20161101

নেলসন মান্ডেলাঃ ১৯১৮-২০১৩

৫ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে বিদায় নিলেন নেলসন মান্ডেলা, দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা, কালো মানুষের বিশ্বস্ত মুক্তিযোদ্ধা, দেশের বড়ো আদরের মাদিবা। শেষ কয়েক মাস অশক্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন; বিশ্বের অনেক মানুষ আশঙ্কায় দিন কাটিয়েছেন। পঁচানব্বই বছর পার করে অমরত্বের পথে পাড়ি দিলেন প্রবাদপুরুষ।

বিংশ শতাব্দীর বড়ো জননেতাদের মধ্যে নেলসন মান্ডেলার নাম থাকবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তালিকায় বেশ কয়েকজনের নাম লেখা হবে। কিন্তু পুরো একটা জাতির জনক বা বিশ্বের বিপুল মানুষের আকাঙ্ক্ষার অধিনায়ক হয়ে ওঠা সহসা ঘটে না। লেনিন বা গান্ধী যেমন, যেমন মাও জে দং বা হো চি মিনতেমনই জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন নেলসন মান্ডেলা। অনেকের মতে স্বদেশের চেয়ে বিদেশেই বেশি পূজ্য ছিলেন তিনি; জীবদ্দশায় প্রতীক হয়ে গেলে যেমনটি হয়, মিডিয়া তাঁর এই নিরাপদ প্রতিমাটিকে লুফে নিয়েছিল। সবাই তাঁর নাম জীবদ্দশায় প্রতীক হয়ে গেলে যেমনটি হয়, মিডিয়া তাঁর এই নিরাপদ প্রতিমাটিকে লুফে নিয়েছিল। সবাই তাঁর নাম শুনেছে, সবাই তাঁকে সম্মান জানায়, রাষ্ট্রনেতারা তাঁর করমর্দন করে ধন্য হন, চিত্রতারকারা হুড়োহুড়ি করে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলে। প্রতিমার আড়ালে অবশ্য অন্যতর বাস্তব লক্ষ করা যায়। অন্য যুগপুরুষদের মতো চিন্তাবিদ তিনি ছিলেন না, নতুন কোনো দর্শন তিনি পত্তন করেননি, সংগ্রামে বা সমাজচিন্তায় নির্দিষ্ট কোনো যুগান্তর আনেননি। স্বাধীনতার লড়াইতেও তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃঢ় কিন্তু প্রথাগত, সহকর্মীদের সঙ্গে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই তিনি চলতেন ও আন্দোলন চালাতেন। ঝোঁক ছিল অহিংস আন্দোলনে, কিন্তু যখন এ.এন.সি সশস্ত্র সংগ্রামের পথে গেল, তখন তিনি আর গান্ধীবাদী পথ আঁকড়ে থাকলেন না, ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুখোমুখি আক্রমণে। সবার সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলতেই তিনি পছন্দ করতেন। সে কারণেই নতুন বিধানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তিনি যে খুব বড়ো কোনো সংস্কার সাধন করতে পেরেছেন তাও বলা যাবে না, কারণ তখন তাঁর কাছে পুরোনো রাজের সঙ্গে রফার একটা দায় এসে পড়েছে। কিন্তু সময়ের সবেচয়ে প্রগতিশীল, সর্বথা গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক বোঝাপড়ার রাজনৈতিক রূপকার হিসেবে মান্ডেলা অবিস্মরণীয়। তেমনি অবিস্মরণীয় তাঁর সর্বপ্রধান কীর্তি: বর্ণবিদ্বেষে বিভাজিত, হিংস্রতায় বিক্ষত, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ নানা জনগোষ্ঠীর মানুষকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে সামিল করা।

এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য তাঁকে অনেক ব্যক্তিগত দাম চোকাতে হয়েছে। জেলখানায় সাতাশ বছর কেমন যেন ধারণার মধ্যে আসে না। এই অতিপ্রাকৃতিক অত্যাচার তিনি সয়েছিলেন দেশের মানুষের কথা ভেবে। আসলে দীর্ঘ কারাবাসের বিকল্প হিসেবে একেবারে খতম করে দেবার মতলব এটেঁছিল অ্যাপারটাইডস সরকার। ১৯৬৩ সালে দেশদ্রোহিতার মামলায় সেটাই ছিল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, নেহাত শ্বেতাঙ্গ জজসাহেবের শেষ মুহূর্তের শিথিলতায় যাবজ্জীবনের আদেশ হয়। জীবনের সবচেয়ে দামি সবচেয়ে সৃজনশীল দিনগুলো গারদের আড়ালে কেটে গেল, সহ্য করতে হল ইতরতম অত্যাচার, প্রিয়জনের থেকে দূরে থাকতে হল, রুদ্ধ হয়ে গেল আন্দোলনে যোগ দেবার রাস্তামান্ডেলার নৈতিক মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেবার আয়োজন ছিল ব্যাপক। সবাই জানে সেই বর্ণবিদ্বেষী প্রকল্পের ভগ্নদশার ইতিহাস। রবেন দ্বীপে কারাবাস, তারপর অন্য জেলে, হাড়ভাঙা খাটুনি, অপকৃষ্ট খাবার, ন্যূনতম সুযোগসুবিধার অভাব, যক্ষ্মার সংক্রমণ, কোনো কিছুতেই দমানো গেল না এই একগুঁয়ে জেদি লক্ষ্যে অবিচল অনুদ্‌বিগ্নমনা মুক্তিযোদ্ধাকে।

আদালতে মান্ডেলার ঐতিহাসিক জবানবন্দি এখনও বিশ্বের বিবেক শিহরণ জাগায়।

আমার জীবন আমি আফ্রিকার জনগণের এই লড়াইতে উৎসর্গ করেছি। আমি লড়েছি সাদা আধিপত্যের বিরুদ্ধে, যেমন লড়েছি কালো আধিপত্যের বিরুদ্ধে। আমি আদর্শ হিসেবে নিয়েছি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক এক সমাজব্যবস্থাকে যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে আর থাকবে সামাজিক ঐক্য। আমি এই আদর্শের জন্যই বাঁচতে চাই; আশাকরি একদিন এটি রূপায়িত হবে। যদি দরকার হয় আমি এই আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত।

১৯৬৩ সালের এই ঘোষণাকে দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামের আশু লক্ষ্য হিসাবে নিলে ভেবে দেখা দরকার ঠিক কী ধরনের গণতন্ত্র এবং সামাজিক ঐক্য চেয়েছিলেন যুবক মান্ডেলা, আর দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা-সংগ্রাম কোন অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছিল। এই সংগ্রামের অনেক শরিক ছিল, ভিতরে ছিল অনেক টানাপোড়েন। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস আর দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ছিল কয়েকটি স্থানীয় দল; আর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ছিল জুলু ইনকাথা পার্টি। এরা সবাই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের অবসান চেয়েছিল, কিন্তু তার পর কি হবে তাই নিযে কখনো একমত হতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টির সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অবশ্য ছিল তুলনায় স্পষ্ট, সারা পৃথিবীর সাম্যবাদীরা যেমন চেয়ে এসেছে তারাও তেমনিভাবে চেয়েছিল শ্রেণিহীন সমাজ, কেবল বর্ণবিদ্বেষের অবসান নয়। নুতন রাষ্ট্র ব্যক্তিগত পুঁজি রাষ্টায়ত্ত্ব করে নেবে, সমানভাবে বণ্টিত হবে দেশের ঐশ্বর্য এবং আয়, সবার সমান অধিকার থাকবে খাদ্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদির সংস্থানে। অবশ্য নেতা জো স্লোভো চাইতেন বিলম্বিত সূর্যাস্তের মতো ধীরগতির পরিবর্তন। মান্ডেলা একসময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতেও নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু কমিউনিস্ট মতাদর্শে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। তাঁর আত্মজীবনী পড়লে মনে হয় যে নিজের জোজা (Xhoza) আদিবাসী সমাজের চিরায়ত সামাজিক ঐক্য তাঁর মনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল তার তুলনায় অন্যান্য ধারণা তেমন জোরালো হয়ে ওঠেনি। শ্রেণি-সংগ্রাম হয়তো তাঁর কাছে তেমন বাঞ্ছিত ছিল না, কারণ কৌম সমাজের সাধাসিধে ভ্রাতৃত্ব অসাম্যকে মেনে নিয়েই তৈরি হয়ে ওঠে; তার গড়নে সম্পদ ও ক্ষমতার উচ্চাবচতা থাকে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকে না, কিন্তু সবাই অংশীদার হওয়াতে একটা সাম্যের আবহ বিরাজ উচ্চাবচতা থাকে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকে না, কিন্তু সবাই অংশীদার হওয়াতে একটা সাম্যের আবহ বিরাজ করে সমাজের যৌথ কাজকর্মে। এটা একোবরেই আশ্চর্য নয় যে বর্ণবিদ্বেষী জমানার অবসানের দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক অসাম্য দূরীকরণের প্রকল্প পুরোপুরি জাড়িয়ে নেননি মান্ডেলা। তাঁর কাছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেজন্য সাদা-চামড়া গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের জমানার অবসান আশঙ্কা করে মান্ডেলাকে বারবার টোপ দিয়েছিল জেল থেকে বেরিয়ে তাদের শর্তে বোঝাপড়ার সন্ধান করার জন্য। বলা বাহুল্য, মান্ডেলা পূর্ণ স্বাধীকারের কোনো বিকল্প গ্রহণ করতে রাজি হননি।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে বিনা শর্তে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবার পর মান্ডেলাকেই অন্তিম ভরসা হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিল বর্ণবিদ্বেষী নেতৃত্ব, নতুবা জনরোষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত সাদা চামড়ার সম্প্রদায়, রক্তের স্রোত বয়ে যেত জনপদের রাস্তায় রাস্তায়। মান্ডেলা যখন ১৯৯৪ সালে নতুন দক্ষিন আফ্রিকা রাষ্ট্রের হাল ধরলেন তখন সাদা-কালো স্ত্রী-পুরুষ গরিব-বড়োলোক বামপন্থী-উদারপন্থী বিপ্লবী-রক্ষণশীল নির্বিশেষে তাঁকে সর্বসম্মত নেতা বলে স্বাগত জানালেন জনসধারণ। তাঁরা জানতেন যে এই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন মাদিবা।

এক দফা রাষ্ট্রপ্রধান থেকেই মান্ডেলা সরকারি কাজ থেকে অব্যাহতি নিলেন ১৯৯৯ সালে; ২০০৪ সালে, তাঁর কথায়, ‘অবসরথেকেও অবসরতাঁর প্রাপ্য বলে জানালেন। ততদিনে বয়স হয়েছে ছিয়াশি, শরীর ভেঙে পড়েছে অন্ধকারায় দীর্ঘ দিনযাপনের ফলে, ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে মারনরোগের নিয়ত সম্ভাবনা। ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনেও নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলাতে হয়েছে তাঁকে। দ্বিতীয় স্ত্রী উইনি-র সঙ্গে সরকারি ভাবে ১৯৯২ সালে বিচ্ছেদ হয়, যদিও জেলে থাকতেই উইনি-র উচ্ছৃঙ্খল এবং অসামাজিক কাজকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের অনেকেও তাঁকে নানাভাবে দুঃখ-ক্লেশ দিয়েছে। বড়ো পরিবারের কর্তা আর আদিবাসী সমাজের রাজপুরুষ হিসেবে তাঁকে নানারকম দায় নিতে হয়েছে, যার ঝুটাঝামেলা নেহাত কম ছিল না। একেক সময়ে এমন গুঞ্জন শোনা গেছে যে মাদিবা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নানাভাবে নিজের ও পরিবারের আখের গুছিয়ে নিতে পরাঙ্মুখ ছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান হিসেবে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান এবং আত্মত্যাগের নিরিখে অনেকেই এইসব মানুষী দুর্বলতাকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। শেষ বয়সে মোজাম্বিকের প্রয়াত জননায়ক সামোরা মাকেল-এর বিধবা স্ত্রী গ্রাকা-র সঙ্গে বিয়ে হবার পর অপেক্ষাকৃত শান্তিতে তাঁর দিন কেটেছিল। এই অন্তিম সুখটুকু তাঁর প্রাপ্য ছিল।

যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মান্ডেলা রেখে গেলেন সেটি তেমন সুখী দেশ নয়। সম্পদের বৃহদংশ এখনও সাদা চামড়ার লোকেদের হাতে, তাদের অতীত কুকর্মের জন্য তেমন ফলভোগও করতে হয়নি। মান্ডেলা সরকারের ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন অনেক কিছু ধামাচাপা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বহুজাতিকদের দাপট অব্যাহত। চারিদিকে অন্যায় বঞ্চনা হিংসার আতিশয্য, চুরি-ডাকাতির সমূহ উপদ্রব। দেশের মানুষ নিরাপদ নয়, আগেকার গরিবেরা গরিবই রয়ে গেছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটা আসল কথা হচ্ছে এই দেশ এখন স্বাধীন, বর্ণবৈষম্য অতীত, সব মানুষের সামনে অন্তত রয়েছে সম্ভাব্য বিকাশের খোলা রাস্তা। সেজন্য সাম্প্রতিক কালের প্রধান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনানীর তিরোধানে তাঁকে অন্তিম সেলাম জানানো বিশ্ববাসীর কর্তব্য।

সম্পাদকীয়, ‘আরেক রকম’

প্রথম বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ১৬-৩১ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ণ-১৫ পৌষ ১৪২০
Copyright @ Arekrakam

স্বৈরাচারী সিদ্ধার্থশঙ্করের যোগ্য উত্তরসূরী মমতা ব্যানার্জি

সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত

পাঁচ বছর আগে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে প্রথম ধ্বংস করেছিলেন বামফ্রন্ট আমলে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যের গণতন্ত্র। প্রথম দফার শাসনকালে ১৭৬জন এবং বিধানসভা নির্বাচন চলাকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে আরও ২৫ জন বাম কর্মী খুন হয়েছেন তৃণমূল ভৈরববাহিনীর হাতে। এখনও পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি কর্মী ঘরছাড়া। লক্ষাধিক কর্মীকে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। গত নির্বাচনের পর প্রায় ৬০০ পার্টি ও প্রায় দেড়শ বাম গণ সংগঠনের অফিস দখল, ভাঙচুর বা আগুন দেওয়া হয়েছে। সদ্য নির্বাচিত বাম বা বিরোধী বিধায়করাও আক্রান্ত হয়েছেন। সন্ত্রাস, আক্রমণ, কন্ঠরোধ করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও মমতা ব্যানার্জী ভয়মুক্ত হতে পারছেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, নানা আক্রমণ ও সন্ত্রাসের মধ্যেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে ৫৫ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন।

বিরোধীদের মর্যাদা দেওয়ার প্রচলিত রীতির মধ্যেই সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভর করে। বিরোধীদের দূরবীণ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে নাবা 'বিরোধীরা ২০ বছর চুপ করে থাকুক' মমতা ব্যানার্জীর এই সদম্ভ হুমকি আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। অনৈতিকভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে বা মোটা টাকার উৎকোচের লোভ দেখিয়ে গায়ের জোরে বিরোধী দল পরিচালিত একের পর এক জেলা পরিষদ, পুরসভা, পঞ্চায়েত দখল করছে তৃণমূল কংগ্রেস। পাঁচ মাস আগে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে মানুষের রায়ে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলি এইভাবে প্রথম দখল করা শুরু হয়েছে - তা কিন্তু নয়। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর থেকেই মমতা ব্যানার্জী চেষ্টা করেছেন বিরোধীদের হাতে থাকা পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলি যে কোনভাবে ভয় দেখিয়ে জোর করে দখল করে নেওয়ার। মমতা ব্যানার্জীর উদ্দেশ্য স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে পুলিশ ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে রাজ্যকে বিরোধীশুন্য করে দেওয়া। কিন্তু ২ কোটি ১৫ লক্ষ ভোটারকে দখল নিতে পারবেন না মমতা ব্যানার্জী।

প্রথম এই ধরনের স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে সংগঠিত গুন্ডামির সাহায্যে হালিশহর পৌরসভা দখল করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৫শে নভেম্বর। পৌর নির্বাচনে হালিশহর পৌরসভার ২৩টির ওয়ার্ডের মধ্যে বামফ্রন্টের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ১৪, তৃণমূল কংগ্রেসের ৮ এবং কংগ্রেসের ১ জন। তৃণমূল গুন্ডাদের সশস্ত্র বাহিনী ২৪শে নভেম্বর রাতে আক্রমণ, ভাঙচুর, প্রাণে মারার হুমকির পর অপহরণ করে হালিশহরে সি পি আই (এম)-র ৬জন কাউন্সিলরকে জবরদস্তি পদত্যাগ করায়। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জোর করে লেখানো হলো পদত্যাগপত্র। মহকুমা শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে এই ৬জন কাউন্সিলর জানিয়ে দিলেন, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা স্বেচ্ছায় নয়, স্রেফ প্রাণনাশের হুমকির মুখে দাঁড়িয়েই তাঁরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, তারা তৃণমূলকে প্রকাশ্যে সহযোগিতা করেছিল।

বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার মমতা ব্যানার্জীর এই স্বৈরাচারী পদ্ধতির সাথে সাতের দশকের সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পদ্ধতির অবিকল মিল আছে। ৭২-৭৭এর গণতন্ত্র নিধনকারী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় জীবিতকালে বারবার বারবার বলেছেন, মমতা তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতায় মমতা ব্যানার্জী কর্তৃক আয়োজিত এক কনভেনশনে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় বলেছিলেন, "কি করে ভোটে জিততে হয় তা আমি দেখিয়ে দিয়েছি। মমতা আমার যোগ্য উত্তরসুরী।মমতা ব্যানার্জী যে তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী, তাঁর প্রমান গত ৫ বছর ৫ মাসের রাজ্য শাসনে প্রতি মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অনুভব করছেন। যত দিন যাচ্ছে, তত বেশী করে প্রমান পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চায়েত, লোকসভা, পৌরসভা ও সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যনার্জী প্রমান করে দিয়েছেন, তিনি শুধু সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের উত্তরসুরী নন, গণতন্ত্র নিধন, সন্ত্রাস-সহ এই সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ে তিনি তাঁর পূর্বসুরী থেকে এগিয়ে রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ আজ গণতন্ত্র নিধনের সুতিকাগারে পরিণত হয়েছে।

অতীতের সাথে তুলনা না করলে বোঝা যাবে না - কেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মমতাকে উত্তরসুরী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবাপন্নরা ক্ষমতায় আসার পর কিভাবে সর্বগ্রাসী ভুমিকা গ্রহণ করে গণতন্ত্রকে চূর্ণ বিচুর্ণ করে দিতে পারে এই অভিজ্ঞতা ১৯৭০ সাল থেকে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ও পরে ১৯৭৫ সালে জরুরী অবস্থা জারীর পর সারা ভারতবর্ষের মানুষের হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ১৬ই মার্চ দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পতনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পর রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে নিযুক্ত বি বি ঘোষ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আইএএস ও আইপিএস-দের গোপন সভা ডেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে করেই হোক এ রাজ্য থেকে সিপিআই(এম)-এর প্রভাবকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কোন শৈথিল্য বা গাফিলতি বরদাস্ত করবেন না। একটি সংবিধান প্রদত্ত বৈধ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ সেই সময় দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীকালে ভারত সরকারের এসআইবি তাদের অতি গোপন সার্কুলারে বিভিন্ন হত্যাকান্ডের সঙ্গে সিপিআই(এম)-এর নাম জড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এরপর কিভাবে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নের্তৃত্বে রিসার্চ এ্যান্ড এ্যানালিসিস উইং-এর ('') পরামর্শ ও সহযোগিতায় ১৯৭২ সালে রিগিং নির্বাচন সম্পন্ন করে কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করেছিল - তা আজ ইতিহাস। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জী একই পদ্ধতিতে পুলিশ ও সাধারণ প্রশাসনকে ব্যবহার করে বামপন্থীদের, বিশেষ করে সিপিআই(এম)-কে, মিথ্যা মামলা, খুন, সন্ত্রাস, আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ নিয়েছেনতা মানুষ গত পাঁচ বছর প্রত্যক্ষ করেছেন। মমতার আমলে এখন রাজ্যে একইভাবে তৃণমূলের চক্রান্তে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে সিপিআই(এম)-এর নাম জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে হলদিয়ার পার্টিনেতা শ্যামল মাইতিকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার। অতীতে মমতা ব্যানার্জী কর্তৃক 'চম্পলা সর্দারের' মিথ্যা কেসের মতো এই কেসটিকেও সাজানো হয়েছে পুলিশ-তৃণমুলের যৌথ চক্রান্তে। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ক্ষমতায় এসেই সমস্ত নির্বাচিত পৌরসভাকে ভেঙে দিয়েছিলেন। মমতার আমলে পৌর ও পঞ্চায়েত প্রতিটি নির্বাচন গায়ের জোরে ছাপ্পা ভোটের মাধ্যমে দখল করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যেখানে বিরোধীরা জিতে বোর্ড গঠন করতে পেরেছেন, সেখানে চলেছে গায়ের জোরে ভয় দেখিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলত্যাগে বাধ্য করে দখল করার নিকৃষ্ট কাজ।

সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের জমানায় দর্পন ও বাংলাদেশ সাপ্তাহিক পত্রিকার দপ্তরে হামলা হয়েছিল। দর্পণ পত্রিকা ছাপার অপরাধে মডার্ণ ইন্ডিয়া প্রেসকে সীল করে দিয়েছিল সরকার। ফলে দর্পণের সাথে ফ্রন্টিয়ার পত্রিকাও বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ীর উপর তান্ডব নৃত্য করে ও হামলা চালিয়ে ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিউটে জয়প্রকাশ নারায়ণের সভা বানচাল করেছিল যুব কংগ্রেস ও ছাত্র পরিষদ। জয়প্রকাশের উপর হামলার ঘটনা সমর্থন করে বিধাননসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন সিপিআই নেত্রী ইলা মিত্র। এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার জন্য সত্যযুগের বার্তা সম্পাদক কল্পতরু সেনগুপ্তকে বিধানসভায় ডেকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য করানো হয়েছিল। মমতার রাজত্বে ২০১৩ সালে প্রায় একইরকম অভিযোগ এনে অরুণাভ ঘোষকে বিধানসভায় দুঘণ্টার জন্য জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। বিধানসভায় শাসকদলের বিধায়কদের হাতে সি পি আই (এম) বিধায়ক দেবলীনা হেমব্রম এবং গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জির নিগ্রহের সংবাদ পরিবেশনের জন্য আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে। বিধানসভার স্বাধিকার রক্ষা কমিটির বিবেচনাধীন অভিযোগটি ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রত্যাহৃত হয়। সম্ভবত সরকার ও পত্রিকাটির মধ্যে গোপনে কোনও সমঝোতার ভিত্তিতে অভিযোগটি প্রত্যাহৃত হয়েছিল। আনন্দবাজারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও অন্য একটি  বৈদ্যুতিন সংবাদ চ্যানেলের বিরুদ্ধে একটি স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পত্র পত্রিকার উপর এই আক্রমণ পুঁজি পরিচালিত সংবাদ মাধ্যম মেনে নিলেও একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা তা কখনো মেনে নেয়নি। তাই বারবার আক্রমনের মুখোমুখি হতে হয়েছে গণশক্তি পত্রিকাকে।

১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন মধ্যরাত্রে অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর সংবাদ ভারতের অনেক পত্রিকা ছাপতে সাহস করেনি। পরদিন সান্ধ্য গণশক্তি পত্রিকায় শীর্ষ সংবাদ হিসাবে খবরটি ছাপা হয়েছিল - "আপৎকালীন অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা ঘোষণা : বিরোধী পক্ষের নের্তৃবৃন্দ গ্রেপ্তার, জয় প্রকাশ নারায়ণ, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতা মেজর জয়পাল সিং, মোরারজী দেশাই প্রমুখ সংগঠন কংগ্রেস, এসপি, জনসংঘ, বিএলডি প্রমুখ বিরোধী নের্তৃবৃন্দ কারাগারে আটক : জ্যোতির্ময় বসু, সুরেন্দ্র মোহন প্রমুখের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা।" শুধু সংবাদটি প্রকাশ করেই গণশক্তি ক্ষান্ত থাকেনি। জরুরী অবস্থার  সেন্সর বিধি ও সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে ঐ দিনই অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে "গণতন্ত্রের মুলোচ্ছেদ গণ প্রতিরোধ চাই" সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : " ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা:)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদকমন্ডলী অবিলম্বে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহারের দাবি করেছে, ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তি দাবী করছে এবং জনগণের প্রতি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহবান জানাচ্ছে। আহবান জানাচ্ছে - গণতন্ত্রের উপর এই বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলুন।"  ভারতের আর কোনও পার্টি বা সংবাদপত্র অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর বিরুদ্ধে এই ধরনের বিবৃতি বা সম্পাদকীয় লেখার সাহস সেদিন দেখাতে পারেনি। একটি কথা উল্লেখ করা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক, আরএসএস প্রধান জরুরী অবস্থা জারীকে সমর্থন করে নিজেদের মুক্তির জন্য জেল থেকে একাধিক চিঠি দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে।

জরুরী অবস্থার সময় আনন্দবাজারের সাংবাদিক বরুন সেনগুপ্ত এবং গৌর কিশোর ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্তও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, আনন্দবাজার সেইসময় এই গ্রেপ্তারের সংবাদ পর্যন্ত ছাপতে সাহস করেনি। সেন্সর বিধির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণশক্তি সেই সংবাদ ছেপেছিল। সারা ভারতে যে ১০০টি পত্রিকায় জরুরী অবস্থার সময়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছিল, তার মধ্যে গণশক্তি ছিল অন্যতম। সেন্সর বিধি লঙ্ঘনের জন্য গণশক্তির উপর ৪৭টি নোটিশ জারী করা হয়েছিল। 'গণশক্তি পত্রিকার প্রেস কেন সীল করা হবে না' - এই মর্মে নোটিশ জারী হলে কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য প্রধান বিচারপতি স্থগিতাদেশ দেওয়ায় সে যাত্রায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সরকারের মনস্কামনা পূর্ণ হয়নি। মমতা ব্যানার্জী্র আমলে আবার গণশক্তি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । অন্যান্য অধিকাংশ সংবাদ মধ্যমকে তাঁবেদারে পরিণত করতে পারলেও গণশক্তির বিজ্ঞাপন বন্ধ করে ও পত্রিকা প্রচারে বাধা দিয়ে গণশক্তিকে টলানো যায়নি। মাথা উঁচু করে স্বৈরশক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একমাত্র গণশক্তি।

অনেকেই আজ ভুলে গিয়েছেন, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সরকার জেলার উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ে জেলায় জেলায় মন্ত্রীসভার বৈঠকের আয়োজন করতেন। তাতে জেলা বা রাজ্যের, কোন উন্নয়ন হয়নি। মমতাও একই পদ্ধতিতে গত পাঁচ বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে জেলায় জেলায় শতাধিক প্রশাসনিক বৈঠক করেছেন। রাজ্যের কোনও উন্নতির লক্ষণ তাতে দেখা যাচ্ছে না। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মাসান্তিক বেতার ভাষণে উন্নয়নের মিথ্যা ফিরিস্তি দিতেন। মমতাও শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে সংবাদ মাধ্যমে নিজের ছবি দিয়ে উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। যেমন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলে মদ, জুয়া আর সাট্টার রমরমা বাজার গড়ে উঠেছিল, তেমনই এই রাজ্যে তৃণমূলের সিন্ডিকেট ও তোলাবাজীর রমরমা বৃদ্ধি ছাড়া রাজ্যের মানুষ কোনও উন্নয়ন চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন না।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গণতন্ত্রের অবমাননা ও লাঞ্ছনা কোনদিন মুখ বুজে মেনে নেয়নি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গ বারেবারে স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। এই রাজ্যের মানুষের গণতন্ত্রবোধ এতটাই প্রখর যে, রাজ্য ও দেশের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে গণতন্ত্র বিপন্ন হলে তাঁরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য - কোন স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রী মনোভাবাপন্নদের কাছে মাথা নত করে না। মমতার কাছেও নয়। গত পাঁচ বছর বহু চেষ্টা করেও মমতা ব্যানার্জী বামপন্থাকে নিশ্ছিহ্ন করতে পারেননি। আগামী দিনেও পারবেন না।                                                        

20161026

নভেম্বর বিপ্লব: মানবজাতির জন্য এক নতুন দিশা

শ্রেণী শোষণ থেকে মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় মানব ইতিহাসে প্রথম অগ্রগতি হলো মহান নভেম্বর বিপ্লব। নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে শ্রমিক কৃষক ও অন্যান্য শোষিত অংশের মানুষের এটি প্রথম সফল বিপ্লব।

নভেম্বর বিপ্লব কি?
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এই বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন সমাজন্ত্রিক রাষ্ট্র —— সোভিয়েত ইউনিয়ন। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনকে তা বিশ্বের সামনে নিয়ে আসে।
রাশিয়ার এই বিপ্লব সংগঠিত হয় ১৯১৭ সালের ১৭ই নভেম্বর (প্রাচীন রাশিয়ার বর্ষপঞ্জী অনুসারে এই তারিখ ছিল ২৫শে অক্টোবর)।
জার রাজতন্ত্রের কেন্দ্র ছিল রাশিয়াএই রাজত্বের হাতে ছিল গোটা মধ্য—এশিয়াসহ বিশাল সাম্রাজ্য। জারের শাসন পদ্ধতির ভিত্তি ছিল বৃহৎ জমিদারতন্ত্র। এই সাম্রাজ্যের উৎকৃষ্ট জমির ৮০ লক্ষ হেক্টর ছিল সর্বশেষ জারের মালিকানায়। সেই সময়ে ছিল ২৮,০০০ বৃহৎ জমির মালিক যাদের হাতে ছিল ১৬.৭৪ কোটি একর জমি।
এই আধা সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি প্রথার পাশপাশি পুঁজিবাদী বিকাশ শিল্পখনি ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুঁজির উদ্ভব ঘটায়। দ্রুততার সঙ্গে পুঁজিবাদের বিকাশ হলেও বৃহৎ ইউরোপীয় দেশগুলির পুঁজিবাদী বিকাশের তুলনায় রাশিয়া ছিল তখনও পশ্চাদপদ।
জার ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন। জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশ ও সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতার কারণে এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বাধে।
লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষককে জারের সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করে এই যুদ্ধে পাঠানো হয়। এই যুদ্ধে রুশ পক্ষ জার্মানির কাছে হারছিল এবং হাজার হাজার রুশ সেনা প্রাণ হারান। দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকরা জমিদারদের হুকুমে দাসদের মতো যন্ত্রণা ভোগ করছিল।



প্রথম, ফেব্রয়ারি বিপ্লব
এই পরিস্থিতিতে গণ অসন্তোষ তীব্র আকার নেয়। বিপ্লবী শক্তিগুলি বিশেষত বলশেভিক পার্টি জার রাজত্বের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংগঠিত করে। এই গণ অভ্যুত্থান বিপ্লবের রূপ নেয়। যা ঘটে ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ সালে। জার স্বৈরতন্ত্র উৎখাত হয় এবং তার জায়গায় বুর্জোয়াদের নিয়ন্ত্রিত একটি সরকার গঠিত হয়, যেখানে কয়েকটি সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিও যোগ দেয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে গঠিত অস্থায়ী সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির সাথে আপস করে রুশ বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার রাস্তা নেয়। যুদ্ধে বিপর্যয় এবং অসংখ্য সৈন্যের মৃত্যুর পরিস্থিতিতে এই সরকার ক্রমশ জনপ্রিয়তা হারায়।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লব জনগণের হাতে ক্ষমতায় নতুন এক হাতিয়ারকে সামনে নিয়ে আসে- সোভিয়েত সমূহ। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত বড় বড় শহরে এবং গ্রামীন এলাকায় শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের সোভিয়েত গড়ে ওঠে।
শ্রমিকদের সোভিয়েত এবং সৈন্যদের মধ্যে গঠিত সোভিয়েতগুলির মধ্য থেকে বলশেভিক পার্টি ( বিপ্লবের পর হয় কমিউনিস্ট পার্টি) ক্রমবর্ধমান সমর্থন পেতে থাকে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে অস্থায়ী সরকার শ্রমিক কৃষক ও সৈন্যদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখোমুখি হয়। চলমান বিপ্লবকে রক্ষা করতে সর্বহারারা রাজধানী পেট্রোগ্রাড এবং মস্কোর মতো শহরে নিজেদের সোভিয়েত ও সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করে। গ্রামীন রাশিয়া জুড়ে কৃষক এবং খেতমজুররা জমিদার ও রাজন্যবর্গের জমি দখল করতে থাকে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে সৈন্যরা নিজেদের সোভিয়েত নির্বাচিত করে যুদ্ধের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করতে থাকে। লেনিন বলেছিলেন এই সৈন্যদের বেশিরভাগটাই ‘‘ উর্দি পরিধান করা কৃষক’’

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে: সোভিয়েতগুলিকে সমস্ত ক্ষমতা প্রদানের দাবি
এই পরিস্থিতিতে বলশেভিক পার্টির নেতা লেনিন ঘোষণা করেন যে দেশ বুর্জোয়া বিপ্লবের প্রথম পর্বের থেকে দ্বিতীয় পর্বের দিকে যাচ্ছে এবং ক্ষমতা দিতে হবে সর্বহারা ও কৃষকদের গরিবতম অংশের হাতে।
‘‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েগুলিকে দাও’’ বলশেভিক পার্টির এই ডাকে চূড়ান্তভাবে ২৫শে অক্টোবর (৭ই নভেম্বর) শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ (লাল ফৌজ) এবং সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করতে এগিয়ে যান। রাজধানী পেট্রোগ্রাডে ক্ষমতা দখলের মধ্যে দিয়ে বিপ্লব সফল হয়। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রতিবিপ্লবী সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে মস্কো এবং অন্যান্য কেন্দ্রে, গোটা রাশিয়ায় এবং পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে সোভিয়েত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়।
জমি, শান্তি ও রুটির শ্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করেছিল। নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল শ্রমিক, সৈন্য ও কৃষকদের ডেপুটিদের সর্ব রাশিয়ান কংগ্রেস-এ জমি ও শান্তির জন্য ডিক্রি পেশ করাএই কংগ্রেসের গৃহীত জমি ডিক্রিতে গির্জা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা জমি, তাদের গবাদি পশু ও কৃষির সরঞ্জাম ও বাড়িঘর অধিগ্রহণ করে স্থানীয় জমি কমিটি ও কৃষক ডেপুটিদের জেলা সোভিয়েতগুলির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
যুদ্ধলিপ্ত সব সরকারগুলি ও জনগণের মধ্যে অবিলম্বে শান্তি আলোচনাসহ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ডাক দেওয়া হয় শান্তি ডিক্রিতে। ক্ষয়ক্ষতি ও এলাকাভুক্ত ছাড়াই অবিলম্বে শান্তি চুক্তি করার সংকল্প ঘোষণা করে নতুন সোভিয়েত সরকার।
অন্যান্য ডিক্রিগুলি ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, অবৈতনিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের নতুন ইউনিয়ন গঠন সম্পর্কিত।
জারের রাশিয়া ছিল ‘‘জাতিসমূহের বন্দীশালা’’। রুশ বিপ্লব ঔপনিবেশিক জোয়াল থেকে বিভিন্ন অ-রুশ জাতি সমূহকে মুক্তি দেয় এবং ইউনিয়নের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বিষয় হিসেবে তাদের দেয় এক স্বয়ংশাসিত ব্যবস্থা।
নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই এই বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। বেধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। লাল ফৌজকে লড়াই করতে হয় শ্বেত ফৌজ ও প্রতিবিপ্লবীর বাহিনীর বিরুদ্ধে। ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ দশটি পুঁজিবাদী দেশ প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে মদত দেয়।
চার বছরের গৃহযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লালফৌজ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত জয়লাভ করে। এই প্রক্রিয়ায় লালফৌজকে বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে এবং লালফৌজের হাজার হাজার শ্রেণী সচেতন শ্রমিক ও কৃষক গৃহযুদ্ধে প্রাণ দেয়।

কেন এটিকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব?
পৃথিবীতে আগে যা বিপ্লব হয়েছে তার থেকে নভেম্বর বিপ্লব পৃথক। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব দিয়ে শুরু করে পূর্ণ সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণী ও অভিজাত শ্রেণীর কাছ থেকে বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিভিন্ন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।
অতীতের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নানা বিপ্লব হয়েছে যখন শোষকদের নতুন শ্রেণী পুরনো শোষকদের শাসনকে উৎখাত করেছিল। এটাই ঘটেছে যখন বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে বিপ্লব পূর্ণ সামন্ত শোষক শ্রেণীগুলিকে উৎখাত করেছিল।
নভেম্বর বিপ্লব তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই প্রথম শ্রমিক শ্রেণী ও তার সহযোগী শোষিত শ্রেণী গরিব কৃষকসহ মিত্ররা শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী ও শোষকশ্রেণীগুলিকে উৎখাত করতে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছে। রাশিয়াতে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণী বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে নভেম্বর বিপ্লবকে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলা হয়। লেনিন বলেছিলেন যে, বিপ্লব তখনই সফল হয় যখন পুরনো রাষ্ট্র ক্ষমতা ভেঙ্গে নতুন ধরণের রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। রুশ বিপ্লবে তা-ই ঘটেছে। এই বিপ্লব পুরনো রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ভেঙ্গে তার জায়গায় সোভিয়েত ধরণের নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই সোভিয়েতগুলি ছিল শ্রমিক এবং গরিব কৃষক স্বার্থের প্রতিনিধি।
সমাজতন্ত্রের অর্থ উৎপাদনের উপকরণ সমূহের সামাজিকীকরণ। শিল্প, জমি ও কৃষি এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ রাষ্ট্র হাতে তুলে নিয়ে এবং যৌথ মালিকানায় নিয়ে এসে নতুন রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এই কাজ সম্পন্ন হয়। এই প্রথম পৃথিবীতে উৎপাদনের নতুন সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বিপ্লবের সাফল্য
১৯৬০-র দশক পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সোভিয়েত ইউনিয়নে সম্পন্ন হয়। এমনকি সবচেয়ে ঘোর সমালোচকরাও এই সত্য স্বীকার করে। সম্মানিত ব্রিটিশ অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন উল্লেখ করেছিলেন: ‘‘সমস্ত বড় অথবা উন্নত দেশগুলির মধ্যে ১৯১৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে মাথা পিছু সোভিয়েত আর্থিক সমৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুততর, এমনকি তখনকার জাপানের চেয়েও দ্রুততর। জাপানে উৎপাদন বৃদ্ধি হয় ৪০০ শতাংশ, সোভিয়েত ইউনিয়নে হয় ৪৪০ শতাংশ।’’
·       গৃহযুদ্ধের পর এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীভূত
·       সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে সাত বছরের সার্বজনীন শিক্ষা এবং দশ বছরের সার্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা যা সেই সময়ে ইউরোপের অন্য কোনো দেশ অর্জন করতে পারেনি।
·       জমিদারি প্রথার বিলোপ এবং গরিব কৃষক ও খেতমজুরদের যৌথ খামার এবং সমবায়ে অংশীদারিত্ব
·       বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই সমস্ত নাগরিকদের নিখরচায় চিকিৎসা পরিষেবা।
·       বেকারত্ব দূর করে সকলের জন্য কাজের ব্যবস্থা। প্রত্যেকের জন্য কাজের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ১৯৩৬ সালের মধ্যে সমস্ত এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
·       নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল মহিলাদের সমানাধিকার, সবার সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুযোগ সুবিধার অধিকার এবং বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করা। এছাড়াও মহিলাদের ভোট দেওয়ার অধিকার। এই অধিকার ১৯২৮ সালে একমাত্র ব্রিটেন দিয়েছিল তাদের দেশের মহিলাদের।
·       সাংস্কৃতিক সম্পদের বিরাট সম্প্রসারণ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় খরচে বিভিন্ন বইপত্র, তার সঙ্গে চলচিত্র, সঙ্গীত ও শিল্পকলা নিয়ে প্রকাশ ও পরিবেশনা।



নভেম্বর বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রভাব
১৯১৭ সালের আগে পৃথিবী যা ছিল, বিংশ শতাব্দীর শেষে এবং আজকের তুলনায় তা সম্পূর্ণ আলাদা। বিংশ শতাব্দীর শুরুটা তখন ছিল সাম্রাজ্যের যুগ- সাম্রাজ্যবাদ ছিল উচ্চ শিখরে। পৃথিবীকে ভাগ করে কর্তৃত্ব নিয়েছিল বৃটিশ, জার্মান, ফরাসি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান ও জাপানি সাম্রাজ্য। এর নিচে সাম্রাজ্য ছিল ইতালিয়ান, পর্তুগীজ ইত্যাদিরপৃথিবীর জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ এসব সাম্রাজ্যের অধীনে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের বাসিন্দা ছিল। এই পুরনো ধরণের উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে রুশ বিপ্লবের সূচনায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদের মৃত্যু যাত্রা শুরু হয়। জার সাম্রাজ্যের উৎখাতের ৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বুকে আর কোনো সাম্রাজ্য ছিল না বললেই চলে। নভেম্বর বিপ্লব জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলিকে উদ্দীপ্ত করে। এই মুক্তি সংগ্রামগুলি ঔপনিবেধিক শাসনগুলিকে উৎখাত করে। প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম উচ্চতর মাত্রায় পৌঁছায়। রুশ বিপ্লব থেকে অনুপ্রেরণা পায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে।
নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তি ছিলো শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর বিপ্লবী রণনীতি। এই শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর রণনীতিই পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক ও আধাঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ব্যপক কৃষক সমাজকে সমবেত করতে ব্যবহার করা হয়। নভেম্বর বিপ্লবের প্রদর্শিত পথে তিন দশক পরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যুগান্তকারী চীন বিপ্লব সংগঠিত হয়। এরপরে হয় ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার বিপ্লব। এই সমস্ত বিপ্লব বিশ্বব্যপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও ১৯৩০- দশকের ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতায় সংগঠিত হয়েছে। এর পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক শিবির।
মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিচালিত সংগ্রামের জন্যই বিংশ শতাব্দীর সেরা বিপদ ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের দেশপ্রেমিক যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ২কোটিরও বেশি সেনা ও মানুষ প্রাণ হারায়। নাৎসী যুদ্ধ সম্পর্কে ধংস করার নেতৃত্ব দেয় লাল ফৌজ।
নভেম্বর বিপ্লবের মুক্তিকামী অবদানে রয়েছে বিশ্বব্যপী প্রভাব। রুশ বিপ্লবের সাফল্য বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলির প্রভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী সরকারগুলি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় মডেল চালু করতে বাধ্য হয়। এই সব দেশের শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের জন্য সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।



ভারতে প্রভাব
নভেম্বর বিপ্লবের সংবাদ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে এবং বাইরের বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির স্বাধীনতা যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
১) কংগ্রেসের মধ্যে মডারেট অংশ সম্পর্কে অসন্তুষ্ট র‌্যাডিক্যাল অংশ যেমন বাল গঙ্গাধর তিলক এবং অন্যান্যরা রাশিয়ার বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান এবং তাঁরা শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত করার পক্ষে ছিলেন।
২) রুশ বিপ্লবের প্রভাবে ভারতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯০৮ সালের আগে শিল্প শ্রমিকদের সংগঠিত করার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা ছিলো না। ধর্মঘটও হতো কচিৎ। ১৯১৮ সালে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের সূচনা হয় এবং অনেকগুলি শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন গড়ে ওঠে ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে দেশে বেশকিছু ধর্মঘটের জোয়ার বয়ে যায়।
৩) মোহাজীর গোষ্ঠীগুলির রুশ বিপ্লবের সঙ্গে পরিচিত হতে আফগানিস্তান হয়ে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। খিলাফৎ আন্দোলনের পরিণামে এই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ছিলেন ক্ষুব্ধ। এদের মধ্যে কয়েকজন ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট
৪) নভেম্বর বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্রের সাফল্যে মুগ্ধ হন বিশিষ্ট লেখক কবি যেমন সুব্রহ্মনিয়াম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজি নজরুল ইসলাম প্রমুখ। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া সফর করে যে নতুন সমাজ গড়া হচ্ছে তাতে মুগ্ধ হয়ে ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে, অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র দশ বৎসরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায় নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে। শুধু নিজের জাতকে নয়, অন্য জাতের জন্যেও এদের সমান চেষ্টা। অথচ সাম্প্রদায়িক ধর্মের মানুষেরা এদের অধার্মিক বলে নিন্দা করে। ধর্ম কি কেবল পুঁথির মন্ত্রে, দেবতা কি কেবল মন্দিরের প্রাঙ্গণে। মানুষকে যারা কেবলই ফাঁকি দেয় দেবতা কি তাদের কোনোখানে আছে। অনেক কথা বলবার আছে। এরকম তথ্য সংগ্রহ করে লেখা আমার অভ্যস্ত নয়, কিন্তু না-লেখা আমার অন্যায় হবে বলে লিখতে বসেছি। রাশিয়ার শিক্ষাবিধি সম্বন্ধে ক্রমে ক্রমে লিখব বলে আমার সংকল্প আছে। কতবার মনে হয়েছে আর-কোথাও নয়, রাশিয়ায় এসে একবার তোমাদের সব দেখে যাওয়া উচিত।’’ 
জওহরলাল নেহরু থেকে পেরিয়ার রামস্বামী পর্যন্ত যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সফর করেছিলেন তাঁরা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভগৎ সিং এবং তাঁর কমরেডরা রুশ বিপ্লব ও লেনিনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩০ সালের ২১শে জানুয়ারি আদালত কক্ষ থেকে তাঁরা মস্কোর উদ্দেশ্যে এই টেলিগ্রাম করেছিলেন, -‘লেনিন দিবসে মহান লেনিনের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যারা কিছু কাজ করছেন তাঁদের সকলের উদ্দেশ্যে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। রাশিয়া যে মহান পরীক্ষানিরিক্ষা করছে আমরা তার সাফল্য কামনা করি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের কন্ঠেই আমরা কন্ঠ মেলাচ্ছি।’
একারণে, ভারতের স্বাধীনতা ও সামাজিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম রুশ বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ঘটলো? 
পুঁজিবাদী বেষ্টনী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সবসময় সাম্রাজ্যবাদী হুমকির মুখে থাকতে হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনেরও লক্ষ্যবস্তু। এসমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন পথে উদ্ভাসিত হয় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঠিক আমেরিকার পরেই শক্তিধর দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত বিরাট সাফল্যের সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায় সোভিয়ত ইউনিয়নে দ্রুত আর্থিক বিকাশ, বেকারীত্বের অবসান, সার্বজনীন শিক্ষা স্বাস্থ্যরক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং জনগণের বস্তুগত সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে
অবশ্য ক্রমশ বিশেষত শেষ দুই দশকে কিছু ত্রুটি ও ঘাটতি দেখা দেয়। নতুন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সাফল্যকে কাজে লাগাতে অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার করা হয়নি; অর্থনীতির পরিচালনায় পুণর্গঠনের ব্যর্থতা দেখা যায়; জনগণের বৈষয়িক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের সম্প্রসারণের ঘাটতি আমলাতান্ত্রিকতার দিকে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ধারণার বিকাশ ঘটাতে কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শগত ব্যর্থতা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ডেকে আনে।
সমাজতন্ত্র নয়, সমাজতন্ত্র নির্মাণে বিকৃতি এবং মতাদর্শগত বিচ্যুতি সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতা ঘটায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র নির্মাণে অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে এটা বলা যেতে পারে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তিতে বর্তমান বিশ্বে সমাজতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায় না।



নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা
নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের কাছে দেখিয়েছে যে পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
নভেম্বর বিপ্লবের দৃষ্টান্ত বিংশ শতাব্দীতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের বিকল্প পথকে আলোকিত করে চলেছে নভেম্বর বিপ্লব।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর বিশ্ব পুঁজিবাদের ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে নয়া উদারনীতির পুঁজিবাদ গোটা পৃথিবীকে মুষ্ঠিমেয় ধনী এবং দারিদ্র, বেকারী ও ক্ষুধায় আক্রান্ত বিশাল জনগণের মধ্যে বিভাজনকে প্রশস্ত করেছে।
দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে অসাম্যের। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১শতাংশের সম্পদের পরিমান ১, ১০,০০,০০০ কোটি টাকা যা পৃথিবীর জনসংখ্যার নিচের তলার অর্ধেকের মোট সম্পদের ৬৫গুন বেশি। পৃথিবীর ১৩০কোটি মানুষ চরম দারিদ্রের মধ্যে বাস করছেন।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্ব আধিপত্যের জন্য আগ্রাসী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ধংসাত্মক সংঘর্ষ চাপিয়ে দিয়েছে যা এখনো চলছে ইরাক সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলিতে।
নয়া উদারনীতির আক্রমণ, ব্যয়সংকোচের নামে জনগণের ওপরে আঘাত এবং সাম্রাজ্যবাদের কাছে পদানত করার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যপী শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের অন্যান্য অংশ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য ১৯১৭ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আলোকবর্তিকা।
সমস্ত বিপ্লবী ও প্রগতিশীল শক্তির কাছে নভেম্বর বিপ্লব অনুপ্রেরণার উৎস। শ্রেণীহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যারা সংগ্রাম করছেন তাঁদের কাছে নভেম্বর বিপ্লব এই বার্তা দিয়ে যাচ্ছে যে সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ।

************


20161017

কখন ‘আহারে বাংলা’ ?

#অনাহারে_বাংলা



শারদোৎসব শেষ হতে না হতেই রাজ্য সরকারের আরেক মোচ্ছব ‘আহারে বাংলা’। সরকারী পয়সায় ‘জমিয়ে পেটপূজো’, খাওয়া দাওয়ার রাজকীয় আয়োজন। পাঁচদিন ধরে এই উৎসবে ‘হরেক রকম’ খানাপিনার লোভনীয় বিজ্ঞাপন।

কখন?

যখন উত্তরবঙ্গের চা বাগানে অনাহার-অপুষ্টিতে মৃত্যুর মিছিল চলছে। একের পর এক বাগান বন্ধ, নেই খাবার, নেই ওষুধ। গত চার বছরে প্রায় ৬০০ শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের মানুষের মৃত্যু ঘটেছে। শুধু আলিপুরদুয়ার জেলাতেই দেড় বছরে ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বাগানের অন্ধকারে। সুখে আছেন শুধু বাগান মালিকরা, রাজ্য সরকার অধিগ্রহণের পরে বাগানের অবস্থা আরো খারাপ। সেখানে রেশনের নামে চলছে কালোবাজারীর কারবার। দলে দলে মানুষ যে কোনো কাজের খোঁজে পালিয়ে যাচ্ছেন। নারী পাচারের ভয়াবহ ঘটনা ঘটছে।

বাংলা কখন ‘আহারে’?

যখন রাজ্যে একের পর এক কারখানায় তালা পড়ছে। হিন্দ মোটর্স, ডানলপ, জেশপ বন্ধ হয়েছে; কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে হিন্দুস্তান কেবলস চিরতরে বন্ধ হয়েছে; রাজ্য সরকার বেচে দিচ্ছে দুর্গাপুর কেমিক্যালস, তুলে দেওয়া হচ্ছে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেস। আসানসোল-দুর্গাপুর, হুগলীর শিল্পাঞ্চলে প্রায় প্রত্যেক দিন চলছে কারখানা বন্ধের পালা। এ রাজ্যের চট শিল্প ধুঁকছে। প্রতারক মালিকরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে যাচ্ছেন আর ফিরে এসেই কয়েক হাজার শ্রমিকের রুজি কেড়ে তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন জুট মিলে। চটকলের শ্রমিক মহল্লায় এই উৎসবের দিনেও জ্বলেনি আলো।

রাজ্যের সরকারী পরিবহনের শ্রমিকদের বকেয়া মিলছে না, পেনশন মিলছে না, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পরিবহনের জমি বেসরকারী আবাসন মালিকদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রীর ‘অনুপ্রেরণায়’ কখন ভূরিভোজের প্রদর্শনী?

এ রাজ্য যখন শিল্পের মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছে। শুধু সিঙ্গুরেই ডিনামাইট দিয়ে কারখানার শেড ভাঙার শব্দ শোনা যাচ্ছে, তাই নয়। শালবনীর কারখানা তৈরি বন্ধ হয়ে গেছে, রঘুনাথপুরে প্রস্তাবিত প্রায় সব শিল্পই পাততাড়ি গুটিয়েছে, অন্ডালে বন্ধ হয়েছে বিমানবন্দর, তোলা দিতে দিতে রাজ্য ছেড়েছে বিদেশী সংস্থা। ইস্পাত, ধাতব এবং বিভিন্ন অনুসারী শিল্প বন্ধ হয়েছে দেদার। প্রায় ৪০হাজার ছোট শিল্প রুগ্‌ণ অথবা বন্ধ হয়েছে।

কোথায় কাজ পাবেন এ রাজ্যের যুবকরা? বহুঘোষিত এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে কাজ চেয়ে নাম লিখিয়েছিলেন ১৮লক্ষ যুবক, কাজ মিলেছে মেরেকেটে দেড় হাজারের। মুখ্যমন্ত্রীর বাগাড়ম্বরের ‘হাব’-গুলিতে ফাঁকা ময়দান, কোনো শিল্পেরই দেখা নেই। একমাত্র সম্ভাবনার স্কুল শিক্ষকের চাকরিতে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি। শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা হতাশগ্রস্ত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।

তুলনামূলক ভাবে কম লেখাপড়া জানা মানুষেরও কাজ নেই। কাজ নেই গ্রামে। পঞ্চায়েত দুর্নীতির আখড়া, ঠিকাদারের পোয়াবারো। রেগার কাজে পশ্চিমবঙ্গ ক্রমেই চলে যাচ্ছে পিছনের সারিতে। উপরন্তু রেগায় কাজ করিয়ে মজুরি বকেয়া রাখায় দেশের শীর্ষে এই বাংলা। রেগায় মজুরি পেতেও শাসক দলকে তোলা দিতে হয়, সে শুধু এ বাংলায়। মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ লক্ষ কাজের গল্প ছেড়ে প্রকৃত কাজের খোঁজে হাজার হাজার যুবক রাজ্য ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনোক্রমে খাবারের সংস্থানটুকু করতেই। এ সময়ে কীসের খাদ্য উৎসব?

এই হেমন্তে কেমন আছেন বাংলার কৃষক? ফসলের দাম না পেয়ে দুর্দশার দায়ে ফসল বিক্রির ঘটনা ঘটছে গ্রামের পর গ্রামে। কখনও ধানচাষী, কখনও আলুচাষী দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে বিষ খেয়ে আত্মঘাতী হচ্ছেন। 

কখন এই ভোজসভা?

বাজার যখন অগ্নিমূল্য। সামান্য ডাল–রুটি যোগাড় করতে সাধারণ মানুষ নাজেহাল। বহু তরিতরকারির দাম বাড়তে বাড়তে তা নাগালের বাইরে। রাজ্য প্রশাসন নিষ্ক্রিয়, দাম নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকাই নেই উৎসবে ডুবে থাকা সরকারের। ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষ, লক্ষ লক্ষ গরিব মানুষকে আধপেটা খেয়ে দিন গুজরান করতে হচ্ছে। এইসব মানুষজনের জন্য কোনো হুঁশ নেই রাজ্য সরকারের।

কখনও উৎসব খুব কুৎসিত মনে হয়। অমানবিক। মুখ্যমন্ত্রী উৎসবের নাম করে রাজ্যের বিবর্ণ অবস্থা ঢাকা দিতে চাইছেন।


বন্ধ হোক সরকারী কোষাগারের মদতে এই মজলিশ। বন্ধ হোক শ্রমজীবী মানুষসহ সাধারণ গরিব মানুষের জীবনকে ঠাট্টা করার এই আয়োজন।