20200719

রাষ্ট্রনায়ক জ্যোতি বসু



রবীন দেব



জীবিত অবস্থাতেই জ্যোতি বসু ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একজন কিংবদন্তী (Living Legend) নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। শুধু বামপন্থী ও কমিউনিস্ট আন্দোলনেই না, ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অর্ধশতবর্ষব্যাপী কাজ করার সুবাদে দেশের  ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো  ও যুক্তরাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের বিকাশে তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন, তা জ্যোতি বসুকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছিল। জ্যোতি বসুর মৃত্যুর আগেও বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে এবং জীবনাবসানের পরেও দেশ-বিদেশের রাজনীতিক-বিশ্লেষকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে তাঁর এই ভূমিকার কথা। এই রকম একজন অসাধারণ কমিউনিস্ট নেতার জন্মশতবর্ষে তাঁর এই অবদানগুলি আলোচনার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল আন্দোলনের কর্মী-সমর্থকদের শিক্ষিত করতে সাহায্য করবে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে একজন উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়েও সেই সময়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির উত্তপ্ত প্রবাহে মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন জ্যোতি বসু। বিলেতেই হাতেখড়ি কমিউনিজমের প্রথম পাঠের, সেখানেই সিদ্ধান্ত নিলেন দেশে ফিরে কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হবেন। দেশে এসেই যোগ দিলেন পার্টির কাজে, শ্রমিকদের সংগঠিত করার যে কাজ তিনি শুরু করলেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তার থেকে কখনো বিযুক্ত হননি। জীবনের শেষ বছরগুলিতেও তিনি সি আই টি ইউ-র একজন নেতা হিসাবে থেকে গিয়েছিলেন। পরাধীন ভারতে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে এভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার মধ্যে দিয়েই ফুটে ওঠেছিল মতাদর্শের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, অসমসাহসী মনোভাব।

অসম্ভব পরিশ্রম করে ব্রিটিশ আমলে রেল শ্রমিকদের সংগঠিত করার দুরূহ কাজে সাফল্য তাঁকে অল্পদিনের মধ্যেই নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত করেছিল। জ্যোতি বসু হয়ে উঠেছিলেন রেল শ্রমিকদের জনপ্রিয় নেতা। ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচন আসন্ন হলে কমিউনিস্ট পার্টি রেল শ্রমিক কেন্দ্রে সেই সময় নামজাদা কংগ্রেস নেতা অধ্যাপক হুমায়ুন কবীরের বিরুদ্ধে তাঁকে পার্টির প্রার্থী হিসাবে দাঁড় করায়। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে জ্যোতি বসু এই কেন্দ্রে জয়ী হন। সংসদীয় রাজনীতিতে সেই থেকে শুরু - মাঝখানে বাহাত্তরের জালিয়াতি নির্বাচনের পাঁচ বছর বাদ দিলে ২০০১ সাল পর্যন্ত একটানা ৫০ বছর ধরে মানুষের রায়ে নির্বাচিত হওয়ার অনন্য নজির তিনি গড়েছেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন থেকে ২০০০সালের ৬ই নভেম্বর পর্যন্ত লাগাতার ৮৫৪০দিন ধরে পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী থাকার বিরলতম নজিরও তিনি গোটা দেশের সামনে তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে, ক্ষমতায় যেনতেন প্রকারেণ টিঁকে থাকার জন্য ভারতের রাজনীতিতে যখন আত্মসর্বস্বতার নিকৃষ্ট উদাহরণ আকছার মিলছে, তখন মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নিয়ে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে আত্মত্যাগের নজিরবিহীন উপমা তুলে ধরেছেন জ্যোতি বসু।

ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রে শ্রমজীবী মানুষের কন্ঠস্বর তুলে ধরার অনন্য পথিকৃৎ ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। ব্রিটিশ ভারতে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় এবং পরে স্বাধীন ভারতে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় কমিউনিস্ট পার্টির অপর দুই বিধায়ক কমরেড রতনলাল ব্রাহ্মণ ও কমরেড রূপনারায়ণ রায় (স্বাধীনতার পরে পূর্ব পাকিস্তানে)-এর সাথে কমরেড জ্যোতি বসু শ্রমিক-কৃষকসহ সমাজের শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের জীবন-যন্ত্রণার কথা মুন্সিয়ানার সঙ্গে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বাইরে মাঠে-ময়দানে জমি-ফসলের আন্দোলন এবং কলে-কারখানায় রুটি-রুজির আন্দোলনের সার্থক প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন আইনসভার অভ্যন্তরেস্বাধীনতার পর প্রথমে প্রফুল্ল ঘোষ এবং পরে বিধান চন্দ্র রায়ের নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভার বিরোধী দলের নেতা হিসাবে জ্যোতি বসু বিধানসভার বিভিন্ন বিতর্কে যে তীক্ষ্ণ ও ক্ষুরধার যুক্তিসহ বক্তব্য পেশ করেছেন, বাইরের আন্দোলনেও তা সাহায্য করেছে কমিউনিস্ট পার্টির গণভিত্তিকে প্রসারিত করতে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে দীর্ঘসময় থাকার কারণে জ্যোতি বসুকে কখনো বিরোধী দলের বিধায়ক, কখনো বিরোধী দলের নেতা, কখনো উপ-মুখ্যমন্ত্রী এবং সর্বোপরি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে তা শুধু তত্ত্বগতভাবেই নয়, বাস্তবেও তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তিনি তুলে ধরেছেন। বিরোধী দলের নেতা থাকাকালীন সাধারণ মানুষের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায়, সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করায় তিনি যে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা সেই সময়ের বিধানসভার অধিবেশনের কার্যবিবরণী দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবেন।

স্বাধীনতার পর ভারতের রাজনীতিতে কংগ্রেসের যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তা রাজ্যে রাজ্যে এবং পরবর্তীতে গোটা দেশের ক্ষেত্রে খর্ব করতে কোয়ালিশন পলিটিকস্‌বা জোট রাজনীতির কৌশল প্রয়োগ করার অন্যতম প্রবক্তা ছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। পশ্চিমবাংলার রাজনীতিতে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করার পিছনে ছিল এই রাজনীতিই--ছিল কমিউনিস্টদের কৌশল। ১৯৬৭ সালে প্রথম পশ্চিমবঙ্গসহ দেশের ৮টি রাজ্যে অকংগ্রেসী সরকার কায়েম হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালাতে কংগ্রেসবিরোধী দলগুলির মধ্যে সি পি ‌আই (এম)-ই প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। কেরালাতে সি পি আই (এম) নেতা কমরেড ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ-ই মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে সি পি ‌আই (এম) ৪৩টি আসন পেলেও যুক্তফ্রন্টের রাজনীতিকে উর্ধ্বে তুলে ধরতে ৩২টি আসন পাওয়া বাংলা কংগ্রেসের নেতা অজয় মুখার্জিকেই মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ১৯৬৯ সালেও। সেবার সি পি ‌আই (এম) পেয়েছিল ৮০টি আসন। তা সত্ত্বেও জ্যোতি বসু উপমুখ্যমন্ত্রী হয়ে যুক্তফ্রন্টের কৌশল ও তার প্রয়োগ এবং সমস্ত সহযোগী দলকে একসাথে নিয়ে চলার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। পরে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিকল্পের উদাহরণ তুলে ধরে অকংগ্রেসী বিরোধী দলগুলিকে একই মঞ্চে সমবেত করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। সে আলোচনায় পরে আসছি।

১৯৬৭সালে প্রফুল্ল ঘোষের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটেছিল। নেমে এসেছিল চরম আক্রমণ। রাজপথে এই আক্রমণের সামনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে নেতৃত্ব দান করেছিলেন জ্যোতি বসু। ১৯৬৭ সালের ২রা অক্টোবর গান্ধীজীর জন্মদিনে অজয় মুখার্জিকে সামনে রেখে প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটাবার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে মিছিলে মিছিলে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনরোল তৈরি হয়। পিছু হটে ষড়যন্ত্রকারীরা, অক্টোবরে প্রফুল্ল ঘোষের বিশ্বাসঘাতকতায় প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটে, পি. ডি. এফ-এর একটি সরকার গঠিত হয়। কিন্তু বিধানসভার তদানীন্তন স্পীকার বিজয় ব্যানার্জির ঐতিহাসিক রুলিং-এ সরকারের পতন ঘটে। জারি হয় রাষ্ট্রপতির শাসন।

প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন থেকে ১৯৬৯সালে দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার কায়েম (যে নির্বাচন রাষ্ট্রপতি শাসনেই হয়েছিল) ১০৫ থেকে কংগ্রেসের আসন নেমে গিয়েছিল ৫৫-তেএই পর্বে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে রাজ্যের বুকে। ভাঙা-গড়া হয়েছে শরিকদলগুলিতে। দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্টের সময়েও অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে, যা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু। এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল, ১৯৬৯ সালের ৩১শে জুলাই বিধানসভা ভবনে উপমুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিসমন্ত্রী জ্যোতি বসুর ঘরে একদল উন্মত্ত পুলিসের হামলা। কিন্তু জ্যোতিবাবুর অসমসাহসী ও দৃঢ়চেতা মনোভাবের সামনে সেই পুলিসের দল পিছু হঠতে বাধ্য হয়। ১৯৭০ সালের ১৭ই মার্চ দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পরেও বাংলা কংগ্রেস ছাড়া বাকিদের নিয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকার গড়ার সুযোগ থাকলেও কেন্দ্রের নির্দেশে জ্যোতি বসুকে সরকার গড়ার জন্য ডাকা হয়নি। ডাকেননি তৎকালীন রাজ্যপাল। প্রখ্যাত সাংবাদিক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় তখন যে বামদলগুলি অন্ধভাবে সি পি আই (এম) বিরোধিতায় নেমেছিল, তাদের জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকার গড়ায় সমর্থন জানাতে আকুল আবেদন করেছিলেন, কিন্তু সাড়া দেয়নি কিছু বামদল।

এরই মাঝে উগ্রপন্থী রাজনীতির সুত্রপাত হয় এই রাজ্যে। উগ্রপন্থীদের ভ্রান্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে সঠিক মার্কসবাদী পথ গ্রহণে প্রয়াত কমরেড প্রমোদ দাশগুপ্ত ও কমরেড জ্যোতি বসু পালন করেছেন দৃঢ় ভূমিকা।

দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার পতনের পর রাজ্যজুড়ে প্রচার আন্দোলনের ঝড় ওঠে। নেমে আসে নৃশংস আক্রমণ। খুন, সন্ত্রাস, বিনা বিচারে আটক, মিথ্যা মামলায় জড়ানো সহ স্বৈরাচারী কাজ চলে ব্যাপকভাবে। তারই মধ্যে পাটনায় ১৯৭০ সালে ৩১শে মার্চ জ্যোতি বসুকে লক্ষ্য করে আনন্দমার্গীরা গুলি চালায়। জীবনবীমা কর্মী কমরেড আলি ইমাম নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে জ্যোতি বসুর প্রাণ রক্ষা করেন। পাটনায় জ্যোতি বসুর উপর এই আক্রমণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজ্যজুড়ে স্বতঃস্ফুর্ত প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পালিত হয় ধর্মঘট। আমার এখনো মনে পড়ে সেই দিনটির কথা আগরপাড়ায় দেবেন সেন রোডে দাদার বাড়িতে সংবাদপত্র পড়ছিলাম। সংবাদ জানার সাথে সাথেই বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। ছাত্রকর্মী হিসাবে স্কুল ছাত্রদের নিয়ে সংগঠিত হয় বিশাল মিছিল। সামিল হন অগণিত মানুষ। পরের দিন শহীদ মিনারে বিশাল সমাবেশে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ব্যক্ত হয় তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার।

ছাত্র-যুব আন্দোলনের একজন কর্মী হিসাবে জ্যোতি বসুকে ১৯৬৫ সাল থেকে প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন বাঁক ও মোড়ে নানা সময়ে যেভাবে বলিষ্ঠভাবে নেতৃত্ব দিতে দেখেছি, তা এই প্রবন্ধে সবটা বিবৃত করা সম্ভব নয়। ১৯৭১ সালের নির্বাচনের আগে ২০শে ফেব্রুয়ারি হেমন্ত বসুকে হত্যা করে জ্যোতি বসুকে সেই বছরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হতে দেয়নি দেশী-বিদেশী প্রতিক্রিয়ার শক্তি। সেবারও জ্যোতি বসু বরাহনগরে জয়ী হয়েছিলেন মহাজোট প্রার্থী অজয় মুখার্জিকে বিপুল ভোটে পরাজিত করেই। সি পি ‌আই (এম) নেতৃত্বাধীন ৬দলের জোট ১২৩টি আসন পাওয়া সত্ত্বেও জ্যোতি বসুকে সরকার গড়তে ডাকেননি রাজ্যপাল। অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হয় এবং ৭১দিনের মধ্যেই সরকারের পতন ঘটে।

১৯৭২-এ সংসদীয় গণতন্ত্রকে কোতল করার বিরুদ্ধে দেশব্যাপী প্রচারাভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। তাঁর লেখা ‘Subversion of Parliamentary Democracy’ নামে একটি পুস্তিকা দেশে-বিদেশে প্রচারিত হয়। ১৯৭২ সালের ১০ই জুন BBC থেকে এই মর্মে প্রচারিত হয় জ্যোতি বসুর বেতার ভাষণ।

১৯৭২থেকে ৭৭আধা-ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস, জরুরী অবস্থার দিনগুলিতে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বহু আন্দোলন-সংগ্রাম সংগঠিত হয়েছে। বারুইপুরে কমরেড জ্যোতির্ময় বসুর সঙ্গে আক্রান্ত হয়েছিল জ্যোতি বসুর গাড়ী১৯৭৩ সালের ২৮শে মার্চ সিদো কানহু ডহরে বেকারী বিরোধী অবস্থানে অংশ নেন জ্যোতি বসু। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় সরকারের বিরুদ্ধে ১৯৭৩ সালের ৩রা জুন শহীদ মিনারে সমাবেশ, ২৭শে জুলাই বাংলা বন্‌ধ, ১৫ই নভেম্বর আইন অমান্য, ১৭ই নভেম্বর বাংলা বন্‌ধ, ১৯৭৪ সালের জানুয়ারিতে চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট, ৭ই মে বাংলা বন্‌ধ, রেলকর্মীদের ধর্মঘট, ১৯৭৫-এর ২০শে জুন বাংলা বন্‌ধ এবং ২৫শে জুন জরুরী অবস্থা জারির বিরুদ্ধে আন্দোলনে সব সময়ই জ্যোতি বসু সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এরই মধ্যে স্বৈরতন্ত্রবিরোধী জোটে প্রফুল্লচন্দ্র সেনসহ অনেককে সামিল করা হয়েছে। ১৯৭৫-এর ২রা এপ্রিল সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ন কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে সভা করতে এসেছিলেন, কিন্তু তখনকার কংগ্রেস নেতা সুব্রত মুখার্জিরা সেই সভা করতে দেননি। ভন্ডুল করে দেওয়া হয়। তখন তিনি এসেছিলেন কংগ্রেস (ও)-র ডাকে। পরে ১৯৭৫ সালের ৫ই জুন বামপন্থীদের ডাকে বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে থেকে স্বৈরতন্ত্র বিরোধী মহামিছিল সংগঠিত হয়েছিল, যেখানে জয়প্রকাশ নারায়ণ, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়ামের সামনে সংক্ষিপ্ত সভার সভাপতি ছিলেন ড. অশোক মিত্র। তিনিই মূল প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

১৯৭২ থেকে ৭৭, এই সময়ে বামপন্থীদের মধ্যে জোটে কয়েকবার ভাঙ্গাগড়া হয়েছে। সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার মধ্যে দিয়েই বামফ্রন্ট তৈরি হয়েছে। প্রথমে ৬দলকে নিয়ে বামফ্রন্ট ১৯৭৭ সালের ২১শে জুন সরকার গঠন করে। ১৯৮০ সালে সি পি আই যুক্ত হলো। পরে ৮দল এবং সর্বশেষে দশটি দলকে নিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন জ্যোতি বসু। এরই মধ্যে যুক্ত হয়েছে এস পি, ডি এস পি প্রভৃতি দলগুলি। আজকের বামফ্রন্ট গড়ার প্রক্রিয়াতেও অনেক জটিলতার অবসান ঘটিয়েছেন জ্যোতি বসু। এইভাবে অজস্র ষড়যন্ত্র কুৎসা, অপবাদ, হুমকি, কারাবাস, মিথ্যা মামলা, সব কিছুকে ভেদ করেই জ্যোতি বসু ৮৫৪০দিন মুখ্যমন্ত্রীত্ব করার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। ষড়যন্ত্র কুৎসা অপপ্রচারের জালকে যেমন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছেন, তেমনি উদ্দীপ্ত করেছেন, প্রেরণা দিয়েছেন শ্রমিক-কৃষক, মধ্যবিত্ত কর্মচারী, শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ, ছাত্র-যুব-মহিলা আন্দোলনকে। পুষ্ট করেছেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে, আমাদের দেশের ও আমাদের রাজ্যের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাস্তবানুগ প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। প্রায় ২৪বছরের বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে গণসংগঠনগুলির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে কাজ করার এক অনন্য নজির সৃষ্টি করছেন জ্যোতি বসু। ১৯৭৮সালের বন্যা, বন্যা পরবর্তীতে উদ্ধার, ত্রাণ, পুণর্বাসন, পুনর্গঠনের কাজে দক্ষিণপন্থী প্রতিক্রিয়ার শক্তি ও উগ্র বামপন্থীদের কাছ থেকে ছাত্র-যুবসহ শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে সঠিক দিশাদানে চুম্বকের মত আকর্ষণ করেছে জ্যোতি বসুর বক্তব্য, কর্মকাণ্ড, পরামর্শ প্রভৃতি।

এই রাজ্যে শিল্পস্থাপনে নতুন জোয়ার সৃষ্টিতে বহু বিতর্কের মধ্যেও সঠিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন জ্যোতি বসু। ১৯৭৮সালে হেমবতী নন্দন বহুগুণা সম্মতি দিলেও ১৯৮৪ সালের ৬ই জুলাই শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভার পেট্রোরসায়ন দপ্তরের মন্ত্রী পি শিবশংকর এই রাজ্যে পেট্রোকেমিক্যাল হবে নাএই ঘোষণা করলেন। পরবর্তীতে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যালস্‌ কারখানা গড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জ্যোতি বসুর সরকার-তা নিয়েও বহু বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু লক্ষ্য করেছি যুব তথা সাধারণ মানুষের মধ্যে উন্মাদনা। ১৯৮৫ সালের ১৪-১৯শে সেপ্টেম্বর সল্টলেক থেকে হলদিয়া পদযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, ১৯শে সেপ্টেম্বর হলদিয়ায় পদযাত্রীদের উদ্দেশ্যে জ্যোতি বসুর দৃপ্ত ঘোষণা হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যালস্‌ হবেই১৯৮৯সালের ১৫ই অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী জ্যোতি বসুকে সঙ্গে নিয়ে হলদিয়ায় পেট্রোকেমিক্যালস্‌ প্রকল্পের শিলান্যাস করেন। যদিও পরে শোনা যায়-৩দিন পর নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে যোজনা পর্ষদের অনুমোদন না নিয়েই নির্বাচনী চমক সৃষ্টিতে তিনি এই কাজ করেছিলেন। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস্‌, বক্রেশ্বরে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রভৃতি দাবিতে ছাত্র-যুবদের উত্তাল আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা ছিলেন জ্যোতি বসু। ২০০০সালের ২রা এপ্রিল হলদিয়া পেট্রোকেমিক‌্যালস্‌ জাতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত করেছিলেন জ্যোতি বসু।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে একটি অঙ্গরাজ্যে সীমিত আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিকল্প কী কর্মসূচী নেওয়া সম্ভব হতে পারে তা জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার গোটা দেশের সামনে হাতেকলমে সাফল্যের সঙ্গে করে দেখিয়েছিল। দেশে জোট রাজনীতির যুগে পশ্চিমবঙ্গে তাঁর নেতৃত্বে এবং পরবর্তী সময়ে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটানা ৩৪ বছর ধরে চলা ৯ দলের একটি দৃঢ় জোট হিসাবে বামফ্রন্ট সরকার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তুলে ধরেছিল। কারণ জোট সরকার মানেই যখন অস্থিতিশীল, বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বলে প্রমাণ হচ্ছিলো, তখন এরাজ্যে এই জোট স্থিতিশীল, শান্তির পরিবেশ এবং জনমুখী উন্নয়নের নজির তৈরি করে গোটা দেশের সামনে একটি উজ্জ্বল ব্যাতিক্রম তুলে ধরেছিল। একথা আজ সকলেরই জানা যে এরাজ্যের ত্রিস্তর পঞ্চায়েতী ব্যবস্থাকে অনুকরণ করেই গোটা দেশে তা রূপায়ণের জন্য আইন তৈরি করা হয়েছে। ভূমি সংস্কার, কৃষি ও গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেও বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য সর্বজনস্বীকৃত হয়েছে। পাশাপাশি, গণতান্ত্রিক পরিবেশ, শান্তি-সুস্থিতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিরবচ্ছিন্নভাবে বজায় ক্ষেত্রেও দেশের সামনে জ্যোতি বসুর পশ্চিমবাংলা উদাহরণ তৈরি করেছিল। আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং তৃণমূলস্তরে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটানোর ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গোটা দেশের সামনে মডেল হিসাবে স্বীকৃত।

শুধু জোট রাজনীতির প্রশ্নই নয়, কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও সামনে তুলে এনেছিল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকারই। রাজ্যগুলির হাতে আরো বেশি আর্থিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার দাবিতে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের ইস্যুকে সামনে রেখে গোটা দেশে অকংগ্রেসী বিরোধী দলগুলি এবং বিভিন্ন রাজ্যে কংগ্রেসবিরোধী দলের দ্বারা পরিচালিত সরকারগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস নিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। শ্রীনগর, কলকাতা ও বিজয়ওয়াড়ায় বিরোধী দলগুলির কনক্লেভের নেতৃত্ব দেন তিনিই। কংগ্রেসের একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙার লক্ষ্যে কোয়ালিশন রাজনীতির সূচনা এভাবেই তাঁর নেতৃত্বে ভারতে শুরু হয়েছিল। একটি রাজ্যের সফল ও জনপ্রিয় মুখ্যমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও কখনো প্রাদেশিকতার গন্ডির মধ্যে তিনি সীমাবদ্ধ না থাকায় জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর সর্বজনগ্রাহ্যতা ও নেতৃত্বের আসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দেশের অখন্ডতা, সংসদীয় গণতন্ত্রে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে তাঁর ঋজু ও দৃঢ় অবস্থান সমগ্র ভারতেই দল-মত-নির্বিশেষে উচ্চপ্রশংসিত হতো। ১৯৮৭ সালের ২৫শে এপ্রিল দিল্লির অন্ধ্র হলে বিরোধী দলগুলির মুখ্যমন্ত্রীদের সম্মেলনে জ্যোতি বসু যে অসাধারণ বক্তব্য রেখেছিলেন, তার পরদিন তাঁর কট্টর সমালোচক আনন্দবাজার পত্রিকাও লিখতে বাধ্য হয়েছিল, ‘রাষ্ট্রনায়কের মত বক্তব্য করেছেন জ্যোতি বসু।১৯৮৯ সালে ভি পি সিং-এর নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় মোর্চার সরকার গড়ারও অন্যতম কারিগর ছিলেন তিনি। এই সময়েই ভারতে আসেন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা নেলসন ম‌্যান্ডেলা। ১৯৯০ সালের ১৮ই অক্টোবর ইডেন উদ‌্যানে বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী ভি পি সিং-এর উপস্থিতিতে জ্যোতি বসু সংবর্ধনা জানান ম‌্যান্ডেলাকে। এই সমাবেশ শেষেই ভি পি সিং এবং জ্যোতি বসু দিল্লিতে গিয়ে যৌথভাবে রথযাত্রার নামে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি বন্ধ করতে আবেদন জানিয়েছিলেন বি জে পি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানিকে। এই বছরেই ১৯শে মে কমরেড হো চি মিন-এর জন্মশতবর্ষে ভিয়েতনাম সরকারের আমন্ত্রণে ভারত সরকারের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন জ্যোতি বসু। সঙ্গে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

জাতীয় রাজনীতিতে অকংগ্রেসী ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁর নেতৃত্ব খুব স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিতে রাজী হয়েছিল। এইচ ডি দেবেগৌড়ার নেতৃত্বে সংযুক্ত মোর্চার সরকার গঠিত হলে গঙ্গার জলবন্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তি করার অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন জ্যোতি বসু। ১৯৯৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবেগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ-এর মধ্যে এই আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

২০০০ সালের ৬ই নভেম্বর জ্যোতি বসু শারীরিক কারণে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে অবসর নেন। অবসর নিলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আমাদের রাজ্য এবং গোটা দেশের গণ-আন্দোলনে অন্যতম পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি বলতেন, ‘কমিউনিস্টদের কাছে কোনো অবসর নেই। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত‌্যাগ করা পর্যন্ত তাদের মানুষের স্বার্থে কাজ করে যেতে হবে।

সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে দুরে রাখতে ২০০৪ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রথম ইউ পি এ সরকার গড়ার ক্ষেত্রেও তিনি এবং সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক হরকিষাণ সিং সুরজিৎ যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, সেকথা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এবং ইউ পি এ চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী বারেবারে স্বীকার করেছেন।  

২০১০ সালের ১৭ই জানুয়ারি জ্যোতি বসু শেষ নিঃশ্বাস ত‌্যাগ করেন। ২০১০র ১৯শে জানুয়ারি এক কমিউনিস্ট নেতার মরদেহ রাষ্ট্রীয় পতাকায় আচ্ছাদিত করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গান স্যালুট দিয়ে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা-নেত্রী, বিদেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে রাষ্ট্রনেতাদের ও তাঁদের প্রতিনিধিদের উপস্থি‍‌তিতে এক জনজোয়ারে শেষ বিদায় জানানো হয় কমরেড জ্যোতি বসুকে। সেদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের পদচারণায় রেড রোড হয়ে উঠেছিল প্রকৃতই রেড রোড। জীবনাবসানের সময় সরকারী পদাধিকারী না হয়েও তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান দিয়ে গান-স্যালুটে শেষ বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এরপরেও কী তাঁকে রাষ্ট্রনায়ক বলা যাবে না?

জ্যোতি বসুর জীবনাবসানের পর তাঁর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা ও শোক জানাতে গিয়ে দেশ-বিদেশের রাষ্ট্রনেতারা রাষ্ট্রনায়কহিসাবে তাঁর অসামান্য ভূমিকার কথা বারেবারে উল্লেখ করেছেন। দিল্লিতে বিদেশী অতিথি আসায় কমরেড জ্যোতি বসুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দেশের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কলকাতায় আসতে পারেননি। কিন্তু প্রয়াত জ্যোতি বসুর শেষযাত্রার আগেরদিন দিল্লিতে সি পি আই (এম)-র কেন্দ্রীয় দপ্তরে গিয়ে তাঁর প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করে শোকপুস্তিকায় লিখে এসেছিলেন : ‘‘দেশ তার এক মহান সন্তানকে হারালো, যিনি ছিলেন এক মহান রাষ্ট্রনেতা ও মহান দেশপ্রেমিক। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের এবং তাঁর অগণিত গুণগ্রাহীদের, কমরেডদের ও অনুগামীদের আমার গভীর শোকজ্ঞাপন করছি।’’ কলকাতায় এসেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী দেবেগৌড়া, ইন্দ্রকুমার গুজরাল, প্রাক্তন উপ-প্রধানমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানিসহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি। ইউ পি এ-র চেয়ারপারসন ও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীও এসেছিলেন প্রয়াত জ্যোতি বসুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। বিশেষ বিমানে কলকাতায় পৌঁছে সোজা বিধানসভা ভবনে গিয়ে সেখানে শায়িত প্রবীণ জননেতার মরদেহে মালা দিয়ে শোকপুস্তিকায় তিনি লেখেন : ‘‘কংগ্রেস দল ও আমার নিজের পক্ষ থেকে কমরেড বসুর প্রতি আমি গভীর শোক জানাই। তিনি ছিলেন একজন আদর্শবাদী, দৃঢ়চেতা, দূরদৃষ্টি ও বাস্তববোধসম্পন্ন নেতা। তিনি দেশ, নিজের দল ও জনগণের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গিয়েছেন। তাঁর অভাব আমরা সকলেই অনুভব করবো।’’

শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ বিমানে কলকাতায় এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জ্যোতি বসুকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম অগ্রণী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বহিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাঁর মৃত্যু শুধু ভারতের নয়, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিরাট ক্ষতি। তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক।গভীর কৃতজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রী হাসিনা স্মরণ করেছিলেন, ‘১৯৭১-এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়বসুর বিপুল সমর্থনেরকথা। সেইসঙ্গে জানিয়েছিলেন, ‘তাঁর ব্যক্তিগত ভূমিকা ও উদ্যোগ শক্তিশালী করেছে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে।  প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সঙ্গে বিশেষ বিমানে একই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন বাংলাদেশের দুই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ও এইচ এম এরশাদও। ছিলেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ সেদেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, যা বাংলাদেশের ইতিহাসেও নজিরবিহীন ঘটনা।

কমরেড জ্যোতি বসু মানে জীবন্ত ইতিহাস। কমরেড জ্যোতি বসু মানে শুধু ভারতের নয়, এই উপমহাদেশের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতা।এভাবেই প্রয়াত কমরেড জ্যোতি বসুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেদিন শোক প্রকাশ করেছিলেন নেপালের কমিউনিস্ট প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল। মাধব কুমার নেপাল বলেছিলেন, ‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা ছিলেন তিনি। দীর্ঘ সাত দশকের ওপর রাজনৈতিক জীবন। দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। আর আমাদের নেপালী জনগণের কাছে কমরেড জ্যোতি বসু প্রিয়তম, মহান বন্ধু।কলকাতায় চীনের কনসাল জেনারেল মাও সিওয়েই এক শোকবার্তায় বলেন, ‘ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ও চীনের মহান বন্ধু জ্যোতি বসুর জীবনাবসানে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।

কমরেড জ্যোতি বসুর কাছে মানুষই ছিল শেষ কথা, জনগণই ছিল তাঁর শক্তির উৎস। তাঁর সত্তর বছরের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিভিন্ন অংশের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম-আন্দোলন-ধর্মঘটে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন, কেবল যখন বিরোধীপক্ষের বিধায়ক বা বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তখনই নয়, যখন যুক্তফ্রন্ট সরকারের উপমুখ্যমন্ত্রী কিংবা বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখনও। মানুষের প্রতি অপরিসীম আস্থা ও ভালোবাসা থেকেই তিনি পেয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা। তাঁর এই অসাধারণ বৈশিষ্ট্যই তাঁর শেষযাত্রায় যেমন টেনে এনেছিল দেশ-বিদেশের নেতা-নেত্রীকে, তেমনি অগণিত সাধারণ মানুষকে। জ্যোতি বসুর জন্মশতবর্ষে তাঁর জীবনের এই উজ্জ্বল দিকগুলিকে বুকে আঁকড়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলাই আমাদের দায়িত্ব। আগামীদিনে এটাই হোক আমাদের শপথ। 
*********

ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা বন্ধ হোক


জ্যোতি বসু
(১৯৪৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর বঙ্গীয় আইনসভায় ভাষণ)


মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আমি মনে করি শ্রমিক শ্রেণীর কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে এই আলোচনায় আমার অবশ্যই অংশগ্রহণ করা উচিত। যে কেন্দ্রে হিন্দু, মুসলমান উভয় ধর্মালম্বীই আছেন। গোটা শহর জুড়ে সাম্প্রদায়িক হানাহানি এই মহানগরীকে হতমান করেছে এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্করভাবে আমাদের রাজনৈতিক জীবনকে কালিমালিপ্ত করেছে, তখন কলকাতা ও শহরতলির শ্রমিকশ্রেণী এই ঘটনা সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দূরে থেকেছেন। আসুন, এর জন্য তাঁদের আমরা সম্মান জানাই।

হাজার হাজার মানুষ কীভাবে নৃশংসতা, কাপুরুষতা ও অমানবিকতায় পতিত হয়েছিল তার বিশদ ব্যাখ্যা আমি করছি না। বরং আমি সভার সমস্ত সদস্য ও দেশবাসীকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এটাই বলব যে, এক মুহূর্তের জন্যও ভুলবেন না, আমরা যাই বলি, যাই করিনা কেন, তার উদ্দেশ্য হবে উদ্ধারকার্য। তার প্রতি দৃষ্টি রেখেই সমস্ত বক্তব্য এবং কাজ করার জন্য আন্তরিক আবেদন জানাবো। এই মুহূর্তে সমস্ত শুভেচ্ছা সহ দেশবাসীর রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি উদ্দীপনা ও শক্তিকে নির্ভর করে ও সাম্রাজ্যবাদী কৌশল মোকাবিলায় এবং স্বাধীনতার জন্য তাঁদের নিঃসংশয় সংকল্পকে স্মরণে রেখেই যা কিছু করতে হবে। যে লক্ষ্য আইনের জন্যই হিন্দু ও মুসলিম ক্ষুধা তৃষ্ণা ও যন্ত্রণার মোকাবিলা করেছেন। বাংলায় মুক্ত জীবন ও স্বাধীনতা অর্জনের একমাত্র পথ ইউরোপীয়ানদের বাদ দিয়ে একটি প্রগতিশীল কর্মসূচির ভিত্তিতে কোয়ালিশন সরকার গঠন। এই লক্ষ্য অর্জন ভোটের মাধ্যমে হবে না। সম্ভব আলোচনার মধ্য দিয়েই, মন্ত্রিসভাকে ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য অভিযুক্ত করার আগে, আসুন পর্যায়ক্রমে আমরা বিষয়গুলি আলোচনা করি। যদিও এই মন্ত্রিসভা বহুবিধ অপকর্ম করেছে। যাই হোক, দেখুন আমাদের বিরুদ্ধে কাপুরুষোচিত ছলের মূল পান্ডা কারা; যাবতীয় ঘৃণার সঙ্গেই আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই আমাদের পয়লা নম্বর শত্রু। তারা আমাদের অবদমিত করেছে, পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, জনগণকে ভুল পথে চালিত করেছে এবং এখন সগর্বে কলকাতায় নিদারুণ শ্মশানের শান্তি বজায় রাখলেও, যে কোনো সময় তা ভেঙে যেতে পারে।

অতীতে যখনই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে তখনই আমরা, সঠিকভাবেই সাম্রাজ্যবাদকে তার প্রধান উস্কানিদাতা হিসেবে ভৎর্সনা করেছি এবং আমরা দেখেছি সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে দেশবাসী কীরকম অসহায় দুর্বল দাবার বোড়েতে পরিণত হয়। এবারেও দাঙ্গা সম্পর্কে আলাদা করে কিছু ভাবনার কোনো কারণ নেই। প্রভাবিত করতে পারে এমন সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তির সঙ্গে আমিও এই দাঙ্গার প্রধান অপরাধীদের অভিযুক্ত করছি। যাঁরা হোয়াইট হল অথবা দিল্লি অথবা কলকাতার গভর্নর হাউসে আত্মতৃপ্তি নিয়ে অবস্থান করছে এবং সুতোর টানে আমাদের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলিকে তাদের পাতা ফাঁদে পা দিতে বাধ্য করছে। গত ছ'মাসে ক্যাবিনেট মন্ত্রী কি নিখুঁত খেলাই না খেললেন। কখনো কংগ্রেস এবং কখনো লীগের কানে অমৃতবাণী বর্ষণ করেছেন। এমন সব প্রস্তাব তারা পেশ করলেন যেগুলিকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। সবশেষে স্বাধীনতাও নয়, এমনকি গণতান্ত্রিক অধিকার বা স্বায়ত্তশাসনের অধিকার দেবার পরিবর্তে তারা যা করল, আমাদের দেশবাসীর এক সম্প্রদায়ের মধ্যে অন্য সম্প্রদায়ের বিরোধকে পরিকল্পিতভাবে জিইয়ে রাখা ও জনমানসকে বিষিয়ে তোলা এসবের চূড়ান্ত পরিণতি হলো কলকাতার মারাত্মক দাঙ্গা। 

মাননীয় উপাধ্যক্ষ, এই সমস্ত কিছুর সঙ্গেই আমার প্রশ্ন, ভাইসরয়ের সভাপতিত্বে গভর্নরদের সম্মেলনের কি গোপন পরিকল্পনা আলোচিত হয়েছিল যার ফলে কলকাতার গভর্নর ঠিক তার বিপরীত কাজ করলেন? কি কারণেই বা কলকাতায় সরকার দুদিনের জন্য আক্ষরিক অর্থে অপসৃত হয়েছিল এবং যার ফলে পুলিস তার নির্ধারিত কাজের বদলে লুঠ ও অগ্নিসংযোগের কাজে সহায়তা করেছিল? পুলিস কিভাবে ধর্মঘট ভাঙে আমরা সবাই জেনেছি। রশিদ আলি দিবসে আমাদের বিপ্লবী যুবকদের মিছিল ভেঙে দিতে তারা কিভাবে তৎপর হয়েছিল তাও আমরা দেখেছি। অর্থাৎ কিভাবে তারা গণঅভ্যুত্থান দমন করে! আমাদের অভিজ্ঞতা আছে, কেমন করে ১৯৪২ সালে সরকারকে অন্ধকারে রেখে কিভাবে পুলিস তার সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। কিন্তু এই দাঙ্গার সময় জনগণ ছিল বিচ্ছিন্ন এবং পুলিসবাহিনী বুঝে নেয় যে তাদেরই জমানা আরো জোরদার হবে। সুতরাং এই স্বৈরতান্ত্রিকদের সংবিধানিক রীতির আড়ালে আশ্রয়ও নিতে দিলে হবে না। যদি ইংরেজরা পথিমধ্যে আক্রান্ত হতেন বা তাদের সম্পত্তি লুঠ হতো কিম্বা মিলিটারি ট্রাক জ্বালিয়ে দেওয়া হতো, তাহলেও কি তারা একই আচরণ করতেন? উত্তর সহজেই অনুমেয় এবং চোখে পড়বার মতো বিষয়। সিআইডি’র তান্ডবের নারকীয় প্রক্রিয়া পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়া অনুমান করাও অসম্ভব। কারণ দাঙ্গার প্রস্তুতি সম্পর্কে সম্ভাবত তারা ওয়াকিবহাল ছিল। সুতরাং, মাননীয় উপাধ্যক্ষ মহাশয়, আমি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছি যে, গভর্নর এবং পুলিস কমিশনারের ছদ্ম-নিরপেক্ষতা ছিল পূর্ব পরিকল্পিত।

মিঃ সুরাবর্দি এবং তাঁর মন্ত্রীরা বলার চেষ্টা করছেন যে, তাঁদের দায়িত্ব কেবল আদেশ করা, আর তা পালন করা পুলিস কমিশনারের কাজ। কিন্তু মিঃ সুরাবর্দি জানেন, তাঁর গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন দিয়ে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছেন ১৬আগষ্ট দুপুরবেলা যে জনসমাগম তা কেমন করে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। তাঁরই অধীনস্থ পুলিস কমিশনার দায়িত্ব পালন করছে কিনা তা দেখা মিঃ সুরাবর্দির দায়িত্ব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে তাঁর ডেপুটি কমিশনারদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার কথা ভাবছেন? তাঁর সে সাহস নেই কারণ তিনি নিজের ব্যর্থতা তদোপরি সরকারের শোচনীয় ব্যর্থতার কথা জানেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার মুসলিম লীগ দল থেকে পৃথক নয় এবং শেষোক্তটিকে অবশ্যই ত্রুটি-বিচ্যুতির দায়িত্ব নিতে হবে। এসব সত্ত্বেও আমি মনে করি, সাম্রাজ্যবাদী নীতি কখনোই আমাদের এমন দুর্দশা করতে পারতো না, যদি না লীগ এবং কংগ্রেস সেই অশুভ চক্রান্তের শিকারে পরিণত না হতো।

আমি প্রথমে লীগের দায়িত্ব সংক্ষেপে উল্লেখ করার চেষ্টা করছি:

১) ১৬ আগস্টের গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৫ আগস্ট ‘আজাদ’ সম্পাদকীয় লিখেছিল যে ওইদিন পাকিস্তানের জন্য যুদ্ধ শুরু হবে।

২) সারা ভারত লীগ কাউন্সিল ব্রিটিশ এবং কংগ্রেস উভয়কেই শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

৩) মৌলানা আক্রম খান এবং ওসমান সাহেব মুসলমানদের পবিত্র রমজান মাসে কাফেরদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার দায়িত্ব স্মরণ করে দিয়েছিলেন।

৪) পরহিতব্রতী নাজিবুদ্দিন সাহেব বারংবার ঘোষণা করেছেন, মুসলিমরা অহিংসতার প্রতি অঙ্গীকার বদ্ধ নয়।

৫। সাহসী সুরাবর্দি ঘোষণা করেছিলেন, ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের সঙ্গে একতরফা বোঝাপড়া করলে তিনি কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণ অবজ্ঞা করবেন এবং বাংলাকে স্বাধীন ঘোষণা করবেন।

৬। সারা ভারত লীগ কাউন্সিলের প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ ছিল ১৬মে ক্যাবিনেট মিশনের বিজ্ঞপ্তি মেনে নিতে কংগ্রেসকে বাধ্য করার জন্য। এই বিজ্ঞপ্তিতে কাউকে স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি এবং মানুষের ভোট ছাড়াই সম্প্রদায়ভিত্তিক আসন বিভাজন নীতিকে মেনে নেওয়া। (এই অবস্থায় সদস্য তাঁর নির্ধারিত সময়সীমা পৌঁছান)

মহাশয়, আমি আর কয়েক মিনিট পেতে পারি?
উপাধ্যক্ষ:...
শ্রী জ্যোতি বসু : মহাশয়, মাননীয় অধ্যক্ষ আমাকে দশ মিনিট সময় বরাদ্দ করেছিলেন। আপনি কি অনুগ্রহ করে আমাকে দুমিনিট সময় দিতে পারেন ?

উপাধ্যক্ষ :...
শ্রী জ্যোতি বসু : আমি আর দুমিনিট সময় চাই। এতে কি আশ্চর্যের কিছু আছে স্যার, যে মুসলিমদের একাংশ তাঁদের নেতাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন এবং প্রত্যক্ষ সংঘর্ষের হাতে কলমে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন এবং এরই পরিণতিতে এই ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। এর দ্বারা ব্রিটিশ আমাদের উপর নতুন করে শৃঙ্খল চাপিয়ে দিয়েছে। এর ফলে একমাত্র ব্রিটিশ সম্পত্তি সুরক্ষিত হয় এবং হিন্দু ও মুসলিম পরস্পরকে শঙ্কা ও অবিশ্বাস নিয়ে দেখবে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আন্দোলন সংগঠিত করার বদলে কংগ্রেস ব্রিটিশ পরিকল্পনাকেই গ্রহণ করেছে। এবং এটা জেনেবুঝেই যে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী ভারত ত্যাগ করছে না, রাজন্যবর্গের নিয়ন্ত্রণকারী আধিপত্য থাকছে এবং চূড়ান্ত ক্ষমতা ব্রিটিশের হাতেই রয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই ব্রিটিশ পরিকল্পনায় কংগ্রেস মুসলিম লীগের বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে এবং কংগ্রেসকে রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে এর মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এই কারণেই মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ’ কংগ্রেসের কাছে ভীতিকর হয়ে উঠেছিল এবং একটি সফল হরতাল তাদের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। সুতরাং ১৫ আগস্ট দেশপ্রিয় পার্কের জনসভায় ১৬ আগস্টের বিরুদ্ধে আবেগ সঞ্চারিত করা হয়েছিল।

এমনকি, এখনও সমস্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা বলছি যে, ব্রিটিশ সেনা আমাদের শান্তি দিতে পারে না; কার্ফিউ ঘোষণা, ১৪৪ ধারা জারি এবং নাগরিক স্বাধীনতা অপহরণ কখনোই ভ্রাতৃপ্রতিম আস্থা এবং সহানুভূতির জন্ম দেয় না। ভাইসরয়ের কাছে এই মন্ত্রীসভার অপসারণ চেয়ে আবেদন-নিবেদনে ফল হবে না। সরকার ফেলে দেবার চেষ্টাও আমাদের সমস্যার সমাধান করবে না। কারণ মানুষ প্রশ্ন করবেন ‘এরপরে কি’কেন্দ্রে কোয়ালিশন ছাড়া বাংলায় কোয়ালিশন সম্ভব নয়, লীগের এই যুক্তি অর্থহীন। তাদের অনুধাবন করতে হবে, একদলীয় সরকারের আমলে দেশবাসী কী দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিলেন। একমাত্র দেশপ্রেমের উদ্দীপনা থেকে রাজনৈতিক দলগুলি একযোগে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে বাংলাকে বাঁচানোর পরিকল্পনা করতে পারে। আমি উল্লেখ করেছি, ইউরোপীয়দের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই সরকারের কর্মসূচি হবে প্রগতিশীল আইন। বাঁচার মতো মজুরি, ইউনিয়নের সুরক্ষা, জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, পাটের ন্যায্য ন্যূনতম মূল্য, সকলের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও বস্ত্র, সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার এবং অবশিষ্ট রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তিদান।

আমরা সেই কারণে অনাস্থা প্রস্তাবের এই বিতর্কে কোনো পক্ষেই ভোট দেব না কারণ এটা কেবলমাত্র ভ্রাতৃঘাতী লড়াইয়ে ঘৃতাহুতি দেবে। আমরা হিন্দু, মুসলমান সকল সাধারণ মানুষের কাছে তাদের সকল শক্তি সংগঠিত করতে আবেদন করছি। যাতে তারা বারংবার না পারস্পরিক খুনোখুনিতে জড়িয়ে পড়েন। এতে আমাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলি ভেঙে যায়, মজুরি বৃদ্ধির এবং জীবনযাত্রার মানের উন্নতির লড়াই ভেঙে পড়ে, আর ইউরোপীয় অশুভ শাসন শক্তিশালী হয়। রশিদ আলি দিবসনৌবিদ্রোহ, আইএনএ, বন্দীদের বিচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২৯জুলাইয়ের সাধারণ ধর্মঘটের উদ্দীপনায় উদ্দীপ্ত মানুষ, সংঘবদ্ধ মানুষই নেতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে বাধ্য করবেন। মানবতার বিভিন্ন আদর্শ অগ্রসর হবে শান্তি এবং স্বাধীনতার পথে। এই মুহূর্ত, তারা বলুন, ‘কখনোই আমরা আর ভাইয়ের বিরুদ্ধে উদ্যত হবো না; কখনোই আমরা আর তাদের বরদাস্ত করব না, যারা হিন্দু ও মুসলিম পার্থক্যের ভিত্তিতে কথা বলে এবং আমাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেয়।’
.........................................................................................................................
ফুটনোট: (১৯৪৬ সালে ১৬ আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংঘর্ষ দিবস’পালনের ডাক দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ, দাবি ছিল পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন। সেদিন থেকে পরপর অন্তত তিনদিন কলকাতা প্রত্যক্ষ করেছিল জঘন্যতম ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা। ১৯৪৫-এর নভেম্বরে আইএনএ বন্দীদের দাবিতে উত্তাল কলকাতা, ১৯৪৬-এর ১৬ ফেব্রুয়ারি আইএনএ দিবস পালন উপলক্ষে মহানগরী, নৌবিদ্রোহের সেনানীদের প্রতি হিন্দু-মুসলিম মিলিত সংহতির সাক্ষী এই শহর, ১৯৪৬-এর ২৯জুলাই অবিস্মরণীয় হরতালের সহমর্মী কলকাতা শিউরে উঠেছিল ৪৬-এর মধ্য আগস্টের রক্তস্নানে। অবিভক্ত বাংলায় তখন এইচএ সুরাবর্দির নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার। বাংলা প্রদেশের আইনসভায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। ১২ সেপ্টেম্বর বাংলা বিধানসভায় অনাস্থা প্রস্তাব এনেছিল কংগ্রেস। বিতর্ক চলেছিল বেশ কয়দিন। ১৯ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার জ্যোতি বসু বক্তব্য রেখেছিলেন। বসুর ভাষণের সময় সভা পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন উপাধ্যক্ষ তাফাজ্জল আলি। বসুর ভাষণের পর বিকেল ৫.২৫ মিনিটে সভা সেদিনের মত মুলতুবি হয়। ভাষণের শিরোনামটি যুক্ত করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২২ সেপ্টেম্বর বিধানসভায় কংগ্রেস অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করে। ১৩ সেপ্টেম্বর অমৃতবাজার পত্রিকায় জ্যোতি বসু রূপনারায়ণ পাল এবং রতনলাল ব্রাহ্মণ, বিধানসভায় তিন কমিউনিস্ট সদস্যের যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশিত হয় তার বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো : ‘‘আমরা, বিধানসভার কমিউনিস্ট সদস্যরা, মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে আনীত অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করিনি। আমাদের যুক্তিগুলি খুবই সহজ সরল। একদলীয় মন্ত্রিত্ব হচ্ছে গৃহযুদ্ধের স্থায়ী প্ররোচনা কিন্তু এই মন্ত্রিত্ব অপসারিত করাও ঠিক একই ব্যাপার। এই পরিস্থিতিতে বাঁচার একমাত্র উপায় সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা এবং একে অপরকে দোষারোপ করে তা সম্ভব নয়। বরং আলোচনার মাধ্যমে একটি অভিন্ন কর্মসূচীতে উপনীত হবার জন্য অভিন্ন সিদ্ধান্তে পৌঁছান যা বাংলাকে বাঁচাবে। কলকাতা সম্প্রতি পারস্পরিক হত্যার নজিরবিহীন তান্ডবের মধ্য দিয়ে গেছে। এবং প্রদেশের সর্বত্র সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রবল। রাস্তাঘাট সৈন্যবাহিনীর হাতে তুলে দিলে ঝগড়া বিবাদ চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমরা জমিউনিস্টরা কখনোই ভাইকে ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করি না বরং অভিন্ন শত্রুর বিরুদ্ধে তাদের একত্রিত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করি।

লীগ নেতাদের কেউ কেউ মনে হয়, ভাবছেন যেহেতু কংগ্রেস অন্যান্য প্রদেশে একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেছে, বাংলাতেও একদলীয় মন্ত্রিসভা গঠন করার অধিকার তাদের রয়েছে। ঐক্যবদ্ধ মন্ত্রিসভা গঠনের উদ্দ্যেশ্যে কংগ্রেস সভাপতির সঙ্গে লীগ নেতাদের বৈঠক সম্পর্কে লীগ সমর্থক একটি দৈনিক বিরক্তি প্রকাশ করেছে।

আমরা আশা করি, বাংলা-কংগ্রেসের যেমন, ঠিক তেমনই বাংলা-লীগের প্রধান অংশ বাংলা প্রদেশে সম্মিলিত মন্ত্রিসভা গঠনের পক্ষে নিশ্চিতভাবেই তাঁরা গত দুর্ভিক্ষের সময়ে একদলীয় লীগ মন্ত্রিসভা গঠনে অক্ষমতার কথা ভুলতে পারেন না। আজ যদি তাঁরা মন্ত্রিসভার দুটি আসন অথবা মন্ত্রকের বিতরণ নিয়ে দর কষাকষি করেন এবং তা লক্ষ লক্ষ বাঙালী মুসলমানদের দ্বিতীয় দুর্ভিক্ষের কবলে ফেলে দেয়, যদি তাঁরা সাম্রাজ্যবাদী আমলাতন্ত্র এবং কায়েমী স্বার্থের বিপক্ষে রুখে দাঁড়াতে পারে এমন শক্তিশালী মন্ত্রিসভা গঠন করতে অস্বীকার করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের বাংলা, হিন্দু ও মুসলমানদের বাংলা, তাঁদের ক্ষমা করবে না।

আমরা বিশ্বাস করি যে বাংলায় কংগ্রেস লীগ কোয়ালিশনের ভিত্তি ডঃ কুমুদ শঙ্কর রায়ের বিবৃতি মতো হতে পারে। কংগ্রেস নেতা, শ্রী কিরণশঙ্কর রায় এবং লীগ নেতা শাহেদ সূরাবর্দি সাম্প্রতিক বিবৃতিতে যে সকল বিষয় উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলি সহজেই দলগুলির মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ন আলোচনার মাধ্যমে মিটে যেতে পারে। পার্টি যে-কোনো রকম গঠনমূলক কার্যে, এবং সাম্রাজ্যবাদী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে - কোনো ধরনের সংগ্রামে, জমিদারদের বিরুদ্ধে, কায়েমী স্বার্থান্বেষী এবং মুনাফাকারীদের বিরুদ্ধে এবং কোনো ধরনের বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে সংগ্রামে, বিধানসভার ভিতরে এবং বাইরে কমিউনিস্ট পার্টি তাঁদের পূর্ন সমর্থনের আশ্বাস দিচ্ছে।’’)

20200622

কর্মসংস্থানে দেশে শীর্ষে থাকা রাজ্যকে টেনে নামিয়েছেন মমতা




প্রসূন ভট্টাচার্য

পুরানো তথ্য, কিন্তু সেটাই নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গে। বাংলার বুকে কাজ না পেয়ে লক্ষ লক্ষ যুবক যখন ভিনরাজ্যে যেতে বাধ্য হচ্ছেন কাজের খোঁজে এবং ভিনরাজ্যে গিয়ে লকডাউনের মতো বিপদে জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, তখন এক দশক আগের এনএসএসও’র তথ্য দেখিয়ে দিচ্ছে পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকার কর্মসংস্থানে দৃষ্টান্তমূলক সাফল্য অর্জন করেছিল। সিঙ্গুর সহ রাজ্যে শিল্পায়নে বামফ্রন্ট সরকারের উদ্যোগ যদি চালু থাকত তাহলে কি কাজের জন্য এমন স্রোতের মতো ভিনরাজ্যে যেতে হতো বাংলার যুবকদের? প্রশ্নটা নতুন করে উঠে আসছে এই চরম বেকারির বাজারে।

বামফ্রন্ট সরকারের শেষের ৬ বছরে রাজ্যে শিল্পায়নে, বিশেষত উৎপাদনমূলক শিল্পে রীতিমতো জোয়ার এসেছিল। রাজ্যের স্থিতিশীলতা, পরিকাঠামো বৃদ্ধি, আইন-শৃঙ্খলা, শিক্ষার প্রসার ও দক্ষ শ্রমিকের জোগান, গ্রামে ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে বামফ্রন্ট সরকার অন্য রাজ্যগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে উৎপাদনমূলক শিল্পে ব্যাপকভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ টানতে সক্ষম হয়েছিল। এনএসএসও’র তথ্য অনুসারে ২০০৪ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে সারা দেশে উৎপাদনমূলক শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে ৫৮ লক্ষ ৭০ হাজার মানুষের। এর ৪০ শতাংশের বেশিই ঘটছে পশ্চিমবঙ্গে। সেই সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে উৎপাদনমূলক শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে ২৪ লক্ষ মানুষের।

উৎপাদনশিল্পে কর্মসংস্থানের পিছনে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল ছোট ও মাঝারি শিল্পের। কিন্তু সেগুলোর প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়েছিল রাজ্যে উৎপাদনভিত্তিক বড় শিল্প কারখানা গড়ে তোলায় বেসরকারি বিনিয়োগ টানায় সাফল্যের কারণে। বড় কারখানার উপস্থিতির জন্য রাজ্যে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলি উৎপাদন করতে পেরেছে, বড়গুলির চাহিদা মেটাতে এবং বড়গুলির উৎপাদনের সাহায্যে নতুন উৎপাদনে। অর্থাৎ আপস্ট্রিম এবং ডাউনস্ট্রিমে। হলদিয়া পেট্রোকেম উপস্থিতিই এরাজ্যে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পেরেছিল ছোট ও মাঝারি শিল্পের বিকাশে।

শিল্পবিকাশের উজ্জ্বল সম্ভাবনায় সেই সময়ে সিঙ্গুরে অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তুলতে টাটা মোটরসের উদ্যোগ, শালবনী, পুরুলিয়া, খড়্গপুরে ইস্পাত শিল্প সহ বিভিন্ন শিল্পের উদ্যোগ চলছিল জোর কদমে। এর সঙ্গে পরিষেবা ক্ষেত্র এগচ্ছিল মূলত তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পকে কেন্দ্র করে। ২০০৪ থেকে ২০১১ সালে বাংলা যখন কেবল উৎপাদন শিল্পেই ২৪ লক্ষ কর্মসংস্থানের সাফল্য দেখাতে পেরেছিল, দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান তখন এক্ষেত্রে ছিল প্রথম। অনেকটা পিছনে দ্বিতীয় স্থানে ছিল গুজরাট। সে রাজ্য ওই সময়কালে ১৪ লক্ষ ৯০ হাজার কর্মসংস্থান করতে পেরেছিল উৎপাদনশিল্পে। এরপরে যারা ছিল সেই তামিলনাডু, পাঞ্জাব, কর্ণাটক এবং মহারাষ্ট্রে সংখ্যাটা ছিল ৪ থেকে ৬লক্ষের মধ্যে।

তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও শিল্প মন্ত্রী নিরুপম সেন তখন প্রায়ই বলতেন, ‘টাটা মোটরসের গাড়িতে কে চড়বে সেটা আমাদের কাছে বড় কথা নয়, অটোমোবাইল শিল্পে এবং তার যন্ত্রাংশ সরবরাহের শিল্পগুলিতে এরাজ্যের হাজার হাজার বেকার ছেলেমেয়ে কাজ পাবেন এটাই আমাদের কাছে বড় কথা।’ সম্ভাবনাময় সেই বাংলায় তখন কাজের জন্য ভিনরাজ্য এমনকি বিদেশ থেকেও অনেকেই ফিরে আসতে শুরু করেছিলেন। বিশেষত শিক্ষিত যুবক-যুবতীরা রাজ্যেই ভালো (ডিসেন্ট) কাজের সন্ধান পাওয়ার আশা করছিলেন।

মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সেই স্বপ্ন গুঁড়িয়ে গেল কীভাবে?

উত্তর আছে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর কাছে। সিঙ্গুর থেকে টাটাদের ৮০ শতাংশ তৈরি হয়ে যাওয়া কারখানা গুজরাটে তাড়ানোর পাশাপাশি বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন তিনি বাংলার ধ্বংসকার্য শুরু করেছিলেন। ২০১১ সালে ক্ষমতায় বসার পরে সেই ধ্বংসকার্যের ফলাফল দেখতে পাচ্ছেন। উৎপাদনমূলক শিল্পকে অর্থনীতির শক্তিশালী বুনিয়াদ বলা হয় এই কারণে যে এটা উদ্বায়ী চরিত্রের নয়। যখন খুশি মুনাফার লোভে সহজেই এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় উড়ে যেতে পারে না, সংগঠিত শ্রমিকরা প্রাপ্যের জন্য সংগঠিতভাবে লড়াই করতে পারে ইত্যাদি। কিন্তু তৃণমূলের সিঙ্গুর আন্দোলনের ফলে বাংলার সেই উৎপাদন শিল্পের সম্ভাবনা ধংস হয়েছে। সিঙ্গুরের কারখানা হয়নি, শালবনী বা পুরুলিয়ার ইস্পাত কারখানাও হয়নি, পেট্রোকেমিক্যালসের প্রসারও ঘটেনি।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিধানসভায় বাজেট পেশ করে অর্থ মন্ত্রী অমিত মিত্র জানিয়েছিলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত চলতি আর্থিক বছরে আমরা ৯ লক্ষ ১১ হাজার জনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরেছি।’’ এভাবেই প্রতিবছর মুখ্যমন্ত্রীও মুখে মুখে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান করছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই কাজ দেখা যাচ্ছে না। এবারের বাজেট অধিবেশনেই শ্রমমন্ত্রী মলয় ঘটক জানিয়েছেন, ‘‘২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজ্যের এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যা ৩৪ লক্ষ ৫ হাজার ৫৮২।’’ 

এটাই হলো রাজ্যের অবস্থা। এরজন্যই রাজ্য ছেড়ে কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শহরের শিক্ষিত যুবরা এবং গ্রামের কৃষিক্ষেত্রে উপার্জনে ব্যর্থ যুবরা। ভিনরাজ্যে কখনো সাম্প্রদায়িক সমস্যার মুখে পড়ছেন, এবার লকডাউনের বিপদে পড়েছেন। কিন্তু ফিরে এসেও উপায় কী? কাজ নেই মমতা ব্যানার্জির বাংলায়, তাই ফের ভিন রাজ্যে যাওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

গত দশকের যে সত্যকে বিরোধী নেত্রী হিসাবে চাপা দিয়েছিলেন, এই দশকে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাকে চেপে রাখতে পারছেন না মমতা ব্যানার্জি।

গণশক্তি, ২০ জুন, ২০২০



বামফ্রন্টের সাফল্য এবং লড়াই শত্রুদের চিরন্তন আতঙ্কের ভূত



মৃদুল দে

বামপন্থীদের সরকার পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯৭৭ সালে। ২১জুন প্রতিষ্ঠা দিবস একটা স্মরণীয় দিন উদ্‌যাপনের আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। ৩৪বছর টানা অনন্য সরকার, তার জন্যও নয়। চারদিকে প্রতিক্রিয়ার বেষ্টনি ও ষড়যন্ত্র, সাংবিধানিক প্রতিবন্ধকতা, কেন্দ্রের সরকারের পদে পদে বৈষম্য, পুলিশ আমলাসহ গোটা যন্ত্র যেভাবে জনবিরোধী কাজে অভ্যস্ত তাদের বাধা, নানা শক্তির নাশকতামূলক কাজ, মিডিয়ার শত্রুতা এবং আদালতের ভূমিকায় জনমুখিনতার অভাব, কংগ্রেসের ত্রিশ বছরের শাসনের ব্যর্থতা ও অপকর্মের বিশাল বোঝা ইত্যাদি উত্তরাধিকার সূত্রে বইতে হয়েছে নতুন সরকারকে; এর মধ্যেই খোদাই হয়েছে অবিস্মরণীয় সাফল্য  হাজার চেষ্টা করেও প্রতিক্রিয়া, তাদের মিডিয়া, বর্তমান হিংস্র স্বৈরাচারী শাসন ভাঙার হাস্যকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালে সারা দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করে অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা চাপিয়ে কংগ্রেস একচ্ছত্র ক্ষমতা অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। তার বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দেশব্যাপী অ-কংগ্রেসী শক্তিগুলির অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের পটভূমিতে ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভারতে প্রথম অকংগ্রেসী সরকার গঠিত হয় এবং এরপরেই রাজ্যে রাজ্যে নির্বাচন; প‍‌শ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরা বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে। এবং আধা-ফ‌্যাসিস্ত সন্ত্রাসের রাজত্বের অবসান ঘটায়। এটাও সামগ্রিক মূল্যায়ন নয়, এভাবে রাতারাতি রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত গুণগত এক পরিবর্তনেও এই সরকার তৈরি হয়নি। এটাও নয় যে, শুধু নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এ সরকার কালচক্রে স্থাপিত হয়েছিল; আছে এক দীর্ঘ অক্ষয় ঐতিহ্য।

পটভূমি
পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় থেকেই জাতীয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় বিপ্লববাদী আন্দোলনের ধারা, পাশাপাশি বিরাট ভূমিকা পালন করে ব্রিটিশ শাসকদের অবর্ণনীয় নৃশংসতার শিকার হয়েছিল, ফাঁসি, জেল, আন্দামানে সেক্যুলার জেলে আটক, পরিবারের পর পরিবারকে কালকানুন দিয়ে হিংস্রতায় নিমজ্জিত করাবাংলায় এই ঐতিহ্য,অম্লান, সুমহান। এঁরা সকলেই পরে যুক্ত হন বামপন্থীদের সঙ্গে ১৯২০ সালে গঠিত কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে। বাংলায় জাতীয় আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দের মধ্যে বামপন্থী ভাবধারার‍‌ই প্রাধান্য ছিল। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে এই উজ্জ্বল অবদানকে পরিকল্পিতভাবে আড়াল করার ফলে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাসের খণ্ডিত চিত্রই প্রজন্মের পর প্রজন্মের মধ্যে সঞ্চারিত করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়েই উগ্র জাতীয়তাবাদ, বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিষ ইতিহাসচর্চায় তখন থেকেই বিরাজ করছে, যার প্রাবল্যে আজ গোটা দেশের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে সঙ্ঘ পরিবার এক বিরাট ও ভয়ঙ্কর চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট বিদ্বেষী প্রচার, কমিউনিস্ট ও বামপন্থার ওপর আক্রমণ, ১৯৪৬-তে গোটা বাংলাজুড়ে দাঙ্গার ভয়াবহতা, দেশভাগজনিত পৃথিবীর অন্যতম ভয়ঙ্কর উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদি শ্রেণি আন্দোলনের সামনে তৈরি করে বহু বাধা ও জটিলতা। কিন্তু এ‍ই কঠিন অবস্থায়ও পাঁচের দশকে নিরবচ্ছিন্ন ও একনিষ্ঠ আন্দোলন, উত্তাল গণআন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে জনগণের সংযোগকে দৃঢ় করে তোলে। কংগ্রেসী শাসনের অত্যাচার, জেল, দমনপীড়ন ইত্যাদি কোনকিছুই জনগণ থেকে কমিউনিস্ট পার্টিকে ও বামপন্থীদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। বরং দেউলিয়া কংগ্রেসের শাসনের বিচ্ছিন্নতাই ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। ছয়ের দশকের গোড়ায় চীন-ভারত বিরোধ, গণআন্দোলন ও দেশে কমিউনিস্ট পার্টির ওপর বিদ্বেষ আক্রমণ চলে। বন্দিমুক্তি, খাদ্য আন্দোলন চললেও বিরাট গণআন্দোলন এই আক্রমণের মুখে অনেকটা গতি হারায়। এরই অনুবর্তিকায় ঘটে বামপন্থীদের ১৯৬৬ সালের উদ্দীপ্ত খাদ্য আন্দোলন, শ্রমিক-কৃষক-শিক্ষকসহ সর্বস্তরের মানুষের যৌথ আন্দোলন। দুদশকের কংগ্রেসের জনবিরোধী নীতি, অপশাসন, আর্থিক সঙ্কটও, মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর আক্রমণ বাড়িয়ে তোলে।

যুক্তফ্রন্ট
১৯৬৭ সালের সাধারণ নির্বাচন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আরেক বড় গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। গোটা দেশে কংগ্রেসের বিকল্প কোনও দল, জোট বা শক্তি ছিল না। কংগ্রেসের বিকল্প নেই এই যে প্রচার গেঁথে দেওয়া হয়েছিল, সেই মিথ্যা তখন ভেঙে পড়ে। সংবিধানের নির্দেশিকা ও মর্মবস্তুর সঙ্গে কংগ্রেস শাসন চিরকাল পরিহাস করে এসেছে। তাতে কংগ্রেস-বিরোধী মনোভাবের সুযোগ নিতে তৎপর হয় স্বতন্ত্র এবং আরএসএসএর রাজনৈতিক ও প্রতিনিধি জনসঙ্ঘ। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলিও সক্রিয়। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং ৭টি রাজ্যের বিধানসভায় কংগ্রেসের পরাজয় ঘটে। পশ্চিমবঙ্গে অকংগ্রেসীরা নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ লড়াই না করেও পরাস্ত করে কংগ্রেসকে। জনসঙ্ঘকে বাদ দিয়ে বাম ও অ-বাম অকংগ্রেসী দলগুলিকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। গোটা রাজ্য এই উচ্ছ্বাসে তখন ফেটে পড়ে। গণতান্ত্রিক অধিকার, গণআন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন ও সংগঠনের অধিকার, বিনাবিচারে আটক বন্দিদের মুক্তি, উদ্বাস্তু, কৃষকদের জন্য জমি, প্রশাসনিক দুর্নীতিরোধ, খাদ্য সঙ্কটের মোকাবিলা ইত্যাদি ১৮ দফা কর্মসূচির বহুবিধ কাজে হাত দেয় নতুন সরকার। পদে পদে বাধা, সংবাদপত্রের কুৎসা, স্থিতিশীলতা ধ্বংস, আইন শৃঙ্খলার অবসান ইত্যাদি প্রচার, এর মধ্যেও গণআন্দোলন ও সরকারের দায়িত্ব পালন একসঙ্গে চলে। দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনের চেয়ে পৃথক এক শাসনধারা তৈরিও শুরু হয়। সাত মাসের মধ্যে নির্দল ও অবামপন্থীদের ১৭ জন বিধায়ককে দিয়ে সমর্থন প্রত্যাহার করিয়ে রাজ্যপালকে ব্যবহার করে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটায় কেন্দ্র, কোনও রাজ্যেই অকংগ্রেসী সরকারকে টিকতে দেওয়া হয়নি। এই চক্রান্তের বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরে রাজজুড়ে জোরালো আন্দোলন চলে, ব্রিগেডে হয় বিরাট বিরাট সমাবেশ। ১৯৬৭-র  ৫নভেম্বরের সিপিআই(এম)র ব্রিগেড সমাবেশ এখনও বলা যায় অতুলনীয়। এই আন্দোলনের চাপেই ১৯৬৯ সালে আবার বিধানসভা নির্বাচন। এবার বাম, অ-বামরা যুক্তফ্রন্টে ঐক্যবদ্ধ। বিরাট জয় হয় যুক্তফ্রন্টের মোট ৪৯.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে।
সিপিআই(এম) উভয় সরকারে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দল হওয়া সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ বাংলা কংগ্রেসকে ছেড়ে দেয়, গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরও ভাগ করা হয় শরিকদের মধ্যে। বেনামি জমি উদ্ধার, জমি বণ্টন, বর্গাদারদের অধিকার, শিল্প শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের নির্বাচন ও অধিকার, শিক্ষা স্বাস্থ্য, উদ্বাস্তু তফসিলি জাতি ও উপজাতি সমস্ত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য সীমিত ক্ষমতা ও সমস্যার মধ্যেও অর্জিত হয়। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও বেনামি জমি উদ্ধারের আন্দোলন, জনগণের পক্ষে ৩৬ দফা কর্মসূচি রূপায়ণ সম্পূর্ণ এক পৃথক ও বিকল্প জনমুখী সরকার পরিচালনা যুক্তফ্রন্ট হাজির করে দেশের সামনে। এর আগে বামপন্থীদের নেতৃত্বে কেরালাও নজির তৈরি করে।

সন্ত্রাসরাজত্ব বাংলাতেই
বাংলায় যুক্তফ্রন্টে এই সাফল্য যেমন প্রতিক্রিয়ার শক্তির শ্রেণি আক্রোশ বাড়িয়ে তোলে, যুক্তফ্রন্টের মধ্যেও বিভেদের প্রতিফলন ঘটে। এসব কাজে লাগিয়ে এই সরকারের পতন ঘটানো হয়। কিন্তু সরকার বাঁচানোর জন্য কোনও আপসমূলক কার্যকলাপ বরদাস্ত করা হয়নি, বাইরের সংগ্রামকে তীব্রতর করা হয়, সন্ত্রাসে সিপিআই(এম)‘র বহু নেতা-কর্মীকে হত্যা ও হাজার হাজার কর্মীকে অকথ্য অত্যাচার সইতে হয়। ১৯৭১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ ছিল না, কিন্তু সিপিআই(এম) এবং সহযোগী কয়েকটি ছোট বামপন্থী দল মিলে অভাবনীয় সাফল্য লাভ করে সন্ত্রাস, মিডিয়ার কুৎসা, বহু কেন্দ্রে নির্বাচনী প্রচার করতে না পারা, ষড়যন্ত্র, গরিবী হটাও, ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ ও বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে কংগ্রেস সরকারের সহায়তার জন্য কংগ্রেস-অনুকূল ইন্দিরা-হাওয়ানামক পরিস্থিতির মধ্যেও। সর্বত্রই জয় জয়কার কংগ্রেসে, একমাত্র হাওয়া ঘুরে যায়, পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় পরাজয় কংগ্রেসের।
১৯৭২ সালের নির্বাচনের আবার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বামপন্থীরা কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া ঐক্যবদ্ধ হয়। আরও বড় শোচনীয় পরাজয় অবধারিত বুঝে গোটা নির্বাচনকে রিগিং ও জাল জুয়াচুরির মাধ্যমে সম্পূর্ণ প্রহসনে পরিণত করে কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকার। পাঁচ বছর ধরে অকথ্য বর্বরতা চলে সিপিআই(এম) এবং বামপন্থীদের ওপর। ১১০০ সিপিআই (এম) নেতা ও কর্মী খুন হন, বিনা বিচারে ও সাজানো মামলায় হাজার হাজার গ্রেপ্তার, হাজার হাজার কর্মী এলাকা ছাড়া হয়। ভারতে জরুরি অবস্থার আগেই পশ্চিমবঙ্গ সেই বীভৎস অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যায়। কিন্তু গণতন্ত্র ও জীবন  জীবিকার আন্দোলনকে তখনও স্তব্ধ করা যায়নি। ভারতের অন্য কোনও রাজনৈতিক দল এই পরীক্ষার সম্মুখীন হয়নি এরকম ত‌্যাগস্বীকার করেনি
এই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কাল যাঁরা অতিক্রম করেছেন, স্বাভাবিক কারণেই আজ তাঁদের সংখ্যা সীমিত। মিডিয়া এখন অনেক শক্তিশালী, নতুন নতুন প্রজন্মকে কুৎসায় ডুবিয়ে সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে তারা বিস্মরণে পাঠিয়ে দিতে ব্যস্ত। অন্যদিকে এই লড়াই ও আত্মত্যাগই আজও ভবিষ্যতের অফুরন্ত প্রেরণা।

বামফ্রন্টের সরকার : নবদিগন্ত
এই সংগ্রামের তরঙ্গ শীর্ষেই গঠিত হয়েছে বামফ্রন্ট এবং ১৯৭৭ সালে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সরকার গঠন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা  সত্ত্বেও  সব শরিকদের সরকারে মর্যাদার আসন দেয় সিপিআই(এম)। ক্ষমতা নয়, জনস্বার্থ রক্ষাই যে প্রধান এ নীতিই উজ্জ্বলতর হয়। কেন্দ্রে তখন জনতা সরকার যার মধ্যে আরএসএসএর জনসঙ্ঘও মিশে যায়। পরাস্ত কংগ্রেসী স্বৈরতন্ত্র। এরকম অনুকূল অবস্থায় কংগ্রেসকে পরাস্ত করতে জনতা পার্টিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও তারা রাজি না হওয়ায় বামফ্রন্ট এককভাবে লড়াই করে, বিরাট জয় অর্জন করে। বাইরের শত্রুতা ছাড়াও দুই যুক্তফ্রন্ট সরকারের অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার  কারণেও যে বাধা ছিল, সেই বাধা ১৯৭৭-এ ছিল না। কিন্তু দেশের  মূল সংবাদপত্র নতুন মাত্রায় বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কুৎসা অভিযান চালায়। প্রথম দিনেই জ্যোতি বসু ঘোষণা করেন, সরকার জনগণের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতাতেই চলবে, রাইটার্স বিল্ডিং থেকে চলবে না। ৩৪ বছর এই নীতিই অক্ষরে অক্ষরে পালিত হয়। দেশে অন্য কোনও নজির নেই। বিরোধীদের মর্যাদা, সমালোচনার অধিকার, বাক্‌ স্বাধীনতা, আন্দোলন-সংগ্রামের অধিকার, রাজবন্দিদের মুক্তি, বরখাস্ত সরকারি কর্মচারী আন্দোলনের পুনর্বহাল, আইন সংশোধন করে পূর্ণমাত্রায় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার পৌরসভা, পঞ্চা‍‌য়েতের  মাধ্যমে কাজ, সর্বত্র আমলাতান্ত্রিকতার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচিত সংস্থার  মাধ্যমে সরকার পরিচালনা পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এই প্রথম  এবং সারা দেশের ও গণতন্ত্র সম্প্রসারণের দিশারিএক বছরের মধ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়, ১৯৭৮  সালে, সম্পূর্ণ সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ ও অবাধ। নির্বাচিত  হয় গরিব অংশের মানুষই দুর্নীতি ও নৈরাজ্যের আবর্ত  থেকে মুক্ত করা হয় শিক্ষাকে। কংগ্রেসী আমলে সন্ত্রাসে হত্যা করা হয় ৪০ জনের বেশি শিক্ষককে। বহু  শিক্ষক, কর্মচারী, শ্রমিক এলাকাচ্যুত হয়, কাজে যোগদান করতে পারেননি এমন সকলেরই পুনর্বহাল হয়। প্রাথমিক শিক্ষার আওতা থেকে কোনও শিশু বাদ না যায়,  অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সে কাজে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অবৈতনিক শিক্ষাসহ শিক্ষা সংস্কার সর্বত্র শুরু হয়। বেআইনি  নাম উদ্ধার করে গরিব অংশের কৃষক, খেতমজুর, বর্গাদারদের মধ্যে বিলির কাজ ও কৃষকদের  সহায়তা  পায় অগ্রাধিকারআলাপ আ‍‌লোচনায় অনেক বন্ধ ও রুগ্‌ণ কারখানা এবং প্রতিষ্ঠান খোলা  সম্ভব হয়। গ্রামে চিকিৎসার সুযোগ পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা, বিভিন্ন ভাষার  বিকাশ, পার্বত্য উন্নয়ন এমন কোনও ক্ষেত্র বাকি নেই  যেখানে জনমুখী বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়নি। বিকেন্দ্রীকরণের  নীতি ও রূপায়ণ দেশ-বিদেশে প্রশংসিত কেন্দ্র ও তা গ্রহণ করে সংবিধান সংশোধন করে।  রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে তা মাঠে মারা যায় যেমন দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল শাসনে বা  অন্যত্র বিজেপি শাসনে বটেই। কিন্তু বাধা, অসুবিধা, প্রতিবন্ধকতা, জনবিরোধী প্রশাসনিক কাঠামো ও সীমিত ক্ষমতার মধ্যে কাজ বার বার বামফ্রন্ট জনগণকে সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন করেছে,  যাতে তাঁদের প্রত্যাশা এর বাইরে আকাশচুম্বী কিছু না হয়।  বলা হয় ভারতীয় রাষ্ট্রকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রীয়, কিন্তু সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কেন্দ্রীভূত। হাজার সদিচ্ছা থাকলেও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাধা ও সীমাবদ্ধতা কোনও রাজ্য সরকারকে মৌলিক সমস্যা বিষয়েও গুণগত পরিবর্তন করতে দেয় না। রাজ্যগুলিকে রাজস্ব, আর্থিক, আইনগত ও বহু বিষয়ে কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়। এই প্রবণতা বেড়েই চলেছে। মোদী সরকার হিন্দুত্বের রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে গোটা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভাঙনের মুখে এখন নিয়ে এসেছে, সরকারের নামে কার্যত দলীয় কর্তৃত্বের আওতায় নির্বাচন কমিশন থেকে সমস্ত স্বাধীন সাংবিধানিক সংস্থাগুলিকে নিয়ে আসছে, আদালতের ওপরও খবরদারি চলছে। অন্য কোনও সরকার, বিরোধী নির্বাচিত সদস্যদের টিকতেই দেবে না ওরা। রাজ্যের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা এবং রাজ্যগুলির প্রকৃত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে রাজ্যগুলি এবং গোটা দেশকে উন্নতির পথে শক্তিশালী করতে বামফ্রন্ট সরকার দেশজুড়ে এক আন্দোলন তৈরি করেছিল। ভূমিসংস্কার, বিকেন্দ্রীকরণ, গণতন্ত্র প্রসার, জনগণের অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন ইত্যাদি অজস্র ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকার বিরাট সাফল্যই কেন্দ্র রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাসের এই দেশব্যাপী আন্দোলনে জ্যোতি বসু নেতৃত্ব দিয়েছেন

ঐতিহাসিক অবদান
কেরালা ও ত্রিপুরায় বামপন্থীরা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হয়, এমন কোনও কাজ করতে দেয়নি। সাড়ে তিন দশক অবাধ, সুষ্ঠু ও সময়মতো নির্বাচন হয় সব স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায়। কিছু বিচ্ছিন্ন দুর্বলতা গোটা সাফল্য ম্লান করতে পারে না। এই দুর্বলতা বামফ্রন্ট লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেনি। জনগণকে নিয়ে জারি রেখেছে। সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে কোনও ফাঁক থাকতে দেয়নি, দুর্নীতি দমনেও মন্ত্রীসভার নজির আজও দেশে সকলের মুখে মুখে। সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথা তোলার আগেই মাথা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তফসিলি, আদিবাসী, মহিলা নির্যাতন হলে অপরাধীরা যে-ই হোক, কেউই পার পায়নি। ১৯৮০ সালে জনতা সরকারের অবসান, তারপর ৪০ বছরে দেশেও কেন্দ্রে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।
বামফ্রন্টের তিন দশকের সরকার পরিচালনার সময় নয়া-উদারীকরণের সর্বনাশা নীতি চালু করেছিল কংগ্রেস ৯০-র দশকে। হীনবল সঙ্ঘ পরিবার একই সময় প্রচণ্ড হিংসাত্মক দৌরাত্ম্য নিয়ে সাম্প্রদায়িক অভিযান তুঙ্গে তুলেছে। একই সময়ে বিশ্বব্যাপী গণআন্দোলনের বিপর্যয় ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে ভারসাম্যের পরিবর্তনে, বিভেদকামী-বিচ্ছিন্নতাকামী শক্তি এ সময়েই ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়। তার মধ্যেই বিরাট উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে যে রাজস্ব ও আর্থিক সামর্থ্য প্রয়োজন, কেন্দ্রের নীতির কারণে তাতেও ঘাটতি। তবুও জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে একবিন্দু বামফ্রন্ট সরকার সরেনি। গোটা দেশের প্রতিক্রিয়ার শক্তি বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিদেশি শত্রুরও ইন্ধন পেয়েছে বহু ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করেই। বামফ্রন্টকে এতবছর কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু গোটা দেশের প্রতিক্রিয়া, আধুনিক মিডিয়া, সমস্ত রঙের সাম্প্রদায়িক ও বিভাজনের শক্তি, চরম উগ্র-সন্ত্রাসবাদী বামপন্থী নামধারী শক্তি, বিপুল অর্থ সবাই তৃণমূলকে সামনে রেখে জোট বাঁধে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে, ৩৪ বছরের সাফল্যের অবসানে।

ফ্যাসিস্তসুলভ সন্ত্রাসের রাজ
কায়েম হয় একচ্ছত্র ফ্যাসিস্তসুলভ সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রায় ৯ বছর, দিল্লিতে একই ফ্যাসিস্তসুলভ বর্বর সাম্প্রদায়িক রাজত্ব। দেশজুড়ে চলছে অভূতপূর্ব বিভীষিকা। বিপন্ন গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জীবনজীবিকাপ্রতি পদক্ষেপে প্রতি মুহূর্তে তার ভয়ার্ত অভিজ্ঞতা বামফ্রন্ট, বৃহত্তর বামশক্তি প্রচণ্ড সন্ত্রাসের মধ্যেও, রিগিং-ভোটলুট সত্ত্বেও লড়াই থেকে একচুলও সরেনি। নতুন নতুন সাহসী লড়াই ও আত্মত্যাগের নজির সৃষ্টি হয়েছে। দুনিয়াজোড়া আর্থিক মন্দা ও সঙ্কটে পুঁজিবাদ কম্পমান, চরম দক্ষিণপন্থী সামাল দিতে বাড়বাড়ন্ত, মোদী সরকারেরও রেহাই নেই, যতই মিডিয়ায় খই ফোটাক। ঐতিহাসিক বামফ্রন্ট এবং চরম স্বৈরাচারী দেউলিয়া তৃণমূল শাসনের আকাশ-পাতাল বৈপরীত্য আজ দ্রুত মানুষের কাছে উন্মোচিত হচ্ছে। বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তি আবার ঐতিহাসিক নিয়মেই একত্রিত হচ্ছে, কংগ্রেসও মারাত্মকভাবে আজ আক্রান্ত। কংগ্রেসও গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য এগিয়ে আসছে। তৃণমূল-বিজেপি অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধসেই লুকানো রহস্য আজ খসে পড়ছে। বর্বরতার পূজারী এ দুয়ের বিরুদ্ধে গোটা রাজ্যের সবাইএই শিক্ষার উৎস যুক্তফ্রন্ট থেকে বামফ্রন্টবামফ্রন্টের সময় থেকে নতুন পরিস্থিতিতেও সার্বিক ঐক্যের বার্তা।

গণশক্তি, ২১জুন, ২০২০