20161017

‘‘মধ্যপথেই রুখে দিতে হবে ফ্যাসিস্তধর্মী শক্তির কর্মসূচি’’: সাক্ষাৎকারে বললেন সীতারাম ইয়েচুরি


ধর্মনিরপেক্ষতা-গণতন্ত্রের বিপদকে লড়াই করেই রুখে দিতে হবে
দেশে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিপদ বাড়ছেসেই বিপদে মদত দিচ্ছে বি জে পির সরকার। ধর্মনিরপেক্ষতাগণতান্ত্রিক কাঠামো আক্রান্ত হচ্ছে। কেন্দ্রের সরকার খোলাখুলি ধনীদের স্বার্থে কাজ করছে। গণশক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বললেন সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। নয়াদিল্লিতে এই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গণশক্তির প্রতিনিধি।

১২ই সেপ্টেম্বর গত আড়াই বছরে আমরা যে ট্রেলারদেখেছি, তারপরে আর এস এস-র নেতৃত্বে পূর্ণ বিকশিত ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের ভয়ংকর, অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপদকে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না। যে কোনো মূল্যে এই বিপদকে মধ্যপথেই বাধা দিতে হবে, প্রতিহত করতে হবে। সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এ কথা বলেছেন। সোমবার গণশক্তি-র সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ইয়েচুরি বলেছেন, মেরুকরণকে তীব্র করার লক্ষ্যে সময়ে সময়ে নতুন বিষয় তোলা হচ্ছে। তথাকথিত লাভ জিহাদ, ঘর ওয়াপসি, জোর করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদি। এখন চলছে গোরক্ষার নামে হাঙ্গামা। ঈদ-উল-জোহা উৎসবের প্রাক্কালে সন্ত্রাসের বাতাবরণ তৈরি করতে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। জঘন্য মনোবৃত্তির এই ধরনের নানা বাহিনী ক্রমেই সামনে আসতে থাকবে। বি জে পি সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার বদলে মদতই দিচ্ছে।

ইয়েচুরি বলেছেন, মোদী সরকারের নীতি প্রকটভাবেই ধনীমুখী, কর্পোরেটমুখী, বিদেশি পুঁজির প্রতি পক্ষপাতমুখী। চলছে ধান্দার ধনতন্ত্রের দাপাদাপি। আড়াই বছরে আমাদের সংবিধানের চার স্তম্ভধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাদুর্বল হয়েছে।

ইয়েচুরি বলেছেন, আর এস এস-র কর্মসূচি হলো ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র থেকে খোলাখুলি অসহিষ্ণু ফ্যাসিস্ত ধাঁচের হিন্দু রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। এই লক্ষ্য পূরণে আর এস এস ধারাবাহিকভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর এস এস যদি সফল হয় তাহলে গুণগতভাবে পৃথক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। কিন্তু বামপন্থীদের দেখতে হবে যাতে ওই পরিস্থিতি বাস্তবায়িত না হয়। প্রস্তুতিপর্বেই মুখোমুখি, ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করে রুখে দিতে হবে ওই বিপদের আশঙ্কাকে।

সাক্ষাৎকারের পূর্ণাঙ্গ বয়ান: 

গণশক্তি: জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি জয়ী হয়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এই পথেই কি লড়াই হবে

ইয়েচুরি: হ্যাঁ, খুবই তাৎপর্যপূর্ণ জয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ হচ্ছিল, এই প্রতিষ্ঠানের প্রগতিশীল চরিত্রের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার আক্রমণ নামিয়ে এনেছে। এই প্রেক্ষাপটে এই জয় খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। যদিও বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির ঐক্য আরো শক্তিশালী হতে পারত। এতদসত্ত্বেও জে এন ইউ-র ছাত্ররা আর এস এস-বি জে পির মতাদর্শগত কর্মসূচী, সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে জোরের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে, সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এ বি ভি পি-কে কোণঠাসা করে দিয়েছে।

দেশের কথা যদি বলা যায়, সাম্প্রদায়িক বিপদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নিশ্চয়ই বামপন্থী ঐক্য প্রথম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভারতের জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য জে এন ইউ-র ছাত্রদের মতো নয়। সি পি আই (এম)-র ২১তম কংগ্রেসে বলা হয়েছিল, ভারতীয় জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যকে বামপন্থীদের পক্ষে পরিবর্তন করতে হলে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের জোরই নির্ণায়ক উপাদান। মোদী সরকারের সার্বিক আক্রমণের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম গড়ে তুলেই এই ঐক্য অর্জন সম্ভব। সমস্ত জনবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপরে, দেশের ঐক্য-সংহতির ওপরে আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বামপন্থীরা তেমন সমস্ত শক্তিকে সমবেত করার চেষ্টা করবে যারা এই পদক্ষেপগুলির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। জনগণের সংগ্রামকে শক্তিশালী করেই বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে শক্তিশালী করা যাবে। 

গণশক্তি: কাশ্মীর জ্বলছে। সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের সফর, ফিরে এসে সর্বসম্মত প্রস্তাবের পরেও কাশ্মীর উপত্যকায় অশান্তি চলছেই। এই একটানা অশান্তি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না কেন?

ইয়েচুরি: কাশ্মীরে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটে চলেছে। কাশ্মীরী যুবকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। অন্তত চার জেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। সর্বদলীয় প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে সমস্ত অংশেরসঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনা শুরুর জন্য আবেদন জানানো হয়েছে। এখনও তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যতক্ষণ পর্যন্ত তা না হচ্ছে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরা খুব কঠিন। দুঃখজনক হলো সরকার এখনও কাশ্মীর সমস্যাকে দেখছে সীমান্তের ওপার থেকে পাকিস্তানের মদতপ্রাপ্ত এবং তাদের তৈরি করা আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে। কাশ্মীরে পাকিস্তানের যোগাযোগ সকলেই জানে, ভারতের রাজনৈতিক মহলের সব অংশই তার নিন্দা করেছে, সরকারকে তা প্রতিহত করার জন্য বারংবার বলেওছে। কিন্তু সমস্ত অংশের সঙ্গে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ছাড়া কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

সি পি আই (এম) দুপথে চলার প্রস্তাব দিয়েছে। একদিকে, ভারতে সংশ্লিষ্ট সব অংশের সঙ্গে শর্তহীন ভাবে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু করো। একই সঙ্গে আমরা বলেছি, আসন্ন সার্ক শীর্ষ বৈঠককে ভারত-পাক আলোচনা পুনরায় শুরুর জন্য প্রধানমন্ত্রী ব্যবহার করুন।

অন্যদিকে, আস্থাবর্ধক কিছু পদক্ষেপ এখনই ঘোষণা করা দরকার। যেমন, পেলেট বন্দুক ব্যবহার বন্ধ করা, যে সমস্ত পরিবারের সন্তানরা মারা গেছে তাদের এবং আহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের অভিযোগের যথাযথ বিচার ও দোষীদের শাস্তি, অসামরিক এলাকা থেকে আফস্পা প্রত্যাহার করা, কাশ্মীরী যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের কর্মসূচি অবিলম্বে শুরু করা। এইভাবে দুপথেই যদি আন্তরিকভাবে এগোনো না যায় গোটা দেশকেই মূল্য দিতে হবে, ভারতের ঐক্য-সংহতির পক্ষে ক্ষতিকারক হবে।

গণশক্তি: কিন্তু সরকারের কোনো আগ্রহ আছে বলে তো মনে হচ্ছে না। কেন?

ইয়েচুরি: সরকার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিচ্ছে না। তবে মনে হয়, আর এস এস-র রাজনৈতিক শাখা বি জে পি-র সরকার সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করতেই আগ্রহী। আর এস এস-র মতাদর্শগত কর্মসূচি হলো ভারতকে অসহিষ্ণু ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের হিন্দু রাষ্ট্রেরূপান্তরিত করা। বি জে পি সরকার তাকেই এগিয়ে নিতে চায়। তাছাড়া, সামনেই উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন। বি জে পি হয়তো ভাবছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ যত বেশি হবে উত্তর প্রদেশ এবং দেশের অন্যত্র তত বেশি নির্বাচনী ফায়দা তুলতে পারবে বি জে পি।

গণশক্তি: বি জে পি সরকার আর কী কী ভাবে আর এস এস-র মতাদর্শগত কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার কাজ করছে?

ইয়েচুরি: নানা ভাবে। সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করার লক্ষ্যে সময়ে সময়ে নতুন বিষয় তোলা হচ্ছে। তথাকথিত লাভ জিহাদ, ঘর ওয়াপসি, জোর করে ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদি। এখন চলছে গোরক্ষার নামে হাঙ্গামা। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে গোরক্ষক সমিতি বানানো হয়েছে, এই ঝটিকা বাহিনী গোরু রক্ষা এবং আইন প্রয়োগ করছে বলে নিজেরা দাবি করছে। নির্বিচারে সংখ্যালঘু এবং দলিতদের ভয় দেখানো হচ্ছে। গোহত্যার মিথ্যা অভিযোগ তুলে মহম্মদ আখলাক, বা ঝাড়খণ্ডের লাতেহারে দুই যুবককে খুন করা হয়েছে। গুজরাটের উনায় দলিতদের ওপরে নৃশংস আক্রমণ হয়েছে। পরপর এই আক্রমণের সর্বশেষটি ঘটেছে হরিয়ানার মেওয়াটে। মুসলিম-নিবিড় এই জেলায় গোমাংস রাখার অভিযোগ তুলে দুই তরুণীকে দলবদ্ধ ভাবে ধর্ষণ করা হয়েছে, এক দম্পতি খুন হয়েছেন। গোমাংস আছে কিনা তা তল্লাশি করতেবিরিয়ানির নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। ঈদ-উল-জোহা, যা সাধারণভাবে বকরি-ঈদ বলে পরিচিত সেখানে চিরাচরিত খাদ্যই হলো বিরিয়ানি। ঠিক এই উৎসবের প্রাক্কালে গোটা সম্প্রদায়কে সন্ত্রস্ত করে তোলা চলতি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের পদ্ধতি।

এই গোরক্ষক বাহিনীর সন্ত্রাসের কায়দার সঙ্গে জার্মানিতে হিটলার এবং ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ত ঝটিকা বাহিনীর কায়দার মিল শিউরে ওঠার মতোই।

অনেক বি জে পি রাজ্য সরকার বা অন্য রাজ্য সরকার গোরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করেছে। তা প্রয়োগের দায়িত্ব রাজ্যের আইনরক্ষকদের। স্বঘোষিত পাহারাদাররা এ কাজ করতে পারে না। সরকারি মদতপ্রাপ্ত এইসব গোরক্ষক বাহিনীকে অবিলম্বে আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে।

পোশাক, আচরণ ইত্যাদি নিয়ে মহিলাদের ভয় দেখিয়ে বেড়ানো বাহিনী আমরা দেখেছি। জঘন্য মনোবৃত্তির এই ধরনের নানা বাহিনী ক্রমেই সামনে আসতে থাকবে। বি জে পি সরকার এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার বদলে মদতই দিচ্ছে।

গণশক্তি: নরেন্দ্র মোদী নির্বাচনে জিতেছিলেন আচ্ছে দিন’, পাঁচ বছরে ১০কোটি কর্মসংস্থানের মতো স্লোগান দিয়ে। মুখে সংস্কারের কথাও তো বলা হচ্ছে। তাহলে এই ধরনের ঘটনা দেশে ঘটছে কেন?

ইয়েচুরি: অর্থনৈতিক বোঝার ভারে ধুঁকতে থাকা জনগণের মধ্যে মিথ্যা আশার জাল বুনে নির্বাচনী সমর্থন লাভের লক্ষ্যে ওই স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। প্রতিশ্রুতির ওইটুকুই অর্থ।

দ্বিতীয়ত, এই সরকারের নীতি প্রকট ভাবেই ধনী-মুখী, কর্পোরেট-মুখী, বিদেশি পুঁজির প্রতি পক্ষপাত-মুখী। এই সরকার জনমুখী বা দরিদ্র মানুষের স্বার্থে নীতি রূপায়ণ করতে অন্তর্নিহিত ভাবেই অক্ষম। এখন আমরা দেখছি ধান্দার ধনতন্ত্রের দাপাদাপি। কর্পোরেট ও ধনীরা কার্যত সম্পদ লুটের মহোৎসব করছে। গত দুবছরেই প্রতি বছর ৫.৫লক্ষ কোটি টাকা কর ছাড় দেওয়া হয়েছে, কর্পোরেট ঋণখেলাপিদের ১.১২লক্ষ কোটি টাকার ঋণ মকুব করা হয়েছে। অথচ যে ভারতীয় কৃষকরা কয়েক হাজার টাকার ঋণ শোধ করতে না পেরে আত্মহত্যা করছেন তাঁদের ঋণ মকুব করা হচ্ছে না, তাঁদের ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা হচ্ছে না। আমরা দেখছি শিল্পে মন্দা, ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে অবনতি, ২০১৫-তে মাত্র ১.৩৫লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ( যদিও বছরে প্রয়োজন ১.৩কোটি এবং প্রতিশ্রুতির বহর হলো ২কোটি), রেগা, গণবণ্টনের মতো সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে বিপুল ছাঁটাই। এক কথায় ধনীদের আরো সম্পদবৃদ্ধি, গরিবরা আরো দরিদ্র হচ্ছেন।

এইসব বাস্তবতা আড়াল করতে তথ্যে কারচুপি হচ্ছে, অর্থনৈতিক বিকাশের উঁচু হার দেখানোর চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ ঘটনা হলো দারিদ্র্যকে পুরো উধাও করে দেওয়া হবে! প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের নীতি আয়োগ বলছে ভারতে দারিদ্র্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতেই তারা অক্ষম!

গণশক্তি: নরেন্দ্র মোদীর সরকার মেয়াদের প্রায় অর্ধেক পেরিয়ে এসেছেআপনার মূল্যায়ন কী?

ইয়েচুরি: এই আড়াই বছরে মোদী সরকার দেশে খুব উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে যা আমাদের সাধারণতন্ত্রের গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে যেতে পারে। সংক্ষেপে বললে এই সরকারের চার মুখএক, আর এস এস-র কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক কর্মসূচি। দুই, জনবিরোধী অর্থনৈতিক নীতি যা দুই ভারতের ব্যবধানকে আরো চওড়া করছে, পুরোপুরি আন্তর্জাতিক ও দেশিয় কর্পোরেট ও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থে কাজ করছে। তিন, ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারী প্রবণতা যা প্রতিফলিত হয়েছে অরুণাচল প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের নির্বাচিত সরকারকে ফেলে দেওয়া বা সংসদীয় রীতিনীতি সহ সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে খর্ব করার চেষ্টার মধ্যে দিয়ে। চার, ভারতকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব রণনীতি, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের ছোট শরিকে পরিণত করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও মার্কিন রাষ্ট্রপতি ওবামার সর্বশেষ যৌথ বিবৃতিতে যা স্পষ্টভাবেই উচ্চারিত হয়েছে।

এই আড়াই বছরে আমাদের সংবিধানের চার স্তম্ভধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাদুর্বল হয়েছে।

গণশক্তি: অতীতে ৬ বছর বি জে পি নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন সরকার দেখেছি আমরা। এই বি জে পি সরকার সেই সরকারগুলি থেকে কীভাবে পৃথক?

ইয়েচুরি: হ্যাঁ, বাজপেয়ীর প্রধানমন্ত্রিত্বে বি জে পি-নেতৃত্বাধীন এন ডি এ কোয়ালিশন সরকার ছিলো ১৯৯৮-২০০৪পর্বে। কিন্তু এই দুই সরকারের মধ্যে গুরুতর পার্থক্য রয়েছে। তখন বি জে পি-র একক গরিষ্ঠতা ছিলো না, কোয়ালিশন সরকার চলছিল, ‘কোয়ালিশনের বাধ্যবাধকতায়বি জে পি কট্টর হিন্দুত্বের অ্যাজেন্ডাকে তাকে তুলে রাখতে বাধ্য হয়েছিল। অযোধ্যার বিতর্কিত স্থানে রামমন্দির, জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০নং ধারা বাতিল, অভিন্ন দেওয়ানি বিধিকে পিছনে সরিয়ে রাখা হয়েছিল। মোদী সরকারের ক্ষেত্রে বি জে পি-র লোকসভায় গরিষ্ঠতা আছে। সুতরাং তারা আর এস এস-র ফ্যাসিস্তধর্মী কর্মসূচি খোলাখুলি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

আর এস এস-র ফ্যাসিস্তধর্মী কর্মসূচি সম্পর্কে সি পি আই (এম)-র সময়োপযোগী কর্মসূচিতে বলা হয়েছে: ‘‘সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিস্ত ধাঁচের আর এস এস পরিচালিত জোটের শক্তিবৃদ্ধি ও কেন্দ্রে তাদের ক্ষমতা দখলের ফলে ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির বিপদ গুরুতর হয়ে দাঁড়িয়েছে’’ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থা এবং জাতীয় ঐক্যের ক্ষেত্রে এই প্রবণতার বিপদের কথা বলতে গিয়ে কর্মসূচিতে বলা হয়েছে: ‘‘ বি জে পি ও তাদের সাম্প্রদায়িক মঞ্চের প্রতি বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণির কোনো কোনো অংশের সমর্থন দেশের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে গুরুতর বিপদের আশঙ্কা তৈরি করেছে’‘(পরিচ্ছেদ ৫.৭)

কর্মসূচিতে আরো বলা হয়েছে, ‘‘ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উপর ভর করে যে ফ্যাসিস্ত প্রবণতা বিস্তার লাভ করছে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সর্বস্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই চালাতে হবে’’(পরিচ্ছেদ ৫.৮)।

পার্টি কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, ‘‘ বিভেদকামী ও সাম্প্রদায়িক মঞ্চের ভারতীয় জনতা পার্টি একটি প্রতিক্রিয়াশীল দল। তাদের প্রতিক্রিয়াশীল মর্মবস্তুর ভিত্তি হলো অন্যান্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী জাত্যাভিমান। বি জে পি কোনো সাধারণ বুর্জোয়া দল নয় কেননা ফ্যাসিস্ত ধাঁচের রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তাদের পরিচালনা করে, আধিপত্য করে। বি জে পি ক্ষমতায় আসায় রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন সংস্থায় প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে আর এস এস। হিন্দুত্ব মতাদর্শ পুনরুত্থানবাদকে মদত দেয়, হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতের মিশ্র সংস্কৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে... সেইসঙ্গে বৃহৎ বাণিজ্য ও জমিদারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদ বি জে পি-কে সর্বাত্মক সমর্থন দিচ্ছে’’ (পরিচ্ছেদ ৭.১৪)।

এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই আদবানির কুখ্যাত রথযাত্রার সময় থেকে আমি বলে থাকি, লিখেও থাকি যে আর এস এস-র কর্মসূচি হলো ভারতকে সাংবিধানিক ভাবে ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র থেকে খোলাখুলি অসহিষ্ণু ফ্যাসিস্ত ধাঁচের হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তরিত করা। এই লক্ষ্য পূরণে আর এস এস দৃঢ়ভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির বিচার করে এ বছরের জুনে ত্রিচূড়ে ই এম এস স্মৃতির উদ্বোধনী ভাষণে আমি বলেছিলাম, ‘‘ আর এস এস যদি সফল হয় তাহলে গুণগত ভাবে পৃথক পরিস্থিতির উদ্ভব হবে। বিপ্লবী শক্তিকে দেখতে হবে যাতে ওই পরিস্থিতি বাস্তবায়িত না হয়।’’ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে তাঁর রিপোর্টে জর্জি ডিমিট্রভ বলেছিলেন, ‘‘ ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগে বুর্জোয়া সরকারগুলি অনেকগুলি প্রাথমিক স্তরের মধ্যে দিয়ে যায়, অনেকগুলি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা চালু করে যা ফ্যাসিবাদকে সরাসরি ক্ষমতা দখলে সাহায্য করে। এই প্রস্তুতির স্তরে বুর্জোয়াদের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাগুলির বিরুদ্ধে এবং ফ্যাসিবাদের বিকাশের মোকাবিলায় যারা লড়াই চালায় না তারা ফ্যাসিবাদের বিজয় অর্জন প্রতিহত করার অবস্থায় থাকে না, বরং বিপরীতে সেই বিজয়কেই সাহায্য করে’’

মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মতো কেন্দ্র কিছু শক্তিকে পেয়েছে যারা পরোক্ষ ভাবে আর এস এস-র সঙ্গেই চলে, পরিকল্পনামাফিক গণতান্ত্রিক শক্তিকে দুর্বল করতে তৎপর। আজকের প্রকৃত বাস্তবতার জমিতে পা রেখে চলা যে কোনো সচেতন মানুষই দেখতে পাবেন কোন অভিমুখে ভারত চলেছে যদি না এই বিপদকে মুখোমুখি এবং ঐক্যবদ্ধ ভাবে মোকাবিলা করা যায়। যদি আমরা এই আক্রমণের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে না লড়াই চালাই ১৯৫০-র পর থেকে ভারতের যেটুকু অগ্রগতি ঘটেছে তা-ও খর্ব হবে। গত আড়াই বছরে আমরা যে ট্রেলারদেখেছি, তার পরে আর এস এস-র নেতৃত্বে পূর্ণ বিকশিত ফ্যাসিস্ত রাষ্ট্রের ভয়ংকর, অন্ধকারাচ্ছন্ন বিপদকে কোনো ভাবেই প্রতিষ্ঠিত হতে দেওয়া যায় না। যে কোনো মূল্যে এই বিপদকে মধ্যপথেই বাধা দিতে হবে, প্রতিহত করতে হবে। এই বিপদের বিরুদ্ধে লড়াই করা আমাদের অঙ্গীকার, আমাদের প্রতিজ্ঞা।

গণশক্তি, ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০১৬

‘জন্মভূমি আজ’

বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

‘‘একবার মাটির দিকে তাকাও
একবার মানুষের দিকে।
এখনো রাত শেষ হয় নি;
অন্ধকার এখনো তোমার বুকের ওপর
কঠিণ পাথরের মত, তুমি নি:শ্বাস নিতে পারছ না।
মাথার ওপর একটা ভয়ঙ্কর কালো আকাশ
এখনো বাঘের মত থাবা উঁচিয়ে বসে আছে।
তুমি যেভাবে পারো এই পাথরটাকে সরিয়ে দাও
আর আকাশের ভয়ঙ্করকে শান্ত গলায় এই কথাটা জানিয়ে দাও
তুমি ভয় পাও নি।
মাটি তো আগুনের মত হবেই
যদি তুমি ফসল ফলাতে না জানো
যদি তুমি বৃষ্টি আনার মন্ত্র ভুলে যাও
তোমার স্বদেশ তাহলে মরুভূমি।
যে মানুষ গান গাইতে জানে না
যখন প্রলয় আসে, সে বোবা ও অন্ধ হয়ে যায়।
তুমি মাটির দিকে তাকাও, সে প্রতীক্ষা করছে,
তুমি মানুষের হাত ধরো, সে কিছু বলতে চায়।’’


পার্টির সাংগঠনিক রাজ্য প্লেনাম সম্পর্কে

ডা: সূর্যকান্ত মিশ্র
গত ২৭-৩১শে ডিসেম্বর ২০১৫, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সংগঠন সম্পর্কে কেন্দ্রীয় প্লেনাম কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলকাতা প্লেনামের নির্দেশগুলি কার্যকর করার জন্য রাজ্যগুলিকে বার্ষিক পরিকল্পনা রচনার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা-সহ চারটি রাজ্যে নির্বাচনের কারণে এই রাজ্যগুলিকে বাড়তি সময় দেওয়া হয়েছে। তদনুযায়ী পার্টির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ৩০শে সেপ্টেম্বর ও ১লা অক্টোবর রাজ্য প্লেনাম সংগঠিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। অবশ্য তার আগে রাজ্য কমিটি যে খসড়া রিপোর্ট পেশ করে তা জেলা কমিটিগুলিতে আলোচনা ও সংযোজনী, সংশোধনী ইত্যাদির ভিত্তিতে রাজ্য প্লেনামের জন্য খসড়া রিপোর্ট প্রস্তুত করা হয়েছে। এই প্লেনামে রাজ্য কমিটির সদস্য ছাড়াও জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সকল সদস্য ও বিভিন্ন গণ-ফ্রন্টের রাজ্য স্তরের নেতৃত্ব অংশগ্রহণ করবেন। প্লেনামে আলোচনায় অংশগ্রহণ করা ছাড়াও তাঁদের সংশোধনী, সংযোজনী, প্রস্তাব, পরামর্শ ইত্যাদি অধিকার থাকবে। এছাড়া প্লেনামে পার্টি সংগঠন, আন্দোলন সংগ্রাম ও নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষ উদযাপন সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলিও চূড়ান্ত করা হবে। রাজ্যের বিশেষ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আগামীদিনে আন্দোলন সংগ্রাম ও সংগঠন সম্পর্কে কলকাতা প্লেনামের নির্দেশগুলি বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক রূপরেখা ও তার চেক-আপ সুনিশ্চিত করাই হল রাজ্য প্লেনামের মূল কাজ।

কলকাতা প্লেনামের মূল আহ্বান ছিল গণ-লাইনের ওপর ভিত্তি করে ভারতীয় জনগণের একটি বিপ্লবী পার্টি গঠনের কাজ ত্বরান্বিত করা। পশ্চিমবাংলার বিশেষ পরিস্থিতিতে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। পৃথিবীজুড়ে ৮বছর ব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে দক্ষিণপন্থী ও ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলির উত্থানের বিপরীতে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ সংগঠিত হচ্ছে। আমাদের দেশে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, অখণ্ডতা ও স্বাধীন বিদেশনীতির ওপর আক্রমণ তীব্রতর হচ্ছে। বেকারী, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্পক্ষেত্রে সংকট-সহ মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত বহুগুণ বেড়েছে। উগ্র, হিন্দুত্ববাদী সঙ্ঘ পরিবারের ফ্যাসিস্ট কায়দায় আক্রমণ, কাশ্মীর পরিস্থিতি, সীমান্তে উত্তেজনা ও যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের অপচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য হল জনজীবনে জ্বলন্ত সমস্যাগুলির বিরুদ্ধে গণ-সংগ্রামগুলিকে বিপথে পরিচালিত করা। বলাবাহুল্য, প্রথম এন ডি এ সরকারের তুলনায় দ্বিতীয় এন ডি এ সরকারে বিজেপি-র একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও আর এস এস-র নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাবৃদ্ধি স্বাধীনতার পরে এক নজিরবিহীন সংকটজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

আমাদের রাজ্যে দ্বিতীয় তৃণমূল সরকারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। ফ্যাসিস্টসুলভ আক্রমণ এখন চলতি বছরের মধ্যেই পশ্চিমবাংলাকে বিরোধীমুক্ত করার রূপ নিয়েছে। শিল্প-কৃষি-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সহ সমস্ত সামাজিক ও পরিষেবা ক্ষেত্রে সংকট গভীরতর হয়েছে। সারদা-নারদা-টেট-স্কুল সার্ভিস কমিশন, উড়ালপুল ভেঙে পড়ার কেলেঙ্কারি থেকে শুরু করে সিণ্ডিকেট রাজ ও তোলাবাজী দৌরাত্ম্য এখন শাসকদলের মধ্যেই দাঙ্গা ও খুনোখুনির রূপ নিয়েছে। এটা এখন স্পষ্ট সীমান্তের ওপার থেকে তাড়া খেয়ে জে এম বি-র সন্ত্রাসবাদীরা এখানে শাসকদল ও প্রশাসনের নিরাপদ আশ্রয় পেয়েছে। রাজ্যে আর এস এস-র কার্যকলাপও বহুগুণ বেড়েছে। এর অর্থ এই নয় রাজ্যে বা কেন্দ্রে ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়েছে। কিন্তু এতে সন্দেহ নেই জরুরী অবস্থার একনায়কত্বের তুলনায় বর্তমান সময়ের বিপদের আশঙ্কা অনেক গভীর। একে আগাম প্রতিহত করার মতো আন্দোলন সংগ্রাম ও সংগঠন গড়ে তোলাই বাম ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অগ্রবর্তী ঘাঁটি পশ্চিমবাংলার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। রাজ্য সাংগঠনিক প্লেনাম এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের জন্য সবরকম প্রস্তুতির আয়োজন করবে।

গণ-লাইন সম্পর্কে
একটি শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার রাজনৈতিক সাংগঠনিক লাইনের মুখ্য উপাদান হিসেবে পার্টি গণ-লাইনের ওপর প্রধান গুরুত্ব আরোপ করেছে। আমাদের পার্টির গঠনতন্ত্রের ১১/১(চ) নং ধারায় পার্টি সভ্যদের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছিল ‘‘নিষ্ঠা সহকারে জনগণের সেবা করতে হবে ও ধারাবাহিক জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধন দৃঢ় করে তুলতে হবে। জনগণের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং তাঁদের মতামত ও দাবিদাওয়া সম্পর্কে পার্টিকে অবহিত করতে হবে, অব্যাহতি না দেওয়া হলে প্রত্যেককেই পার্টির পরিচালনাধীনে কোনও না কোন গণসংগঠনে কাজ করতে হবে।’’ গণ-লাইনের অর্থ হল এই কথাগুলিকে গঠনতন্ত্রের যে কোনও একটা ধারা হিসেবে গণ্য না করে এখনকার মুখ্য কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
ভেঙে বললে যা দাঁড়ায়: প্রথমত, জনগণের সেবা করতে হবে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে তা করতে হবে। এর অর্থ তাঁদের কেবল সভা-সমাবেশে সমবেত করা নয়, দৈনন্দিন জীবনে তাঁদের সমস্যাগুলির নিরসনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করা। শাস্ত্রে যেরকম বলা আছে উৎসবে, ব্যসনে, দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে, শ্মশানে অর্থাৎ এককথায় মানুষের সুখে-দুঃখে সবসময় যে পাশে থাকে তাকেই বন্ধু বলে গণ্য করতে হবে। স্কুলে বা হাসপাতালে ভর্তি, রক্তদান, রেশন দোকান, একশো দিনের কাজ, ‘যুবশ্রী’, ‘কন্যাশ্রী’ ইত্যাদি ‘সুশ্রী-বিশ্রী’ যতরকম সমস্যা আসুক না কেন মানুষের সঙ্গে থেকেই কেবলমাত্র সেগুলির আংশিক সমাধানের মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা যায়। এছাড়া মনে রাখা দরকার পূর্বোক্ত শ্লোকের শুরু হচ্ছে ‘উৎসব’ শব্দটি দিয়ে। কেবল দুঃখ নয়, সুখেরও সাথী হতে হবে। কেবল পেটের ক্ষুধা নয়, মনের ক্ষুধাও মেটাতে হবে। তাই খেলাধূলা, সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড-সহ নানারকম জীবনমুখী সামাজিক অনুষ্ঠানে যুক্তিবাদ বিসর্জন না দিয়েই আমাদের অংশগ্রহণ করতে হবে। 
দ্বিতীয়ত, এই কাজ ধারাবাহিকভাবে করতে হয়। বছরে দু-একবার যাওয়া-আসার মধ্য দিয়ে ‘জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধন দৃঢ় করে’ তোলা যায় না। 
তৃতীয়ত, ‘জনগণের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে’। কেউ কেউ মনে করেন আমরা কেবল জনগণকে শিক্ষা দিতে পারি। অবশ্যই মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম সংগঠনে গুরুত্ব সম্পর্কে জনগণকে শিক্ষিত করে তোলা আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এইসব বিষয় সম্পর্কে আমাদের শিক্ষা প্রয়োগ ছাড়া অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রয়োগের অভিজ্ঞতায় শিক্ষা প্রতিদিন সমৃদ্ধ হয়। এবং সেই শিক্ষা জনগণের কাছ থেকেই অর্জন করতে হয়। তাঁদের কাছ থেকে আমরা জানতে পারি তাঁদের আশু সমস্যাগুলি কী? তা থেকে কোন কোন দাবি আংশিকভাবে হলেও আদায়ের সংগ্রাম গড়ে তোলা যায়। সেই সংগ্রামগুলি পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ ও আমরা উভয়েই শিক্ষা গ্রহণ করি। ছোট ছোট এরকম অসংখ্য সংগ্রামগুলিকে মূল দাবি আদায়ের সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত না করতে পারলে এক পা-ও এগোন সম্ভব নয়।
চতুর্থত, এইসব সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণের ‘মতামত ও দাবিদাওয়া সম্পর্কে পার্টিকে অবহিত করতে হবে’। প্লেনাম যাই সিদ্ধান্ত নিক না কেন, তার সঠিকতা বিচার হয় প্রয়োগের অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে। সেই জন্য পার্টিকে সিদ্ধান্ত করে জনগণের মধ্যে নিয়ে যেতে হয় এবং সে সম্পর্কে প্রয়োগে তাঁদের মতামত ও অভিজ্ঞতা পার্টিকে অবহিত করতে হয়। পার্টির কাজ হল এই আদানপ্রদানের প্রক্রিয়ায় বোঝাপড়ায় কোনো ভুল থাকলে তাকে সংশোধন করা। এটা ঠিক না ওটা ঠিক তা নিয়ে কেবল অন্তহীন তাত্ত্বিক বিতর্কের আশ্রয় না নিয়ে সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য জনগণের সঙ্গে অভিজ্ঞতার বিনিময়ই হল গণ-লাইনের মর্মবস্তু। 
পঞ্চমত, অব্যাহতি না দেওয়া হলে প্রত্যেককেই পার্টির পরিচালনাধীনে কোনও না কোন গণসংগঠনে কাজ করতে হবে। বলাবাহুল্য গণসংযোগ ও গণসংগ্রামগুলির মধ্য থেকেই গণসংগঠনগুলি গড়ে ওঠে ও শক্তিসঞ্চয় করে। এগুলিতে অংশগ্রহণ না করে কেউ পার্টি সদস্য হতে পারে না। পার্টি সদস্যরা পার্টির পরিচালনাধীনেই বিভিন্ন সংগঠনে কাজ করেন। কিন্তু তাঁরা ঐ সংগঠনের স্বাধীন গণতান্ত্রিক কর্মধারায় পার্টির তকমা লাগিয়ে অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। গণ-লাইনের সঠিক প্রয়োগের মধ্য দিয়েই গণসংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। জনগণের আস্থা ছাড়া যোগ্যতা অর্জন করা যায় না।

বিপ্লবী পার্টি সম্পর্কে
‘বিপ্লব’ কথাটি সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। এটা নিছক সরকার পরিবর্তনের ব্যাপার নয়। সমাজবিপ্লবই হল পৃথিবীর ইতিহাসে একটা সমাজব্যবস্থা থেকে উন্নততর সমাজব্যবস্থায় উত্তরণের চালিকাশক্তিভারতের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমাদের পার্টি ১৯৬৪সালে ভারতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রথম স্তর হিসেবে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচী গ্রহণ করেছিল। যা ২০০০সালে বিশ্ব ও জাতীয় পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সময়োপযোগী করা হয়। ইতিহাসের অভিজ্ঞতায় এটা বারংবার প্রমাণিত হয়েছে যে বৈপ্লবিক পরিস্থিতি ও বিপ্লব সমাধার জন্য বিপ্লবী পার্টি এই দুইয়ের মধ্যে কোনও একটা উপাদানে ঘাটতি থাকলে বিপ্লব সংগঠিত করা অসম্ভব। আমাদের দেশে শ্রেণী ও সামাজিক এই উভয়বিধ বৈষম্য থেকে মুক্ত একটা সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলাই হল পার্টির লক্ষ্য। শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত ও অবৃহৎ জাতীয় পুঁজিপতি অংশকে জনগণতান্ত্রিক মোর্চায় সংগঠিত করার লক্ষ্যে রণনীতিগত লক্ষ্যে আপাত রণকৌশলগত লাইন হিসেবে একবিংশতিতম পার্টি কংগ্রেস এই শ্রেণীগুলিকে বাম ও গণতান্ত্রিক মোর্চায় সমবেত করার পাশাপাশি বামপন্থীসহ সমস্ত গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির ব্যপকতম মঞ্চে সংগঠিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এই কর্তব্য সম্পাদনের জন্য কলকাতা প্লেনাম একটি শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ডাক দিয়েছে। একটা বিপ্লবী পার্টিতে নিষ্ক্রিয় ও অবাঞ্ছিত সদস্যদের কোন স্থান নেই। পার্টির বিপ্লবী চরিত্রের গুণগত মান পার্টির সংখ্যাগত বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ার পথে সব বাধাগুলি অতিক্রম করাই হল আসন্ন রাজ্য প্লেনামের অন্যতম মুখ্য আলোচ্য বিষয়। পার্টি সদস্য ও বিভিন্ন স্তরের নেতৃত্বের শ্রেণীগত সামাজিক বিন্যাস ও গড় বয়স পরিবর্তনের জন্য গণসংগ্রামের ময়দান থেকে বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদা পূরণের উপযোগী অগ্রগামী অংশকে অন্তর্ভুক্তির ওপরে অগ্রাধিকার আরোপ করবে। গ্রাম ও শহরের শ্রমজীবী অংশ, মহিলা আদিবাসী, তপসিলী, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য অনগ্রসর অংশের জনগণের মধ্য থেকে তরুণতর কর্মীদের নিয়ে আসা, মতাদর্শগত শিক্ষায় সমৃদ্ধ করা, রাজনৈতিক সাংগঠনিক নেতৃত্বদানে উপযোগী করে গড়ে তোলাই হল আমাদের সামনে প্রধান কাজ।
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি প্রকৃত অর্থে শেষপর্যন্ত জনগণই ইতিহাস রচনা করেনদলত্যাগী আত্মসমর্পণকারীরা ইতিহাস গড়ে না, তাদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। বিগত বিধানসভা নির্বাচনে যে ২কোটি ১৫লক্ষ মানুষ জীবন-জীবিকার ওপর সবরকম আক্রমণের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে তৃণমূল ও বিজেপি-র বিরুদ্ধে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন তাঁদের সমর্থনের ওপর ভিত্তি করে নতুন নতুন অংশকে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামে সমবেত করার ব্যপক সম্ভাবনা রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যেই নিহিত আছে। রাজ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনের জন্য সর্বব্যাপক গণসংগ্রাম গড়ে তোলার উপযোগী সাংগঠনিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে রাজ্যে সাংগঠনিক প্লেনামকে নতুন প্রত্যয়সিদ্ধ শপথ গ্রহণের মঞ্চ হিসেবে গড়ে তুলতে আমরা সক্ষম হব —এই আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে।
******

গণশক্তি, ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৬

অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে আমাদের পার্টিই

ডা: সূর্যকান্ত মিশ্র

গত এক বছরের মধ্যে দুনিয়া, দেশ ও রাজ্যের পরিস্থিতিতে অনেক নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। এরমধ্যে একটা সাধারণ ও অতি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো এই তিন ক্ষেত্রেই দক্ষিণপন্থার উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী সঙ্কটের আট বছর পরেও সেই সঙ্কট থেকে উদ্ধারের কোনো লক্ষ্মণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দেখা যাচ্ছে, বিংশ শতাব্দীর তিনের দশকের মহামন্দা থেকে এবারের মন্দা পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সেই মন্দা পরিস্থিতি চার বছর ধরে চলেছিল। এবার আট বছর পরেও সেই লক্ষ্মণ তো দেখাই যাচ্ছে না, উলটে আবার নতুন করে আরেকটা মন্দার সম্ভাবনাই প্রবলতর হচ্ছে। খোদ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ (আমাদের দেশের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতো) সহ সভাপতি স্ট্যানলি ফিসার সেখানকার অর্থনীতির হার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাঁর কথায়, ১৯৭৯ সালের পরে অর্থনীতিতে এটাই সবচেয়ে খারাপ সময়। গত তিন মাসেই উৎপাদনের সবচেয়ে খারাপ রেকর্ড দেখা যাচ্ছে। ১৯৪৯ সাল থেকে ২০০৫ সালের তুলনায় ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের সময়কালে উৎপাদনশীলতার হার ১.২৫ শতাংশ কমেছে। তাঁর মতে, যদি এমন চলতে থাকে তাহলে কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত মজুরির ওপরে এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। বিনিয়োগ কমছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের গতি শ্লথ হয়েছে, সরকারী ও বেসরকারী উভয় ক্ষেত্রেই ঋণের বোঝা বিপুল পরিমানে বাড়ছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রবার্ট সিলার মনে করেন, বিনিয়োগকারীরা দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁরা আস্থা হারাচ্ছেন। কারণ ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদ, অভিবাসন, সন্ত্রাসবাদের প্রেক্ষাপট।

আসলে সিলার যা বলেননি তা হলো, তথাকথিত সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়েছে সাম্রাজ্যবাদের মদতে। আর অভিবাসন ও শরণার্থী সমস্যা তার থেকেই। আবার তার বিরুদ্ধেই পালটা মাথা চাড়া দিচ্ছে উগ্র জাতীয়তাবাদ। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির স্বর্গরাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির বিরুদ্ধে জাতীয় পুঁজি আস্ফালন দেখাচ্ছে। তাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের ব্রেক্সিট। তাই সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যেকার যে দ্বন্দ্ব প্রায় চাপা পড়ে গিয়েছিল সেটা আবার মাথা তুলতে শুরু করেছে।

অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে মহামন্দার পরে যেরকম আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদীদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ফ্যাসিবাদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল, এখনও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থভাণ্ডার এবং বিশ্বব্যাঙ্কের হিসাবে, ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সালের সময়কালের তুলনায় বিশ্বের মোট উৎপাদন (ওয়ার্ল্ড জি ডি পি) বৃদ্ধির হার ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ক্রমহ্রাসমান। এর পাশাপাশি দুনিয়াজুড়ে উগ্র দক্ষিণপন্থী, নয়া ফ্যাসিবাদী শক্তির বৃদ্ধি ঘটছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি যত কমছে দুনিয়াজুড়ে এদের দাপাদাপি তত বাড়ছে। দুবছর আগে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচিত সাংসদদের মধ্যে এক চতুর্থাংশই ছিল এইসব নিও ফ্যাসিস্ত বা চরম দক্ষিণপন্থী শিবিরের। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এই প্রথম ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন উগ্র জাতীয়তাবাদীর কন্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এমনকি বলিভিয়ায় উগ্র দক্ষিণপন্থীদের দাপাদাপি দেখা যাচ্ছে গত একবছর ধরে। আফ্রিকার দক্ষিণ থেকে উত্তরে, তুরস্ক থেকে ভারতে সর্বত্র দক্ষিণপন্থীদের আস্ফালন দেখা যাচ্ছে।

********
আমাদের দেশে দ্বিতীয় এন ডি এ সরকারের দুবছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই যে এই সরকার বাজপেয়ী আদবানীদের প্রথম এন ডি এ সরকারের থেকে অনেক বেশি দক্ষিণপন্থী, প্রতিক্রিয়াশীল, উগ্র হিন্দুত্ববাদী, সাম্রাজ্যবাদ ঘেঁষা, একনায়কতন্ত্রী। ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীসুলভ উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তি সংঘ পরিবারের নিয়ন্ত্রণ এই সরকারের ওপরে অনেক বেশি। বি জে পি এককভাবেই এবার লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিপদ এখন অনেক বেশি।

বলা হচ্ছে, এবছর নাকি ভারত বৃদ্ধির হারে সারা বিশ্বে প্রথম স্থানে থাকবে। অথচ আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হলো, বৃদ্ধি বলতে মূল্যবৃদ্ধি, বৃদ্ধি বেকারীর, শিল্পে মন্দার, কৃষিতে সঙ্কটের। সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী, মহিলাদের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, ধনী গরিবের বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন বৈদেশিক নীতি ও অখণ্ডতার সামনে বিপদ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে বিপন্ন করে এককেন্দ্রীকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জটিলতা কেমন বাড়ছে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো কাশ্মীর। শুরু থেকে আজ পর্যন্ত কাশ্মীর সমস্যা এত জটিল আগে কখনো হয়নি। ভারত ও ভারতবাসীর সুরক্ষার চাইতে তথাকথিত গোরক্ষাই গেরুয়াবাহিনীর এখনকার প্রধান কর্তব্য। নাথুরাম গডসের অনুগামীরা এখন দেশপ্রেমিক সেজেছে। ইতিহাস, পাঠ্যসূচী বিকৃত করা হচ্ছে। হিন্দি, হিন্দুত্ব ও হিন্দিস্তানের স্টিমরোলার দিয়ে এরা বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাস চর্চা, যুক্তিবাদ ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের কাঠামোটাকে গুঁড়িয়ে দিতে চায়। এক কথায় স্বাধীনতার পরে দেশজুড়ে সমস্ত ক্ষেত্রব্যাপী সঙ্কটের বৃদ্ধি দেশকে এক ভয়াবহ বিপদের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

********
আমাদের রাজ্যে তৃণমূল সরকারের দ্বিতীয়বারের মেয়াদ চলছে। দ্বিতীয় তৃণমূল সরকার শুরু থেকেই আরও উগ্র ফ্যাসিবাদী কায়দায় চলছে। বছর শেষ হওয়ার আগেই রাজ্যকে বিরোধীশূণ্য করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে শাসকদল। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ফ্যাসিস্তসুলভ আক্রমণ, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের বিপদ, জীবনজীবিকার ওপরে আক্রমণ এসবই এরাজ্যে তীব্রতর হচ্ছে। একদিকে বি জে পি চায় কংগ্রেসমুক্ত ভারতআর এখানে তৃণমূল চায় বিরোধীশূণ্য পশ্চিমবঙ্গ। আসলে উভয়েরই মূল লক্ষ্য বামপন্থীরা। পশ্চিমবঙ্গ এখনো বামপন্থীদের সবথেকে বড় ভিত্তি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যার বিচারেও দেশের বাকি অংশে বামপন্থীদের যা ভোট তার যোগফলের তুলনায় এরাজ্যের বামফ্রন্টের ভোট বেশি। এরাজ্যে সি পি আই (এম)-ই বামপন্থীদের প্রধান শক্তি, তাই স্বাভাবিক কারণে তাদের ওপরেই আক্রমণ নেমে এসেছে সর্বাপেক্ষা তীব্রভাবে। বলা বাহুল্য, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের শক্তি দুর্বল হলে সারা দেশে বাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দুর্বল হবে। তাই সাম্রাজ্যবাদ, কেন্দ্র এবং রাজ্যে ক্ষমতাসীন শাসকদল বামপন্থীদের ওপরে আক্রমণ কেন্দ্রীভূত করার প্রশ্নে একই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে হাত ধরাধরি করে। বিশ্বায়িত লগ্নিপুঁজির আক্রমণ ও উদারনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে বামপন্থীরাই প্রথম সারিতে রয়েছে। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো, দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার আন্দোলনে বামপন্থীরা শুধু সামনের সারিতেই আছে তাই নয়, মতাদর্শগত বিচারে এই লড়াইয়ের একমাত্র নির্ভরযোগ্য শক্তি। শ্রমিক কৃষক মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন জীবিকার সংগ্রামের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই সমস্ত প্রশ্নেই এরাজ্যে বামপন্থীদের সংগ্রাম কেবলমাত্র এরাজ্যের মানুষের স্বার্থরক্ষার মধ্যেই সীমিত নেই, তার চেয়েও বৃহত্তর ক্ষেত্রে প্রসারিত। সমগ্র ভারতীয় জনগণের মতাদর্শ ও রাজনৈতিক সংগ্রাম ক্ষমতা এর ওপরে নির্ভরশীল। এর বিপরীতে রয়েছে সাম্রাজ্যবাদসহ দেশ ও রাজ্যের শাসকদলের স্বার্থ। এই দুই স্বার্থের সংঘাতের কেন্দ্র বিন্দু হলো আজকের পশ্চিমবঙ্গ।

দুনিয়া দেশ ও রাজ্যে দ্রুততার সাথে দক্ষিণপন্থা যে আগ্রাসী ভূমিকায় অগ্রসর হচ্ছে তাতে কেবল বামপন্থীদের পক্ষে এককভাবে তার মোকাবিলা করা সম্ভব একথা মনে করা সংকীর্ণতাবাদ ও হঠকারিতার শামিল হবে। আবার ব্যাপক মঞ্চ গঠনের নামে বাম ও গণতান্ত্রিক বিকল্পের জন্য পার্টির স্বাধীন উদ্যোগ গ্রহণের কাজ অবহেলা করা দক্ষিণপন্থী সুবিধাবাদ ছাড়া কিছু নয়। রাজ্য ও দেশব্যাপী সমস্ত বাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে ব্যাপকতম প্রতিরোধের মঞ্চে সমবেত করেই এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। বামপন্থীদের নিজস্ব উদ্যোগে সংগ্রাম ও সংগঠনকে শক্তিশালী না করে এই মঞ্চ গড়ে তোলা অসম্ভব। এসব প্রশ্নে কেবল কৌশল নিয়ে বিতর্কে অযথা সময় অপচয় না করে ময়দানে নেমে সংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে লাইনের সঠিকতা যাচাই করাই হলো একমাত্র পথ। সেই জন্য আমাদের পার্টির রাজ্য কমিটি আহবান জানিয়েছেপ্রথমত, সি পি আই (এম)-র নিজস্ব উদ্যোগে শ্রেণি সংগ্রাম ও গণসংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, বামফ্রন্টের সম্মিলিত সংগ্রামকে বিকশিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বামফ্রন্ট বহির্ভুত বামপন্থী ও বাম সহযোগী দলগুলিকে নিয়ে যুক্ত সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। এবং চতুর্থত, রাজ্যে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার ওপরে আক্রমণ মোকাবিলায় কংগ্রেস ও সব বাম ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে নিয়ে ব্যপকতম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রাজ্যের আন্দোলন সংগ্রামের প্রধান ইস্যুগুলি চিহ্নিত করা দরকার। প্রথমত, গণতন্ত্রের ওপরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় আক্রমণ তীব্রতর হয়েছে। ২১১টা আসনে জয়লাভ করেও পুলিশ, প্রশাসন, অর্থবল, পেশীবলের এমন ব্যাপক ব্যবহার করে বিরোধীদের বিধায়ক পদ, পঞ্চায়েত, পৌরসভা দখলের দৃষ্টান্ত পশ্চিমবঙ্গ আগে কখনো দেখেনি। শাসকদল ঘোষণা করে দিয়েছে, এই বছরের মধ্যেই সি পি আই (এম) এবং কংগ্রেসমুক্ত করা হবে পশ্চিমবঙ্গকে। বামপন্থীদের মতাদর্শ, সংগ্রাম ও সংগঠনের দুর্বলতাকে অস্বীকার না করেও একথা বলা যায় যে আসলে এটা শাসকদলেরই দুর্বলতা ও ভীতির প্রতিফলন। ২১১টা আসনে জিতেও আত্মবিশ্বাসের এত অভাব! এর প্রধান কারণ হলো, মানুষের ওপরে আস্থার অভাব। মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে ভয় পাচ্ছেন, কারণ তিনি জানেন যে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের ভিত্তিতে তাঁর এই জয় আসেনি। ২কোটি ১৫লক্ষ মানুষ যে তৃণমূল ও বি জে পি-র বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন সেটাই তাঁর মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শতাংশের হারের বিচারে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ৫শতাংশের কিছু বেশি, আর সংখ্যার বিচারে ৩০লক্ষের মতো বেশি। কোনো সন্দেহ নেই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে হঠাৎ করে গড়ে ওঠা বিরোধী জোট নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি ছিল, তার সঙ্গে ছিল অপরপক্ষের ভোট লুটের কৌশল। প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্র থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক বুথ বেছে নিয়ে বিপুল অর্থ ও পেশীবল ব্যবহারের মাধ্যমে ভোট লুটের নিখুঁত পরিকল্পনা সত্ত্বেও বিরোধীদের সঙ্গে মাত্র ৩০লক্ষের ব্যবধান মুখ্যমন্ত্রীর ভয়ের প্রধান কারণ। তিনি বিলক্ষণ বোঝেন, শতকরা ৩ভাগ ভোট এদিক ওদিক হলে ফলাফলটাও বিপরীত হয়ে যেতে পারতো। বি জে পি-র সঙ্গে গোপন বোঝাপড়াটাও চিরকাল যে গোপন থাকবে না সেই আশঙ্কাও তাঁর রয়েছে। সর্বোপরি কৃষকের আত্মহত্যা, শ্রমিকের অনাহারে মৃত্যু, কারখানার পর কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিল্পের মড়ক, টেট-এস এস সি-পি এস সি কেলেঙ্কারি, সারদানারদা কেলেঙ্কারি, সিন্ডিকেট আর তোলাবাজি, দুর্দমনীয় দুষ্কৃতী দৌরাত্ম্যে নারী শিশু-সহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, এমনকি শাসকদলের অনুগামীদের মধ্যেও গোষ্ঠী সংঘর্ষ বৃদ্ধি-সহ জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। রাজ্যের ঋণের বোঝা পূর্বাপেক্ষা অনেক দ্রুতহারে বাড়ছে। ২টাকা কেজি দরের চালের পরিমাণ ও গুণমানে অবনতি ঘটছে। এছাড়া মুখ্যমন্ত্রীর নিজের দেওয়া অঢেল প্রতিশ্রুতির বন্যাই এখন তাঁর রাজত্বকে ভাসিয়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। নির্মাণকারী ঠিকাদারদের টাকা পাইয়ে দেওয়ার পরে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, কিষাণ মান্ডির কাঠামোগুলি এখন ভগ্নস্তুপের মতো পড়ে রয়েছে। কিছু ঠিকাদার আবার তোলা দিয়েছেন, কিন্তু প্রাপ্য টাকার সবটা পাননি। ৫বছরের উন্নয়নের কঙ্কালসার চেহারাটা বেরিয়ে পড়ছে। সিঙ্গুরে বিজয়োৎসব আসলে মুখ্যমন্ত্রীর নার্ভাস প্রতিক্রিয়া। নির্বাচনের জয় যে জনগণের মধ্যে কোনো স্বতঃস্ফূর্ত উচ্ছ্বাসের রূপ নিতে পারেনি সেটাই তাঁর নার্ভাস হয়ে পড়ার প্রধান কারণতাই বেপরোয়া আক্রমণ। মুখ্যমন্ত্রী জানেন, নির্বাচিত বিধায়কদের কিংবা পঞ্চায়েত পৌরসভা যেনতেন প্রকারে দখল করলেও মানুষের মনের দখল তিনি নিতে পারবেন না। নির্বাচনের আগেই মানুষের মধ্যে যে মোহমুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে তা কিছুদিনের মধ্যে আরো তীব্র হতে বাধ্য।

রাজ্যে বি জে পি-র হাল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জরাজীর্ণ। কেন্দ্রের হাত এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর মাথায় রয়েছে ঠিকই, কিন্তু কেন্দ্রের নীতিগুলির বিরুদ্ধে জনরোষ বাড়ছে। ২রা সেপ্টেম্বরের ধর্মঘটই তার প্রমাণ। কিন্তু আর এস এস-এর ফ্যাসিস্তসুলভ উগ্র হিন্দুত্ববাদী কার্যকলাপের প্রসার বা বৃদ্ধিকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। জনবিচ্ছিন্নতার বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য কেন্দ্রের শাসকদলের প্রধান হাতিয়ার এই হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি। সারা দেশের মতো আমাদের রাজ্যেও এটা গুরুতর বিপদ। আর এস এস-এর এই সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বিপরীতের সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িক শক্তিকেও জমি জোগাতে সাহায্য করছে। সীমান্তবর্তী রাজ্য হিসাবে পশ্চিমবঙ্গে আমাদের এই বিপদও অনেক বেশি। কিন্তু এটা বোঝা দরকার তৃণমূলকে পরাস্ত না করে রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ রক্ষা করা অসম্ভব। রাজ্যে তৃণমূল সরকারের এই সুবিধাবাদী অবস্থানই উভয় সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ন্ত ডেকে এনেছে।

********
বামপন্থীদের সামনে রাজ্যে আন্দোলন সংগ্রামের ইস্যু অনেক। কিন্তু এগুলিকে নিয়ে যে ব্যাপক ভিত্তিক গণসংগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব তা করা যায়নি। এর কারণগুলি চিহ্নিত করে পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে দুর্বলতাগুলি কাটিয়ে উঠতে হবে। এখানে প্রধান দুটি দুর্বলতার উল্লেখ করা হচ্ছে।

প্রথমত, স্থানীয় আশু আদায়যোগ্য দাবি নিয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে পঞ্চায়েত পৌরসভা গ্রাম শহর কলকারখানা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানসহ সব ক্ষেত্রজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলায় আমাদের উদ্যোগ অপর্যাপ্ত। বিশেষত কেবল সরকার বিরোধিতা নয়, সরকারী প্রকল্পগুলির রূপায়ণে ঘোষণা ও বাস্তবের মধ্যে ফারাক, দুর্নীতি, দলবাজি, ইত্যাদির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পার্টি ও গণফ্রন্টের মাধ্যমে রক্তদান, সাক্ষরতা, কোচিং, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, কৃষিবিকাশ, সমবায়, শিশুকিশোর সংগঠন, ক্লাব, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞানমেলা, ইত্যাদি বহুমাত্রিক ইতিবাচক কর্মসূচী নিতে হবে। এসব না করে রাজ্যের দাবিগুলি নিয়ে বড় বড় কেন্দ্রীয় সমাবেশ সব সময় পরিস্থিতির চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। এই সংগ্রামগুলিকে স্বতঃস্ফূর্ততার ওপরে ছেড়ে না দিয়ে তাকে সংগঠিত করা ও এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া এখন সব চাইতে জরুরী কাজ। শুরুতেই এলাকা ও আন্দোলনের ক্ষেত্রগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা দরকার। অগ্রাধিকার ভিত্তিক পরিকল্পনা ছাড়া কিছু বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম প্রতিরোধ ও প্রত্যাঘাতের শক্তি অর্জন করতে পারবে না। অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে শ্রমিক কৃষক খেতমজুরসহ এলাকার নানা রকমের মানুষের শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মহিলা, সংখ্যালঘু, তফসিলি ও আদিবাসী মানুষের, অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের বিশেষ করে পশ্চাদ্‌পদ অংশের দাবিগুলিকে নিয়ে সংগ্রামকে যুক্ত করতে হবে। সর্বত্রই অপেক্ষাকৃত তরুণ প্রজন্মকে সামনের সারিতে নিয়ে আসতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাজ্যের জ্বলন্ত ইস্যুগুলি নিয়ে রাজ্য বা জেলাগত আন্দোলনের কর্মসূচী অবশ্যই সংগঠিত করতে হবে। কিন্তু তার পূর্বশর্ত হিসাবে স্থানীয়স্তরে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ দাবিগুলির ভিত্তিতে ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয় না। অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চ থেকে রাজ্যব্যাপী আন্দোলনের কর্মসূচীর ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু প্রায়শই এগুলি এত উপর্যুপরি বা একটার ওপরে একটা চেপে বসে যে ঠাসা কর্মসূচীর ভিড়ে স্থানীয় সংগ্রামগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতা সুনিশ্চিত করার বিষয়টি। কাজেই, রাজ্যভিত্তিক ও স্থানীয় মূলত এই দুই ধরনের সংগ্রামের মধ্যে পারস্পরিক ভারসাম্য ও সমন্বয় বজায় রাখার দুর্বলতাগুলি দূর করতেই হবে। এর মধ্য দিয়েই অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলি নিয়ে সংগ্রামকে রাজনৈতিক সংগ্রামে উন্নীত করতে হবে।

স্বতঃস্ফূর্ততার ওপরে নির্ভর না করে সংগঠিত সংগ্রাম গড়ে তোলার অত্যাবশ্যক শর্ত হচ্ছে সংগঠন। সাংগঠনিক দুর্বলতাই আমাদের প্রধান দুর্বলতা। এখানে সংগঠন বলতে মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠনের বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ একটি সংগঠনের কথাই বলা হচ্ছে, যা এই চার ফ্রন্টেই সংগ্রাম পরিচালনা করতে পারবে। কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠন সংক্রান্ত প্লেনাম সেরকম একটি গণলাইন নির্ভর বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছে। রাজ্যের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেই নির্দেশগুলি কার্যকরী করার জন্য রাজ্যের সংগঠন সংক্রান্ত প্লেনাম হচ্ছে। কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামের মূল আহবান ছিল পার্টির দৈনন্দিন কাজে রুটিন সর্বস্ব গতানুগতিকতা বর্জন করে নিরন্তর ও নিবিড় গণসংযোগ গড়ে তোলা। জনগণের কাছে যেতে হবে, তাঁদের কাছে মতাদর্শ, রাজনীতি ও সংগ্রামের কথা নিয়ে যেতে হবে। আবার তাঁদের কাছ থেকে এসব বিষয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে আসতে হবে। এগুলির পর্যালোচনার ভিত্তিতে আমাদের চার রকমের সংগ্রামেরই পরীক্ষা করতে হবে প্রয়োগের মাপকাঠিতে। এরমাধ্যমে আমাদের ত্রুটিগুলি চিহ্নিত করতে হবে, সংশোধন করতে হবে এবং সংশোধন করে তা নিয়ে ফের জনগণের কাছে যেতে হবে। জনগণের মধ্যে এই নিরন্তর যাওয়া আসা দেওয়া নেওয়ার মধ্য দিয়েই আমাদের সংগঠন অপেক্ষাকৃত ত্রুটিমুক্ত ও শক্তিশালী হতে পারে। ত্রুটি সংশোধনের লক্ষ্যে পার্টির বিপ্লবী চরিত্রের অবক্ষয়গুলি চিহ্নিত করে দূর করতে হবে। আমাদের রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন ৩৪বছরে একটা অনুকূল পরিস্থিতিতে সংগঠনের যে প্রসার ঘটেছিল বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তা সংহত করা পার্টির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ। আমাদের কাজের মুখ্য অভিমুখ হতে হবে পরিস্থিতির উপযোগী নতুন কাজের ধারা আয়ত্ব করা, সংগ্রাম সংগঠনের পুণর্বিন্যাস করা, নিষ্ক্রিয় সদস্যদের চাপ থেকে সংগঠনকে মুক্ত করে শ্রেণি সামাজিক ও বয়সের গঠনের পরিবর্তনের জন্য নতুন নতুন অংশকে সংগঠনে নিয়ে আসা, কমিটিগুলির সংখ্যা ও স্তরের বাহুল্য কমিয়ে এবং একই বিষয় নিয়ে দীর্ঘ নিষ্ফলা আলোচনা কমিয়ে কমিটিগুলিকে দ্রুত কর্মসম্পাদনের উপযোগী করে তোলা। অগ্রাধিকার এলাকা ও ফ্রন্ট চিহ্নিত করে পরিকল্পিত ধারাবাহিক কাজের উদ্যোগ নিতে হবে। ত্রুটি সংশোধন অভিযান উপর থেকে শুরু করতে হবে। সমস্ত ক্ষেত্রেই নেতৃত্বকে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠন, এই চার ফ্রন্টের সংগ্রাম তিন স্তরেই পরিচালনা করতে হবে। পার্টির বাইরে, পার্টির মধ্যে এবং আমাদের প্রত্যেকের নিজের মধ্যে। পার্টির বাইরে চার ফ্রন্টের সংগ্রামগুলি পার্টির আভ্যন্তরীণ সংগ্রামে প্রতিফলিত হতে বাধ্য। বাইরের সংগ্রাম যত তীব্র হবে পার্টির ভিতরে সংগ্রামও ততই তীব্র হবে। এই সংগ্রামগুলি আবার পার্টির প্রত্যেকটি পার্টিকর্মীর নিজেকে পরিবর্তন করার সংগ্রামে প্রতিফলিত হবে। এতে কেউ কেউ ভয় পেয়ে যান, শত্রুর কাছে আত্মসমর্পন করেন, সম্পদ, পদ ও নিরাপদ জীবনযাপনের হাতছানিতে প্রলুব্ধ হন। এভাবে তাঁদের পদস্খলন ঘটে। অপরদিকে কেউ কেউ ধৈর্য হারিয়ে অতিবিপ্লবী বাস্তবজ্ঞান বিবর্জিত মনগড়া ধারণার দ্বারা পরিচালিত হয়ে এমন ধরনের সংগ্রাম শুরু করেন যা কার্যত প্রতিবিপ্লবী শক্তির সুবিধা করে দেয়। আবার মধ্যপন্থার নামে কেউ কেউ এই উভয় রকম বিচ্যুতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার বদলে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন, পার্টিতে নীতি বিবর্জিত ঐক্য স্থাপনের নিষ্ফলা চেষ্টায় অযথা কালক্ষেপন করেন। শেষোক্ত ঝোঁকটি সবার কাছে ভালো সাজার উদারবাদী ঝোঁক। পার্টির ভিতরের সংগ্রাম নীতি নিয়ে, ব্যক্তি নিয়ে নয়। নীতি স্থির না করে কোনো ব্যক্তিকে সংশোধন করা সম্ভব নয়। পার্টির রণনীতির প্রশ্নে সংগ্রামে আপোষ করা চলে না। কিন্তু দৈনন্দিন কৌশল ও নিছক কাজের প্রশ্নে আপোষহীন সংগ্রাম চলে না। নিজেকে পরিবর্তন করার সংগ্রাম নিজেকেই করতে হয়। কিন্তু কেবল এককভাবে নিজেকে সংশোধন করা যায় না। তার জন্য সমষ্টিগত উদ্যোগ চাই। কমরেডসুলভ মনোভাব নিয়েই ধৈর্যের সাথে এই কাজ করা সহকর্মীদের দায়িত্ব। বিচ্যুতির প্রাথমিক লক্ষ্মণগুলি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই তা সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে। পার্টির আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম ও নিজেকে পরিবর্তনের সংগ্রাম পরিচালনা সম্পর্কে লিও শাও চি আভ্যন্তরীণ সংগ্রামকী করে সাচ্চা কমিউনিস্ট হতে হবেলিখে গিয়েছেন। আমাদের রাজ্যে আটের দশকের শুরুতেই তা প্রকাশিত হয়। কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রুটি সংশোধন অভিযানের প্রথম দলিল প্রকাশিত হওয়ার বেশ কিছু আগে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি এই সম্পর্কে যে নির্দেশ দিয়েছিল তার মধ্যেও লিও শাও চি-র পুস্তিকাটি পড়তে বলা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় কমিটির এই সংক্রান্ত সর্বশেষ দলিলটি সময়োপযোগী করা হয়েছে, এটাও অবশ্যপাঠ্য বলে বিচার করতে হবে। অবশ্যই এই পাঠ বা চর্চার প্রধান লক্ষ্য হবে পার্টি ও নিজের জীবনে তা নির্দিষ্টভাবে প্রয়োগ করতে পারা। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের এবং কেবল আমাদের পার্টিই পারে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে।

গণশক্তি, শারদ সংখ্যা ২০১৬ 

ফ্যাসিবাদের পথে অভিযানকে রুখতে হবে প্রস্তুতিপর্বেই

সীতারাম ইয়েচুরি

১৯৯০-এ এল কে আদবানির রথযাত্রার সময় থেকে একটি বিষয়ে আমাকে বারংবার চর্চা করতে হয়েছে। সেই রথযাত্রা দাঙ্গা ও রক্তপাতের রাস্তায় এগিয়েছিল। আর এস এস হলো বি জে পি-র পরিচালক। আর এস এস-র মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত বি জে পি সরকার, বিশেষ করে মোদীর নেতৃত্বাধীন বি জে পি সরকার দেশে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথে এগোচ্ছে কিনাএই বিতর্ক ফের সামনে এসেছে। এখন‍‌ও পর্যন্ত ইউরোপীয় ফ্যাসিজমের চরিত্র ও উত্থান সম্পর্কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেছেন জর্জি ডিমিট্রভ, ১৯৩৫-এ কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে তাঁর গভীর বিশ্লেষণমূলক ভাষণে। তিনি ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা দেন : ‘‘লগ্নি পুঁজির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী এবং সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী অংশের সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব’’ফ্যাসিবাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এক বুর্জোয়া সরকারের বদলে আরেক বুর্জোয়া সরকারের ক্ষমতায় আরোহণের মতো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। তা হলো শাসকশ্রেণির এক রাষ্ট্ররূপের বদলে আরেক রাষ্ট্ররূপবুর্জোয়া সংসদীয় গণতন্ত্রের বদলে খোলাখুলি সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব।

ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান হয়েছিল শাসকশ্রেণির শ্রেণি আধিপত্য প্রকৃতপক্ষে সংকটে পড়ায়। শাসকশ্রেণির তরফে তা ছিলো সংকট মোকাবিলার পথ। ১৯২৯-এ মহামন্দা’-র বিশ্ব পুঁজিবাদী সংকট শুরু হয়। হিটলারের ফ্যাসিবাদ শুরুর আগের পর্বে জার্মান একচেটিয়া পুঁজির শ্রেণি আধিপত্যের সংক‌ট তৈরি হয়। শাসকশ্রেণির নিজের শাসনই সংকট ডেকে এনেছিল। ফ্যাসিবাদের বিপদ তৈরি হয় কখনও শাসকশ্রেণির নিজের শিবিরেরই সংকট থেকে, আবার প্রায় একই সঙ্গে সর্বহারা শ্রেণির তরফে শাসকশ্রেণির শ্রেণি-শাসন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ায়।
জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের উত্থানের সময়ের সঙ্গে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি একইরকম নয়। এটা ঠিকই যে চলতি বিশ্ব অর্থনৈতিক সংকট অষ্টম বর্ষে পড়েছে। শ্রমজীবী মানুষের শোষণকে আরো তীব্র করে এই সংকট থেকে বেরোনোর সমস্ত চেষ্টা বিশ্ব ধনতন্ত্রকে আরো গভীরতর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির নেতৃত্বে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সংকট নয়া উদারবাদী অর্থনৈতিক সংস্কারের কর্মসূচির মাধ্যমে আদিম সঞ্চয়ের এক ভয়াবহ অভিযানের জন্ম দিয়েছে। এর মাধ্যমে পুঁজি তার মুনাফা সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার প্রত্যক্ষ ফলাফল জনগণের বিপুল অংশের বর্ধিত শোষণ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং দেশের মধ্যে সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য যেভাবে লাফিয়ে বেড়েছে, তা থেকেই এর আভাস মেলে। আমাদের দেশে দুই ভারত তৈরি হচ্ছে। আমাদের জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ক্রমবর্ধমান দুর্দশা ও বঞ্চনার শিকার। ডিমিট্রভের আলোচনায় আসা একচেটিয়া পুঁজির সংকটের উপাদান রয়েছে কিন্তু ভারতে সর্বহারা শ্রেণি এখনই ক্ষমতা দখল করতে পারে, এমন কোনো পরিস্থিতি নেই। তাছাড়াও দ্রুত বর্ধমান স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা সত্ত্বেও, যা অরুণাচল প্রদেশ বা উত্তরাখণ্ডের ঘটনাবলিতে প্রতিফলিত হয়েছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে খর্ব করা সত্ত্বেও বুর্জোয়া-জমিদার শ্রেণি শাসনের সংকট এই স্তরে পৌঁছোয়নি যে শাসকশ্রেণির আশু কর্মসূচি হয়ে দাঁড়াচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রকেই বিসর্জন দেওয়া।

সুতরাং, আর এস এস-নেতৃত্বাধীন বি জে পি ক্ষমতায় এসেছে মানেই ধ্রুপদী ইউরোপীয় অর্থে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেছে, তা নয়। নিঃসন্দেহে আর এস এস-র হিন্দুরাষ্ট্র’-এর ধারণা ফ্যাসিবাদী ধারণা। যদি আর এস এস আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের জায়গায় তাদের হিন্দুরাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সফল হয়, তাহলে গুণগতভাবে সম্পূর্ণ পৃথক পরিস্থিতি তৈরি হবে। সেই পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই বাস্তবায়িত না হয় বিপ্লবী শক্তিসমূহকে সেই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিকে তাই আরো যথার্থভাবে বর্ণনা করা যেতে পারে। যে বুর্জোয়া জমিদার শ্রেণি শাসনের সংকট এমন স্তরে পৌঁছেছে যেখানে শাসকশ্রেণির একটি অংশ, সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল অংশআর এস এস/বি জে পি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছে তারা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সফল হয়েছে। ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের হিন্দুরাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য এগিয়ে নিয়ে যেতে তারা জোরের সঙ্গে তাকে ব্যবহার করছে।

অনেক সময়ে জর্জি ডিমিট্রভকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের রণ‍‌কৌশলের প্রবক্তা বলা হয়ে থাকে। যেহেতু ফ্যাসিবাদ এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তাই অনেক সম‍‌য়ে বলা হয় বর্তমান ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে ডিমিট্রভ প্রাসঙ্গিক নন, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা হলো প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের রণ‍‌কৌশল তৈরির ক্ষেত্রে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ যুক্তফ্রন্ট গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছিল। এই লাইনের ফলে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও স্তালিন কমিউনিস্ট-বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মা‍‌র্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্সের সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আঁতাত তৈরি করতে পেরেছিল। বিশ্বজুড়ে ফ্যাসিস্ত আধিপত্য ছড়িয়ে দিতে হিটলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এই সমস্তই ছিলো ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, তার অমানবিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গ। যেহেতু ভারতে এখনও ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সমস্ত ফ্যাসিবিরোধী শক্তির সাধারণ যুক্তফ্রন্ট গঠনের ডিমিট্রভের বিশ্লেষণ সমসাময়িক ভারতীয় পরিস্থিতিতে খা‍‌টে না।
এভাবে বুঝলে ডিমিট্রভকে ঠিক বোঝা হবে না। বস্তুত সেক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের উত্থান সম্পর্কে তাঁর সমৃদ্ধ ও অতুলনীয় বিশ্লেষণের প্রতি অন্যায় করা হবে। ১৯৩৫-এ সপ্তম কংগ্রেসে তাঁর রি‍‌পোর্ট, ‘শ্রমিক ঐক্য : ফ্যাসিবাদ বিরোধী দুর্গ’-তে ডিমিট্রভ বলছেন :

দেশের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা, তার জাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আন্তর্জাতিক অবস্থান অনুসারে বিভিন্ন দেশ ফ্যাসিজমের বিকাশ ও ফ্যাসিস্ত একনায়কত্বও বিভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। কয়েকটি দেশে, বিশেষ করে যে সব দেশে ফ্যাসিজমের ব্যাপক গণভিত্তি নেই বা যে সব দেশে ফ্যাসিস্ত বুর্জোয়াদের নিজেদের শিবিরের মধ্যেই ঝগড়া কোন্দল বেশ উৎকট সে সব দেশে ফ্যাসিজম চট করে পার্লামেন্ট ভেঙে দিতে ভরসা পায় নাসেখানে তারা অন্যান্য বুর্জোয়া পার্টি এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিসমূহকে কিছু পরিমাণে আইনগত সুযোগ বজায় রাখতে দেয়। কিন্তু যে সব দেশে বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী বিপ্লব আসন্ন বলে ভয় পায় সেখানে ফ্যাসিজম অবিলম্বে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী দল-উপদলগুলিকে দলন করে বা তাদের বিরুদ্ধে বিভীষিকার রাজত্ব তীব্র করে অবাধে রাজ‍‌নৈতিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। তার মানে এই নয় যে, অবস্থা বিশেষ জটিল হয়ে দাঁড়ালে প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্বের সঙ্গে পার্লামেন্টারি কার্যক্রমের ধাপ্পাবাজি মিশেল দিয়ে ফ্যাসিজম তার শ্রেণি চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে গণভিত্তি প্রসারিত করতে চেষ্টা করবে না।

‘‘ফ্যাসিজমের ক্ষমতায় অধিরোহণ একটা বুর্জোয়া গভর্নমেন্টের পরিবর্তে আর একটা বুর্জোয়া গভর্নমেন্টের স্থান অধিকারের মতো সাধারণ ঘটনা নয়। এ হলো বুর্জোয়াশ্রেণির আপন শ্রেণি আধিপত্য বজায় রাখার এক ধরনের রাষ্ট্ররূপ, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের বদলে আর এক ধরনের রাষ্ট্ররূপ, প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়কত্ব স্থাপন। এই পার্থক্য উপেক্ষা করাটা গুরুতর ভুল হবে। এই ভুলের ফলে ফ্যাসিস্তদের ক্ষমতা দখলের আশঙ্কার বিরুদ্ধে শহর ও গ্রামের শ্রমজীবী মানুষের ব্যাপকতম অংশের সমাবেশ গড়তে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণি অপারগ হবেন; বুর্জোয়াদের নিজেদের শিবিরেই যে অন্তর্দ্বন্দ্ব রয়েছে তারও সুযোগ নিতে পারবেন না। কিন্তু আজকের দিনে বুর্জোয়া গণতন্ত্রী দেশগুলিতেও বুর্জোয়া শ্রেণি ক্রমবর্ধমান হারে যে সব প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা অবলম্বন করছেযার ফলে মেহনতি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ধ্বংস হচ্ছে, পার্লামেন্টের অধিকার খর্ব হচ্ছে, ভুয়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং বিপ্লবী আন্দোলনের উপর দমননীতি তীব্রতর হয়ে উঠছেফ্যাসিস্ত একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পথে সে সবগুলির গুরুত্ব ছোট করে দেখাটা মোটেই কম গুরুতর বা কম বিপজ্জনক ভুল নয়।

কমরেডগণ, লগ্নি পুঁজিওয়ালাদের কোন সমিতি একদিন বসে ঠিক করে ফেললো, অমুক তারিখে ফ্যাসিস্ত একনায়কত্ব কায়েম করা হবেফ্যাসিজমের ক্ষমতা দখলের ব্যাপারটাকে অত সহজ, সরল প্রক্রিয়া মনে করাটা ভুল হবে। আসলে, পুরনো বুর্জোয়া দলগুলির বা ঐ সব দলের একটা বিশেষ অংশের সঙ্গে পারস্পরিক, এক এক সময় গুরুতর লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই সাধারণত ফ্যাসিজম ক্ষমতা দখল ক‍‌রে; এমন কি কখন‍‌ও কখনও ফ্যাসিস্তদের নিজেদের শিবিরের অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে, অনেক সময়জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও অন্যান্য দেশে আমরা যে রকম দেখেছিসশস্ত্র সংঘর্ষের মধ্য দিয়েও ফ্যাসিজম ক্ষমতা হস্তগত করে। ফ্যাসিস্ত একনায়কত্ব কায়েম হওয়ার আগে বুর্জোয়া গভর্নমেন্টগুলি সাধারণত যে কতকগুলি প্রাথমিক স্তরের মধ্য দিয়ে অগ্রসর ঝয়,তারা যে একের পর এক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা চালু করে ফ্যাসিজমের ক্ষমতা দখলের পথ প্রশস্ত করে দেয়, উপরে বর্ণিত বিষয়গুলি এ সত্য থেকে যেন আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে না ফেলে। যাঁরা বুর্জোয়াশ্রেণির এই সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাসমূহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম না করেন, যাঁরা ফ্যাসিজ‍‌মের এই প্রস্তুতির যুগে তার বিরুদ্ধে না লড়েন তাঁরা ফ্যাসিজমের বিজয় রুখতে পারবেন না বরং তার জয়ের পথকইে প্রশস্ত করবেন।’’ অর্থাৎ ফ্যাসিবাদকে সংহত হতে সাহায্য করে এমন সমস্ত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের গণসংগ্রাম সংগঠিত করার গুরুত্বের ওপরেই ডিমিট্রভ জোর দিয়েছেন।

কীভাবে ফ্যাসিবাদ বিভিন্ন পদ্ধতিতে নিজেকে সংহত করে ডিমিট্রভ সে আলোচনাও করেছেন। ফ্যাসিবাদী শক্তি পূর্ণাঙ্গ ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করে। আজকের বিকাশমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এগুলি প্রাসঙ্গিক।

‘‘জনসাধারণের উপর ফ্যাসিজমের যে প্রভাব রয়েছে তার উৎসটা কি? ফ্যাসিজম যে জনসাধারণকে আকর্ষণ করতে পারছে তার কারণ হলো এই যে, তারা গলাবাজি করে জনসাধারণের জরুরি প্রয়োজন ও চাহিদার কথা বলছে। ফ্যাসিজম শুধু যে জনসাধারণের বদ্ধমূল কুসংস্কারকেই উসকিয়ে তোলে তা নয়, তারা তাঁদের সুস্থ চেতনা, তাঁদের ন্যায়বোধ এমনকি অনেক সময় তাঁদের বিপ্লবী ঐতিহ্যের প্রতিও আবেদন জানায়।’’ মোদী সরকার স্বাধীনতার লড়াইয়ের বিপ্লবী বীর ভগৎ সিং‍‌, চন্দ্রশেখর আজাদ প্রমুখের নাম করছে নিজেদের কর্মসূচি এগিয়ে নিতে যেতে। জাতীয় আন্দোলনে কোনো ভূমিকা পালন করেনি আর এস এস, স্বাধীনতার জন্য জনগণের বিপুল সংগ্রাম থেকে দূরে দাঁড়িয়েছিলো তারা। সেই আর এস এস এখন জাতীয় বীরদের অনেককে নিজেদের পংক্তির মধ্যে টানতে চাইছে এমন লোকের কাছে পৌঁছোনোর জন্য অন্যথায় যারা তাদের সামাজিক বা রাজনৈতিক ভিত্তির মধ্যে পড়ে না।

ডিমিট্রভ আরো বলছেন: ‘‘ফ্যাসিবাদ চরম সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থেই কাজ করে কিন্তু অন্যায়ের শিকার একটি জাতির স্বার্থরক্ষকের ছদ্মবেশে তারা জনসাধারণের সামনে হাজির হয়...আহত জাতীয় চেতনার কাছে তারা সেইভাবে আবেদন করে।’’ সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে কাজ করতে করতে এই বি জে পি সরকার ভারতকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুগত মিত্র বানিয়ে ফে‍লেছে। কিন্তু এক অন্যায়ের শিকারজাতির প্রতিনিধিত্বকারী হিসাবে নিজেদের দেখায়।

অন্যায়ের শিকারহলো হিন্দুরাএই অতিকথনকেই তারা জোরদার করার চেষ্টা করছে। বিদেশি শাসক, মুখ্যত মুসলিমদের শতাব্দীর পর শতাব্দী অসহিষ্ণুতা ও অন্যায়ের শিকার এই জাতির উচিত নিদ্রা থেকে জেগে উঠে সমস্ত বিদেশিদের, অর্থাৎ অ-হিন্দুদের থেকে মুক্ত করে হিন্দু রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা করা। এই লক্ষ্যে তারা জাতীয়তাবাদের নানা ধরনের ধারণা সামনে নিয়ে আসছে। এসব আর কিছুই না সাম্প্রদায়িকতার মুখোশ, যারা তাদের ধাঁচের জাতীয়তাবাদে অনুসরণ করবে না তাদের বিশ্বাসঘাতক’, ‘জাতীয়তা-বিরোধীবলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রকৃত দেশপ্রেমিক মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন। এই পদ্ধতিতে তারা বিরোধীদের মুখ বন্ধ করে ফ্যাসিস্ত ধাঁচের কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

‘‘জনসাধারণকে অবাধে শোষণ করাই ফ্যাসিজমের লক্ষ্য। কিন্তু দস্যু বুর্জোয়াশ্রেণি ব্যাঙ্ক, ট্রাস্ট ও রাঘববোয়াল পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের যে সুগভীর ঘৃণা রয়েছে তার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে পুঁজিবাদবিরোধী গলাবাজি করে তারা জনসাধারণের কাছে আবেদন জানায়এমন সব দাবি উপস্থিত করে যা রাজনৈতিকভাবে অপরিপক্ক জনসাধারণের কাছে সেই মুহূর্তে সবচেয়ে লোভনীয় বোধ হয়।’’ লক্ষ্য করা যেতে পারে জনধন যোজনা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে স্লোগান সামনে আনছেন (যদিও এই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির বিরাট অংশই অচল বা শূন্য ব্যালান্সের)। জনগণকে প্রলোভিত করার চেষ্টা হচ্ছে। অথচ এই সরকারের অর্থ‍‌নৈতিক নীতি জনগণের ওপরে ক্রমশই বেশি বেশি বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

‘‘ফ্যাসিজম জনসাধারণকে সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ, সব থেকে বিষাক্ত মনোবৃত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের গ্রাসে তুলে দেয়, কিন্তু জনসাধারণের দরবারে তারা হাজির হয় ‘‘সৎ এবং দুর্নীতির ছোঁয়াচহীন গভর্নমেন্ট’’ গঠনের দাবি নিয়ে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক গভর্নমেন্টসমূহ সম্পর্কে জনসাধারণের সুগভীর মোহমুক্তির উপর ভর করে ফ্যাসিজম কপটভাবে দুর্নীতির নিন্দা করে।’’ প্রধানমন্ত্রী একটানা বাগাড়ম্বর করে চলেছেন যে ভারতে এই প্রথম একটা সরকারের কোনো দুর্নীতি-কেলেঙ্কারি নেই। একই সঙ্গে এই সরকার নির্বিচার ধান্দার ধনতন্ত্রকে মদত দিচ্ছে। সংসদেই স্বীকার করা হয়েছে, ২০১৫-১৬ সালে কর্পোরেটদের ৫৯,৫৪৭ কোটি টাকার ঋণ মকুব করা হয়েছে। এ হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। কর্পোরেটকে কর ছাড়ের বার্ষিক পরিমাণ প্রায় ৬ লক্ষ কো‍টি টাকা। অন্যদিকে, সামান্য ঋণের টাকা শোধ করতে পারার মতো পরিস্থিতিতে না থাকায় একজন কৃষককে শাস্তি পেতে হচ্ছে। তার সম্পত্তি, গোরু-মোষ কেড়ে নিচ্ছে সেই একই ব্যাঙ্কগুলি যারা ভারতের শীর্ষ কর্পোরেটদের ৮.৫ লক্ষ কোটি টাকা এমন ঋণ দিয়েছে যা ফেরতের আশা প্রায় নেই। আক্ষরিক অর্থেই ‘‘সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত, সবচেয়ে বিষাক্তদেরগ্রাসে তুলে দেওয়া হচ্ছে জনসাধারণকে।

‘‘বুর্জোয়া শ্রেণির সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল মহলের স্বার্থেই ফ্যাসিজম পুরানো বুর্জোয়া পার্টিগুলোর উপর বীতশ্রদ্ধ জনসাধারণকে মাঝপথে পাকড়াও করে। বুর্জোয়া গভর্নমেন্টের উপর আক্রমণের তীব্রতা এবং পুরানো বুর্জোয়া দলগুলি সম্পর্কে আপসহীন মনোভাব দেখিয়ে তারা এইসব সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করে।’’ পাঠকদের নিশ্চয়ই স্মরণে আছে প্রত্যেক বিদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলে চলেছেন গত ৬০ বছরের কংগ্রেস শাসনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তাঁর সরকার ভারতকে পুনর্নির্মাণ করছে। গত দুবছরে যদিও ধনী-দরিদ্রের অর্থনৈতিক বৈষম্য আরো তীব্র হয়েছে। আজ ভারতীয়দের শীর্ষ এক শতাংশ দেশের মোট সম্পদের অর্ধেকেরই মালিক। ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে, গরিবরা আরো গরিব। যদিও এই সরকারের প্রচারের ধরন এমন যেন পুরানো বুর্জোয়া দলগুলি সম্পর্কে তাদের আপসহীন মনোভাব।

‘‘নৈরাশ্যবাদ ও কপটতায় ফ্যাসিজম অন্য সব রকম বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াকে ছাড়িয়ে যায়। একটা দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে, এমন কি একই দেশের বিভিন্ন সামাজিক স্তরের সঙ্গে খাপ খাইয়ে ফ্যাসিজম তার প্রচারের ধরন ঠিক করে। অভাব-অনটন, বেকারি ও জীবনের অনিশ্চয়তায় হতাশাগ্রস্ত পেটি-বুর্জোয়া জনতা, এমন কি শ্রমিকশ্রেণির একাংশও সহজেই ফ্যাসিজমের সমাজতান্ত্রিকএবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদী ভাঁওতাবাজীর শিকার বনেন।’’ ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের বাকচাতুর্য ছাড়াও আর এস এস/বি জে পি সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বা সামাজিক বিন্যাসের খেলা চালাচ্ছে। বিভিন্ন সামাজিক স্তরের সঙ্গে খাপখাইয়ে তারা একেকটি জাত-সম্প্রদায়ের মধ্যেকার উপ-জাত সম্প্রদায়কেও সমবেত করে তাদের মধ্যে সামাজিক ভিত্তি গঠনের চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদ-মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদী বাগাড়ম্বরের দ্বন্দ্বে এই সামাজিক বিন্যাসও ফ্যাসিস্তধাঁচের মতাদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমসাময়িক ভারতীয় পরিস্থিতিতে ডিমিট্রভের কথার সঙ্গে এমন অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। এই পরিস্থিতিতে মোদী সরকার ফ্যাসিস্ত সরকার কি না তা নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে ফেলা বিতর্কেই ডুবে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা আগেই বলেছি, এই সরকার এখনও ফ্যাসিস্ত সরকার নয়। সুতরাং আজকের পরিস্থিতি মোকাবিলায় সাধারণ যুক্তফ্রন্টের রণকৌশল প্রাসঙ্গিক না। যে বিয়ষটি জোর দিয়ে বলার মতো তা হলো যদি আগেই প্রতিহত করা না যায় মোদী সরকার আর এস এস-র ফ্যাসিস্ত ধাঁচের হিন্দুরাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার দিকে যাত্রা করবে। এই যাত্রা যাতে এগোতে না পারে, তাকে থামানো দরকার। আজ আমরা যা দেখছি তা এখনও ফ্যাসিবাদ নয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদী পদ্ধতিগুলির নির্মম এবং শিউরে ওঠার মতো ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। আর এস এস-র আপাদমস্তক অসহিষ্ণু ফ্যাসিস্ত-ধাঁচের হিন্দু রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই অভিযান চালানো হচ্ছে। এই হিন্দুরাষ্ট্রগঠিত হতে পারে কেবলমাত্র আমাদের বর্তমান সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ওপরে। সমস্ত কমিউনিস্ট, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সমস্ত দেশপ্রেমিক ভারতীয়ের কর্তব্য হলো ফ্যাসিবাদের পথে এই যাত্রাকে প্রতিরোধ ও পরাস্ত করা। সি পি আই (এম)-র ২১তম কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এই সাম্প্রদায়িক অভিযানকে মোকাবিলার প্রধান কর্তব্যসম্পাদনে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির সংগ্রামে আরো জোরদার ঐক্য গঠন করতে হবে। (রচনাকাল : ৩১শে আগস্ট, ২০১৬)

গণশক্তি, শারদ সংখ্যা ২০১৬


সাম্রাজ্যবাদ ও তার বিপদ : সম্পাদকীয়ের পরিবর্তে একটি আলোচনা

 ডা: সূর্যকান্ত মিশ্র

একশ বছর আগে লেনিন লিখেছিলেন ‘সাম্রাজ্যবাদ: পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ স্তর’। এই পুস্তিকা ছিলো আয়তনে ছোট, মুখ্যত ইউরোপীয় শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে মতবাদিক লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে রচিত। এই পুস্তিকায় লেনিন সাম্রাজ্যবাদের পাঁচটি মুখ্য চরিত্রকে চিহ্নিত করেছিলেন। একচেটিয়ার প্রাধান্য, ব্যাঙ্ক ও শিল্প পুঁজির মিলনে লগ্নী পুঁজির উদ্ভব ও আধিপত্য,পণ্য রপ্তানি অপেক্ষা পুঁজির রপ্তানির প্রাধান্য, বিশ্বজোড়া কার্টেল এবং ধনতান্ত্রিক দেশগুলির মধ্যে বাজার ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে দুনিয়াজোড়া ভৌগোলিক ভূমির বন্টন ও পুনর্বন্টন। যার ফলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে।

লেনিন এই পুস্তিকা লেখার সময়ে সমসাময়িক আরো কয়েকজন লেখকের গবেষণা নিয়ে চর্চা করেছিলেন। জন আটকিনসন হবসন তাঁদের অন্যতম। রাজনৈতিক ধ্যানধারণার দিক থেকে সামাজিক উদারবাদী হলেও সাম্রাজ্যবাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যকে তিনি চমৎকার ভাবে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদী মনস্তাত্বিক যুদ্ধ সম্পর্কে চর্চার ক্ষেত্রে তিনি অগ্রণী। মার্কসবাদী পথের এই সংখ্যায় হবসন সম্পর্কে অঞ্জন বেরার লেখা সংযোজিত হয়েছে।

লেনিনের মূল সুত্রগুলি কার্যকরী থাকলেও তাঁর সময় থেকে পুঁজিবাদের বিকাশ ঘটেছে। পুঁজির কেন্দ্রীভবন আরো গতি পেয়েছে এবং তা আন্তর্জাতিক চেহারা পেয়েছে। তেমনই উল্লেখযোগ্য  লগ্নী পুঁজি এখন আর জাতীয় চরিত্রের নেই, তা আন্তর্জাতিক চেহারা পেয়েছে। আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির অবাধ চলাচলের স্বার্থেই দেশে দেশে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণ হচ্ছে। বিশ্বায়নের কেন্দ্রে রয়েছে এই লগ্নী পুঁজিইএকই সঙ্গে উৎপাদনের আন্তর্জাতিকীকরণও ঘটেছে। তুলনামূলক ভাবে সস্তা কাঁচা মাল ও মজুরির ভূখণ্ডে পুঁজি রপ্তানি করে সস্তায় উৎপাদন করিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার ফলশ্রুতিতে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির শ্রমিকদের মজুরির হার হয় একই জায়গায় থেকে যাচ্ছে নয়তো প্রকৃত মজুরির হার কমে যাচ্ছে।

বস্তুত মজুরির হারকে স্থির জায়গায় রেখে দেওয়া বা সংকোচন পুঁজির মূল লক্ষ্য হিসাবে কাজ করছে। পরিধির শ্রমজীবী জনতার আয়ের স্ফীতি সংকোচন করেও পুঁজি এই অতিরিক্ত মুনাফা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। মার্কসবাদী পথের এই সংখ্যায় উৎসা পট্টনায়েক ও প্রভাত পট্টনায়েকের লেখায় বিশ্বায়নের পর্বে পুঁজির মূল কেন্দ্রগুলির সঙ্গে পরিধির অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকাশ নিয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। শ্রমশক্তির বাজারে সংরক্ষিত বাহিনী বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে প্রকৃত মজুরি কমিয়ে রাখার কৌশলের বিষয়টি এই লেখায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই লুন্ঠনের পরিধিগুলির অধিকাংশই একসময়ে উপনিবেশ ছিলো। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর দশকে এই সদ্যস্বাধীন দেশগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সাম্রাজ্যবাদ নয়া উপনিবেশবাদী নীতি নিয়ে চলেছে। তা নিয়ে দ্বন্দ্বও অনেক বেশি তীব্র ও দৃশ্যমান ছিলো। নয়া উপনিবেশবাদী নীতি কার্যকর করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়লে সামরিক ভাবে আগ্রাসনও চালিয়েছে সাম্রাজ্যবাদ। বিশ্বায়নের পর্বে কয়েকটি মূল অর্থনৈতিক নীতি প্রায় সব দেশেই রূপায়িত হচ্ছে। অনেকে একে ‘ওয়াশিংটন কনসেনসাস’ বলেও অভিহিত করেন। আন্তর্জাতিক লগ্নী পুঁজির দাপট ছাড়াও উন্নয়নশীল দেশগুলির শাসক শ্রেণীগুলি ক্রমেই তাদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্কে যুক্ত হচ্ছে বলেই এই কাজ তুলনায় মসৃণ ভাবে সম্পন্ন হতে পারছে।

একথা ঠিকই যে লেনিনের সময়ের মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্ব এখন ফেটে পড়ছে না। বিশ্বায়নের ফলে সব সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরই বাজার বিস্তারের সুযোগ ঘটে যাওয়া তার একটি কারণ। অন্য কারণগুলির মধ্যে অন্যতম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক আধিপত্য। এর ফলেই আন্তঃ সাম্রাজ্যবাদী দ্বন্দ্বগুলি স্তিমিত হয়ে রয়েছে। কিন্তু এ কথা বলা যায় না যে এই দ্বন্দ্ব চিরকালের জন্য নিরসন হয়ে গেছে। বরং বিশ্ব অর্থনীতির একটানা সঙ্কটের পরিপ্রেক্ষিতে এই দ্বন্দ্ব নতুন করে সামনে আসতে পারে, এমন সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। ২০০৭-০৮-এ প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরে ইউরোপে যে অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয় তার ফলে বিকাশের গতি ধীর হয়ে গেছে। এই সঙ্কট থেকে মুক্তির কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ এখনও নেই, বরং ২০১৬ হলো পরপর পঞ্চম বছর যখন বিশ্বের গড় বিকাশের হার ৩.৭শতাংশের নিচে রয়ে গেছে। ১৯৯০ থেকে ২০০৭’র বিকাশের হারে কোনো ভাবেই পৌঁছোতে পারছে না বিশ্ব অর্থনীতি। উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতেও কার্যত মন্দাই চলছে, বেকারীর হার বাড়ছে, সামাজিক সুরক্ষা কমছে। ব্যয়সঙ্কোচের নামে শ্রমজীবী মানুষেরই ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বেশি বেশি বোঝা।

এই প্রেক্ষাপটে একদিকে যেমন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শ্রমিক শ্রেণী আন্দোলন সংগ্রামের পথ নিয়েছেন, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে গেছে। ব্রিটেন গণভোটে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার। গণভোটের এই রায়ের পিছনে বামপন্থী বা ব্যয়সঙ্কোচ বিরোধী মানুষের সমর্থনও যেমন রয়েছে, দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলিও এই গণভোটকে ব্যবহার করেছে এবং করে চলেছে। বিশেষ করে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে, এমনকি ইউরোপেরই অন্যান্য দেশ থেকে ব্রিটেনে কাজ করতে যাওয়া বিভিন্ন অংশের শ্রমজীবীর বিরুদ্ধে বৈরিতা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। (ব্রেক্সিট নিয়ে একটি শান্তনু দে’র আলোচনা এই সংখ্যায় রয়েছে)। প্রশ্ন উঠেছে, ব্রিটিশ পুঁজির একটি অংশ কি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসতে আগ্রহী হয়েছিল? ব্রিটেনের দুই প্রধান দল কনজারভেটিভ ও লেবার পার্টির মধ্যেই এই প্রশ্নে বিভাজন স্পষ্ট। ফ্রান্স, ডেনমার্ক, জার্মানিতেও এমন দাবি উঠেছে। আবার, কয়েকদিন আগে জি-২০’র শীর্ষ বৈঠকেও দেখা গেছে সঙ্কট থেকে অর্থনীতি বেরোতে পারছে না। পরিত্রাণের পথ কী, তা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট মতৈক্যে পৌঁছোনোও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বরং ‘সংরক্ষণবাদ’ নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। নিজের দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে সংরক্ষণের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। সঙ্কট থেকে মুক্ত হতে পারছে না বলেই এই দ্বন্দ্বগুলি সামনে আসতে শুরু করেছে। বিশ্বায়নের মধ্যে থেকে যাওয়া দ্বন্দ্বগুলি সামনে আসতে শুরু করেছে। এই প্রবণতার প্রতি সতর্ক নজর রাখা প্রয়োজন।   

পুঁজিবাদের এহেন সঙ্কটের সময়ে অতি দক্ষিণপন্থা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, জাতিবিদ্বেষ মাথা চাড়া দিয়ে থাকে। তিরিশের দশকে ইউরোপ তার সাক্ষী। মহামন্দার পরিণতিতে, ইউরোপের অস্থিরতার সুযোগে বিশেষ করে জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতা দখল করেছিল। ইতালিতে যেমন তার আগেই ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় চলে আসে তেমনই ইউরোপের আরো অনেকগুলি দেশে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তি মাথাচাড়া দেয়। কখনও ‘আহত জাতিসত্ত্বার’ ধুয়ো তুলে, কখনো সঙ্কটে জর্জরিত সাধারণ মানুষকে সুদিনের স্বপ্ন দেখিয়ে ফ্যাসিবাদ সমর্থনও আদায় করেছিল। শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদ আর নিজ দেশের পরিধিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সাম্রাজ্যবাদের চেহারা নিয়ে একের পর এক দেশে ভূখন্ড দখলের আগ্রাসনও চালিয়েছিল। যার পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ভয়ঙ্কর ক্ষয়ক্ষতি। এখন তা সম্ভবপর না হলেও পৃথিবীতে স্থানীয় যুদ্ধের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এম এ বেবির লেখায় তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অতি দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলির বিকাশ নজর না করে উপায় নেই। ২০১৪সালে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে নির্বাচিত সদস্যদের এক চতুর্থাংশ উগ্র দক্ষিণপন্থী বা ফ্যাসিস্তধর্মী দলগুলির প্রতিনিধিত্ব করছেন। এমনকি ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে এই শক্তিগুলি নির্বাচনে খুবই ভালো ফলাফল করতে পারে বলেও পর্যবেক্ষকরা অনেকেই মনে করছেন। হাঙ্গেরিতে ইতোমধ্যেই কট্টর দক্ষিণপন্থী এবং অভিবাসী-শরণার্থী বিরোধীরা সরকারে রয়েছে। নেদারল্যান্ডসে অতি দক্ষিণপন্থী ফ্রিডম পার্টির গণভিত্তি রয়েছে, তারাও ই ইউ থেকে বেরিয়ে আসায় গণভোট দাবি করেছে। ফ্রান্সে ন্যাশনাল পার্টি আগামী বছরের এপ্রিল-মে মাসে নির্বাচনে জিতবে বলে প্রচার অতিরঞ্জিত হলেও পৃথকত্ব ও উগ্র জাতীয়তার যে প্রবণতা ইউরোপজুড়ে দেখা যাচ্ছে, তার প্রভাব ফ্রান্সেও পড়তে বাধ্য। জার্মানিতেও অলটারনেটিভ ফর ডয়েশল্যান্ড-এর মতো দল সামনে চলে এসেছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের দল তাঁর নিজের প্রদেশে পরাস্ত হয়েছে। গ্রিসে গোল্ডেন ডন মাথা চাড়া দিচ্ছে। বলা বাহুল্য, এই প্রবণতা ই ইউ-র প্রধান শক্তি ফ্রাঙ্কো- জার্মান পুঁজির মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে জর্জি ডিমিট্রভ দেখিয়েছিলেন এই শক্তিগুলি অর্থনৈতিক সঙ্কটে জর্জরিত এবং শাসক শ্রেণীর অন্যান্য দলগুলির প্রতি বীতশ্রদ্ধ সাধারণ মানুষকে ‘মধ্যপথে পাকড়াও করে’। উপরন্তু এক সময়ে সাম্রাজ্যবাদী মদতেই সৃষ্ট আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ ও তার ফলশ্রুতিতে হিসাবে শরণার্থী স্রোতকে আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলিতেও দক্ষিণপন্থী শক্তির বিকাশের দিকে আমরা নজর না দিয়ে পারি না। এই সব দেশে, আগে যাদের তৃতীয় বিশ্ব বলা হতো, অর্জিত গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপরে আক্রমণ বেড়েই চলেছে। ভারতেও স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে অর্জিত মানুষের অধিকার, মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রগতিমুখী উপাদান গুরুতর আক্রমণের মুখে। মার্কসবাদী পথের এই সংখ্যায় সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ‘ভারতের ধারণা’ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষণের পূর্ণাঙ্গ বয়ান প্রকাশিত হলো। ভারতের ধারণা নিয়ে বিতর্ক আদৌ বিমূর্ত বিতর্ক নয়। আর এস এস ও  সঙ্ঘ পরিবার যে ‘ভারত’ তৈরি করতে চাইছে তা ভারতের সংস্কৃতির বিরোধী, মিশ্র ও বহুত্ববাদী গঠনের বিরোধী, ধর্মনিরপেক্ষতার বৈরি। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য তথাকথিত ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠন করা। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে যে ভারতের লক্ষ্য নিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন, সঙ্ঘ পরিবারের ‘ভারত’ তা থেকে বহু দূরে। কিন্তু সঙ্ঘ পরিবার খুবই জোরালো মতাদর্শগত অভিযান চালাচ্ছে, সামাজিক বহু সংগঠনের মধ্যে দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির জগতে তারা দখলদারি কায়েম করতে চাইছে। এই অভিযানের এখন ‘স্বর্ণযুগ’ চলছে কেননা একক গরিষ্ঠতা নিয়েই কেন্দ্রে বি জে পি সরকার গঠন করতে পেরেছে। সঙ্ঘ পরিবার গণতন্ত্রের ধারণায় বিশ্বাস করে না, হিন্দু পরিচিতিসত্ত্বাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করাই তাদের লক্ষ্য। যদি প্রয়োজন হয় এবং সেই সক্ষমতা তারা অর্জন করতে পারে তারা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেঙে দিতে তারা আদৌ দ্বিধা করবে না। ইতোমধ্যেই এই সরকারের স্বৈরতান্ত্রিক কাজের ধরন স্পষ্ট হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী সর্ব ক্ষমতার উৎস এমন ধারণাও প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। খুবই লক্ষণীয় এই যে দেশের বৃহৎ পুঁজির উল্লেখযোগ্য অংশ আর এস এস- বি জে পি’র চরিত্র বুঝেও তাদের সমর্থন করছে। সঙ্ঘ পরিবার এবং বি জে পি-ও কর্পোরেটের স্বার্থে, দেশ-বিদেশের পুঁজির স্বার্থে একের পর এক কাজ করছে। বাগাড়ম্বর যাই হোক না কেন, ভারতের অর্থনীতি সঙ্কটমুক্ত নয়। মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধির হার নিয়ে সরকারী দাবিতে সংশয় প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদদের বড় অংশই। কৃষিতে স্পষ্টতই সঙ্কট গভীরতর হয়েছে, শিল্পোৎপাদনের সূচক ক্রমেই নামছে, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে। কেন্দ্রেরই শ্রম মন্ত্রকের হিসেব কর্মসংস্থানের হার সাত বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। দেশের অর্থনীতির স্বনির্ভর ভিত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের সর্বনাশ ঘটানো হচ্ছে। লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিরও বেসরকারীকরণের লক্ষ্যে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি শেয়ার বিক্রির পথে চলেছে কেন্দ্রএমন কোনো ক্ষেত্র নেই যা বিদেশী পুঁজির জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে,  অতীতের যে কোনো সরকারের তুলনায় নরেন্দ্র মোদী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক-রাজনৈতিক সম্পর্ককে দৃঢ় করছে। বিশেষ করে এশিয়ায় মার্কিন রণনীতির শরিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে ভারত। সম্প্রতি মার্কিন সেনাবাহিনীর সঙ্গে পরিকাঠামোগত সাহায্য বিনিময়ের প্রাতিষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সেনাবাহিনী ভারতের তিন বাহিনীর ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে। এই চুক্তি সইয়ের পরে ওয়াশিংটনে যে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছিল সেখানে দু’দেশের ‘যৌথ সামরিক অভিযানের’ কথাও বলা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে শাসক শ্রেণীর এই অংশ, যারা এখন সরকারী ক্ষমতায় আছে, ভবিষ্যতে গণতন্ত্রের পক্ষে আরো ধ্বংসাত্মক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। ভারতে ইউরোপীয় ধাঁচে ফ্যাসিবাদ বিকশিত না হলেও বিপদ থেকেই যাচ্ছে। সেই বিপদ যাতে বাড়তে না পারে, সেই স্তরেই পালটা তৎপরতা দরকার বামপন্থী, প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির পক্ষে। সি পি আই (এম)-র সর্বভারতীয় প্লেনামে বলা হয়েছে, সঙ্ঘ পরিবারকে যথাযথ ভাবে মোকাবিলা করতে হলে সামাজিক, মতাদর্শগত ক্ষেত্রে নিবিড় লড়াই চালাতে হবে। সি পি আই (এম) এবং বামপন্থীদেরই এ কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে। অন্যদের টেনে আনার কাজও তখনই সম্ভব যখন বামপন্থীরা স্বাধীন শক্তিতে এই লড়াই পরিচালনার মতো সাংগঠনিক জোর অর্জন করবে।

সারা দেশে সি পি আই (এম) এবং বামপন্থীদের শক্তি কাঙ্ক্ষিত জায়গায় নেই। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের একটানা তীব্র সন্ত্রাস, বহু ক্ষেত্রে ভোট অবাধ না হওয়া, সি পি আই (এম) ও বামপন্থীদের সাংগঠনিক দুর্বলতা বিধানসভা নির্বাচনে ফল খারাপ হওয়ার মুখ্য কারণ। এই ফলাফল অপ্রত্যাশিত হওয়ার কারণ নির্বাচনের পূর্বে যে কিছুটা ভিত্তিহীন কিন্তু বিরাট প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল পরে তা হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে। নির্বাচনের সময়ে এবং পরেও বি জে পি এবং তৃণমূলের মধ্যে সমঝোতা ও পরস্পরের জন্য জমি তৈরির খেলা স্পষ্ট হচ্ছে। এছাড়া, আগেও কেরালা, পশ্চিমবঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের কমিউনিস্ট-বিরোধিতায় মদত নতুন কথা নয়। এখন ত্রিপুরায় সমস্ত কমিউনিস্ট-বিরোধী শক্তি একজোট হচ্ছে। এসব সত্ত্বেও মনে রাখতে হবে ২ কোটি ১৫লক্ষ মানুষ তৃণমূল ও বি জে পি-র বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।

নির্বাচনের পরেও তৃণমূলের তরফে সন্ত্রাস অব্যাহত রয়েছে। ভারতে কোনো রাজ্যেই বিরোধীদের এইধরনের একটানা স্বৈরাচারী আক্রমণ সহ্য করতে হচ্ছে না। বর্তমান পরিস্থিতির উপযুক্ত পার্টি সংগঠন গড়ে তুলতে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস, গণ লাইনকে কার্যকর করতে নিবিড় জনসংযোগ, উন্নত মতাদর্শগত মান অর্জন খুবই প্রয়োজনীয়। সর্বভারতীয় প্লেনামের মতো পশ্চিমবঙ্গেও পার্টির সাংগঠনিক প্লেনামে অন্যতম মুখ্য বিষয় হলো গত পঁচিশ বছরে নয়া উদারনীতির কারণে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ও বিভিন্ন শ্রেণীর ক্ষেত্রে যে পরিবর্তনগুলি হয়েছে, তার প্রভাব মাথায় রেখে আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাজের অভিমুখ স্থির করা। শ্রমিক শ্রেণী, কৃষির সঙ্গে যুক্ত শ্রেণীগুলি, মধ্যবিত্ত ও শহর এলাকায় কাজের ধারার পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন। সেই কাজ করেই স্বৈরাচারী শক্তিকে মোকাবিলা করে বামপন্থী আন্দোলনকে এগিয়ে যেতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

‘মার্কসবাদী পথ’, আগস্ট ২০১৬       

20160905

মুখ্যমন্ত্রীর সিঙ্গুর উৎসব আসলে জমি হাঙরদের সহর্ষ আস্ফালন

সূর্য মিশ্র

বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে সিঙ্গুরে টাটা মোটর্সের গাড়ি কারখানা তৈরির জন্য যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট তা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশে আমাদের রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এতই আনন্দিত হয়েছেন যে তিনি রাজ্যজুড়ে সিঙ্গুর উৎসব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর দলবল গ্রামে, শহরের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে উৎসবের আয়োজন করেছে। শিক্ষামন্ত্রী আরো একধাপ এগিয়ে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের পাঠ্যসূচীতে সমগ্র বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এইসবের পিছনে আসলে মনে হচ্ছে রাজ্যবাসীর পয়সায় রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের আয়োজন হচ্ছে।

এতকিছু করলেও বিষয়টির কিন্তু শেষ ঘটে যায়নি। এখনো কফিনের শেষ পেরেক পোঁতা হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় দুই বিচারপতি সিঙ্গুরের জমি নিয়ে মোট ৯টি বিষয়কে বিবেচনার জন্য নির্ধারণ করে।  বিচারপতিদের মোট ২০৪ পৃষ্ঠার রায়ের ৭২-৭৩ পৃষ্ঠায় এই বিষয়গুলিকে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই ৯টি বিষয়ের মধ্যে মাত্র ৩টি বিষয়ে দুই বিচারপতি সহমত হয়েছেন। ২০৪ পৃষ্ঠার রায়ে মতৈক্যের অংশ মাত্র দেড় পৃষ্ঠার মতন (১০৫-১০৬ পৃষ্ঠা)। এই রায়ের বিরুদ্ধে আবেদনের সুযোগও রাখা রয়েছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণ বাতিল করার জন্য কলকাতা হাইকোর্টে যে মামলা হয়েছিল, হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ ২০০৮ সালের ১৮ই জানুয়ারি একটি রায়ে তা খারিজ করে দিয়েছিলকিন্তু সিঙ্গুর সংক্রান্ত অন্যান্য মামলাগুলির এখনো নিষ্পত্তি হয়নি, সেগুলি এখনো বিচারাধীন। যেমন, ২০১১ সালে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফেরানোর যে বিল এনেছিলেন তা কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ খারিজ করে দেয়। সেই বিল রাষ্ট্রপতির সম্মতিও পায়নি। সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ে এই বিলের কথা উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু তা এখানে বিচার্য হয়নি। ২০১১ সালে বিধানসভায় এই বিল আনার সময়েই আমরা বলেছিলাম, এই বিল অসাংবিধানিক, এটা আটকে যাবে। সরকারকে সতর্ক করে আমরা বলেছিলাম যে জমি ফেরাতে চাইলে ইচ্ছুক এবং অনিচ্ছুকদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবেন না। যেহেতু তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার থাকতে সিঙ্গুরে গাড়ি কারখানা তৈরি হওয়ার আর কোনো বাস্তবতা ছিল না, সেই কারণে আমরা ইচ্ছুক অনিচ্ছুক নির্বিশেষে সবাইকে জমি ফেরৎ দেওয়ার জন্য বলেছিলাম এবং সরকারকে এরজন্য একটি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছিলাম যা সংবিধান ও আইনসম্মত ছিলসুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায় থেকে এটা স্পষ্ট যে তৃণমূল সরকারের আনা সিঙ্গুর বিল মাফিক অনিচ্ছুকদের জমি ফেরতের কোনো সুযোগ নেই, ঐ বিল এখন বিশ বাঁও জলে।

তাহলে মুখ্যমন্ত্রীর এই উৎসব পালনের কারণ কী? এটা ওঁর বিরাট জয়? আর পূর্বতন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সরকারের বিরাট পরাজয়? সিঙ্গুরের সব মামলার জল কোথা থেকে কোথায় গড়ায় তার তোয়াক্কা না করেই মুখ্যমন্ত্রী এখন উৎসবের আয়োজন করেছেন। সিঙ্গুর নিয়ে একশো আশি ডিগ্রি ভোল বদলে এখন অনেকেই অনেক কিছু বলছেন। তখন তাঁরা কে কী বলেছিলেন তার বিস্তারিত উল্লেখ এখানে কুলোবে না। অতএব যে যা বলতে চান বলুনকিন্তু আমরা গিরগিটি নই, কোনো মৌলিক বিষয়ে ওরকমভাবে ঘন ঘন অবস্থান বদলানো আমাদের কাজ নয়।

আমাদের অবস্থান কর্মসংস্থানের স্বার্থে শিল্পায়নের পক্ষে। কৃষি আমাদের ভিত্তি, তাকে শক্তিশালী করে পৃথিবীর যে কোনো উন্নয়নশীল দেশের মতোই আমাদের দেশ ও রাজ্যকেও কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের দিকে যেতে হবে। কৃষি আমাদের ভিত্তি, শিল্প আমাদের ভবিষ্যৎ, এর কোনো বিকল্প নেই। সিঙ্গুর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায়ের পরে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, পশ্চিমবঙ্গ শিল্পের ‘ডেস্টিনেশন’ হবে। যার রাজত্বে রাজ্যে কৃষিতে সঙ্কট ঘনীভূত হয়েছে, কৃষকের আত্মহত্যা ঘটে চলেছে, চা বাগান, চটকল থেকে শুরু করে হিন্দমোটরসহ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পগুলির অন্তর্জলি যাত্রা প্রতিদিন স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে, তিনি ছাড়া এমন ঘোষণা আর কে করবেন! তাঁর পথ বি-শিল্পায়নের পথ। সারদা-নারদা, সিন্ডিকেট, তোলাবাজি, জমির দালালি আর মাফিয়াবৃত্তির পথ, পুঁজির আদিম সঞ্চয়ের পথ। ক্রমবর্ধমান বেকার বাহিনীকে লুম্পেনবৃত্তির দিকে ঠেলে দেওয়ার পথ। সমাজের বুকে এর মারাত্মক ফলাফল আমরা ঘনঘন দেখতে পাচ্ছি। অতি সম্প্রতি কলকাতায় এক কিশোরীকে গাড়িতে তুলে ধর্ষণ করে খুনের যে বীভৎস ঘটনা ঘটেছে, সেটাও এই পথেরই ফলাফল। মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এতে উদ্বিগ্ন নন, তিনি মনে করছেন, এইসব নিয়েই উৎসব হবে।

বামফ্রন্ট সরকার সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণ করেছিল কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়নের জন্য, কৃষির ওপরে চাপ কমানোর জন্য এবং কৃষিতে আরো বিনিয়োগ বাড়িয়ে তাকে শক্তিশালী করার জন্য। শিল্পায়ন মানে কী? আমরা বুঝেছিলাম, শিল্পায়নের পথ মানে বৃহৎ, মাঝারি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের আনুপাতিক ভারসাম্য ও সমন্বয় বজায় রেখে এগোনো। কোনো একটাকে বাদ দিয়ে কেবল আরেকটাকে নিয়ে এগোনো যায় না। অযথা সময় নষ্ট না করেও কৃষিজমির মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলিতে সতর্কতার সঙ্গে খেয়াল রেখে, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার খুঁটিনাটি প্রত্যেকটি বিষয়ে সচেতন থেকে অগ্রসর হওয়া। এসবের মধ্যে কোথাও কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি ঘটেনি বা ঘটবে না, এমন দাবি করা অবাস্তব। কিন্তু বর্তমান সরকার তো আইন সংবিধান কিছুই মানে না। শিল্পক্ষেত্রে সমন্বয়, ভারসাম্য এসব তো এই সরকারের কাছে অনেক দূরের কথা। এই সরকার নৈরাজ্যের উৎস এবং উৎসবের সরকার।

সিঙ্গুরের জমি নিয়ে মামলা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে। অধিগ্রহণের সময় থেকে সুপ্রিম কোর্টে মামলার সময়ের মধ্যে সরকার বদলে গেছে। তাই মামলাতেও সরকারেই হারতে হবে- এটাই ছিল সরকারের মনোভাব। মামলা চলাকালীন আদালতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য দাখিল করা হবে কিনা, তথ্য আড়াল করা হবে কিনা, এসব সরকারের সদিচ্ছার ওপরে নির্ভর করে। কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী হবে সেসব বিবেচনা না করে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থপূরণ হতে পারে, রাজ্যের জনগণের সামগ্রিক স্বার্থপূরণ হবে না। মুখ্যমন্ত্রী যে বিমানবন্দরের উদ্বোধন করেছেন (যদিও এরমধ্যেই সেটা বন্ধ হয়ে গেছে), সেখানকার জমিও যদি সিঙ্গুরের মতো একই কায়দায় ফেরতের দাবি ওঠে তখন কী হবে?

১৮৯৪ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন যে কৃষকদের স্বার্থরক্ষার পক্ষে যথেষ্ট নয়, সেই আইনের খোলনলচে যে বদলানো দরকার, সেই দাবি বামফ্রন্ট সরকার ধারাবাহিকভাবে করে এসেছে। শুধু তাই নয়, এই আইনে কৃষক ও বর্গাদারদের স্বার্থবাহী অনেকগুলি সংশোধনীও বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে করা হয়েছিল যা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনও পেয়েছিলকেন্দ্রীয় সরকার এবং অন্যান্য রাজ্যগুলিও বিভিন্ন সময়ে এই জমি অধিগ্রহণ আইনে কিছু কিছু ইতিবাচক সংশোধন করেছিলকিন্তু এটাই ছিল কেন্দ্রীয় আইন এবং ২০১৩ সালের আগে পর্যন্ত ঐ আইনটিই ছিল জমি অধিগ্রহণের একমাত্র আইন। ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন আইন বলবৎ হওয়ার পরেও সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এমন বলা যাবে না। কারণ আমাদের কাছে মূল প্রশ্নগুলি জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্য, নীতি ও অভিমুখ ঘিরে। কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করে শিল্প বা জনস্বার্থবাহী প্রকল্পের জন্য, পরিকাঠামোর জন্য জমি সংগ্রহ করতেই হবে। প্রশ্ন হলো, এতে কি সরকারের কোনো ভূমিকা থাকবে না? সরকারের কোনো হস্তক্ষেপের প্রয়োজন থাকবে না? কৃষকদের কি জমি হাঙরের মুখে ছেড়ে দেওয়া হবে?

এই প্রশ্নগুলির নিরিখে ভাবতে হবে কী ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে? এখন কী ঘটছে এরাজ্যে? বামফ্রন্ট সরকারের অধিগ্রহণ করা জমিগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে? সড়ক, বিদ্যুতের সাব-স্টেশন, ইত্যাদি নির্মাণের জন্য এখন কীভাবে কতখানি জমি সংগ্রহ করা হচ্ছে? পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে এখন জমি মাফিয়াদের মুখে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর সিঙ্গুর উৎসবে জমির মাফিয়া, সিন্ডিকেট, প্রোমোটারি বাণিজ্য, বেসরকারী শিক্ষা স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলির বাণিজ্যিক মালিকদের সহর্ষ আস্ফালন দেখা যাচ্ছে। সেটা কি নজরে পড়ছে না? নাকি এগুলি উপেক্ষা করার মতো? জমিবাণিজ্য থেকে সুবিধাভোগী এইসব আস্ফালনকারীদের মধ্যে শাসকদলের কেষ্টবিষ্টুরা রয়েছেন, মন্ত্রীসান্ত্রীরা আছেন, আছেন ভাই-ভাইপোরাও। সততার প্রতীকের রাজত্বে এই ক’বছরে কার কত সম্পত্তি হলো তা থেকেই আস্ফালনের কারণ বোঝা যায়। ৩৪বছরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের ভাই-ভাইপোদের এমন হয়েছিল নাকি?

২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগেও আমরা বলেছিলাম, সিঙ্গুরের বিবাদ আমরা মেটানোর পক্ষে। আমরা চেয়েছিলাম কৃষকের স্বার্থ রক্ষা করেই সিঙ্গুর-শালবনী-রঘুনাথপুরে শিল্প হবে। নির্বাচনে যে ২কোটি ১৫ লক্ষ মানুষ তৃণমূল-বি জে পি-র বিরুদ্ধে ভোট দিলেন, তাঁরা তো এসব জেনেবুঝে ভেবেই ভোট দিয়েছেন। এই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে সর্বত্র অবাধ হলে এবং ৪শতাংশ ভোট এদিক-ওদিক হলে ফলাফল কী হতো তা বলা যায় না।

এখন মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের রায় পেয়ে উৎসবে মেতে আছেন। আপনি জমি জরিপের কাজ শুরু করে দিন, তবে মানবজমিনের কথাটাও মাথায় রাখবেন। সিঙ্গুরের যেসব যুবকযুবতী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে কারখানায় কাজে যোগ দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন তাঁদের কী হবে? তাঁদের কাছে কী কৈফিয়ৎ দেবেন? সিঙ্গুরের জমির কতটা চাষযোগ্য করে দেবেন? যেটা চাষযোগ্য নয়, সেটার কী করবেন? জমি না হয় দিলেন, কিন্তু যারা ফেরৎ পেলো তাঁদের আয় ও কর্মসংস্থানের সমাধান কীভাবে করবেন? ফেরৎ পাওয়া জমি শেষপর্যন্ত কৃষকদের হাতে থাকবে তো? নাকি সিঙ্গুর উৎসবের উদ্যোক্তাদের হাতে চলে যাবে? অথবা তাঁদের মাধ্যমে অন্য কোথাও হস্তান্তরিত হয়ে যাবে? আপনি যতই উৎসব করুন, আপনার এখনো অনেক দূর যাওয়া বাকি। হ্যাঁ, উৎসবের মরশুম আসছে। ঈদ আসছে, শারদোৎসব আসছে। কিন্তু সরকারের উৎসব করা সাজে না। বাংলার যন্ত্রণাক্লিষ্ট সাধারণ মানুষ যে সরকারের উৎসবে মেতে ওঠার মেজাজে নেই, তা ২রা সেপ্টেম্বরেই আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। অতএব, ধীরে, রজনী ধীরে।

আর যারা এখন ভোল বদলাচ্ছেন, তাঁদের বলি, সাধু সাবধান।


গণশক্তি, ৪ঠা সেপ্টেম্বর, রবিবার, ২০১৬