Showing posts with label জ্যোতি বসু. Show all posts
Showing posts with label জ্যোতি বসু. Show all posts

20220905

‘‘জুতোটা ঠিক জায়গায় লেগেছে তো?’’


অজয় দাশগুপ্ত
 

সেদিন অফিসে ঢুকতেই অভীকদা বললো, ‘‘একবার ওবাড়িতে যাও। বিমানদা তোমাকে ডেকেছেন!’’

আমি ব্যাগটা রেখে সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে আলিমুদ্দিনে ছুটলাম।

বিমানদা আমাকে দেখেই বললেন, ‘‘শোনো, তোমাকে কাল একবার জ্যোতিবাবুর বাড়ি যেতে হবে। ৩১ তারিখের সমাবেশের জন্য ওনার একটা শুভেচ্ছা বার্তা আনতে হবে।’’

২০০৯ সালের ৩১আগস্ট খাদ্য আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী বর্ষ উপলক্ষে বামফ্রন্ট ধর্মতলায় বিশাল সমাবেশের ডাক দিয়েছিল। তার দু’দিন আগের এই ঘটনা।

আমি বিমানদাকে বললাম, ‘‘জ্যোতিবাবুর একটা লেখা তো করে এনেছি। সেটা ৩১তারিখ গণশক্তিতে ছাপা হবে।’’

বিমানদা বললেন, ‘‘হ্যাঁ, জানি সেটা। এটা শুভেচ্ছা বার্তা, সমাবেশে পাঠ করা হবে। জ্যোতিবাবু তো তোমার কথা বললেন।’’

বলে বিমানদা হাসতে লাগলেন, ‘‘জ্যোতিবাবু বললেন, ‘তোমার ওই মোটা ছেলেটাকে পাঠিও, ও নিয়ে যাবে।’ উনি মোটা ছেলেটা বলতে কাকে বলেন, সেটা আমি জানি। যাইহোক, তুমি কখন যাবে, সেটা জয়ের সঙ্গে কথা বলে নিও।’’

**********************

অফিসে এসে জয়কৃষ্ণ ঘোষকে ফোন করলাম। পরদিন সকাল দশটায় ইন্দিরা ভবনে যেতে বললেন। নিয়মমতো দশটার আগেই পৌঁছে গেলাম। কাঁটায় কাঁটায় দশটার সময় উনি বাইরের ঘরে এলেন। এসেই বললেন, ‘‘বিমান এসেছিল। ও বললো, যা প্রস্তুতির খবর এসেছে, তাতে বিশাল সমাবেশ হবে। এত মানুষ আসবেন, আপনি একটা শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিলে ভালো হয়আমি বলছি, তুমি লিখে নাও।’’

উনি খুব সংক্ষেপে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা দিলেন। খুব তাড়াতাড়িই আমার কাজ শেষ হয়ে গেল। 

**********************

 

                                                  সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ

১৯৫৯ সালের ৩১আগস্টের ঘটনার পর ২১ সেপ্টেম্বর বিধানসভার অধিবেশন শুরু হলে খাদ্য আন্দোলনের ফলে পুলিশী আক্রমণে নিহত ৮০ জন শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালনের দাবি জানানো হলে তা মানতে অস্বীকার করে শাসক কংগ্রেস ও পিএসপি-র সদস্যরা। তখন তুমুল হট্টগোল শুরু হয়। এমনকি জুতো ছোড়াছুড়িও হয়েছিল বলে জানা যায়হইচই থামলে জ্যোতিবাবু খাদ্য আন্দোলনের প্রসঙ্গে মুলতবি প্রস্তাব এনে তৎকালীন রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বিধানসভায় ভাষণ দেন। পরে বিধান রায় সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে বিরোধী দলের সদস্যরা। ২৮ সেপ্টেম্বর অনাস্থা প্রস্তাবের ওপরেও ভাষণ দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু।

সেদিনের গণশক্তিতে জ্যোতিবাবুর ২১ সেপ্টেম্বরের বক্তৃতাটিই পুনর্মুদ্রিত করা হয়েছিল। আমি ওঁর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্যই ওনাকে ওই বক্তৃতাটা ছাপানোর কথা বললাম।

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘হ্যাঁ, জয় আমাকে বলেছে। তোমরা তো অনেক কিছু ছেপেছো।’’

তারপর উনি সেই অধিবেশনের ঘটনার কথা বলতে শুরু করলেন। একেবারে ফোটোগ্রাফিক মেমোরি!

‘‘ওইদিন তো খুব গোলমাল হয়েছিল হাউসে। চিৎকার চেঁচামেচি হচ্ছিলো। কংগ্রেসের এমএলএ’রা বললো, আমি নাকি জুতো ছুড়ে মেরেছি। আমি পা থেকে জুতো খুলে দেখিয়ে বললাম, আমার জুতো আমার পায়েই আছে। আমি জুতো ছুড়িনি। আসলে মণিকুন্তলা ছুড়েছিল।’’

তারপর একটু থেমে বললেন, ‘‘সাউথ ইন্ডিয়া থেকে আমাদের পার্টির কয়েকজন নেতা এখানে এসেছিলেন। তাঁরা সেদিন অধিবেশন দেখতে বিধানসভায় ভিজিটার্স গ্যালারিতে ছিলেন। তাঁরা পরে পার্টি অফিসে এসে বললেন, বিধানসভায় এসব আবার কী হচ্ছে?’’

জ্যোতিবাবু একটু পরিহাসের সুরেই বললেন, ‘‘আসলে এখানকার মানুষের তখন ক্ষোভ কতটা বেশি ছিল, সে সম্পর্কে ওঁদের কোনো ধারণাই ছিল না। বিধানসভায় তখন একজন নির্দল এমএলএ ছিলেন, আন্দোলনে আমাদের সঙ্গেই ছিলেন, নামটা এখন মনে পড়ছে না। উনি পরে আমাকে বলেছিলেন, বিধানসভাতেও বলেছেন একটা ঘটনার কথা। উনি বাজারে মাছ কিনতে গেছেন। মাছওলা ওনাকে প্রশ্ন করেছেন, জুতোটা ঠিক জায়গায় লেগেছে তো? সেই সময় মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।’’

 

*********************

 

                                        ২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় বামফ্রন্টের 
                                          সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

ইন্দিরা ভবনে থেকে ফিরে তড়িঘড়ি কম্পোজ করে পার্টি অফিসে দিয়ে এলাম। ঘন্টাখানেক বাদে আবার ওবাড়ি থেকে ফোন। ওপারে বিমানদা। বললেন, ‘‘শোনো, তুমি আরেকবার ইন্দিরা ভবনে যাও। কম্পোজ কপিটার নিচে জ্যোতিবাবুর সই করিয়ে আনতে হবে। প্রেসকে আমরা সেটার কপিই দেবো।’’ বিমানদা আরও বললেন, ‘‘আমি জ্যোতিবাবুকে বলে রেখেছি। তুমি গেলেই সই করে দেবেন।’’

কী আর করা! আবার বিকেলে ছুটলাম। আমাকে দেখেই জ্যোতিবাবুর সস্নেহ হাসি, ‘‘কি, তোমায় আবার আসতে হলো তো! বিমানের যতসব কান্ড!’’

জয়কৃষ্ণ ঘোষ আগে থেকেই একটা সিগনেচার স্ট্যান্ড আনিয়ে রেখেছিলেন। সাদা কাগজের প্যাডও ছিল।

জ্যোতিবাবু বললেন, ‘‘সই-টই করা এখন খুব ঝামেলার ব্যাপার!’’

জয়দা বললেন, ‘‘আপনি ওই সাদা কাগজে তিন-চারবার মকসো করে নিন। তারপর ওই বার্তাটায় সই করবেন।’’

জ্যোতিবাবু তাই করলেন। আমি গোটা তিনেক কপি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। সবগুলোতেই সই করিয়ে নিলাম।

জয়দা আমাকে বললেন, ‘‘আসলে এখন বছরে একবার সই করতে হয় ওনাকে। প্রাক্তন বিধায়ক হিসেবে যে পেনশন পান, সেটা পার্টির রাজ্য কমিটিকে চেক লিখে দিয়ে দেন। ওটাই বছরে একবার করতে হয়’’ 

 জ্যোতি বসুর স্বাক্ষরিত এই সেই বার্তা

********************

 

                                ২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় বামফ্রন্টের  সমাবেশ

২০০৯ সালের ৩১আগস্ট ধর্মতলায় সেবার যে সমাবেশ হয়েছিল, তা সঠিক অর্থেই ছিল ঐতিহাসিক। ‘‘অনুগত’’ সংবাদমাধ্যমে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর চেষ্টা হলেও ধর্মতলায় অতবড় সমাবেশ এখনও পর্যন্ত কোন দলই ক্ষমতায় থাকতে বা না থাকতে করতে পারে নি। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য প্রধান বক্তা ছিলেন। বামফ্রন্টের নেতারা বক্তব্য রেখেছিলেন।

সমাবেশের শুরুতেই জ্যোতিবাবুর শুভেচ্ছা বার্তা পাঠ করে বিমানদা কাগজটা সমবেত জনতাকে দেখিয়ে বললেন, ‘‘এটা জ্যোতিবাবুর শুভেচ্ছা বার্তা, এই যে দেখুন ওনার সই করা আছে।’’

লাখো লাখো জনতা মুখরিত সখ্যে সেই বার্তা গ্রহণ করলেন।

********************

সংযোজন: ১৯৫৯ সালের ২৮সেপ্টেম্বর বিধানসভার কার্যবিবরণী থেকে দেখা যাচ্ছে, পিএসপি বিধায়ক (১৯৫৭ সালে নির্বাচনে জেতার পর নিজেকে দলের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে চলছিলেন) সুধীর চন্দ্র রায়চৌধুরী বলেছিলেন, ‘‘....গুলি চালিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপর্যস্ত করে বসে থাকা মোটেই সম্মানের কাজ নয়। এখানে জুতো ছোড়াছুড়ি নিন্দনীয়, নিশ্চয়ই এবিষয়ে কোন ভুল নেই, কিন্তু সাধারণ মানুষ এতে খুব দুঃখিত হয়েছে তা নয়। এক ভদ্রলোক আমাকে সেদিন বললেন — আচ্ছা, কালীবাবুর মুখে কি জুতা গিয়ে পড়েছিলো? আমি বললাম, অত তো লক্ষ্য করিনি। তখন তিনি জিজ্ঞাসা করলেন — প্রফুল্লবাবু কি তখন ঘরে ছিলেন না? আমি বললাম — হ্যাঁ, ছিলেন। তখন তিনি বললেন — তার মুখে একটা পড়তে পারল না। এটা একজন সাধারণ মানুষেরই কথা, আমার বানান কথা নয়।’’

স্কেচ সৌজন্য: ইন্দ্রজিৎ নারায়ণ

************

#MartyrsDay

#HistoricalFoodMovement

#LeftFront

#JyotiBasu

 

20220712

ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার লড়াই: সীতারাম ইয়েচুরি

 

------------------------------------------

৮ জুলাই জ্যোতি বসু স্মারক বক্তৃতায় ‘স্বাধীনতা: ৭৫’ শিরোনামে সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ভাষণের সম্পাদিত বয়ান।

------------------------------------------

আমার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় তিন দশক জ্যোতি বসুর সঙ্গে কাজ করার যে সুযোগ পেয়েছি তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফেরার পর অনেকেই মনে করেছিলেন যে জ্যোতি বসু বাকিদের মতো ওকালতি পেশায় যুক্ত হবেন। কিন্তু তার বদলে তিনি আন্দোলনের ময়দানে পা রাখলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন যে দেশে ফেরার পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি যুক্ত হবেন এবং সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সময় চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে যে স্বাধীন ভারতের চরিত্র কেমন হবে। এই নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত শুরু হয়েছিল। 

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল কংগ্রেসের। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ভারতের বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ভারত বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কংগ্রেসের এই ধারণাকে সমর্থন করলেও দাবি তোলা হয় যে সাধারণ মানুষ যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাবে তাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার রূপ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে হবে, তবেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা টিকে থাকবে। এভাবেই ভারত ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে চলবে। ভারতে বৈচিত্রের কথা মাথায় রেখে সেই সময় কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে ভারত যদি সমাজতন্ত্রের দিকে, অর্থনৈতিক সমতার দিকে এগিয়ে না যায় তবে দেশের মানুষের মধ্যে ক্রমশ তৈরি হওয়া অসন্তোষ একটা সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করবে।

 


আর এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী মত হিসাবে উঠে আসে তৃতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাতে বলা হয় যে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ব্যাখ্যা করতে হবে। একটি পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে ভারতে যেহেতু মুসলিমদের একটি বড়সড় জনসংখ্যা থাকে তাই একটি মুসলিম রাষ্ট্র দরকার আছে। অপর দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় যে ভারত নিজেকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলবে। কে মুসলমান আর কে হিন্দু সেই নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। যেমন কেরালার মোপলা মুসলিম আর আসামের সিলেটি মুসলিমের মধ্যে মিলের চেয়ে ফারাকই বেশি আছে। ভারতের হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র আরও বেশি। এইসময়ে হিন্দুত্বের ধারণা নিয়ে আসেন সাভারকার। ইংল্যান্ডে থাকাকালীনই সাভারকার হিন্দুত্ববাদ শীর্ষক একটি লেখায় উল্লেখ করেন যে হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক নেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হিন্দুত্ববাদ হলো একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর মাধ্যমে বলা হয় যে ভারত যাদের মাতৃভূমি পিতৃভূমি এবং পূণ্যভূমি তারাই একমাত্র এখানে থাকতে পারবে। সাভারকার উল্লেখ করেন যে মুসলমানদের পুণ্যভূমি মক্কা মদিনা এবং খ্রিস্টানদের পুণ্যভূমি জেরুসালেম। আরএসএস তৈরি হওয়ার দুবছর আগেই এই ধারণা ধীরে ধীরে প্রচার হতে থাকে। হিন্দু রাষ্ট্র এবং মুসলিম রাষ্ট্র এই দুই রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ আলি জিন্নাহও একই কথা বলেন। সেই সময়ে সাভারকার জানান যে তাঁর সঙ্গে জিন্নার কোনও মতবিরোধ নেই। এই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই স্বাধীন ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়। সেই একই কথা এখন শোনা যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আরএসএস নেতাদের মুখে। তাঁদের কথায়, পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতে বসবাস করছে হিন্দুরা। আর ১২০০ বছর ধরে তারা পরাধীন। কারণ সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে। তারপর ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর সেই সময়ের লড়াইকে হিন্দু বনাম খ্রিস্টানের বলে উল্লেখ করতে চাইছে আরএসএস। আর এই সবের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে পরিবর্তন করা হচ্ছে। ভারতের ইতিহাসকে তারা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে, আর ভারতীয় দর্শনকে বদলে হিন্দু দর্শনের পাঠ দিতে চাইছে। এসবের কারণেই স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্ব। 

জ্যোতি বসুর দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির নেতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যা  ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। সেই সময় থেকেই কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। ভারতকে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে তৈরি করতে চাইলেও পুঁজিবাদের ওপর কংগ্রেস নির্ভরশীল ছিল, কমিউনিস্টরা তার বিরোধিতা করে। ১৯৪০ সাল নাগাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্বে এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে বিদেশ থেকে জ্যোতি বসু যখন দেশে ফেরেন তখন তাঁর এবং কয়েকজন কমিউনিস্ট সদস্যের ওপরে ওপর মুখ্য দায়িত্ব পরে তৎকালীন ভারতে কৃষকদের দুর্দশার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলার। যেমন বাংলায় তেভাগা আন্দোলন, কেরালায় পুন্নাপ্রা ভায়লার, মহারাষ্ট্রে ওরলি আদিবাসীদের জমির লড়াই, আসামের সুরমা উপত্যকায়, তেলেঙ্গানায় তখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে কৃষি আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলিকে থেকে বলা যেতে পারে স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অন্যদিকে কংগ্রেস জমিদার, জোতদারদের সাথে বোঝাপড়া করে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে আনার চেষ্টা করেছে। এই বোঝাপড়া স্বাধীনতার পরেও টিকে থাকে এবং তার পরিণাম এখনও আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি শেষ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সামন্তবাদের সাথে আপস করে পুঁজিবাদ নিজেদের জমি তৈরি করতে চেয়েছে, ফলে সামন্তবাদের উচ্ছেদ হয়নি। জ্যোতি বসু বার বার বলতেন যে, এরফলে সামন্তবাদী ধারণার আধিপত্য সমাজে বজায় থাকে। যেমন ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা এবং জাতব্যবস্থা এই দুই ধারণা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সে পিতৃতন্ত্রের প্রশ্নে হোক বা আদিবাসী দলিতদের ওপর অত্যাচারের প্রশ্নে হোক, কমিউনিস্টদের এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। প্রসঙ্গত, এই সব ধারণা আরএসএস’এর মনুবাদী মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, বিজেপি আরএসএস হিন্দুত্বের স্লোগানকে সামনে রেখে এইসব সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা ভাবনাকে এখন প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। 

বিজেপি জানে যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির কথা তারা বলছে তা কোনোভাবে সম্ভব নয় বর্তমান ভারতীয় সংবিধান থাকলে। হিন্দু রাষ্ট্র করতে তাদের সংবিধান বদলাতে হবে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এসে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি যখন কেন্দ্রে এমন এক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে যারা ভারতের সংবিধানকে বদলাতে চাইছে। তাকে মান্যতা দিতে চাইছে না শুধুমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করবে বলে। সংবিধানের চার ভিত্তি আর্থিক সার্বভৌমতা, সামাজিক ন্যায় বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র। এই চার স্তম্ভই আজ আক্রমণের সামনে। তিস্তা শীতলবাদের ঘটনা চোখে  আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বর্তমান ভারতের গণতন্ত্রের পরিস্থিতি। বর্তমান সরকার বলতে চাইছে যে সত্যি কথা কেউ বলতে পারবে না। সত্যি প্রকাশের জন্য সাংবাদিক জুবেইরকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের পর একের পর এক নতুন আইন তৈরি করে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সরকার কেড়ে নিয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে সরকার বলছে ভিন্নধর্মে বিবাহের আগের পুলিশ ভেরিফিকেশন করাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। যে সব আইন বিজেপি সরকার তৈরি করছে তার মধ্যে দিয়ে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে যেখানে হিন্দু এবং মুসলমানরা একে অপরের সাথে খোলাখুলি মেলামেশা করতে পারবে না। সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন, আদিবাসী দলিতদের ওপর ক্রমশ আক্রমণ প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। কর্পোরেট এবং সরকারের সখ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত দুই বছরে আদানির সম্পদ ব্যাপক বেড়েছে। আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছি যেখানে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে খাদ্যের দিক থেকে হোক স্বাস্থ্যের দিক থেকে হোক বা অন্য যে কোনও বিষয়ে বিভিন্ন সূচকে ভারতের স্থান ক্রমশ নিম্নমুখী।

 


স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে এসে ভারত আবার সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে তারা স্বাধীনতার আগে ছিল। সেই সময় যে যে বিষয়ের বিরুদ্ধে ভারতকে লড়াই করতে হয়েছে আজও সেই একই বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু সময় বদলানোর সাথে সাথে লড়াইয়ের চরিত্র ধরন বদলে গিয়েছে। স্বাধীনতার আগে ভারতে যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা এখন আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে স্বাধীনতার রাতে মহাত্মা গান্ধী কোথায় ছিলেন। তিনি কলকাতায় ছিলেন, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন, তারপর গিয়েছিলেন নোয়াখালিতে। আরএসএসের মতাদর্শের কারণে মহাত্মা গান্ধীকে খুন হতে হয়েছে। 

জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ উভয়েই প্রতি পদক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতেন। এই প্রশ্নে তাঁরা কমিউনিস্ট এবং বামপন্থী দলগুলি ছাড়াও অন্যান্য দলগুলির কাছেও সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। এই দুই নেতা দেশভাগের ক্ষত নিজেদের চোখে দেখেছেন, মরমে মরমে উপলবদ্ধি করেছেন। একজন বাংলায়, একজন পাঞ্জাবে। ভারত ভাগে আসল বিভাজিত হয়েছিল বাংলা এবং পাঞ্জাব। সেই বিভাজনের অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়, সাম্প্রদায়িকতার আগুন কীভাবে সবথেকে প্রগতিশীল বিচারধারাকে আক্রমণ করেছে। পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রসর, একইভাবে লাহোর শহর ছিল গোটা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। ভগৎ সিং লাহোরে কাজ করেছিলেন। সুরজিৎ নিজে লাহোর থেকে অমৃতসর অবধি সাইকেল চালিয়ে আসতেন বিপ্লবের কাজে। স্যার সিকান্দার হায়াত খান অবিভক্ত পাঞ্জাবের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কন্যা তাহিরা কমিউনিস্ট পার্টির পাঞ্জাব প্রদেশ কমিটির সদস্য ছিলেন। লাহোরে তাঁদের বাড়িতেই সাধারণত ক্যাবিনেট বৈঠক হতো, আবার কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠকও সেখানেই হতো। এমনও দিন গেছে, বাড়ির একতলায় পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠক চলছে, এবং দোতলায় কমিউনিস্ট পার্টির পিসি বৈঠক হচ্ছে। তো এমনই এক বৈঠক চলাকালীন খবর এল, পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠকে ঠিক হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এমন সময় তাহিরা বলেন, আপনারা চিন্তা করবেন না। আপনারা আমাদের বাড়িতেই থেকে যান। কারোর কল্পনাতেও আসা সম্ভব নয়, যে পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতেই কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠক চলছে! দেশভাগের পরে লাহোরের সেই ঐতিহ্য একেবারেই হারিয়ে গেল। ঢাকা শহরে আবার নতুন করে প্রগতিশীল আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং বামপন্থীরা সেখানে ভূমিকা রাখছেন। 

সুরজিৎ, জ্যোতি বসুরা বারবার বলতেন, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতে চান, তাঁদের সবাইকে একজোট করতে হবে। যারা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাঁদের সবাইকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলাম। আমরা এমন সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, যে সরকারের বিদেশমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। যদি প্রশ্ন করেন কেন এই সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, তার উত্তর হলো— যে কোনও উপায়ে জরুরি অবস্থাকে রুখতেই হতো। সেই সময়কার সব কালাআইনকেও সংবিধান থেকে বাতিল করতে হতো। তাই এই সরকারকে আমরা সমর্থন করি। জ্যোতি বসু ১৯৬৭ সালে অজয় মুখার্জিকে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে রাজি হয়েছিলেন, নিজে উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, যদিও সেই সময় আমাদের বৃহত্তম সংখ্যক বিধায়ক ছিলেন। আমরা নিজেরা মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি জানাতে পারতাম। কিন্তু ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯- দুইবারই, বেশি বিধায়ক নিয়েও আমরা অজয় মুখার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করি। কেন? কারণ তখন আমাদের মূল কাজ ছিল যে ভাবে সম্ভব কংগ্রেসকে হারানো এবং ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা। 

মূল বিষয় হলো, প্রতি যুগেই এমন একটা সময় আসে, যখন আমাদের শ্রেণি সংগ্রাম ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে আশু লক্ষ্য চিহ্নিত করতে হয়। সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির নিরিখে আমাদের চিহ্নিত করতে হয় শত্রুকে। কোন শক্তির কিংবা ব্যক্তির বিরোধিতা করতে পারলে গণআন্দোলন ও শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা সেই মুহূর্ত ঠিক করে দেয়। 

১৯৯৬ সালে নরসিমা রাওয়ের সরকারের ঠিক পরেই বাজপেয়ীর সরকার ক্ষমতায় এল। আমরা বললাম এদের ঠেকাতে হবে। সেই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা বললেন, আমি সরকার গড়তে সর্ববৃহৎ দলকে ডাকবো। সেটা ছিল বিজেপি। বিজেপি ১৩দিন সরকার চালিয়েছিল। সেই সময় আমি এবং আমার সহকর্মীরা জ্যোতি বসু এবং সুরজিতের কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে আমরা সেই সময় খুবই শঙ্কিত ছিলাম। বিজেপি একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেলে তাদের উৎখাত করা কঠিন হয়ে পড়বে। জ্যোতি বসু এবং সুরজিৎ আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তোমরা চিন্তা কোরো না, আমরা এদের ঠিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ছাড়ব। ১৩দিন পরে সংসদে আস্থা ভোট হলো, এবং ভোটে হেরে বাজপেয়ী ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। তারপর প্রথম ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। 

মূল বিষয় বা প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের কী প্রয়োজন সেই নিরিখেই আমাদের পথ তৈরি হবে। ১৯৭৭ সালে আমরা উপলব্ধি করেছিলাম আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করতে এমারজেন্সি এবং ইন্দিরা গান্ধীকে পরাস্ত করতে হবে। তাই আমরা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে প্রস্তুত সব শক্তির সঙ্গে একজোট হই। একইভাবে আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে, আমাদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। তাই বিজেপি’কে পরাস্ত করতে সক্ষম এবং ইচ্ছুক সমস্ত শক্তিকে একজোট করার দিকে আমরা এগোচ্ছি। জ্যোতি বসুই খুব সম্ভবত আমাদের দেশের জোট রাজনীতির স্থপতি ছিলেন। ১৯৬৭ সালে বাংলার প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার থেকে শুরু। তারপরে বাংলায় এবং দেশে যতগুলি যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি হয়েছে, প্রত্যেকটিতে জ্যোতি বসুর ভূমিকা ছিল। 

২০০৪ সালে এনডিএ সরকারকে হারানোর জন্য বিজেপি বিরোধী জোট গঠনের প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সুরজিৎ। সেই সময়ের মূল প্রশ্ন ছিল, কিভাবে বিজেপি-কে পরস্ত করতে পারার মতো সংখ্যা একত্রিত করা যায়। বিরোধীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ছিল— নিজের নিজের রাজ্যে যাও। বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে যতটা সম্ভব একত্রিত করো। এই ফর্মুলাতে রাজ্যস্তরে নিশ্চিত করতে হবে যে যাতে প্রতিটি রাজ্য থেকে অধিক সংখ্যক বিজেপি বিরোধী সাংসদ জিতে আসতে পারেন। তারপর আমরা দিল্লিতে বসে ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করব। বাস্তবেও ঠিক এটাই হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের যুক্তফ্রন্টও কিন্তু নির্বাচনের পরেই গঠিত হয়েছিল। একই কায়দায় ২০০৪ সালের প্রথম ইউপিএ সরকার নির্বাচনের পরে গঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকেই স্পষ্ট, ভারতে নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী বিজেপি বিরোধী কোনও মোর্চা গঠন সম্ভব নয়। কিছু মানুষ এখন থেকেই মোদীর এবং বিজেপি’র বিকল্প জোট ইত্যাদি গড়ার কথা বলছেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হলো এই ধরনের বিকল্প রাজ্যস্তরে গড়ে তুলতে হবে। যেমন তামিলনাড়ুতে হয়েছে। প্রথমে রাজ্যস্তরে করে তারপরে সেটাকে সর্বভারতীয় স্তরে তুলে আনতে হবে। 

এই মুহুর্তের গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটি? আমরা পার্টি কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাম্প্রদায়িকতাকে হারাতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সর্বোচ্চ ঐক্য গঠন করতে হবে। আমাদের প্রাথমিক কাজ হলো বিজেপি-কে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, তাকে দুর্বল করতে হবে এবং তাকে হারাতে হবে। সেই কাজ করতে গেলে সবার আগে আমাদের পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। আমাদের পার্টির সংগঠন এবং জনভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত বামপন্থী ঐক্য মজবুত করতে হবে। তৃতীয়ত সেই জোরের উপর দাঁড়িয়ে বাম-গণতান্ত্রিক জোট গঠন করতে হবে। এই জোট কেবলমাত্র রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামাজিক ও ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলনরত সংস্থা এবং শক্তিগুলিকেও এরমধ্যে শামিল করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে এক জায়গায় জড়ো করতে গেলে ন্যূনতম একটা বোঝাপড়ায় আমাদের পৌঁছাতেই হবে। 

বর্তমানে আমাদের দরজায় রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এমন একজন প্রার্থী খুঁজে বের করতে হবে যাকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি সমর্থন জানাতে প্রস্তুত হবে। এই প্রার্থীকে সামনে রেখে আমরা বিজেপি’র প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারব। এটাই মূল ইস্যু। একাধিকবার আমাদের মধ্যে প্রার্থীর নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যাকে অধিকাংশ দল সমর্থন জানাতে রাজি হবে। বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিজেপি’র বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছুঁড়ে দেওয়া। এই প্রাথমিক উদ্দেশ্য আমাদের পূরণ করতেই হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারিনা অমুকে হলুদ জামা পরেছে বা তমুকে লাল জামা পরেছে বলে আমি তাঁকে সমর্থন করব না। কিংবা সেই ব্যক্তি আগে অমুক অমুক কাজ করেছে তাই তাঁকে সমর্থন করা যাবে না। জ্যোতি বসুদের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে অজয় মুখার্জি বাংলায় কি কি করেছিলেন, কিংবা জনতা পার্টির নেতা হওয়ার আগে জগজীবন রামের ভূমিকা কী ছিল, রাজীব গান্ধীর অর্থমন্ত্রী হিসাবে ভিপি সিংয়ের ভূমিকা কী ছিল, এইসব প্রশ্ন আমরা তুলিনি, আমরা তাঁদের প্রত্যেককে সমর্থন জানিয়েছি কোনও না কোনও সময়ে। আমরা রাষ্ট্রপতি পদে ভিভি গিরিকে ভোট দিয়েছি। কিন্তু আমরা তাঁকে শর্ত দিয়েছিলাম। আপনি ব্যাঙ্ক, কয়লার রাষ্ট্রীয়করণ করুন, তাহলেই একমাত্র আপনাকে সমর্থন করব। এবং তাঁকে দিয়ে আমরা এগুলি করিয়ে নিয়েওছিলাম। 

জ্যোতিবাবু এবং সেই সময়ের নেতা যাঁদের আমরা পার্টির নবরত্ন বলে থাকি তাঁদের থেকে আমাদের শিখতে হবে, কীভাবে আশু লক্ষ্য পূরণ করে আমাদের আদর্শ এবং রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী রণকৌশল গ্রহণ করতে হবে। একটি শক্তি কিংবা ব্যক্তিকে সমর্থন জানানোর মাপকাঠি কেবলমাত্র এটাই। একজন ব্যক্তি অতীতে কী করেছেন, বা ভবিষ্যতে কী করতে পারেন, সেই ভাবনা থেকে বর্তমানের রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে না। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ইতিহাস তাই-ই বলছে। এই সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করার ফলেই আমরা এমারজেন্সিকে পরাস্ত করতে পেরেছি। আমারা মোরারজী দেশাই সরকারকে সমর্থন না করলে এমারজেন্সি সরানো যেত না। আর এমারজেন্সি না সরলে পশ্চিমবাংলায় ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হত কিনা তা বলা সম্ভব নয়। জ্যোতিবাবুর ২৩বছরের রেকর্ড মুখ্যমন্ত্রিত্ব, হয়ত এর কোনওটাই হতো না। আমরা কাকে সমর্থন করছি সেটা বিষয় নয়, কেন সমর্থন করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য কী?  উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন আসছে। আমরা এমন একজন প্রার্থীর খোঁজ করছি, যাঁকে সামনে রেখে বৃহত্তম বিরোধী ঐক্য গঠন সম্ভব। 

ইংল্যান্ড থেকে ফেরত আসার পরে জ্যোতি বসু ব্যারিস্টারির লোভনীয় পেশার হাতছানি উপেক্ষা করে রাজনীতিতে এলেন। শেষজীবনে তিনি একবার বলেছিলেন, সীতারাম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করব। আর আজকে আমি আমার মরণোত্তর দেহদান করলাম, আমি জানতাম না যে মৃত্যুর পরেও আমি জনগণের সেবায় কিছু করতে পারি। এই ধরনের মূল্যবোধ এবং চিন্তাধারা বিরল। তাঁর এই চিন্তাধারার জন্য আমরা তাঁকে সেলাম জানাই। এবং শুধুমাত্র সেলাম জানানোই নয়, আমরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর থেকে শিক্ষা নিই, নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করি। 

আমরা বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর আগের যুগসন্ধিক্ষণে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল। এই সন্ধিক্ষণে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের কাঠামো রক্ষার লড়াইতে জিততে হবে। সেই ভিতের উপরে দাঁড়িয়েই আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। 

...........................................

গণশক্তি, উত্তর সম্পাদকীয়, ১০জুলাই, ২০২২

...........................................

20210719

বামফ্রন্ট সরকার ও জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতি



রবীন দেব

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার পরিচালনার চৌত্রিশ বছরের (১৯৭৭-২০১১) অভিজ্ঞতা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। নজিরবিহীন শুধু তার মেয়াদের দৈর্ঘ্যের কারণে নয়, তার বিকল্প নীতির রাজনৈতিক তাৎপর্যের সূত্রেও। বহু পদক্ষেপের ক্ষেত্রেই বামফ্রন্ট সরকার ছিল দেশের মধ্যে পথিকৃৎ। শুধু রাজ্যে নয়, সমগ্র দেশে।

বামফ্রন্ট সরকারকে অনেক সময়েই এমন পথে চলতে হয়েছে যে পথে আগে কারও পদচিহ্ন পড়েনি। পথও কুসুমাস্তীর্ণও ছিল না। বাধা এবং প্রতিকূলতা ছিল লাগাতার। ছিল আক্রমণ ষড়যন্ত্র অপপ্রচার। বামফ্রন্ট সরকারের চৌত্রিশ বছরে ২৮০৬ জন কমরেড এরাজ্যে শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন শ্রেণিশত্রুদের হাতে। বামফ্রন্ট সরকার পরাজিত হবার পরও শহীদ হয়েছেন ২২৮জন।

বামফ্রন্ট সরকার পরাজিত হবার দশ বছর পরও সেই সরকারের অভিজ্ঞতাগুলির প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। শুধু সাফল্যের অভিজ্ঞতা নয়, তার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতার অভিজ্ঞতাও। সব মিলিয়ে বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রাজ্যস্তরে বাম-নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালনার জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকারের অবদান ও সাফল্য সমগ্র দেশে আজও বিকল্প নীতি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের দিশারি।

শুধু বিধানসভা নির্বাচন নয়, পঞ্চায়েত, পৌরসভা, লোকসভার প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্ট রাজ্যবাসীর সমর্থন পেয়েছে চৌত্রিশ বছর ধরে। দিনের হিসাবে বারো হাজার তিনশো ছিয়াশি দিন। সেই সময়পর্বে কমরেড জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আট হাজার পাঁচশো চল্লিশ দিন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিন হাজার আটশো ছেচল্লিশ দিন।

অনেক আত্মত্যাগের ফলশ্রুতি

বামফ্রন্ট সরকার এরাজ্যে হঠাৎ করে গঠিত হয়নি। যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলি (১৯৬৭ এবং ১৯৬৯) স্বল্পমেয়াদি হলেও বামফ্রন্ট সরকার গঠনের ভিত্তি রচিত হয় তখনই। যুক্তফ্রন্ট সরকার পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার ও আধাফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, জরুরি অবস্থার মোকাবিলা করতে গিয়ে সত্তর দশকের সেই সময় সিপিআই(এম)’র ১১০০ নেতা,কর্মী, সংগঠক শহীদ হয়েছিলেন। হাজার হাজার কর্মীকে ঘড়ছাড়া হতে হয়েছিল। গণতন্ত্রের সংগ্রাম এগিয়েছে অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।

লক্ষণীয়, বামফ্রন্ট সর্বদা নতুন নতুন অংশের মধ্যে প্রসারিত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ছিল ছ’পার্টির কোয়ালিশন। তারপর বামফ্রন্টের শরিকের সংখ্যা বেড়েছে। এখনও বামফ্রন্ট আট দলের। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বানের সময় বামফ্রন্টের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস এবং আইএসএফ মিলে সংযুক্ত মোর্চা গঠিত হয়। ত্রিপুরা এবং কেরালাতেও সিপিআই(এম) নতুন নতুন শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১-র নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে জিতলেও সেই জোট টেকেনি। উলটে কংগ্রেসের নির্বাচিত বিধায়কদের দল ভাঙিয়ে তৃণমূলে আনা হয়েছে। নেত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাই তৃণমূলে শেষ কথা। মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ-ও কার্যত ভাঙাঘর। বিজেপি এখন মোদী-সর্বস্ব। একটি গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজ, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কখনই নিরাপদ নয়।

বামফ্রন্ট সরকার: নতুন অভিমুখ

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রবেশ করে নতুন এক পর্বে এবং সেই সূত্রেই বদলে যেতে শুরু করে রাজ্য সরকারের অভিমুখ।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করেছে, তাকে প্রসারিত করেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বামফ্রন্ট সরকার সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেয়। কয়েকজন সাংবাদিকও তখন মুক্তি পান। মুক্তি পান নকশালপন্থী এবং কংগ্রেসের অনেকেও। নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে অন্য রাজ্যের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়। বামফ্রন্ট সরকার বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। সরকারি কর্মচারীদের, এমনকি পুলিশ কর্মীদের সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয়। গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলন বা ধর্মঘট ভাঙতে কখনও পুলিশ পাঠায়নি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। বামফ্রন্ট সরকারই দেশের মধ্যে প্রথম রাজ্যস্তরে মানবাধিকার কমিশন গঠন করে।

ভূমি সংস্কার ও গ্রামোন্নয়ন: কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের অবদান অতুলনীয়। বিশ্বব্যাঙ্ক পর্যন্ত ২০০৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এ ভূমিসংস্কার কর্মসূচীর প্রশংসা করে। সারা দেশের জমির মাত্র ৩% পশ্চিমবঙ্গে। অথচ গোটা দেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে যত জমি বণ্টিত হয়েছে তার ২২% পশ্চিমবঙ্গেই হয়েছিল। ভূমি সংস্কারের ফলেই রাজ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ৮৪শতাংশ কৃষি জমির মালিক। জাতীয় স্তরে তা ৩৪ শতাংশের সামান্য বেশি। পাট্টা পেয়ে জমির মালিক হয়েছেন কৃষক পরিবারের মহিলারাও। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫লক্ষ ১৩হাজার নথিভুক্ত বর্গাদারের আইনি অধিকার সুরক্ষিত করেছিল বামফ্রন্ট সরকার।

ভূমি সংস্কারের উপর ভিত্তি করেই কৃষিতে সাফল্য আসে। স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ছিল খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঘাটতি রাজ্য। বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পশ্চিমবঙ্গ খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৭৬-৭৭সালে রাজ্যে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হত ৭৪লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে তা দাঁড়ায় প্রায় ১৭০লক্ষ মেট্রিক টন।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ

প্রথম বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর কমরেড জ্যোতি বসু বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র মহাকরণ থেকে কাজ করবে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলায় গোটা দেশকে পথ দেখিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭৮ সালে রাজ্যে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামোন্নয়নের ভার তুলে দেওয়া হয় পঞ্চায়েতের হাতে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার নেতৃত্বে উঠে আসে দুর্বলতর অংশের প্রতিনিধিরা। বামফ্রন্ট সরকার নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচন করেছে। পর পর সাতবার।

বামফ্রন্ট সরকারই পঞ্চায়েতে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে— প্রথমে ৩৩ শতাংশ, তারপর ৫০ শতাংশ। তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং ওবিসি সম্প্রদায়ের জন্য জনসংখ্যার অনুপাতে পঞ্চায়েতে আসন ও পদ সংরক্ষণ করা হয়। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয় পৌরসভাগুলির ক্ষেত্রেও।

জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কাজের নতুন উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল নির্বাচিত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ১৯৭৮ সালের শতাব্দীর ভয়ঙ্করতম বন্যার সময় ত্রাণ ও পুনর্গঠনের কাজে পঞ্চায়েতের নেতৃত্বে ব্যাপক সংখ্যায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নতুন নজির সৃষ্টি করে। রাজ্যের মন্ত্রীরাও প্রত্যক্ষভাবে উদ্বার ও ত্রাণকার্যে নেমে পড়েন।

 



বামফ্রন্ট সরকারের দুই মুখ্যমন্ত্রী: জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

পৌরব্যবস্থায় রূপান্তর: বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই নগরায়নের চাহিদায় সাড়া দিয়ে পৌরব্যবস্থার অভূতপুর্ব প্রসার ঘটানো হয়। রাজ্যে পৌরসভার সংখ্যা বেড়ে ৯২ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭। শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, আসানসোল পৌরনিগম হয় বামফ্রন্টের আমলেই। বামফ্রন্ট সরকারই পৌরসভাগুলিকে সত্যিকারের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করে। পৌর নির্বাচনে ১৮ বছর বয়স্কদের ভোটাধিকার প্রদান করে দেশের মধ্যে প্রথম। পৌরসভাগুলির নির্বাচন হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে এবং নিয়মিত। অথচ গত দশ বছরে নির্দিষ্ট সময়ে পৌরসভা নির্বাচন করতে রাজ্য সরকার চরম ব্যর্থ। ২০১৮ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ ১৭টি পৌরসভাসহ মোট ১১২টি পৌরসভার ভোট কবে হবে কেউ জানে না।


দারিদ্র হ্রাস: পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ১৯৭৭-র আগে শহর-গ্রাম মিলিয়ে গড়ে ৬০ শতাংশের উপর মানুষ এরাজ্যে দারিদ্রসীমার নিচে ছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, ২০০৪-০৫ সালেই তা ২০.৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। ষষ্ঠ এবং সপ্তম বামফ্রন্টের সময়কালে রাজ্যে আর্থিক অগ্রগতির হার জাতীয় গড়ের উপরে থেকেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির ফলেই ২০১০-১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে শিল্পপণ্যের বাজার ছিল প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার।

সংখ্যালঘু উন্নয়নে বামফ্রন্ট সরকার: সামগ্রিকভাবে শিক্ষা এবং মানব উন্নয়নের মাপকাঠিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অগ্রগতি বামফ্রন্টের আমলে। পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তরের সূত্রপাত বামফ্রন্ট আমলে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ, মাদ্রাসা শিক্ষাকে মাধ্যমিক শিক্ষার সমতুল্য করার কৃতিত্ব বামফ্রন্ট সরকারের। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সেই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। বামফ্রন্ট সরকারই মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন গঠন করে। মাদ্রাসাগুলিকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হিসাবে ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠা করে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের প্রতিষ্ঠাও বামফ্রন্ট সরকারের আমলে। কর্মসূচি রূপায়ণে নিগম একদশকের উপর ধারাবাহিকভাবে দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। তবে সরকারি ও অন্যান্য সরকারপোষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বামফ্রন্ট সরকারই দেশে প্রথম রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ মেনে ‘অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়’(ওবিসি)-এর তালিকায় বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুবিধা সম্প্রসারণে তা ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

শিক্ষা: শিক্ষাক্ষেত্রে চরম অরাজকতার ও মাৎস্যন্যায়ের পর্বে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে শাসনভার গ্রহণ করে। স্কুল শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষায় সুস্থ স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করা এবং গুণমান বৃদ্ধি করা বামফ্রন্ট সরকারের বিরাট সাফল্য। উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছিল প্রাথমিক শিক্ষায়। রাজ্যে ছয় থেকে দশ বছর বয়সি শিশুদের ৯৯.৬ শতাংশকে স্কুলে আনা সম্ভব হয়। মিড ডে মিলের আওতায় আনা গিয়েছিল ৯৬% শিশুকে। স্কুলছুটের সংখ্যাও দ্রুতহারে কমে আসছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষার সুযোগ বেড়েছিল নজিরবিহীনভাবে। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ২লক্ষেরও কম ছাত্র-ছাত্রী। ২০১১ সালে সাড়ে ১০ লক্ষের মতো। এদের মধ্যে ছাত্রীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উচ্চগবেষণার সুযোগ আজ যা দেখা যায় তার প্রায় পুরোটাই গড়ে ওঠে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে। উচ্চশিক্ষায় সংখ্যালঘুদের আরও বেশি উৎসাহিত করতে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারই প্রথম সরকারি কাজকর্মে ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতি দেয়।

সাক্ষরতা: ১৯৭১ সালে রাজ্যে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৮.৮৬ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ শতাংশ। সর্বভারতীয় হারের চেয়ে তা অনেক বেশি। সাক্ষরতার সাফল্যে ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর বিখ্যাত ‘নোমা পুরস্কার’ পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সাক্ষরতা আন্দোলন সেই সময় গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

সংস্কৃতি: সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার স্বার্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও পরিকাঠামো তৈরি করতে এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুত্ব ও বৈচিত্র্য বিকশিত করতে অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারই সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের উপর সরকারি খবরদারি বন্ধ করে। বন্ধ করে পুলিশ দিয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুমোদনের প্রথা।

স্বাস্থ্যক্ষেত্র: বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের সময় রাজ্যে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ১৩২৬। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার। রাজ্যে ৭৩% মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসতেন। যখন গোটা দেশে এই হার ছিল ৪০ শতাংশের মতো। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে গড় আয়ু, জন্মহার, মৃত্যুহার, প্রসূতি মৃত্যুর হার এবং শিশু মৃত্যুর হারে পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় হারের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়। পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করায় বামফ্রন্ট জোর দেয়।

প্রসঙ্গত, করোনা অতিমারীকালে দুর্ভোগে পড়া সাধারণ মানুষের সাহায্যে বাম ছাত্র-যুব শ্রমিক মহিলা সংগঠনগুলি অনবদ্য ভূমিকা নিয়েছে। এটাই বামপন্থীদের ভূমিকা। অতিমারী মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের চরম ব্যর্থতার মধ্যে রেড ভলান্টিয়াররাই রাজ্যকে গৌরবান্বিত করছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য: বামফ্রন্টের আমলে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অভূতপূর্ব হারে। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো মাত্র ১৬১৫ মেগাওয়াট। ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে তা দাঁড়ায়, ১১,৩০০ মেগাওয়াটে। প্রায় প্রতিটি পরিবারে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়। ২০১১ সালের পর রাজ্যে একটিও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়নি।

উদ্বাস্তু কল্যাণ: কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাহায্য না পেয়ে সীমিত সাধ্যের মধ্যেই উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে বামফ্রন্ট সরকার উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। উদ্বাস্তু কলোনিগুলির স্বীকৃতি এবং জমির নি:শর্ত পাট্টা প্রদানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা পেলে সমস্যার আরও অনেক সুরাহা করা যেত। বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ের পর নতুন সরকার উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের পৃথক অস্তিত্বই তুলে দিয়েছে।

শিল্প-প্রসারে উদ্যোগ: কৃষির সাফল্যের উপর ভিতের উপর দাঁড়িয়েই রাজ্যের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করতে শিল্পায়নের উপর নজর দেয় বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রের বৈষম্যমূলক নীতির মুখে রাজ্য সরকার নিজের উদ্যোগেই কাজ শুরু করে।

বেসরকারি পুঁজির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস ন’শোর বেশি অনুসারী শিল্পেই দু’লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। সল্টলেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পেও কাজের সুযোগ বেড়েছিল নানা স্তরে।

ক্ষুদ্র শিল্পে সংখ্যার বিচারে ও কর্মসংস্থানের বিচারে বামফ্রন্টের সময়েই পশ্চিমবঙ্গ দেশের সেরার শিরোপা পায়। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে প্রায় ২৮ লক্ষ ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিটে কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৫৫ লক্ষ মানুষের। উপকৃত মানুষের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি।

কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৯১ সালে নয়া উদারনীতি ঘোষণার পর সার্বিকভাবে পরিস্থিতি বিচার করে বামফ্রন্ট সরকার ১৯৯৪ সালে রাজ্য সরকারের ‘শিল্পায়ন সংক্রান্ত নীতি বিবৃতি’ ঘোষণা করে। রাজ্য সরকারের লাগাতার উদ্যোগের ফলেই ১৯৯১ থেকে ২০০৮-এর মধ্যবর্তী সময়ে শিল্প বিনিয়োগের পরিমাণের মানদণ্ডে আমাদের রাজ্য উঠে আসে দেশের মধ্যে তিন নম্বর স্থানে। ২০১০ সালে শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছিল ১৫হাজার ৫২ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা।

আন্তরিকতার সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দাঁড়িয়েছে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির পাশে। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৬ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৮০ হাজার। ২০১১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৫লক্ষে। সদস্য সংখ্যা ১ কোটি ৫০লক্ষের উপর; যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই মহিলা। মহিলাদের মর্যাদা ও ক্ষমতায়নে দেশে বামফ্রন্ট সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সেই সঙ্গে ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গ নাগরিক কর্মসংস্থান প্রকল্প’,‘উদীয়মান স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প’,‘বাংলা কর্মসংস্থান প্রকল্প’-র মতন উদ্যোগগুলি।

নয়া উদারবাদ যখন কর্মসংস্থানহীন/কর্মসংকোচনকারী তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-র মডেল চাপিয়ে দিচ্ছে তখন বামফ্রন্ট সরকারের ‘বিকল্প’ নীতির বৈশিষ্ট্য ছিল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং আয় বাড়ানোর প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানো। প্রতিটি প্রকল্প রূপায়ণে কর্মদিবস সৃষ্টির প্রশ্নটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক সুরক্ষা: সমাজের দুর্বলতর অংশের স্বার্থরক্ষায় বামফ্রন্ট সরকার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করেছে অনেক আগে থেকে। বামফ্রন্ট সরকারের আগে এরকম প্রকল্প বিশেষ ছিল না। বার্ধক্য ভাতা (শুরু ১৯৭৯ সালে), প্রতিবন্ধী ভাতা (শুরু ১৯৮০সাল), আদিবাসী বার্ধক্যভাতা (একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে দেওয়া হতো), কৃষক ভাতা, বিধবা ভাতা শুরু করা হয় রাজ্য সরকারের নিজের উদ্যোগে। এই সব প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে টাকার পরিমাণও এবং উপভোক্তার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ভূমিহীন কৃষক, রাজ্যের বন্ধ কলকারখানা ও বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক, অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের পথিকৃৎ বামফ্রন্ট সরকারই। বামফ্রন্ট সরকার ২ কোটি ৬৪ লক্ষ গরিব মানুষকে ২টাকা কেজি দরে চাল দিত। শুধু বিপিএল নয়, এপিএল-এর দরিদ্র মানুষেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে গরিবের জন্য বাড়ি তৈরিতে পশ্চিমবঙ্গ দেশে প্রথম তিনটি রাজ্যের মধ্যে স্থান করে নেয়। সংখ্যালঘু গরিব মানুষের জন্য বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে তখন রাজ্য ছিল দ্বিতীয় স্থানে। শুধু গ্রাম নয়, শহরেও গরিব মানুষকে বসবাসের জমি দিতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। যেমন, উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত জমি প্রদান; ঠিকা প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন করা, কুড়ি বছরের বেশি সময়ের উপর সরকারি জমিতে বসবাসকারীদের মাত্র ১ টাকায় ৯৯ বছরের লিজ প্রদান ইত্যাদি।

বামফ্রন্ট সরকারের সামাজিক সুরক্ষামূলক উদ্যোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দু:স্থ মেদাবী ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষত অনগ্রসর সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু জন্য উদারভাবে বিভিন্ন বৃত্তি, স্কলারশিপ ও আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করা।

বামফ্রন্ট সরকারই ‘ল্যাম্পস’-র কর্মচারীদের রাজ্য বেতন কমিশনের আওতায় এনেছিল। মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা এবং আদিবাসী মহিলা স্বশক্তিকরণ যোজনা প্রকল্প রূপায়ণে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল দেশের মধ্যে প্রথম।

তবে শুধুমাত্র সহায়তা প্রকল্প মারফত কোনও সমাজ সুস্থায়ী উন্নয়নের পথে এগতে পারে না। তাই স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য শিল্প প্রসারে জোর দেওয়া হয়। সরকারি দপ্তরগুলিতে এবং স্কুল কলেজ গ্রন্থাগার প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে শূণ্যপদ পূরণে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্কুল সার্ভিস কমিশন, কলেজ সার্ভিস কমিশন, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি।

বামফ্রন্ট সরকার শুধু রাজ্য সরকারি কর্মচারী নয়, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, পৌরসভা, পঞ্চায়েত, সমবায় প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতন, পেনশন, পারিবারিক পেনশন, কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল। এসবে বামফ্রন্ট সরকার কখনই কাটছাঁট করেনি।

সম্প্রীতি ও ঐক্য: ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতিগত ঐক্যরক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গা এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমনে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা গোটা দেশের পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদা বাড়িয়েছিল। সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সংখ্যাগুরুবাদী সংকীর্ণতা রাজ্যে মাথাচাড়া দিতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক শক্তি সব সময়ই বামফ্রন্ট-বিরোধী ষড়যন্ত্রে সক্রিয়ভাবে শামিল থেকেছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এবং বিজেপি’র সঙ্গে তার সার্বিক জোট রাজ্য রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলির নতুন সমাবেশ ঘটাতে সাহায্য করে।

দুর্নীতির পরিবেশে ব্যতিক্রমী: বিশেষত নয়া উদারবাদী পর্বে সরকারি দুর্নীতি যখন কি কেন্দ্রে, কি রাজ্যে রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, তখন বামফ্রন্ট সরকার ছিল স্পষ্টতই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। অবান্তর বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মানুষকে ভাগাভাগি করে, জনগণকে ভুল বুঝিয়ে নির্বাচনে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেনি বামফ্রন্ট।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে

বামফ্রন্ট সরকার কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের দাবি তুলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজনৈতিক প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলির অধিকারের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ নেয়। দেশের বিরোধী দল শাসিত রাজ্য সরকারগুলিকে এই প্রশ্নে সমবেত করে। সেই সব উদ্যোগের পরিণতিতেই কেন্দ্রীয় সরকার সারকারিয়া কমিশন গঠন করে। 

রাজনৈতিক পালা বদলের পর

আমরা শুধু সাফল্য নয়,বামফ্রন্ট সরকারের দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলি থেকেও শিক্ষা নেবার কথা বলি। অগ্রগতির সেটাও অপরিহার্য শর্ত।

একই সঙ্গে বিগত দশ বছর ধরে এটাও অভিজ্ঞতা যে, বামফ্রন্ট সরকারের অনুপস্থিতি আগ্রাসী নয়া উদারবাদী জমানার মুখে রাজ্যবাসীর সমস্যা-সঙ্কট বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চরম আক্রমণ নেমে এসেছে সিপিআই(এম)সহ বামপন্থীদের উপর। খুন জখম মিথ্যা মামলা চলছেই। আর বামপন্থীরা আক্রান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ধিত মাত্রায় আক্রমণ নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের উপর। সবচেয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ। শ্রমজীবী মানুষ। সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ অংশ। ধান্দার ধনতন্ত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই। একই সঙ্গে চলছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ভয়ঙ্কর আক্রমণ জনজীবনের ওপর।

সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়ছে রাজ্য। রাজ্য সরকারের বাজার থেকে ধারের পরিমাণে দেশে রেকর্ড করেছে। কর্মহীনতা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ না নিয়ে শুধুমাত্র কিছু সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যক্তিগত উপভোক্তা তৈরি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি রাজ্যের ভবিষ্যৎ বিকাশের সম্ভাবনাগুলিকে বিপর্যস্ত করছে। রাজ্য স্থায়ী সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। পরিকাঠামো নির্মাণে রাজ্য পিছিয়ে পড়ছে ক্রমাগত।

দুর্নীতি এখন লাগামছাড়া। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপর্যস্ত। সহায়তা প্রকল্পগুলিকে জিম্মা রেখে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি হরণ করা হচ্ছে। রাজ্য পরিণত হচ্ছে জাতপাত সংকীর্ণ পরিচিতি সত্তা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভয়ারণ্যে।

বল্গাহীন স্বৈরাচার যেন বিকল্পহীন-- দেখাতে চায় ক্ষমতালিপ্সু শাসক। ‘জয় বাংলা’ আর ‘সোনার বাংলা’-র মিডিয়াপুষ্ট দ্বৈরথ সেই লক্ষ্যেই। সেকারণেই গুরুত্ব বাড়ছে বিকল্পের লড়াইয়ের। অর্জিত অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কার জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতির গুরুত্ব এখানেই। এরাজ্যে এবং সমগ্র দেশে।

গণশক্তি, ২০ জুন, ২০২১