20160710

বেকারীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ কর্মসূচীতে যোগ দিন: সি পি আই (এম)-র আহ্বান

মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারী বৃদ্ধির প্রশ্নে ১১-১৭ই জুলাই সি পি আই (এম)-র ডাকে সারা ভারতে প্রতিবাদ সপ্তাহ পালিত হবে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রতিবাদ সপ্তাহে কর্মসূচীতে অংশগ্রহণের জন্য পার্টির রাজ্য কমিটি সকলের কাছে আবেদন জানিয়েছে।

বেকারী, কর্মহীনতা
ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে মোদীর অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি দেওয়ার। আর মোদী প্রতিশ্রুত ‘সুদিন’ বা ‘আচ্ছে দিন’-র দু’বছর পর এখন দেশে বেকার বাহিনীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান।

কেন্দ্রের মোদী সরকারের নীতির সাফল্য এখানেই যে আজ দেশে কর্মহীন বেকারের সংখ্যা ২০ কোটি ছাপিয়ে গেছে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের মধ্যে বেকারবাহিনীর সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে প্রতিদিন কর্মচ্যুত মানুষের সংখ্যাও। প্রতিবছর ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ নতুন করে বেকারের তালিকায় নাম তুলছেন। আর এই বর্ধিত কর্মহীন কিন্তু কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আজ প্রায় ৫০ কোটি ছুঁইছুঁই। লক্ষ্যনীয় আজ এটাই, এই কর্মহীন নতুন বেকারবাহিনী তরুণ এবং শিক্ষিত অংশ, যাঁদের লক্ষ্য করে নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে মোদী দু-হাতে অঢেল কাজের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।

কিন্তু বাস্তব চিত্রটা কী? সকলেই জানেন হাওয়ায় চাকরি বা কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। তার জন্য দরকার শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধি। উৎপাদনশীল শিল্প বা ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে সবচেয়ে বেশি বেকার কাজ পেতে পারে। তার ব্যাপক উন্নতি দরকার, কিন্তু হচ্ছে অধোগতি। প্রয়োজন কৃষিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারী বিনিয়োগ। কিন্তু তারও বেহাল অবস্থা।

কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা মোদী সরকার বজায় রেখে চলেছে। চাকরির পদসৃষ্টির বদলে পদই লোপ করে দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের শূণ্যপদের সংখ্যা ৭,৪৭,১৭১। যা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদিত পদের সংখ্যার ১৮ শতাংশ। বিভিন্ন রাজ্যেও অনুরূপভাবে বহু পদ শূণ্য। মোদী ক্ষমতায় আসার সময় ভারতীয় রেলে শূণ্যপদ ছিল ২,২৫,৮৬৩। কার্যত সেই অবস্থাতেই এখন চলছে। তপসিলী জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে নিয়োগের বকেয়া খুবই বেশি। একইসঙ্গে মোদী সরকার এটা পরিষ্কার করে দিয়েছে যে বেসরকারী ক্ষেত্রে তারা সংরক্ষণের বিরোধী।

কেন বেকার সমস্যা বাড়ছে? কর্মসংস্থান সৃষ্টির নাম করে মোদী সরকার ভারতীয় বিদেশী কর্পোরেটগুলিকে ঢালাও সুবিধার পর সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। তাকানো যাক ব্যাঙ্কঋণ কেলেঙ্কারির দিকে। ২০১৫সালের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাঙ্কগুলিতে খারাপ ঋণ (অনুৎপাদক সম্পদের জন্য ঋণ)-র পরিমান ছিল ৩.৪লক্ষ কোটি টাকা। এই ঋণের বেশিরভাগটাই দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বেসরকারী কোম্পানিকে, উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছিল শিল্প স্থাপন বা পরিকাঠামো নির্মান। কিন্তু কিছুই হয় নি। অথচ জনগণের এই বিরাট পরিমান অর্থ হাওয়ায় উড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নতুন বিনিয়োগের সাথে যে কর্মসংস্থান হওয়ার কথা তাও উড়ে গেল।

২০১৫-র ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৬-র ফেব্রুয়ারি এই একবছরে শিল্পোৎপাদনের সূচক বেড়েছে মাত্র ২শতাংশ। এটা পূর্ববর্তী একবছরের তুলনাতেও (ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০১৫) খারাপ। সেই সময় শিল্পোৎপাদনের সূচক ছিল ৪.৮শতাংশ। আগের বছর ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প বৃদ্ধি হয়েছিল ৫.১শতাংশ। পরের একবছরে হয়েছে ০.৭ শতাংশ। এই তথ্য ২০১৬ সালের ১২ই এপ্রিল প্রকাশ করেছে পরিসংখ্যান ও কর্মসূচী রূপায়ন মন্ত্রক।

এবার আসা যাক দেশের মোট জাতীয় উৎপাদনের প্রসঙ্গে। মোট জাতীয় উৎপাদনের অংশ হিসেবে সরকারী ব্যয় হ্রাস পেয়েছে, বিনিয়োগ কমেছে এবং কমেছে আমদানি ও রপ্তানি। এর অর্থ হচ্ছে যে সরকারী ব্যয়ে মানুষের সহায়তা হয় এবং মানুষের ক্রময়ক্ষমতা বাড়ে সেই সরকারী ব্যয় হ্রাস করা হয়েছে। বিনিয়োগ হয়েছে খুব কম। আন্তর্জাতিক বানিজ্য হ্রাসমান।

২০১৬সালের মার্চ পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে দেখা যায় গত একবছরে অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং ইস্পাত উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এখানেও একই কথা আসে। উৎপাদন যদি কমতে থাকে বা সামান্যই বৃদ্ধি পায় সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কোথায়? বস্তুত ২০১৫ সালের শেষ তিনমাসে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধির বদলে এই সুযোগ কমেছে।

শ্রম ব্যুরোর পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা যায় সবচেয়ে বেশি শ্রম-নিবিড় শিল্পের কয়েকটির অবস্থা খুব খারাপ। প্রতি তিনমাস অন্তর ৮টি শিল্পে এই সমীক্ষা করা হয়। এটা দেখার জন্য যে কত কর্মসংস্থান হয়েছে বা লোপ পেয়েছে। এই ৮টি শিল্প হল বস্ত্র, চর্ম, ধাতু, অটোমোবাইল, অলঙ্কার, পরিবহন, তথ্য প্রযুক্তি-বিপিও এবং হস্তচালিত ও বিদ্যুৎ চালিত তাঁত। ২০১৬সালের মার্চে প্রকাশিত সর্বশেষ সমীক্ষা অনুসারে (জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১৫) এটা পরিষ্কার যে মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার ১৫মাস পরে (অর্থাৎ ২০১৪-র জুলাই থেকে ২০১৫-র অক্টোবর) ৪.৩ লক্ষ চাকরি যুক্ত হয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে এটাই সর্বনিম্ন। যে চাকরি যুক্ত হয়েছে তার সিংহভাগটাই তথ্য প্রযুক্তি পরিষেবা এবং বিপিও ক্ষেত্রে। পাশাপাশি হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত তাঁতশিল্প, পরিবহন, অলঙ্কার ও চর্মশিল্পে চাকরি হ্রাস পেয়েছে।

সবচেয়ে দুরবস্থা কৃষির। কৃষিতে ভারতীয় জনগণের দুই তৃতীয়াংশ যুক্ত। এই কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি নামমাত্র —১.১শতাংশ। এই কৃষি সঙ্কট আরও বেড়েছে খরা পরিস্থিতির জন্য। তাতে গ্রামীণ দারিদ্র্য আরও বেড়েছে। কয়েক কোটি খেতমজুর ও কৃষক পরিবার অসহনীয় অবস্থার মধ্যে রয়েছে। আইনী পথে এই দুস্থ দরিদ্র পরিবারগুলি যে সাহায্য পেতে পারে সেটা একমাত্র মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইনের মাধ্যমে (রেগা)। গ্রামীণ ধনিদের শক্তিশালী চক্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই আইনী ব্যবস্থাকে হেয় করছে মোদী সরকার। এই প্রকল্পে সময়মতো অর্থবরাদ্দ তাঁরা করছে না। এরফলে ন্যূনতম একশো দিনের কাজ দেওয়ার পরিবর্তে গড়ে বছরে কাজ হচ্ছে ৪৮দিন। অথচ মোদী সরকার খরাপ্রবণ এলাকায় একশো দিনের বদলে ১৫০দিন কাজ দেবে বলে ঘোষণা করেছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের হিসেব অনুযায়ী ১কোটি ২০লক্ষ আবেদনকারীকে (১৪শতাংশ) কোন কাজ দেওয়া যায় নি। এটাই আসল গুজরাট মডেল। কারণ রেগা রূপায়নের ব্যর্থতায় গুজরাটের নাম আগে। রেগার সাফল্যের শীর্ষে রয়েছে ত্রিপুরা। যেখানে ২০১৫-১৬সালে গড়ে কাজ দেওয়া হয়েছে ৯৫দিন। দেশের সর্বত্র রেগার এই ত্রিপুরা মডেলই অনুসরণ করা উচিত।

চাকরি দিতে না পারা বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতার জন্য দায়ী মোদী সরকারের আগ্রাসী নয়া-উদারবাদী নীতি। বামপন্থীরা যে বিকল্প নীতির দাবি করে আসছে তা হল চাকরি ও কর্মসংস্থান সুনিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয় বহুল পরিমানের বৃদ্ধি করা। এটাই একমাত্র অর্থনীতিকে তেজী করতে পারে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে পারে। তা না করে মোদী সরকার সম্পূর্ণই নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বেসরকারী বিনিয়োগের দিকে।

পশ্চিমবঙ্গে বেকারত্বের সমস্যা সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় ভয়াবহ। নতুন শিল্প হয় নি, অথচ সরকার শিল্পে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থানের হাস্যকর তথ্য হাজির করছে। শূণ্যপদে নিয়োগ এরাজ্যে কার্যত বন্ধ। নামমাত্র মজুরিতে সরকারী ক্ষেত্রে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকার অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করছে। কৃষির ক্ষেত্রেও সঙ্কট সরকারী নীতির জন্য বাড়ছে। কৃষকেরা ফসলের লাভজনক দাম পাচ্ছেই না। এর কারণেই বাড়ছে গ্রামীণ বেকারী। ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে ব্যবসা-বানিজ্যের অধোগতি। আর্থিক কারণে এবং তৃণমূলের অপশাসনে বহু শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঝাঁপ বন্ধ হচ্ছে। নিয়োগনীতির ক্ষেত্রে সীমাহীন কেলেঙ্কারি রাজ্যের তরুণ এবং বেকাররা হাড়ে হাড়ে পাঁচ বছর ধরে বুঝতে পারছেন। বেকারীত্বে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় মুখ্যমন্ত্রীর ‘তেলেভাজা শিল্প!’ প্রসারের ডাকের মাধ্যমে। বেকারদের চাকরি এবং কর্মসংস্থানে পশ্চিমবঙ্গকে ভাসিয়ে দেওয়ার তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি রাজ্যের সবচেয়ে বড় প্রহসনে পরিণত।

বেকারত্বের সমস্যার বিরুদ্ধে এবং মোদী সরকার ও তৃণমূল সরকারের বেকারবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলনে সকলের ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরী।

আমাদের দাবি
সরকারী পদে নিয়োগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। সমস্ত শূণ্যপদ পূরণ করতে হবে। তপসিলী জাতি, আদিবাসীদের পদগুলো সমস্ত বকেয়া পূরণ করতে হবে। বেসরকারী ক্ষেত্রে সংরক্ষণ চালু করতে হবে।

শহর এলাকায় রেগা’র ধাঁচে কর্মসংস্থান নিশ্চয়তাকরণের জন্য আইন প্রনয়ন করতে হবে।
রেগা’য় সরকারী বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং এই আইনের যথার্থ রূপায়ন সুনিশ্চিত করতে হবে।

রাজ্যে নতুন শিল্প চাই। কৃষিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সমস্ত শূণ্যপদে নিয়োগ করতে হবে। সরকারী পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা সুনিশ্চিত করতে হবে। সরকারী কাজে নিয়োগে শাসকদলের দলবাজী, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

20160417

ক্ষমতার গান~~পল্লব কীর্তনিয়া

অতীতের পরিবর্তনকামী পল্লব কীর্তনিয়ার অসাধারন  আত্মোপলব্ধি:
      
~~ক্ষমতার গান~~

প্রশ্ন কোরনা তাহলেই তুমি মাওবাদী, সন্ত্রাসী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

ভোট দিয়ে জনগণ আমাদের এনেছিল ক্ষমতায়

ভাইয়েরা খাচ্ছে হক্কের টাকা তাইতো কী মমতায় !

উড়ালপুলের সাব-কন্ট্রাক্ট পার্টির ছেলেই খাবে

সেতু ভেঙে কেউ মরলে নাহয় পাঁচ লাখ পেয়ে যাবে,

কিন্তু তোমরা প্রশ্ন কোরনা তাহলেই সন্ত্রাসী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

সারদার টাকা, রোজ-দার টাকা, ডেলো পাহাড়ের কেলো,

সে টাকায় ওড়ে হেলিকপ্টার পরিবর্তনও এলো

কত মানুষের রক্তের টাকা চিট ফান্ড চেটে খায়

চোরের ওপর বাটপাড়ি করি কী নিপুণ মমতায় !

কিন্তু তোমরা প্রশ্ন কোরনা মাওবাদী সন্ত্রাসী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

মোটা টাকা ফেলো চাকরি জুটবে, পাশ করে যাবে টেট

মস্তান হলে তুমি সম্পদ তোমারই সিন্ডিকেট

ইমামকে টাকা দিলে কিছু পাবো সংখ্যালঘুর ভোট

ভোটে কাজে লাগে ক্লাবের ছেলেরা ওদেরও জন্য নোট...

প্রশ্ন কোরনা প্রতি ইঞ্চিতে বুঝে নেব সন্ত্রাসী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

যতটুকু কাজ তার চেয়ে বেশি ঢাক পেটানোর টাকা

হোর্ডিংয়েতে ছবি, 'অনুপ্রেরণা` শহরের মুখ ঢাকা

চা বাগানে খিদে, তাহোক একটু তেলেভাজা খাক ওরা

ওরাও জানুক কেমন ছুটছে শিল্পে নতুন ঘোড়া ! 

কিন্তু তোমরা প্রশ্ন কোরনা মাওবাদী সন্ত্রাসী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I 

ধর্ষণ সেটা আগে কি  ছিল না ? ছোট্ট ঘটনা সব !

সাজানো ঘটনা, কুৎসা রটিয়ে বলে, 'হোক কলরব' !

টাকা নেবেইত ছাত্র-নেতারা কলেজে ভর্তি করে,

ছোট ছেলেমেয়ে একটু ফুর্তি করবে না বচ্ছরে ?

প্রশ্ন কোরনা প্রশ্ন কোরনা, প্রশ্ন সর্বনাশী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি i

পাপোষ পাল তো রেপ বিশারদ কেষ্টার আছে বোম,

দু-পায়ের তল দিয়ে মেরে দেবে ফণিরুল একদম I

সঙ্গে রয়েছে `আমার' পুলিশ, ছাপ্পা ভোটের দল,

নির্মূল গণতন্ত্রে আমার এটাই তো সম্বল !

কমিশন আমায় শোকজ করেছে? ওসব পুরনো বাসি...

আমার রাজ্যে আমি সম্রাট বাকি সব দাসদাসী !

কিন্তু তোমরা প্রশ্ন কোরনা, প্রশ্ন সর্বনাশী

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

ক্ষমতার স্বাদ কী যে আল্হাদ যে না পায় সে কী বোঝে ?

রাজনীতি থেকে আদর্শবাদ বোকারাই শুধু খোঁজে

সিবিআইকেও ম্যানেজ করেছি লোকে ভুলে যাবে সব

আবার জিতব, আবার করব টাকার মহোৎসব !

প্রশ্ন কোরনা প্রতি ইঞ্চিতে বুঝে নেব সব হাসি

সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি I

প্রশ্ন কোরনা প্রতি ইঞ্চিতে মুছে দেব সব হাসি


সাত বছরের জেল হবে আর তিন দিনের ফাঁসি !

20160412

কী সৌভাগ্য, খোদ মহিলাটির বিরুদ্ধেই ভোট দিতে পারব

ভোটের দিবসে নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাব, আমার মতো শারীরিক অসমর্থদের জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা যদি না-ও থাকে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ভোট-পরিচালকের সামনে উপস্থিত হয়ে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করব।

অশোক মিত্র
আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ এপ্রিল, ২০১৬, ০০:২৭:৪৭

একটি বিশেষ মহিলা সততার প্রতীক বলে তিনি স্বয়ং এবং তাঁর অনুগামীরা গত দু’তিন দশক পশ্চিম বাংলাকে অবিশ্রান্ত তোলপাড় করে দিয়েছেন। শহরে গ্রামে ছড়িয়ে লক্ষ লক্ষ অভাবী মানুষজন, বেকারত্বের চাপ বাড়ছে, গ্রামে কিছু কিছু কৃষক যাঁরা আগে নেহাতই খেতমজুর ছিলেন, তাঁরা এক ছটাক দু’ছটাক করে হয়তো জমি পেয়েছেন, কিন্তু তা চাষ করে স্বচ্ছন্দ বেঁচে থাকার উপায় নেই, শহরে ও শহরতলিতে শিল্পবাণিজ্যের প্রসার সীমিত, কোনও ক্রমে বেঁচে থাকার তাগিদে ক্রমবর্ধমান গরিব মানুষদের উদ্ভ্রান্ত ছোটাছুটি। সততার প্রতীক মহিলাটি খাঁটি প্রাকৃত ভাষায় তাঁদের যথার্থ শত্তুর বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন— ওই গোলগাল চেহারা, অ্যাম্বাসাডর চড়নেওয়ালা, নধর বেটাগুলোই সব সর্বনাশের জন্য দায়ী, তিনি সততার প্রতীক, তাঁকে যদি সর্বগোত্রের অভাবী মানুষগুলি সমর্থন জ্ঞাপন করেন, তা হলেই পশ্চিম বাংলা স্বপ্নরাজ্যে পরিণত হবে, সততা, সততা, সততা: সততার বাইরে থেকে গেলে, সততাকে পরিপূর্ণ সমর্থন না জানালে কৃষক মজুর মধ্যবিত্তের আর কোনও আশা নেই। মধ্যবিত্ত পরশ্রীকাতরতা দিনদরিদ্রদের মানসে অনুপ্রবেশ ঘটানোর কাজে ওই বিশেষ ভাষা ব্যবহার আশ্চর্য সাফল্য এনে দিল, এমনকী লেখাপড়া-জানা অতি-বামপন্থী বলে খ্যাত কিছু মানুষজনও এই সততার প্রতীকে মজে গেলেন।

অথচ মহিলাটির পূর্ব ইতিহাস এমন তো অজানা ছিল না। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে হাতেখড়ির মুহূর্তে তিনি ডক্টর পদবিটি সযত্নে ব্যবহার করতেন, মার্কিন কোনও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি নাকি ডক্টরশ্রী-তে ভূষিত হয়েছিলেন। কয়েক মাসের মধ্যেই প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটিত, ও-রকম নামে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ই নেই। তাতে কী? পৃথিবীতে প্রতারকদের তো অভাব নেই, সততার প্রতীক তাদেরই কারও খপ্পরে পড়ে একটু বিব্রত, সেটা ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, তিনি রাজ্যের শাসনভার হাতে পেলেই সমস্ত অন্যায় বিলুপ্ত হবে, ন্যায়ের বন্যায় পশ্চিম বাংলা প্লাবিত হবে। পাঁচ বছর আগে রাজ্যের ভোটদাতাদের একটি অ-তুচ্ছ অংশ এ-রকম প্রতীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে সততার প্রতীকটিকে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিপুল ভাবে জয়ী করলেন— স্বপ্নরাজ্য এখন হাতের মুঠোয়।

তার পর অবশ্য অবিশ্বাস্য উলটপুরাণের অধ্যায়ের পর অধ্যায়। সততার স্বরূপ যে কত বিভঙ্গে, কত বৈচিত্রে বিচ্ছুরিত হতে পারে, গোটা পশ্চিম বাংলার সাধারণ মানুষ ক্রমে-ক্রমে হাড়ে-হাড়ে টের পেতে শুরু করলেন। অর্থব্যবস্থার আলোচনা থেকেই শুরু করা যাক। কী কৃষিতে, কী শিল্পে বা পরিষেবায়, গত পাঁচ বছরে এই রাজ্যে উন্নয়নের ছিটেফোঁটা হয়নি। পরিবর্তে চোখ-ছানাবড়া-করা আজব নানা ঘটনা। কালিম্পঙের উপকণ্ঠে এক শোখিন অতিথিশালায় নিভৃত বৈঠকে কে কে এবং কী কারণে উপস্থিত ছিলেন, তা নিয়ে অনেক বয়ান, অথচ কোনও একটিকেও সততার প্রতীক মহিলা ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে সোচ্চার হননি। কিন্তু মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-অতিনিম্নবিত্ত মানুষগুলি তাঁদের সামান্য সঞ্চয় যে একটি-দুটি অসাধু বিনিয়োগ সংস্থার কাছে গচ্ছিত রাখতে শুরু করেন, শাসক দলের নেতানেত্রীদের প্রবল উৎসাহে ও প্ররোচনায় তা উধাও হয়ে গেল, মাসে মাসে যে টাকা ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার কথা, তা-ও পুরোপুরি বন্ধ।

পাশাপাশি, অন্য একটি গভীর ব্যঞ্জনাপূর্ণ তথ্য, বহু বছর ধরে ডাকঘরে-জমা-পড়া স্বল্পসঞ্চয়ে পশ্চিমবঙ্গ দেশে সর্বাগ্রগণ্য। এই সঞ্চয়ের দুই-তৃতীয়াংশ রাজ্য সরকারের ঋণ হিসেবে প্রাপ্য, রাজ্য সরকার তাই এই প্রকল্পের ব্যাপ্তিসাধনে বরাবর সচেষ্ট থেকেছেন। দিদিমণির মুখ্যমন্ত্রিত্বে প্রথম দু’বছর অন্য ইতিহাস রচনা করল। রাজ্যে ডাকঘরে-জমা-পড়া অঙ্কের পরিমাণ অতি সংকুচিত, অথচ কালিম্পঙের উপকণ্ঠে সেই ঐতিহাসিক সভায় যে যে বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির মালিকরা উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা, তাদের সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় একশো গুণ বেড়ে গেল। যে বেকার বা গৃহবধূদের সম্প্রদায় ডাকঘরের জন্য টাকা তুলতেন, তাঁরা বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির জন্য অর্থ সংগ্রহে শশব্যস্ত। সব মিলিয়ে বিভিন্ন অসাধু সংস্থা কত হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে, তার নানা হিসেব। সাধারণ মানুষের অসন্তোষ চাপা দিতে সংস্থাগুলির চাঁইদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হল। ক্রমশ অভিযোগ প্রকাশ পেল, উধাও হওয়া মধ্যবিত্ত গরিব মানুষের টাকা কিছু কিছু সততার প্রতীক দলটির নেতানেত্রীদের কুক্ষিগত। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ মাননীয় সাংসদ, কেউ কেউ হয়তো বা প্রখ্যাত শিল্পী বা অভিনেতা-অভিনেত্রী। 

আরও বিচিত্র দৃশ্যের সম্মুখীন আমরা। দুরাচারী এক বিনিয়োগ সংস্থার কারাগারে আটক নায়ক আদালতে আবেদন পেশ করলেন: হুজুর ধর্মাবতার, কী সব আজেবাজে গুজব শুনছি, যেহেতু আমাদের প্রতিষ্ঠান বেশ কয়েকটি রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মহান ব্রতে নিযুক্ত ছিল, কেউ কেউ নাকি বলছেন পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে নিয়ে মামলাটি খোদ সর্বোচ্চ আদালতের হাতে অর্পণ করা হোক। বন্দিমহোদয়ের আকুল আবেদন: আমি হলফ করে বলছি, রাজ্য সরকার আমার বিরুদ্ধে অতি দক্ষতার সঙ্গে মামলাটি পরিচালনা করছে, সুতরাং সুপ্রিম কোর্টে সরিয়ে নেওয়ার মতো বিদঘুটে ব্যাপার দয়া করে হতে দেবেন না।

শেষ পর্যন্ত যদিও সেই মামলা এখন দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয়ের নির্দেশে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার তত্ত্বাবধানে শুরু হয়েছে, কবে সেই মামলা শেষ হবে, কেউ জানে না। সত্যের প্রতীক দলটির আরও অনেক নেতানেত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, এক জন রাজ্য মন্ত্রীকে জামিন না দিয়ে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে। যদিও তিনি আর মন্ত্রী নেই, তেমন ক্ষতি নেই তাতে, বন্দিশালায় তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পুরোপুরি ভোগ করছেন।

আর্থিক দুরাচারের আরও এত এত দৃষ্টান্ত ক্রমশ উদ্ঘাটিত, কোনটা ছেড়ে আগে কোনটা বলব? এখন তো দেখা যাচ্ছে, দলের নেতা মন্ত্রী সাংসদরা প্রায় প্রকাশ্যে উৎকোচ গ্রহণ করছেন। দলের মহানেত্রী শখ করে মাঝে মধ্যে ছবিটবিও আঁকেন। তাঁর ছবির বাজারদর খোলাবাজারে দশ-বারো টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে নাকি একটি বিশেষ ছবি কেড়ে নিয়ে প্রায় তিন কোটি টাকা দাম ধরিয়ে দিয়েছে কোনও বেসরকারি সংস্থা। রাজ্য প্রশাসনের প্রত্যেকটি দফতর থেকে এটা-ওটা-সেটা উপলক্ষ করে বিভিন্ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে অর্থব্যয় করা হয়। ক্রমশ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, প্রকল্পের সুযোগ পেতে হলে দলের কোনও না কোনও কেউকেটাকে দস্তুরি দিতে হয়। সর্বশেষ উদাহরণ জোড়াসাঁকোর ভেঙে-পড়া উড়ালসেতু।

এই দীর্ঘ গৌরচন্দ্রিকা থেকে পাঠকদের অব্যাহতি দিয়ে সততার প্রতীক নেত্রীর স্পষ্ট ঘোষণায় পৌঁছে যাওয়া যাক। তিনি গর্বসহকারে নিজেই জানিয়েছেন, এন্তার সমাজবিরোধীর ওপর তিনি কর্তালি করেন। প্রকৃত অর্থেই তাঁর দল সব গোত্রের সব স্তরের সমাজবিরোধীদের আশ্রয়দাতা। রাজ্যের শাসনকারী দলের সাংসদ প্রকাশ্যে গলা ফুলিয়ে বলছেন, যদি কেউ তাঁর বিরুদ্ধে টু শব্দটি করে, তাঁর ছেলেরা গিয়ে সেই উদ্ধত ব্যক্তির বাড়িতে ঢুকে মহিলাদের ধর্ষণ করে আসবে। সাংসদটির বিরুদ্ধে কোনও কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করা দূরে থাক, ধর্ষণ নাকি বড়জোর দুষ্টু ছেলের সামান্য নষ্টামি। কোনও বহিরাগত গিয়ে যদি কোনও কলেজের অধ্যক্ষ বা অধ্যাপককে পেটায়, তা হলে যে পেটাল তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে অধ্যক্ষ বা অধ্যাপক বেচারিকে লাঞ্ছনার উদ্যোগ। পার্ক স্ট্রিটের ধর্ষণটি নাকি সাজানো ঘটনা, কামদুনির ধর্ষণ তথা খুন সিপিএম-মাওবাদীদের চক্রান্ত। বিদ্যাসাগর এবং রবীন্দ্রনাথের বাংলাকে সভ্যতা সংস্কৃতির কোন অতলে গত পাঁচ বছরে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে, তা অবলোকনে নির্বাক না হয়ে উপায় নেই। ন্যায়পরায়ণতা সম্পূর্ণ অদৃশ্য। মানবাধিকার কমিশনকে মুখ ভেঙচিয়ে তার নির্দেশকে কলা দেখানো হচ্ছে, মহিলা কমিশনেরও একই অভিজ্ঞতা। এমনকী মাননীয় বিচারপতি যদি শাসকের প্রসাদধন্য সমাজবিরোধীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন, পুলিশের ঘাড়ে ক’টা মাথা, তার কাছাকাছি যায়?

পুলিশ নিছক নিষ্ক্রিয় নয়, এখন শাসক দলের অনুশাসনেই তার ঘোরাফেরা। গোটা প্রশাসনই সেই পথের পথিক। রমেশচন্দ্র দত্ত থেকে শুরু করে অন্নদাশংকর রায় পর্যন্ত রাজপুরুষরা ঋজু, বলিষ্ঠ ন্যায়নিষ্ঠ প্রশাসনের যে ঐতিহ্য স্থাপন করে গিয়েছিলেন, তা এখন ক্লেদাক্ত ধুলোয় লুটোচ্ছে। গোটা প্রশাসন জুড়ে জো-হুজুর-তালিমকারীদের ঠাসাঠাসি ভিড়। একদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্রছাত্রী, কঠিন পরীক্ষায় সসম্মান উত্তীর্ণ হয়ে প্রশাসনে প্রবেশ, তাঁরা কেন সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাঠে নৈতিকতা তথা আত্মসম্মানবোধ বিসর্জন দিয়েছেন, তা অবশ্যই গভীর গবেষণার বিষয়। সব মিলিয়ে একটি আশ্চর্য নবদর্শন পশ্চিম বাংলায় গত পাঁচ বছরে রচিত: মিথ্যা মানে সত্য, অন্যায় মানে ন্যায়পরায়ণতা, বেআইনিই আইন, অজ্ঞতাই প্রজ্ঞা, যে অত্যাচারিত, সে-ই আসলে অত্যাচারী, আসল অত্যাচারী পারিতোষেকরই যোগ্যতা অর্জন করেছে।

এই উপাখ্যান, মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, সত্যিই অন্তহীন। পাঁচ বছর আগে মহিলাটি দাবি করেছিলেন, জঙ্গলমহলে কোনও মাওবাদী নেই, সিপিএমই মাওবাদী সেজে গোলমাল পাকাচ্ছে। আজ তিনি বলছেন, জঙ্গলমহলে একমাত্র তিনি আছেন আর মাওবাদীরা আছে, আর কেউ নেই। আসানসোলের হিন্দিভাষী-প্রধান এলাকায় নির্বাচনী সভায় পৌঁছে শাসাচ্ছেন: জো হামসে লড়েগা, চুরচুর হো জায়েগা। একটু বাদেই কুলটিতে গিয়ে হাতজোড় করে সকাতর প্রার্থনা: ভুলত্রুটি করে থাকলে ক্ষমা করবেন, মুখ ফিরিয়ে নেবেন না।

এখন মনে হয়, ঘৃণার একটি মস্ত সামাজিক সার্থকতা আছে। জীবনের অন্তিম লগ্নে পৌঁছে আমি স্পষ্টোক্তি করে অত্যন্ত শান্তি পাচ্ছি, মস্ত তৃপ্তি পাচ্ছি: এই স্বৈরাচারিণীকে আমি ঘৃণা করি। ঘৃণা, ঘৃণা, ঘৃণা। আমার ঘৃণা প্রকাশ পড়শিদেরও ঘৃণা-নিষ্কাশনের সাহস সঞ্চার করে। কী সৌভাগ্য, সেই ঘৃণাকে ব্যক্ত করার একটি সুযোগ বর্তমান রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন আমাকে এনে দিয়েছে। যে এলাকায় আমার বসবাস, এখন তা ভবানীপুর কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত। ভোটের দিবসে যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে যাব, আমার মতো শারীরিক অসমর্থদের জন্য কোনও বিশেষ ব্যবস্থা যদি না-ও থাকে, হামাগুড়ি দিয়ে হলেও ভোট-পরিচালকের সামনে উপস্থিত হয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে পর্দায় ঘেরা যন্ত্রে মহিলাটির বিরুদ্ধে আমার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করব। 

মেগালোম্যানিয়াক

মানব মুখার্জি

অসুখটার নাম মেগালোম্যানিয়া (Megalomania)। এই অসুখে আক্রান্ত রোগীকে বলা হয় মেগালোম্যানিয়াক। রোগ হিসাবে এটি খুবই পরিচিত, ইতিহাসের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় এই অসুখ এবং অসুস্থদের নানা বিবরণী। নানা ইতিহাসবিদ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মেগালোম্যানিয়াক বলেছেন। কিন্তু সবার তালিকায় তিনটি নাম কমন। রোমের সম্রাট নিরো, জার্মানির ফুয়েরার অ্যাডলফ হিটলার এবং ইতালির ডুচে বেনিতো মুসোলিনি।

ডিকশনারিতে মেগালোম্যানিয়া সম্পর্কে বলা হচ্ছে – Megalomania is a psychopathological condition charecterized by fantasies of power relevance, omnipotence and by inflated self esteem. অর্থাৎ মেগালোম্যানিয়া এক ধরনের মনরোগগ্রস্ত অবস্থা, যাতে রোগী নিজেকে পরম ক্ষমতাসম্পন্ন বলে মনে করে। নিজেকে ভাবে পরমশক্তিশালী এবং নিজের সম্পর্কে এক কল্পিত উচ্চ ধারণা পোষণ করে।

ব্যক্তিগত জীবনে মেগালোম্যানিয়াক দু’চার জনকে সবাই খুঁজে পাবেন। আমাদের সাহিত্যের পৃষ্ঠাতেও মেগালোম্যানিয়াকদের আনাগোনা আছে। বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মেগালোম্যানিয়াক চরিত্র লীলা মজুমদারের ‘পদিপিসির বর্মীবাক্স’-র পদিপিসি। কিন্তু সাহিত্যের মেগালোম্যানিয়াকরা বাস্তব জীবনে বিশেষ সমস্যা তৈরি করে না, তৈরি করে বাস্তব জীবনের মেগালোম্যানিয়াকরা।

লীলা মজুমদারের পদিপিসি আমাদের সমস্যা না। সমস্যা অভিষেক ব্যানার্জির ছোটো পিসি, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী। তিনি একজন আদর্শ মেগালোম্যানিয়াক। তিনি যা বলবেন সেটাই এরাজ্যের সিদ্ধান্ত। তিনি যা ভাববেন সেটাই সবাইকে ভাবতে হবে। তাকে কেউ প্রশ্ন করতে পারবে না। কারুর পরামর্শ তার প্রয়োজন নেই। তিনি সমস্ত জ্ঞানের আধার। তাকে কুর্ণিশ করাটাই এই রাজ্যের ৯কোটি মানুষের কাজ। উনি চান তাই গোটা রাজ্যকে নীল সাদা রঙে রাঙানো হলো। উনি চান তাই সত্যজিৎ রায়ের বাসভবন বিশপ লেফ্রয় রোডে, সেই নাম পালটে করা হলো ‘সত্যজিৎ ধরণী’। রাস্তার নাম ‘ধরণী’ — ভূভারতে কেউ কখনও শোনেনি। কিন্তু উনি ভেবেছেন।

অথচ রাস্তার নামকরণের জন্য প্রখ্যাত ইতিহাসবিদদের নিয়ে একটি কমিটি আছে। কিসের বিশেষজ্ঞ? আমাদের রাজ্যে একমাত্র বিশেষজ্ঞ মুখ্যমন্ত্রী (মেগালোম্যানিয়াকরা ঠিক এরকমই মনে করে)। এখন সত্যজিৎ রায়ের পুত্র কান্নাকাটি করছেন — ‘দোহাই, রাস্তার নাম ফিরিয়ে দিন’। তাতে অবশ্য কোনো লাভ হয়নি। কেউ যদি মনে করেন এই অভিযান এখানেই শেষ তিনি ভুল প্রমাণিত হতেই পারেন। ‘ধরণী’-তে বিষয়টা থামবে বলে মনে হয় না। কাল হতেই পারে রবীন্দ্রনাথকে চিরজীবী করতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ির সামনের রাস্তা রবীন্দ্র সরণির নাম পাল্টে করে দিলেন ‘রবীন্দ্র মরেনি’। এ সবই সম্ভব।

একজন গড় সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ জানেন সাঁওতাল বিদ্রোহের দু’জন নেতা সিধো এবং কানহু। সেখানে একজন ডহরবাবু বা তার পরিবারের সদস্যদের একদম ভরা বাজারে মাইকে ডেকে পাঠানোটা বাড়াবাড়ি রকমের অজ্ঞানতা, কিন্তু অজ্ঞানতা অপরাধ নয় কাজেই ক্ষমার্হ। কিন্তু কবি জন কিটস (মৃত্যু - ১৮২১) এবং শেলী (মূত্যু - ১৮২২)-এর সাথে শেকসপিয়রকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের (জন্ম - ১৮৬১) জ্ঞানগর্ভ আলোচনার উৎস একটি প্রহেলিকা ছাড়া কিছুই না। কি করে জানলেন? নিশ্চয়ই কোনো বইয়ে পড়েননি, নিশ্চয়ই কেউ বলেননি। স্রেফ উনি ভেবেছেন। আর যেহেতু তিনি মেগালোম্যানিয়ায় আক্রান্ত তাই যেটা ভেবেছেন সেটাকেই সত্য বলে জেনেছেন।

মুখ্যমন্ত্রী আমাদের আবার রবীন্দ্রপ্রেমী। কথায় কথায় তিনি রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনেন। তাই অবলীলাক্রমে ১৯৪১ সালে প্রয়াত কবি ১৯৪৬ সালে বেলেঘাটায় এসে মহাত্মা গান্ধীর অনশন ভাঙাতে তাঁর হাতে ফলের রসের গ্লাস তুলে দেন — কারণ তিনি ভেবেছেন। একইভাবে ১৮৬১-তে প্রতিষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ১৮৩৩-এ প্রয়াত রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে এসে বক্তৃতা দিয়ে যান। এবং এ কথা ভুলবশত একবার বলে ফেলেননি, দু’দুবার বলেছেন। কারণ তিনি যা ভাবেন তাই অভ্রান্ত, ১০০% খাঁটি সত্য।

তবে এই সব অসংখ্য মণিমুক্তার ভাণ্ডার জনজীবনে খুব বিপজ্জনক হয়ে ওঠে না। বড়জোর আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পর কেউ যদি বই লেখেন ‘রাজ্য রাজনীতিতে হাস্যরস’ তবে এইসব তাতে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং আমাদের উত্তরসূরিরা এই সব পড়ে হেসে কুটিপাটি হবেন। কিন্তু মেগালোম্যানিয়াক রাজনীতিকদের কীর্তি এতটা নিরামিষ হয় না, এর সাক্ষ্য দিচ্ছে ইতিহাস। মেগালোম্যানিয়াকের প্রধান দু’টি বৈশিষ্ট হলো এক, নিজেকে সর্বশক্তিমান ভাবা, দুই, নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাবা। অর্থাৎ তিনি বাকিদের মতো না—তিনি সবার ওপরে। উনি সব কিছুর ঊর্ধ্বে এই মনোভাবই সমস্ত মেগালোম্যানিয়াককে স্বৈরাচারী বানায়। সাধারণ মানুষের কাজ তাকে অনুসরণ করা। যদি করে তবে ভাল, আর না করলে তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য করতে হবে।

২০১১-র পরের কোনো নির্বাচনে মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারেনি। পরাজয় দূরে থাক কোনো নির্বাচনে তার সমর্থন কমে যাওয়াটাও একজন মেগালোম্যানিয়াক নেতা সহ্য করতে পারেন না। কেবল লোকসভা, পঞ্চায়েত বা পৌরসভার মতো রাজনৈতিক ভোট না, ছাত্র সংসদ থেকে কো-অপারেটিভ, পাড়ার ক্লাব থেকে স্কুল কমিটি সব নির্বাচনেই সরকারি দল গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ঢালাও নির্দেশ — ‘অন্যরা যাতে একটি আসনও না পায় সেটা দেখতে হবে।’ এই নির্দেশ কেবল দলের কাছে যায় না, সাধারণ এবং পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের কাছেও এই নির্দেশ যায়। স্টিং অপারেশন খ্যাত শ্রীযুক্ত মির্জা বা ভারতী ঘোষের মতো পুলিশ কর্তারা ঠিক এই কাজ করেছে পঞ্চায়েত বা পৌরসভা নির্বাচনে।

এটা কাকতালীয় কিনা জানি না। ক্ষমতায় আসার পর হিটলার এবং মুসোলিনি দু’জনেই প্রশাসন এবং দলকে মিশিয়ে দিয়েছিলেন, যেটা এই রাজ্যে করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই কাজ করার জন্য দল এবং প্রশাসনকে বিশেষভাবে তৈরি করতে হয়। অন্যকে সহমতে আনার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি ক্রমশ অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়। ২০১১-র আশপাশে তৃণমূলের মিটিং-এ মিছিলে বড় সংখ্যায় থাকতো সেই কর্মীরা যারা মানুষকে সহমতে আনতে পারে। কিন্তু এই অংশের প্রয়োজন ক্রমশ ফুরিয়েছে তৃণমূলের কাছে, তাদের দরকার ভোট লুট করার বাহিনী, তাদের দরকার প্রতিপক্ষ মুখ বন্ধ করার বাহিনী। তাদের দরকার মানুষকে ভয় দেখানোর বাহিনী, পায়ে হাঁটা মিছিলের বদলে বাইকবাহিনীকে বেশি দরকার।

বিধাননগরের পৌরভোটে টিভিতে আমরা দেখেছি মাটিতে ফেলে ৭০বছরের বৃদ্ধর বুকে লাথি মারা হচ্ছে। এরা রাজনৈতিক কর্মী হতে পারে না, এরা পেশাদার সমাজবিরোধী। কেন আসে এরা তৃণমূলের সাথে? নবান্নতে ‘দিদি’ আছেন মানে এরা ‘করে খেতে পারবে।’ তোলাবাজি, সিন্ডিকেট এগুলোই তো এদের কাজ। এই করে এরা ‘খায়’। তৃণমূলের রাজনীতি দেখে এরা আসে না। অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এরা আসে। কাজেই যে কোনো মূল্যে এরা তৃণমূল ক্ষমতায় থাকুক এরা চায়। পাঁচ বছরে তৃণমূল দলের চেহারা পালটে গেছে। তৃণমূলের নেতা এখন অনুব্রত, আরাবুল, কাজল শেখ, মণিরুল, কানকাটা দিলীপ বা রানিগঞ্জের এম এল এ সোহরাব আলিরা। দল ছেড়ে চলে গেছেন পঙ্কজ ব্যানার্জি, এই বাহিনীর হাতে বেধড়ক মার খেয়েছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। এটাই এখনকার তৃণমূল।

২০১০-এ মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন ‘আমি অনেক গুন্ডা কন্ট্রোল করি’ আর এখনকার বাস্তবতা হলো গুন্ডারা ওনাকে এবং ওনার দলকে কন্ট্রোল করে। যে কোনো মূল্যে ক্ষমতাই মেগালোম্যানিয়াকের লক্ষ্য। কোন্ পথে তা আসলো তা তার দেখার দরকার নেই। রানিগঞ্জের এম এ এ সোহরাব আলি লোহা চুরির মামলায় অপরাধী সাব্যস্ত হলেও তাকে তিনি সরান না। জেলে গেলেও মদন মিত্রকে মন্ত্রী রাখেন এবং প্রার্থী করেন। যারা নারদ স্টিং অপারেশনে ধরা পড়ল সেই সব তৃণমূল নেতারা জানেন নেত্রী তাদের কিছু বলবে না বরং তাদের পাশে দাঁড়াবেন। হিটলারের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অনুচর হেরম্যান গোয়েরিং লুট করে ইউরোপের সবচেয়ে বড়লোকে পরিণত হয়েছিলেন। তার জমির পরিমাণ ছিল ১লক্ষ একর বা ৪০০ বর্গ কিলোমিটার। প্যারিসের মিউজিয়াম থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিল্প সামগ্রী লুট করে এনেছিলেন। সেই সব জিনিসের পরিমাণ এতটাই ছিল ২৬টি ট্রেন বোঝাই করে তা আনতে হয়েছিল। এতে গোয়েরিং-এর ওপর হিটলারের আস্থা বিন্দুমাত্র কমেনি। কারণ হিটলারের নিজের ক্ষমতার প্রধান স্তম্ভ ছিলেন গোয়েরিং।

পৃথিবীর সমস্ত মেগালোম্যানিয়াক স্বৈরাচারী শাসকদের অধিকাংশই ব্যক্তিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ। কয়েক বছর আগে গ্রিস যখন তার বৈদেশিক ঋণ শোধ করতে পারছে না, তখন তার নিলামে তুলেছিল রোডস দ্বীপে মুসোলিনির প্রাসাদ — তার দাম উঠেছিল ১০০ মিলিয়ন ডলার।

আমাদের রাজ্যের মেগালোম্যানিয়াক ভদ্রমহিলাটি একসময় নিজেকে সততার প্রতীক বলে প্রচার করতেন। চাপে পড়ে এখন সেসব করেন না। ডেলোর পাহাড়ী বাংলোর মধ্যরাতে চিট ফান্ড মালিকদের সাথে গোপন মিটিং, রহস্যজনক ক্রেতাদের কাছে কোটি কোটি টাকার ছবি বিক্রি এসবের উত্তর তিনি দিতে পারছেন না। দিতে পারছেন না তার ভাইয়েদের হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির, এমনকি দিল্লির ফাইভ স্টার হোটেলে ভাইপোর ১১কোটি টাকার বিয়ের। স্বৈরাচার শেষ বিচারে দুর্নীতির উৎস। এবং দুর্নীতি এক জায়গায় দাঁডিয়ে থাকে না—তা প্রসারিত হয়। পাঁচ বছরে এই রাজ্য সৎ মানুষদের জেলখানা এবং চোরেদের মুক্তরাজ্যে পরিণত হয়েছে। দল, নেতা, নেত্রী, প্রশাসনের একটা অংশ সবাই এ পথের যাত্রী। যদি উনি জিতে চান এই রাজত্ব প্রসারিত হবে, কারণ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাও তিনি বি জে পি-র সাথে সমঝোতা করে ম্যানেজ করে নিয়েছেন।

মেগালোম্যানিয়াকের স্বাভাবিক চরিত্র সে আইন মানে না, আইনের প্রতিষ্ঠান মানে না, নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করে। কিন্তু এখন মমতা ব্যানার্জির কাছে এটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য না, তার আত্মরক্ষার এক মাত্র পথ। নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে তার রাগ ফুটে বেরোচ্ছে প্রতিটি বক্তৃতায়। আদালত সম্পর্কে তার প্রকাশ্য অবজ্ঞা তো আমরা গত পাঁচ বছর ধরে দেখছি। কাজেই শেষ চেষ্টা তিনি করবেন যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে। তিনি একটি পথই জানেন তা হলো লুট। এবারে এটা করবার মতো সাহস তিনি অর্জন করতে পারবেন কি না এটাই প্রশ্ন। এবারই প্রথম তিনি ভয় পেয়েছেন। কাজটা তার পক্ষে কঠিন। তিনি জানেন সব কিছু তিনি ম্যানেজ করতে পারবেন, পারবেন না বাংলার মানুষকে ম্যানেজ করতে।

মেগালোম্যানিয়াকদের শেষ যখন আসে তারা থাকে একা। সম্রাট নিরোর সাথে ছিল তার সঙ্গিনী। বার্লিনের মাটির নিচের বাংকারে হিটলারের সাথে একমাত্র ছিল ৪০মিনিট আগে যাকে বিয়ে করেছিলেন সেই এভা ব্রাউন। মুসোলিনীকে ধরে ফেলেছিল মিলানের পার্টিজান সৈনিকরা, তাকে মেরে ওরা ঝুলিয়ে দিয়েছিল ল্যাম্পপোস্টে। মিলানের শ্রমিক মহল্লা থেকে দল বেঁধে এসেছিল না খেতে পাওয়া হার জিরজিরে মেয়েরা, ঝুলন্ত দেহটাতে থুতু দিতে।

আমাদের মেগালোম্যানিয়াকও ক্রমশ একা হয়ে আসছেন। ২০১১-তে তাঁর সাথে ছিল সবাই। বামপন্থীরা ছিল একা। ৫বছর পর তার কেউ নেই। সবাই তার বিরুদ্ধে। উনি একা হয়ে আসছেন। মেগালোম্যানিয়াকের শেষ সময় ঘড়ির কাঁটার সাথে ক্রমশ এগিয়ে আসছে।-- 

সংখ্যালঘু উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার হিসেবই নেই

বরাদ্দ টাকায় কী কাজ হলো, কে করলো
জানাতে পারছে না মমতার সরকার

সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ টাকায় কী কাজ হয়েছে? কোন সংস্থা কাজ করেছে? মমতা ব্যানার্জির সরকার জানাতে পারেনি। এই প্রশ্ন তুলেছে সি আই টি ইউ। 

আর প্রশ্ন উঠেছে সংখ্যালঘুদের জন্য পরিচালিত মাল্টি সেক্টোরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামস (এম এস ডি পি) নিয়ে। প্রথম ইউ পি এ সরকারের সময়কালে চালু এই প্রকল্পে দেশের প্রায় ৯০টি সংখ্যালঘু নিবিড় জেলায় নানা পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজে টাকা বরাদ্দ করা হয়। রাজ্যে এমন ১২টি জেলা আছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে এম এস ডি পি-র টাকা খরচে কিংবা তাতে হওয়া কাজের নিরিখে পশ্চিমবঙ্গে একাধিকবার প্রথম হয়েছিল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের সময়কালে ওই প্রকল্পের কাজ নিয়ে বেশ কয়েকটি জেলায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। ঠিকমতো কাজ হচ্ছে না, বরাদ্দ টাকা খরচ হচ্ছে না — এমন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, হাজার কোটি টাকা খরচের কোনো হিসেবই নেই। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি স্বয়ং রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী। তবু অভিযোগের বহর বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে আর টি আই আইনে রাজ্য সরকারের কাছে এই বিষয়ে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল। কিন্তু কোনও জবাব পাওয়া যায়নি। বুধবার সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সভাপতি শ্যামল চক্রবর্তী এক সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, আমরা রাজ্য সরকারের কাছে ফাইল নম্বর ও তারিখ ধরে জানতে চেয়েছি যে ওই টাকা কীভাবে খরচ হয়েছে। ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত সমস্ত তথ্য রয়েছে। এ কাজের জন্য কোন্‌ কোন্‌ নোডাল এজেন্সি কাজ করেছে তার বিস্তারিত তথ্য আমরা চেয়েছি। কিন্তু সরকারের তরফে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। আদৌ তার কোনো হিসেব আছে কিনা বলুক সরকার। অবিলম্বে এই সমস্ত তথ্য দেওয়া হোক বলে দাবি করেন শ্যামল চক্রবর্তী।

শুধু তাই নয়, রাজ্য সরকারের অপদার্থতায় ফ্রি কোচিং থেকেও বঞ্চিত তফসিলি ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা। এদিন শ্রমিক ভবনে শ্যামল চক্রবর্তীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে বলেন অমিতাভ চৌধুরি। তিনি এই আর টি আই করেছেন রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে। আর টি আই তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে উত্তর দিনাজপুরে ২০১১- ১২ সাল থেকে ২০১৪-১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। একইভাবে মুর্শিদাবাদে প্রায় ২১৫ কোটি, নদীয়ায় ৮০ কোটি, উত্তর চব্বিশ পরগনায় ৭২ কোটি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় ১২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া মালদহে ১০৯ কোটি, কলকাতায় প্রায় ২৩ কোটি, হাওড়া ২৬ কোটি, বীরভূমে ৭৯ কোটি, কোচবিহার ৪২ কোটি, বর্ধমান ৪৯ কোটি, দক্ষিণ দিনাজপুর ৫১ কোটি টাকা গত ৪ বছরে পেয়েছে। এই টাকার সমস্ত হিসাব দিতে হবে, জানাতে হবে সংখ্যালঘুদের জন্য কীভাবে তা খরচ হয়েছে।

এছাড়াও তফশিলি ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নিখরচায় পড়ার সুযোগ চালু রয়েছে। কিন্তু রাজ্যের অপদার্থতায় তা ব্যাহত হয়েছে বলে জানান শ্যামল চক্রবর্তী। ফলে বহু ছাত্রই কেন্দ্রের ফ্রি কোচিং-এর সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কেন্দ্রের সামাজিক ন্যায় বিচার দপ্তরের প্রকল্প- নিখরচায় চাকরির পরীক্ষার জন্য তফসিলি ও আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। বিধানসভা ভিত্তিক জনসংখ্যার সংরক্ষণ অনুযায়ী তা চূড়ান্ত হয়। রাজ্যের ক্ষেত্রে জেলাগুলিতে সরকার সেই প্রস্তাব পাঠায়নি বলে অভিযোগ। এর ফলে বহু ছাত্রছাত্রী এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। রাজ্য সরকারকে এর জবাব দিতে হবে।

রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-র মার্চ থেকে ২০১৫-র ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্য সরকার এম এস ডি পি বাবদ প্রায় ১১৩৬ কোটি টাকা পেয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেই এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫৫৭ কোটি টাকার খরচের হিসাব (ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট) দিতে পারেনি। আর কাজের ক্ষেত্রেও নানা প্রশ্ন উঠছে। যেমন সাধারণ ক্লাসরুমের কথাই ধরা যেতে পারে। ২০০৮ থেকে শুরু হয়েছে এম এস ডি পি। ২০০৮-২০১১-র মার্চ, এই সময়ে রাজ্যের সংখ্যালঘু নিবিড় এলাকার স্কুলগুলিতে অতিরিক্ত ৬৫৬৫টি ক্লাসরুম তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল বামফ্রন্ট। ২০১১-র মার্চের মধ্যে কাজ শেষ হয়েছিল ৬৯২৭টির কাজ। অর্থাৎ প্রায় একশো শতাংশ কাজই শেষ হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০১২-র মার্চ থেকে এখনও পর্যন্ত ৫৫৩১টি অতিরিক্ত ক্লাসরুমের অনুমোদন পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। হয়েছে ২৫৬২টি — পঞ্চাশ শতাংশের কাছাকাছি। বাকিগুলি কেন হলো না? কে কাজ করছিল? তার জবাবই চাওয়া হচ্ছে সরকারের কাছে।

আর একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে পলিটেকনিক কলেজ তৈরির কাজ। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে সংখ্যালঘু নিবিড় এলাকায় ৩টি পলিটেকনিক তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল। ২০১১-র মার্চ পর্যন্ত ২টি পলিটেকনিকের কাজ চলছিল। ১টির কাজ শুরু করা যায়নি। আর মমতা ব্যানার্জির সরকার গত সাড়ে চার বছরে আরও ৬টি পলিটেকনিক কলেজ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রকে। কেন্দ্রীয় সরকার তাতে সবুজ সংকেত দিয়েছে, টাকাও অনুমোদন করেছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ‘শেষ হয়েছে’ সেই ২টিরই!

সংখ্যালঘুদের জন্য নতুন স্কুল তৈরির কাজও বিশেষ কিছুই হয়নি তৃণমূল কংগ্রেসের সময়কালে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে ৪১টি স্কুল বানানোর অনুমোদন মিলেছিল। তারমধ্যে ৩৫টির কাজ শেষ হয়েছিল। ৭টির কাজ চলছিল। আর গত সাড়ে চার বছরে আরও ৬৭টি স্কুল তৈরির অনুমোদন পেয়েছিল সরকার। কিন্তু কাজ শেষ হয়েছে ৫টির।
অর্থাৎ বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে শুরু হওয়া ৭টি স্কুলের কাজও শেষ করতে পারেনি বর্তমান সরকার। এমন নানা অসঙ্গতির কারণেই সি আই টি ইউ-র পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরকার জবাব দেয়নি।

৬ই এপ্রিল, গণশক্তি