Showing posts with label মেগালোম্যানিয়াক. Show all posts
Showing posts with label মেগালোম্যানিয়াক. Show all posts

20161207

#Demonetization কালো টাকা উদ্ধার, নাকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা?

#Demonetization

গত ৮ই নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘোষণা করেন টেলিভিশনে। শুরু হয়ে যায় দেশজুড়ে অস্থিরতা। কোটি কোটি মানুষ ব্যাঙ্কের সামে দীর্ঘ লাইন দিতে বাধ্য হন ঘন্টার পর ঘন্টা। ৮৬শতাংশই মুদ্রাই ছিলো ওই দুই নোটে। ভারতের মতো নগদ-নির্ভর অর্থনীতিতে এই ধাক্কা  বিরাট। কার্ড, ডিজিটালের মতো অ-নগদ পদ্ধতিতে লেনদেন হয় মাত্র ৮শতাংশ। সরকারের প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট ১৭বার নিয়ম পরিবর্তনের ঘটনাতেই। উপরন্তু পুরনো নোট বাতিল হলেও নতুন নোট জোগানে ব্যর্থতা সংকট বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতের অর্থনীতিতে কালো টাকার দাপট অনেক দিন ধরেই। কালো টাকা উদ্ধারে কঠোর ও আন্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবশ্যই তা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু নোট বাতিলের এই পদ্ধতিতে কি আদৌ কালো টাকা উদ্ধার হবে, নাকি জনগণের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক বিরাট অর্থনৈতিক দুর্দশার বোঝা?

কালো টাকা কাকে বলে?

সব টাকাই বা নোট হলো সাদা টাকা। যখন টাকা আয় বৈধভাবে করা হয় না বা আয় নিয়ে বৈধ কর দেওয়া হয় না সেটাই হয় কালো টাকা (বলা ভালো কালো সম্পদ)। শুধু প্রত্যক্ষ কর নয়, পণ্য কেনা বেচায় বৈধ কর না দিয়ে যে আয় করা হয় সেটা কালো টাকা। সরকারের প্রাপ্য বা সাধারণ মানুষের টাকা প্রতারণা করে গায়েব করা টাকা হলো কালো টাকা। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে কালো টাকার ৮০% মজুত করে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি যার বিরাট অংশই তারা বিদেশে পাচার করে ব্যাঙ্কে জমা রাখছে। এই কালো টাকা কোম্পানিগুলি আয় করে উৎপাদিত পণ্য কম দেখিয়ে, শ্রমের ব্যবহার বেশি দেখিয়ে বাড়তি সুযোগের রফা করে, মুনাফা কম দেখিয়ে, কর কম দিয়ে। কালো টাকা পাচারের বড় পথ হলো আমদানি রপ্তানি কারবারের লেনদেনের হিসাবে কারচুপির করা। মোদী সরকার বা তার আগের সরকার কেউ এই মুখ্য অপরাধী কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে  কোন উদ্যোগ নেয়নি।

দেশে কত কালো টাকা আছে ?

বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা ও কমিটি দেশে কত কালো টাকা আছে তার অনুমান করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু বিষয়টি গোপন তার পুরো সঠিক হিসাব এখনো সম্ভব হয়নি। তবে কিছু হিসাবে বলা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির মোট টাকার ২০%থেকে ৬৬% হলো কালো টাকা। বর্তমানে ২০১৫-১৬ সালে ভারতের জিডিপির পরিমাণ হলো আনুমানিক ১৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। এতে কালো টাকার পরিমাণ হবে ২৭লক্ষ কোটি টাকা থেকে ৯০ লক্ষ কোটি টাকা।


এই কালো টাকা কি ৫০০ বা ১০০০টাকার নোটে মজুত করে রাখা হয়?

নগদে কালো টাকার সম্পদের মজুত আছে বড়জোর ৩-৫%। সংবাদ মাধ্যমে কেন্দ্রের তরফে দাবি করা হয়েছে নোট বাতিলে উদ্ধার হবে ৪ থেকে ৬লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ যদি সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িতও হয় এত নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে, বাগাড়ম্বর করেও আসলে ৯৫ থেকে ৯৭শতাংশ কালো সম্পদই এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে।
 
সব কালো টাকা বস্তায় বা বেনামি অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে যে প্রচার চলছে তা-ও ওই ৩-৪%র মধ্যেই। তা-ও সংগৃহীত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম ধনীদের কাছ থেকে। সরকার ১০০০টাকার নোটে কালো টাকা মজুত হয় বলে তা বাতিল করলো আবার উলটে ২হাজার টাকার নতুন নোট  চালু করলো। এর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হলো না। কালো টাকার বড় বড় রাঘব বোয়ালদের আসলে ধরাই হলো না।

কোথায় আছে কালো টাকা ?

দেশে ও বিদেশে কালো টাকা রোধে পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রকে একটি রিপোর্টও জমা আছে। ২০১২ সালে অর্থমন্ত্রকের বিশিষ্ট অফিসার ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটি ঐ রিপোর্ট পেশ করে। তাতে কমিটি জানিয়েছে, নোট বাতিল কালো টাকার সমস্যার কোন সুরাহা করবে না। বেশি কালো টাকা এতে উদ্ধার হবে না। কারণ কালো টাকা নোটে নয় মজুত আছে বেনামে সোনার বার, অলংকার, জমি, বাড়ি সহ নানা সম্পত্তিতে। সুইস ব্যাঙ্কে দেশের যাদের বিপুল টাকা জমা রয়েছে এরকম ৬৮০ জনের অ্যাকাউন্টের তালিকা রয়েছে কেন্দ্রের কাছে। উইলিকস-পানামার সংবাদপত্রে দেশের ধনীদের কার কার বিদেশে বিভিন্ন সংস্থায় শেয়ারে টাকা জমা আছে তার তালিকা প্রকাশ হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে তার তালিকাও আছে। যেসব দেশে কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে সেখানে বিদেশি ব্যাঙ্কে দেশের ধনীরা  যারা টাকা জমা রেখেছেন সেই বেআইনি  টাকা উদ্ধারের উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন্দ্র। সেসব দেশ ভারত সরকারকে সহযোগিতা করতে রাজি হলেও সে টাকা উদ্ধারের কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। উলটে সে কালো টাকা সরকারের সাহায্যে ঘুরপথে দেশে চলে আসছেতাকে সরকার থেকে আবার আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

নোট বাতিলে জাল নোট বন্ধ হবে?

হবে না। দেশের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা এন আই এ (জাতীয় তদন্ত সংস্থা) কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটকে এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিল। অর্থনীতিতে কত অংশে জাল নোট ঘুরছে তার রিপোর্ট দেয় তারা। এন আই এ-র পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা যার মধ্যে রয়েছে সি বি আই, আই বি, ডি আর আই, ‘এবং রাজ্যগুলির পুলিশের থেকে তথ্য নেওয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতি ১০লক্ষ টাকার মধ্যে ২৫০টাকা মূল্যের জাল নোট থাকে। শতাংশে ০.০২৫। সরকার নিজেও সংসদে এই তথ্যই পেশ করেছে। সমীক্ষায় স্পষ্ট বলা হয়, জাল নোট বাজেয়াপ্ত করার জন্য চালু ব্যবস্থাই যথেষ্ট।
যে কোনো মানুষ বোঝেন, জাল নোটের কারবার যারা করে তাদের ধরা না গেলে নতুন নোট ফের জাল করা হবে। জাল নোটের কারবার রুখতে ১৪লক্ষ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেওয়া আজগুবি ব্যাপার।

বন্ধ হবে সন্ত্রাসবাদ?

আমরা সকলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু, সন্ত্রাসবাদীরা টাকার থলি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না। সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় যে পরিস্থিতি, যে রাজনীতি তা থেকে নজর সরানো অনুচিত। একটি ঘটনা লক্ষ্য করুন। কাশ্মীরে নিহত দুই সন্ত্রাসবাদীর কাছে পাওয়া গিয়েছে নতুন ২০০০টাকার নোট। নোট বন্ধ বা চালু করে নয়, সন্ত্রাসবাদীদের কাছে টাকাটা যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়া দরকার।

সরকার বলছে, বিরাট লাভের জন্য সামান্য লোকসান। একথা কি সত্যি?

এখন পর্যন্ত আমাদের কমপক্ষে ৭১জন সহনাগরিকের মৃত্যু হয়েছে নোট বাতিল ঘোষণার জেরে। পুরানো নোট নার্সিংহোমে না নেওয়ায় মৃত্যু হয়েছে শিশুর। আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাবার কোলে ব্যাঙ্কের লাইনে থাকার ধকল নিতে না পেরে।
প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে জওয়ানদের তুলনা টানছেন। বলছেন তাঁরা যদি সীমান্তে বিনিদ্র রাত কাটাতে পারেন তাহলে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে পারব না কেনজওয়ানদের অনেকে কিন্তু কৃষকসন্তান। আজকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং কৃষিজীবী মানুষ। কৃষকরা তাঁদের ফসল মান্ডিতে আনলেও বিক্রি হচ্ছে না। দূরের ব্যাঙ্কের শাখায় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা। এখন তাঁরা লাইন দিচ্ছেন সরকারি বীজ সরবরাহের দোকানে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন, রবিশস্যের চাষের কী হবে। ফসল তোলার সময়ে সঙ্কট নেমে এসেছে গ্রাম ভারতে। এই অবস্থায় জওয়ানরা খুশি থাকতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী জোয়ানদের জন্য মেকি দরদ, মেকি জাতীয়তাবাদ দেখাচ্ছেন।
বিপুল অংশের মানুষের জীবিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির বিপুল অংশ নগদের ভরসায় চলে। পুরো থমকে গিয়েছে অর্থনীতির এই অংশের লেনদেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কম মজুরির অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষরা, যারা মজুরি পান নগদে। ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের হিসেব, শ্রম নিবিড় ক্ষেত্রে এর মধ্যেই কাজ হারিয়েছেন ৪লক্ষ শ্রমিক। বস্ত্র, চামড়া, অলঙ্কারের মতো শিল্পেই কেবল ৬০লক্ষ মানুষ বেতন পাননি। বাগিচা শিল্পে তীব্র সংকটে আরো ২০লক্ষ শ্রমিক। অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ খুইয়ে দলে দলে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি, খুচরো ব্যবসা ও নির্মাণেই দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ যুক্ত। ক্ষতি তাদেরই সর্বাধিক।
ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘট ডাকলে যারা অর্থনীতির লোকসানের হিসেব দিতে উঠেপড়ে নামে তারা এখন চুপ। দিনের পর দিন কাজ বন্ধ হয়ে বিপুল লোকসানে তাদের চোখ বন্ধ।


প্রধানমন্ত্রীর দাবি এই পদক্ষেপ গরিবের জন্য। কথাটা কি ঠিক?

গরিবের স্বার্থে বলাটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটেমোদী সরকার তার সরকারের প্রথমার্ধ  কাটিয়েছে কেবল তথাকথিত ব্যবসা মসৃণ করারকাজে। দেশি-বিদেশি বড় পুঁজির মালিকের স্বার্থ দেখেই এতটা সময় কাটিয়েছে মোদী সরকার। এখন সরকার জোর করে সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখতে বলছে কিন্তু তা তাদের প্রয়োজনমতো তুলতে দিচ্ছে না।  সরকার বলেছিলো কালো টাকা উদ্ধার করে প্রতি অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেবে। তা আজ তামাশার পর্যায়ে চলে গেছে। তার বদলে নিজের টাকা তুলতে গেলে হাতে লাগছে কালো কালি।
সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। অনেকেই সমবায় ব্যাঙ্কে তাদের টাকা রাখেন। এখন সরকার সেখানেই পুরানো নোট বদল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গ্রাম ভারতে লেনদেন বন্ধ হয়ে চরম সংকট নেমে এসেছে।

আসলে অতি-ধনীদের সাহায্য করা হচ্ছে

গরিবদের সাহায্য দূরের কথা, বড় ব্যবসায়ী এবং ধনীদের ঋণ মাফ করে দেওয়ার নির্দেশিকা আসলে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছে দেশের সরকার। এই অংশের থেকে ব্যাঙ্কগুলির পাওনা ১১লক্ষ কোটি টাকার বেশি। একজন কৃষক বা ছাত্র বা ছোট দোকানদার ধার নিলে সুদসহ তা ফেরত না দিলে ব্যাঙ্ক নোটিস পাঠায়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, জেলেও পাঠায়। এই সরকার কোনো একজন বড় ব্যবসায়ী ঋণখেলাপিকে শাস্তি দিয়েছে? বরং, এই সময়ে বড়লোকদের ২লক্ষ কোটি টাকা ধার মকুব করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি এই অনাদায়ী ঋণের ভারে সম্খটগ্রস্ত। এখন নোট অচলের ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে টাকা জমা রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে ব্যাঙ্কে। ফলে, ব্যাঙ্কে বড়লোকদের অনাদায়ী ঋণ, ধার মকুব করার লোকসান অংশত মেটানোর চেষ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষের এই টাকা দিয়েই। অতি-ধনী ঋণখেলাপিদের আবার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

এই সমস্যা কি সাময়িক?

লোকসানের বহর কতো সঠিক হিসেব করে ওঠা মুশকিল। কিন্তু, কিছু বেসরকারি সমীক্ষা যে হিসেব দিচ্ছে তা চমকে দেয়ার মতো। অ্যাম্বিট ক্যাপিটালের হিসেব, ২০১৬-১৭অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ভাগে মোট জাতীয় উৎপাদন ০.৫শতাংশ কমবে। সারা বছরে এই হার দাঁড়াবে ৩.৫শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বৃদ্ধির হার হবে মাত্র ৫.৮শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি-র হিসেব, স্বল্পমেয়াদেই লোকসানের অঙ্ক ১.২৮লক্ষ কোটি টাকা। মানে, প্রত্যেক ভারতীয়ের ১০০০টাকা করে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে গরিবদের উপর যাঁরা নগদ অর্থনীতির ওপর বেশি নির্ভর করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি জানাচ্ছে, অর্থনীতি সংকোচনের ফলে যে প্রভাব পড়বে তার তুলনায় বেআইনি অর্থনীতিতে প্রভাব সামান্যই। মানে, গরিব এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিপুল ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। অথচ, কালো টাকা উদ্ধারে প্রভাব সামান্য। দেশে মন্দা, কর্মসংস্থানের সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী চেহারা নিতে পারে।

মোদী এবং বি জে পি যে ব্যাপারে চুপ

দুর্নীতির সবচেয়ে জঘন্য চেহারা রাজনৈতিক দুর্নীতি। কালো টাকার মালিক, ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের চক্র। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে চুপ। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টিতে একটি মামলা চলছে। ২০১৩-তে সি বি আই দুই শিল্পগোষ্ঠী বিড়লা এবং সাহারায় তল্লাশি চালায়। কাগজপত্রে পাওয়া যায় রাজনীতিবিদদের তালিকা সঙ্গে টাকার অঙ্কের উল্লেখ। বিড়লা ২৫কোটি টাকা এবং সাহারার ৫৫কোটি টাকা দুই তালিকায় পাওয়া যায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীরউল্লেখ। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আবেদন গ্রহণ করার জন্য আরো কাগজপত্র দিতে হবে।
৮ই নভেম্বর ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। কলকাতায় তারা আগেই বি জে পি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোটে কোটি টাকা জমা করে। বিহারের মতো বিভিন্ন রাজ্যে হঠাৎই বিপুল পরিমাণে জমি বা অন্য সম্পত্তি কিনেছে বি জে পি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নামেই এই সম্পত্তি কেনা হয়েছে। এসব কি কাকতালীয়? বাছাই করা কেউ কেউ যে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত আগাম জানতেন, তার ইঙ্গিত মিলছে। এই কারণেই যৌথ সংসদীয় কমিটি গড়ে তদন্তের দাবি জানাচ্ছে সি পি আই (এম)।

সরকার এই পদক্ষেপ নিলো কেন?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর কে সি চক্রবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় বলেছিলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে প্রবল ব্যর্থতা থেকে চোখ ঘোরাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেবল কালো টাকা ফেরানোয় ব্যর্থতাই নয়। তার মধ্যে রয়েছে কাজ, খাদ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা।
অনেকেই মনে করেন গোটা বিষয়টি বিশেষ করে কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন ভোটের সঙ্গে জড়িত। এর আগে আর এস এস উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বিরোধিতা করলেই দেশবিরোধী বলেছে। এবার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুললেই তাদের দেশদ্রোহী বলে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচারে নামা হয়েছে। প্রচারের মাধ্যমে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।

দাবি কী

বামপন্থী দলগুলির দাবি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোট অন্তত ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে দেওয়া হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা যাচ্ছে না, নতুন নোটের যথেষ্ট যোগান হচ্ছে না ততদিন সাধারণ মানুষকে বৈধ লেনদেন করার অনুমতি দেওয়া হোক।
শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের ঋণ মকুব করতে হবে। সমবায় ব্যাঙ্কে পূর্ণাঙ্গ লেনদেনের অনুমতি দিতে হবে। কৃষি উপকরণ কেনায় অসুবিধা দূর করতে হবে।
ব্যাঙ্কে ১১লক্ষ কোটি অনাদায়ী ঋণ বড়লোকদের থেকে আদায় করতে হবেবিদেশী ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখা আমানতকারীদের তালিকা ঘোষণা করতে হবে। করফাঁকির স্বর্গ এমন দেশগুলির সঙ্গে দ্বৈত কর রদ চুক্তি বাতিল করতে হবেসাহারা-বিড়লা তদন্তে মেলা তথ্যের পূর্ণ তদন্ত করতে হবে 
নোট বাতিলে দুর্দশার জেরে যাঁরা প্রাণ হারালেন তাঁদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাঁদেরও দিতে হবে ক্ষতিপূরণ।   
 

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ও সরকারের ভূমিকা কী?

এরাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস নিজেরাই বেআইনী চিট ফান্ডের সুবিধাভোগী বলে অভিযুক্ত। রাজ্যের প্রায় ২৫লক্ষ মানুষকে প্রতারণা করে সারদা ও অন্য কয়েকটি চিট ফান্ড যে টাকা যোগাড় করেছিল তা শাসক নেতাদের পুষ্ট করেছে বলে অভিযোগ। রাজ্য সরকার চিট ফান্ডের প্রকৃত অপরাধীদেৃর আড়াল করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পান্ডাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সি বি আই-কে দেওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। উলটে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিসন বেঞ্চ চিট ফান্ডের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একজনের কমিটি গঠন করলে রাজ্য সরকার অসহযোগিতার পথ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থা ই ডি-ও কমিটি তুলে দিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়, অবশ্য এরা স্থগিতাদেশ পায়নি। নারদা কান্ডেও কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। দুর্নীতি নিয়ে বাইরে মোদী সরকার বাগাড়ম্বর করলেও পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্ত শ্লথ করে উভয়ের সমঝোতাই প্রমাণ করেছে।  সংসদে, বিশেষত রাজ্যসভায় বি জে পি তৃণমূলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল এবং রাজ্যে তৃণমূল সরকারের ত্রাণকর্তা হিসাবে বি জে পি-র ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিজ নিজ স্বার্থের প্রশ্নে এদের মধ্যে দর কষাকষি এবং গড়াপেটার খেলা দিয়ে এরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
নোট বাতিলের ফলে তৃণমূলের দেশে ও বিদেশে থাকা কালো টাকা উদ্ধার করা যাবে এরকম মোহ পোষণ করার কোনো কারণ নেই। এই পদ্ধতিতে কালো টাকা উদ্ধার হবে না জেনেও বামপন্থীরা নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তোলেনি। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ দাবি করেছে। সেই দাবিতে বামপন্থীরা দৃঢ় থাকবে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষায় প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাবে বামপন্থীরা।

********* 

20160412

মেগালোম্যানিয়াক

মানব মুখার্জি

অসুখটার নাম মেগালোম্যানিয়া (Megalomania) এই অসুখে আক্রান্ত রোগীকে বলা হয় মেগালোম্যানিয়াক। রোগ হিসাবে এটি খুবই পরিচিত, ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এই অসুখ এবং অসুস্থদের নানা বিবরণী। নানা ইতিহাসবিদ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মেগালোম্যানিয়াক বলেছেন। কিন্তু সবার তালিকায় তিনটি নাম কমন। রোমের সম্রাট নিরো, জার্মানির ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার এবং ইতালির ডুচে বেনিতো মুসোলিনি।

ডিকশনারিতে মেগালোম্যানিয়া সম্পর্কে বলা হচ্ছে – Megalomania is a psychopathological condition charecterized by fantasies of power relevance, omnipotence and by inflated self esteem. অর্থাৎ মেগালোম্যানিয়া এক ধরনের মনরোগগ্রস্ত অবস্থা, যাতে রোগী নিজেকে পরম ক্ষমতাসম্পন্ন বলে মনে করে। নিজেকে ভাবে পরমশক্তিশালী এবং নিজের সম্পর্কে এক কল্পিত উচ্চ ধারণা পোষণ করে।

ব্যক্তিগত জীবনে মেগালোম্যানিয়াক দুচার জনকে সবাই খুঁজে পাবেন। আমাদের সাহিত্যের পৃষ্ঠাতেও মেগালোম্যানিয়াকদের আনাগোনা আছে। বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মেগালোম্যানিয়াক চরিত্র লীলা মজুমদারের ‘পদিপিসির বর্মীবাক্স’-র পদিপিসি। কিন্তু সাহিত্যের মেগালোম্যানিয়াকরা বাস্তব জীবনে বিশেষ সমস্যা তৈরি করে না, তৈরি করে বাস্তব জীবনের মেগালোম্যানিয়াকরা।

লীলা মজুমদারের পদিপিসি আমাদের সমস্যা না। সমস্যা অভিষেক ব্যানার্জির ছোটো পিসি, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি একজন আদর্শ মেগালোম্যানিয়াক। তিনি যা বলবেন সেটাই এরাজ্যের সিদ্ধান্ত। তিনি যা ভাববেন সেটাই সবাইকে ভাবতে হবে। তাকে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। কারুর পরামর্শ তার প্রয়োজন নেই। তিনি সমস্ত জ্ঞানের আধার। তাকে কুর্ণিশ করাটাই এই রাজ্যের ৯কোটি মানুষের কাজ। উনি চান তাই গোটা রাজ্যকে নীল সাদা রঙে রাঙানো হলো। উনি চান তাই সত্যজিৎ রায়ের বাসভবন বিশপ লেফ্রয় রোডে, সেই নাম পালটে করা হলো সত্যজিৎ ধরণী। রাস্তার নাম ধরণী’ — ভূভারতে কেউ কখনও শোনেনি। কিন্তু উনি ভেবেছেন।

অথচ রাস্তার নামকরণের জন্য প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের নিয়ে একটি কমিটি আছে। কিসের বিশেষজ্ঞ? আমাদের রাজ্যে একমাত্র বিশেষজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রী (মেগালোম্যানিয়াকরা ঠিক এরকমই মনে করে)। এখন সত্যজিৎ রায়ের পুত্র কান্নাকাটি করছেন — ‘দোহাই, রাস্তার নাম ফিরিয়ে দিন। তাতে অবশ্য কোনো লাভ হয়নি। কেউ যদি মনে করেন এই অভিযান এখানেই শেষ তিনি ভুল প্রমাণিত হতেই পারেন। ধরণী’-তে বিষয়টা থামবে বলে মনে হয় না। কাল হতেই পারে রবীন্দ্রনাথকে চিরজীবী করতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সামনের রাস্তা রবীন্দ্র সরণির নাম পাল্টে করে দিলেন রবীন্দ্র মরেনি। এ সবই সম্ভব।

একজন গড় সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জানেন সাঁওতাল বিদ্রোহের দুজন নেতা সিধো এবং কানহু। সেখানে একজন ডহরবাবু বা তার পরিবারের সদস্যদের একদম ভরা বাজারে মাইকে ডেকে পাঠানোটা বাড়াবাড়ি রকমের অজ্ঞানতা, কিন্তু অজ্ঞানতা অপরাধ নয় কাজেই ক্ষমার্হ। কিন্তু কবি জন কিটস (মৃত্যু - ১৮২১) এবং শেলী (মূত্যু - ১৮২২)-এর সাথে শেকসপিয়রকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের (জন্ম - ১৮৬১) জ্ঞানগর্ভ আলোচনার উৎস একটি প্রহেলিকা ছাড়া কিছুই না। কি করে জানলেন? নিশ্চয়ই কোনো বইয়ে পড়েননি, নিশ্চয়ই কেউ বলেননি। স্রেফ উনি ভেবেছেন। আর যেহেতু তিনি মেগালোম্যানিয়ায় আক্রান্ত তাই যেটা ভেবেছেন সেটাকেই সত্য বলে জেনেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী আমাদের আবার রবীন্দ্রপ্রেমী। কথায় কথায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনেন। তাই অবলীলাক্রমে ১৯৪১ সালে প্রয়াত কবি ১৯৪৬ সালে বেলেঘাটায় এসে মহাত্মা গান্ধীর অনশন ভাঙাতে তাঁর হাতে ফলের রসের গ্লাস তুলে দেন কারণ তিনি ভেবেছেন। একইভাবে ১৮৬১-তে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৮৩৩-এ প্রয়াত রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে এসে বক্তৃতা দিয়ে যান। এবং এ কথা ভুলবশত একবার বলে ফেলেননি, দুদুবার বলেছেন। কারণ তিনি যা ভাবেন তাই অভ্রান্ত, ১০০% খাঁটি সত্য।

তবে এই সব অসংখ্য মণিমুক্তার ভাণ্ডার জনজীবনে খুব বিপজ্জনক হয়ে ওঠে না। বড়জোর আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর কেউ যদি বই লেখেন রাজ্য রাজনীতিতে হাস্যরসতবে এইসব তাতে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং আমাদের উত্তরসূরিরা এই সব পড়ে হেসে কুটিপাটি হবেন। কিন্তু মেগালোম্যানিয়াক রাজনীতিকদের কীর্তি এতটা নিরামিষ হয় না, এর সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতিহাস। মেগালোম্যানিয়াকের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট হলো এক, নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবা, দুই, নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবা। অর্থাৎ তিনি বাকিদের মতো নাতিনি সবার ওপরে। উনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে এই মনোভাবই সমস্ত মেগালোম্যানিয়াককে স্বৈরাচারী বানায়। সাধারণ মানুষের কাজ তাকে অনুসরণ করা। যদি করে তবে ভাল, আর না করলে তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য করতে হবে।

২০১১-র পরের কোনো নির্বাচনে মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারেনি। পরাজয় দূরে থাক কোনো নির্বাচনে তার সমর্থন কমে যাওয়াটাও একজন মেগালোম্যানিয়াক নেতা সহ্য করতে পারেন না। কেবল লোকসভা, পঞ্চায়েত বা পৌরসভার মতো রাজনৈতিক ভোট না, ছাত্র সংসদ থেকে কো-অপারেটিভ, পাড়ার ক্লাব থেকে স্কুল কমিটি সব নির্বাচনেই সরকারি দল গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঢালাও নির্দেশ — ‘অন্যরা যাতে একটি আসনও না পায় সেটা দেখতে হবে।এই নির্দেশ কেবল দলের কাছে যায় না, সাধারণ এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের কাছেও এই নির্দেশ যায়। স্টিং অপারেশন খ্যাত শ্রীযুক্ত মির্জা বা ভারতী ঘোষের মতো পুলিশ কর্তারা ঠিক এই কাজ করেছে পঞ্চায়েত বা পৌরসভা নির্বাচনে।

এটা কাকতালীয় কিনা জানি না। ক্ষমতায় আসার পর হিটলার এবং মুসোলিনি দুজনেই প্রশাসন এবং দলকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা এই রাজ্যে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই কাজ করার জন্য দল এবং প্রশাসনকে বিশেষভাবে তৈরি করতে হয়। অন্যকে সহমতে আনার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি ক্রমশ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। ২০১১-র আশপাশে তৃণমূলের মিটিং-এ মিছিলে বড় সংখ্যায় থাকতো সেই কর্মীরা যারা মানুষকে সহমতে আনতে পারে। কিন্তু এই অংশের প্রয়োজন ক্রমশ ফুরিয়েছে তৃণমূলের কাছে, তাদের দরকার ভোট লুট করার বাহিনী, তাদের দরকার প্রতিপক্ষ মুখ বন্ধ করার বাহিনী। তাদের দরকার মানুষকে ভয় দেখানোর বাহিনী, পায়ে হাঁটা মিছিলের বদলে বাইকবাহিনীকে বেশি দরকার।

বিধাননগরের পৌরভোটে টিভিতে আমরা দেখেছি মাটিতে ফেলে ৭০বছরের বৃদ্ধর বুকে লাথি মারা হচ্ছে। এরা রাজনৈতিক কর্মী হতে পারে না, এরা পেশাদার সমাজবিরোধী। কেন আসে এরা তৃণমূলের সাথে? নবান্নতে দিদিআছেন মানে এরা করে খেতে পারবে।তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এগুলোই তো এদের কাজ। এই করে এরা খায়। তৃণমূলের রাজনীতি দেখে এরা আসে না। অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এরা আসে। কাজেই যে কোনো মূল্যে এরা তৃণমূল ক্ষমতায় থাকুক এরা চায়। পাঁচ বছরে তৃণমূল দলের চেহারা পালটে গেছে। তৃণমূলের নেতা এখন অনুব্রত, আরাবুল, কাজল শেখ, মণিরুল, কানকাটা দিলীপ বা রানিগঞ্জের এম এল এ সোহরাব আলিরা। দল ছেড়ে চলে গেছেন পঙ্কজ ব্যানার্জি, এই বাহিনীর হাতে বেধড়ক মার খেয়েছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। এটাই এখনকার তৃণমূল।

২০১০-এ মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন আমি অনেক গুন্ডা কন্ট্রোল করিআর এখনকার বাস্তবতা হলো গুন্ডারা ওনাকে এবং ওনার দলকে কন্ট্রোল করে। যে কোনো মূল্যে ক্ষমতাই মেগালোম্যানিয়াকের লক্ষ্য। কোন্ পথে তা আসলো তা তার দেখার দরকার নেই। রানিগঞ্জের এম এ এ সোহরাব আলি লোহা চুরির মামলায় অপরাধী সাব্যস্ত হলেও তাকে তিনি সরান না। জেলে গেলেও মদন মিত্রকে মন্ত্রী রাখেন এবং প্রার্থী করেন। যারা নারদ স্টিং অপারেশনে ধরা পড়ল সেই সব তৃণমূল নেতারা জানেন নেত্রী তাদের কিছু বলবে না বরং তাদের পাশে দাঁড়াবেন। হিটলারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর হেরম্যান গোয়েরিং লুট করে ইউরোপের সবচেয়ে বড়লোকে পরিণত হয়েছিলেন। তার জমির পরিমাণ ছিল ১লক্ষ একর বা ৪০০ বর্গ কিলোমিটার। প্যারিসের মিউজিয়াম থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্প সামগ্রী লুট করে এনেছিলেন। সেই সব জিনিসের পরিমাণ এতটাই ছিল ২৬টি ট্রেন বোঝাই করে তা আনতে হয়েছিল। এতে গোয়েরিং-এর ওপর হিটলারের আস্থা বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ হিটলারের নিজের ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ ছিলেন গোয়েরিং।

পৃথিবীর সমস্ত মেগালোম্যানিয়াক স্বৈরাচারী শাসকদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ। কয়েক বছর আগে গ্রিস যখন তার বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে পারছে না, তখন তার নিলামে তুলেছিল রোডস দ্বীপে মুসোলিনির প্রাসাদ তার দাম উঠেছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার।

আমাদের রাজ্যের মেগালোম্যানিয়াক ভদ্রমহিলাটি একসময় নিজেকে সততার প্রতীক বলে প্রচার করতেন। চাপে পড়ে এখন সেসব করেন না। ডেলোর পাহাড়ী বাংলোর মধ্যরাতে চিট ফান্ড মালিকদের সাথে গোপন মিটিং, রহস্যজনক ক্রেতাদের কাছে কোটি কোটি টাকার ছবি বিক্রি এসবের উত্তর তিনি দিতে পারছেন না। দিতে পারছেন না তার ভাইয়েদের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির, এমনকি দিল্লির ফাইভ স্টার হোটেলে ভাইপোর ১১কোটি টাকার বিয়ের। স্বৈরাচার শেষ বিচারে দুর্নীতির উৎস। এবং দুর্নীতি এক জায়গায় দাঁডিয়ে থাকে নাতা প্রসারিত হয়। পাঁচ বছরে এই রাজ্য সৎ মানুষদের জেলখানা এবং চোরেদের মুক্তরাজ্যে পরিণত হয়েছে। দল, নেতা, নেত্রী, প্রশাসনের একটা অংশ সবাই এ পথের যাত্রী। যদি উনি জিতে চান এই রাজত্ব প্রসারিত হবে, কারণ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও তিনি বি জে পি-র সাথে সমঝোতা করে ম্যানেজ করে নিয়েছেন।

মেগালোম্যানিয়াকের স্বাভাবিক চরিত্র সে আইন মানে না, আইনের প্রতিষ্ঠান মানে না, নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করে। কিন্তু এখন মমতা ব্যানার্জির কাছে এটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য না, তার আত্মরক্ষার এক মাত্র পথ। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে তার রাগ ফুটে বেরোচ্ছে প্রতিটি বক্তৃতায়। আদালত সম্পর্কে তার প্রকাশ্য অবজ্ঞা তো আমরা গত পাঁচ বছর ধরে দেখছি। কাজেই শেষ চেষ্টা তিনি করবেন যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে। তিনি একটি পথই জানেন তা হলো লুট। এবারে এটা করবার মতো সাহস তিনি অর্জন করতে পারবেন কি না এটাই প্রশ্ন। এবারই প্রথম তিনি ভয় পেয়েছেন। কাজটা তার পক্ষে কঠিন। তিনি জানেন সব কিছু তিনি ম্যানেজ করতে পারবেন, পারবেন না বাংলার মানুষকে ম্যানেজ করতে।

মেগালোম্যানিয়াকদের শেষ যখন আসে তারা থাকে একা। সম্রাট নিরোর সাথে ছিল তার সঙ্গিনী। বার্লিনের মাটির নিচের বাংকারে হিটলারের সাথে একমাত্র ছিল ৪০মিনিট আগে যাকে বিয়ে করেছিলেন সেই এভা ব্রাউন। মুসোলিনীকে ধরে ফেলেছিল মিলানের পার্টিজান সৈনিকরা, তাকে মেরে ওরা ঝুলিয়ে দিয়েছিল ল্যাম্পপোস্টে। মিলানের শ্রমিক মহল্লা থেকে দল বেঁধে এসেছিল না খেতে পাওয়া হার জিরজিরে মেয়েরা, ঝুলন্ত দেহটাতে থুতু দিতে।

আমাদের মেগালোম্যানিয়াকও ক্রমশ একা হয়ে আসছেন। ২০১১-তে তাঁর সাথে ছিল সবাই। বামপন্থীরা ছিল একা। ৫বছর পর তার কেউ নেই। সবাই তার বিরুদ্ধে। উনি একা হয়ে আসছেন। মেগালোম্যানিয়াকের শেষ সময় ঘড়ির কাঁটার সাথে ক্রমশ এগিয়ে আসছে।--