20161101

বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়ন কর্মসূচী — দু-চার কথা

স্বপন সিনহা

বিগত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট পরাজিত হওয়ার ফলে ৩৪ বছর পর বামবিরোধীরা রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই পরিবর্তনে নিশ্চয় আশা করা হয়েছিল নতুন সরকার জনগণের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনা করবে এবং বিরোধীরা গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সচেষ্ট থাকবে।

যে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বামফ্রন্ট সরকারের সময় বিশেষ করে শেষের কয়েক বছর বর্তমান শাসকদল বিরোধীপক্ষে থাকাকালীন সংঘটিত করে সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি যে বামপন্থীরা করবে না এটা সাধারণ উপলব্ধি। বামফ্রন্ট মানুষের সেই বিশ্বাসের প্রতি যথাযথ মর্যাদা অবশ্যই রাখতে পেরেছে। কিন্তু বর্তমান শাসকদল? মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এই যে নির্লজ্জ দলবাজি, ব্যাপক দুর্নীতি, চরম অগণতান্ত্রিক আচরণ, সীমাহীন ঔদ্ধত্য অপদার্থতা এবং শুধুমাত্র আত্মপ্রচারের ঢাক পেটানো ছাড়া উল্লেখ করার মতো একটা কাজও তারা করে দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে নতুন শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে নিজেদের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে তারা প্রচার চালাতে চেষ্টা করছে যে, ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট শিল্পের ব্যাপারে কিছুই করেনি। সেই কারণে বাকি রাজ্য শিল্পের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। বামফ্রন্ট বিরোধী মহল থেকে প্রধানত দুটি বিষয় আগেও তোলা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রথমত, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বামফ্রন্ট শিল্পায়নের শোরগোল তোলে কিন্ত কার্যত কিছুই করেনি। দ্বিতীয়ত, বামফ্রন্ট একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের উদার অর্থনৈতিক নীতি শিল্পনীতির বিরোধিতা করেছে অন্যদিকে সেই একই নীতিই তারা পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করেছে। সেই কারণে বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যারা সেই সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন তাদের অবগতির প্রয়োজনে প্রসঙ্গে কিছু আলোচনার উদ্দেশ্যে বর্তমান প্রবন্ধের অবতারণা।

মানবজীবনের মহত্তম লক্ষ্য মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার অনুপ্রেরণা থেকেই মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া। তাদের প্রতিটি পদ‍‌ক্ষেপ, প্রতিটি কর্মসূচী মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য। ইতিহাসের গতিশীল অনুধাবন প্রক্রিয়া আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে মার্কসবাদ কোন কাল্পনিক ধারণা নয়। এটি বিজ্ঞান এবং গতিশীল বিজ্ঞান। প্রতিটি দেশকালের বাস্তব অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ করেই তার প্রয়োগ করতে হয় মার্কসবাদীরা সেই সৃজনশীল কাজেই নিয়োজিত। তারা জানে গোটা ভারতে এক ধরনের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল বিরাজ করলে পশ্চিমবাংলা তার থেকে খুব বেশি আলাদাভাবে কাজ করতে পারে না। সারা দেশে গঙ্গার জল যদি দূষিত হয়, যদি হরিদ্বার, বারাণসী এবং পাটনার ঘাটে ঘোলা জল বয়ে যায় তাহলে কি কলকাতার বাবুঘাটে ফিলটার ওয়াটার পাওয়া সম্ভব? যেটা করা যেতে পারে তা হলো ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি ছড়িয়ে জলকে খানিকটা পরিশুদ্ধ করা এবং সমগ্র গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। এই রূঢ় বাস্তবকে সামনে রেখেই বামপন্থীরা বিভিন্নভাবে তাদের কার্যক্রমকে পরিচালিত করতে সচেষ্ট থেকে‍‌ছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সর্বনাশা উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করা অন্যদিকে রাজ্যে যেটুকু সম্ভব শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ। এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অবকাশটা কোথায়? একে স্ববিরোধিতা বলে না। এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া।

৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্ট এরাজ্যে সরকার পরিচালনা করেছে। মামুলী ধরনের বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সরকার ছিল না এটা। লক্ষ মানুষের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য আন্দোলন সংগ্রামের ফসল এই বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট এক নীতি আদর্শভিত্তিক কর্মসূচী সংগ্রামের এক সুনির্দিষ্ট রূপ। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকার তার পরিকল্পনা, তার বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থেকেই বামফ্রন্ট। গ্যাটচুক্তির প্রধান সারমর্মই রাষ্ট্রের ভূমিকা খর্ব করা। গ্যাট পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বলতে এতদিন যা বোঝাতো তা আর প্রাসঙ্গিক রইলো না। শিল্প-বাণিজ্য তথা স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে এই পর্যায়ে দারুণভাবে আঘাত হানার চেষ্টা হয়েছে যা প্রতিহত করার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা কংগ্রেস থেকে বি জে পি-জোট কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। বিদেশী ঋণের শর্তাবলীর কারণে নির্বিচারে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেশীয় বাজারে বিদেশী পণ্যের ব্যাপক প্রবেশের পথ খুলে দেওয়া হয়। এরফলে বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান অর্থাৎ বাণিজ্যঘাটতি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, অনুসৃত এই নয়া উদারনীতি অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে বিদেশী বহুজাতিকদের সাম‍‌নে দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলিকে এক অসমান প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের মুখে দাঁড়ায় দেশীয় শিল্প। এই রকম এক পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধ নিয়ে সঙ্কটজর্জরিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে রাজ্য সরকার তার শিল্পায়ন কর্মসূচী রূপায়ণের চেষ্টা করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সাথে রাজ্য সরকার গৃহীত নীতির পার্থক্যটা কোথায়?

এটা সকলেরই জানা যে, এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে এক নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিগুলি খাতায় কলমে থাকলেও রাজ্যগুলি প্রয়োজনীয় ক্ষমতা পায়নি। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার তার নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থেই দীর্ঘদিন ধরে এক বৈরী মনোভাব নেওয়ায় এরাজ্য বিশেষ অসুবিধা ভোগ করেছে। এছাড়া পশ্চিমবাংলার ভয়াবহ বেকারসমস্যা এবং তার সমাধানে কেন্দ্রের অসহযোগিতা এবং শত সহস্র বাধানিষেধের কথাও কারও অজানা নয়। তা সত্ত্বেও এই বাস্তব অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সু‍‌যোগ সম্ভাবনা সৃষ্টির যথাসাধ্য আন্তরিক প্রয়াস রাখার সাথে সাথে বামফ্রন্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, যেহেতু দেশের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মূল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে, সেইজন্য তাদের নীতি হলো অর্থনীতি পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনার জন্য কেন্দ্রের কাছে দাবি জানানো, কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পনা রচয়িতাদের কাছে তাদের বিকল্পনীতিগুলি উপস্থিত করা এবং জনসাধারণের চরম দুর্দশা লাঘব করার প্রচেষ্টা চালানো। সাথে সাথে তারা এও বলে যে, সেই কারণে তারা কখনওই একটা নেতিবাচক অবস্থান নিতে পারে না এবং যেহেতু পশ্চিমবাংলায় একটা বামপন্থী সরকার রাজ্যশাসন করছে সেহেতু বেসরকারী পুঁজি এরাজ্যে লগ্নি হবে না এটাও হতে পারে না।
সাতের দশকে ভারতের অর্থনীতি একটার পর একটা সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারী জনসাধারণের দুর্দশা সীমাহীনভাবে বেড়েছে। জরুরী অবস্থাকালে কোন না কোন সময়ে লে-অফ, ছাঁটাই, লক আউটের দরুন পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ কাজ হারায়। সরকারী ব্যয় হ্রাসের নামে কেন্দ্র রাজ্যগুলিতে হাজার হাজার সরকারী কর্মচারীকে চাকরি থেকে অপসারণ বরখাস্ত করা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর বিশ দফা কর্মসূচীতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান স্কিমের বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও গ্রামীণ বেকারী দুর্দশা হু হু করে বেড়ে চলে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা চল্লিশ লক্ষ অতিক্রম করে যায়। এরাজ্যে ৭০ থেকে ৭৭ এক অন্ধকারময় পর্যায়, যাকে বলা হয় সাতের দশকের কালো দিন। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে সমস্ত রকম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের টুঁটি টিপে এরা‍‌জ্যে কায়েম হয় এক আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস। খাদ্যের প্রশ্নে রাজ্য পরিণত হয় ঘাটতি রাজ্যে। লোডশেডিং মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলো এক ভয়াবহ বিভীষিকা। শিক্ষার কথা উল্লেখ না করাই ভালো।

সন্ত্রাসের সেই বীভৎসতাকে ছুঁড়েফেলে এবং জরুরী অবস্থার কালোরাত্রির অবসানে দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী কংগ্রেসের একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে জনজাগরণের তরঙ্গশীর্ষে ১৯৭৭ সালের জুন মাসে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচীতে বলা হয় — ‘বামপন্থী‍‌ ফ্রন্টের সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী রাজনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থের সেবা করবে, তাঁদের জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণ উন্নয়নে সহায়তা করবে ত্রিশ বছরের কংগ্রেসী অপশাসনে তাঁরা যে চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন তার কিছুটা উপশমের ব্যবস্থা করতে প্রয়াস রাখবে।নিজেদের এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যথাযোগ্য ভূমিকা পালনে বামফ্রন্ট আন্তরিক প্রয়াস রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। মানুষের জন্য স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি তারা কখনোই দেয়নি। বরং মানুষের দুঃখ-কষ্ট খানিকটা প্রশমনে কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে বামপন্থীরা ছিল দ্বিধাহীন। নিজেদের কর্মতৎপরতাকে আরও গতিশীল করে মানুষের প্রত্যাশার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে এটাই ছিল বামপন্থীদের অঙ্গীকার।

 এরাজ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? নিঃসন্দেহে বেকার সমস্যা। বামফ্রন্ট বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলো যে, কৃষির অগ্রগতির সাথে সাথে শিল্পের অগ্রগতি ঘটাতে না পারলে রাজ্যের সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট দেখতে পায় তাদের হাতে বিনিয়োগের উপযোগী পুঁজি নেই। কিন্তু গ্রামে আছে প্রচুর জমি আর অফুরন্ত শ্রমশক্তি (অর্থাৎ বেকার বাহিনী) এরাজ্যে যে সম্ভাবনাময় বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তি বেকার অবস্থায় পড়ে রয়েছে, তাদের জন্য অর্থবহ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা দরকার। সেই কারণে কৃষি, ক্ষুদ্রায়তন শিল্পক্ষেত্র এবং গ্রামোন্নয়নের মতো জায়গাগুলিতে প্রথমে নজর দেওয়া হয়। শহরের ক্ষেত্রে এই প্রকল্প নেওয়ায় অসুবিধেটা দেখা দেয় এই যে, এখানে যদি বা শ্রমশক্তির সরবরাহ যথেষ্ট কিন্তু জমি নেই আর পুঁজির অভাব তো আছেই। সেই কারণে শহরে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের পাশাপাশি বৃহৎ ভারী ‍‌শিল্পের দিকে নজর দেওয়া হয়। বিষয়টি পুরোপুরি কেন্দ্রীয় এক্তিয়ারে এবং এক্ষেত্রে বিনিয়োগের উপযোগী পুঁজি পশ্চিমবাংলা কেন, কোন রাজ্য সরকারেরই নেই। সেই কারণে এইসব ক্ষেত্রে লগ্নি করার জন্য কেন্দ্রকে বারবার অনুরোধ জানানো হয়। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস, সল্টলেক ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স, বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় টালবাহানার কথা তো আজ ইতিহাস।

দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকার আসার পরে কেন্দ্র রাজ্যের এই দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নেয়। প্রথম পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাধাদানের হাতিয়ার অবলম্বন করে যাতে এই মন্ত্রীসভাকে বিপাকে ফেলা যায় এবং জনগণের সাথে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়।

এই অবস্থায় প্রশ্ন ছিল, এই শ্রেণী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে? অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের এই পরিকল্পনাকে সফল হতে দেওয়া হবে এবং ক্রমবর্ধমান বেকারীর সামনে এরাজ্য শিল্পের দিক থেকে মরুভূমি হয়ে যাবে। এই পটভূমিকাতেই এরাজ্যে যৌথ ব্যক্তি উদ্যোগের শিল্প সম্পর্কিত বিষয়ের বিচার-বিবেচনা জরুরী হয়ে পড়ে।

এটা বামফ্রন্টের ঘোষিত নীতি যে, বেসরকারী ক্ষেত্রের ওপর সব সময় সরকারী ক্ষেত্রের প্রাধান্য থাকবে। একই সাথে এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কেন্দ্র পশ্চিমবাংলার সংগ্রাম। একটানা কেন্দ্র এটা দেখাতে চেষ্টা করে যে যতদিন বামফ্রন্ট সরকার থাকবে ততদিন এখানে শিল্পের অগ্রগতি হবে না এবং কংগ্রেস এরাজ্যে ক্ষমতায় ফিরে না আসা পর্যন্ত কর্মসংস্থান বাড়ানোর সব আশা শিকেয় তুলে রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে যুবমানসের জীবনযন্ত্রণার প্রতি যথার্থ অনুভূতি সহমর্মিতার উপলব্ধি নিয়ে এবং আত্মমর্যাদাবোধ সংগ্রামী মানসিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এরাজ্যে শিল্প গড়ার উদ্যোগকে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখি শিল্প গড়ার সুযোগসুবিধা এবং অনুকূল পরিস্থিতির কারণেই ইংরেজ আমলে বিদেশী শিল্পপতিরা এখানে শিল্প গড়তে এগিয়ে আসে। পরিকাঠামো বলে বিশেষ কিছুই তখন এখানে ছিলো না। তা সত্ত্বেও চা, চট, ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যালস প্রভৃতি শিল্প কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র পূর্বাঞ্চলকেই অবহেলা করায় এখানকার শিল্পের ওপর দারুণ আঘাত পড়ে। তারওপর মাশুল সমীকরণ নীতি, শিল্প লাইসেন্স প্রথা, কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরূপ আচরণকে কাজে লাগিয়ে এখানকার শিল্প সম্ভাবনাকে একেবারে বিপর্যয়ের মু‍‌খে ঠেলে দেওয়া হয়। ১৯৭২-৭৭ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়ে শিল্প সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেয়।

এমত পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালে রাজ্য সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করায় পশ্চিমবাংলার অর্থনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, সামাজিক বনসৃজন, শিক্ষার প্রসার, সাক্ষরতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পরিলক্ষিত হয়। দেশের শতকরা সত্তর ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষির উন্নতি ছাড়া শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভন নয়। আমূল ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর সাফল্য এক্ষেত্রে এক নতুন দিশা নিয়ে আসে। গ্রামীণ অর্থনীতির এই পরিবর্তনের ফলে গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রবণতা কম‍‌তে থাকে। গ্রামীণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজ্যে শিল্পপণ্যের এক বাজার তৈরি হয়। ফলে হাজার প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে এখানে শিল্পায়নের এক শক্তিশালী বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। শিল্পের প্রাথমিক প্রয়োজন বিদ্যুৎ। ১৯৭৬-৭৭ সালে অর্থাৎ কংগ্রেস শাসনের শেষ বছর রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ক্ষমতা ছিল ১৬২৫ মেগাওয়াট। বামফ্রন্ট আমলে ১৯৮৫-৮৬ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৫৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র বছরে অতিরিক্ত ১৭২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা পশ্চিমবাংলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। কংগ্রেস শাসনে ১৯৭০-৭১ থেকে ১৯৭৬-৭৭ সালের মধ্যে রাজ্যে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয় মাত্র ৯৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বামফ্রন্ট সরকারের দেওয়া বক্রেশ্বর, সাগরদিঘি সহ প্রায় ৬০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনু‍‌মোদন লাভে ব্যর্থ হয়। প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার ষষ্ঠ সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী যোজনায় বিদ্যুৎখাতে যোজনা কমিশনের বরাদ্দ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ছিল সবচেয়ে কম। ফলে কেন্দ্রের লাগাতার বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পশ্চিমবাংলার আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প। রক্ত দিয়ে বক্রেশ্বর গড়ার সংকল্প তো আর এমনি এমনি আসেনি। ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটিকে প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাজ্য সরকারের প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন দেয়। পরবর্তীকালে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি সপ্তম যোজনায় রাজ্যের প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এমনকি ১৯৮৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ‍‌ঘোষণাও করেন যে, মাস তিনেকের মধ্যেই বক্রেশ্বর প্রকল্প ছাড়পত্র পাবে। কিন্তু তারপরেই কেন্দ্রীয় সরকার ভোলবদল করে। ১৯৮৭ সালের ২৯শে অক্টোবর কেন্দ্রীয় শক্তিমন্ত্রী টেলেক্স বার্তায় রাজ্য সরকারকে জানায় যে, প্রকল্পের জন্য সোভিয়েত ঋণ পাওয়ার প্রাকশর্ত হলো প্রকল্পটিকে কেন্দ্রীয় ক্ষেত্রে রূপায়িত করতে হবে। অথচ কিছুদিন বাদে ভারতে অবস্থিত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত জ্যোতি বসুর সাথে দেখা করে জানালেন যে, এসব ভুল কথা। উনি বলেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে এরকম কোন শর্ত দেওয়া হয়নি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তখন কেন্দ্রকে জানানো হয় যে, সোভিয়েত ঋণ পশ্চিমবাংলাকে না দিলে সেটা হবে চরম অবিচার। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারকে সমস্তরকমভাবে অপদস্থ করতে তখন কেন্দ্র মরিয়া। ফলে এক রকম বাধ্য হয়ে নিজস্ব উদ্যোগেই বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। ১৯৮৮ ২৮শে সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির শিলান্যাস করতে গিয়ে জ্যোতি বসু ঘোষণা করেন — ‘বক্রেশ্বর প্রকল্পের রূপায়ণের সাথে জড়িয়ে আছে এরাজ্যের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা অবিচারের সমুচিত জবাব এরাজ্যের মানুষ প্রকল্পটির সার্থক রূপায়ণের মধ্যে দিয়েই দেবে।

এরপর ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির চাপে অন্যান্য বিষয়ের সাথে শিল্প লাইসেন্স প্রথা বাতিল মাশুল সমীকরণ নীতি শিথিল করা হয়। বিশ্বব্যাঙ্ক-আই এম এফ নির্দেশিত উদার অর্থনৈতিক নীতির প্রধান প্রতিপাদ্য বেসরকারীকরণ। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে প্রথমে রুগ্ অলাভজনক এমনকি লাভজনক সংস্থার শেয়ার বিক্রি অগ্রাধিকার তালিকায় চলে আসে। কেন্দ্রের এই উদার অর্থনীতির তীব্র বিরোধিতা করে বামফ্রন্ট। কারণ এই নীতির দরুণ আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে প্রধান ভূমিকায় রেখে শিল্প বিকাশের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিল তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বিচারে বিদেশী পুঁজি প্রযুক্তি আমাদানির ফলে দেশীয় শিল্প এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে দুর্বল হবে এবং আমাদের আর্থিক স্বয়ংভরতা বিপন্ন হয়ে পড়বে।

বামফ্রন্টের স্পষ্ট বক্তব্য দেশের স্বনির্ভরতার স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র শক্তিশালী হোক। কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটা অঙ্গরাজ্যে সরকারে এসে তো কেউ তাদের নীতিকে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক শিল্পনীতির আওতায় থেকেই তাদের কাজ করতে হয়। স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে কেন্দ্রের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র ছিল অগ্রাধিকার তালিকায় (commanding light of economy) সেই সময় রাজ্যের ক্ষেত্রেও সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন্দ্রের গৃহীত উদার অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের কাছে ব্যক্তিপুঁজির বিকল্প আর কিছু রইলো না। এই রূঢ় বাস্তবকে কি ইচ্ছে করলেই অস্বীকার করা যায়? কেন্দ্রীয় সরকারের নয়া অর্থনীতি গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় উন্নয়ন পর্ষদের সভায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই নীতির শুধু বিরোধিতাই করা হয়নি বিকল্প প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল। এর মাধ্যমে এক নতুন বিকল্প আর্থ-সামাজিক নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা যা দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করবে এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে অটুটু রাখবে, তা তুলে ধরার চেষ্টা হয়। এই বিকল্প নীতি যদি কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ কর‍‌তো তাহলে তার পটভূমিতে জাঁকিয়ে আমাদের রাজ্যে শিল্পায়নের বিষয়টি অন্যভাবে ভাবা যেতে পারতো। যেহেতু তা হয়নি সেই কারণে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ বিশেষ ছিল না। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেয় সরকারী বিনিয়োগ কমিয়ে বিদেশী বিনিয়োগের ঢালাও ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে রাজ্য সরকার কী করবে? শুধু নীতিগত অবস্থানের কথা বলে হাত গুটিয়েবসে থাকবে? সেটাতো মূর্খের আচরণ। রাজ্যকে উদ্যোগ নিতেই হয় এবং কেন্দ্রীয় নীতির বাইরেও খুব একটা যাওয়া যায় না। মনে রাখা দরকার, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এই নীতিগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল না। সদিচ্ছা ‍‌নৈতিক বল থাকলেই তারা অন্য পক্ষ নিতে পারতেন। সে বিকল্প প্রস্তাব বামপন্থীরা দিয়েও ছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার ইচ্ছে করলেই কেন্দ্রীয় নীতিকে উপেক্ষা করতে পারতো না।

এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেহেতু বড় মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কোনও স্বাধীন নীতি ঘোষণা করতে পারে না, সেই কারণে ১৯৯৪ সালে সরকারের পক্ষ থেকে বিধানসভায় শিল্পায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে এক নীতি-বিবৃতি (Policy statement on Industrial development) পেশ করা হয়। এতে বলা হয় — () রাজ্য সরকার উপযুক্ত ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধাজনক শর্তে বৈদেশিক পুঁজি প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাবে। () রাজ্য সরকার সামাজিক ন্যায়বিচার ভারসাম্যমূলক অগ্রগতির ক্ষেত্রে সরকারী সরকার অধিগৃহীত ক্ষেত্রগুলিকে প্রধান চালিকাশক্তি মনে করে। রাজ্য সরকার এটাও স্বীকার করে যে, কয়েকটি কারণে অগ্রগতির স্বার্থে বেসরকারী উদ্যোগেরও গুরুত্ব ভূমিকা থাকবে। যেমন, প্রধান প্রধান শিল্পে বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারী উদ্যোগের এক তাৎপর্যময় ভূমিকা আছে বিশেষ করে মূল্যায়নের রাশ টেনে রাখার ক্ষেত্রে। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের স্বার্থে এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব আর্থিক সীমাবদ্ধতার দরুণ রাজ্য সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে। () সরকারী বেসরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি রাজ্য সরকার যৌথ সহযোগী উদ্যোগগুলিকে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে মূলধন সংগ্রহ করা এবং অন্যান্য কিছু বিশেষ কাজে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বলে মনে করে। () শিল্পের পরিকাঠামোর উন্নয়ন ক্রম অগ্রগতিশিল্পের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করে রাজ্য বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আগামী দশ বছরে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে। সরকারী, বেসরকারী, যৌথ উদ্যোগেই এটা করা সম্ভব। এছাড়া রাস্তা যোগা‍‌যোগ ব্যবস্থা শিল্পবিকাশ কেন্দ্রগুলির উন্নয়ন ঘটানো হবে। () সামাজিক পরিকাঠামো যথা উপনগরী নির্মাণ, আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জল সরবরাহ, হোটেল নির্মাণ, উন্নতমানের স্কুল-কলেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্প্রসারণের উপর জোর দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নতমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থা‍‌পনের জন্য বেসরকারী যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহিত করার প্রয়াস জারি থাকবে।

এই শিল্প সংক্রান্ত নীতি-বিবৃতিঘোষণার সাথে সাথে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয় যে, এরাজ্যে শ্রমজীবী মানুষ বহু সংগ্রাম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বারে বারে এই সরকারের ওপর তাদের গভীর আস্থার প্রমাণ রেখেছে। এরাজ্যের স্বার্থবিরোধী কোন শিল্প প্রকল্প কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার কোনরকম সহায়তা করবে না। বামফ্রন্ট চায় শ্রমজীবী মানুষ শিল্প উদ্যোগী উভয়েই তাদের অধিকার কর্তব্য দুটি বিষয়েই সমান গুরুত্ব আরোপ করুন যাতে করে এখানে একটা শিল্পের অনুকূল বাতাবরণ গড়ে ওঠে।

বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে বামফ্রন্টের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে জ্যোতি বসু বলেন — ‘বিকল্প ব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত স্বনির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো, আমাদের দেশে প্রচুর প্রাকৃতিক মানবিক সম্পদ রয়েছে যার অনেকটাই এখনও অব্যবহৃত। এখন দেখতে হবে সাধারণ মানুষের কৃষি শিল্পপণ্যের প্রয়োজন মেটানো সামাজিকভাবে উপযুক্ত উৎপাদন সৃষ্টি কতোটা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে হতে পারে আর কতোটা বিদেশী বাণিজ্যের মাধ্যমে হতে পারে। স্বনির্ভরতা মানে বিদেশী বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং যে সব ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা ( গতিশীল সুবিধা) আছে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বাণিজ্য করতে হবে। অর্থাৎ শক্তি আত্মমর্যাদার অবস্থান থেকেই বাণিজ্য করতে হবে (মার্কসবাদী পথ, ফেব্রুয়া‍‌রি-১৯৯২) বামফ্রন্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানায়, বিদেশী পুঁজির ক্ষেত্রে ‍‌নির্বিচার প্রবেশের পরিবর্তে জাতীয় অগ্রাধিকার, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা এবং সামগ্রিক সুবিধা অসুবিধা মনে রেখে নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বিশেষেই এই পুঁজি গ্রহণ যুক্তিযুক্ত। সমগ্র পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করে বামফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এরাজ্যে উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর, কর্মসংস্থান অভিমুখী এবং কৃষিভিত্তিক এই ধরনের শিল্পায়নেই গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজ্যের মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে পেট্রোরসায়ন, ইলেকট্রনিক্স, তথ্য প্রযুক্তি, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি শিল্প স্থাপনের কাজ থাকবে অগ্রাধিকার তালিকায়। রাজ্যের চিরাচরিত শিল্পগুলি রক্ষা করা এবং আধুনিকীকরণ সম্প্রসারণ কর্মসূচীর মাধ্যমে সেগুলির বিকাশ ঘটাতে সব ধরনের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।

বঞ্চনার বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদার প্রতীক বক্রেশ্বর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে রাজ্য আজ লোডশেডিংয়ের রক্তচক্ষু থেকে প্রায় মুক্ত। পরবর্তী পর্যায়ে প্রশাসনিক গাফিলতিতে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ জারি রয়েছে। নন্দীগ্রামকে আর এক হলদিয়ায় পরিণত করার বামফ্রন্টের আন্তরিক সদিচ্ছাকে কায়েমী স্বার্থবাদীরা সর্বশক্তি দিয়ে বানচাল করতে সফল হয়ে‍‌ছে। সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করে এক বিশাল শিল্পনগরী গড়ার উদ্যোগ প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার মুখে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বামফ্রন্টের শিল্পায়ন কর্মসূচীকেঠেকিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৯১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সংগঠিত শিল্পের ক্ষেত্রে ২৫৩১টি সংস্থায় বাস্তবায়িত হয়েছিলো ৬৫,৬৮৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ। এরফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় তিন লক্ষ (‍ এবং পরোক্ষভাবে এর দ্বিগুণ) লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। সেক্টর ফাইভের তথ্য প্রযুক্তি শিল্প মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছোট বড় অসংখ্য শিল্প পরিকল্পনা বামফ্রন্টের উদ্যোগে নেওয়া হয়েছে যার বেশ কয়েকটি বর্তমান সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায় বাস্তবায়িত হতে পারছে না সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ইনফোসিস।

 তা সত্ত্বেও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, শিল্পায়ন প্রসঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক কুৎসা-অপপ্রচার মোকাবিলায় আমাদের ব্যর্থতা থেকেই গিয়েছে। যে কারণে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে শত্রুরা সাময়িকভাবে ‍‌লেও আমাদের বিরোধী শিবিরে টেনে‍‌ নিতে পেরেছে। সঠিক তথ্য যুক্তির আলোকে সেই মানুষকে আমাদের দিকে নিয়ে আসতেই হবে। প্রয়াত জ্যোতি বসু একটা কথা প্রায় বলতেন, মনে রাখা দরকার মানুষ যেমন ইতিহাস গড়ে আবার মানুষই ভুল করে। ফরাসী বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লব সম্পাদন করেছিল মানুষ। আবার মানুষের হাত ধরেই এসেছিল ফ্যাসিবাদ। প্রতিক্রিয়ার প্রচারের সামনে অনেক সময় দেখা যায় প্রগতির বক্তব্য পিছিয়ে পড়ে। গণেশ দুধ খাচ্ছে, এই হুজুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন দেশজুড়ে গ্লাস বা ঘটি ভর্তি দুধ নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সচেতন বিজ্ঞান কর্মীরা যখন থিওরি অব সারফেস টেনশনঅনুসরণ করে এই গুজবের অসারতা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়, তখন কিন্তু খুব বেশি মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দেয় না। এক্ষেত্রে বুজরুকি বনাম বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বে বিজ্ঞান সাময়িকভাবে হলেও পিছু হটে। সুতরাং মানুষের সাথে নিরন্তর সম্পর্ক রাখা এবং তাদের বিচার বি‍‌শ্লেষণেরউদ্দেশ্যে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমস্ত বিষয়গুলো তুলে ধরা প্রতিটি বামপন্থী কর্মীর অবশ্য কর্তব্য। কাজটা কঠিন। সেই কারণে দায়িত্বও বেশি। আমাদের তা পালন করতেই হবে।

[সহায়তা গ্রহণ : বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের বাজেট ভাষণ]



নেলসন মান্ডেলাঃ ১৯১৮-২০১৩

৫ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে বিদায় নিলেন নেলসন মান্ডেলা, দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদী নেতা, কালো মানুষের বিশ্বস্ত মুক্তিযোদ্ধা, দেশের বড়ো আদরের মাদিবা। শেষ কয়েক মাস অশক্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন; বিশ্বের অনেক মানুষ আশঙ্কায় দিন কাটিয়েছেন। পঁচানব্বই বছর পার করে অমরত্বের পথে পাড়ি দিলেন প্রবাদপুরুষ।

বিংশ শতাব্দীর বড়ো জননেতাদের মধ্যে নেলসন মান্ডেলার নাম থাকবে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তালিকায় বেশ কয়েকজনের নাম লেখা হবে। কিন্তু পুরো একটা জাতির জনক বা বিশ্বের বিপুল মানুষের আকাঙ্ক্ষার অধিনায়ক হয়ে ওঠা সহসা ঘটে না। লেনিন বা গান্ধী যেমন, যেমন মাও জে দং বা হো চি মিনতেমনই জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে উঠেছিলেন নেলসন মান্ডেলা। অনেকের মতে স্বদেশের চেয়ে বিদেশেই বেশি পূজ্য ছিলেন তিনি; জীবদ্দশায় প্রতীক হয়ে গেলে যেমনটি হয়, মিডিয়া তাঁর এই নিরাপদ প্রতিমাটিকে লুফে নিয়েছিল। সবাই তাঁর নাম জীবদ্দশায় প্রতীক হয়ে গেলে যেমনটি হয়, মিডিয়া তাঁর এই নিরাপদ প্রতিমাটিকে লুফে নিয়েছিল। সবাই তাঁর নাম শুনেছে, সবাই তাঁকে সম্মান জানায়, রাষ্ট্রনেতারা তাঁর করমর্দন করে ধন্য হন, চিত্রতারকারা হুড়োহুড়ি করে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলে। প্রতিমার আড়ালে অবশ্য অন্যতর বাস্তব লক্ষ করা যায়। অন্য যুগপুরুষদের মতো চিন্তাবিদ তিনি ছিলেন না, নতুন কোনো দর্শন তিনি পত্তন করেননি, সংগ্রামে বা সমাজচিন্তায় নির্দিষ্ট কোনো যুগান্তর আনেননি। স্বাধীনতার লড়াইতেও তাঁর নেতৃত্ব ছিল দৃঢ় কিন্তু প্রথাগত, সহকর্মীদের সঙ্গে বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই তিনি চলতেন ও আন্দোলন চালাতেন। ঝোঁক ছিল অহিংস আন্দোলনে, কিন্তু যখন এ.এন.সি সশস্ত্র সংগ্রামের পথে গেল, তখন তিনি আর গান্ধীবাদী পথ আঁকড়ে থাকলেন না, ঝাঁপিয়ে পড়লেন মুখোমুখি আক্রমণে। সবার সঙ্গে বোঝাপড়া করে চলতেই তিনি পছন্দ করতেন। সে কারণেই নতুন বিধানের রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে তিনি যে খুব বড়ো কোনো সংস্কার সাধন করতে পেরেছেন তাও বলা যাবে না, কারণ তখন তাঁর কাছে পুরোনো রাজের সঙ্গে রফার একটা দায় এসে পড়েছে। কিন্তু সময়ের সবেচয়ে প্রগতিশীল, সর্বথা গ্রহণযোগ্য গণতান্ত্রিক বোঝাপড়ার রাজনৈতিক রূপকার হিসেবে মান্ডেলা অবিস্মরণীয়। তেমনি অবিস্মরণীয় তাঁর সর্বপ্রধান কীর্তি: বর্ণবিদ্বেষে বিভাজিত, হিংস্রতায় বিক্ষত, গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে দীর্ণ নানা জনগোষ্ঠীর মানুষকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চৌহদ্দিতে সামিল করা।

এই ঐতিহাসিক সাফল্যের জন্য তাঁকে অনেক ব্যক্তিগত দাম চোকাতে হয়েছে। জেলখানায় সাতাশ বছর কেমন যেন ধারণার মধ্যে আসে না। এই অতিপ্রাকৃতিক অত্যাচার তিনি সয়েছিলেন দেশের মানুষের কথা ভেবে। আসলে দীর্ঘ কারাবাসের বিকল্প হিসেবে একেবারে খতম করে দেবার মতলব এটেঁছিল অ্যাপারটাইডস সরকার। ১৯৬৩ সালে দেশদ্রোহিতার মামলায় সেটাই ছিল কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, নেহাত শ্বেতাঙ্গ জজসাহেবের শেষ মুহূর্তের শিথিলতায় যাবজ্জীবনের আদেশ হয়। জীবনের সবচেয়ে দামি সবচেয়ে সৃজনশীল দিনগুলো গারদের আড়ালে কেটে গেল, সহ্য করতে হল ইতরতম অত্যাচার, প্রিয়জনের থেকে দূরে থাকতে হল, রুদ্ধ হয়ে গেল আন্দোলনে যোগ দেবার রাস্তামান্ডেলার নৈতিক মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেবার আয়োজন ছিল ব্যাপক। সবাই জানে সেই বর্ণবিদ্বেষী প্রকল্পের ভগ্নদশার ইতিহাস। রবেন দ্বীপে কারাবাস, তারপর অন্য জেলে, হাড়ভাঙা খাটুনি, অপকৃষ্ট খাবার, ন্যূনতম সুযোগসুবিধার অভাব, যক্ষ্মার সংক্রমণ, কোনো কিছুতেই দমানো গেল না এই একগুঁয়ে জেদি লক্ষ্যে অবিচল অনুদ্‌বিগ্নমনা মুক্তিযোদ্ধাকে।

আদালতে মান্ডেলার ঐতিহাসিক জবানবন্দি এখনও বিশ্বের বিবেক শিহরণ জাগায়।

আমার জীবন আমি আফ্রিকার জনগণের এই লড়াইতে উৎসর্গ করেছি। আমি লড়েছি সাদা আধিপত্যের বিরুদ্ধে, যেমন লড়েছি কালো আধিপত্যের বিরুদ্ধে। আমি আদর্শ হিসেবে নিয়েছি স্বাধীন এবং গণতান্ত্রিক এক সমাজব্যবস্থাকে যেখানে সব মানুষের সমান অধিকার থাকবে আর থাকবে সামাজিক ঐক্য। আমি এই আদর্শের জন্যই বাঁচতে চাই; আশাকরি একদিন এটি রূপায়িত হবে। যদি দরকার হয় আমি এই আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত।

১৯৬৩ সালের এই ঘোষণাকে দক্ষিণ আফ্রিকার মুক্তিসংগ্রামের আশু লক্ষ্য হিসাবে নিলে ভেবে দেখা দরকার ঠিক কী ধরনের গণতন্ত্র এবং সামাজিক ঐক্য চেয়েছিলেন যুবক মান্ডেলা, আর দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা-সংগ্রাম কোন অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছতে চেয়েছিল। এই সংগ্রামের অনেক শরিক ছিল, ভিতরে ছিল অনেক টানাপোড়েন। আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস আর দক্ষিণ আফ্রিকার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ছিল কয়েকটি স্থানীয় দল; আর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ছিল জুলু ইনকাথা পার্টি। এরা সবাই শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের অবসান চেয়েছিল, কিন্তু তার পর কি হবে তাই নিযে কখনো একমত হতে পারেনি। কমিউনিস্ট পার্টির সমাজতান্ত্রিক লক্ষ্য অবশ্য ছিল তুলনায় স্পষ্ট, সারা পৃথিবীর সাম্যবাদীরা যেমন চেয়ে এসেছে তারাও তেমনিভাবে চেয়েছিল শ্রেণিহীন সমাজ, কেবল বর্ণবিদ্বেষের অবসান নয়। নুতন রাষ্ট্র ব্যক্তিগত পুঁজি রাষ্টায়ত্ত্ব করে নেবে, সমানভাবে বণ্টিত হবে দেশের ঐশ্বর্য এবং আয়, সবার সমান অধিকার থাকবে খাদ্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ইত্যাদির সংস্থানে। অবশ্য নেতা জো স্লোভো চাইতেন বিলম্বিত সূর্যাস্তের মতো ধীরগতির পরিবর্তন। মান্ডেলা একসময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, কেন্দ্রীয় কমিটিতেও নির্বাচিত হয়েছিলেন, কিন্তু কমিউনিস্ট মতাদর্শে তাঁর সম্পূর্ণ আস্থা ছিল কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। তাঁর আত্মজীবনী পড়লে মনে হয় যে নিজের জোজা (Xhoza) আদিবাসী সমাজের চিরায়ত সামাজিক ঐক্য তাঁর মনে যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল তার তুলনায় অন্যান্য ধারণা তেমন জোরালো হয়ে ওঠেনি। শ্রেণি-সংগ্রাম হয়তো তাঁর কাছে তেমন বাঞ্ছিত ছিল না, কারণ কৌম সমাজের সাধাসিধে ভ্রাতৃত্ব অসাম্যকে মেনে নিয়েই তৈরি হয়ে ওঠে; তার গড়নে সম্পদ ও ক্ষমতার উচ্চাবচতা থাকে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকে না, কিন্তু সবাই অংশীদার হওয়াতে একটা সাম্যের আবহ বিরাজ উচ্চাবচতা থাকে, নারী-পুরুষের সমানাধিকার থাকে না, কিন্তু সবাই অংশীদার হওয়াতে একটা সাম্যের আবহ বিরাজ করে সমাজের যৌথ কাজকর্মে। এটা একোবরেই আশ্চর্য নয় যে বর্ণবিদ্বেষী জমানার অবসানের দাবির সঙ্গে অর্থনৈতিক অসাম্য দূরীকরণের প্রকল্প পুরোপুরি জাড়িয়ে নেননি মান্ডেলা। তাঁর কাছে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেজন্য সাদা-চামড়া গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের জমানার অবসান আশঙ্কা করে মান্ডেলাকে বারবার টোপ দিয়েছিল জেল থেকে বেরিয়ে তাদের শর্তে বোঝাপড়ার সন্ধান করার জন্য। বলা বাহুল্য, মান্ডেলা পূর্ণ স্বাধীকারের কোনো বিকল্প গ্রহণ করতে রাজি হননি।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯০ সালে বিনা শর্তে ছেড়ে দিতে বাধ্য হবার পর মান্ডেলাকেই অন্তিম ভরসা হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিল বর্ণবিদ্বেষী নেতৃত্ব, নতুবা জনরোষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত সাদা চামড়ার সম্প্রদায়, রক্তের স্রোত বয়ে যেত জনপদের রাস্তায় রাস্তায়। মান্ডেলা যখন ১৯৯৪ সালে নতুন দক্ষিন আফ্রিকা রাষ্ট্রের হাল ধরলেন তখন সাদা-কালো স্ত্রী-পুরুষ গরিব-বড়োলোক বামপন্থী-উদারপন্থী বিপ্লবী-রক্ষণশীল নির্বিশেষে তাঁকে সর্বসম্মত নেতা বলে স্বাগত জানালেন জনসধারণ। তাঁরা জানতেন যে এই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখবেন মাদিবা।

এক দফা রাষ্ট্রপ্রধান থেকেই মান্ডেলা সরকারি কাজ থেকে অব্যাহতি নিলেন ১৯৯৯ সালে; ২০০৪ সালে, তাঁর কথায়, ‘অবসরথেকেও অবসরতাঁর প্রাপ্য বলে জানালেন। ততদিনে বয়স হয়েছে ছিয়াশি, শরীর ভেঙে পড়েছে অন্ধকারায় দীর্ঘ দিনযাপনের ফলে, ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে মারনরোগের নিয়ত সম্ভাবনা। ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনেও নানা ঘাত-প্রতিঘাত সামলাতে হয়েছে তাঁকে। দ্বিতীয় স্ত্রী উইনি-র সঙ্গে সরকারি ভাবে ১৯৯২ সালে বিচ্ছেদ হয়, যদিও জেলে থাকতেই উইনি-র উচ্ছৃঙ্খল এবং অসামাজিক কাজকর্মে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সন্তান এবং নাতি-নাতনিদের অনেকেও তাঁকে নানাভাবে দুঃখ-ক্লেশ দিয়েছে। বড়ো পরিবারের কর্তা আর আদিবাসী সমাজের রাজপুরুষ হিসেবে তাঁকে নানারকম দায় নিতে হয়েছে, যার ঝুটাঝামেলা নেহাত কম ছিল না। একেক সময়ে এমন গুঞ্জন শোনা গেছে যে মাদিবা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নানাভাবে নিজের ও পরিবারের আখের গুছিয়ে নিতে পরাঙ্মুখ ছিলেন না। তবে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান হিসেবে তাঁর অবিস্মরণীয় অবদান এবং আত্মত্যাগের নিরিখে অনেকেই এইসব মানুষী দুর্বলতাকে তেমন গুরুত্ব দিতে রাজি নন। শেষ বয়সে মোজাম্বিকের প্রয়াত জননায়ক সামোরা মাকেল-এর বিধবা স্ত্রী গ্রাকা-র সঙ্গে বিয়ে হবার পর অপেক্ষাকৃত শান্তিতে তাঁর দিন কেটেছিল। এই অন্তিম সুখটুকু তাঁর প্রাপ্য ছিল।

যে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মান্ডেলা রেখে গেলেন সেটি তেমন সুখী দেশ নয়। সম্পদের বৃহদংশ এখনও সাদা চামড়ার লোকেদের হাতে, তাদের অতীত কুকর্মের জন্য তেমন ফলভোগও করতে হয়নি। মান্ডেলা সরকারের ট্রুথ অ্যান্ড রিকন্সিলিয়েশন কমিশন অনেক কিছু ধামাচাপা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বহুজাতিকদের দাপট অব্যাহত। চারিদিকে অন্যায় বঞ্চনা হিংসার আতিশয্য, চুরি-ডাকাতির সমূহ উপদ্রব। দেশের মানুষ নিরাপদ নয়, আগেকার গরিবেরা গরিবই রয়ে গেছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও একটা আসল কথা হচ্ছে এই দেশ এখন স্বাধীন, বর্ণবৈষম্য অতীত, সব মানুষের সামনে অন্তত রয়েছে সম্ভাব্য বিকাশের খোলা রাস্তা। সেজন্য সাম্প্রতিক কালের প্রধান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনানীর তিরোধানে তাঁকে অন্তিম সেলাম জানানো বিশ্ববাসীর কর্তব্য।

সম্পাদকীয়, ‘আরেক রকম’

প্রথম বর্ষ চতুর্বিংশ সংখ্যা ১৬-৩১ ডিসেম্বর ২০১৩, ৩০ অগ্রহায়ণ-১৫ পৌষ ১৪২০
Copyright @ Arekrakam

স্বৈরাচারী সিদ্ধার্থশঙ্করের যোগ্য উত্তরসূরী মমতা ব্যানার্জি

সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত

পাঁচ বছর আগে পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মমতা ব্যানার্জি ক্ষমতায় এসে প্রথম ধ্বংস করেছিলেন বামফ্রন্ট আমলে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজ্যের গণতন্ত্র। প্রথম দফার শাসনকালে ১৭৬জন এবং বিধানসভা নির্বাচন চলাকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে আরও ২৫ জন বাম কর্মী খুন হয়েছেন তৃণমূল ভৈরববাহিনীর হাতে। এখনও পর্যন্ত ১১ হাজারের বেশি কর্মী ঘরছাড়া। লক্ষাধিক কর্মীকে মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। গত নির্বাচনের পর প্রায় ৬০০ পার্টি ও প্রায় দেড়শ বাম গণ সংগঠনের অফিস দখল, ভাঙচুর বা আগুন দেওয়া হয়েছে। সদ্য নির্বাচিত বাম বা বিরোধী বিধায়করাও আক্রান্ত হয়েছেন। সন্ত্রাস, আক্রমণ, কন্ঠরোধ করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও মমতা ব্যানার্জী ভয়মুক্ত হতে পারছেন না। কারণ তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে, নানা আক্রমণ ও সন্ত্রাসের মধ্যেও তৃণমূলের বিরুদ্ধে ৫৫ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছেন।

বিরোধীদের মর্যাদা দেওয়ার প্রচলিত রীতির মধ্যেই সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ নির্ভর করে। বিরোধীদের দূরবীণ দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে নাবা 'বিরোধীরা ২০ বছর চুপ করে থাকুক' মমতা ব্যানার্জীর এই সদম্ভ হুমকি আমাদের সংসদীয় ব্যবস্থার পরিপন্থী। অনৈতিকভাবে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে বা মোটা টাকার উৎকোচের লোভ দেখিয়ে গায়ের জোরে বিরোধী দল পরিচালিত একের পর এক জেলা পরিষদ, পুরসভা, পঞ্চায়েত দখল করছে তৃণমূল কংগ্রেস। পাঁচ মাস আগে অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে মানুষের রায়ে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলি এইভাবে প্রথম দখল করা শুরু হয়েছে - তা কিন্তু নয়। ২০১১ সালে বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর থেকেই মমতা ব্যানার্জী চেষ্টা করেছেন বিরোধীদের হাতে থাকা পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলি যে কোনভাবে ভয় দেখিয়ে জোর করে দখল করে নেওয়ার। মমতা ব্যানার্জীর উদ্দেশ্য স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে পুলিশ ও প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে অসাংবিধানিক পদ্ধতিতে রাজ্যকে বিরোধীশুন্য করে দেওয়া। কিন্তু ২ কোটি ১৫ লক্ষ ভোটারকে দখল নিতে পারবেন না মমতা ব্যানার্জী।

প্রথম এই ধরনের স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে সংগঠিত গুন্ডামির সাহায্যে হালিশহর পৌরসভা দখল করা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৫শে নভেম্বর। পৌর নির্বাচনে হালিশহর পৌরসভার ২৩টির ওয়ার্ডের মধ্যে বামফ্রন্টের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সংখ্যা ১৪, তৃণমূল কংগ্রেসের ৮ এবং কংগ্রেসের ১ জন। তৃণমূল গুন্ডাদের সশস্ত্র বাহিনী ২৪শে নভেম্বর রাতে আক্রমণ, ভাঙচুর, প্রাণে মারার হুমকির পর অপহরণ করে হালিশহরে সি পি আই (এম)-র ৬জন কাউন্সিলরকে জবরদস্তি পদত্যাগ করায়। শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে জোর করে লেখানো হলো পদত্যাগপত্র। মহকুমা শাসকের সামনে দাঁড়িয়ে এই ৬জন কাউন্সিলর জানিয়ে দিলেন, শারীরিক অসুস্থতা কিংবা স্বেচ্ছায় নয়, স্রেফ প্রাণনাশের হুমকির মুখে দাঁড়িয়েই তাঁরা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া দূরের কথা, তারা তৃণমূলকে প্রকাশ্যে সহযোগিতা করেছিল।

বামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার মমতা ব্যানার্জীর এই স্বৈরাচারী পদ্ধতির সাথে সাতের দশকের সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের পদ্ধতির অবিকল মিল আছে। ৭২-৭৭এর গণতন্ত্র নিধনকারী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় জীবিতকালে বারবার বারবার বলেছেন, মমতা তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী। ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কলকাতায় মমতা ব্যানার্জী কর্তৃক আয়োজিত এক কনভেনশনে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় বলেছিলেন, "কি করে ভোটে জিততে হয় তা আমি দেখিয়ে দিয়েছি। মমতা আমার যোগ্য উত্তরসুরী।মমতা ব্যানার্জী যে তাঁর যোগ্য উত্তরসুরী, তাঁর প্রমান গত ৫ বছর ৫ মাসের রাজ্য শাসনে প্রতি মুহুর্তে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ অনুভব করছেন। যত দিন যাচ্ছে, তত বেশী করে প্রমান পাওয়া যাচ্ছে। পঞ্চায়েত, লোকসভা, পৌরসভা ও সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা ব্যনার্জী প্রমান করে দিয়েছেন, তিনি শুধু সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের উত্তরসুরী নন, গণতন্ত্র নিধন, সন্ত্রাস-সহ এই সম্পর্কিত সমস্ত বিষয়ে তিনি তাঁর পূর্বসুরী থেকে এগিয়ে রয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ আজ গণতন্ত্র নিধনের সুতিকাগারে পরিণত হয়েছে।

অতীতের সাথে তুলনা না করলে বোঝা যাবে না - কেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মমতাকে উত্তরসুরী হিসাবে ঘোষণা করেছিলেন। আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বৈরাচারী ও কর্তৃত্ববাদী মনোভাবাপন্নরা ক্ষমতায় আসার পর কিভাবে সর্বগ্রাসী ভুমিকা গ্রহণ করে গণতন্ত্রকে চূর্ণ বিচুর্ণ করে দিতে পারে এই অভিজ্ঞতা ১৯৭০ সাল থেকে প্রথমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ও পরে ১৯৭৫ সালে জরুরী অবস্থা জারীর পর সারা ভারতবর্ষের মানুষের হয়েছিল। ১৯৭০ সালের ১৬ই মার্চ দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পতনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির পর রাজ্যপালের প্রধান পরামর্শদাতা হিসাবে নিযুক্ত বি বি ঘোষ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ আইএএস ও আইপিএস-দের গোপন সভা ডেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে করেই হোক এ রাজ্য থেকে সিপিআই(এম)-এর প্রভাবকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী কোন শৈথিল্য বা গাফিলতি বরদাস্ত করবেন না। একটি সংবিধান প্রদত্ত বৈধ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে স্বৈরাচারী পদ্ধতিতে নিশ্চিহ্ন করার নির্দেশ সেই সময় দেওয়া হয়েছিল।

পরবর্তীকালে ভারত সরকারের এসআইবি তাদের অতি গোপন সার্কুলারে বিভিন্ন হত্যাকান্ডের সঙ্গে সিপিআই(এম)-এর নাম জড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এরপর কিভাবে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের নের্তৃত্বে রিসার্চ এ্যান্ড এ্যানালিসিস উইং-এর ('') পরামর্শ ও সহযোগিতায় ১৯৭২ সালে রিগিং নির্বাচন সম্পন্ন করে কংগ্রেস ক্ষমতা দখল করেছিল - তা আজ ইতিহাস। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর মমতা ব্যানার্জী একই পদ্ধতিতে পুলিশ ও সাধারণ প্রশাসনকে ব্যবহার করে বামপন্থীদের, বিশেষ করে সিপিআই(এম)-কে, মিথ্যা মামলা, খুন, সন্ত্রাস, আক্রমণ করে নিশ্চিহ্ন করার উদ্যোগ নিয়েছেনতা মানুষ গত পাঁচ বছর প্রত্যক্ষ করেছেন। মমতার আমলে এখন রাজ্যে একইভাবে তৃণমূলের চক্রান্তে মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে সিপিআই(এম)-এর নাম জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে হলদিয়ার পার্টিনেতা শ্যামল মাইতিকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার। অতীতে মমতা ব্যানার্জী কর্তৃক 'চম্পলা সর্দারের' মিথ্যা কেসের মতো এই কেসটিকেও সাজানো হয়েছে পুলিশ-তৃণমুলের যৌথ চক্রান্তে। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ক্ষমতায় এসেই সমস্ত নির্বাচিত পৌরসভাকে ভেঙে দিয়েছিলেন। মমতার আমলে পৌর ও পঞ্চায়েত প্রতিটি নির্বাচন গায়ের জোরে ছাপ্পা ভোটের মাধ্যমে দখল করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও যেখানে বিরোধীরা জিতে বোর্ড গঠন করতে পেরেছেন, সেখানে চলেছে গায়ের জোরে ভয় দেখিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলত্যাগে বাধ্য করে দখল করার নিকৃষ্ট কাজ।

সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের জমানায় দর্পন ও বাংলাদেশ সাপ্তাহিক পত্রিকার দপ্তরে হামলা হয়েছিল। দর্পণ পত্রিকা ছাপার অপরাধে মডার্ণ ইন্ডিয়া প্রেসকে সীল করে দিয়েছিল সরকার। ফলে দর্পণের সাথে ফ্রন্টিয়ার পত্রিকাও বন্ধ হয়ে যায়। গাড়ীর উপর তান্ডব নৃত্য করে ও হামলা চালিয়ে ইউনিভার্সিটি ইনষ্টিউটে জয়প্রকাশ নারায়ণের সভা বানচাল করেছিল যুব কংগ্রেস ও ছাত্র পরিষদ। জয়প্রকাশের উপর হামলার ঘটনা সমর্থন করে বিধাননসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন সিপিআই নেত্রী ইলা মিত্র। এই বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার জন্য সত্যযুগের বার্তা সম্পাদক কল্পতরু সেনগুপ্তকে বিধানসভায় ডেকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য করানো হয়েছিল। মমতার রাজত্বে ২০১৩ সালে প্রায় একইরকম অভিযোগ এনে অরুণাভ ঘোষকে বিধানসভায় দুঘণ্টার জন্য জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। বিধানসভায় শাসকদলের বিধায়কদের হাতে সি পি আই (এম) বিধায়ক দেবলীনা হেমব্রম এবং গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জির নিগ্রহের সংবাদ পরিবেশনের জন্য আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে। বিধানসভার স্বাধিকার রক্ষা কমিটির বিবেচনাধীন অভিযোগটি ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে প্রত্যাহৃত হয়। সম্ভবত সরকার ও পত্রিকাটির মধ্যে গোপনে কোনও সমঝোতার ভিত্তিতে অভিযোগটি প্রত্যাহৃত হয়েছিল। আনন্দবাজারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও অন্য একটি  বৈদ্যুতিন সংবাদ চ্যানেলের বিরুদ্ধে একটি স্বাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পত্র পত্রিকার উপর এই আক্রমণ পুঁজি পরিচালিত সংবাদ মাধ্যম মেনে নিলেও একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা তা কখনো মেনে নেয়নি। তাই বারবার আক্রমনের মুখোমুখি হতে হয়েছে গণশক্তি পত্রিকাকে।

১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন মধ্যরাত্রে অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর সংবাদ ভারতের অনেক পত্রিকা ছাপতে সাহস করেনি। পরদিন সান্ধ্য গণশক্তি পত্রিকায় শীর্ষ সংবাদ হিসাবে খবরটি ছাপা হয়েছিল - "আপৎকালীন অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা ঘোষণা : বিরোধী পক্ষের নের্তৃবৃন্দ গ্রেপ্তার, জয় প্রকাশ নারায়ণ, মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতা মেজর জয়পাল সিং, মোরারজী দেশাই প্রমুখ সংগঠন কংগ্রেস, এসপি, জনসংঘ, বিএলডি প্রমুখ বিরোধী নের্তৃবৃন্দ কারাগারে আটক : জ্যোতির্ময় বসু, সুরেন্দ্র মোহন প্রমুখের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা।" শুধু সংবাদটি প্রকাশ করেই গণশক্তি ক্ষান্ত থাকেনি। জরুরী অবস্থার  সেন্সর বিধি ও সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে ঐ দিনই অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধের আহবান জানিয়ে "গণতন্ত্রের মুলোচ্ছেদ গণ প্রতিরোধ চাই" সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল : " ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মা:)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদকমন্ডলী অবিলম্বে জরুরী অবস্থা প্রত্যাহারের দাবি করেছে, ধৃত ব্যক্তিদের মুক্তি দাবী করছে এবং জনগণের প্রতি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আহবান জানাচ্ছে। আহবান জানাচ্ছে - গণতন্ত্রের উপর এই বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে, স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলুন।"  ভারতের আর কোনও পার্টি বা সংবাদপত্র অভ্যন্তরীন জরুরী অবস্থা জারীর বিরুদ্ধে এই ধরনের বিবৃতি বা সম্পাদকীয় লেখার সাহস সেদিন দেখাতে পারেনি। একটি কথা উল্লেখ করা এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক, আরএসএস প্রধান জরুরী অবস্থা জারীকে সমর্থন করে নিজেদের মুক্তির জন্য জেল থেকে একাধিক চিঠি দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীকে।

জরুরী অবস্থার সময় আনন্দবাজারের সাংবাদিক বরুন সেনগুপ্ত এবং গৌর কিশোর ঘোষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সাংবাদিক জ্যোতির্ময় দত্তও গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, আনন্দবাজার সেইসময় এই গ্রেপ্তারের সংবাদ পর্যন্ত ছাপতে সাহস করেনি। সেন্সর বিধির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে গণশক্তি সেই সংবাদ ছেপেছিল। সারা ভারতে যে ১০০টি পত্রিকায় জরুরী অবস্থার সময়ে বিজ্ঞাপন বন্ধ করা হয়েছিল, তার মধ্যে গণশক্তি ছিল অন্যতম। সেন্সর বিধি লঙ্ঘনের জন্য গণশক্তির উপর ৪৭টি নোটিশ জারী করা হয়েছিল। 'গণশক্তি পত্রিকার প্রেস কেন সীল করা হবে না' - এই মর্মে নোটিশ জারী হলে কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য প্রধান বিচারপতি স্থগিতাদেশ দেওয়ায় সে যাত্রায় সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সরকারের মনস্কামনা পূর্ণ হয়নি। মমতা ব্যানার্জী্র আমলে আবার গণশক্তি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । অন্যান্য অধিকাংশ সংবাদ মধ্যমকে তাঁবেদারে পরিণত করতে পারলেও গণশক্তির বিজ্ঞাপন বন্ধ করে ও পত্রিকা প্রচারে বাধা দিয়ে গণশক্তিকে টলানো যায়নি। মাথা উঁচু করে স্বৈরশক্তির বিরুদ্ধে আপোষহীন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে একমাত্র গণশক্তি।

অনেকেই আজ ভুলে গিয়েছেন, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সরকার জেলার উন্নয়নের স্লোগান দিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ে জেলায় জেলায় মন্ত্রীসভার বৈঠকের আয়োজন করতেন। তাতে জেলা বা রাজ্যের, কোন উন্নয়ন হয়নি। মমতাও একই পদ্ধতিতে গত পাঁচ বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে জেলায় জেলায় শতাধিক প্রশাসনিক বৈঠক করেছেন। রাজ্যের কোনও উন্নতির লক্ষণ তাতে দেখা যাচ্ছে না। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় মাসান্তিক বেতার ভাষণে উন্নয়নের মিথ্যা ফিরিস্তি দিতেন। মমতাও শত শত কোটি টাকা ব্যয় করে সংবাদ মাধ্যমে নিজের ছবি দিয়ে উন্নয়নের বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। যেমন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলে মদ, জুয়া আর সাট্টার রমরমা বাজার গড়ে উঠেছিল, তেমনই এই রাজ্যে তৃণমূলের সিন্ডিকেট ও তোলাবাজীর রমরমা বৃদ্ধি ছাড়া রাজ্যের মানুষ কোনও উন্নয়ন চর্মচক্ষে দেখতে পাচ্ছেন না।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ গণতন্ত্রের অবমাননা ও লাঞ্ছনা কোনদিন মুখ বুজে মেনে নেয়নি। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পীঠস্থান পশ্চিমবঙ্গ বারেবারে স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন শাসকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদে সামিল হয়েছে। এই রাজ্যের মানুষের গণতন্ত্রবোধ এতটাই প্রখর যে, রাজ্য ও দেশের সীমানা অতিক্রম করে পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে গণতন্ত্র বিপন্ন হলে তাঁরা প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য - কোন স্বৈরাচারী একনায়কতন্ত্রী মনোভাবাপন্নদের কাছে মাথা নত করে না। মমতার কাছেও নয়। গত পাঁচ বছর বহু চেষ্টা করেও মমতা ব্যানার্জী বামপন্থাকে নিশ্ছিহ্ন করতে পারেননি। আগামী দিনেও পারবেন না।                                                        

20161026

নভেম্বর বিপ্লব: মানবজাতির জন্য এক নতুন দিশা

শ্রেণী শোষণ থেকে মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় মানব ইতিহাসে প্রথম অগ্রগতি হলো মহান নভেম্বর বিপ্লব। নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনে শ্রমিক কৃষক ও অন্যান্য শোষিত অংশের মানুষের এটি প্রথম সফল বিপ্লব।

নভেম্বর বিপ্লব কি?
১৯১৭ সালে রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লব বিশ্ব ইতিহাসে নতুন যুগের সূচনা করেছিল। এই বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় নতুন সমাজন্ত্রিক রাষ্ট্র —— সোভিয়েত ইউনিয়ন। শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে বিপ্লবী আন্দোলনকে তা বিশ্বের সামনে নিয়ে আসে।
রাশিয়ার এই বিপ্লব সংগঠিত হয় ১৯১৭ সালের ১৭ই নভেম্বর (প্রাচীন রাশিয়ার বর্ষপঞ্জী অনুসারে এই তারিখ ছিল ২৫শে অক্টোবর)।
জার রাজতন্ত্রের কেন্দ্র ছিল রাশিয়াএই রাজত্বের হাতে ছিল গোটা মধ্য—এশিয়াসহ বিশাল সাম্রাজ্য। জারের শাসন পদ্ধতির ভিত্তি ছিল বৃহৎ জমিদারতন্ত্র। এই সাম্রাজ্যের উৎকৃষ্ট জমির ৮০ লক্ষ হেক্টর ছিল সর্বশেষ জারের মালিকানায়। সেই সময়ে ছিল ২৮,০০০ বৃহৎ জমির মালিক যাদের হাতে ছিল ১৬.৭৪ কোটি একর জমি।
এই আধা সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি প্রথার পাশপাশি পুঁজিবাদী বিকাশ শিল্পখনি ক্ষেত্রে একচেটিয়া পুঁজির উদ্ভব ঘটায়। দ্রুততার সঙ্গে পুঁজিবাদের বিকাশ হলেও বৃহৎ ইউরোপীয় দেশগুলির পুঁজিবাদী বিকাশের তুলনায় রাশিয়া ছিল তখনও পশ্চাদপদ।
জার ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন। জার্মানি, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির উপনিবেশ ও সম্পদ দখলের প্রতিযোগিতার কারণে এই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ বাধে।
লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ও কৃষককে জারের সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করে এই যুদ্ধে পাঠানো হয়। এই যুদ্ধে রুশ পক্ষ জার্মানির কাছে হারছিল এবং হাজার হাজার রুশ সেনা প্রাণ হারান। দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকরা জমিদারদের হুকুমে দাসদের মতো যন্ত্রণা ভোগ করছিল।



প্রথম, ফেব্রয়ারি বিপ্লব
এই পরিস্থিতিতে গণ অসন্তোষ তীব্র আকার নেয়। বিপ্লবী শক্তিগুলি বিশেষত বলশেভিক পার্টি জার রাজত্বের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংগঠিত করে। এই গণ অভ্যুত্থান বিপ্লবের রূপ নেয়। যা ঘটে ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ সালে। জার স্বৈরতন্ত্র উৎখাত হয় এবং তার জায়গায় বুর্জোয়াদের নিয়ন্ত্রিত একটি সরকার গঠিত হয়, যেখানে কয়েকটি সোস্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিও যোগ দেয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে গঠিত অস্থায়ী সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলির সাথে আপস করে রুশ বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার রাস্তা নেয়। যুদ্ধে বিপর্যয় এবং অসংখ্য সৈন্যের মৃত্যুর পরিস্থিতিতে এই সরকার ক্রমশ জনপ্রিয়তা হারায়।
ফেব্রুয়ারি বিপ্লব জনগণের হাতে ক্ষমতায় নতুন এক হাতিয়ারকে সামনে নিয়ে আসে- সোভিয়েত সমূহ। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত বড় বড় শহরে এবং গ্রামীন এলাকায় শ্রমিক, কৃষক ও সৈন্যদের সোভিয়েত গড়ে ওঠে।
শ্রমিকদের সোভিয়েত এবং সৈন্যদের মধ্যে গঠিত সোভিয়েতগুলির মধ্য থেকে বলশেভিক পার্টি ( বিপ্লবের পর হয় কমিউনিস্ট পার্টি) ক্রমবর্ধমান সমর্থন পেতে থাকে। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারির শেষে অস্থায়ী সরকার শ্রমিক কৃষক ও সৈন্যদের তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের মুখোমুখি হয়। চলমান বিপ্লবকে রক্ষা করতে সর্বহারারা রাজধানী পেট্রোগ্রাড এবং মস্কোর মতো শহরে নিজেদের সোভিয়েত ও সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করে। গ্রামীন রাশিয়া জুড়ে কৃষক এবং খেতমজুররা জমিদার ও রাজন্যবর্গের জমি দখল করতে থাকে। সামরিক বাহিনীর মধ্যে সৈন্যরা নিজেদের সোভিয়েত নির্বাচিত করে যুদ্ধের অবসান ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবি করতে থাকে। লেনিন বলেছিলেন এই সৈন্যদের বেশিরভাগটাই ‘‘ উর্দি পরিধান করা কৃষক’’

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথে: সোভিয়েতগুলিকে সমস্ত ক্ষমতা প্রদানের দাবি
এই পরিস্থিতিতে বলশেভিক পার্টির নেতা লেনিন ঘোষণা করেন যে দেশ বুর্জোয়া বিপ্লবের প্রথম পর্বের থেকে দ্বিতীয় পর্বের দিকে যাচ্ছে এবং ক্ষমতা দিতে হবে সর্বহারা ও কৃষকদের গরিবতম অংশের হাতে।
‘‘সমস্ত ক্ষমতা সোভিয়েগুলিকে দাও’’ বলশেভিক পার্টির এই ডাকে চূড়ান্তভাবে ২৫শে অক্টোবর (৭ই নভেম্বর) শ্রমিকদের সশস্ত্র অংশ (লাল ফৌজ) এবং সৈন্যবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী সেনারা অস্থায়ী সরকারকে উৎখাত করতে এগিয়ে যান। রাজধানী পেট্রোগ্রাডে ক্ষমতা দখলের মধ্যে দিয়ে বিপ্লব সফল হয়। পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে প্রতিবিপ্লবী সেনাদের প্রতিরোধ ভেঙে মস্কো এবং অন্যান্য কেন্দ্রে, গোটা রাশিয়ায় এবং পুরনো জার সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশে সোভিয়েত ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বিপ্লবের পরে লেনিনের নেতৃত্বে জনগণের কমিশারদের পরিষদ নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়।
জমি, শান্তি ও রুটির শ্লোগানে বলশেভিকরা জনগণকে সংগঠিত করেছিল। নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল শ্রমিক, সৈন্য ও কৃষকদের ডেপুটিদের সর্ব রাশিয়ান কংগ্রেস-এ জমি ও শান্তির জন্য ডিক্রি পেশ করাএই কংগ্রেসের গৃহীত জমি ডিক্রিতে গির্জা-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা জমি, তাদের গবাদি পশু ও কৃষির সরঞ্জাম ও বাড়িঘর অধিগ্রহণ করে স্থানীয় জমি কমিটি ও কৃষক ডেপুটিদের জেলা সোভিয়েতগুলির হাতে তুলে দেওয়া হয়।
যুদ্ধলিপ্ত সব সরকারগুলি ও জনগণের মধ্যে অবিলম্বে শান্তি আলোচনাসহ যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ডাক দেওয়া হয় শান্তি ডিক্রিতে। ক্ষয়ক্ষতি ও এলাকাভুক্ত ছাড়াই অবিলম্বে শান্তি চুক্তি করার সংকল্প ঘোষণা করে নতুন সোভিয়েত সরকার।
অন্যান্য ডিক্রিগুলি ছিল নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, অবৈতনিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যরক্ষা এবং সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের নতুন ইউনিয়ন গঠন সম্পর্কিত।
জারের রাশিয়া ছিল ‘‘জাতিসমূহের বন্দীশালা’’। রুশ বিপ্লব ঔপনিবেশিক জোয়াল থেকে বিভিন্ন অ-রুশ জাতি সমূহকে মুক্তি দেয় এবং ইউনিয়নের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র বিষয় হিসেবে তাদের দেয় এক স্বয়ংশাসিত ব্যবস্থা।
নতুন সোভিয়েত রাষ্ট্র সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজ শুরু করার আগেই এই বিপ্লব প্রতিবিপ্লবী শক্তির আক্রমণের মুখে পড়ে। বেধে যায় রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। লাল ফৌজকে লড়াই করতে হয় শ্বেত ফৌজ ও প্রতিবিপ্লবীর বাহিনীর বিরুদ্ধে। ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সসহ দশটি পুঁজিবাদী দেশ প্রতিবিপ্লবী শক্তিকে অস্ত্র সহায়তা দিয়ে মদত দেয়।
চার বছরের গৃহযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত লালফৌজ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ধ্বংস করে চূড়ান্ত জয়লাভ করে। এই প্রক্রিয়ায় লালফৌজকে বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে এবং লালফৌজের হাজার হাজার শ্রেণী সচেতন শ্রমিক ও কৃষক গৃহযুদ্ধে প্রাণ দেয়।

কেন এটিকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব?
পৃথিবীতে আগে যা বিপ্লব হয়েছে তার থেকে নভেম্বর বিপ্লব পৃথক। ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব দিয়ে শুরু করে পূর্ণ সামন্ততান্ত্রিক শ্রেণী ও অভিজাত শ্রেণীর কাছ থেকে বুর্জোয়াদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিভিন্ন বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে।
অতীতের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে নানা বিপ্লব হয়েছে যখন শোষকদের নতুন শ্রেণী পুরনো শোষকদের শাসনকে উৎখাত করেছিল। এটাই ঘটেছে যখন বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে বিপ্লব পূর্ণ সামন্ত শোষক শ্রেণীগুলিকে উৎখাত করেছিল।
নভেম্বর বিপ্লব তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই প্রথম শ্রমিক শ্রেণী ও তার সহযোগী শোষিত শ্রেণী গরিব কৃষকসহ মিত্ররা শাসক বুর্জোয়া শ্রেণী ও শোষকশ্রেণীগুলিকে উৎখাত করতে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছে। রাশিয়াতে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণী বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে নভেম্বর বিপ্লবকে পৃথিবীর প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলা হয়। লেনিন বলেছিলেন যে, বিপ্লব তখনই সফল হয় যখন পুরনো রাষ্ট্র ক্ষমতা ভেঙ্গে নতুন ধরণের রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। রুশ বিপ্লবে তা-ই ঘটেছে। এই বিপ্লব পুরনো রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ভেঙ্গে তার জায়গায় সোভিয়েত ধরণের নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এই সোভিয়েতগুলি ছিল শ্রমিক এবং গরিব কৃষক স্বার্থের প্রতিনিধি।
সমাজতন্ত্রের অর্থ উৎপাদনের উপকরণ সমূহের সামাজিকীকরণ। শিল্প, জমি ও কৃষি এবং উৎপাদনের অন্যান্য উপকরণ রাষ্ট্র হাতে তুলে নিয়ে এবং যৌথ মালিকানায় নিয়ে এসে নতুন রাষ্ট্র ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে এই কাজ সম্পন্ন হয়। এই প্রথম পৃথিবীতে উৎপাদনের নতুন সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

বিপ্লবের সাফল্য
১৯৬০-র দশক পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি সোভিয়েত ইউনিয়নে সম্পন্ন হয়। এমনকি সবচেয়ে ঘোর সমালোচকরাও এই সত্য স্বীকার করে। সম্মানিত ব্রিটিশ অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ অ্যাঙ্গাস ম্যাডিসন উল্লেখ করেছিলেন: ‘‘সমস্ত বড় অথবা উন্নত দেশগুলির মধ্যে ১৯১৩ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে মাথা পিছু সোভিয়েত আর্থিক সমৃদ্ধি সবচেয়ে দ্রুততর, এমনকি তখনকার জাপানের চেয়েও দ্রুততর। জাপানে উৎপাদন বৃদ্ধি হয় ৪০০ শতাংশ, সোভিয়েত ইউনিয়নে হয় ৪৪০ শতাংশ।’’
·       গৃহযুদ্ধের পর এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীভূত
·       সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে সাত বছরের সার্বজনীন শিক্ষা এবং দশ বছরের সার্বজনীন মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থা যা সেই সময়ে ইউরোপের অন্য কোনো দেশ অর্জন করতে পারেনি।
·       জমিদারি প্রথার বিলোপ এবং গরিব কৃষক ও খেতমজুরদের যৌথ খামার এবং সমবায়ে অংশীদারিত্ব
·       বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই সমস্ত নাগরিকদের নিখরচায় চিকিৎসা পরিষেবা।
·       বেকারত্ব দূর করে সকলের জন্য কাজের ব্যবস্থা। প্রত্যেকের জন্য কাজের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় ১৯৩৬ সালের মধ্যে সমস্ত এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
·       নতুন সরকারের প্রথম পদক্ষেপ ছিল মহিলাদের সমানাধিকার, সবার সমান মজুরি, মাতৃত্বকালীন সুযোগ সুবিধার অধিকার এবং বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করা। এছাড়াও মহিলাদের ভোট দেওয়ার অধিকার। এই অধিকার ১৯২৮ সালে একমাত্র ব্রিটেন দিয়েছিল তাদের দেশের মহিলাদের।
·       সাংস্কৃতিক সম্পদের বিরাট সম্প্রসারণ ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় খরচে বিভিন্ন বইপত্র, তার সঙ্গে চলচিত্র, সঙ্গীত ও শিল্পকলা নিয়ে প্রকাশ ও পরিবেশনা।



নভেম্বর বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রভাব
১৯১৭ সালের আগে পৃথিবী যা ছিল, বিংশ শতাব্দীর শেষে এবং আজকের তুলনায় তা সম্পূর্ণ আলাদা। বিংশ শতাব্দীর শুরুটা তখন ছিল সাম্রাজ্যের যুগ- সাম্রাজ্যবাদ ছিল উচ্চ শিখরে। পৃথিবীকে ভাগ করে কর্তৃত্ব নিয়েছিল বৃটিশ, জার্মান, ফরাসি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান, রাশিয়ান ও জাপানি সাম্রাজ্য। এর নিচে সাম্রাজ্য ছিল ইতালিয়ান, পর্তুগীজ ইত্যাদিরপৃথিবীর জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ এসব সাম্রাজ্যের অধীনে উপনিবেশ ও আধা উপনিবেশের বাসিন্দা ছিল। এই পুরনো ধরণের উপনিবেশবাদের অবসান ঘটে রুশ বিপ্লবের সূচনায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদের মৃত্যু যাত্রা শুরু হয়। জার সাম্রাজ্যের উৎখাতের ৫০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর বুকে আর কোনো সাম্রাজ্য ছিল না বললেই চলে। নভেম্বর বিপ্লব জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলিকে উদ্দীপ্ত করে। এই মুক্তি সংগ্রামগুলি ঔপনিবেধিক শাসনগুলিকে উৎখাত করে। প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সাফল্যের মধ্য দিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম উচ্চতর মাত্রায় পৌঁছায়। রুশ বিপ্লব থেকে অনুপ্রেরণা পায় এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলি। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই জাতীয় মুক্তি সংগ্রামগুলির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করে।
নভেম্বর বিপ্লবের ভিত্তি ছিলো শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর বিপ্লবী রণনীতি। এই শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর রণনীতিই পরবর্তী সময়ে ঔপনিবেশিক ও আধাঔপনিবেশিক দেশগুলিতে ব্যপক কৃষক সমাজকে সমবেত করতে ব্যবহার করা হয়। নভেম্বর বিপ্লবের প্রদর্শিত পথে তিন দশক পরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যুগান্তকারী চীন বিপ্লব সংগঠিত হয়। এরপরে হয় ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার বিপ্লব। এই সমস্ত বিপ্লব বিশ্বব্যপী সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও ১৯৩০- দশকের ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রামের প্রত্যক্ষ ধারাবাহিকতায় সংগঠিত হয়েছে। এর পরিণতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে গঠিত হয় সমাজতান্ত্রিক শিবির।
মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের অস্তিত্ব এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন পরিচালিত সংগ্রামের জন্যই বিংশ শতাব্দীর সেরা বিপদ ফ্যাসিবাদ পরাস্ত হয়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জনগণের দেশপ্রেমিক যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ২কোটিরও বেশি সেনা ও মানুষ প্রাণ হারায়। নাৎসী যুদ্ধ সম্পর্কে ধংস করার নেতৃত্ব দেয় লাল ফৌজ।
নভেম্বর বিপ্লবের মুক্তিকামী অবদানে রয়েছে বিশ্বব্যপী প্রভাব। রুশ বিপ্লবের সাফল্য বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলির প্রভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী সরকারগুলি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রীয় মডেল চালু করতে বাধ্য হয়। এই সব দেশের শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের জন্য সর্বজনীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়।



ভারতে প্রভাব
নভেম্বর বিপ্লবের সংবাদ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসে এবং বাইরের বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির স্বাধীনতা যোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জোগায়।
১) কংগ্রেসের মধ্যে মডারেট অংশ সম্পর্কে অসন্তুষ্ট র‌্যাডিক্যাল অংশ যেমন বাল গঙ্গাধর তিলক এবং অন্যান্যরা রাশিয়ার বিপ্লবী প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানান এবং তাঁরা শ্রমিকশ্রেণীকে সংগঠিত করার পক্ষে ছিলেন।
২) রুশ বিপ্লবের প্রভাবে ভারতে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। ১৯০৮ সালের আগে শিল্প শ্রমিকদের সংগঠিত করার কোনো উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা ছিলো না। ধর্মঘটও হতো কচিৎ। ১৯১৮ সালে শ্রমিকশ্রেণীর আন্দোলনের সূচনা হয় এবং অনেকগুলি শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠন গড়ে ওঠে ১৯১৯ থেকে ১৯২১ সালের মধ্যে দেশে বেশকিছু ধর্মঘটের জোয়ার বয়ে যায়।
৩) মোহাজীর গোষ্ঠীগুলির রুশ বিপ্লবের সঙ্গে পরিচিত হতে আফগানিস্তান হয়ে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। খিলাফৎ আন্দোলনের পরিণামে এই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ছিলেন ক্ষুব্ধ। এদের মধ্যে কয়েকজন ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট
৪) নভেম্বর বিপ্লবের পর সমাজতন্ত্রের সাফল্যে মুগ্ধ হন বিশিষ্ট লেখক কবি যেমন সুব্রহ্মনিয়াম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজি নজরুল ইসলাম প্রমুখ। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ রাশিয়া সফর করে যে নতুন সমাজ গড়া হচ্ছে তাতে মুগ্ধ হয়ে ‘রাশিয়ার চিঠি’তে তিনি লিখেছেন, ‘‘আমি নিজের চোখে না দেখলে কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারতুম না যে, অশিক্ষা ও অবমাননার নিম্নতম তল থেকে আজ কেবলমাত্র দশ বৎসরের মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে এরা শুধু ক খ গ ঘ শেখায় নি, মনুষ্যত্বে সম্মানিত করেছে। শুধু নিজের জাতকে নয়, অন্য জাতের জন্যেও এদের সমান চেষ্টা। অথচ সাম্প্রদায়িক ধর্মের মানুষেরা এদের অধার্মিক বলে নিন্দা করে। ধর্ম কি কেবল পুঁথির মন্ত্রে, দেবতা কি কেবল মন্দিরের প্রাঙ্গণে। মানুষকে যারা কেবলই ফাঁকি দেয় দেবতা কি তাদের কোনোখানে আছে। অনেক কথা বলবার আছে। এরকম তথ্য সংগ্রহ করে লেখা আমার অভ্যস্ত নয়, কিন্তু না-লেখা আমার অন্যায় হবে বলে লিখতে বসেছি। রাশিয়ার শিক্ষাবিধি সম্বন্ধে ক্রমে ক্রমে লিখব বলে আমার সংকল্প আছে। কতবার মনে হয়েছে আর-কোথাও নয়, রাশিয়ায় এসে একবার তোমাদের সব দেখে যাওয়া উচিত।’’ 
জওহরলাল নেহরু থেকে পেরিয়ার রামস্বামী পর্যন্ত যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় সফর করেছিলেন তাঁরা সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্যে গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভগৎ সিং এবং তাঁর কমরেডরা রুশ বিপ্লব ও লেনিনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সমাজতন্ত্রকে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩০ সালের ২১শে জানুয়ারি আদালত কক্ষ থেকে তাঁরা মস্কোর উদ্দেশ্যে এই টেলিগ্রাম করেছিলেন, -‘লেনিন দিবসে মহান লেনিনের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যারা কিছু কাজ করছেন তাঁদের সকলের উদ্দেশ্যে আমরা আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। রাশিয়া যে মহান পরীক্ষানিরিক্ষা করছে আমরা তার সাফল্য কামনা করি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের কন্ঠেই আমরা কন্ঠ মেলাচ্ছি।’
একারণে, ভারতের স্বাধীনতা ও সামাজিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম রুশ বিপ্লবের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়।

কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তি ঘটলো? 
পুঁজিবাদী বেষ্টনী রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের মধ্যে রুশ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে সবসময় সাম্রাজ্যবাদী হুমকির মুখে থাকতে হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনেরও লক্ষ্যবস্তু। এসমস্ত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে সোভিয়েত ইউনিয়ন নতুন পথে উদ্ভাসিত হয় এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঠিক আমেরিকার পরেই শক্তিধর দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় অন্তর্নিহিত বিরাট সাফল্যের সম্ভাবনা লক্ষ্য করা যায় সোভিয়ত ইউনিয়নে দ্রুত আর্থিক বিকাশ, বেকারীত্বের অবসান, সার্বজনীন শিক্ষা স্বাস্থ্যরক্ষা ও বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং জনগণের বস্তুগত সাংস্কৃতিক মানের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে
অবশ্য ক্রমশ বিশেষত শেষ দুই দশকে কিছু ত্রুটি ও ঘাটতি দেখা দেয়। নতুন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিপ্লবের সাফল্যকে কাজে লাগাতে অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কার করা হয়নি; অর্থনীতির পরিচালনায় পুণর্গঠনের ব্যর্থতা দেখা যায়; জনগণের বৈষয়িক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্রের সম্প্রসারণের ঘাটতি আমলাতান্ত্রিকতার দিকে নিয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে জনগণের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ধারণার বিকাশ ঘটাতে কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শগত ব্যর্থতা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ডেকে আনে।
সমাজতন্ত্র নয়, সমাজতন্ত্র নির্মাণে বিকৃতি এবং মতাদর্শগত বিচ্যুতি সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতা ঘটায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র নির্মাণে অভিজ্ঞতার ঐতিহাসিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে এটা বলা যেতে পারে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবলুপ্তিতে বর্তমান বিশ্বে সমাজতন্ত্রের প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়ে যায় না।



নভেম্বর বিপ্লবের প্রাসঙ্গিকতা
নভেম্বর বিপ্লব মানব সমাজের কাছে দেখিয়েছে যে পুঁজিবাদের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করা যায়।
নভেম্বর বিপ্লবের দৃষ্টান্ত বিংশ শতাব্দীতে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছে। একবিংশ শতাব্দীতে পুঁজিবাদের বিকল্প পথকে আলোকিত করে চলেছে নভেম্বর বিপ্লব।
সোভিয়েত ইউনিয়নের অবসানের পর বিশ্ব পুঁজিবাদের ও সাম্রাজ্যবাদের আধিপত্য এসেছে। একবিংশ শতাব্দীতে নয়া উদারনীতির পুঁজিবাদ গোটা পৃথিবীকে মুষ্ঠিমেয় ধনী এবং দারিদ্র, বেকারী ও ক্ষুধায় আক্রান্ত বিশাল জনগণের মধ্যে বিভাজনকে প্রশস্ত করেছে।
দ্রুত বৃদ্ধি ঘটেছে অসাম্যের। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ১শতাংশের সম্পদের পরিমান ১, ১০,০০,০০০ কোটি টাকা যা পৃথিবীর জনসংখ্যার নিচের তলার অর্ধেকের মোট সম্পদের ৬৫গুন বেশি। পৃথিবীর ১৩০কোটি মানুষ চরম দারিদ্রের মধ্যে বাস করছেন।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ বিশ্ব আধিপত্যের জন্য আগ্রাসী অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ধংসাত্মক সংঘর্ষ চাপিয়ে দিয়েছে যা এখনো চলছে ইরাক সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলিতে।
নয়া উদারনীতির আক্রমণ, ব্যয়সংকোচের নামে জনগণের ওপরে আঘাত এবং সাম্রাজ্যবাদের কাছে পদানত করার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যপী শ্রমিকশ্রেণী ও শ্রমজীবী জনগণের অন্যান্য অংশ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জন্য ১৯১৭ সালের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আলোকবর্তিকা।
সমস্ত বিপ্লবী ও প্রগতিশীল শক্তির কাছে নভেম্বর বিপ্লব অনুপ্রেরণার উৎস। শ্রেণীহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যারা সংগ্রাম করছেন তাঁদের কাছে নভেম্বর বিপ্লব এই বার্তা দিয়ে যাচ্ছে যে সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ।

************