Showing posts with label পুলিশী সন্ত্রাস. Show all posts
Showing posts with label পুলিশী সন্ত্রাস. Show all posts

20170526

গণতন্ত্র বিপন্ন, তাই চলো নবান্ন


#BanglaBiponna #ChaloNabanna

শেষ কবে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেখেছে পশ্চিমবাংলা? এরাজ্যের মানুষের অভিজ্ঞতা হলো, ২০১১সালে বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে গণতন্ত্রকে প্রহসনে পরিণত করেছে শাসকদল দেশের সংবিধানে দেওয়া অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে বারবার বাধা পাচ্ছেন মানুষ। গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা সমস্ত দিক থেকেই আক্রান্ত। শুধু নির্বাচনে নিজের পছন্দমতো প্রার্থীকে নিজে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকেই নয়, কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার অধিকার, শ্রমিক-কর্মচারীদের অর্জিত অধিকার, নারীর মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার, এমনকি মানবাধিকারও এই সরকারের আক্রমণের মুখে। বিরোধীদের কথা বলার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলগুলির, বিশেষত বামপন্থীদের পার্টি অফিস, ট্রেড ইউনিয়ন, গণসংগঠনের দপ্তর জ্বালিয়ে দেওয়া, লুট করা, দখল করা হচ্ছে। বামপন্থী কর্মীদের খুন, আক্রমণ, তাঁদের বাড়িতে আগুন লাগানো, লুটপাট করা, বাড়ির মহিলাদের ওপর নৃশংস অত্যাচার, চাষ করতে-ফসল কাটতে বাধা, জরিমানা চাপানো, মিথ্যা মামলায় জেল, এলাকাছাড়া করা হচ্ছে। নির্বাচিত সমস্ত ধরণের সংস্থা, সাংবিধানিক সংস্থাও তৃণমূল সরকারের রোষের হাত থেকে রেহাই পায়নি। গণতন্ত্র এভাবেই আক্রান্ত, বিপন্ন তৃণমলী শাসনে।

গত ছয় বছরে বিধানসভা, লোকসভা, পঞ্চায়েত, পৌরসভাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই নির্বাচনে ‌ঠ্যাঙারেবাহিনী দিয়ে বেপরোয়া সন্ত্রাস করে, পুলিশ ও প্রশাসনের একাংশের সরাসরি মদতে, মিডিয়াকে সাক্ষী করে নির্বাচনে মানুষের রায়কে পদদলিত করেছে এরাজ্যের শাসক দল কেন্দ্রের শাসক বি জে পি মুখে লোকদেখানো ছায়াযুদ্ধ করলেও শেষ পর্যায়ে গিয়ে কার্যত তৃণমূলের সমস্ত অনৈতিক কাজে সহায়তা করেছে। গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় বি জে পি-আর এস এস যে বেশ কয়েকটি আসনে তৃণমূলকে জয়ী করতে সাহায্য করেছে, তা তারা পরে স্বীকারও করেছেশুধু বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন নয়, পঞ্চায়েত, ক্লাব, গ্রন্থাগার, স্কুল কিংবা সমবায়ের পরিচালন কমিটি নির্বাচনকেও প্রহসন করে কার্যত দখল করেছে তৃণমূল

মোদী সরকারের মদতেই সারদাসহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির তদন্ত শিকেয় তুলে রেখেছে সি বি আই, ই ডি-সহ তদন্তকারী সংস্থাগুলি। ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক পরীক্ষায় নির্জলা সত্য প্রমাণিত হলেও, এমনকি চার্জশিট জারি হয়ে যাওয়ার পরেও নারদকান্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছে মোদী সরকারগাঁটছড়া কোথায় বাধা বুঝতে কারো অসুবিধা হয় না। নির্বাচনের সময় যে সমস্ত ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়বাহিনীর তৎপরতায় তৃণমূল কংগ্রেসের পরাজয় অনিবার্য হওয়ার সম্ভাবনা ছিল সে সমস্ত জায়গায় তাদের ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছিলএকেবারে হিসেব কষে নির্দিষ্টসংখ্যক বুথে ভোট লুট এবং অবাধ কারচুপি করে তৃণমূল ভোটে জিতেছে

২০১৪ সালের লোকসভা এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যে সমস্ত আসনে জয়ের ব্যাপারে তৃণমূলের আশঙ্কা ছিল সেই সমস্ত জায়গায় সচিত্র ভোটার স্লিপ প্রশাসনের সাহায্যে নিজেদের কাছে রেখে ব্যাপক হারে ভোট লুট করে  ফলাফলকে নিজেদের অনুকূলে নিয়েছে২০১৬সালে নির্বাচনে ৭৫টি বিধানসভা কেন্দ্রে ১০-১৯শতাংশ এবং ৬৫টি কেন্দ্রে ২০শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সচিত্র ভোটার স্লিপ ব্যবহার করে ভোট দেওয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও তৃণমূল কংগ্রেস একই কৌশলে নির্দিস্ট ১৬টি আসনে বাছাই করা বুথে ব্যাপক কারচুপি ঘটিয়ে তাদের জয় হাসিল করে নিয়েছিল। এছাড়া ব্যাপক কারচুপি, ছাপ্পা ভোট, রিগিং তো ছিলই। ২০১২ সালের ৩রা জুন রাজ্যের ৬টি পৌরসভায় ভোট হয়। বাস্তবে ভোট নয়, অনেক জায়গায় ভোটের নামে হয় প্রহসন। ২০১৩ সালের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন, ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে এবং ২০১৫-র কলকাতা কর্পোরেশন সহ রাজ্যের ৯১টি পৌরসভার নির্বাচনে, এই সময়ে বিধানসভা, লোকসভা আসনের সবকটি উপনির্বাচনে সরকারি মদতে শাসক তৃণমূলের বেনজির হিংসার সাক্ষী থেকেছে এরাজ্য।

২০১৩-র পঞ্চায়েতে নির্বাচনে পাঁচ দফায় ভোটের দিন দখল করা হয় ৬১৮২টি বুথ, বেপরোয়াভাবে ছাপ্পা ভোট দেওয়া হয় আরও ১০ হাজার বুথে। ভোট গণনার দিনও ব্যাপক কারচুপি করা হয়। এরপরেও যেখানে বামপন্থীরা পঞ্চা‌য়েত গঠন করতে পেরেছিল, সেখানেও শুরু হয় হামলা, এমনকি খুনও। ২০১৫ সালের গত ১৮ই এপ্রিল কলকাতা পৌরসভার নির্বাচনে প্রকাশ্যে ভোট লুট করে তৃণমূল বাহিনী। এই অপকর্মে নির্লজ্জের মতো তৃণমূলের সঙ্গে হাত মেলায় পুলিশবাহিনীর একটা অংশ। ওই বছরের ২৫শে এপ্রিল রাজ্যের ৯১টি পৌরসভার ভোটগ্রহণ হয়। এই ভোটপর্বকে প্রহসনে পরিণত করে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। বিভিন্ন জায়গায় সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের জড়ো করে শাসক তৃণমূল ভোট লুটের অভিযান চালায় সকাল থেকেই। ২০১৫ সালের ৩রা অক্টোবর ছিল পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি কালো দিন। কিভাবে ভোট লুট করে গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করা যায়, বিধাননগর-রাজারহাট পৌরসভা, হাওড়া কর্পোরেশনের সংযুক্ত বালির ১৬টি ওয়ার্ডে এবং আসানসোল কর্পোরেশন এলাকায় ভোটে তার একটি নির্লজ্জ উদাহরণ তৈরি করে শাসক তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি, রাজ্য নির্বাচন কমিশনারকে ফলপ্রকাশের আগেই জোর করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিলসর্বশেষ উদাহরণ, রবিবার অনুষ্ঠিত পৌরনির্বাচনে শাসকদলের বেপরোয়া ভোট লুটের ঘটনা।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গণতন্ত্র ও নৈতিকতাকেও কার্যত বলি দিয়েছে তৃণমূল। বিশেষ করে, অন্য দলের জয়ী প্রার্থীদের ভয় ও প্রলোভন দেখিয়েও পঞ্চা‍‌য়েত, পৌরসভা দখল করে ‘দল ভাঙানো’র অভিযান চালাচ্ছে তৃণমূল। একই পন্থায় দল ভাঙিয়েছে কয়েকজন বিরোধী বিধায়ককেও।  

অন্যদিকে, কেন্দ্রের বি জে পি সরকার যেভাবে মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি করছে, তার পালটা সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি তৃণমূলও করছে। একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে এই দুই দল, যা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের কাছে বিপজ্জনক।

তৃণমূলের হাতে লুন্ঠিত, বিপন্ন গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে এরাজ্যের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন গণতান্ত্রিক মানুষকেই। তাই ২২শে মে ‘নবান্ন চলো’র ডাক। 

২২শে মে ‘‘বাংলা বিপন্ন, চলো নবান্ন”


#BanglaBiponna #ChaloNabanna

তুষের আগুনে ধিকি ধিকি জ্বলা গ্রামবাংলা থেকে অনাহারের মৃত্যুমিছিল দেখা চা বাগিচা। বন্ধ কারখানার শ্রমিক মহল্লা থেকে শাল পিয়াল মহুলের বনাঞ্চল। তিস্তাপার থেকে সুন্দরবনের বাদাবন। কোচবিহারের বক্সিরহাট থেকে কাকদ্বীপের ৮নং লট। ২২শে মে সবার ঠিকানা কলকাতার রাজপথ।

একের পর এক ব্যারিকেড ভেঙে লক্ষ মানুষ এগোবেন নবান্নের দিকে। মানুষের জেদের কাছে হার মানবে তৃণমূলী পুলিশের লাঠি, জলকামান, কাঁদানে গ্যাস। ২২শে মে অচল হবে কলকাতা। অবরুদ্ধ হবে ডাফরিন রোড থেকে রেড রোড। রানী রাসমণি অ্যাভিনিউ, জওহরলাল নেহরু রোড থেকে পি টি এস। গঙ্গার ওপারে জি টি রোড, ফোরশোর রোড। সাঁতরাগাছি, কোনা এক্সপ্রেসওয়ে।
রাজ্যজুড়ে ব্যাপক আন্দোলনের তরঙ্গশীর্ষে আগামী ২২শে মে নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছে ১১টি বামপন্থী কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগঠন। বামপন্থী ছাত্র, যুব, মহিলা, শ্রমিক সব গণসংগঠনগুলিই এই কর্মসূচিতে শামিল হবে বলে ঘোষণা করেছে। বামফ্রন্টসহ অন্যান্য বামপন্থী ও সহযোগী দলগুলির পক্ষ থেকেও কর্মসূচিকে সমর্থন করা হয়েছে।

আমার, আপনার, সকলের জীবন-সংগ্রামের জ্বলন্ত দাবি নিয়েই সোমবার নবান্ন চলো। আসুন, আপনিও চলুন, সকলে মিলেই নামি এই জীবনের মিছিলে।

আমাদের দাবি:

১। ধান কেনায় বোনাস তুলে দেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করো। কুইন্টাল প্রতি ২০০ টাকা বোনাস চাই। ন্যূনতম ৫০ টাকা পরিবহণ খরচ দিয়ে সহায়ক মূল্যে ধান কিনতে হবে। চেক ভাঙানোর হয়রানি বন্ধ করতে নগদে ধান কিনতে হবে। প্রতি গ্রাম পঞ্চায়েতে একাধিক ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে। অভাবী বিক্রির সময় ধান কেনা হলো না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও।

২। স্বামীনাথন কমিটির সুপারিশ মেনে ধান, পাট ও গমের সহায়ক মূল্য স্থির করতে হবে। গম আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক তুলে দিয়ে কৃষক মারার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ কর। হিমঘরে রাজ্য কোটায় সরকারকে আলু রাখতে হবে। রাজ্য সরকারকে কুইন্টাল প্রতি ৭০০ টাকা দরে আলু কিনে চাষিদের সহায়তা করতে হবে।

৩। রবি ও বোরো চাষে বর্গাদারসহ সব কৃষককে ৮ সুদে ব্যাঙ্ক বা সমবায় ঋণ দিতে হবে। মৌজা ভিত্তিক শস্যবিমা চালু করা বর্গাদারসহ সব চাষিকে কৃষি বিমার আওতায় আনতে হবে। পেট্রোল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি বন্ধ কর। কেরোসিনের বরাদ্দ কমানো হলো কেন কেন্দ্রীয় সরকার জবাব দাও। ছোট-মাঝারি কৃষক ও বর্গাদারদের চাষ জমির বিদ্যুতের লাইন কাটা নয়, ভরতুকি দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং বর্গাদারদের চাষ ও ফসল তোলায় রেগা প্রকল্প চালু করতে হবে।

৪। তিস্তা প্রকল্পের কাজ অবিলম্বে শেষ করতে হবে। পানীয় জলের স্বার্থে ভূগর্ভস্থ জলোত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করো। নদী, খাল, বিল সংস্কার করো। সুন্দরবনের বাঁধ নির্মাণ হচ্ছে না কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। নদী ভাঙনরোধে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।

৫। সমস্ত গ্রাম পঞ্চায়েতে রেগার কাজ চালু করতে হবে। রেগায় বছরে ১০০দিনের কাজ ও দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরি চাই। অবিলম্বে রেগার বকেয়া মজুরি, ভাতা ও অন্যান্য বকেয়া দিতে হবে। ১০০দিনের কাজসহ ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে দুর্নীতির তদন্ত চাই। ৬০ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে সব কৃষককে মাসে ৩,০০০ টাকা পেনশন দিতে হবে।

৬। কোনো গরিব মানুষকে খাদ্য সুরক্ষা তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। খাদ্য সুরক্ষা থেকে গরিব মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। খাদ্য সুরক্ষার বরাদ্দ কমানো বা অনিয়মিত হচ্ছে কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও। সকলকে ডিজিটাল রেশনকার্ড দিতে হবে। সব মানুষকে গণবণ্টন ব্যবস্থার আওতায় রাখতে হবে।

৭। সব বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ করো। মেধা তালিকা প্রকাশ না করে এস এম এস মাধ্যমে নিয়োগ চলবে না। সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে সমকাজে সমমজুরি চালু করতে হবে।

৮। বাস্তুহীনদের বাস্তুজমি দিতে হবে। সমস্ত গৃহহীনদের প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় আনতে হবে।

৯। বনাঞ্চলের অধিকার আইন কার্যকর করতে হবে। আদিবাসীদের জন্য ল্যাম্প সোসাইটিগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।

১০। সব আত্মহত্যাকারী কৃষক পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা হারে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

১১। দুর্নীতিরোধে সব মানুষ এক হও। সমস্ত চিট ফান্ড, শিলিগুড়ি উন্নয়ন পর্ষদ, নারদ, ব্রিজ কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে এক হও। সাহারা ও বিড়লা ঘুষকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। ব্যাপমসহ কেন্দ্র ও রাজ্যে দুর্নীতির তদন্তকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। রাজনী‍‌তিতে দুর্বৃত্তায়ন বন্ধ করো।

১২। রাজ্যে ধর্ষণ, নারী ও শিশু পাচার বাড়ছে কেন মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও। ধর্ষণ ও পাচারকাণ্ডে যুক্তদের কঠোর শাস্তি চাই। রাজ্যে নিয়ম না মেনে ব্যাঙের ছাতার মতো নার্সিংহোম হলো কেমন করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী/মুখ্যমন্ত্রী জবাব দাও।

১৩। বিকল্প ব্যবস্থা না করে নোট বাতিল হলো কেন প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। বিদেশি ব্যাঙ্কে জমা টাকা ফেরত এলো না কেন প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও। নোট বাতিলের আগে রাজ্য বি জে পি জানলো কেমন করে প্রধানমন্ত্রী জবাব দাও।

১৪। ২০১৩ সালের আইন মেনে সরকারকে জমি করতে অধিগ্রহণ হবে। জমি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে কৃষক সমাজ জোট বাঁ‍ধো। ভাঙড় আন্দোলনে ধৃতদের বিনাশর্তে মুক্তি চাই। কর্পোরেট হাউসদের হাতে খাস জমি না দিয়ে গরিবদের জমির পাট্টা দিতে হবে। কর্পোরেট হাউসদের ঋণ ও সুদ ছাড় নয় মাঝারি কৃষক পর্যন্ত সব কৃষকের ঋণ মকুব করতে হবে পি এফ-এর সুদ কমানো চলবে না। কর্পোরেটদের সাথে চুক্তি চাষ বন্ধ করো।

১৫। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় ও উভয় মৌলবাদের বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ হও। সাম্প্রদায়িক ও উভয় মৌলবাদ-নিপাত যাক। উদারনীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শামিল হও। সংখ্যালঘু ও দলিতদের বিরুদ্ধে সঙ্ঘ পরিবারের হামলা বন্ধ করো।

১৬। রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের গণতন্ত্র ধ্বংসকারী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। সংবিধান প্রদত্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা চলবে না। রাজ্যে মানুষের গণতন্ত্র হরণ করা হচ্ছে কেন রাজ্য সরকার জবাব দাও।

১৭। পলাশী চিনিকলের অব্যবহৃত জমি ভূমিহীন ও গরিব কৃষকদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।

১৮। জমির মিউটেশন ফি বাড়ানো চলবে না। জমি হাঙরদের রক্ষা করতে দ্রুত জমির চরিত্র বদলের চক্রান্ত বন্ধ কর।

**************





20170328

রক্তাক্ত ভাঙড়ে বেআব্রু মমতার জমি মডেল

 সুদীপ্ত বসু
১৭ই জানুয়ারি


একজনের বয়স ২২, কলেজ ছাত্র। অপরজন গ্রামেরই বাসিন্দা, বয়স ২৪।
রক্তাক্ত ভাঙড় মঙ্গলবার দেখলো গ্রামবাসী, কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ভাঙতে পুলিশের গুলিতে দুই যুবকের রক্তাক্ত বুলেটবিদ্ধ দেহ। নবান্ন নির্বিকার, দায় এড়ানোর চেনা কৌশলে বহিরাগতর তত্ত্ব প্রশাসনের। যদিও মৃত দুই যুবক স্থানীয় গ্রামেরই বাসিন্দা।
একদিকে সাধারণ গরিব গ্রামবাসী, অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জির পুলিশ ও তৃণমূলের একাংশের সশস্ত্র দুষ্কৃতীবাহিনী। জ্বলছে পুলিশের গাড়ি, রাস্তা অবরোধ, গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরুদ্ধ গোটা এলাকা। পালটা গ্রামবাসীদের দিকে উড়ে আসছে ইট, টিয়ার গ্যাসের শেল। চলেছে গুলিও।


রণক্ষেত্র ভাঙড়।
প্রকল্পের নামে জমি মাফিয়া দিয়ে শাসক তৃণমূলের জোর করে জমি দখলের প্রতিবাদে, পুলিশি অত্যাচারে বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একজোট গ্রামবাসীকে শেষ পর্যন্ত বন্দুক দিয়েই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালো তৃণমূল সরকার। পরিণামে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই স্থানীয় বাসিন্দার।
পুলিশের গুলিতেই মঙ্গলবার শেষ বিকালে মৃত্যু হলো ২২বছরের এক তরতাজা যুবকের। পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বরূপনগর গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর মোল্লা। পুলিশের গুলিতে রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েছেন। রক্তে ভেসেছে শরীর। চিকিৎসার সময়ও মেলেনি। ২২ বছরের আলমগীর কলেজ ছাত্র। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও অনেকে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে নিয়ে আসা হয় এস এস কে এম হাসপাতালে। রাতেই সেখানে মৃত্যু হয় ২৪ বছর বয়সি যুবক মফিজুল শেখের। পোলেরহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের গাজীপুরের শেখপাড়ার বাসিন্দা এই বছর চব্বিশের যুবক।
জোর করে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে জমি মাফিয়া মারফত তৃণমূলের জমি দখল, রাতের অন্ধকারে পুলিশের অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নজির গড়েছে ভাঙড়। প্রশাসন পিছু হটেছে, পিছু হটা প্রশাসনকে অক্সিজেনজোগাতে পুলিশের দিক থেকেই গ্রামবাসীদের তাক করে বোমা ছুঁড়েছে আরাবুল বাহিনী। তাতেও ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসীকে পিছু হটাতে পারেনি প্রশাসন। সকাল থেকে চলা অবরোধ, বিক্ষোভের জেরে স্তব্ধ হয়েছে ভাঙড়, রাজারহাট লাগোয়া পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ প্রান্ত। বিকালের দিকে সেই স্তব্ধ হয়ে যাওয়া জনপদেই ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসী, জমিদাতা কৃষককে ছত্রভঙ্গ করতে চললো পুলিশের গুলি। মৃত্যু হলো দুজনের। আহত হলেন একাধিকজন।
রাত পর্যন্ত গুলি চালানোর ঘটনা অস্বীকারের মরিয়া চেষ্টা চালায় জেলা পুলিশ। রাতেই মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, বহিরাগতরা জড়ো হয়ে অশান্তি পাকাচ্ছে। এমনকি তাঁদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী। রাতেই পোলেরহাট-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের খামারাটি, টোনা, মাছিডাঙা বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের টহল। পুলিশ, র‌্যাফও ক্রমেই ঘিরছে ভাঙড়কে। উত্তেজনা রয়েছে রাতভর। উত্তেজনার চেহারা এমনই তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লাও ঢুকতে পারেননি নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে। গ্রামবাসীরাই গড়েছেন ব্যারিকেড।
বরাবরের জমি আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি ভাঙড় মঙ্গলবার সকাল থেকে কেন ফেটে পড়লো প্রবল ক্ষোভ, উত্তেজনায়? কেন মুহূর্তেই তা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো? ভাঙর-২ ও ভাঙর-১ নম্বর ব্লক জুড়েই শাসক তৃণমূলের একচেটিয়া একাধিপত্য। তৃণমূলের একাধিপত্য মানে জমি মাফিয়া, দুষ্কৃতীরাজের রমরমা তা গত সাড়ে পাঁচ বছরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন গ্রামবাসীরা। সেই ভাঙড়ে ২০১৩ সালে পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের টোনা মৌজার নতুনহাটে ৪০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠার কথা পাওয়ার গ্রিড প্রকল্প। প্রথম থেকেই পোলেরহাটের মত তিন ফসলি, চার ফসলি জমি দিতে আপত্তি ছিল কৃষকদের। তখন ভাঙড়ে আরাবুলের একচ্ছত্র দাপট।
গ্রামবাসী, জমিদাতা কৃষকদের অন্ধকারে রেখেই পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। জমি নেওয়া হবে বলেই নোটিস দেওয়া হয়। কৃষকরাও জানেন না তাঁদের জমি দিতে হবে প্রকল্পে। সেই নোটিস দেখিয়ে তৃণমূলের নেতা আরাবুল ইসলামের বাহিনী বাইকে চেপে রাতের পর রাত হুমকি দিয়ে জোর করে ভয় দেখিয়ে কৃষকদের জমি দিতে বাধ্য করে। দীর্ঘদিন ধরেই জমছিল সেই ক্ষোভ। গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই তৈরি হয় জমি জীবিকা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটি। সেই ক্ষোভের তুষে আগুন ধরায় জমি মাফিয়াদের হয়েই পুলিশের অত্যাচার, মিথ্যা মামলা। গত নভেম্বর মাসেই আন্দোলনকারী তিন মহিলা সহ ছয়জনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়ে।
শান্তিপূর্ণভাবেই গত ১১ই জানুয়ারি কাশীপুর থানার খামারাটিতে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে অবরোধে শামিল হন কয়েক হাজার গ্রামবাসী, মহিলারা। অসমাপ্ত বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি ফেরত চেয়ে, বহুফসলি জমিতে পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্প বন্ধের দাবিতে। সেদিন কোন গন্ডগোল, উত্তেজনা ছড়ায়নি। লাওহাটি-শ্যামনগর দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার রাস্তা অবরোধ করেই চলে সেই বিক্ষোভ।  প্রশাসনের আশ্বাসে ওঠে বিক্ষোভ। যদিও তারপরেও তৃণমূলের দুষ্কৃতী বাহিনী, জমি মাফিয়াদের হুমকি চলতেই থাকে। এরই মধ্যে সোমবার রাতে আরও একটি মিথ্যা মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করে সামসুর হক ওরফে কালুকে। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভাঙড়-২ নম্বর ব্লক জুড়েই।
আর এরপরেই ঘটে সোমবার গভীর রাতেই ভয়াবহ পুলিশি অত্যাচারের ঘটনা। রাত প্রায় দুটো নাগাদ বিরাট পুলিশ বাহিনী পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের খামারাটি, টোনা, নতুনহাট, মাছিডাঙার মতো একের পর এক গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে চলে পুলিশি অত্যাচার। সোমবার রাতেই এই ঘটনার জেরেই মঙ্গলবার ভোর থেকে হাজার হাজার গ্রামবাসী, কৃষক, বৃদ্ধ, এমনকি শিশুরাও নামে রাস্তায়। ভোর ছটা থেকেই শুরু হয় পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ প্রান্ত জুড়ে অবরোধ। শ্যামনগর থেকে বকডুবি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার রাস্তার মোড়ে মোড়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে শুরু হয় রাস্তা অবরোধ। সময় যত গড়িয়েছে বেড়েছে অবরোধকারীর সংখ্যা। দশ হাজারের বেশি মানুষ তখন রাস্তায়। চলছে অবরোধ।
সেই অবরোধ ভাঙতে আশেপাশের চারটি থানা এলাকার বিরাট পুলিশ বাহিনী ঢোকে এলাকায়।পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। দুপুরের দিকে পুলিশই চারদিক দিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গোটা এলাকা বন্‌ধের চেহারা নেয়। সব দোকানপাট বন্ধ, রাস্তা গাছের গুঁড়ি দিয়ে আটকানো। পুলিশ জনতার চক্রব্যূহেই আটকে পড়ে। আর সেই সময়েই ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে তৃণমূলের একাংশ। পুলিশকে রক্ষা করতে মাঠে নামে তৃণমূলী দুষ্কৃতীবাহিনী। পুলিশের সামনেই তৃণমূলী বাহিনী অবরোধকারীদের দিকে প্রথমে ঢিল পরে বোমা ছোঁড়ে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অবরোধকারীরাও পালটা ইট ছুঁড়তে শুরু করেন। পুলিশ তখন নির্বিচারে মহিলা, পুরুষদের ওপর লাঠিচার্জ করতে শুরু করে। কার্যত রণক্ষেত্র তখন গোটা এলাকা। পুলিশের বাহিনীর সংখ্যাও তখন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে গ্রামবাসীদের সংখ্যা। পুলিশের তরফে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়। একের পর এক শেল ফাটানো হয়। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা পুলিশের গাড়িও ভাঙচুর শুরু করে।
এরপরেই পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় জনতাকে লক্ষ্য করে। পুলিশের গুলিতেই জমিদাতা পরিবারের নিরীহ যুবক আলমগীর মোল্লার ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। ২২ বছরে আলমগীর কলেজ পড়ুয়া, এই ঘটনায় গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মাত্র দ্বিগুণ হয়। পুলিশের গুলিতে চারজন আহত হন। তার মধ্যে মফিজুল শেখ নামে ২৪ বছরের আরও এক গ্রামবাসী যুবকের রাতে এস এস কে এম হাসপাতালে মৃত্যু হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাতেই মুখ্যমন্ত্রী টুইট করেন যে মানুষ না চাইলে ওখানে বিদ্যুতের প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ হবে না, প্রয়োজনে প্রকল্প অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। যদিও পুলিশি অত্যাচার, গুলি চালানোর ঘটনায় মুখ খোলেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং মুখ খুলে সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়েছেন তৃণমূলী মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা। তাঁর কথায়, ওখানে প্রথমে সমস্যা ছিল না, পরের দিকে জমি নিতে গিয়ে এমন কিছু ঘটনা হয় যাতে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে।

খোদ মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভার সদস্য এই দাবি করলেও রাজ্য প্রশাসন উলটে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহী মনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যা আসলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। 

১৮ই জানুয়ারি 

শ্যামনগর থেকে কামারবাড়ি যাওয়ার ভাঙাচোরা পিচ রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা পরেও জমাট বাঁধা রক্তের দাগ স্পষ্ট। রাস্তার একেবারে মাঝবরাবরই চোখে পড়বে সেই শুকিয়ে যাওয়া তাজা রক্তের দাগ।
শুধুই কি রাস্তায়? ২২বছরের ছাত্র আলমগীর মোল্লা থেকে লরির খালাসি ২৮ বছরের মফিজুল শেখের নিথর দেহই প্রমাণ করছে পুলিশের গুলি চলেছে সামনে থেকে। একজনের লেগেছে গলায়, আরেকজনের তলপেটে। একেবারে সামনে থেকে, শরীরের পিছনের অংশে কোন আঘাত নেই। শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাস্তার ধারে পড়ে থাক আলমগীরের গুলিবিদ্ধ দেহ পা দিয়ে নাড়িয়ে দেখেছিল পুলিশ, গুলি খাওয়ার পরে বেঁচে নেই তো!
২২বছরে মেধাবী নিরস্ত্র ছাত্রকে কয়েক হাত দূর থেকে গলায় গুলি চালাতে হলো কেন মমতা ব্যানার্জির পুলিশবাহিনীকে? প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
আর উত্তর? তাও মিলেছে এদিন কামারবাড়ি থেকে টোনা, নতুনহাট, মাছিডাঙার মতো একের পর এক গ্রামে, বুধবার সকালে।
প্রায় বিধ্বস্ত, বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কাঠের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধে শামিল নিতান্তই সাধারণ গরিব গ্রামবাসী, কৃষকরা। সবজি চাষের আঁতুরঘর ভাঙড়ের পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের এই বিস্তীর্ণ এলাকা। ফুলকপি থেকে লঙ্কায় সেজে ওঠা মাঠ, সবুজ খেত ফেলে রেখে কৃষকরা রাস্তায়। মাঠের ফসল রক্ষাই যাঁদের ভুবন সেই মানুষগুলি সারা রাত গ্রাম পাহারা দিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফের রাস্তায় কেন? কীসের তাগিদ? নির্মম পুলিশি অত্যাচারের ক্ষত পুষে রেখেই এককাট্টা হয়ে থাকা কেন?
মমতা ব্যানার্জির শাসনে পুলিশের মিথ্যা মামলা, পুলিশ দিয়ে হামলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সাক্ষী এই বাংলা। কিন্তু ভাঙড়ে মানুষ সোমবার সন্ধ্যা থেকে যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছে তা যেন নজিরবিহীন।
বুধবার সকালে তখন কাশীপুর থানা কয়েক কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর মোড়ে গাছে গুঁড়ি ফেলে আটকে রাখা হয়েছে রাস্তা। পুলিশের প্রবেশ নিষেধ, জানান দিচ্ছেন গ্রামবাসীরাই। ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম। জিজ্ঞাসা করতে বলে উঠলেন, কেন তা জানতে হলে গ্রামের ভিতরে আসুন। যান নার্গিস পারভিনের কাছে।
নার্সিস পারভিনের বয়স সাড়ে তিন। ডান পায়ের দুটো আঙুল ভেঙে গেছে। রক্তের দাগ লাগা সেই পিচ রাস্তা পেরিয়েই কামারবাড়িতে নার্গিস পারভিনের বাড়িতে আসা, গোটা বাড়ি যেন ধ্বংসস্তূপ। সাড়ে তিন বছরের এই শিশুকন্যা মঙ্গলবার সকালে ঘরের সামনে উঠোনে খেলনা নিয়ে বসে খেলছিল। মমতা ব্যানার্জির পুলিশবাহিনী সাড়ে তিন বছরের নার্গিসকেও আন্দোলনকারীহিসাবেই যেন দেখেছে। সটান বাড়িতে ঢুকে প্রথমে তাঁর বাবা নুর হোসেন মোল্লাকে বেধড়ক মারধর করেছে। তারপর তার মা-কে। বাড়ির সব লোককেই মারা হয়।  দরজা, জানলা, টিভি, আলমারি ভেঙে দেওয়া হয়। তারপর চোখ পড়ে নার্গিসের ওপর। আছাড় মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এখনও হাঁটতে পারছে না ওই শিশু।
বুধবার সকাল মুখোমুখি নার্গিস পারভিন। অব্যক্ত যন্ত্রণা, চোখে জল। আধো  আধো ভাষায় শুধু বলে উঠতে পারলো, মেরেছে কাকুরা, আমার মা কোথায় ? মা-র কাছে যাবো খিদে পেয়েছে।
নার্গিস পারভিনের মা দিনিয়ারা বিবি মঙ্গলবার সকাল থেকে এখনও নিখোঁজ। কোনো হদিশ নেই। পুলিশ ও তৃণমূলীবাহিনী বাড়ি থেকেই টানতে টানতে তুলে নিয়ে গেছে। কোথায়? এখনও পর্যন্ত ভাঙড়বাসী জানেন না। শুধু দিনিয়ারা বিবি? এই পরিবারেরই চারজন এখনও নিখোঁজ। আবদুস সামাদ ও তাঁর দুই ভাইও নিখোঁজ। আবদুস সামাদ নার্গিসের জেঠু হন। সোমবার সকাল থেকে তাঁর খোঁজ নেই। কাঁদতেই কাঁদতেই চিৎকার করছিলেন তাঁর স্ত্রী মহিমা বিবি, ‘ মরদাটকে মারতে মারতে নিয়ে গেল, আমাদের ঘর সব ভেঙে দিয়েছে , খাওয়ারও কিছু নেই। জানেন আমার দুই মেয়ে কদিন ছিল এখানে। কাল সকালে যখন পুলিশ আর কিছু মুখে কাপড় বাঁধা লোকজন ঢুকলো সেই সময় আমার দুই মেয়ে নাতনিদের নিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে পড়েছিল। সেখান থেকেও বার করে ওঁদের মেরেছে। বাথরুম থেকে বের করেছে মেয়েদের।
জমি দখলে মমতা ব্যানার্জির পুলিশের চেহারা কী হতে পারে তার আরও শিউরে ওঠার অভিজ্ঞতা তখনও যেন বাকি ছিল। কামারবাড়ি থেকে সোজা সেই নতুনহাটের পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্পের দিকে যত এগনো ততই যেন সেই ববর্রতার ছবি। রাস্তার দুপাশে সিংহভাগ বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, কল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সোমবার মধ্যরাতে বিস্তীর্ণ এলাকাকে অন্ধকার করেই চলেছে সেই তাণ্ডব। খামারআইট গ্রামের এক মহিলার কথায়, ‘ঘরে তখন বাচ্চা নিয়ে শুয়েছিলাম। দরজায় লাথি মেরে ঢুকে ভাঙচুর চালালো পুলিশেরবাহিনী। আমার শরীরের একাধিক জায়গায় ইচ্ছা করেই ধাক্কা মারলো পুলিশ...’, শেষ করতে পারলেন না কেঁদে ফেললেন।
এক সংখ্যালঘু মহিলা তাঁর স্বামীর সামনে দাড়িয়েই যখন এই অভিযোগ করছেন, দুপুরে তখন কলকাতায় রাজ্য গোয়েন্দা পুলিশের সদর দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রীর জরুরিবৈঠক চলছে। সি আই ডি-র একটি সূত্রেই জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী দুটি নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। এক,গ্রামের বহিরাগতদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে হবে, পুরানো মামলা থাকলে তাতে গ্রেপ্তার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ নয়, বহিরাগতই গুলি চালিয়েছ সেই অবস্থানেই থাকতে হবে।
সরকার প্রশাসনের দাবি আর ভাঙড়ের বাস্তবতার আসলে যোজন ফারাক। কারা বহিরাগত? কীভাবে এত পরিকল্পিত হামলা চললো? তাও স্পষ্ট হয়েছে সেই পাওয়ার গ্রিড প্রজেক্টের মাত্র ১৫০ মিটার দূরেই। রাস্তার ওপরেই বাড়ি লোকমান মোল্লার। প্রবীণ মানুষ। সঙ্গে স্ত্রী থাকেন। ছেলে বাইরে রয়েছে। সোমবার রাতে প্রথমে সেই বাড়িতেই চড়াও হয় পুলিশ আর সঙ্গে থাকে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা। বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে সেই প্রবীণ দম্পতিকে বের করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে। তাঁরাও এখনও নিখোঁজ। তারপর সেই বাড়িতেই ঘাঁটি গেড়ে চলে যাবতীয় অপারেশন। বাড়ির পিছনে আমবাগান। বুধবার দুপুরে সেখানেই দেখা গেল পড়ে রয়েছে পুলিশের একাধিক ইউনিফর্ম, টুপি। পুলিশের জাল আইডেনটিটি কার্ড, এমনকি ব্যাঙ্কের পাশবইওমিলেছে জিতেন্দ্র যাদব নামে উত্তরপ্রদেশের এক পুলিশ কর্মীর পরিচিতিপত্রও। এদিন দুপুরে তখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে কয়েক জোড়া হাওয়াই চটি, মদের বোতল আর গরম পোশাক।
আর এখানেই গ্রামবসীরা প্রশ্ন তুলছেন পুলিশের সঙ্গে তাহলে কারা ছিল? অপারেশন চালাতে আসা পুলিশকে কেন ব্যাঙ্কের পাশবই সঙ্গে আনতে হয়? কেনই বা গ্রামের একটি বাড়ি দখল করে সারা রাত সেখান থেকে অপারেশন চালাতে হলো? পুলিশের সামনে দাড়িয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে বোমা ছুঁড়লো কারা? কেন পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পের ভিতরে গত দশ দিন ধরে ৫২জন দুষ্কৃতীকে দেখা গেল? আগে থেকেই কি তাহলে এই অপারেশনের পরিকল্পনা ছিল? মাছিডাঙার বাসিন্দা আন্দোলনকারী আনোয়ার মোল্লার কথায়, পুলিশ নিজে গাড়ি থেকে বসেই গুলি চালিয়েছে। পুলিশের গাড়িতে ঐ সব মুখোশ পরা আরাবুলের বাহিনীও ছিল। তাঁরা লোক চিনিয়ে দিচ্ছিল। পুলিশের বন্দুক থেকেই বেরিয়েছে গুলি। আমরা পুলিশমন্ত্রীরও ইস্তফা চাই।
শহর লাগোয়া এই ভাঙড় গত সাড়ে পাঁচ বছরে বারে বারে তৃণমূলের জমি নীতির মডেল সামনে এনেছে। কখনও আরাবুল, কখনও কাইজার। আর এবার সেই ভাঙড়-২নম্বর ব্লকের পোলেরহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বরূপনগর থেকে কামারবাড়ি, নতুনহাট থেকে খামারআইট- আট কিলোমিটার বিস্তীর্ণ এলাকা রক্তের বিনিময়ে, দুই যুবকের নিথর দেহের মূল্য দিয়েই প্রত্যক্ষ করলো তৃণমূলের সেই জমি মাফিয়াদের উগ্র লালসার চেহারা।
২০১৩ সালের প্রকল্প। জমি অধিগ্রহণহয়েছে। অথচ সিংহভাগ জমিদাতা, খেতমজুর ক্ষতিপূরণের অর্ধেকও পায়নি। আরাবুলের বাহিনীর দাপটে। রাতের অন্ধকারে স্রেফ বাইক নিয়ে জমি দিতে হবে এই হুমকি শুনিয়েই মমতা ব্যানার্জির দলীয়বাহিনী বেসরকারি সংস্থার হয়ে জমি কবজা নিয়েছে। শুধু নতুনহাটের ১৩ একর জমিই নয়, এই প্রকল্প সফল হলে পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ছিল তৃণমূলী জমি মাফিয়াদের পরবর্তী টার্গেট
নির্মম জমি মডেলের সেই চেহারাই বেআব্রু হয়ে ভাঙড়ে।
আর, তার বিরুদ্ধে রক্ত ঝরিয়েই এক অনির্বাণ প্রতিরোধের দিনলিপি এখন লিখছে সেই ভাঙড়ই।