Showing posts with label সি পি আই (এম). Show all posts
Showing posts with label সি পি আই (এম). Show all posts

20220712

ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার লড়াই: সীতারাম ইয়েচুরি

 

------------------------------------------

৮ জুলাই জ্যোতি বসু স্মারক বক্তৃতায় ‘স্বাধীনতা: ৭৫’ শিরোনামে সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ভাষণের সম্পাদিত বয়ান।

------------------------------------------

আমার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় তিন দশক জ্যোতি বসুর সঙ্গে কাজ করার যে সুযোগ পেয়েছি তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফেরার পর অনেকেই মনে করেছিলেন যে জ্যোতি বসু বাকিদের মতো ওকালতি পেশায় যুক্ত হবেন। কিন্তু তার বদলে তিনি আন্দোলনের ময়দানে পা রাখলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন যে দেশে ফেরার পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি যুক্ত হবেন এবং সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সময় চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে যে স্বাধীন ভারতের চরিত্র কেমন হবে। এই নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত শুরু হয়েছিল। 

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল কংগ্রেসের। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ভারতের বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ভারত বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কংগ্রেসের এই ধারণাকে সমর্থন করলেও দাবি তোলা হয় যে সাধারণ মানুষ যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাবে তাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার রূপ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে হবে, তবেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা টিকে থাকবে। এভাবেই ভারত ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে চলবে। ভারতে বৈচিত্রের কথা মাথায় রেখে সেই সময় কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে ভারত যদি সমাজতন্ত্রের দিকে, অর্থনৈতিক সমতার দিকে এগিয়ে না যায় তবে দেশের মানুষের মধ্যে ক্রমশ তৈরি হওয়া অসন্তোষ একটা সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করবে।

 


আর এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী মত হিসাবে উঠে আসে তৃতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাতে বলা হয় যে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ব্যাখ্যা করতে হবে। একটি পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে ভারতে যেহেতু মুসলিমদের একটি বড়সড় জনসংখ্যা থাকে তাই একটি মুসলিম রাষ্ট্র দরকার আছে। অপর দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় যে ভারত নিজেকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলবে। কে মুসলমান আর কে হিন্দু সেই নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। যেমন কেরালার মোপলা মুসলিম আর আসামের সিলেটি মুসলিমের মধ্যে মিলের চেয়ে ফারাকই বেশি আছে। ভারতের হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র আরও বেশি। এইসময়ে হিন্দুত্বের ধারণা নিয়ে আসেন সাভারকার। ইংল্যান্ডে থাকাকালীনই সাভারকার হিন্দুত্ববাদ শীর্ষক একটি লেখায় উল্লেখ করেন যে হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক নেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হিন্দুত্ববাদ হলো একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর মাধ্যমে বলা হয় যে ভারত যাদের মাতৃভূমি পিতৃভূমি এবং পূণ্যভূমি তারাই একমাত্র এখানে থাকতে পারবে। সাভারকার উল্লেখ করেন যে মুসলমানদের পুণ্যভূমি মক্কা মদিনা এবং খ্রিস্টানদের পুণ্যভূমি জেরুসালেম। আরএসএস তৈরি হওয়ার দুবছর আগেই এই ধারণা ধীরে ধীরে প্রচার হতে থাকে। হিন্দু রাষ্ট্র এবং মুসলিম রাষ্ট্র এই দুই রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ আলি জিন্নাহও একই কথা বলেন। সেই সময়ে সাভারকার জানান যে তাঁর সঙ্গে জিন্নার কোনও মতবিরোধ নেই। এই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই স্বাধীন ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়। সেই একই কথা এখন শোনা যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আরএসএস নেতাদের মুখে। তাঁদের কথায়, পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতে বসবাস করছে হিন্দুরা। আর ১২০০ বছর ধরে তারা পরাধীন। কারণ সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে। তারপর ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর সেই সময়ের লড়াইকে হিন্দু বনাম খ্রিস্টানের বলে উল্লেখ করতে চাইছে আরএসএস। আর এই সবের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে পরিবর্তন করা হচ্ছে। ভারতের ইতিহাসকে তারা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে, আর ভারতীয় দর্শনকে বদলে হিন্দু দর্শনের পাঠ দিতে চাইছে। এসবের কারণেই স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্ব। 

জ্যোতি বসুর দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির নেতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যা  ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। সেই সময় থেকেই কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। ভারতকে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে তৈরি করতে চাইলেও পুঁজিবাদের ওপর কংগ্রেস নির্ভরশীল ছিল, কমিউনিস্টরা তার বিরোধিতা করে। ১৯৪০ সাল নাগাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্বে এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে বিদেশ থেকে জ্যোতি বসু যখন দেশে ফেরেন তখন তাঁর এবং কয়েকজন কমিউনিস্ট সদস্যের ওপরে ওপর মুখ্য দায়িত্ব পরে তৎকালীন ভারতে কৃষকদের দুর্দশার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলার। যেমন বাংলায় তেভাগা আন্দোলন, কেরালায় পুন্নাপ্রা ভায়লার, মহারাষ্ট্রে ওরলি আদিবাসীদের জমির লড়াই, আসামের সুরমা উপত্যকায়, তেলেঙ্গানায় তখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে কৃষি আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলিকে থেকে বলা যেতে পারে স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অন্যদিকে কংগ্রেস জমিদার, জোতদারদের সাথে বোঝাপড়া করে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে আনার চেষ্টা করেছে। এই বোঝাপড়া স্বাধীনতার পরেও টিকে থাকে এবং তার পরিণাম এখনও আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি শেষ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সামন্তবাদের সাথে আপস করে পুঁজিবাদ নিজেদের জমি তৈরি করতে চেয়েছে, ফলে সামন্তবাদের উচ্ছেদ হয়নি। জ্যোতি বসু বার বার বলতেন যে, এরফলে সামন্তবাদী ধারণার আধিপত্য সমাজে বজায় থাকে। যেমন ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা এবং জাতব্যবস্থা এই দুই ধারণা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সে পিতৃতন্ত্রের প্রশ্নে হোক বা আদিবাসী দলিতদের ওপর অত্যাচারের প্রশ্নে হোক, কমিউনিস্টদের এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। প্রসঙ্গত, এই সব ধারণা আরএসএস’এর মনুবাদী মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, বিজেপি আরএসএস হিন্দুত্বের স্লোগানকে সামনে রেখে এইসব সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা ভাবনাকে এখন প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। 

বিজেপি জানে যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির কথা তারা বলছে তা কোনোভাবে সম্ভব নয় বর্তমান ভারতীয় সংবিধান থাকলে। হিন্দু রাষ্ট্র করতে তাদের সংবিধান বদলাতে হবে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এসে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি যখন কেন্দ্রে এমন এক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে যারা ভারতের সংবিধানকে বদলাতে চাইছে। তাকে মান্যতা দিতে চাইছে না শুধুমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করবে বলে। সংবিধানের চার ভিত্তি আর্থিক সার্বভৌমতা, সামাজিক ন্যায় বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র। এই চার স্তম্ভই আজ আক্রমণের সামনে। তিস্তা শীতলবাদের ঘটনা চোখে  আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বর্তমান ভারতের গণতন্ত্রের পরিস্থিতি। বর্তমান সরকার বলতে চাইছে যে সত্যি কথা কেউ বলতে পারবে না। সত্যি প্রকাশের জন্য সাংবাদিক জুবেইরকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের পর একের পর এক নতুন আইন তৈরি করে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সরকার কেড়ে নিয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে সরকার বলছে ভিন্নধর্মে বিবাহের আগের পুলিশ ভেরিফিকেশন করাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। যে সব আইন বিজেপি সরকার তৈরি করছে তার মধ্যে দিয়ে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে যেখানে হিন্দু এবং মুসলমানরা একে অপরের সাথে খোলাখুলি মেলামেশা করতে পারবে না। সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন, আদিবাসী দলিতদের ওপর ক্রমশ আক্রমণ প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। কর্পোরেট এবং সরকারের সখ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত দুই বছরে আদানির সম্পদ ব্যাপক বেড়েছে। আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছি যেখানে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে খাদ্যের দিক থেকে হোক স্বাস্থ্যের দিক থেকে হোক বা অন্য যে কোনও বিষয়ে বিভিন্ন সূচকে ভারতের স্থান ক্রমশ নিম্নমুখী।

 


স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে এসে ভারত আবার সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে তারা স্বাধীনতার আগে ছিল। সেই সময় যে যে বিষয়ের বিরুদ্ধে ভারতকে লড়াই করতে হয়েছে আজও সেই একই বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু সময় বদলানোর সাথে সাথে লড়াইয়ের চরিত্র ধরন বদলে গিয়েছে। স্বাধীনতার আগে ভারতে যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা এখন আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে স্বাধীনতার রাতে মহাত্মা গান্ধী কোথায় ছিলেন। তিনি কলকাতায় ছিলেন, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন, তারপর গিয়েছিলেন নোয়াখালিতে। আরএসএসের মতাদর্শের কারণে মহাত্মা গান্ধীকে খুন হতে হয়েছে। 

জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ উভয়েই প্রতি পদক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতেন। এই প্রশ্নে তাঁরা কমিউনিস্ট এবং বামপন্থী দলগুলি ছাড়াও অন্যান্য দলগুলির কাছেও সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। এই দুই নেতা দেশভাগের ক্ষত নিজেদের চোখে দেখেছেন, মরমে মরমে উপলবদ্ধি করেছেন। একজন বাংলায়, একজন পাঞ্জাবে। ভারত ভাগে আসল বিভাজিত হয়েছিল বাংলা এবং পাঞ্জাব। সেই বিভাজনের অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়, সাম্প্রদায়িকতার আগুন কীভাবে সবথেকে প্রগতিশীল বিচারধারাকে আক্রমণ করেছে। পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রসর, একইভাবে লাহোর শহর ছিল গোটা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। ভগৎ সিং লাহোরে কাজ করেছিলেন। সুরজিৎ নিজে লাহোর থেকে অমৃতসর অবধি সাইকেল চালিয়ে আসতেন বিপ্লবের কাজে। স্যার সিকান্দার হায়াত খান অবিভক্ত পাঞ্জাবের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কন্যা তাহিরা কমিউনিস্ট পার্টির পাঞ্জাব প্রদেশ কমিটির সদস্য ছিলেন। লাহোরে তাঁদের বাড়িতেই সাধারণত ক্যাবিনেট বৈঠক হতো, আবার কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠকও সেখানেই হতো। এমনও দিন গেছে, বাড়ির একতলায় পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠক চলছে, এবং দোতলায় কমিউনিস্ট পার্টির পিসি বৈঠক হচ্ছে। তো এমনই এক বৈঠক চলাকালীন খবর এল, পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠকে ঠিক হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এমন সময় তাহিরা বলেন, আপনারা চিন্তা করবেন না। আপনারা আমাদের বাড়িতেই থেকে যান। কারোর কল্পনাতেও আসা সম্ভব নয়, যে পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতেই কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠক চলছে! দেশভাগের পরে লাহোরের সেই ঐতিহ্য একেবারেই হারিয়ে গেল। ঢাকা শহরে আবার নতুন করে প্রগতিশীল আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং বামপন্থীরা সেখানে ভূমিকা রাখছেন। 

সুরজিৎ, জ্যোতি বসুরা বারবার বলতেন, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতে চান, তাঁদের সবাইকে একজোট করতে হবে। যারা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাঁদের সবাইকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলাম। আমরা এমন সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, যে সরকারের বিদেশমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। যদি প্রশ্ন করেন কেন এই সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, তার উত্তর হলো— যে কোনও উপায়ে জরুরি অবস্থাকে রুখতেই হতো। সেই সময়কার সব কালাআইনকেও সংবিধান থেকে বাতিল করতে হতো। তাই এই সরকারকে আমরা সমর্থন করি। জ্যোতি বসু ১৯৬৭ সালে অজয় মুখার্জিকে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে রাজি হয়েছিলেন, নিজে উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, যদিও সেই সময় আমাদের বৃহত্তম সংখ্যক বিধায়ক ছিলেন। আমরা নিজেরা মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি জানাতে পারতাম। কিন্তু ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯- দুইবারই, বেশি বিধায়ক নিয়েও আমরা অজয় মুখার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করি। কেন? কারণ তখন আমাদের মূল কাজ ছিল যে ভাবে সম্ভব কংগ্রেসকে হারানো এবং ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা। 

মূল বিষয় হলো, প্রতি যুগেই এমন একটা সময় আসে, যখন আমাদের শ্রেণি সংগ্রাম ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে আশু লক্ষ্য চিহ্নিত করতে হয়। সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির নিরিখে আমাদের চিহ্নিত করতে হয় শত্রুকে। কোন শক্তির কিংবা ব্যক্তির বিরোধিতা করতে পারলে গণআন্দোলন ও শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা সেই মুহূর্ত ঠিক করে দেয়। 

১৯৯৬ সালে নরসিমা রাওয়ের সরকারের ঠিক পরেই বাজপেয়ীর সরকার ক্ষমতায় এল। আমরা বললাম এদের ঠেকাতে হবে। সেই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা বললেন, আমি সরকার গড়তে সর্ববৃহৎ দলকে ডাকবো। সেটা ছিল বিজেপি। বিজেপি ১৩দিন সরকার চালিয়েছিল। সেই সময় আমি এবং আমার সহকর্মীরা জ্যোতি বসু এবং সুরজিতের কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে আমরা সেই সময় খুবই শঙ্কিত ছিলাম। বিজেপি একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেলে তাদের উৎখাত করা কঠিন হয়ে পড়বে। জ্যোতি বসু এবং সুরজিৎ আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তোমরা চিন্তা কোরো না, আমরা এদের ঠিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ছাড়ব। ১৩দিন পরে সংসদে আস্থা ভোট হলো, এবং ভোটে হেরে বাজপেয়ী ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। তারপর প্রথম ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। 

মূল বিষয় বা প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের কী প্রয়োজন সেই নিরিখেই আমাদের পথ তৈরি হবে। ১৯৭৭ সালে আমরা উপলব্ধি করেছিলাম আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করতে এমারজেন্সি এবং ইন্দিরা গান্ধীকে পরাস্ত করতে হবে। তাই আমরা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে প্রস্তুত সব শক্তির সঙ্গে একজোট হই। একইভাবে আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে, আমাদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। তাই বিজেপি’কে পরাস্ত করতে সক্ষম এবং ইচ্ছুক সমস্ত শক্তিকে একজোট করার দিকে আমরা এগোচ্ছি। জ্যোতি বসুই খুব সম্ভবত আমাদের দেশের জোট রাজনীতির স্থপতি ছিলেন। ১৯৬৭ সালে বাংলার প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার থেকে শুরু। তারপরে বাংলায় এবং দেশে যতগুলি যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি হয়েছে, প্রত্যেকটিতে জ্যোতি বসুর ভূমিকা ছিল। 

২০০৪ সালে এনডিএ সরকারকে হারানোর জন্য বিজেপি বিরোধী জোট গঠনের প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সুরজিৎ। সেই সময়ের মূল প্রশ্ন ছিল, কিভাবে বিজেপি-কে পরস্ত করতে পারার মতো সংখ্যা একত্রিত করা যায়। বিরোধীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ছিল— নিজের নিজের রাজ্যে যাও। বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে যতটা সম্ভব একত্রিত করো। এই ফর্মুলাতে রাজ্যস্তরে নিশ্চিত করতে হবে যে যাতে প্রতিটি রাজ্য থেকে অধিক সংখ্যক বিজেপি বিরোধী সাংসদ জিতে আসতে পারেন। তারপর আমরা দিল্লিতে বসে ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করব। বাস্তবেও ঠিক এটাই হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের যুক্তফ্রন্টও কিন্তু নির্বাচনের পরেই গঠিত হয়েছিল। একই কায়দায় ২০০৪ সালের প্রথম ইউপিএ সরকার নির্বাচনের পরে গঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকেই স্পষ্ট, ভারতে নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী বিজেপি বিরোধী কোনও মোর্চা গঠন সম্ভব নয়। কিছু মানুষ এখন থেকেই মোদীর এবং বিজেপি’র বিকল্প জোট ইত্যাদি গড়ার কথা বলছেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হলো এই ধরনের বিকল্প রাজ্যস্তরে গড়ে তুলতে হবে। যেমন তামিলনাড়ুতে হয়েছে। প্রথমে রাজ্যস্তরে করে তারপরে সেটাকে সর্বভারতীয় স্তরে তুলে আনতে হবে। 

এই মুহুর্তের গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটি? আমরা পার্টি কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাম্প্রদায়িকতাকে হারাতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সর্বোচ্চ ঐক্য গঠন করতে হবে। আমাদের প্রাথমিক কাজ হলো বিজেপি-কে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, তাকে দুর্বল করতে হবে এবং তাকে হারাতে হবে। সেই কাজ করতে গেলে সবার আগে আমাদের পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। আমাদের পার্টির সংগঠন এবং জনভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত বামপন্থী ঐক্য মজবুত করতে হবে। তৃতীয়ত সেই জোরের উপর দাঁড়িয়ে বাম-গণতান্ত্রিক জোট গঠন করতে হবে। এই জোট কেবলমাত্র রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামাজিক ও ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলনরত সংস্থা এবং শক্তিগুলিকেও এরমধ্যে শামিল করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে এক জায়গায় জড়ো করতে গেলে ন্যূনতম একটা বোঝাপড়ায় আমাদের পৌঁছাতেই হবে। 

বর্তমানে আমাদের দরজায় রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এমন একজন প্রার্থী খুঁজে বের করতে হবে যাকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি সমর্থন জানাতে প্রস্তুত হবে। এই প্রার্থীকে সামনে রেখে আমরা বিজেপি’র প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারব। এটাই মূল ইস্যু। একাধিকবার আমাদের মধ্যে প্রার্থীর নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যাকে অধিকাংশ দল সমর্থন জানাতে রাজি হবে। বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিজেপি’র বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছুঁড়ে দেওয়া। এই প্রাথমিক উদ্দেশ্য আমাদের পূরণ করতেই হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারিনা অমুকে হলুদ জামা পরেছে বা তমুকে লাল জামা পরেছে বলে আমি তাঁকে সমর্থন করব না। কিংবা সেই ব্যক্তি আগে অমুক অমুক কাজ করেছে তাই তাঁকে সমর্থন করা যাবে না। জ্যোতি বসুদের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে অজয় মুখার্জি বাংলায় কি কি করেছিলেন, কিংবা জনতা পার্টির নেতা হওয়ার আগে জগজীবন রামের ভূমিকা কী ছিল, রাজীব গান্ধীর অর্থমন্ত্রী হিসাবে ভিপি সিংয়ের ভূমিকা কী ছিল, এইসব প্রশ্ন আমরা তুলিনি, আমরা তাঁদের প্রত্যেককে সমর্থন জানিয়েছি কোনও না কোনও সময়ে। আমরা রাষ্ট্রপতি পদে ভিভি গিরিকে ভোট দিয়েছি। কিন্তু আমরা তাঁকে শর্ত দিয়েছিলাম। আপনি ব্যাঙ্ক, কয়লার রাষ্ট্রীয়করণ করুন, তাহলেই একমাত্র আপনাকে সমর্থন করব। এবং তাঁকে দিয়ে আমরা এগুলি করিয়ে নিয়েওছিলাম। 

জ্যোতিবাবু এবং সেই সময়ের নেতা যাঁদের আমরা পার্টির নবরত্ন বলে থাকি তাঁদের থেকে আমাদের শিখতে হবে, কীভাবে আশু লক্ষ্য পূরণ করে আমাদের আদর্শ এবং রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী রণকৌশল গ্রহণ করতে হবে। একটি শক্তি কিংবা ব্যক্তিকে সমর্থন জানানোর মাপকাঠি কেবলমাত্র এটাই। একজন ব্যক্তি অতীতে কী করেছেন, বা ভবিষ্যতে কী করতে পারেন, সেই ভাবনা থেকে বর্তমানের রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে না। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ইতিহাস তাই-ই বলছে। এই সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করার ফলেই আমরা এমারজেন্সিকে পরাস্ত করতে পেরেছি। আমারা মোরারজী দেশাই সরকারকে সমর্থন না করলে এমারজেন্সি সরানো যেত না। আর এমারজেন্সি না সরলে পশ্চিমবাংলায় ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হত কিনা তা বলা সম্ভব নয়। জ্যোতিবাবুর ২৩বছরের রেকর্ড মুখ্যমন্ত্রিত্ব, হয়ত এর কোনওটাই হতো না। আমরা কাকে সমর্থন করছি সেটা বিষয় নয়, কেন সমর্থন করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য কী?  উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন আসছে। আমরা এমন একজন প্রার্থীর খোঁজ করছি, যাঁকে সামনে রেখে বৃহত্তম বিরোধী ঐক্য গঠন সম্ভব। 

ইংল্যান্ড থেকে ফেরত আসার পরে জ্যোতি বসু ব্যারিস্টারির লোভনীয় পেশার হাতছানি উপেক্ষা করে রাজনীতিতে এলেন। শেষজীবনে তিনি একবার বলেছিলেন, সীতারাম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করব। আর আজকে আমি আমার মরণোত্তর দেহদান করলাম, আমি জানতাম না যে মৃত্যুর পরেও আমি জনগণের সেবায় কিছু করতে পারি। এই ধরনের মূল্যবোধ এবং চিন্তাধারা বিরল। তাঁর এই চিন্তাধারার জন্য আমরা তাঁকে সেলাম জানাই। এবং শুধুমাত্র সেলাম জানানোই নয়, আমরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর থেকে শিক্ষা নিই, নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করি। 

আমরা বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর আগের যুগসন্ধিক্ষণে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল। এই সন্ধিক্ষণে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের কাঠামো রক্ষার লড়াইতে জিততে হবে। সেই ভিতের উপরে দাঁড়িয়েই আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। 

...........................................

গণশক্তি, উত্তর সম্পাদকীয়, ১০জুলাই, ২০২২

...........................................

20200827

প্যান্ডেমিক-পিকে-আঁখি এবং প্রত্যাঘাত

সুদীপ্ত বসু

শুধু ধূপগুড়িতেই গঙ্গাধর রায় সহ মোট দশজন কৃষক এখনও পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়েছেন। পাটের চাষ প্রায় বন্ধ বিস্তীর্ণ এলাকায়। ফসলের দাম নেই, মহাজনী ঋণে জর্জরিত গরিব, প্রান্তিক কৃষকরা। আবার এই ধূপগুড়িতেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে প্রথম গোরক্ষার নামে গুজব ছড়িয়ে দুই কিশোরকে পিটিয়ে খুন করার প্রথম ঘটনা ডুডুয়ার তীরে বারহালিয়া গ্রামে। 

আজকের বাংলার রাজনীতির ‘সাজানো সমীকরণের’ আশ্চর্য ক্যানভাস হয়ে উঠতে পারে উত্তরবঙ্গের এই কৃষি জনপদ। 

গঙ্গাধর রায়ের মাত্র তিন বিঘা জমি ছিল, অন্যের জমিতে লিজেও চাষ করতেন। তিনটি মেয়ে। ব্যাঙ্ক ও মহাজনী ঋণের চাপে শেষপর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ, আত্মঘাতী হন। জমিও আপাতত বন্ধক রয়েছে মহাজনী কারবারিদের হাতে। ধূপগুড়ি থেকে গোটা উত্তরবঙ্গে আলু যায়, সেখানেই আলু চাষি আত্মঘাতী হচ্ছেন। শুধু এই এলাকা থেকেই তিন হাজারের বেশি কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়ে বাইরে কাজের খোঁজে। 

দারিদ্র্যের সেই উঠোনে বিহার থেকে আসা পিকে’র বাহিনী হাজির হয়েছিল। গঙ্গাধর রায়ের দাদা চিন্তামোহন রায়। গাদং এলাকায় সিপিআই(এম)’র সংগঠক। দু’বছর আগে বাবাকে হারানো তিন কন্যার অবাক চাহনি। চিন্তামোহন রায়ের পুত্র জয়ন্ত রায়। বাংলায় এমএ। ছয় বছর আগে প্রাথমিকে টেটে উত্তীর্ণ, আজও নিয়োগ হয়নি।

কর্পোরেট সংস্থা পিকে বাহিনীর মুখের ওপর জবাব শুনিয়েছিল জয়ন্ত,‘আমাদের পরিবারকে আগে জেনে আসুন, তারপর বাবাকে কিনতে আসবেন, আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু বিক্রি হই না’। 

প্রত্যাখ্যানের পর্ব পেরিয়ে এবার প্রত্যাঘাত। ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরাই পালটা তাড়া করেছে। প্রত্যাঘাতেই লুকিয়ে আছে আগামীর অনেক সম্ভাবনার রসদ।

 

‘আমাদের মাথা বিক্রির জন্য নয়’ 

রাজনীতিতে সময় বরাবরই এক্স ফ্যাক্টর। 

কোভিড আবহ। চলতি মাসেই রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লক্ষে পৌঁছাতে চলেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র বেআব্রু হচ্ছে প্রতিদিন, লকডাউনের দিন ঘোষণা করতেও কার্যত নাজেহাল সরকার। রাজ্যের মত দেশেও বাড়ছে করোনা দাপট। দেড়শো দিন পেরিয়ে গেছে, দেশে ৫৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্য, প্রধানমন্ত্রী ময়ূরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন! 

ঠিক সেই সময়তেই এরাজ্যে কেনাবেচা করতে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা শুরু করেছে মমতা ব্যানার্জির হয়ে ভাড়া খাটা প্রশান্ত কিশোরের বাহিনী। 

২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গায়ের জোরে, অস্ত্রের মুখে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় মাইলের পর মাইল বিরোধী শূন্য। বেলাগাম দুর্নীতির উৎসমুখ। আমফান পরবর্তী ঘটনাবলি স্পষ্ট করেছে বিনা ভোটে জেতার উগ্র বাসনা কেন। গরিব, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সামান্য ত্রিপল পেতেও টাকা দিতে হয়েছে। ক্ষোভের বৃত্ত বাড়ছে, জমি হারাচ্ছে তৃণমূল। বাজার করতে বেরোচ্ছে প্রশান্ত কিশোর অ্যান্ড কোম্পানি। 

খোদ হরিরামপুরের বিধায়কের বাড়ি পৌঁছেছে সেই ভাড়াটে বাহিনী। ঘৃণাভরে তা উড়িয়েছেন সিপিআই(এম) বিধায়ক রফিকুল ইসলাম। ঘরের দোর থেকেই বিদায় করেছেন পিকে বাহিনীকে। 

এবাংলার রাজনীতিতে এই সংস্কৃতির আমদানি হলো মমতা ব্যানার্জির হাত ধরেই। ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা মামলা রুজু করে দলবদলে চাপ দেওয়ার ঘটনা ২০১১ সাল থেকেই চলছিল। কিন্তু কোটি কোটি টাকায় ভাড়া করা একটা কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে বাংলার মানুষকে ‘কিনতে ’ চাওয়ার স্পর্ধা এর আগে কেউ দেখায়নি। ‘দিদিকে বলো’ থেকে ‘বাংলার গর্ব মমতা’- কর্পোরেট প্রচার মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই এবার বাঁকা আঙুলে ঘি তোলার চেষ্টা— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন উদ্বেগজনক ছবি।  

ধূপগুড়ির সিপিআই(এম)’র প্রাক্তন বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়ের উঠোনে দাঁড়িয়েও দরদাম করেছেন প্রশান্ত কিশোরের সংস্থার বিহারের বাসিন্দা। 

—শুনুন তৃণমূলকে জেতানোর দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের বস, এখন বেকায়দায়। চারিদিকে দুর্নীতি, আপনি তৃণমূলে যোগ দিন,আপনাদের মতো সৎ লোকেদের প্রয়োজন তৃণমূলে। টাকা পয়সার অভাব হবে না, জেলায় ভালো পদ পাওয়া যাবে।

ছাত্র আন্দোলন থেকে জমির আন্দোলনে পরশ মাখা প্রৌঢ়ের পালটা জবাব ছিল,‘ কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল সারাজীবন, কোনোদিন শুনিনি ভোটের জন্য কোনও দলকে একটা কর্পোরেট কোম্পানিকে ভাড়া করতে হয়। এসব এরাজ্যের সংস্কৃতি নয়, আর এই যে বলছেন তৃণমূলে সব অসৎ লোক, এটা ভুল ধারণা। তৃণমূলের মাথাই অসৎ তাই কর্মীরাও সেই পথে’। 

কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের শ্লাঘা বোধ হবে এমন কথোপকথনে স্বাভাবিক। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন সিপিআই(এম)’কে কিনতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে হচ্ছে? আবার করোনা পরিস্থিতিতে রাজ্যও দেশের সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে, মানুষের দাবিতে প্রতিবাদ আন্দোলনে নামলে সিপিআই(এম)’কেই হুঁশিয়ারি দিতে হচ্ছে নবান্ন থেকে?

 

বাড়ির সামনে বসে মাছের জাল বুনছেন প্রাক্তন সিপিআই(এম) বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়


‘করোনার ব্যর্থতা শেষে এখন দুর্নীতি’ 

গত পাঁচ মাস রাজ্যজুড়ে কোভিড পরিস্থিতিতে একের পর এক মর্মান্তিক ছবি সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য দপ্তর পাঁচ মাসে ঠিক কী কাজ করেছে তা নিয়ে রাজ্যবাসীর স্বাভাবিকভাবেই এখন কোনও আগ্রহ নেই। লকডাউন মানে যে রাস্তা লাল ইট দিয়ে সাদা গোল করা নয়, তা এতদিনে উনিও হয়তো টের পেয়েছেন। 

মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক তো ছাড়, খাস বিহারও এখন দৈনিক করোনা নমুনা পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজ্যে গোষ্ঠী সংক্রমণের আবহে অ্যাগ্রেসিভ টেস্টিং’র জায়গায় দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ ভাবে কমে যাওয়া করোনা পর্বে রীতিমতো উদ্বেগজনক বলেই মনে করা হচ্ছে। কোভিড পজিটিভ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার পেরোতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের যে জেলায় করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেই জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিকদের স্রেফ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। ‘আলিপুরদুয়ার মডেল’ নয়, সরকার বরং নির্মল মাজি-শান্তনু সেন’দের প্রেসক্রিপশনেই আস্থা রাখছে। যার অনিবার্য পরিণাম, সংক্রমণের গতি বেপরোয়া, মৃত্যুর স্রোতকে আটকাতে না পারার ব্যর্থতা সামনে আসছে প্রতিদিন। 

সংক্রমণের এই পর্বে রাজনীতি করা যাবে না বলে দাবি করে প্রতিদিন স্রেফ দলীয় রাজনীতি করে যাচ্ছে সরকার। সংক্রমণের শঙ্কা উপেক্ষা করে দলীয় বাহিনী ত্রাণ, ক্ষতিপূরণে টাকা চুরি করে যাচ্ছে, প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা পথে নামলে ‘করোনায় রাজনীতি ’ না করার হুশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তথ্য বলছে লকডাউন শুরু প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তখই করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩১, ১২৫১জন নজরদারিতে, ২৯জনের লালরসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আর সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী মালদহের সভায় দাঁড়িয়ে বলছে, করোনা করোনা নিয়ে মাথা ঘামানো হচ্ছে, ওসবে প্যানিক করবেন না’। উলটে আবার নেতাজী ইন্ডোরে সভা করে ক্লাবগুলিতে টাকা বিলি করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সরকার কেনাবেচায় ব্যস্ত ছিল অমিত শাহ, তাই জানুয়ারি স্পষ্ট ইঙ্গিত পেলেও মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নষ্ট করা হয়েছিল। 

আর এখন আনলক পর্বে সামনে এসেছে মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিইি-ভেন্টিলেটর- কেনা নিয়েও সরকারের অন্দরেই এখন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খবর। কোভিড সরঞ্জাম নিয়েও দুর্নীতি! আমফানের ক্ষতিপূরণ নিয়েই দুর্নীতি! মুখ্যমন্ত্রীর সাফাইয়ের মর্মার্থ— পিএম কেয়ার ফান্ডে দুর্নীতি হতে পারলে এরাজ্যে সামান্য মাস্ক, ভেন্টিলেটর নিয়ে প্রশ্ন কেন? 

‘বাইনারি’ ঠিক হচ্ছে কীভাবে, কোন খাতে বারেবারে তা স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। 


‘শীতঘুম শেষে বোঝাপড়ার সমন’ 

এর মাঝেই নতুন মোড়। আনলক পর্বে এসে দীর্ঘ শীতঘুম কাটিয়ে ফের নারদ ঘুষকাণ্ডে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের সমন পাঠানো হচ্ছে, সম্পত্তির তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এফআইআর রুজুর পরে চার বছর কেটে গেছে। তারপরেও এখনও সমনের পালা চলছে। কেউ কেউ খুশি, ‘এই তো এবার দুর্নীতিগ্রস্তরা ধরা পড়বে’। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তির আকাঙ্ক্ষা ভুল কিছু নয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থা দৃঢ়তার সঙ্গে তদন্ত করে হাত পেতে ঘুষ নেওয়া মন্ত্রী, সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, সেই ধারণা চরম বিভ্রান্তিকর। 

কেন? ২০১৪ সালে সারদা-রোজভ্যালি সহ চিট ফান্ডকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। ছয় বছর পরেও চার্জশিট জমা দেওয়া হয়নি। এখন বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তদন্ত চলছে। 

তবে এর মাঝেই এবার জবাব দিতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই। গত ছয় বছর ধরে চিট ফান্ডকাণ্ডে অভিযুক্তদের জেলে ঢোকানোর গল্প পশ্চিমবঙ্গে এসে বার পাঁচেক শুনিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

অথচ সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের (সিভিসি) রিপোর্ট বলছে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা দেশে একাধিক দুর্নীতির মামলায়( ব্যাঙ্ক, এমনকি সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি) জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আধিকারিক সহ ১১০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সম্মতিটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ, জন-অভিযোগ মন্ত্রক। এই মন্ত্রক রয়েছে মোদীর হাতেই। 

২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র আবেদন বকেয়া রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসেই সিবিআই’র তরফে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ ও একজন মন্ত্রীর জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আবেদন জানানো হয়। সেই  আবেদন ১৫ মাস ধরে ফেলে রেখেছে মোদী সরকার। এমনকি মমতা ব্যানার্জির ছবি দুর্নীতিকাণ্ডের আইনি প্রক্রিয়ার আবেদনও ফেলে রাখা হয়েছে। 

বিশ্বাস করবেন এই নতুন ‘সমন পর্ব’? 


সোশ্যাল মিডিয়া শাসকেরই মিডিয়া’ 

‘নয়া ভারতে মোদীর প্রতারক ভাবমূর্তি’— এই শীর্ষক সিপিআই(এম)র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ফেসবুক লাইভ। সেই ভার্চুয়াল বক্তৃতার শেয়ার করার মহারাষ্ট্রের সিপিআই(এম) নেত্রী শুভা সামিমের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তিনদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। এই বক্তৃতা নাকি ফেসবুকে সামাজিক মাপকাঠির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

যদিও তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা টি রাজা সিং’র ঘৃণ্য বিষাক্ত মন্তব্য— মুসলিমদের বিশ্বাসঘাতক, রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি করে মারা, দিল্লির দাঙ্গায় কপিল মিশ্রের উগ্র পোস্ট— সব কিছুই অনুমোদন দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ‘ব্যবসা ও শাসক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কে ক্ষতি হবে’ এই অজুহাতে! অভিযোগের তীর ফেসবুকের  ভারত, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পাবলিক পলিসি ডিরেক্টর আঁখি দাস আবার রাজ্যের প্রাক্তন কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ। ২০১১ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ বর্ধমান কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার সামলেছেন আঁখি দাস নিজেই। কথিত আছে, তাঁর প্রভাবেই রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় মন্ত্রীসভায় স্থান পান। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তাঁর স্বামী দিল্লির উচ্চ পদস্থ আমলা( আরএসএস’র কট্টর সমর্থক) সৌম্য চট্টোপাধ্যায় এবং আঁখি দাস ওই কেন্দ্রের নির্বাচনী প্রচারের সময় ছিলেন বর্ধমানেই। এমনকি খোদ তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে কোভিডের জন্য ‘মুসলিমদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করা উচিত’র মতো সূক্ষ বিষাক্ত প্রচারও শেয়ার করতে দেখা গেছে। তাঁর দিদিও পরিচিত মুখ, বিজেপি’র। 

বিজেপি-আরএসএস’র সখ্যতা কখনও তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আঁখি দাসের পথে বাধা হয়নি। 

২০১১ ভোটের সময় যেভাবে তৃণমূলের প্রচার ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছিল, যেভাবে প্রচারের সুর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাতে দলেরই বিধায়ক, মন্ত্রীর এই পুত্রবধূর ‘ভূমিকা’ গুরুত্বপূর্ণ। 

সীতারাম ইয়েচুরির বক্তৃতার লিঙ্ক শেয়ার অপরাধ, অথচ কপিল মিশ্রদের বক্তৃতা ফেসবুকে ভাইরাল করতে সময় লাগে না। খোদ ফেসবুক প্রধান নিজেই লিখেছেন মমতার প্রচারের ৩৮ ভিডিও ভাইরালের রহস্য! 

আদৌ রহস্য থাকল কিছু ? সোশ্যাল মিডিয়া আসলেই ‘শাসকেরই মিডিয়া’!


‘দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে’ 

মহামারীকে ঢাল করে যেভাবে জনগণের রুটি-রুজির ওপরে আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে, যেভাবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ কর্পোরেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তার প্রতিবাদে গোটা দেশজুড়ে এই অস্থির সময়তেই সপ্তাহ ব্যাপী সিপিআই(এম)’র প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। ১৬টি দাবি। স্পষ্ট বিকল্প— আয়কর দেয় না এমন পরিবারগুলিকে আগামী ছয় মাস নগদ ৭৫০০ টাকা করে দিতে হবে, বর্ধিত মজুরি সহ রেগায় ২০০দিনের কাজ। 

আবারো বলতে হচ্ছে ‘সময়’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুত্বের উগ্র মুখ মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল ফিরে এসেছেন কলকাতায়। নড়বড়ে অধিকারী পরিবার, নারদকাণ্ডের সমন পৌঁছেছে তাঁর ঠিকানাতেও। ‘পত্র-সংঘাতের’ মাঝেই রাজভবনে ‘আড্ডা’ দিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রীও।

বিচ্ছিন্ন সব ছবি? একেবারেই নয়। 

পরিকল্পিত মেরুকরণের রঙিন চিত্রনাট্য প্রস্তুত। শাসকের মরজি মতো মিডিয়ায় সাজানো হচ্ছে বাইনারি- ‘হয় তুমি তৃণমূল নয় তুমি বিজেপি’। 

আপনাকে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে দুই সরকার। 

উত্তর অভিন্ন— আমাদেরই সামনে আনতে হবে বিকল্প ভাষ্য। একইসঙ্গে প্রত্যাঘাত, দ্রুত এবং সরাসরি। মনে রাখতে হবে পিকে’র বাহিনী কাদা মাখা কৃষকদের তাড়া খেয়েই কিন্তু গ্রাম থেকে পালাতে বাধ্য হয়।

গণশক্তি, ২৫ আগস্ট, ২০২০

20200622

বামফ্রন্টের সাফল্য এবং লড়াই শত্রুদের চিরন্তন আতঙ্কের ভূত



মৃদুল দে

বামপন্থীদের সরকার পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৭৭ সালে। ২১জুন প্রতিষ্ঠা দিবস একটা স্মরণীয় দিন উদ্‌যাপনের আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। ৩৪বছর টানা অনন্য সরকার, তার জন্যও নয়। চারদিকে প্রতিক্রিয়ার বেষ্টনি ও ষড়যন্ত্র, সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা, কেন্দ্রের সরকারের পদে পদে বৈষম্য, পুলিশ আমলাসহ গোটা যন্ত্র যেভাবে জনবিরোধী কাজে অভ্যস্ত তাদের বাধা, নানা শক্তির নাশকতামূলক কাজ, মিডিয়ার শত্রুতা এবং আদালতের ভূমিকায় জনমুখিনতার অভাব, কংগ্রেসের ত্রিশ বছরের শাসনের ব্যর্থতা ও অপকর্মের বিশাল বোঝা ইত্যাদি উত্তরাধিকার সূত্রে বইতে হয়েছে নতুন সরকারকে; এর মধ্যেই খোদাই হয়েছে অবিস্মরণীয় সাফল্য  হাজার চেষ্টা করেও প্রতিক্রিয়া, তাদের মিডিয়া, বর্তমান হিংস্র স্বৈরাচারী শাসন ভাঙার হাস্যকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে সারা দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা চাপিয়ে কংগ্রেস একচ্ছত্র ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশব্যাপী অ-কংগ্রেসী শক্তিগুলির অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের পটভূমিতে ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গঠিত হয় এবং এরপরেই রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচন; প‍‌শ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এবং আধা-ফ‌্যাসিস্ত সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটায়। এটাও সামগ্রিক মূল্যায়ন নয়, এভাবে রাতারাতি রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত গুণগত এক পরিবর্তনেও এই সরকার তৈরি হয়নি। এটাও নয় যে, শুধু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ সরকার কালচক্রে স্থাপিত হয়েছিল; আছে এক দীর্ঘ অক্ষয় ঐতিহ্য।

পটভূমি
পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই জাতীয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লববাদী আন্দোলনের ধারা, পাশাপাশি বিরাট ভূমিকা পালন করে ব্রিটিশ শাসকদের অবর্ণনীয় নৃশংসতার শিকার হয়েছিল, ফাঁসি, জেল, আন্দামানে সেক্যুলার জেলে আটক, পরিবারের পর পরিবারকে কালকানুন দিয়ে হিংস্রতায় নিমজ্জিত করাবাংলায় এই ঐতিহ্য,অম্লান, সুমহান। এঁরা সকলেই পরে যুক্ত হন বামপন্থীদের সঙ্গে ১৯২০ সালে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। বাংলায় জাতীয় আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে বামপন্থী ভাবধারার‍‌ই প্রাধান্য ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই উজ্জ্বল অবদানকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করার ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাসের খণ্ডিত চিত্রই প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ইতিহাসচর্চায় তখন থেকেই বিরাজ করছে, যার প্রাবল্যে আজ গোটা দেশের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সঙ্ঘ পরিবার এক বিরাট ও ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট বিদ্বেষী প্রচার, কমিউনিস্ট ও বামপন্থার ওপর আক্রমণ, ১৯৪৬-তে গোটা বাংলাজুড়ে দাঙ্গার ভয়াবহতা, দেশভাগজনিত পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদি শ্রেণি আন্দোলনের সামনে তৈরি করে বহু বাধা ও জটিলতা। কিন্তু এ‍ই কঠিন অবস্থায়ও পাঁচের দশকে নিরবচ্ছিন্ন ও একনিষ্ঠ আন্দোলন, উত্তাল গণআন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জনগণের সংযোগকে দৃঢ় করে তোলে। কংগ্রেসী শাসনের অত্যাচার, জেল, দমনপীড়ন ইত্যাদি কোনকিছুই জনগণ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে ও বামপন্থীদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং দেউলিয়া কংগ্রেসের শাসনের বিচ্ছিন্নতাই ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ছয়ের দশকের গোড়ায় চীন-ভারত বিরোধ, গণআন্দোলন ও দেশে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর বিদ্বেষ আক্রমণ চলে। বন্দিমুক্তি, খাদ্য আন্দোলন চললেও বিরাট গণআন্দোলন এই আক্রমণের মুখে অনেকটা গতি হারায়। এরই অনুবর্তিকায় ঘটে বামপন্থীদের ১৯৬৬ সালের উদ্দীপ্ত খাদ্য আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের যৌথ আন্দোলন। দুদশকের কংগ্রেসের জনবিরোধী নীতি, অপশাসন, আর্থিক সঙ্কটও, মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে।

যুক্তফ্রন্ট
১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরেক বড় গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। গোটা দেশে কংগ্রেসের বিকল্প কোনও দল, জোট বা শক্তি ছিল না। কংগ্রেসের বিকল্প নেই এই যে প্রচার গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, সেই মিথ্যা তখন ভেঙে পড়ে। সংবিধানের নির্দেশিকা ও মর্মবস্তুর সঙ্গে কংগ্রেস শাসন চিরকাল পরিহাস করে এসেছে। তাতে কংগ্রেস-বিরোধী মনোভাবের সুযোগ নিতে তৎপর হয় স্বতন্ত্র এবং আরএসএসএর রাজনৈতিক ও প্রতিনিধি জনসঙ্ঘ। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিও সক্রিয়। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং ৭টি রাজ্যের বিধানসভায় কংগ্রেসের পরাজয় ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে অকংগ্রেসীরা নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ লড়াই না করেও পরাস্ত করে কংগ্রেসকে। জনসঙ্ঘকে বাদ দিয়ে বাম ও অ-বাম অকংগ্রেসী দলগুলিকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। গোটা রাজ্য এই উচ্ছ্বাসে তখন ফেটে পড়ে। গণতান্ত্রিক অধিকার, গণআন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনের অধিকার, বিনাবিচারে আটক বন্দিদের মুক্তি, উদ্বাস্তু, কৃষকদের জন্য জমি, প্রশাসনিক দুর্নীতিরোধ, খাদ্য সঙ্কটের মোকাবিলা ইত্যাদি ১৮ দফা কর্মসূচির বহুবিধ কাজে হাত দেয় নতুন সরকার। পদে পদে বাধা, সংবাদপত্রের কুৎসা, স্থিতিশীলতা ধ্বংস, আইন শৃঙ্খলার অবসান ইত্যাদি প্রচার, এর মধ্যেও গণআন্দোলন ও সরকারের দায়িত্ব পালন একসঙ্গে চলে। দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের চেয়ে পৃথক এক শাসনধারা তৈরিও শুরু হয়। সাত মাসের মধ্যে নির্দল ও অবামপন্থীদের ১৭ জন বিধায়ককে দিয়ে সমর্থন প্রত্যাহার করিয়ে রাজ্যপালকে ব্যবহার করে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটায় কেন্দ্র, কোনও রাজ্যেই অকংগ্রেসী সরকারকে টিকতে দেওয়া হয়নি। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে রাজজুড়ে জোরালো আন্দোলন চলে, ব্রিগেডে হয় বিরাট বিরাট সমাবেশ। ১৯৬৭-র  ৫নভেম্বরের সিপিআই(এম)র ব্রিগেড সমাবেশ এখনও বলা যায় অতুলনীয়। এই আন্দোলনের চাপেই ১৯৬৯ সালে আবার বিধানসভা নির্বাচন। এবার বাম, অ-বামরা যুক্তফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ। বিরাট জয় হয় যুক্তফ্রন্টের মোট ৪৯.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে।
সিপিআই(এম) উভয় সরকারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দল হওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ বাংলা কংগ্রেসকে ছেড়ে দেয়, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও ভাগ করা হয় শরিকদের মধ্যে। বেনামি জমি উদ্ধার, জমি বণ্টন, বর্গাদারদের অধিকার, শিল্প শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের নির্বাচন ও অধিকার, শিক্ষা স্বাস্থ্য, উদ্বাস্তু তফসিলি জাতি ও উপজাতি সমস্ত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য সীমিত ক্ষমতা ও সমস্যার মধ্যেও অর্জিত হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও বেনামি জমি উদ্ধারের আন্দোলন, জনগণের পক্ষে ৩৬ দফা কর্মসূচি রূপায়ণ সম্পূর্ণ এক পৃথক ও বিকল্প জনমুখী সরকার পরিচালনা যুক্তফ্রন্ট হাজির করে দেশের সামনে। এর আগে বামপন্থীদের নেতৃত্বে কেরালাও নজির তৈরি করে।

সন্ত্রাসরাজত্ব বাংলাতেই
বাংলায় যুক্তফ্রন্টে এই সাফল্য যেমন প্রতিক্রিয়ার শক্তির শ্রেণি আক্রোশ বাড়িয়ে তোলে, যুক্তফ্রন্টের মধ্যেও বিভেদের প্রতিফলন ঘটে। এসব কাজে লাগিয়ে এই সরকারের পতন ঘটানো হয়। কিন্তু সরকার বাঁচানোর জন্য কোনও আপসমূলক কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হয়নি, বাইরের সংগ্রামকে তীব্রতর করা হয়, সন্ত্রাসে সিপিআই(এম)‘র বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা ও হাজার হাজার কর্মীকে অকথ্য অত্যাচার সইতে হয়। ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ ছিল না, কিন্তু সিপিআই(এম) এবং সহযোগী কয়েকটি ছোট বামপন্থী দল মিলে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে সন্ত্রাস, মিডিয়ার কুৎসা, বহু কেন্দ্রে নির্বাচনী প্রচার করতে না পারা, ষড়যন্ত্র, গরিবী হটাও, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ ও বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে কংগ্রেস সরকারের সহায়তার জন্য কংগ্রেস-অনুকূল ইন্দিরা-হাওয়ানামক পরিস্থিতির মধ্যেও। সর্বত্রই জয় জয়কার কংগ্রেসে, একমাত্র হাওয়া ঘুরে যায়, পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় পরাজয় কংগ্রেসের।
১৯৭২ সালের নির্বাচনের আবার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বামপন্থীরা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঐক্যবদ্ধ হয়। আরও বড় শোচনীয় পরাজয় অবধারিত বুঝে গোটা নির্বাচনকে রিগিং ও জাল জুয়াচুরির মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রহসনে পরিণত করে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার। পাঁচ বছর ধরে অকথ্য বর্বরতা চলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থীদের ওপর। ১১০০ সিপিআই (এম) নেতা ও কর্মী খুন হন, বিনা বিচারে ও সাজানো মামলায় হাজার হাজার গ্রেপ্তার, হাজার হাজার কর্মী এলাকা ছাড়া হয়। ভারতে জরুরি অবস্থার আগেই পশ্চিমবঙ্গ সেই বীভৎস অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়। কিন্তু গণতন্ত্র ও জীবন  জীবিকার আন্দোলনকে তখনও স্তব্ধ করা যায়নি। ভারতের অন্য কোনও রাজনৈতিক দল এই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়নি এরকম ত‌্যাগস্বীকার করেনি
এই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কাল যাঁরা অতিক্রম করেছেন, স্বাভাবিক কারণেই আজ তাঁদের সংখ্যা সীমিত। মিডিয়া এখন অনেক শক্তিশালী, নতুন নতুন প্রজন্মকে কুৎসায় ডুবিয়ে সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে তারা বিস্মরণে পাঠিয়ে দিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে এই লড়াই ও আত্মত্যাগই আজও ভবিষ্যতের অফুরন্ত প্রেরণা।

বামফ্রন্টের সরকার : নবদিগন্ত
এই সংগ্রামের তরঙ্গ শীর্ষেই গঠিত হয়েছে বামফ্রন্ট এবং ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকার গঠন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা  সত্ত্বেও  সব শরিকদের সরকারে মর্যাদার আসন দেয় সিপিআই(এম)। ক্ষমতা নয়, জনস্বার্থ রক্ষাই যে প্রধান এ নীতিই উজ্জ্বলতর হয়। কেন্দ্রে তখন জনতা সরকার যার মধ্যে আরএসএসএর জনসঙ্ঘও মিশে যায়। পরাস্ত কংগ্রেসী স্বৈরতন্ত্র। এরকম অনুকূল অবস্থায় কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে জনতা পার্টিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও তারা রাজি না হওয়ায় বামফ্রন্ট এককভাবে লড়াই করে, বিরাট জয় অর্জন করে। বাইরের শত্রুতা ছাড়াও দুই যুক্তফ্রন্ট সরকারের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার  কারণেও যে বাধা ছিল, সেই বাধা ১৯৭৭-এ ছিল না। কিন্তু দেশের  মূল সংবাদপত্র নতুন মাত্রায় বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কুৎসা অভিযান চালায়। প্রথম দিনেই জ্যোতি বসু ঘোষণা করেন, সরকার জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাতেই চলবে, রাইটার্স বিল্ডিং থেকে চলবে না। ৩৪ বছর এই নীতিই অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। দেশে অন্য কোনও নজির নেই। বিরোধীদের মর্যাদা, সমালোচনার অধিকার, বাক্‌ স্বাধীনতা, আন্দোলন-সংগ্রামের অধিকার, রাজবন্দিদের মুক্তি, বরখাস্ত সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের পুনর্বহাল, আইন সংশোধন করে পূর্ণমাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার পৌরসভা, পঞ্চা‍‌য়েতের  মাধ্যমে কাজ, সর্বত্র আমলাতান্ত্রিকতার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচিত সংস্থার  মাধ্যমে সরকার পরিচালনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথম  এবং সারা দেশের ও গণতন্ত্র সম্প্রসারণের দিশারিএক বছরের মধ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়, ১৯৭৮  সালে, সম্পূর্ণ সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ও অবাধ। নির্বাচিত  হয় গরিব অংশের মানুষই দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের আবর্ত  থেকে মুক্ত করা হয় শিক্ষাকে। কংগ্রেসী আমলে সন্ত্রাসে হত্যা করা হয় ৪০ জনের বেশি শিক্ষককে। বহু  শিক্ষক, কর্মচারী, শ্রমিক এলাকাচ্যুত হয়, কাজে যোগদান করতে পারেননি এমন সকলেরই পুনর্বহাল হয়। প্রাথমিক শিক্ষার আওতা থেকে কোনও শিশু বাদ না যায়,  অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সে কাজে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবৈতনিক শিক্ষাসহ শিক্ষা সংস্কার সর্বত্র শুরু হয়। বেআইনি  নাম উদ্ধার করে গরিব অংশের কৃষক, খেতমজুর, বর্গাদারদের মধ্যে বিলির কাজ ও কৃষকদের  সহায়তা  পায় অগ্রাধিকারআলাপ আ‍‌লোচনায় অনেক বন্ধ ও রুগ্‌ণ কারখানা এবং প্রতিষ্ঠান খোলা  সম্ভব হয়। গ্রামে চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা, বিভিন্ন ভাষার  বিকাশ, পার্বত্য উন্নয়ন এমন কোনও ক্ষেত্র বাকি নেই  যেখানে জনমুখী বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়নি। বিকেন্দ্রীকরণের  নীতি ও রূপায়ণ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত কেন্দ্র ও তা গ্রহণ করে সংবিধান সংশোধন করে।  রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা মাঠে মারা যায় যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল শাসনে বা  অন্যত্র বিজেপি শাসনে বটেই। কিন্তু বাধা, অসুবিধা, প্রতিবন্ধকতা, জনবিরোধী প্রশাসনিক কাঠামো ও সীমিত ক্ষমতার মধ্যে কাজ বার বার বামফ্রন্ট জনগণকে সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করেছে,  যাতে তাঁদের প্রত্যাশা এর বাইরে আকাশচুম্বী কিছু না হয়।  বলা হয় ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয়, কিন্তু সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কেন্দ্রীভূত। হাজার সদিচ্ছা থাকলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধা ও সীমাবদ্ধতা কোনও রাজ্য সরকারকে মৌলিক সমস্যা বিষয়েও গুণগত পরিবর্তন করতে দেয় না। রাজ্যগুলিকে রাজস্ব, আর্থিক, আইনগত ও বহু বিষয়ে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়। এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে। মোদী সরকার হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গোটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভাঙনের মুখে এখন নিয়ে এসেছে, সরকারের নামে কার্যত দলীয় কর্তৃত্বের আওতায় নির্বাচন কমিশন থেকে সমস্ত স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে নিয়ে আসছে, আদালতের ওপরও খবরদারি চলছে। অন্য কোনও সরকার, বিরোধী নির্বাচিত সদস্যদের টিকতেই দেবে না ওরা। রাজ্যের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা এবং রাজ্যগুলির প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে রাজ্যগুলি এবং গোটা দেশকে উন্নতির পথে শক্তিশালী করতে বামফ্রন্ট সরকার দেশজুড়ে এক আন্দোলন তৈরি করেছিল। ভূমিসংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, গণতন্ত্র প্রসার, জনগণের অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন ইত্যাদি অজস্র ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকার বিরাট সাফল্যই কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের এই দেশব্যাপী আন্দোলনে জ্যোতি বসু নেতৃত্ব দিয়েছেন

ঐতিহাসিক অবদান
কেরালা ও ত্রিপুরায় বামপন্থীরা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হয়, এমন কোনও কাজ করতে দেয়নি। সাড়ে তিন দশক অবাধ, সুষ্ঠু ও সময়মতো নির্বাচন হয় সব স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায়। কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্বলতা গোটা সাফল্য ম্লান করতে পারে না। এই দুর্বলতা বামফ্রন্ট লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেনি। জনগণকে নিয়ে জারি রেখেছে। সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে কোনও ফাঁক থাকতে দেয়নি, দুর্নীতি দমনেও মন্ত্রীসভার নজির আজও দেশে সকলের মুখে মুখে। সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তোলার আগেই মাথা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তফসিলি, আদিবাসী, মহিলা নির্যাতন হলে অপরাধীরা যে-ই হোক, কেউই পার পায়নি। ১৯৮০ সালে জনতা সরকারের অবসান, তারপর ৪০ বছরে দেশেও কেন্দ্রে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।
বামফ্রন্টের তিন দশকের সরকার পরিচালনার সময় নয়া-উদারীকরণের সর্বনাশা নীতি চালু করেছিল কংগ্রেস ৯০-র দশকে। হীনবল সঙ্ঘ পরিবার একই সময় প্রচণ্ড হিংসাত্মক দৌরাত্ম্য নিয়ে সাম্প্রদায়িক অভিযান তুঙ্গে তুলেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী গণআন্দোলনের বিপর্যয় ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে ভারসাম্যের পরিবর্তনে, বিভেদকামী-বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তি এ সময়েই ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। তার মধ্যেই বিরাট উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে যে রাজস্ব ও আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন, কেন্দ্রের নীতির কারণে তাতেও ঘাটতি। তবুও জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে একবিন্দু বামফ্রন্ট সরকার সরেনি। গোটা দেশের প্রতিক্রিয়ার শক্তি বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি শত্রুরও ইন্ধন পেয়েছে বহু ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করেই। বামফ্রন্টকে এতবছর কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু গোটা দেশের প্রতিক্রিয়া, আধুনিক মিডিয়া, সমস্ত রঙের সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের শক্তি, চরম উগ্র-সন্ত্রাসবাদী বামপন্থী নামধারী শক্তি, বিপুল অর্থ সবাই তৃণমূলকে সামনে রেখে জোট বাঁধে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে, ৩৪ বছরের সাফল্যের অবসানে।

ফ্যাসিস্তসুলভ সন্ত্রাসের রাজ
কায়েম হয় একচ্ছত্র ফ্যাসিস্তসুলভ সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রায় ৯ বছর, দিল্লিতে একই ফ্যাসিস্তসুলভ বর্বর সাম্প্রদায়িক রাজত্ব। দেশজুড়ে চলছে অভূতপূর্ব বিভীষিকা। বিপন্ন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জীবনজীবিকাপ্রতি পদক্ষেপে প্রতি মুহূর্তে তার ভয়ার্ত অভিজ্ঞতা বামফ্রন্ট, বৃহত্তর বামশক্তি প্রচণ্ড সন্ত্রাসের মধ্যেও, রিগিং-ভোটলুট সত্ত্বেও লড়াই থেকে একচুলও সরেনি। নতুন নতুন সাহসী লড়াই ও আত্মত্যাগের নজির সৃষ্টি হয়েছে। দুনিয়াজোড়া আর্থিক মন্দা ও সঙ্কটে পুঁজিবাদ কম্পমান, চরম দক্ষিণপন্থী সামাল দিতে বাড়বাড়ন্ত, মোদী সরকারেরও রেহাই নেই, যতই মিডিয়ায় খই ফোটাক। ঐতিহাসিক বামফ্রন্ট এবং চরম স্বৈরাচারী দেউলিয়া তৃণমূল শাসনের আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য আজ দ্রুত মানুষের কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি আবার ঐতিহাসিক নিয়মেই একত্রিত হচ্ছে, কংগ্রেসও মারাত্মকভাবে আজ আক্রান্ত। কংগ্রেসও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য এগিয়ে আসছে। তৃণমূল-বিজেপি অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধসেই লুকানো রহস্য আজ খসে পড়ছে। বর্বরতার পূজারী এ দুয়ের বিরুদ্ধে গোটা রাজ্যের সবাইএই শিক্ষার উৎস যুক্তফ্রন্ট থেকে বামফ্রন্টবামফ্রন্টের সময় থেকে নতুন পরিস্থিতিতেও সার্বিক ঐক্যের বার্তা।

গণশক্তি, ২১জুন, ২০২০

20200620

বামফ্রন্ট সরকারের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার



প্রকাশ কারাত

কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন যখন বামফ্রন্ট সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল, তখন কেউই ভাবতে পারেননি যে, ঐ সরকার ইতিহাস রচনা করবে। সে সময় যদি তখন কেউ ভবিষ্যৎবাণী করতেন যে বামফ্রন্ট আগামী তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করবে তা হলে কেউ তা বিশ্বাস করতো না। বামফ্রন্ট সরকার সেটাই করে দেখিয়েছে। তারা পশ্চিমবঙ্গে একাদিক্রমে ৩৪ বছর সরকার পরিচালনা করেছে। প্রশংসনীয় ও অনন্য রেকর্ড, সন্দেহ নেই। বামপন্থীদের দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে, অনেক অত্যাচার সহ্য করার মধ্য দিয়ে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে। ১৯৭২ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পুলিস ও প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে রিগিং করে জয়লাভ করে। সেবার নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছিল। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস কায়েম করেছিল। ঐ সময়কালে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলির ১৪০০ জন সদস্য ও সমর্থককে খুন করা হয়। গোটা দেশে জরুরী অবস্থা জারি করেছিল ইন্দিরা গান্ধী সরকার। সে সময় গণতান্ত্রিক অধিকারগুলিকে অবদমিত করে রাখা হয়েছিল।

জমির জন্য কৃষকদের জঙ্গী আন্দোলন এবং মেহনতী মানুষের ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের জোয়ারের ফলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলি তৎকালীন সরকারের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলি সরকারের প্রচণ্ড দমনপীড়নের শিকার হয়েছিল। সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্ট ১৯৭৭ সালে নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয়। এর কারণ হলো জনগণ ঘৃণিত কংগ্রেস সরকার‍‌কে দূরে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং সর্বান্তকরণে ভোট দিয়েছিলেন বামফ্রন্টের কর্মসূচী ও নীতিগুলির সমর্থনে।

এই বিপুল জনসমর্থনের ফলেই বামফ্রন্ট একাদিক্রমে ৩৪ বছর পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার সাতবার বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী হয়েছে। প্রতি বারেই তারা বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়েছে। জনগণের সমর্থনের এটি এক উল্লেখযোগ্য নজির। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে রূপায়িত ভূমিসংস্কারের ফলে লক্ষ লক্ষ কৃষক ও বর্গাদার উপকৃত হয়েছেননির্বাচনের মধ্যে দিয়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা, যা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। গ্রামের গরিব মানুষ এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় ভূমিকা গ্রহণ করতে পেরেছেন। শ্রমিক শ্রেণী ও মেহনতী জনগণের অধিকার সুনিশ্চিত করা গিয়েছিল।

এসবের ফলে মেহনতী মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত হয় নতুন মর্যাদাবোধ ও আত্মবিশ্বাস। ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার এবং স্বাধীন ভারতে পুঁজিবাদী উন্নয়নের অসম প্রকৃতির জন্য পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ভারত অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার শিকার হয়। এই অর্থনৈতিক পশ্চাদপসরতার বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট সরকার গোড়া থেকেই লড়াই শুরু করে। ধর্মনিরপেক্ষতার নির্যাস ও মর্মবস্তু কি হতে পারে তা বামফ্রন্ট সরকার হাতে কলমে করে দেখিয়ে দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দুর্গ হয়ে দাঁড়ায়। বৃহৎ বুর্জোয়া এবং সামন্তপ্রভুদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার আওতায় একটি রাজ্য সরকার চালাতে হয় গুরুতর ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। রাজ্য সরকারের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকা সত্ত্বেও বামফ্রন্ট সরকার কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ধরনের সাফল্যের নজির গড়েছে।

তাছাড়া বামফ্রন্ট সরকারকে সবসময় অভ্যন্তরীণ ও বাইরের প্রতিক্রিয়াশীল রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়েছে। ১৯৯৬ সা‍‌লে পুরুলিয়ায় অস্ত্রবর্ষণ থেকে বোঝা যায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলি বামফ্রন্ট সরকারকে উৎখাত করার জন্য কতদূর পর্যন্ত চক্রান্ত এঁটেছিল। কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া বামফ্রন্ট সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারগুলির বৈরিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার যে টিকে থেকে কাজ চালিয়ে যেতে পেরেছিল তার জন্য মূল ভূমিকা ছিল পশ্চিমবঙ্গে জনগণের অবিচলিত সমর্থন এবং দেশের বাকি অংশে গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশ ও বৃদ্ধি। যে গণতান্ত্রিক চেতনা পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারকে অগণতান্ত্রিক পথে উৎখাত করার কোনো চক্রান্ত বরদাস্ত করতো না।

২০১১ সালের মে মাসের নির্বাচনে পরাজয়ের পর গত ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্যগুলিকে নস্যাৎ করার জন্য একটি সমন্বিত অপচেষ্টা শুরু হয়েছে। বামফ্রন্ট সরকারের কৃতিত্ব নির্বাচনী পরাজয়কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হচ্ছে এইভাবে যেন জনগণ বামফ্রন্ট সরকারের সমস্ত কৃতিত্বকে খারিজ করে দিয়েছেন। এসব হলো বামপন্থীদের যারা বিরোধী তাদের উদ্দেশ্যমূলক আক্রমণ। তাছাড়া মতাদর্শগত আক্রমণও চালানো হচ্ছে। বামফ্রন্টের শাসনকে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হলো বামফ্রন্ট আমলে জনগণ যেসব অধিকার ও সুফল অর্জন করেছেন সেগুলিকে উলটে দেওয়া। অর্জিত অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পুরানো আধিপত্যশীল শ্রেণীগুলি আবার নতুন করে জোর খাটানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কেন্দ্রে কংগ্রেস-তৃণমূল জোট নয়া উদারনৈতিক নীতিগুলি অনুসরণ করছে। পশ্চিমবঙ্গে জনপ্রিয়তার আড়ালে এমনসব ব্যবস্থা নেওয়া হবে যা মানুষের জীবন-জীবিকার উপরে আঘাত হানবে এবং তাদের অধিকারগুলিকে দুর্বল করে তুলবে।

সিপিআই(এম) এবং বামফ্রন্টের নেতা ও কর্মীদের উপর যে মারাত্মক ধরনের আক্রমণ চালানো হচ্ছে তা থেকে বোঝা যায় আগামীদিনে কী ঘটতে চলেছে। তৃণমূল কংগ্রেস - কংগ্রেস যে শ্রেণী শক্তিগুলির প্রতিনিধিত্ব করে থাকে তারা সুপরিকল্পিতভাবে বামপন্থী নেতা ও কর্মীদের খুন করছে, তাদের আক্রমণে অনেকে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছেন, নিয়মিত হুমকি দেওয়া হচ্ছেওরা সিপিআই(এম) তথা বামফ্রন্টের সাংগঠনিক কাঠামোকে ধ্বংস করতে দিতে চাইছেকারণ তারা জানে এই সাংগঠনিক কাঠামোর উপরে ভরসা করে পশ্চিমবঙ্গের মেহনতী মানুষ সংগ্রামে অবতীর্ণ হন এবং তাদের অধিকারকে সগর্বে তুলে ধরেন।

মেহনতী মানুষ অর্থাৎ কৃষক, বর্গাদার খেতমজুর, শ্রমিকশ্রেণী এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যে সুফল অর্জন করেছেন তা রক্ষা করতে হবে। শাসক শ্রেণীগুলির পক্ষে ভূমিসংস্কার এবং অন্যান্য সুফলগুলিকে আবার আগের পশ্চাদপদ জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সহজ হবে না। কেরালার পুরানো অভিজ্ঞতা আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। নিজেদের অধিকার ও জীবন-জীবিকা রক্ষা করা, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি রক্ষা করা এবং জনবিরোধী নয়া উদারনৈতিক নীতিগুলির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী জনগণের অন্যান্য অংশগুলির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের ইতিহাসে গড়ে উঠবে এক নতুন অধ্যায়।

শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত করা, শ্রেণীসংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং গণতন্ত্রকে রক্ষা করার মধ্য দিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সবসময়ই ভরসা দেওয়ার শক্তিশালী কাঠামো হিসাবে কাজ করবে। যারা বামফ্রন্টকে মুছে দিয়ে শোকগাথা লিখে ফেলেছেন ইতিহাস তাঁদের একদিন ভ্রান্তদর্শী বলে প্রমাণ করবে।

গণশক্তি, ২১শে জুন, ২০১১