20180226

আজকের জগৎ শেঠ ও আজকের মীরজাফর


শ্যামল চক্রবর্তী

যুদ্ধে পরাজিত করে দেশ দখলের নীতি এখন বদলে গেছে। যুদ্ধে না জিতেও দেশের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো আসল ক্ষমতা। ইতিহাসের দুই চরিত্র জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী-আম্বানির তুলনা এই লেখা।

বাংলার বণিকরা জগৎ শেঠের নেতৃত্বে ইংরেজদের দিয়ে সিরাজউদ্দোল্লাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সেই সময় বাংলা ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য। এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য গড়ে উঠেছিল সুবিস্তৃত বাজার। বাংলা ছিল সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে ভালো কৃষি ব্যবস্থার অধিকারী। ফরাসি বণিকরা বাংলাকে বলতেন জান্নাতুল বিলাত’, অর্থাৎ প্রদেশগুলির স্বর্গ। মুঘল ফরমানে তৎকালীন বাংলাকে ভারতবর্ষের স্বর্গহিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় বাংলায় একটি ব্যাঙ্কিং বাণিজ্য গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এই জমিদার বণিক শ্রেণিকে বণিক রাজা বলা হতো। নবাবি দরবারে তারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়ে যায়। এই প্রভাব বলয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল জগৎ শেঠ পরিবারের। এরা পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। জগৎ শেঠ ছিল একটা উপাধি। মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ারের এক ফরমান বলে জগৎ শেঠকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বাঁ পাশের আসন গ্রহণে ক্ষমতা বা মর্যাদা দেন। নবাব যেন তার কথা উপেক্ষা না করেন সেই মর্মে ফারুখশিয়ার ফরমানও জারি করেন। পদমর্যাদায় জগৎ শেঠ নবাবের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। ২০০০ ঘোড়সওয়ার তার বাড়ি পাহারা দিতো (অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদ্দৌলা, দে ১৮৯৭ পৃঃ ১১৭)
জগৎ শেঠের উদ্দেশ্য কী ছিল? জগৎ শেঠ এবং অন্যান্য বণিকদের হাতে এত  সম্পদ জমে গিয়েছিল যে তৎকালীন সময়ে অতিরিক্ত বাজার ছিল না। তাই বাজার পাওয়ার জন্য জগৎ শেঠরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারফত দেশের অন্যত্র এবং বিদেশের সঙ্গেও বাণিজ্য করতে চাইল। কিন্তু তাদের সে আশায় বাধ সাধলেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজরা কলকাতা এবং তার চারপাশে একটি দস্তকবা মোগল বাদশাহদের অনুমতিপত্র নিয়ে এখানে বিনা শুল্কে ব্যবসা করত। তারা বিনা শুল্কে ব্যবসা করত কিন্তু বাংলার ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় শুল্ক দিতে হতো। এই অসম ব্যবস্থায়  রাজকোষের ক্ষতি হতো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও বিপন্ন হতো। সিরাজদ্দৌলার মনোগত ইচ্ছা ছিল ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু হাত-পা বাঁধা ছিল। কারণ ফরমান ছিল দিল্লির বাদশাহের।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা মোঘল বাদশাহের দেওয়া দস্তকের (বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি পত্র) অপব্যবহার করে। কোম্পানির অফিসাররা দস্তক অপব্যবহার করে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও ব্যবসা শুরু হয়।  এরফলে রাজস্বের ভীষণ ক্ষতি হয়। বিনা শুল্কে বাণিজ্য চালাতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা এটাই বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলার স্বার্থে। কিন্তু জগৎ শেঠদের চাহিদা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের নিজস্ব ব্যবসা বাণিজ্যকে প্রসারিত করা এবং সঞ্চিত ধন সম্পদের অনেক বেশি লাভজনকভাবে  ব্যবহার করা। সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে দিতে চাইছিলেন না। এজন্য তিনি দুর্গ তৈরি করতে নিষেধ করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মীরজাফরকে সিংহাসনে বসানো হয়। কারণ মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ইংরেজদের সেই সুযোগ দেবেন। ইতিহাস বলছে মীরজাফর ক্লাইভকে তার হাত ধরে সিংহাসনে বসিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। তারপর ব্যবসা বাণিজ্য সবটাই তো ইংরেজদের দখলে চলে গেল।
ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করবার অধিকার নিয়ে সিরাজদ্দৌলার মনোবেদনা থাকলেও তিনি বিনা শুল্কের অধিকার কেড়ে নিতে পারেননি। কারণ দিল্লি বাদশাহের ফরমান। তিনি চেয়েছিলেন দস্তকের অপব্যবহার রুখতে। আজ ২৫০ বছর পর আজকের জগৎ শেঠরা, আদানি, আম্বানি প্রভৃতিরা একইরকমভাবে নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে চাহিদা অনুযায়ী দেশের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছে। কাজে নিজেরা বিদেশিদের তাঁবেদার হতে চেয়েছে। জগৎ শেঠরা যেমন নিজেদের স্বার্থে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তেমন করে আদানি আম্বানিরা মোদীকে ভারতের সিংহাসনে বসিয়েছে। বিদেশি বণিকদের সুবিধার জন্য দশ হাজার পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।অপরদিকে ‘‘মেড ইন ইন্ডিয়া’’ নাম দিয়ে ভারতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত অন্তঃশুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় ভারতের মাঝারি ছোট শিল্পপতিদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন, সংকট সারা দেশজুড়ে।
সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ তৈরি করতে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরা ভারতে বিমানঘাঁটি-নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে, যৌথ বিমান মহড়া হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাজেটিক সামরিক চুক্তি করছে, যুদ্ধবাজ ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, ট্রাম্পের ড্রাম বাজাচ্ছে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে।   কর্পোরেট সংস্থাগুলো এই প্রথম একযোগে পরিকল্পনা করে নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তথাকথিত ভাইব্র্যান্ট গুজরাটে সম্মেলনে মোদীই তাদের উপযুক্ত প্রার্থী বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন মীরজাফর বসেছিল ক্ষমতায় এবং ইংরেজদের সব আবদার পূরণ করত, তেমনি মোদীও সাম্রাজ্যবাদের সব আবদার রাখার জন্য ভারতের দরজা খুলে দিয়েছে। চীনকে ঘিরে ফেলার জন্য জাপান-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে। আদানি-আম্বানি অন্যান্য কর্পোরেটদের অবাধ লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। কংগ্রেস আমলে কর্পোরেটদের আক্ষেপ ছিল যে মনমোহন সিংয়ের আমলে সংস্কারের কাজ অর্থাৎ কর্পোরেট লুটের সুযোগ করে দেওয়ার কাজ খুব শ্লথ গতিতে হচ্ছিল। মোদীকে দিয়ে সেই গতিকে ত্বরান্বিত করিয়ে নিচ্ছে। তবে একটাই পার্থক্য ভারতীয় শিল্পপতিরা নিজেদের শিল্পের বাজারও পাচ্ছে। এবং কিছু স্বাধীনভাবেও পাচ্ছে। একেবারে বিদেশিদের দারোয়ান হয়ে যায়নি। বিশ্বস্ত মোদী নিষ্ঠার সঙ্গে কর্পোরেটদের ইচ্ছাপূরণ করে চলেছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দস্তক পেল কি করে?
দেশীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দিল্লির বাদশাহের এই ফরমান বা দস্তক পাওয়ার দুটো ইতিহাস আছে। বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার এই ফরমান ইংরেজরা পেল মোগল সম্রাটদের কাছ থেকে।
১৬৪৪ সাল শাহজাহানের রাজত্বে তাঁর প্রিয় এক কন্যা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তৎকালীন ভারতীয় চিকিৎসকরা তাকে নিরাময়ে ব্যর্থ হন। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জেন Gabriel Bughton ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হোপওয়েল জাহাজের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি নবাব কন্যাকে সারিয়ে তুললেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি চাইলেন ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করবার কারখানা তৈরি করবার অনুমতি। এর আগে অনেক নিয়ন্ত্রণ রেখে ব্রিটিশদের ব্যবসা করতে হতো, তাতে লাভ হচ্ছিল না। অনুমতি পাওয়া গেল। এই সময় আবার বাউটন বাংলায় এলেন দিল্লির সম্রাটের ফরমান নিয়ে। সুলতান সুজা তখন বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত।
সম্ভবত কোন একজন বেগমের অসুখ বাউটন নিরাময় করে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ব্রিটিশদের বাংলায় স্থায়ীভাবে বাণিজ্য কারখানা করার অনুমতি দিলেন। এই সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেকগুলি কারখানা খুলে ফেলল। বছরে খুব সামান্য তিন হাজার টাকা করের ভিত্তিতে কার্যত প্রায় বিনা শুল্কে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা শুরু করলো। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুবে বাংলার নবাব ছিলেন শায়েস্তা খান। শায়েস্তা খানের চাপে জব চার্নক মাদ্রাজে (চেন্নাই) চলে গেছিলেন। কিন্তু বাংলার পরবর্তী নবাব ইব্রাহিম খানের আমন্ত্রণে জব চার্নক কলকাতায় সুতানুটিতে বসতি স্থাপন করেন। তারপর নানাভাবে হাত বদলে আলিবর্দী খান পরে তার দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলার হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেবের দৌহিত্র ফারুকশিয়ার  নিজের রাজত্বকালে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজপুতানার রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ব্রিটিশ ডাক্তার হ্যামিলটনের চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করেন। হ্যামিলটন বাংলায় ইংরেজদের পাওয়া সুবিধাকে আরও বৃদ্ধি করার আবেদন জানান আর ফারুক শিয়ারের কাছ থেকে গঙ্গার দুপারের ৩৮টি গ্রামের জায়গির লাভ করেন মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশাল তৈরি করেন। ইতিমধ্যে কলকাতা একটি বড় বন্দর নগরী হিসেবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বাদশাহ ফারুক শিয়ার জগৎ শেঠকে অপরিসীম অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন।

আদিম সঞ্চয়ের জন্য লুট
ইংরেজরা বাংলায় ঢুকেই অবাধ লুটের ব্যবস্থা করল। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের জন্য আদিম পুঁজি সংগ্রহ করা হয়েছিল ভারতসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলি লুট করে। মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে আদিম পুঁজির সঞ্চয় বলেছেন যে, উপনিবেশগুলিকে লুট করেই আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে আমেরিকার বাজারে দাস হিসাবে বিক্রি করে প্রচুর সোনা রূপা নিয়ে আসত। সেই অর্থ এবং ভারত এশিয়া-আফ্রিকার অন্যান্য উপনিবেশ থেকেও ধনসম্পদ লুট করে ইংল্যান্ড ইউরোপের শিল্পায়নের জন্য পুঁজি জোগাড় হয়। বঙ্গ প্রদেশ থেকে টাকা লুট হয়, বিনা শুল্কে ভারতের পণ্যদ্রব্য অন্যান্য উপনিবেশগুলোতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়, এছাড়া রাজস্ব আদায় করা হয় নির্মমভাবে। এর ফলে বাংলা-বিহারের বিশাল অংশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষ ৭৬- মন্বন্তর নামে পরিচিত।
জওহরলাল নেহরু, ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া (১৯৮৬ সংস্করণ, পৃঃ ২৯৭) গ্রন্থে বলেছিলেন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের প্রচার ছিল যে, মুসলমান শাসনের দুর্দশা দূর করে পলাশির যুদ্ধের পর যে ইংরেজ শাসন শুরু হলো তাতে বাংলা নাকি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। নতুন জাতীয়তাবাদী ইতিহাস দেখিয়ে দিল যে, বরং‍‌ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছিল, ক্লাইভ হেস্টিং- লুটপাটের ফলেই বাংলায় ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটেছিল (১৭৭০) তৎকালীন বাংলা বিহারের প্রায় তিনভাগের একভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছিলেন।
নেহরু আরও বলেন (ডিসকভারি ২৯৭, ২৯৮) বাংলা লুট করে তার অর্থেই আদিম সঞ্চয় হিসাবে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল এই সত্যের উন্মোচন শুরু হয়েছিল দাদাভাই নত্তরোজির ১৯০১ সালে প্রকাশিত বই (পভার্টি অ্যান্ড অল ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) এবং নতুনভাবে বিকশিত হয় রজনীপাম দত্তের ইন্ডিয়া টুডেগ্রন্থে। এই চিন্তায় নতুন অবদান রচনা করেন বিপানচন্দ্র পাল রাইজ অ্যান্ড গ্রোথ অফ ইকনমিক ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া (নিউদিল্লি, ১৯৬৬) বইটিতে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের অপব্যাখ্যা থেকে ভারতের ইতিহাসকে মুক্ত করেছেন। এখন ভারতের ইতিহাস অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
উৎসা পট্টনায়ক তাঁর এক লিখিত প্রবন্ধে বলেছেন ১৭৬০ সাল থেকে ১৮২০ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রভূত পরিমাণে অর্থ জমা হয়। সবই হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশ লুটের টাকা। এই অর্থ ইংল্যান্ডের শিল্প স্থাপনের কাজে লাগে। উৎসা পট্টনায়ক অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে একে বলেছেন বিনি পয়সার ভোজ (ভারততত্ত্ব, এন বি , সুকুমারী ভট্টাচার্য সম্মাননা গ্রন্থ)
বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন সারা দুনিয়াব্যাপী যে লুঠ হচ্ছে একেও আদিম সঞ্চয়ের মতো শোষণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমার দেশ ভারতেও এখন আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের সময়ের মতই  বেপরোয়া লুট করে মানুষকে নিঃস্ব করা হচ্ছে।
আকাশ বিক্রি হয়ে গেল। আকাশ বিক্রি হওয়ার প্রক্রিয়াতে ,৭৬,০০০ কোটি টাকা। বিদেশিদের হা‍‌তে এখনকার সময়ের দস্তক দিয়ে দিয়েছেন ভারত সরকার, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি সংস্থায় অঙ্গীভূত হওয়ার জন্য। একেই বলে বিশ্বায়ন। ভুবনগ্রামের অর্থ হলো বিনা শুল্কে অন্যদেশে বাণিজ্যের অধিকার। ভারতে ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।খনি দুর্নীতিতে আরও বেশি টাকা লুট হলো। কর্ণাটকে খনি দুর্নীতিমধ্য প্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারি, মহারাষ্ট্রের আবাসন কেচ্ছা এসবের মধ্যে দিয়ে লুট চললো অব্যাহতগতিতে। পশ্চিমবাংলাও পিছিয়ে নেই। বি জে পি-তৃণমূল পরোক্ষ আঁতাতের সুযোগে তৃণমূল সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা চিট ফান্ডের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করল।  এসব কিছু যেন আদিম পুঁজিরই মতো লুটপাট করে সংগৃহীত হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ ভিখারি হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া, জনগণের নির্ভরতা পেনশন ফান্ড শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া, নোট বন্দী করে কালো টাকা উদ্ধারের নামে ব্যাঙ্কে সব ৫০০-১০০০ টাকার পুরানো নোট বাতিল করে নতুন নোট নিতে বলা হয়। সেখানে রোদে লাইন দিতে ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মোদীর মন্তব্য ছিল কালো টাকা সন্ত্রাসবাদীরা ব্যবহার করছে। নোট বন্দির ফলে কালো টাকা তারা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল উলটো। কালো টাকা সাদা হয়ে গেল। আসলে কালো টাকাকে সাদা করে দেওয়া হলো এই প্রক্রিয়ায়। সন্ত্রাসবাদী উৎপাত কমলই না। বরং সীমান্তে হামলা বাড়লো, আমাদের সেনাবাহিনীর জীবন ক্ষয় হতে থাক‍‌ল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। এরপরে নিয়ে আসা হল জি এস টি। ছোট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জি এস টি  ব্যবসায়ীদের নিচের অংশটা  নিঃস্ব হতে শুরু করল।
সম্প্রতি মোদী সরকার লোকসভায় তাড়াহুড়ো করে এফ আর ডি আই বিল পাশ করাতে চাইছে। কর্পোরেটদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ধার দিয়েছ মন্ত্রীসভার আনুকূল্যে। সেই ধার তারা শোধ ‍‌রেনি এমনকি সুদও দেয় না। ব্যাঙ্কের টাকায় শতকরা ৮৫ ভাগ কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তদের সঞ্চিত টাকা। ফলে ব্যাঙ্কগুলোকে এখন রুগ্ দেউলিয়া করে নানা কায়দায় ব্যাঙ্কে জনগণের গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। আজকের জগৎ শেঠরা-আদানি-আম্বানি-জিন্দল-মিত্তাল-গোয়েঙ্কা কর্পোরেট নিজেরা তো বটেই সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনার হয়ে লুটের ছোট তরফ বনতে চাইছে। ফলে এখন তারা পররাষ্ট্র নীতিকেও প্রভাবিত করছে। এখন তো আর জোর করে দেশ অধিকারের দরকার হয় না। দেশের অর্থনীতি রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই তা সম্ভব। মীরজাফর নতুন মুখোশ নিয়েছে, আর জগৎ শেঠের দলও আদানি-আম্বানি চেহারা চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই নতুন জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরদের বিরুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত লড়াই ছাড়া আর কোন গতিপথ নেই। জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডে পালটে যায়।
গীতায় কৃষ্ণ বলেছিলেন দুর্বৃত্ত দমনের জন্য সৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করবো। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সম্পদ লুটপাট করে নিঃস্ব করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য জগৎ শেঠরাও বারবার জন্মগ্রহণ করছেন। জগৎ শেঠরা যুগের আদানি-আম্বানি অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। সঙ্গে সহজন্ম নিয়েছেন তখনকার মীরজাফর আজকের নরেন্দ্র মোদী। তাই এই মুহূর্তে লুটপাট চালিয়ে ভারতের আদানি, আম্বানি, মিত্তাল, জিন্দাল, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কা প্রমুখ শতকরা ভাগ মানুষের হাতে ৭৩ ভাগ সম্পদ জমা হয়েছে।
রাজদণ্ড এখন তাদেরই হাতে।

গণশক্তি, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮


মূল আর্থিক সমস্যাগু‍‌লির প্রশমনে ব্যর্থ এই কেন্দ্রীয় বাজেট

ড. অসীম দাশগুপ্ত

মোদী সরকারের বাজেট পেশ হয়েছে সংসদে। এই বাজেট প্রস্তাবে জনগণের জন্য প্রতিশ্রুতির শেষ নেই। কিন্তু বাস্তবের জমিতে বাজেট প্রস্তাবের সঙ্গে মিলবে কি এইসব প্রতিশ্রুতি? মূল আর্থিক সমস্যা সমাধানের কি কোনও দিশা আছে এই বাজেটে? সেইসব বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই দুটি লেখায়।
এই কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করা হলো এমন একটি সময়ে যখন সমগ্র দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন গভীর উদ্বেগের মধ্যে। আর্থিক দিক থেকে উদ্বেগের মূল কারণগুলি হলো বেকারত্ব এবং মূল্যবৃদ্ধিদীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাগুলি অপ্রশমিত থাকার কারণে স্বার্থান্বেষীমহল পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে চলেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যেই ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে ধর্মের নামে এবং সরাসরি হিংস্রতা দিয়ে গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ করে সর্বভারতীয় স্তরে এবং এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও।
এছাড়া, সাম্প্রতিককালে অতিরিক্ত আঘাত এসেছে নোট বাতিলের পদক্ষেপের কারণে, পণ্য পরিষেবা করের বিভ্রান্তিকর রূপায়ণের ফলে এবং সর্বশেষে এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্কে রাখা সঞ্চয়ের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই বাজেটের অবস্থান
পূর্বেকার তিনটি বছরে প্রতি বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে যে অতিরিক্ত দুকোটি কর্মসংস্থানের আশা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা অর্জিত না হওয়ায় এবছরের বাজেটে সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা না রেখে, সেচের সম্প্রসারণ, বিপণনের পরিকাঠামোর উন্নয়ন ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। এই প্রে‍‌ক্ষিতে এটা সতর্কতার লক্ষ্যনীয় যে, গ্রামাঞ্চলে পরিকাঠামো নির্মাণে যেখানে জাতীয় কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে সেখানে এই খাতে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ বর্তমান বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার থেকে বৃদ্ধি না করে একই অর্থা‍‌ঙ্কে স্থির রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ শতাংশ হারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে প্রকৃত অর্থে এই বরাদ্দ ১০ শতাংশ হ্রাস প্রাপ্ত হয়ে যাবে। এছাড়া প্রায় ৪,৮০০ কোটি টাকা গতবছর থেকেই বকেয়া রয়ে গেছে।
এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে কৃষির সঙ্গে সবজি ইত্যাদি চাষের গুরুত্ব দেওয়ার পর, এটা জানা সত্ত্বেও যে এর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে জমির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, এবং তাই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থে ভূমিসংস্কারের ওপর। কিন্তু এই ভূমিসংস্কারের বিষয়ে শ্রেণিস্বার্থের কারণে সম্পূর্ণভাবেই নীরব থেকেছে এই বাজেটের প্রস্তাবগুলি। কেবলমাত্র জোর দেওয়া হয়েছে বাজার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং পরিকাঠামোর উন্নতির ওপর। এর ফলে এই উন্নতির সামগ্রিক সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবেন গরিব কৃষকরা। অথচ এদের স্বার্থে আয় বৃদ্ধি করার কথাই তো এই বাজেটের মাধ্যমে প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও অসংগঠিত শিল্পের গুরুত্বের কথা বলা হলেও, এক্ষেত্রে ঠিক কতটা কর্মসংস্থান হতে পারে তার কোনও লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়নি।
মূল্যবৃদ্ধি
মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যমানকে সাধারণ কৃষক এবং সাধারণ ক্রেতাদের স্বার্থে একটি স্তরে ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত ভরতুকির ভিত্তিতে গণবণ্টন ব্যবস্থা গুরুত্বের কথা অবশ্যই সকলের জানা আছে। একথা জানা সত্ত্বেও এই বাজেটে তার লক্ষ্যে কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা হলো না, এবং সমস্ত বিষয়টি পুনরায় বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো এই বাজেটে। এবং এর সমর্থনে কোনও যুক্তিই উল্লেখ করা হয়নি এই বাজেটে।
রাজস্ব সংগ্রহ
এটা লক্ষ্যণীয় যে, এই  কেন্দ্রীয় বাজেটটি হলো পরিষেবা কর (জি এস টি) লাগু করার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় বাজেট। যেহেতু জি এস টি লাগু করার ক্ষেত্রে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের কমিটির যে সুপারিশ ‍ ছিল অপেক্ষাকৃত সরল ব্যবস্থার, তা মানা হয়নি এবং কর প্রদানের ক্ষেত্রেও থেকেছে জটিলতা, তাই কিভাবে এই কাঠামো আরও সরল করা যায় সাধারণ ব্যবসায়ী, সাধারণ ক্রেতা এবং রাজ্যগুলির স্বার্থে সেই বিষয়ে উল্লেখ করা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল এই বাজেটে। অথচ তা করা হলো না।
অন্যদিকে, নোট বাতিলের পর কালো টাকা উদ্ধারের ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত কি নির্দিষ্ট সাফল্য পাওয়া গেল এবং ভবিষ্যতে এব্যাপারে কি চিন্তা করা হয়েছে তাও উল্লেখ করা হলো না।
এফ আর ডি আই বিল
এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধারের নাম করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সাধারণ মানুষের আমানতের উপর সমস্ত গ্যারান্টি তুলে দেওয়ার কথা বলে’, এই বিলটি শুধু সাধারণ সঞ্চ‌য়ীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করেছে তাই নয়।  এর ফলে সামগ্রিক ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা, এবং আর্থিক ব্যবস্থার অস্থিরতার সৃষ্টি করার কারণ হয়েছে। এর ফলে শুরু হতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নতুন এবং ব্যাপক মন্দার সংকট। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে স্বচ্ছ মনোভাব ব্যক্ত করার সুযোগ ছিল এই বাজেটে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এই বাজেটে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য রাখতে পুনরায় ব্যর্থ হলো।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে পুনরায় আঘাত
এমনকি লাভজনক ক্ষেত্রগুলিতেও পুনরায় জোর দেওয়া হলো বিলগ্নীকরণের। এবং এখানে নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমাসংস্থাগুলির উপরও নামানো হলো নতুন ধরনের আঘাত। একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিমা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে ঠিক তখনই এই বিলগ্নীকরণ নতুন করে সংকটের কারণ সৃষ্টি হলো, যার থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন পুনরায় সাধারণ মানুষই।
****
তাই এই বাজেটে শুধু দেশের সাধারণ মানুষের মূল সমস্যাগুলি বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, জি এস টি-র জটিলতা তা অপ্রশমিত থাকছে তাই নয় —  নতুন ধরনের আঘাত সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং বিমা ব্যবস্থার বিলগ্নীকরণের মাধ্যমে ব্যাপকতর সংকটের উৎস মুখ খুলে দিচ্ছে। যেহেতু বাজেটের উপস্থাপনাটি আপাত দৃষ্টিতে মসৃণ, তাই আমাদের সতর্ক থাকার কারণও জরুরি। এই ব্যাপারে এই বাজেটের মূল ক্ষতিকারক দিকগুলি সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করা উচিত এবং তার ভিত্তিতে অবশ্যই প্রয়োজন হবে ব্যাপকভাবে গণবিক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধের কর্মসূচির।


গণশক্তি, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

জেটলির শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট: ভাবনা ও দুর্ভাবনা


রতন খাসনবিশ

আগামীকাল লোকসভায় পেশ হতে চলেছে কেন্দ্রীয় বাজেট। লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। তাই ভোটের কথা মাথায় রেখেই জেটলি পেশ করবেন এই বাজেট। কিন্তু আয়কর ফাঁকি দেওয়া সম্পদশালীদের আঘাত করার সাধ্য নেই এই সরকারের। বাজেট পেশের ২৪ ঘণ্টা আগে সম্ভাব্য প্রস্তাব বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
১লা ফেব্রুয়ারি লোকসভায় অরুণ জেটলি পেশ করবেন ২০১৮-১৯ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট। লোকসভা ভোটের আগে এটা হলো জেটলির শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। অন্যদিকে এটি হলো জি এস টি চালু হবার পর প্রথম বাজেট। পরোক্ষ কর  এখন আর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেই। অর্থ হলো, কেন্দ্রীয় সরকার কোন পণ্যের ওপর কী হারে উৎপাদন শুল্ক চাপাবে, কোথাও শুল্ক কমবে কিনা, শুল্ক বেড়ে যাবার সম্ভাবনাই বা কোথায় আছে বাজেটের আগের কয়েকদিন যা নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে, এ বাজেট নিয়ে সে সব ঘটবে না। কেন্দ্রীয় শুল্ক এখন জি এস টি-র আওতায়। কেন্দ্রীয় বাজেটে তার লম্বা ফিরিস্তি আর থাকবে না। মন্ত্রীর বাজেট ভাষণ তাই ছোট হবে, ফিনান্স বিলের আকার কৃশ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এই জি এস টি-র জমানাতেও অবশ্য আমদানি শুল্কে হেরফের করতে পারে, হেরফের হতে পারে রপ্তানি শুল্কেও। কিন্তু সে সবেও আবার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তৈরি করা সীমার মধ্যেই থেকে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। চালু শুল্কে বড় ধরনের রদবদল ঘটানো সম্ভব নয় এসব ক্ষেত্রে। তাই বাজেটে কোনও চমক থাকবে না এই অংশেও। থেকে যাচ্ছে আয়কর ব্যক্তিগত আয়কর আর কোম্পানি কর যা আদায় করার অধিকার এখনও আছে কেন্দ্রীয় সরকারেরই। এদেশে যারা এখন বছরের শেষে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাঁদের অর্ধেক কোনও কর দেন না, শুধু রিটার্নটা জমা দিয়ে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করেন। রিটার্ন যা  দেওয়া হয় তার হিসাবে, এ দেশে মাত্র ৩০,০০০ করদাতা আছে বার্ষিক আয় এক কোটি টাকার ওপরে। যারা আয়কর দেয়, তাদের ৯০ শতাংশের কাছ থেকে তাই পাওয়া যায় আয়করের মাত্র ২৩ শতাংশ। এই স্তরের করদাতাদের অধিকাংশই সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, যেখানে উৎস থেকেই আয়কর আদায় করা হয়। সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরে কর আদায়ের ব্যবস্থাটা এখনও এদেশে তেমন পাকাপোক্ত নয়। ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জেটলি খুব কড়া কোনও ব্যবস্থা নিয়ে মৌচাকে ঢিল ছুঁড়বেন, এটা আশা করা যায় না। বরং অবস্থার চাপে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মধ্যবিত্তকে সুখী করতে মোদী সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে আয়কর ছাড়ের সামান্য ব্যবস্থা থাকতে পারে। এক্ষেত্রেও চমকের সুযোগ কম। জেটলির সমস্যা হলো জি এস টি লাগু হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ কর বাবদ আয় কমেছে। কমার কথাই ছিল। পণ্যের ওপর মাশুল বাড়ালে মাশুল আদায় বেশি হয়, এই নির্বোধের যুক্তিতে প্রথম দিকে জি এস টি কাউন্সিল এখন ১৭৮টি পণ্যে ২৮ শতাংশ মাশুলের দায় চাপিয়েছিল, যেগুলি অতিরিক্ত কর ভারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গত নভেম্বরে জি এস টি হারে ব্যাপক অদলবদল করে এই ১৭৮টি পণ্যে কর হার ২৮ শতাংশ থেকে  ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে। এছাড়াও কর হার কমানো হয়েছে দুশোর বেশি পণ্যে। চড়া হারে জি এস টি লাগু করায় কর আদায় প্রথমে কমেছে। কর হার কমানোর পর আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। তৎসত্ত্বেও, বাজারের যা অবস্থা, তাতে জি এস টি থেকে বিশাল কিছু আয়ের আশা নেই। কর হার কমানোর পর ডিসেম্বরে ৮৬,৭০৩ কোটি টাকা জি এস টি আদায় হয়েছে। অঙ্কটি নভেম্বরের চেয়ে বেশি, তবে অনুমান করা হচ্ছে, বাজার চাঙ্গা না হলে  এর বেশি জি এস টি আদায় হবে না। কর হার কমিয়েও জি এস টি অর্থাৎ পরোক্ষ কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। রাজস্ব বাড়াবার তাগিদ তীব্র। প্রত্যক্ষ কর, অর্থাৎ আয়কর আদায় বাড়াতেই হবে। জেটলি তাই ব্যক্তিগত আয়করে খুব বেশি ছাড় দেবার পক্ষপাতী থাকবেন না। যারা অল্প আয়কর দেন, সংখ্যায় যারা ১.৫৬ কোটি আয়করদাতার নব্বই শতাংশ তাদের জন্য আয়করে  কিছু ছাড় পাওয়া যেতে পারে ভোটের রাজনীতির চাপে। তার বাইরে কোনও কিছুই থাকবে না। ব্যক্তিগত আয় যাঁরা লুকিয়ে রাখেন, ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতিওয়ালা দিল্লিশ্বর তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রযা কডিকাল পদক্ষেপ নেবেন না। নেবেন না কারণ তিনি তাঁদেরই লোক। তাহলে সফেদ ভারত’, ‘না খায়েঙ্গেনা খাওয়ায়েঙ্গের থেকের রাজনীতির কী হলো? স্পষ্ট বলাই ভালো। ওটা ছিল গদি দখলের জন্য জরুরি কথা। এদেশে বছরে ১ কোটি টাকার বেশি উপার্জন করেন, এমন নাগরিকের সংখ্যা ৩০,০০০ এর অনেক বেশি। তারা বেশ বহাল তবিয়তে আছেন মোদীর জমানা‌য়। নোট বাতিল আর জি এস টি দিয়ে কী হলো? নোট বাতিল ছিল একটা নির্বোধের চমক সৃষ্টির চেষ্টা, ভারতীয় নোট’-এর ওপর আপামর ভারতবাসীর আস্থা কমানোই যার একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী অবদান। আর জি এস টি? জি এস টি কোনও সোনার হাঁস নয় যাকে চাঙ্গা রাখলে বেশি ডিম অর্থাৎ বেশি পরোক্ষ কর আদায় হবে। এদেশে উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে। জি এস টি সেটাকেই জখম করে দিয়েছে। সরকারি রাজস্ব বাড়ে অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে। গত চার বছরে সেটাই সবচেয়ে বেশি জখম করেছে মোদী সরকার। শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সরকারি রাজস্ব আদায় অভূতপূর্ব উন্নতির আশা জেটলি অন্তত করছেন না। জি এস টি থেকে, ডিসেম্বরে যা আদায় হয়েছে সেটার আসে পাশে‍‌ই থাকবে এর পরের আদায়গুলি। ব্যক্তিগত আয়‌কর থেকে আয় বাড়বে না। কোম্পানি কর-এ আদায় কী বাড়বে? বাড়ার আশা কম। কোম্পানিগুলি ইতিমধ্যেই হাত তুলে বসে আছে। তাদের কথা, যে কথাটা একদম খাঁটি কথা, তা হলো, বাজারের অবস্থা একেবারেই ভালো না। বেসরকারি উদ্যোগপতিরা ভরসা করে লগ্নি করতেই চাইছে না। নতুন লগ্নি হচ্ছে কিনা সেটা বোঝার একটা সহজ মাপকাঠি হলো কারখানায় নতুন যন্ত্রপাতি বসছে কিনা, নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে কিনা এবং একই সাথে ব্যাঙ্কের দরজায় সেই উদ্যোগপতিদের দেখা মিল‍‌ছে কিনা যারা নতুন প্রকল্পের জন্য ঋণ চায় (টাকা চেয়ে দেদার ধান্দায়‌ যারা ঘোরাফেরা করে তারা নয়)। চিদাম্বরম দাবি করেছেন এবং তাঁর দাবির পিছনে তথ্যের জোর আছে, নতুন কারখানা তৈরি, নতুন যন্ত্রাংশ বসানোর জন্য বিনিয়োগ, ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার ধামাকা সত্ত্বেও একেবারে তলা‍নিতে এসে ঠেকেছে। জি ডি পি-র তুলনায় নতুন ল‍‌গ্নি কত, তার হিসাব পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (সি এস ও) থেকে। ২০১১-১২ সালে এই জি ডি পি-র তুলনায় লগ্নি ছিল জি ডি পি-র ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৬-১৭ সালে এই অংশটি নেমে দাঁড়িয়ে ছিল ২৭ শতাংশে, ১৭-১৮ সালে সূচকটির সম্ভাব্য অঙ্ক হলো ২৬.৪ শতাংশ। তথ্য বলছে মেক ইন ইন্ডিয়াফ্লপ করেছে। কারখানার নতুন যন্ত্রাংশ বৃদ্ধির শতাংশটি ২০১৪-১৫ সালের এপ্রিল-জুনে ছিল ৩২.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এর হিসাবে অঙ্কটি নেমে দাঁড়িয়েছে ২৮.৯ শতাংশে। নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নেই। সুদের হার কমিয়েও ব্যাঙ্ক তার সংগ্রহ করা আমানত বিনিয়োগের রাস্তা পাচ্ছে না। ২০১৪-১৫ সালের এপ্রিল-জুনের হিসাবে ব্যাঙ্ক ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৯ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এর ত্রৈমাসিক হিসাবে ঋণ বৃদ্ধির অঙ্কটি নেমে দাঁড়িয়েছে ৬.৫ শতাংশে। মনে রাখতে হবে, ইতিমধ্যে ব্যাঙ্কে তিনবার সুদের হার কমানো হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দেবার জন্য। উদ্যোগপতিরা তাকিয়েও দেখেনি। আসলে, বাজার না থাকলে টাকার জোগান  বাড়িয়ে যে লাভ হয় না, পানাগাড়িয়ার মতো পরামর্শদাতারা এই মৌ‍লিক সত্যটাই বুঝতে চান নাহারভাট’-কে হার্ডওয়ার্কদিয়ে ঠেকাবার নির্বোধ যুক্তি আর কাজ করছে না। হার্ডওয়ার্ক হবে কোথায়। অর্ডার কই? সমস্যাটা আসলে বাজার না বাড়ার সমস্যা। বাজার কেন বাড়ছে না, সেই কথাটা ভাবতে হবে মোদী-জেটলিকে। এই অপ্রিয় সত্যটি ইতিমধ্যেই তাঁদের বুঝতে হয়েছে যে বিদেশি প্রত্যক্ষ লগ্নি যা আসছে, যেখানে নতুন কারখানা হচ্ছে তা তাদের বিনিয়োগে যাচ্ছে চালু কারখানা কিনতে কিংবা তার অংশীদারিত্ব বাড়াবে। তাদের বিনিয়োগ থেকে নতুন কর্মসৃষ্টির আশা নেই। সেটাই হবার কথা। শিল্পে বিনিয়োগকারীরা এই খবর রাখে যে স্রেফ বাজারের অভাবে এদেশের চালু কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অলস হয়ে থাকে, বিনিয়োগ করলে নতুন কারখানা হয়, তারা ভাবে চালু কারখানা কিনবেই। ফলত এই বিনিয়োগ থেকে নতুন কর্মসৃষ্টি হবে না। কারিগরিতে যদি কিছু বিনিয়োগ হ‌য়, সে বিনিয়োগ কর্ম ধ্বংস করবে শ্রমিক ছাঁটাই করে; যারা ছাঁটাই হবে না তাদের একই সময়ে বেশি কাজ করতে হবে, মজুরি বৃদ্ধির কথাই উঠবে না কাজ বাঁচানোর তাগিদে।
মজুরি বাড়ছে না, কারখানা উৎপাদনে অবস্থা খারাপ। অথচ ডিভিডেন্ট থেকে আয় বাড়ছে ক্রমাগত। ডিভিডেন্ট বাড়ছে কেন, উৎপাদনের হাল যেখানে খারাপ। ডিভিডেন্ট বাড়ছে কারণ সংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরি বাড়ছে না, উৎপাদনের একক প্রতি শ্রমিকের প্রাপ্ত ক্রমশ কমছে। অঙ্কের নিয়মেই উলটোদিকে তাই মুনাফা বাড়ছে। কোম্পানিগুলির ডিভিডেন্ট বাড়ছে এর ফলে। বাজারে অর্ডার কমছে, উৎপাদনের হাল খারাপ। মালিকদের তাতে লোকসান নেই। নতুন বিনিয়োগে তারা সতর্ক। কিন্তু পুরানো বিনিয়োগে ডিভিডেন্ট তারা বাড়িয়ে নিচ্ছে শ্রমিকের হিস্যা ক্রমাগত কমিয়ে এনে। ডিভিডেন্ট এতটাই ভালো যে অরুণ জেটলি তার আয় বাড়ানোর সমস্যা কিছুটা মেটাতে পারেন ডিভিডেন্ট বণ্টনের ওপর যে কর সংস্থাগুলিকে গুনতে হয় তা তুলে নিয়ে বরং ডিভিডেন্টকেই করের আওতা‌য় এনে। ছোট এবং মাঝারি শিল্পে কোম্পানি কর কমাতে হয়েছে সব বছর। ঝিমিয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি সঞ্চার করার জন্য এবার সম্ভবত বড় শিল্পে (কোম্পানি কর) কমবে। যে আয় ডিভিডেন্ট হিসাবে বণ্টন করা হয় তাতে কর বসিয়ে সম্ভবত কিছুটা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করবেন অরুণ জেটলি। আয় আসতে পারে শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের ওপর কর ছাড়ে কোপ বসিয়েও। সেনসেক্স ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের পরিমাণ এখন অনেকটাই বেড়েছে। সেখানে কর বসিয়ে আয়ের রাস্তা খোলার চেষ্টা করতে পারেন অরুণ জেটলি।
তবে ও রাস্তাতেও বিপদ কম নয়। সেনসেক্স এতটা বাড়ার কারণ কী? উৎপাদন তো অর্ডারের অভাবে ঝিমিয়ে আছে। অন্যদিকে শেয়ার বাজার এত চা‌ঙ্গা কেন? কারণটা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। গার্হস্থ্য সঞ্চয়ের যে অংশটা ব্যাঙ্কে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে জমা পড়ছে, ব্যাঙ্কে সুদের হার ক্রমাগত কমিয়ে তার একটা বড় অংশকে ঠেলা হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডে। ২০১৬ সালে বাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ ছিল ৩৫,৭০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সা‍‌লে তা ১ লক্ষ ৭ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। টাকাটা এসেছে মধ্যবিত্তর গার্হস্থ্য সঞ্চয় থেকেযার স্বাভাবিক ঠিকানা এখন আর ব্যাঙ্ক-পেমেন্ট অফিস নয়। এই টাকা শেয়ার বাজারে ঢুকে বাড়িয়েছে শেয়ারের দাম যে শেয়ার দামের সঙ্গে উৎপাদন ক্ষেত্রের আর কোনও সম্পর্কই নেই। য‍‌দি দেখা যায় ‍‌ডিভিডেন্ট-এর ওপর কর বসে আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের রাস্তা বন্ধ করে এই ফান্ডগুলি থেকে আয়ের অঙ্ক সেই ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিসের সুদের কাছাকাছি এসে যাচ্ছে, তাহলে মিউচুয়াল ফান্ডে টাকার জোগান কমবে, শেয়ার বাজারে চাহিদা কমবে এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই শেয়ার মূল্য বুদবুদের মতোই ফে‍‌টে যাবে। সে সম্ভাবনা প্রবল, কেন না শেয়ার বাজার চাঙ্গা থাকছে গার্হস্থ্য সঞ্চয় টেনে আর সেটা হয়েছে ব্যাঙ্কে সুদের হার কমিয়ে ঋণ সস্তা করার সরকারি পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে। জেটলি বিলক্ষণ জানেন, শেয়ার বাজার এতটা ফু‍‌‍‌লে ওঠা স্বাভাবিক নয়। এর পর আবার শেয়ারের ডিভিডেন্ট-এ কর বসালে আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের রাস্তা বন্ধ করলে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ কমবে, ধস নামবে সেনসেক্সে। ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করতে গিয়ে এতোটা ঝুঁকি নেবেন কি জেটলি?
জেটলি সম্ভবত সতর্ক থাকবেন আয়কর, কোম্পানিকর, ডিভিডেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের ওপর কর বসাতে। খরচ কমানোর চেষ্টা তিনি অবশ্যই করবেন। তবে এ বাজেট যেহেতু ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট, যেখানে ভোট আছে সেখানে সরকারি টাকা ঢালতে বিশেষ কার্পণ্য করবেন না। দরকার হলে রাজকোষ ঘাটতি বাড়াবেন তিনি। বেসরকারি বিনিয়োগ যেহেতু কিছুতেই চাঙ্গা হচ্ছে না সুদের হার এতোটা কমানোর পরও, সম্ভবত সরকারি বিনিয়োগ বাড়াবেন তিনি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে। রাজকোষ ঘাটতি বাড়ানোর আর সরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো, আর সেই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যে কার্য সংস্থান থেকে ন্যূনতম চাহিদা আসতে পারে এবং তার ফলে কারখানাগুলো উৎপাদনের নতুন অর্ডার পেয়ে বেসরকারি বি‍‌নিয়োগে উৎসাহী হবে পানাগড়িয়া মার্কা বাজার মৌলবাদীরা এসব একেবারেই পছন্দ করেন না। মোদী-জেটলি গত চার বছর শুনেছেন এই বাজার মৌলবাদীদের কথা। নিজেরাও যাঁরা বাজার মৌলবাদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী মোদীর মেক ইন ইন্ডিয়াএসেছিল এই পথ ধরেই। তবে ভোটে যাবার আগে এটা তারা বুঝছেন যে, এসবে ভোট পাওয়া যাবে না। ভোটের কথা মাথায় রেখে এ বাজেটে সরকারি রাজস্ব কম থাকলেও খরচ ছাঁটাই করবে না। সরকারি বিনিয়োগ বাড়াবে বেসরকারি লগ্নির অভাব পূরণ করার জন্য। নতুন অর্থবর্ষে যে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে মূলধনী খাতে, ইতিমধ্যেই তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে; রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্তাদের দিয়ে ইতিমধ্যেই ২৫০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করানো হয়েছে।
পকৌড়া ভেজে ভা‍‌লো উপায় করার রাস্তা দেখিয়েছিলেন মোদী‍‌, এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যেমন চপের দোকান করে দশতলা বাড়ির মালিক হবার পথ দেখিয়েছেন। ভারতবাসী এসব কথা যে ভালোভাবে নেবে না সেটা সম্ভবত উপলব্ধি করছেন জেটলি। রাজকোষে ঘাটতি বাড়াবার ঝুঁকি নিয়েই তিনি মূলধনী খাতে বরাদ্দ বাড়াবেন যাতে সরকারি উদ্যোগে কিছু নিয়োগ সৃষ্টি হয় এবং তার হাত ধরে চাহিদা  বেড়ে বাজার কিছুটা চাঙ্গা হয়। কর্মসংস্থানে কতটা গতি আসবে এর ফলে সেটা বলা শক্ত; শেষ বেলায় তাড়াহুড়ো করে এসব করে ভোটে তার সুফল পাওয়া যাবে কিনা সেটাও প্রশ্ন। কিন্তু সে যাই হোক, বছরে দুকোটি নতুন কাজের ধাপ্পা থেকে মুখরক্ষার একটা রাস্তা খুলতে পারে মূলধনী খাতে বিনিয়োগের বহু পরিচিত কেইনসীয় পথে পা বাড়ালে। জেটলির বাজেট এই পথে হাঁটলে অবাক হবো না।
রাজস্ব আদায়ে সমস্যা সত্ত্বেও জেটলিকে কৃষি এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে  হবে ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে। এদেশের অর্ধেক ভোটাররা এখনও মূলত কৃষিনির্ভর। আর কৃষির অবস্থা মোটেই ভালো নয়। মোদী ভোটে জেতার আগে বলেছিলেন ২০১৫-১৬ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে কৃষকের আয় ডবল করে দেবেন তিনি। হিসাব কষে বছরে ১০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে কৃষির আয় ঐ লক্ষ্য পূরণের জন্য। তথ্য এই যে ২০১১-১২ থেকে ২০১৫-১৬ সালের মধ্যে কৃষিতে আয় হয়েছে ১.৩৬ শতাংশ। অভাবী থেকে মহাজনী ঋণ কোনোটারই বিদায় জোটেনি প্রায় ভারতে। সঙ্গে জুটেছে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, বেড়েছে আত্মহত্যা। গত চার বছরে মোদী সরকার প্রায় কিছুই করে উঠতে পারেনি কৃষির এই সমস্যা মেটাতে। সেচের জন্য গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৭,৩৭৭ কোটি টাকা, আর ফসল বিমার জন্য ৯০০০ কোটি টাকা। কৃষিতে মোট বরাদ্দ ছিল ৫১,০২৬ কোটি টাকা। প্রয়োজনের তুলনায় এটা যৎসামান্য। এ বছর এই দুই খাতেই সম্ভবত বরাদ্দ বাড়বে। সেটা ভালো কথা। তবে সমস্যাটা শুধু বরাদ্দ বাড়ানোর নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। ফসল বিমার ক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে বিমা কোম্পানিগুলি সংগ্রহ করেছিল ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপর্যস্ত কৃষকরা দাবি করেছিলেন ৪২৭০ কোটি টাকা। বিমা কোম্পানিগুলির থেকে পাওয়া গেছে মাত্র ৭১৪ কোটি টাকা। কৃষি এখন লুটের জায়গা। প্রয়োজনে কড়া নীতি। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার কারও জন্য কড়া নীতি আর কারও জন্য নরমনীতি আনে। যেটা এতদিনে স্পষ্ট। কৃষকের খুব বেশি আশা করার কিছু নেই, এই সরকারের কাছ থেকে। বাজেট বরাদ্দ যাই হোক না কেন।
সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ের ওপর আক্রমণ নেমেছে ব্যাপকভাবে। ডিভিডেন্ট আয় কিছু বাড়ছে, মজুরি যদিও ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকছে। কৃষকের সার ‍-বীজ- সেচ বাজার নির্ভর। বাজার আবার এমনই যে এমনকি বিমার টাকা চাইলে বিমা কোম্পানিগুলো টাকা আটকে বসে থাকে সেই কৃষকের যে ইয়েস স্যার’, ‘নো ম্যাডাম’-এর পাঠ নেয়নি। বাজেটে কতটা কী করবেন অরুণ জেটলি?


গণশক্তি, ৩১শে জানুয়ারি, ২০১৮