্রিমোর গতি-প্রকৃতি একটু তলিয়ে বিচার করলেই সেটা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বি জে পি-আর এস এস ‘মুখ’, আর তৃণমূল ‘মুখোশ’-এর কাজ করে চলেছে বিভিন্ন সময়। যেখানে এবং যখন ‘মুখ’ দেখিয়ে কাজ হবে না, তখন ‘মুখোশ’ দেখাও! কিছু লোকদেখানো নাটকবাজি সঙ্গে যুক্ত করো, ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য! তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে ইতিহাস একটু খতিয়ে দেখলেই এটা আরও স্পষ্ট হবে। 

১৯৯২সালের ৬ই ডিসেম্বর। গোটা বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো চারশো বছরের পুরানো বাবরি মসজিদের ইমারতকে। মমতা ব্যানার্জি তখন কংগ্রেসে, কেন্দ্রে নরসিমা রাও সরকারের মন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তখন বারবার প্রধানমন্ত্রীকে বি জে পি-আর এস এস যে বাবরি মসজিদ ভাঙতে চলেছে, তানিয়ে সতর্ক করছিলেন। ৪ঠা ডিসেম্বর বামফ্রন্ট প্রতিবাদ সমাবেশও করে কলকাতায়। সেদিনই পালটা সভা করে মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘‘অযোধ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে সি পি এম। বি জে পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। এসব সি পি এম-এর ষড়যন্ত্র।’’ মসজিদ ভাঙার পর অবশ্য এনিয়ে তিনি এই সেদিন পর্যন্ত টুঁ শব্দটি করেননি। আচমকা এবছর তিনি ৬ই ডিসেম্বর মুখ খুলে নানারকম আষাঢ়ে গল্প শুনিয়েছেন!

১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৩দিনের সরকারের পতন হলো। গঠিত হলো সংযুক্ত মোর্চার সরকার। এই সময় জাতীয় রাজনীতিতে বি জে পি যখন একেবারে কোণঠাসা, কার্যত আঞ্চলিক দলগুলি যখন বি জে পি-কে একঘরে করে দিয়েছিল, ঠিক তখনই বি জে পি-কে বাঁচাতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে মমতা ব্যানার্জির। কংগ্রেস ভেঙে তখন তিনি নতুন দল গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তৃণমূল তৈরি হওয়ার আগেই, ১৯৯৭ সা‌লের ডি‌সেম্বর মা‌সে, মমতা ব্যানার্জিই প্রথম বলেন, ‘‘বি‌ জে ‌পি অচ্ছুৎ নয়’’। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষদের অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন দল গড়ার মদতটা কোন জায়গা থেকে এসেছিল, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি। ১৯৯৮সা‌লের লোকসভা ভো‌টে জোট বাঁধ‌লেন বি‌ জে ‌পি-র স‌ঙ্গে। বি জে পি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানি তখন বলেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বি জে পি-র সঙ্গে তৃণমূলের এই জোট একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।’’ জ্যোতি বসু এই প্রসঙ্গে বারবার বলতেন, ‘‘তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অপরাধ ওরা সাম্প্রদায়িক বি জে পি-কে এরাজ্যে হাত ধরে ডেকে এনেছে।’’

(৩)
১৯৯৮ সালে লোকসভা নির্বাচনের পর প্রথম এন ডি এ সরকারের রেল মন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন হয়ে তৃণমূলনেত্রী ক্ষমতার অলিন্দে। ১৯৯৯ সালে আবার বি জে পি-র সঙ্গে জোট, আবার সরকারে, এবার রেলমন্ত্রী। যদিও ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফায়দা তোলার জন্য এন ডি এ থেকে বের হয়ে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধেন। কিন্তু কলকাতা কর্পোরেশনে সেই সময়েও তাদের সঙ্গে বি জে পি-র জোট পুরোদস্তুর বহাল ছিল। তৃণমূলের সুব্রত মুখার্জি মেয়র এবং বি জে পি-র মীনাদেবী পুরোহিত ডেপুটি মেয়রবিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মমতা ব্যানার্জি আবার ফিরে যান এন ডি এ-তে। এবার হন কয়লামন্ত্রী। সেই সময়, ২০০১ সালের ২৪শে আগস্ট বি বি সি-র ‘হার্ডটক ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠানে করণ থাপারের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট বলেন, ‘‘বি জে পি আমাদের স্বাভাবিক মিত্র..।’’

এন ডি এ আমলেই ২০০২ সালের গোড়াতে হয় গুজরাটে সংখ্যালঘু গণহত্যা, ভারতের ইতিহাসে যা বর্বরতম ঘটনা। বিশ্বজুড়ে এর নিন্দা হয়েছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এই হত্যাকাণ্ডের কোনও প্রতিবাদ করেননি। তখন তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটা বি জে পি-র অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’ ওই বছরই গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি আবার জয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।

২০০৩ সা‌লে ১৫ই সেপ্টেম্বর নয়া‌দি‌ল্লি‌তে আর এস এস-এর মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’-র সম্পাদক তরুণ বিজয় সম্পাদিত ‘কমিউনিস্ট টেররিজম’ নামে পুস্তক প্রকাশ অনুষ্ঠা‌নে মমতা ব্যানার্জি ব‌লেন, ‘‘কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি আপনাদের পাশে আছি। য‌দি আপনারা আমায় ১শতাংশ সাহায্য ক‌রেন, আমরা ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের সরা‌তে পার‌বো।’’ মমতা ব্যানার্জির আহ্বা‌নে আর এস এস স্বয়ংসেবকরা খুবই উৎসা‌হিত হয়অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহন ভাগবত, মদনদাস দেবী, এইচ ভি শেষাদ্রির মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী শীর্ষ নেতারা। তাঁদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘‘..আপনারাই হলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।’’ ‌বি‌ জে পি-র তৎকা‌লীন রাজ্যসভা সাংসদ বলবীর পুঞ্জ, ওই সভা‌তেই ব‌লেন,‘‘আমা‌দের প্রিয় মমতাদি‌দি সাক্ষাৎ দুর্গা।’’

আর এস এস-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের ‘খাঁটি দেশপ্রেমিক’ বলে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি, তা কিন্তু স্বয়ংসেবকরা ভোলেনি। গত লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে, ২০১৩সালের ৪ঠা আগস্ট ‘সঙ্ঘ পরিবার’ টুইট করে জানিয়েছিল যে মমতা সেদিন তাঁদের ‘প্রশংসায় পঞ্চমুখ’ হয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের কৃতজ্ঞতা এখনও যে ম্লান হয়নি, তা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরেও তারা জানিয়েছে।

২০০৪-র লোকসভা নির্বাচনেও বি জে পি-র সঙ্গেই ছিল তৃণমূল। ২০০৪ সা‌লে ৮ই এপ্রিল নয়া‌দি‌ল্লি‌তে বিজে‌পি নেতৃত্বাধীন এন‌ ডি এ-র লোকসভা নির্বাচ‌নের ইশ‌্‌তেহার প্রকা‌শিত হয়। প্রকাশ ক‌রেন অটলবিহারী বাজ‌পেয়ী। ইশ‌্‌তেহা‌রে রামম‌ন্দির ‌নির্মা‌ণের ইস্যু, গোহত্যা বন্ধের মতো বিষয় লেখা হ‌য়ে‌ছিল। আবার সরকা‌রে এলে কয়লাখ‌নি বেসরকারি হাতেই যা‌বে, সেকথাও বলা হয়েছিল। ‌বি‌ জে ‌পি-র এতগু‌লো লক্ষ্য উল্লেখ ক‌রা হয়ে‌ছি‌ল ওই ইশ্‌তেহার। ওইদিন মঞ্চে হা‌জির ছি‌লেন, এন‌ ডি এ-র ১১টি শ‌রিক দ‌লের মধ্যে মাত্র ৫টি দলের প্রতি‌নি‌ধি। সেই ৫জনের মধ্যে একজন হ‌লেন মমতা ব্যানা‌র্জি। সে‌দিন ইশ‌্‌তেহার প্রকা‌শিত হওয়ার আগেই সম্ম‌তি জা‌নি‌য়ে তাতে সই করে‌ছি‌লেন তি‌নি।

২০০৫ সা‌লের ৪ঠা আগস্ট সংসদে প‌শ্চিমব‌ঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ’-এর অভিযোগ তুলে, এবিষয়ে আর এস এস-র বহুলপ্রচারিত বক্তব্যই আওড়াতে থাকেন মমতা ব্যানার্জি। আসলে তার মাধ্যমে তিনি সঙ্ঘ পরিবারকে বার্তা দিতে চাইছিলেন: ‘‘আমি তোমা‌দেরই লোক।’’

২০০৬-র বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল বি জে পি-র সঙ্গে জোট বেঁধেই এরাজ্যে লড়েছিল। নির্বাচনের পরে ওই বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ধর্মতলায় অনশন মঞ্চে তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বামফ্রন্টবিরোধী যাবতীয় ষড়যন্ত্র, হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনে বরাবর তৃণমূলকে মদত জুগিয়েছে বি জে পি–আর এস এস।

এমনকি, ২০০৯-র লোকসভা ভোটে এবং ২০১১সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল জোট বাঁধলেও বি জে পি-আর এস এস বামফ্রন্টকে পরাস্ত করতে তৃণমূলের হয়েই যে গোপনে কাজ করেছিল, পরে বি জে পি-আর এস এস-র নেতারা বিভিন্ন প্রকাশ্য সভায় তা বলেছেন। চরম বামপন্থী থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী-মাওবাদী থেকে আর এস এস-সমস্ত শক্তির তখন একটাই লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে হটানো। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের পর ২০১২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর তৃণমূল দ্বিতীয় ইউ পি এ মন্ত্রিসভা থেকে সরে যায়।

(৪)
২০১১-য় রাজ্যে তথাকথিত ‘পরিবর্তন’-র পরে মমতা ব্যানার্জিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। তবু ‘কমিউনিস্ট’ নিধনের আহ্বানটিই যেন মমতা ব্যানার্জিকে মনে করিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন —‘‘প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন।’’ ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ে উল্লসিত আর এস এস তাদের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপত্র ‘স্বস্তিকা’র ২৩শে মে, ২০১১ তারিখের সম্পাদকীয়তে লেখে: ‘‘অবশেষে দুঃশাসনের অবসান।...ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।’’

২০১৩সালে হাওড়া লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। দেওয়ালে বি জে পি প্রার্থীর নাম লেখাও শুরু হয়েছিল। এই অবস্থায় দিল্লিতে বি জে পি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের বাড়িতে হাজির তখন তৃণমূলের প্রভাবশালী সাংসদ, চিট ফান্ড মালিক কে ডি সিং। বি জে পি-র সাধারণ সম্পাদক রাজীব প্রতাপ রুডির উপস্থিতিতে আঁতাত সম্পন্নএকেবারে শেষ মুহূর্তে বি জে পি প্রার্থীর নাম প্রত্যাহার।

২০১৩সালের পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূল-বি জে পি সুযোগ বুঝে আঁতাত করেছে। যেমন, পাঁশকুড়ার চৈতন্যপুর-১নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে বি জে পি-কে সঙ্গে নিয়েই পঞ্চায়েত গঠন করেছিল তৃণমূল। প্রধান বি জে পি-র, উপপ্রধান তৃণমূলের! মিনাখাঁ, বামনপুকুর, চৈতল—তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতই চলেছে তৃণমূল-বি জে পি-র যৌথ বোঝাপড়ায়, একেবারে প্রকাশ্যে। উদাহরণ আরও আছে। অবশ্য, পরে বেশ কিছু জায়গায় অন্য দলের মতই বি জে পি-র পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদেরও দল ভাঙিয়েছে তৃণমূল।

সারদাসহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ ঘুষকাণ্ডে এই দুই দলের গোপন বোঝাপড়া দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৪সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন বক্তৃতায় চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি, যেমন সি বি আই, ই ডি, এস এফ আই ও কি করেছে? চার বছরের বেশি সময় ধরে ক্রমাগত টালবাহানা করে এই তদন্ত বিলম্বিত করে চলেছে।

মণিপুরে, ২০১৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর বি জে পি-র সরকার গড়তে সমর্থন করে একমাত্র তৃণমূল বিধায়ক টি রবীন্দ্র সিং। আস্থাভোটে বি জে পি-কে সমর্থন করার পর ওই তৃণমূল বিধায়ক বলে ‘দলের নির্দেশেই সমর্থন।’ আজ পর্যন্ত সেই বিধায়ককে তৃণমূল আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করেনি। 

অন্যদিকে, ত্রিপুরার ঘটনায় তৃণমূল যে আদতে বি জে পি-কেই পুষ্ট করতে কাজ করছে, তা একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেসের ৬বিধায়ক ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রথমে তৃণমূলে যোগ দেয়। কিন্তু এবছর এপ্রিল মাসে এই ৬বিধায়কই বি জে পি-তে যোগ দেয়। এমনকি, তৃণমূলের রাজ্যদপ্তরের সাইনবোর্ড পর্যন্ত তারা উলটে দিয়ে তাকে বি জে পি-র দপ্তরে পরিণত করেছে!

সংসদে বিভিন্ন ঘটনায় তৃণমূলের সঙ্গে বি জে পি-র গোপন বোঝাপড়া স্পষ্ট! ২০১৭ সালের ২৯শে মার্চ রাজ্যসভায় অর্থবিল পাশ করাতে তৃণমূল ওয়াক-আউট করে। রাজ্যসভায় অর্থবিলের বিরুদ্ধে তৃণমূল ভোট দিলে তা অনুমোদন হতো না, বেকায়দায় পড়তো মোদী সরকার। কিন্তু সমস্ত বিরোধী দল ভোট দিলেও তৃণমূল অধিবেশন বয়কট করে ওই বিল অনুমোদনের সুযোগ করে দেয় বি জে পি-কে। সংসদে বারেবারে বিজেপি সরকারকে সাহায্য করে চলেছে তৃণমূল। সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নে তৃণমূল কিভাবে বিজেপি-র ‘অনুগত বিরোধী’র ভূমিকা পালন করে চলেছে, তা গত ৪ঠা মার্চ, ২০১৬ ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি সংবাদ (TMC plays 'loyal Opposition', only for PM) দেখলেই বোঝা যাবে। ঠিক বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংসদের অধিবেশনে যখন বিরোধীরা মোদী সরকারকে তুলোধোনা করছেন, তখন তৃণমূল সাংসদদের কাছে খোদ মমতা ব্যানার্জির কাছথেকে নির্দেশ আসে যে ‘অনুগত বিরোধী’র ভূমিকা পালন করতে হবে, যা শুনে এমনকি তৃণমূল সাংসদরাও বিস্মিত হয়ে যান। বিরোধী দলগুলি যখনই এককাট্টা হয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণে নেমেছে, তখনই ছলেবলে কৌশলে তৃণমূল তা এড়িয়ে গেছে, বা বানচাল করার চেষ্টা করেছে। ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ তারই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ!

নারদ ঘুষকান্ডর কথা আগেই বলা হয়েছে। নারদকাণ্ডের জেরে গঠিত লোকসভার এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন বি জে পি-র বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি‘এক্স ফাইলস’-এর ভিডিও ফুটেজে তৃণমূলের যে সব সাংসদকে দেখা গিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। লোকসভায় নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার আড়াই বছর বাদেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার। কেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে পর্যাপ্ত নথিপত্র দেওয়ার পরেও চিট ফান্ড মালিক তৃণমূল সাংসদ (বর্তমানে সাসপেন্ডেড) কে ডি সিংয়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

অথচ ইউ পি এ সরকারের আমলে যখন লোকসভার অধ্যক্ষ ছিলেন সোমনাথ চ্যাটার্জি, তখন ঘুষকান্ডে জড়িত সাংসদদের বিরুদ্ধো মাত্র ১২দিনের মধ্যে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ২০০৫সালের ১২ই ডিসেম্বর গোটা দেশ তোলপাড় হয়েছিল ১১জন সাংসদের ঘুষ নেওয়ার ক্যামেরাবন্দি দৃশ্যে। ১০জন লোকসভার ও ১জন রাজ্যসভার সদস্যকে সেদিনও এক স্টিং অপরেশনে দেখা গিয়েছিল ঘুষ নিতে। তারমধ্যে ৬ই জনই ছিল বিজেপি-র সাংসদ। ২০০৫সালের ২৪শে ডিসেম্বর মাত্র ১২দিনের মধ্যে লোকসভার ১০জন সাংসদ ও রাজ্যসভার ১জন সাংসদকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এখন আড়াই বছর আগে নারদ ঘুষকান্ডে তৃণমূল সাংসদদের ক্যামেরাবন্দী ভিডিও ফরেনসিক টেস্টে প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাঁদের সদস্যপদ টিঁকিয়ে রেখে বিজেপি-র কী লাভ, এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই!

(৫)
২০১৬সালের বিধানসভা নির্বাচনেও যে অন্তত ১০০টা কেন্দ্রে বি জে পি প্রার্থীরা বিরোধী ভোট কেটে তৃণমূলকে সহযোগিতা করেছে, কলকাতায় এসে সেকথা বলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী। বি জে পি না থাকলে তৃণমূলের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা যে সহজ হতো না তা মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বিধানসভা ভোটের আগে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের সভায় খোলাখুলি বলেছেন, ‘‘আমরা এখানে এমন কিছু করতে পারি না, যাতে কমিউনিস্টরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।’’

তৃণমূলের নীতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ন্ত। বি জে পি-র হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে উসকানি দিচ্ছে তৃণমূল, যাতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতাই আরও পুষ্ট হচ্ছে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে বামফ্রন্ট সরকারের সময় বাংলায় আর এস এস-র শাখা ছিল মাত্র ৪৭৫টি। কিন্তু গত ছয় বছরে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী সংগঠনটির শাখা পশ্চিমবঙ্গে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০০। রাজ্যে আর এস এস পরিচালিত প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ৩০৯টি। এছাড়া ১৬টিতে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশুনা হয়। আর এরমধ্যে ১৫টি গড়ে উঠেছে গত পাঁচ বছরে। এই তিনশোর বেশি হিন্দুত্ববাদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৬হাজার ৯০ জন। ৫০০টি শিশুমন্দির ও ৫০টি বিদ্যালয়মন্দির (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত এগচ্ছে আর এস এস।

গত তিন বছরে রাজ্যে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে ধূলাগড়, বসিরহাট, নোয়াপাড়ার মতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা। এই সবকটি ঘটনাতেই স্পষ্ট, বি জে পি-আর এস এস-হিন্দু সংহতি সমিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই সাম্প্রদায়িক বিভাজনে নেমেছে তৃণমূল, যাতে ভোটের রাজনীতির ফায়দা হয়। পরস্পরকে পুষ্ট করার লক্ষ্য নিয়েই এই দুই দল এগচ্ছে। ‘রামনবমী’র মিছিলের পালটা ‘হনুমান জয়ন্তী’ করা তারই একটি উদাহরণ। এরাজ্যে প্রথম গোরক্ষকদের হাতে খুন হয়েছিল ধূপগুড়িতে, গরিব পরিবারের দুই ১৯ বছরের কিশোর। গ্রেপ্তার হলো পাঁচ-তিনজন তৃণমূলের, দুইজন আর এস এস’র.! কেশিয়াড়িতে ১৫একর জমিতে আর এস এস গোশালা করলো..গোমূত্র মেলে সেখানে....জমি দিল তৃণমূল.....গোমূত্র বিক্রিও করছে তৃণমূল.....এরাজ্যের বুকে গণতন্ত্র রক্ষা, শ্রমিকের লড়াই, কৃষকের লড়াই, ছাত্রদের ক্যাম্পাস রক্ষার লড়াই, বিভাজনের রাজনীতির ঠেকানোর লড়াই এমনকি বি জে পি’র বিরুদ্ধে লড়াই- এসবের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বাধা তৃণমূল..মমতার বাহিনীর এই উন্মত্ত ভোটলুটের একটা উদ্দেশ্য হলো বিজেপি’কে জায়গা করে দেওয়া...প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গো, গত ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকারটা (নিশ্চয়ই পড়েছেন) আরেকবার পড়ে নিতে অনুরোধ করছি। ওখানে তৃণমূলের 'স্বৈরতান্ত্রিক' চরিত্র উল্লেখ করে উনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন কেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মেলালে বামপন্থীদের ক্ষতিই হবে। বরং বিজেপি-র বিরুদ্ধে অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে ঐক‍্যবদ্ধ প্রতিরোধে নামাটাই জরুরী কাজ এই মুহূর্তে। তৃণমূল যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাও উনি  স্পষ্টভাষায় বলেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অপসারণ আর এস এস-র লক্ষ্য নয়। আর এস এস মমতা ব্যানার্জির ‘আত্মশুদ্ধি’ চায়। চায় তৃণমূল কংগ্রেসের ‘রিফর্ম’। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হায়দরাবাদে তিনদিনের জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৪ই জানুয়ারি ব্রিগেডের সভাতেও আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। বি জে পি এবং সর্বোপরি আর এস এস-এর হয়ে কিভাবে তৃণমূল দল কাজ করছে, আর বি জে পি-আর এস এস কিভাবে তৃণমূলকে টিকিয়ে রেখেছে, তৃণমূল যে আদতে বি‌ জে‌ পি-র ‘মু‌খোশ’ তা যত দিন যাবে, ততই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
********
২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮

‘দুন্দুভি’ শারদ সংকলন