20201108

সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল নভেম্বর বিপ্লব

 


জ্যোতি
বসু

 

বছর সারা পৃথিবীতে মহান নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও মর্যাদার সঙ্গে আমরা মহান নভেম্বর বিপ্লবকে স্মরণ করবো।

অনেকেই এখন বলে থাকেন যে, ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে যে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল, সেই সোভিয়েতই তো এখন নেই! তবে নভেম্বর বিপ্লব দিবস উদ্যাপন, করার যৌক্তিকতা কোথায়? যারা এসব কথা বলেন, তারা আসলে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্যে‍‌ দিয়ে শ্রমিকশ্রেণি যে সাফল্য অর্জন করেছিল তাকেই খাটো করে দেখাতে চান। কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোঘোষণার মাধ্যমে পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাষ্ট্র বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শকে প্রচার করেন। এই মতবাদের ভিত্তিতে পুথিবীর দেশে দেশে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণি প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে, যা প্যারি কমিউনহিসাবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। যদিও এই চেষ্টা সফল হয়নি। অল্পদিনের মধ্যেই বুর্জোয়াদের হিংস্র আক্রমণের ফলে প্যারি কমিউন’-এর পতন ঘটে। কিন্তু কমিউনার্ড-দের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা, সে সময় ইউরোপের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া জার্মান, হাঙ্গেরিসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিকশ্রেণির অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।

১৯১৭ সালে জার শাসিত রাশিয়ায় কমরেড লেনিনের নেতৃত্বেই প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়, যা নভেম্বর বিপ্লব হিসাবে পরিচিত। মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামে সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শ মার্কসবাদের সফল সার্থক প্রয়োগ হয়েছিল নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে। মার্কস-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশ্তেহার রচনার সময় এবং পরে এই ধারণার কথা বলেছিলেন যে এগিয়ে থাকা পুঁজিবাদী দেশেই আগে শ্রমিক বিপ্লব হবে। মার্কস-এঙ্গেলস যখন একথা বলেন, সে সময় পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। তখন এই ধারণাই সঠিক ছিলো। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় পুঁজিবাদ, তার সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদে প্রবেশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি গোটা পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে লেনিন মার্কসবাদের সৃজনশীল বিকাশ সার্থক প্রয়োগ জারশাসিত রাশিয়ায় ঘটান। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে রাশিয়া অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের এই দুর্বলতম গ্রন্থিতেই শ্রমিকশ্রেণিকে আঘাত হানতে হবে। লেনিনের এই তত্ত্ব সারা পৃথিবীতে বিপ্লবী আন্দোলনে নতুন পথনির্দেশ দিয়েছিল। এজন্য কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঘোষণা করেছিল, লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। এজন্য আমরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অনুসরণ করার কথা বলি।

শ্রমিকশ্রেণির প্রথম রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছিল যে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদের থেকে অনেক উন্নত সমাজব্যবস্থা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা বাসস্থানের মতো মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলিও যে সমাধান করা সম্ভব, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা পৃথিবীর সামনে তার উদাহরণ তুলে ধরে। পুঁজিবাদের চার শতাব্দীর ইতিহাসে যে প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব হয়নি, তা অল্প দিনের মধ্যেই করে দেখায় সমাজতান্ত্রিক শিশুরাষ্ট্র। রাশিয়া ছিল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। কিন্তু মাত্র ১৩ বছরের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম সারির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। যে সামাজিক সাম্য ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সোভিয়েত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রশংসা বিশ্বের বহু মনীষী অকুণ্ঠভাবে করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সোভিয়েত দেশ ভ্রমণের সময় রাশিয়ার চিঠি’-তে শুরুতেই লিখেছিলেন, ‘যা দেখছি, আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনও দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা জাগিয়ে তুলেছে।’’

বিশেষ করে জনশিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নভেম্বর বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই গোটা দেশজুড়ে শিক্ষা বিস্তারের বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। শুধুমাত্র ইউরোপীয় অংশেই নয়, এশিয়ার অংশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পশ্চাৎপদ উপজাতিদেরও শিক্ষার অঙ্গনে টেনে আনা হয়েছিল। জাতিগঠনের প্রশ্নে শিক্ষার যে বিরাট ভূমিকা রয়েছে তা সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রতিষ্ঠিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও এই দিকটি নজর কেড়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমাদের সকল সমস্যার সব চেয়ে বড় রাস্তা হচ্ছে শিক্ষা। এতকাল সমাজের অধিকাংশ লোক শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেভারতবর্ষ তো প্রায় সম্পূর্ণই বঞ্চিত। এখানে সেই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যা নয়, তার সম্পূর্ণতায় তার প্রবণতায়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় নিকর্মা হয়ে না থাকে এজন্যে কী প্রচুর আয়োজন কী বিপুল উদ্যম।’’

মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও সোভিয়েত ইউনিয়নই পথিকৃৎ। নারী পুরুষের জন্য পূর্ণ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির অল্প দিনের মধ্যেই গৃহীত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নই বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যেখানে ১৮ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষকে সর্বজনীন ভোটাধিকার দেওয়া হয়। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বলে অভিহিত গ্রেট ব্রিটেন এই অধিকার দেয় ১৯২৮ সালে।

জন্মলগ্ন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। গৃহযুদ্ধ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, অন্তর্ঘাত প্রভৃতি প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অত্যন্ত পশ্চাৎপদ দেশ থেকে অল্প দিনের মধ্যেই অগ্রসর দেশে পরিণত হয়। দ্রুত এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদের মতো বিধ্বংসী শক্তিকে আটকাতে সক্ষম হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, যা পুঁজিবাদী দেশগুলির পক্ষে সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন মানব সভ্যতাকে রক্ষা করেছিল। কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে কখনই ম্লান করা যাবে না।

৭৪ বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপর্যয় ঘটলো কেন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের পার্টি সম্পর্কে ১৯৯২ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেসে কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কেশীর্ষক একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তাতে প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে। আমি সে কথায় ‍‌রে আসবো।

একথা সকলেরই জানা যে, লেনিন রাশিয়ার বুকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করলেন তা ছিল একটি পশ্চাৎপদ দেশ। ফলে তাঁকে সম্পূর্ণ নতুন পথে চলতে হয়েছিল কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা, দিক-নির্দেশ তাঁর সামনে ছিল না। তিনিই নয়া অর্থনৈতিক নীতি (NEP) চালু করেছিলেন, যে রাষ্ট্র বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যদিও আধিপত্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের।

আমরা কখনই ভাবতে পারিনি যে, একটা দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়ার পর তার আবার পতন হতে পারে এবং আবার সে দেশে পুঁজিবাদ ফিরে আসতে পারে। আমরা কেন, পৃথিবীর অনেক বড় কমিউনিস্ট পার্টিই তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু লেনিন বারে বারে আত্মসন্তুষ্টি পরিহার করার কথা বলেছিলেন। বিশেষ করে চারপাশে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে হুঁশিয়ার করেছিলেন। তিনি আমেরিকান পেশাদারি দক্ষতা থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

রাশিয়ায় পরবর্তীকালে যে মতাদর্শগত চর্চার অভাব ঘটেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সে দেশে গিয়েও আমার নিজের বিষয়ে মনে হয়েছিল। প্রথম যাই ১৯৫৭ সালে। তারপর আরো কয়েকবার গিয়েছি। সাল মনে নেই, একবার সে দেশে গিয়ে ব্ল্যাক সি (কৃষ্ণসাগর)- উপর দিয়ে একটা জাহাজে করে যাচ্ছিলাম। সেই জাহাজটি এক সময়ে হিটলারের জাহাজ ছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত বাহিনী তা কবজা করে। প্রায় ২২০০ যাত্রী সেই জাহাজে ছিল। প্রায় সকলেই ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। জাহাজের মধ্যে খেলছে, সাঁতার কাটছে। কিন্তু দেখলাম কেউই খবরের কাগজ পড়ছে না। অথচ কাগজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ খবর ছাপা হয়েছে। ওদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সংক্রান্ত খবর ছাপা হয়েছে এবং রয়েছে এক রুশ মহাকাশচারীর প্রত্যাবর্তনের খবর। কিন্তু তাতেও ওদের কাগজ পড়ার আগ্রহ নেই। আমি এক দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘ওদের খবরের কাগজ পড়ার আগ্রহ নেই কেন?’’ জবাবে সে বললো, ‘‘ওরা ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। তাই ওদের আগ্রহ নেই। ফিরে এসে কাগজ দেখবে। তাতে শুধু দেখবে ওদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা কিছু বাড়লো কি না।’’ তখন এই বিষয়টা নজরে এসেছিল। সবটা বুঝিনি আজ বুঝি প্রবণতাটা তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল।

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সর্ব‍‌শেষ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় বিজয়ওয়াদায়। সেই কংগ্রেসেই বোঝা গিয়েছিল পার্টি ভাঙতে চলেছে। তখন তো ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে স্তালিনবিরোধী প্রচার পুরোদমে চলছে। এই অবস্থায় আমাদের পার্টি সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে একটি প্রতিনিধিদলকে মস্কো পাঠায়। দলে আমিও ছিলাম। এছাড়াও ছিলেন ভূপেশ গুপ্ত গোবিন্দন নায়ার। সোভিয়েত পার্টির তরফে আলোচনার মধ্যে ছিলেন সুসলভ এবং পনোমারিয়েভ। আমার একটি প্রশ্নে পনোমারিয়েভ চটে গিয়েছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘আপনারা স্তালিনের আমলে লেখা বলশেভিক পার্টির ইতিহাসবইটি বাতিল করে দিলেন কেন? তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তো বই পৃথিবীর সর্বত্র প্রচার করেছিল।’’ জবাবে পনোমারিয়েভ রেগে গিয়ে বললেন, ‘‘ বইতে মার্কসবাদী দর্শন বিষয়ে স্তালিনের একটি লেখা ছিল। স্তালিন দর্শনের ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন। Negation of the negation বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় ত্রুটি ছিল। আমরা তা সং‍‌শোধন করে নতুন বই লিখেছি। এখন তার তর্জমার কাজ চলছে।’’ আমি সুসলভকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘আপনারা স্তালিনের এত সমালোচনা করছেন কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় এই সমালোচনা করেননি কেন?’’ এই প্রশ্নের জবাবে সুসলভ কিন্তু রেগে গেলেন না। তিনি হেসে বললেন, ‘‘এটা বুঝবেন, স্তালিন তো শুধু সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন না বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ছিলেন। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ ছিল না।’’ সেই সময় আলবানিয়ায় সরকার উৎখাতের বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন মদত জোগাচ্ছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আপনারা এটা কেন করছেন? সে দেশে কোন্সরকার থাকবে তা সে দেশের মানুষই ঠিক করবেন।’’ জবাবে সুসলভ বললেন, ‘‘ওরা আমাদের বিরুদ্ধে সাংঘাতিক প্রচার করছে। তাই আমরা একাজ করছি।’’ স্বভাবতই সুসলভের এই জবাব শুনে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। পরে ফিরে এসে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটা রিপোর্ট দিয়েছিলাম।

আগেই বলেছি যে, সোভিয়েতে বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে আমাদের পার্টি ১৯৯২ সালে মাদ্রাজ (চেন্নাই) পার্টি কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই প্রস্তাবে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়। তারমধ্যে একটি হলো, সে দেশে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার বদলে পার্টির এবং বেশিরভাগ সময়ে পার্টি নেতৃত্বের একনায়কত্বে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে পার্টি রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নকে। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে গিয়ে উন্নতমানের ভোগ্যপণ্য তৈরির কাজ অবহেলিত থেকেছে। মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারেনি। এছাড়া মতাদর্শগত চেতনা প্রসারের ঢিলেমি দেখা দিয়েছিল।

আমি এই লেখায় সেই বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না। আমার কথা হলো, এই যাবতীয় অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। একই ভুল আমরা যাতে না করি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সব থেকে বড় কথা, কমিউনিস্টদের অনেক দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়েই এগোতে হবে। কিন্তু এই সঙ্কল্প রাখতে হবে পৃথিবীতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবেই।

নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকীতে সেই লক্ষ্যে কাজ করার শপথ আমাদের নিতে হবে।

 (২০০৭ সালের নভেম্বর মহান নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকী উপলক্ষে গণশক্তিতে জ্যোতি বসুর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল।)

 

20200909

অশোক মিত্র: অনন্য মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস

 



অজয় দাশগুপ্ত

আচমকাই সুযোগ হয়ে গিয়েছিল অশোক মিত্রের সান্নিধ্যে আসার। রাজনৈতিক জীবনের গোড়া থেকেই যাঁর বক্তৃতা ও লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত, তাঁর কাছে নিয়মিত যেতে হবে শুনেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। পয়লা মে সকালে মৃদুলদা(দে) যখন ফোনে জানালেন ওঁর মৃত্যুসংবাদ, তখন একরাশ কথা ভিড় করে এলো। শুন্যতা তো বটেই!

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি থেকে আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ‘গণশক্তি’-র রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় লেখা ওঁর বাড়ি থেকে আনার। টানা প্রায় দু’বছর আলিপুর পার্ক রোডে সোনালী অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি সপ্তাহে দু’বার করে যেতে হতো। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা! প্রথমে টেলিফোন করে ওঁর সময় নিতে হতো, তারপর যথার্থই যথাসময়ে (এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না) পৌঁছে যেতে হতো। প্রথমে উনি টানা বলে যেতেন, যার দ্রুত নোট নিতে হতো। পরের দিন সেটা কম্পোজ করে নিয়ে গেলে তার ওপর উনি কাটাছেড়া করতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘আমি প্রথমবার ভাবনাটা বলি, পরেরবার লিখি।’

গণশক্তির বানান নিয়ে ওঁর প্রশ্ন ছিল। একদিন উনি ডিকটেশন দেওয়ার সময় কোনো লেখায় ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি বলেছিলেন। আমাদের তখন সংসদ বাংলা অভিধান অনুসরণ করা হতো, সোমেনদা(পাল) আমাকে একদিন ওই অভিধান দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে’ অশুদ্ধ প্রয়োগ, ওটা ‘ইতোমধ্যে’ হবে। আমিও তাই সেই অনুসারে ‘ইতোমধ্যে’-ই লিখেছিলাম। উনি লেখাটার কম্পোজ প্রুফ দেখার সময় আমাকে বললেন, ‘তোমরা ইতিমধ্যে-কে ইতোমধ্যে লেখো কেন?’ আমি ‘সংসদ বাংলা অভিধান’-এর কথা বলতে উনি বললেন, ‘তোমাদের প্রুফ কি বাংলা ভাষার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকরা দেখেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইতিমধ্যে’ ব্যবহার করেছেন, সেটাও তাঁরা মানবেন না?’ ওঁর নোট নিতে গিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি তো বটেই, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগ নিয়েও অনেককিছু শিখতে পেরেছিলাম বলে ধন্য হয়েছি। একই শব্দ একই লেখায় দু’রকম প্রয়োগ করা নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে ওঁর সহাস্য মন্তব্য, ‘আমি দুটোই লিখি, একটা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আরেকটা লিখি।’

ওঁর বিশাল লাইব্রেরি কাম ড্রয়িং রুমে বসে জ্ঞানভান্ডারের বহরে নিজেকে কার্যত হারিয়ে ফেলতাম। মাঝেমাঝে টুকরো-টাক্‌রা কথাবার্তা হতো। আমার বাড়ি গড়িয়াতে জেনে বলেছিলেন, ‘ওখানে উজ্জ্বল (চ্যাটার্জি) আছে, খুবই উদ্যমী ছেলে।’

‘আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট’ বলে যিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তিনি কিন্তু ব্যক্তিগত আচারে অত্যন্ত সুভদ্র ছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি অনেকের কাছেই। প্রত্যেক অতিথিকে উনি লিফটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, নগণ্য হলেও আমার ক্ষেত্রে কোনোদিন তার অন্যথা হয়নি। আপাতকঠিন, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পিছনে যে একজন স্নেহশীল পিতার মনন লুকিয়ে আছে, সেটা একটা ঘটনায় টের পেয়েছিলাম। গণশক্তি থেকে ২৩০নং বাসে চেপে শেষ স্টপেজ চিড়িয়াখানায় নেমে হেঁটেই চলে যেতাম আলিপুর পার্ক রোডে। ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে একদিন রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। রাস্তা খোঁড়া হচ্ছিল, চারদিকে ইটের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ছিল। ব্যস্‌, হাত-পা ছড়ে গেলো, রক্ত বের হচ্ছিলো। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমি কোনমতে ধুলে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। বেল টিপতে দু’মিনিট দেরি হয়ে গেছিল, দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছিলাম। ‘আজ একটু দেরি হয়ে গেলো’ বলতে বলতেই উনি আমার হাত লক্ষ্য করে বললেন, ‘কী হয়েছে, ছড়ে গেছে মনে হচ্ছে!’ আমি বললাম, ‘ও কিছু না, পড়ে গিয়ে একটু লেগেছে।’ উনি আমাকে ঘরে বসিয়ে সোজা ভেতরে চলে গেলেন। তারপর একটা ক্রিম(সম্ভবত ‘ভোলিনি’ জাতীয় কিছু একটা হবে) নিয়ে এসে নিজে লাগিয়ে দিতে লাগলেন, হাতে-পায়ে। আমি তো সঙ্কোচে ‘না, না’ করতে লাগলাম। কিন্তু কার্যত ধমকে আমাকে বললেন, ‘তুমি চুপ করে বসো, নিজে নিজে মলম লাগানো যায় না।’ তারপর আমি সেদিন লিখতে পারবো কিনা, অন্যদিন আসবো কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘কিছুই তো হয়নি, আমি পারবো, আপনি বলুন।’ সেদিন লেখা শেষ করে ফেরার সময় উনি মলমের টিউবটা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও। পরে আরেকবার লাগিয়ে নেবে।’ ওঁর এই স্নেহশীল ভূমিকা দেখে আমি রীতিমত অভিভূত হয়েছিলাম সেদিন। 

ওই সময়েই আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ‘গণশক্তি’-র নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। তারিখটা ১৯৯৭সালের ২রা জানুয়ারি। আমি তখন নিয়মিত ওঁর বাড়িতে যাচ্ছি। পরে আমাকে কথায় কথায় কয়েকবার বলেছিলেন, ‘তোমাদের নতুন দপ্তরে আমার যাওয়া হয়নি।’ আমি বলেছিলাম, ‘চলুন না একদিন।’ কিছুদিন বাদে উনি আমাকে একদিন বললেন, ‘তোমাদের দপ্তরের কাছেই যাচ্ছি, এনআরএস আকাদেমি হলে একটা কর্মসূচী আছে।’ আমি ওঁকে সেদিন এনআরএস আকাদেমি হল থেকে নিয়ে এসেছিলাম গণশক্তি দপ্তরে। প্রয়াত কমরেড দীপেন ঘোষ তখন আমাদের সম্পাদক। উনি আমাদের দপ্তরের সম্পাদকীয় বিভাগ দেখে বললেন, ‘আমি নিউইয়র্ক টাইমস্‌-এর দপ্তরেও গেছি, ম্যানহাটনে। ওখানেও তোমাদের মতই ব্যবস্থা, সবাই সবাইকে দেখতে পায়। কোনো ঘেরাটোপ নেই।’ 

ওঁর রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় পড়ার জন্য বহু মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকতেন। গণশক্তি-র রবিবারের প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে সেটাও একটা কারণ ছিল বলে মনে হয়। পরে ওঁর রবিবারের সেই লেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য কর্মসূচীতে যখনই দেখা হয়েছে, ডেকে কথা বলেছেন। আমায় বলতেন, ‘তোমরা সাংবাদিকরা সঙ্গে একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘোরোনা কেন? কোনো ঘটনা ঘটলে তুমি নিজেই তার ছবি তুলে নিতে পারবে, চিত্রসাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।’

অনেকেই মার্কসবাদ ও রবীন্দ্রনাথকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখতে বা দেখাতে চান। অশোক মিত্র’র বিভিন্ন লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির কথা বারেবারে উঠে এসেছে। তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ ‘আপিলা চাপিলা’-য় একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন: ‘‘এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে দুটি আলাদা চরিতার্থবোধ: এক রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমার জন্ম; দুই, আমার চেতনাজুড়ে মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস।’’ যারা এই পরস্পরবিরোধিতাকে উপজীব্য করে থাকেন, অশোক মিত্র যেন তাদের উদ্দেশ্যেই নিজের এবিষয়ে উপলব্ধির কথা লিখেছেন: ‘‘...নিজেকে মার্কসবাদী বলে গর্বিত প্রচার করি, মার্কসীয় বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজের জিজ্ঞাসা-বিবর্তন বিশ্লেষণে নিমগ্ন হই, মার্কসীয় ধারণার প্রেক্ষিতে অর্থশাস্ত্রের গহনে শ্রেণীদ্বন্দ্বের অন্বেষণ করি। অথচ সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার অভিভূত গরিমাবোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় জন্মগ্রহণ করেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি, তাঁর কবিতায় গানে প্রতিনিয়ত অবগাহিত হয়ে অধরার সন্ধান পাই, আমার চেতনা জুড়ে, মার্কসের পাশাপাশি সব সময়ই রবীন্দ্রনাথের আনন্দনিষ্যন্দিত উপস্থিতি।....আমরা হাসি, কাঁদি, গল্পগুজব করি, কেচ্ছা ছড়াই, গানে গুনগুনিয়ে উঠি, কলহে প্রবৃত্ত হই, সব-কিছুরই প্রকাশের পথ বাতলে দেয় রবীন্দ্রনাথ দ্বারা নির্মিত-চর্চিত, রূপমন্ডিত বাংলা ভাষা। ভাষার দার্ঢ্য এবং সেই সঙ্গে বিস্তার না থাকলে চিন্তা এলিয়ে পড়ে, যুক্তির সারণি বেপথুমান হয়, ভাবনাকে সংহত রূপ দিতে আমরা অসমর্থ হই। রবীন্দ্রনাথ-দত্ত ভাষার ভেলায় ভেসেই আমরা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞানের স্তরের পর স্তর অতিক্রম করতে সমর্থ হই। হাটে-মাঠে-ঘাটে যখন মার্কসবাদী হিসেবে নিজের বিশ্বাসের কথা অন্যদের শোনাতে যাই, তখনো তো আমার প্রধান অবলম্বন আমার মাতৃভাষা, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষা, রবীন্দ্রনাথ যা ভূষণে-রতনে আমাদের জন্য রচনা করে দিয়েছেন, অথচ ভূষণরত্নের ভারে প্রসাদগুণ বিমূঢ় হয়নি।...’’

কয়েক বছর আগে ‘আমার মৃত্যুর পর’ নিবন্ধেও তিনি লিখে গেছেন: "...যে-বয়সে পৌঁছেছি, মৃত্যুচিন্তা এড়ানো অসম্ভব, এবং সেজন্যই ইচ্ছাপত্র গোছের কিছু বাসনার কথা ব‍্যক্ত করছি। ধরে নিচ্ছি আমার মৃত্যুকালে তখনো কয়েকজন বন্ধু অবশিষ্ট থাকবেন। উদ্ধত সাহসের সঙ্গে আরো ধরে নিচ্ছি, তাঁরা হয়তো আমার জন্য একটি ক্ষুদ্রায়তন স্মরণসভার আয়োজন করবেন। সেই সভায়, আমার বিনীত অনুরোধ, স্মৃতিচারণ ধাঁচের বক্তৃতাদি একেবারে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান, একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই কিছু গান যেন গাওয়া হয়।..." (নিবন্ধ সংকলন: ‘‘সমাজ, স্মৃতি, সাহিত্য’’)।

*************

‘একুশ শতক’, জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত

20200827

করোনার সংক্রমণ ও আর্থিক অধোগতি রোধ: বামপন্থী বিকল্প পথ

 

বামপন্থী বিকল্প পথ ব্যাখ্যা করছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি

ড. অসীম দাশগুপ্ত

করোনা অতিমারী এবং আর্থিক অধোগতি— এই দুই কঠিন সমস্যার মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি। একই সঙ্গে, আমরা লক্ষ্য করছি, করোনা রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে সামগ্রিক নীতি কি হওয়া উচিত— স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদীতে— তার ওপর সংক্ষেপে এই আলোচনা। 

আর্থিক অধোগতি 

দেশের আর্থিক অধোগতি করোনার আক্রমণের আগেই শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল তথাকথিত আর্থিক উদারনীতি, যে নীতি কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির কারণেই, বারংবার দেশের অর্থনীতিকে ছেড়ে দিতে চেয়েছে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার ওপরে এবং খর্ব করতে চেয়েছে সরকারের সামাজিক কল্যাণকর ভূমিকা। এই নীতি অনুসরণ করেই, ভুল পথে গিয়ে, প্রস্তুতিহীন ভাবে বিমুদ্রাকরণ ঘোষণা করা হয়, এবং তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা— সর্বক্ষেত্রেই।

কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতি অর্থবর্ষে তিন মাস ধরে ধরে যে তথ্যাবলী প্রকাশিত হয়, তার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, গত অর্থবর্ষের (২০১৯-২০) প্রতি তিন মাসেই দেশের মোট উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে এবং সর্বশেষ ত্রৈমাসিকে এই বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে হয় ৫ শতাংশ, যা বিগত ছ’বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অধোগতির অঙ্গ হিসাবে উৎপাদনের পরিমাণও হ্রাস পায়— শিল্পের ক্ষেত্রে, কৃষিতে এবং পরিষেবার (যথা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা থেকে ঋণ প্রদান ইত্যাদি) ক্ষেত্রেও। উৎপাদন ও পরিষেবার এই সামগ্রিক অধোগতির কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ, এবং ফলে হ্রাস পায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এই ক্রয়ক্ষমতার হ্রাসই আর্থিক সঙ্কটের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রকাশিত রিপোর্টে (২০১৯-২০)। এর মুখে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, পুনরায় তাদের শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, সাধারণ মানুষের এই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষা করে নজর দেয় ধনী শিল্পপতিদের সুবিধা দিতে কর্পোরেট করের হার ইত্যাদি লাঘব করতে, যাতে শিল্পপতিরা উৎসাহিত হয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ, যেখানে মূল সমস্যা ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে বাজারে মোট চাহিদারই অভাব, সেই চাহিদার বৃদ্ধির পথে না গিয়ে, কেবল জোগান বৃদ্ধির পথে গিয়ে সমস্যা সমাধানের উলটো দিকেই যাওয়া হয়। ফলে, সামগ্রিক আর্থিক অধোগতি রোধ করাও সম্ভব হয় না। 

করোনা অতিমারীর আঘাত 

এই আর্থিক অধোগতির মধ্যেই করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত অর্থবর্ষের শেষের দিকে। চীন দেশের উহান প্রদেশে এই রোগ শুরু হলেও (এবং চীন এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সফল হলেও) ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সরকার বিষয়টিকে শুরু থেকেই গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয় এবং করোনা অতিমারীর আকার ধারণ করে গোটা বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে করোনা আক্রান্ত এখন ২.৩৩ কোটি অতিক্রম করেছে। আক্রান্তের নিরিখে শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা, তারপরে ব্রাজিল, এবং তৃতীয় স্থানে ভারত (৩০লক্ষ ছাড়িয়েছে)। কিন্তু এর মধ্যে উদ্বেগের বিষয় এই যে, সর্বাপেক্ষা বেশি হারে আক্রান্তদের সংখ্যা এখন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে ভারতেই। 

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দেশে এবং এরাজ্যে উপলব্ধি করা হয়েছে যে, যত দিন না পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে, ততদিন নিবারণমূলক পদক্ষেপের ওপরই জোর দিতে হবে— দূরত্ববিধি রক্ষা, মুখের বন্ধনী ব্যবহার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইত্যাদির ওপর। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা আরও ব্যাপক ও দ্রুত করা এবং তার সঙ্গে নিভৃতবাস এবং হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থাকেও কার্যকরী ভাবে সমন্বিত করা। এই পদক্ষেপগুলির অঙ্গ হিসাবে জোর দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে কিছুদিন এবং কিছু এলাকা নির্দিষ্ট করে ‘লকডাউন’ প্রক্রিয়া লাগু করার ওপর। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই ‘লকডাউন’ এর দিন ইত্যাদির সিদ্ধান্ত একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত ভাবে নেওয়া হয়নি এবং স্থানীয় চাপ ইত্যাদির সঙ্গে আপস করা হয়েছে, যার একটি উদাহরণ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত। 

কিন্তু, উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই ‘লকডাউন’গুলির কারণে প্রতিটি রাজ্যেই উৎপাদন এবং পরিষেবার ওপর বাড়তি আঘাত এসে পড়েছে, বিশেষ করে দেশের বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলির ওপর যেখানে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ তাঁদের কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের জন্য নির্ভরশীল। এর ফলে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবর্ষে (২০২০-২১) আমাদের দেশের মোট উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিবর্তে হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ সংকোচন (-৪%) এবং কাজ হারাতে পারেন প্রায় ১৪ কোটি মানুষ। এতে সামগ্রিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পুনরায় দেশের সেই নিচের ৮০ শতাংশ মানুষজনই। 

কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রশ্ন 

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্থির করেছে যে, দরিদ্র মানুষদের সরাসরি সহায়তা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূলত উদ্যোগীদের ঋণ প্রদান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপরেই জোর দেওয়া। তার মাধ্যমেই উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটলে শ্রমজীবী মানুষজনও উপকৃত হবেন। লক্ষণীয় যে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে আরও বিস্তারিত ভাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, ঘোষণা করেছেন তার প্রায় ৯০ শতাংশই হলো ঋণ যা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রদান করা হবে শিল্পোদ্যোগীদের। এমন কি অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী যে ১ লক্ষ কোটি টাকা কৃষির ক্ষেত্রে বরাদ্দ করার কথা বলেছেন, তা ঐ ২০ লক্ষ কোটি টাকারই অংশ এবং যা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন কৃষকদের প্রদান করা হবে বিপণন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যা উপেক্ষিত থাকছে, তা হলো, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষমতা, যার সমাধান না হলে শুধুমাত্র জোগান বৃদ্ধি করলে উৎপাদিত পণ্য তার বাজার পাবে না। 

এ ছাড়া, উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই আর্থিক অধোগতির সময়ই, সংসদে কোনও আলোচনা না করেই নির্বিচারে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার যার মধ্যে রয়েছে দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিও। এ ছাড়া, আঘাত করা হয়েছে শ্রমিকদের কল্যাণের শ্রমআইনগুলিও। এই পদক্ষেপগুলির জন্য পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যাপক অংশের শ্রমজীবী মানুষ। 

বামপন্থী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি 

এই ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধিকেই মূল লক্ষ্য হিসাবে স্থির রাখা হয়েছে বামপন্থী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই কার্যকরী দিক হলো কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে নিচের ৮০ শতাংশ পরিবারের হাতে পরিবারপিছু মাসে ৭,৫০০ টাকা সরাসরি প্রদান করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া, বিনামূল্যে রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া, এবং করোনা প্রতিরোধে নিবারণমূলক এবং নিরাময়মূলক পদক্ষেপগুলির জন্য অতিরিক্ত অর্থপ্রদান করা এবং সাংগঠনিক পদক্ষেপগুলিও গ্রহণ করা। 

এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে তাই স্বল্পমেয়াদি (আগামী ছ’মাসের জন্য) পদক্ষেপগুলি হলো— (১) দেশের নিচের ৮০ শতাংশ পরিবারের প্রত্যেকটি পরিবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাসে ৭,৫০০ টাকা জমা দেওয়া। এর জন্য কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ করতে হবে ৯.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা। তারপরে (২) নিচের এই ৮০ শতাংশ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ভরতুকি দিয়ে বিনামূল্যে ৬ মাসের জন্য মাসে ১০ কেজি করে খাদ্যশস্য (চাল অথবা গম) রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া, যার জন্য প্রয়োজন হবে ৬ কোটি ২৪ লক্ষ টন খাদ্যশস্য (যার থেকে অনেক বেশি খাদ্যশস্য, প্রায় ৭ কোটি ৭০ লক্ষ টন, বর্তমানে মজুত আছে ভারতের খাদ্যনিগমের গুদামগুলিতে)। আর্থিক দিক থেকে এই পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজন হবে কেন্দ্রীয় বাজেটে অতিরিক্ত ১.১৭ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা। এ ছাড়া, (৩) করোনার ক্ষেত্রে নিবারণ ও নিরাময়মূলক পদক্ষেপগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে বর্তমান বছরে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বরাদ্দকে (৬৭ হাজার কোটি টাকা) দ্বিগুণ করে উন্নীত করতে হবে ১.৩৪ লক্ষ কোটি টাকাতে। অর্থাৎ, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের জন্য বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে অতিরিক্ত মোট ১১.১৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা হবে সমগ্র কেন্দ্রীয় বাজেটের মাত্র ৩.৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদিতে এই বাড়তি অর্থ জোগাড় করতে হবে ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমেই, এবং এর জন্য উদারনীতির চাপানো আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট পরিচালনা আইনকে কিছুটা অতিক্রম করতেই হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই পদক্ষেপগুলির জন্য সাধারণ মানুষের আয়বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হবে, তা বর্তমানের এই চাহিদা-ঘাটতির সময়ে মঙ্গলজনক হয়ে উৎপাদনকে উৎসাহিত করে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যকেই রক্ষা করবে, এবং এর জন্য কোনও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি হবে না। ফলে, উৎপাদনে অধোগতিকে রুখে দিয়ে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি সঞ্চারই হবে। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী যে ১ লক্ষ কোটি টাকা কৃষির ক্ষেত্রে বরাদ্দ করার কথা বলেছেনতা ঐ ২০ লক্ষ কোটি টাকারই অংশ এবং যা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন কৃষকদের প্রদান করা হবে বিপণন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যা উপেক্ষিত থাকছেতা হলোসাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষমতাযার সমাধান না হলে শুধুমাত্র জোগান বৃদ্ধি করলে উৎপাদিত পণ্য তার বাজার পাবে না।

স্বল্পমেয়াদিতে যতদিন না পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং গণব্যবহার শুরু হচ্ছে, ততদিন মূল জোর থাকবে করোনার নিবারণমূলক চিকিৎসায়, এবং তার সঙ্গে নিরাময়মূলক চিকিৎসার সমন্বয়ের ওপর। এই নিবারণমূলক চিকিৎসার ক্ষেত্রে, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘লকডাউনের’ পরিবর্তে অনেক জরুরি হবে গ্রামে এবং শহরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। এই কাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে চিকিৎসকের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা যাদের অধিকাংশকেই এরাজ্যে নিয়োগ করা হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারেরই আমলে। এঁরাই মানুষের বাড়িতে গিয়ে বোঝাবেন কি কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে তাঁদের স্বাস্থ্য নিরাপদ থাকবে তাঁদের নিজেদের হাতেই। এই ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগী ভূমিকা পালন করবে বাম ও প্রগতিশীল গণসংগঠনগুলি। এই বিষয়ে এরাজ্যে ইতিমধ্যেই এগিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানমঞ্চ, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি এবং ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি। এরপর, এই নিবারণমূলক পদক্ষেপগুলির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হবে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে গ্রামাঞ্চলে ব্লক, মহকুমা এবং জেলাস্তরে হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা, রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত করা এবং রোগ নিরাময়ের দিকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া। শহরাঞ্চলেও একই ধরনের কাজ করতে হবে প্রতি ওয়ার্ডকে ভিত্তি করে পৌর হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোকে উন্নয়নের মাধ্যমে। করোনার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের এই পদক্ষেপগুলির জন্যই এই খাতে কেন্দ্রীয় বাজেটের অর্থ দ্বিগুণ করার কথা ইতিমধ্যেই উল্লিখিত হয়েছে। 

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ 

দীর্ঘমেয়াদি স্তরটি চিহ্নিত হবে করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং তার গণব্যবহারের স্তর শুরু হওয়ার পর থেকেই। এই লক্ষ্যে এখনই প্রস্তুতির প্রয়োজন, যাতে কেন্দ্রীয় বাজেটে উপযুক্ত ভরতুকি প্রদানের জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দ থাকে, এবং রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় থাকে যাতে এই বিষয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে গণটিকার ব্যবস্থা সম্ভব হয়, এবং তার উপকার সমস্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও স্বল্পমেয়াদি স্তরের তিনটি পদক্ষেপকেই বেশ কিছুদিনই চালু রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের স্বার্থে শুধু করোনার আক্রমণের পূর্ণাঙ্গ মোকাবিলা সম্ভব হবে তাই নয়, আর্থিক প্রগতির চাকাটিও নিয়মিত ঘুরতে শুরু করবে যাতে সাধারণ মানুষের আয় এবং কর্মসংস্থান ধারাবাহিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। দেশের মোট উৎপাদন ও আয়বৃদ্ধি হতে থাকলে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পায়, এবং এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলির আয়ও বৃদ্ধি পাবে, যার থেকে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরও বর্ধিত ব্যয়ও বহন করা সম্ভব হবে। 

সর্বশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, আর্থিক প্রগতি এবং করোনাকে প্রতিরোধ করার এই প্রক্রিয়া থেকে সর্বাপেক্ষা উপকৃত হতে পারেন আমাদের দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষজনই। তাই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলির ক্ষেত্রে, দাবি আদায় এবং পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত এবং ধারাবাহিক আন্দোলন— গ্রামে এবং শহরে। 

গণশক্তি, ২৭ আগস্ট, ২০২০

 


 

প্যান্ডেমিক-পিকে-আঁখি এবং প্রত্যাঘাত

সুদীপ্ত বসু

শুধু ধূপগুড়িতেই গঙ্গাধর রায় সহ মোট দশজন কৃষক এখনও পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়েছেন। পাটের চাষ প্রায় বন্ধ বিস্তীর্ণ এলাকায়। ফসলের দাম নেই, মহাজনী ঋণে জর্জরিত গরিব, প্রান্তিক কৃষকরা। আবার এই ধূপগুড়িতেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে প্রথম গোরক্ষার নামে গুজব ছড়িয়ে দুই কিশোরকে পিটিয়ে খুন করার প্রথম ঘটনা ডুডুয়ার তীরে বারহালিয়া গ্রামে। 

আজকের বাংলার রাজনীতির ‘সাজানো সমীকরণের’ আশ্চর্য ক্যানভাস হয়ে উঠতে পারে উত্তরবঙ্গের এই কৃষি জনপদ। 

গঙ্গাধর রায়ের মাত্র তিন বিঘা জমি ছিল, অন্যের জমিতে লিজেও চাষ করতেন। তিনটি মেয়ে। ব্যাঙ্ক ও মহাজনী ঋণের চাপে শেষপর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ, আত্মঘাতী হন। জমিও আপাতত বন্ধক রয়েছে মহাজনী কারবারিদের হাতে। ধূপগুড়ি থেকে গোটা উত্তরবঙ্গে আলু যায়, সেখানেই আলু চাষি আত্মঘাতী হচ্ছেন। শুধু এই এলাকা থেকেই তিন হাজারের বেশি কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়ে বাইরে কাজের খোঁজে। 

দারিদ্র্যের সেই উঠোনে বিহার থেকে আসা পিকে’র বাহিনী হাজির হয়েছিল। গঙ্গাধর রায়ের দাদা চিন্তামোহন রায়। গাদং এলাকায় সিপিআই(এম)’র সংগঠক। দু’বছর আগে বাবাকে হারানো তিন কন্যার অবাক চাহনি। চিন্তামোহন রায়ের পুত্র জয়ন্ত রায়। বাংলায় এমএ। ছয় বছর আগে প্রাথমিকে টেটে উত্তীর্ণ, আজও নিয়োগ হয়নি।

কর্পোরেট সংস্থা পিকে বাহিনীর মুখের ওপর জবাব শুনিয়েছিল জয়ন্ত,‘আমাদের পরিবারকে আগে জেনে আসুন, তারপর বাবাকে কিনতে আসবেন, আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু বিক্রি হই না’। 

প্রত্যাখ্যানের পর্ব পেরিয়ে এবার প্রত্যাঘাত। ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরাই পালটা তাড়া করেছে। প্রত্যাঘাতেই লুকিয়ে আছে আগামীর অনেক সম্ভাবনার রসদ।

 

‘আমাদের মাথা বিক্রির জন্য নয়’ 

রাজনীতিতে সময় বরাবরই এক্স ফ্যাক্টর। 

কোভিড আবহ। চলতি মাসেই রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লক্ষে পৌঁছাতে চলেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র বেআব্রু হচ্ছে প্রতিদিন, লকডাউনের দিন ঘোষণা করতেও কার্যত নাজেহাল সরকার। রাজ্যের মত দেশেও বাড়ছে করোনা দাপট। দেড়শো দিন পেরিয়ে গেছে, দেশে ৫৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্য, প্রধানমন্ত্রী ময়ূরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন! 

ঠিক সেই সময়তেই এরাজ্যে কেনাবেচা করতে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা শুরু করেছে মমতা ব্যানার্জির হয়ে ভাড়া খাটা প্রশান্ত কিশোরের বাহিনী। 

২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গায়ের জোরে, অস্ত্রের মুখে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় মাইলের পর মাইল বিরোধী শূন্য। বেলাগাম দুর্নীতির উৎসমুখ। আমফান পরবর্তী ঘটনাবলি স্পষ্ট করেছে বিনা ভোটে জেতার উগ্র বাসনা কেন। গরিব, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সামান্য ত্রিপল পেতেও টাকা দিতে হয়েছে। ক্ষোভের বৃত্ত বাড়ছে, জমি হারাচ্ছে তৃণমূল। বাজার করতে বেরোচ্ছে প্রশান্ত কিশোর অ্যান্ড কোম্পানি। 

খোদ হরিরামপুরের বিধায়কের বাড়ি পৌঁছেছে সেই ভাড়াটে বাহিনী। ঘৃণাভরে তা উড়িয়েছেন সিপিআই(এম) বিধায়ক রফিকুল ইসলাম। ঘরের দোর থেকেই বিদায় করেছেন পিকে বাহিনীকে। 

এবাংলার রাজনীতিতে এই সংস্কৃতির আমদানি হলো মমতা ব্যানার্জির হাত ধরেই। ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা মামলা রুজু করে দলবদলে চাপ দেওয়ার ঘটনা ২০১১ সাল থেকেই চলছিল। কিন্তু কোটি কোটি টাকায় ভাড়া করা একটা কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে বাংলার মানুষকে ‘কিনতে ’ চাওয়ার স্পর্ধা এর আগে কেউ দেখায়নি। ‘দিদিকে বলো’ থেকে ‘বাংলার গর্ব মমতা’- কর্পোরেট প্রচার মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই এবার বাঁকা আঙুলে ঘি তোলার চেষ্টা— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন উদ্বেগজনক ছবি।  

ধূপগুড়ির সিপিআই(এম)’র প্রাক্তন বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়ের উঠোনে দাঁড়িয়েও দরদাম করেছেন প্রশান্ত কিশোরের সংস্থার বিহারের বাসিন্দা। 

—শুনুন তৃণমূলকে জেতানোর দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের বস, এখন বেকায়দায়। চারিদিকে দুর্নীতি, আপনি তৃণমূলে যোগ দিন,আপনাদের মতো সৎ লোকেদের প্রয়োজন তৃণমূলে। টাকা পয়সার অভাব হবে না, জেলায় ভালো পদ পাওয়া যাবে।

ছাত্র আন্দোলন থেকে জমির আন্দোলনে পরশ মাখা প্রৌঢ়ের পালটা জবাব ছিল,‘ কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল সারাজীবন, কোনোদিন শুনিনি ভোটের জন্য কোনও দলকে একটা কর্পোরেট কোম্পানিকে ভাড়া করতে হয়। এসব এরাজ্যের সংস্কৃতি নয়, আর এই যে বলছেন তৃণমূলে সব অসৎ লোক, এটা ভুল ধারণা। তৃণমূলের মাথাই অসৎ তাই কর্মীরাও সেই পথে’। 

কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের শ্লাঘা বোধ হবে এমন কথোপকথনে স্বাভাবিক। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন সিপিআই(এম)’কে কিনতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে হচ্ছে? আবার করোনা পরিস্থিতিতে রাজ্যও দেশের সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে, মানুষের দাবিতে প্রতিবাদ আন্দোলনে নামলে সিপিআই(এম)’কেই হুঁশিয়ারি দিতে হচ্ছে নবান্ন থেকে?

 

বাড়ির সামনে বসে মাছের জাল বুনছেন প্রাক্তন সিপিআই(এম) বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়


‘করোনার ব্যর্থতা শেষে এখন দুর্নীতি’ 

গত পাঁচ মাস রাজ্যজুড়ে কোভিড পরিস্থিতিতে একের পর এক মর্মান্তিক ছবি সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য দপ্তর পাঁচ মাসে ঠিক কী কাজ করেছে তা নিয়ে রাজ্যবাসীর স্বাভাবিকভাবেই এখন কোনও আগ্রহ নেই। লকডাউন মানে যে রাস্তা লাল ইট দিয়ে সাদা গোল করা নয়, তা এতদিনে উনিও হয়তো টের পেয়েছেন। 

মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক তো ছাড়, খাস বিহারও এখন দৈনিক করোনা নমুনা পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজ্যে গোষ্ঠী সংক্রমণের আবহে অ্যাগ্রেসিভ টেস্টিং’র জায়গায় দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ ভাবে কমে যাওয়া করোনা পর্বে রীতিমতো উদ্বেগজনক বলেই মনে করা হচ্ছে। কোভিড পজিটিভ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার পেরোতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের যে জেলায় করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেই জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিকদের স্রেফ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। ‘আলিপুরদুয়ার মডেল’ নয়, সরকার বরং নির্মল মাজি-শান্তনু সেন’দের প্রেসক্রিপশনেই আস্থা রাখছে। যার অনিবার্য পরিণাম, সংক্রমণের গতি বেপরোয়া, মৃত্যুর স্রোতকে আটকাতে না পারার ব্যর্থতা সামনে আসছে প্রতিদিন। 

সংক্রমণের এই পর্বে রাজনীতি করা যাবে না বলে দাবি করে প্রতিদিন স্রেফ দলীয় রাজনীতি করে যাচ্ছে সরকার। সংক্রমণের শঙ্কা উপেক্ষা করে দলীয় বাহিনী ত্রাণ, ক্ষতিপূরণে টাকা চুরি করে যাচ্ছে, প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা পথে নামলে ‘করোনায় রাজনীতি ’ না করার হুশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তথ্য বলছে লকডাউন শুরু প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তখই করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩১, ১২৫১জন নজরদারিতে, ২৯জনের লালরসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আর সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী মালদহের সভায় দাঁড়িয়ে বলছে, করোনা করোনা নিয়ে মাথা ঘামানো হচ্ছে, ওসবে প্যানিক করবেন না’। উলটে আবার নেতাজী ইন্ডোরে সভা করে ক্লাবগুলিতে টাকা বিলি করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সরকার কেনাবেচায় ব্যস্ত ছিল অমিত শাহ, তাই জানুয়ারি স্পষ্ট ইঙ্গিত পেলেও মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নষ্ট করা হয়েছিল। 

আর এখন আনলক পর্বে সামনে এসেছে মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিইি-ভেন্টিলেটর- কেনা নিয়েও সরকারের অন্দরেই এখন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খবর। কোভিড সরঞ্জাম নিয়েও দুর্নীতি! আমফানের ক্ষতিপূরণ নিয়েই দুর্নীতি! মুখ্যমন্ত্রীর সাফাইয়ের মর্মার্থ— পিএম কেয়ার ফান্ডে দুর্নীতি হতে পারলে এরাজ্যে সামান্য মাস্ক, ভেন্টিলেটর নিয়ে প্রশ্ন কেন? 

‘বাইনারি’ ঠিক হচ্ছে কীভাবে, কোন খাতে বারেবারে তা স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। 


‘শীতঘুম শেষে বোঝাপড়ার সমন’ 

এর মাঝেই নতুন মোড়। আনলক পর্বে এসে দীর্ঘ শীতঘুম কাটিয়ে ফের নারদ ঘুষকাণ্ডে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের সমন পাঠানো হচ্ছে, সম্পত্তির তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এফআইআর রুজুর পরে চার বছর কেটে গেছে। তারপরেও এখনও সমনের পালা চলছে। কেউ কেউ খুশি, ‘এই তো এবার দুর্নীতিগ্রস্তরা ধরা পড়বে’। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তির আকাঙ্ক্ষা ভুল কিছু নয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থা দৃঢ়তার সঙ্গে তদন্ত করে হাত পেতে ঘুষ নেওয়া মন্ত্রী, সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, সেই ধারণা চরম বিভ্রান্তিকর। 

কেন? ২০১৪ সালে সারদা-রোজভ্যালি সহ চিট ফান্ডকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। ছয় বছর পরেও চার্জশিট জমা দেওয়া হয়নি। এখন বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তদন্ত চলছে। 

তবে এর মাঝেই এবার জবাব দিতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই। গত ছয় বছর ধরে চিট ফান্ডকাণ্ডে অভিযুক্তদের জেলে ঢোকানোর গল্প পশ্চিমবঙ্গে এসে বার পাঁচেক শুনিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

অথচ সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের (সিভিসি) রিপোর্ট বলছে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা দেশে একাধিক দুর্নীতির মামলায়( ব্যাঙ্ক, এমনকি সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি) জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আধিকারিক সহ ১১০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সম্মতিটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ, জন-অভিযোগ মন্ত্রক। এই মন্ত্রক রয়েছে মোদীর হাতেই। 

২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র আবেদন বকেয়া রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসেই সিবিআই’র তরফে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ ও একজন মন্ত্রীর জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আবেদন জানানো হয়। সেই  আবেদন ১৫ মাস ধরে ফেলে রেখেছে মোদী সরকার। এমনকি মমতা ব্যানার্জির ছবি দুর্নীতিকাণ্ডের আইনি প্রক্রিয়ার আবেদনও ফেলে রাখা হয়েছে। 

বিশ্বাস করবেন এই নতুন ‘সমন পর্ব’? 


সোশ্যাল মিডিয়া শাসকেরই মিডিয়া’ 

‘নয়া ভারতে মোদীর প্রতারক ভাবমূর্তি’— এই শীর্ষক সিপিআই(এম)র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ফেসবুক লাইভ। সেই ভার্চুয়াল বক্তৃতার শেয়ার করার মহারাষ্ট্রের সিপিআই(এম) নেত্রী শুভা সামিমের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তিনদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। এই বক্তৃতা নাকি ফেসবুকে সামাজিক মাপকাঠির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

যদিও তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা টি রাজা সিং’র ঘৃণ্য বিষাক্ত মন্তব্য— মুসলিমদের বিশ্বাসঘাতক, রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি করে মারা, দিল্লির দাঙ্গায় কপিল মিশ্রের উগ্র পোস্ট— সব কিছুই অনুমোদন দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ‘ব্যবসা ও শাসক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কে ক্ষতি হবে’ এই অজুহাতে! অভিযোগের তীর ফেসবুকের  ভারত, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পাবলিক পলিসি ডিরেক্টর আঁখি দাস আবার রাজ্যের প্রাক্তন কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ। ২০১১ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ বর্ধমান কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার সামলেছেন আঁখি দাস নিজেই। কথিত আছে, তাঁর প্রভাবেই রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় মন্ত্রীসভায় স্থান পান। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তাঁর স্বামী দিল্লির উচ্চ পদস্থ আমলা( আরএসএস’র কট্টর সমর্থক) সৌম্য চট্টোপাধ্যায় এবং আঁখি দাস ওই কেন্দ্রের নির্বাচনী প্রচারের সময় ছিলেন বর্ধমানেই। এমনকি খোদ তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে কোভিডের জন্য ‘মুসলিমদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করা উচিত’র মতো সূক্ষ বিষাক্ত প্রচারও শেয়ার করতে দেখা গেছে। তাঁর দিদিও পরিচিত মুখ, বিজেপি’র। 

বিজেপি-আরএসএস’র সখ্যতা কখনও তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আঁখি দাসের পথে বাধা হয়নি। 

২০১১ ভোটের সময় যেভাবে তৃণমূলের প্রচার ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছিল, যেভাবে প্রচারের সুর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাতে দলেরই বিধায়ক, মন্ত্রীর এই পুত্রবধূর ‘ভূমিকা’ গুরুত্বপূর্ণ। 

সীতারাম ইয়েচুরির বক্তৃতার লিঙ্ক শেয়ার অপরাধ, অথচ কপিল মিশ্রদের বক্তৃতা ফেসবুকে ভাইরাল করতে সময় লাগে না। খোদ ফেসবুক প্রধান নিজেই লিখেছেন মমতার প্রচারের ৩৮ ভিডিও ভাইরালের রহস্য! 

আদৌ রহস্য থাকল কিছু ? সোশ্যাল মিডিয়া আসলেই ‘শাসকেরই মিডিয়া’!


‘দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে’ 

মহামারীকে ঢাল করে যেভাবে জনগণের রুটি-রুজির ওপরে আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে, যেভাবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ কর্পোরেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তার প্রতিবাদে গোটা দেশজুড়ে এই অস্থির সময়তেই সপ্তাহ ব্যাপী সিপিআই(এম)’র প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। ১৬টি দাবি। স্পষ্ট বিকল্প— আয়কর দেয় না এমন পরিবারগুলিকে আগামী ছয় মাস নগদ ৭৫০০ টাকা করে দিতে হবে, বর্ধিত মজুরি সহ রেগায় ২০০দিনের কাজ। 

আবারো বলতে হচ্ছে ‘সময়’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুত্বের উগ্র মুখ মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল ফিরে এসেছেন কলকাতায়। নড়বড়ে অধিকারী পরিবার, নারদকাণ্ডের সমন পৌঁছেছে তাঁর ঠিকানাতেও। ‘পত্র-সংঘাতের’ মাঝেই রাজভবনে ‘আড্ডা’ দিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রীও।

বিচ্ছিন্ন সব ছবি? একেবারেই নয়। 

পরিকল্পিত মেরুকরণের রঙিন চিত্রনাট্য প্রস্তুত। শাসকের মরজি মতো মিডিয়ায় সাজানো হচ্ছে বাইনারি- ‘হয় তুমি তৃণমূল নয় তুমি বিজেপি’। 

আপনাকে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে দুই সরকার। 

উত্তর অভিন্ন— আমাদেরই সামনে আনতে হবে বিকল্প ভাষ্য। একইসঙ্গে প্রত্যাঘাত, দ্রুত এবং সরাসরি। মনে রাখতে হবে পিকে’র বাহিনী কাদা মাখা কৃষকদের তাড়া খেয়েই কিন্তু গ্রাম থেকে পালাতে বাধ্য হয়।

গণশক্তি, ২৫ আগস্ট, ২০২০