20201108

সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিল নভেম্বর বিপ্লব

 


জ্যোতি
বসু

 

বছর সারা পৃথিবীতে মহান নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে। আমাদের দেশেও মর্যাদার সঙ্গে আমরা মহান নভেম্বর বিপ্লবকে স্মরণ করবো।

অনেকেই এখন বলে থাকেন যে, ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে যে বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত হয়েছিল, সেই সোভিয়েতই তো এখন নেই! তবে নভেম্বর বিপ্লব দিবস উদ্যাপন, করার যৌক্তিকতা কোথায়? যারা এসব কথা বলেন, তারা আসলে নভেম্বর বিপ্লবের মধ্যে‍‌ দিয়ে শ্রমিকশ্রেণি যে সাফল্য অর্জন করেছিল তাকেই খাটো করে দেখাতে চান। কার্ল মার্কস ফ্রেডরিক এঙ্গেলস ১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোঘোষণার মাধ্যমে পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণির নিজস্ব রাষ্ট্র বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মতাদর্শকে প্রচার করেন। এই মতবাদের ভিত্তিতে পুথিবীর দেশে দেশে, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলিতে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। ১৮৭১ সালে ফ্রান্সের প্যারিস শহরে সেখানকার শ্রমিকশ্রেণি প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করে, যা প্যারি কমিউনহিসাবে ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। যদিও এই চেষ্টা সফল হয়নি। অল্পদিনের মধ্যেই বুর্জোয়াদের হিংস্র আক্রমণের ফলে প্যারি কমিউন’-এর পতন ঘটে। কিন্তু কমিউনার্ড-দের বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা, সে সময় ইউরোপের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। এছাড়া জার্মান, হাঙ্গেরিসহ কয়েকটি দেশে শ্রমিকশ্রেণির অভ্যুত্থানের চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল।

১৯১৭ সালে জার শাসিত রাশিয়ায় কমরেড লেনিনের নেতৃত্বেই প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত হয়, যা নভেম্বর বিপ্লব হিসাবে পরিচিত। মানুষের শোষণ মুক্তির সংগ্রামে সর্বশ্রেষ্ঠ মতাদর্শ মার্কসবাদের সফল সার্থক প্রয়োগ হয়েছিল নভেম্বর বিপ্লবের মাধ্যমে। মার্কস-এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশ্তেহার রচনার সময় এবং পরে এই ধারণার কথা বলেছিলেন যে এগিয়ে থাকা পুঁজিবাদী দেশেই আগে শ্রমিক বিপ্লব হবে। মার্কস-এঙ্গেলস যখন একথা বলেন, সে সময় পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। তখন এই ধারণাই সঠিক ছিলো। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে এবং বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় পুঁজিবাদ, তার সর্বোচ্চ স্তর সাম্রাজ্যবাদে প্রবেশ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলি গোটা পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে লেনিন মার্কসবাদের সৃজনশীল বিকাশ সার্থক প্রয়োগ জারশাসিত রাশিয়ায় ঘটান। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের ফলে রাশিয়া অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের এই দুর্বলতম গ্রন্থিতেই শ্রমিকশ্রেণিকে আঘাত হানতে হবে। লেনিনের এই তত্ত্ব সারা পৃথিবীতে বিপ্লবী আন্দোলনে নতুন পথনির্দেশ দিয়েছিল। এজন্য কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঘোষণা করেছিল, লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ সর্বহারা বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ। এজন্য আমরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অনুসরণ করার কথা বলি।

শ্রমিকশ্রেণির প্রথম রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়ন হাতে-কলমে পরীক্ষা করে দেখিয়ে দিয়েছিল যে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদের থেকে অনেক উন্নত সমাজব্যবস্থা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা বাসস্থানের মতো মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলিও যে সমাধান করা সম্ভব, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন গোটা পৃথিবীর সামনে তার উদাহরণ তুলে ধরে। পুঁজিবাদের চার শতাব্দীর ইতিহাসে যে প্রশ্নের মীমাংসা সম্ভব হয়নি, তা অল্প দিনের মধ্যেই করে দেখায় সমাজতান্ত্রিক শিশুরাষ্ট্র। রাশিয়া ছিল অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া। কিন্তু মাত্র ১৩ বছরের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম সারির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। যে সামাজিক সাম্য ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সোভিয়েত সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার প্রশংসা বিশ্বের বহু মনীষী অকুণ্ঠভাবে করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও সোভিয়েত দেশ ভ্রমণের সময় রাশিয়ার চিঠি’-তে শুরুতেই লিখেছিলেন, ‘যা দেখছি, আশ্চর্য ঠেকছে। অন্য কোনও দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা জাগিয়ে তুলেছে।’’

বিশেষ করে জনশিক্ষা বিস্তারের প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। নভেম্বর বিপ্লবের অব্যবহিত পরেই গোটা দেশজুড়ে শিক্ষা বিস্তারের বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছিল। শুধুমাত্র ইউরোপীয় অংশেই নয়, এশিয়ার অংশে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পশ্চাৎপদ উপজাতিদেরও শিক্ষার অঙ্গনে টেনে আনা হয়েছিল। জাতিগঠনের প্রশ্নে শিক্ষার যে বিরাট ভূমিকা রয়েছে তা সোভিয়েত ইউনিয়নই প্রতিষ্ঠিত করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও এই দিকটি নজর কেড়েছিল। তিনি লিখেছেন, ‘‘আমাদের সকল সমস্যার সব চেয়ে বড় রাস্তা হচ্ছে শিক্ষা। এতকাল সমাজের অধিকাংশ লোক শিক্ষার পূর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেভারতবর্ষ তো প্রায় সম্পূর্ণই বঞ্চিত। এখানে সেই শিক্ষা যে কী আশ্চর্য উদ্যমে সমাজের সর্বত্র ব্যাপ্ত হচ্ছে তা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। শিক্ষার পরিমাণ শুধু সংখ্যা নয়, তার সম্পূর্ণতায় তার প্রবণতায়। কোনো মানুষই যাতে নিঃসহায় নিকর্মা হয়ে না থাকে এজন্যে কী প্রচুর আয়োজন কী বিপুল উদ্যম।’’

মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও সোভিয়েত ইউনিয়নই পথিকৃৎ। নারী পুরুষের জন্য পূর্ণ সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আইন সোভিয়েত ইউনিয়ন তৈরির অল্প দিনের মধ্যেই গৃহীত হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নই বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র যেখানে ১৮ বছরের বেশি বয়সী নারী-পুরুষকে সর্বজনীন ভোটাধিকার দেওয়া হয়। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে পুরানো পুঁজিবাদী গণতন্ত্র বলে অভিহিত গ্রেট ব্রিটেন এই অধিকার দেয় ১৯২৮ সালে।

জন্মলগ্ন থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়নকে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। গৃহযুদ্ধ, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, অন্তর্ঘাত প্রভৃতি প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করেই সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি অত্যন্ত পশ্চাৎপদ দেশ থেকে অল্প দিনের মধ্যেই অগ্রসর দেশে পরিণত হয়। দ্রুত এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদের মতো বিধ্বংসী শক্তিকে আটকাতে সক্ষম হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, যা পুঁজিবাদী দেশগুলির পক্ষে সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করেও হিটলারের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন মানব সভ্যতাকে রক্ষা করেছিল। কমরেড স্তালিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের এই গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকাকে কখনই ম্লান করা যাবে না।

৭৪ বছর পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে বিপর্যয় ঘটলো কেন নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের পার্টি সম্পর্কে ১৯৯২ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত চতুর্দশ পার্টি কংগ্রেসে কয়েকটি মতাদর্শগত বিষয় সম্পর্কেশীর্ষক একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। তাতে প্রশ্নের কিছু উত্তর আছে। আমি সে কথায় ‍‌রে আসবো।

একথা সকলেরই জানা যে, লেনিন রাশিয়ার বুকে প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংগঠিত করলেন তা ছিল একটি পশ্চাৎপদ দেশ। ফলে তাঁকে সম্পূর্ণ নতুন পথে চলতে হয়েছিল কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা, দিক-নির্দেশ তাঁর সামনে ছিল না। তিনিই নয়া অর্থনৈতিক নীতি (NEP) চালু করেছিলেন, যে রাষ্ট্র বেসরকারি উদ্যোগের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। যদিও আধিপত্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের।

আমরা কখনই ভাবতে পারিনি যে, একটা দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যাওয়ার পর তার আবার পতন হতে পারে এবং আবার সে দেশে পুঁজিবাদ ফিরে আসতে পারে। আমরা কেন, পৃথিবীর অনেক বড় কমিউনিস্ট পার্টিই তা বুঝতে পারেননি। কিন্তু লেনিন বারে বারে আত্মসন্তুষ্টি পরিহার করার কথা বলেছিলেন। বিশেষ করে চারপাশে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে হুঁশিয়ার করেছিলেন। তিনি আমেরিকান পেশাদারি দক্ষতা থেকেও শিক্ষা নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

রাশিয়ায় পরবর্তীকালে যে মতাদর্শগত চর্চার অভাব ঘটেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সে দেশে গিয়েও আমার নিজের বিষয়ে মনে হয়েছিল। প্রথম যাই ১৯৫৭ সালে। তারপর আরো কয়েকবার গিয়েছি। সাল মনে নেই, একবার সে দেশে গিয়ে ব্ল্যাক সি (কৃষ্ণসাগর)- উপর দিয়ে একটা জাহাজে করে যাচ্ছিলাম। সেই জাহাজটি এক সময়ে হিটলারের জাহাজ ছিল। বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত বাহিনী তা কবজা করে। প্রায় ২২০০ যাত্রী সেই জাহাজে ছিল। প্রায় সকলেই ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। জাহাজের মধ্যে খেলছে, সাঁতার কাটছে। কিন্তু দেখলাম কেউই খবরের কাগজ পড়ছে না। অথচ কাগজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ খবর ছাপা হয়েছে। ওদের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা সংক্রান্ত খবর ছাপা হয়েছে এবং রয়েছে এক রুশ মহাকাশচারীর প্রত্যাবর্তনের খবর। কিন্তু তাতেও ওদের কাগজ পড়ার আগ্রহ নেই। আমি এক দোভাষীকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘ওদের খবরের কাগজ পড়ার আগ্রহ নেই কেন?’’ জবাবে সে বললো, ‘‘ওরা ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। তাই ওদের আগ্রহ নেই। ফিরে এসে কাগজ দেখবে। তাতে শুধু দেখবে ওদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা কিছু বাড়লো কি না।’’ তখন এই বিষয়টা নজরে এসেছিল। সবটা বুঝিনি আজ বুঝি প্রবণতাটা তখন থেকেই তৈরি হয়েছিল।

অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সর্ব‍‌শেষ কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয় বিজয়ওয়াদায়। সেই কংগ্রেসেই বোঝা গিয়েছিল পার্টি ভাঙতে চলেছে। তখন তো ক্রুশ্চেভের নেতৃত্বে স্তালিনবিরোধী প্রচার পুরোদমে চলছে। এই অবস্থায় আমাদের পার্টি সোভিয়েত নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে একটি প্রতিনিধিদলকে মস্কো পাঠায়। দলে আমিও ছিলাম। এছাড়াও ছিলেন ভূপেশ গুপ্ত গোবিন্দন নায়ার। সোভিয়েত পার্টির তরফে আলোচনার মধ্যে ছিলেন সুসলভ এবং পনোমারিয়েভ। আমার একটি প্রশ্নে পনোমারিয়েভ চটে গিয়েছিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘আপনারা স্তালিনের আমলে লেখা বলশেভিক পার্টির ইতিহাসবইটি বাতিল করে দিলেন কেন? তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক তো বই পৃথিবীর সর্বত্র প্রচার করেছিল।’’ জবাবে পনোমারিয়েভ রেগে গিয়ে বললেন, ‘‘ বইতে মার্কসবাদী দর্শন বিষয়ে স্তালিনের একটি লেখা ছিল। স্তালিন দর্শনের ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন। Negation of the negation বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যায় ত্রুটি ছিল। আমরা তা সং‍‌শোধন করে নতুন বই লিখেছি। এখন তার তর্জমার কাজ চলছে।’’ আমি সুসলভকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘আপনারা স্তালিনের এত সমালোচনা করছেন কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় এই সমালোচনা করেননি কেন?’’ এই প্রশ্নের জবাবে সুসলভ কিন্তু রেগে গেলেন না। তিনি হেসে বললেন, ‘‘এটা বুঝবেন, স্তালিন তো শুধু সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন না বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ছিলেন। সুতরাং তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলা সহজ ছিল না।’’ সেই সময় আলবানিয়ায় সরকার উৎখাতের বিষয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন মদত জোগাচ্ছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আপনারা এটা কেন করছেন? সে দেশে কোন্সরকার থাকবে তা সে দেশের মানুষই ঠিক করবেন।’’ জবাবে সুসলভ বললেন, ‘‘ওরা আমাদের বিরুদ্ধে সাংঘাতিক প্রচার করছে। তাই আমরা একাজ করছি।’’ স্বভাবতই সুসলভের এই জবাব শুনে আমরা সন্তুষ্ট হতে পারিনি। পরে ফিরে এসে আমরা কেন্দ্রীয় কমিটিতে একটা রিপোর্ট দিয়েছিলাম।

আগেই বলেছি যে, সোভিয়েতে বিপর্যয়ের কারণ সম্পর্কে আমাদের পার্টি ১৯৯২ সালে মাদ্রাজ (চেন্নাই) পার্টি কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই প্রস্তাবে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করা হয়। তারমধ্যে একটি হলো, সে দেশে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার বদলে পার্টির এবং বেশিরভাগ সময়ে পার্টি নেতৃত্বের একনায়কত্বে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে পার্টি রাষ্ট্র জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সেইসঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বাড়াতে হয় সোভিয়েত ইউনিয়নকে। সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় পাল্লা দিতে গিয়ে উন্নতমানের ভোগ্যপণ্য তৈরির কাজ অবহেলিত থেকেছে। মানুষের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে পারেনি। এছাড়া মতাদর্শগত চেতনা প্রসারের ঢিলেমি দেখা দিয়েছিল।

আমি এই লেখায় সেই বিস্তৃত আলোচনায় যাচ্ছি না। আমার কথা হলো, এই যাবতীয় অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। একই ভুল আমরা যাতে না করি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সব থেকে বড় কথা, কমিউনিস্টদের অনেক দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়েই এগোতে হবে। কিন্তু এই সঙ্কল্প রাখতে হবে পৃথিবীতে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠিত হবেই।

নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকীতে সেই লক্ষ্যে কাজ করার শপথ আমাদের নিতে হবে।

 (২০০৭ সালের নভেম্বর মহান নভেম্বর বিপ্লবের ৯০তম বার্ষিকী উপলক্ষে গণশক্তিতে জ্যোতি বসুর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল।)

 

20200909

অশোক মিত্র: অনন্য মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস

 



অজয় দাশগুপ্ত

আচমকাই সুযোগ হয়ে গিয়েছিল অশোক মিত্রের সান্নিধ্যে আসার। রাজনৈতিক জীবনের গোড়া থেকেই যাঁর বক্তৃতা ও লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত, তাঁর কাছে নিয়মিত যেতে হবে শুনেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। পয়লা মে সকালে মৃদুলদা(দে) যখন ফোনে জানালেন ওঁর মৃত্যুসংবাদ, তখন একরাশ কথা ভিড় করে এলো। শুন্যতা তো বটেই!

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি থেকে আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ‘গণশক্তি’-র রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় লেখা ওঁর বাড়ি থেকে আনার। টানা প্রায় দু’বছর আলিপুর পার্ক রোডে সোনালী অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি সপ্তাহে দু’বার করে যেতে হতো। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা! প্রথমে টেলিফোন করে ওঁর সময় নিতে হতো, তারপর যথার্থই যথাসময়ে (এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না) পৌঁছে যেতে হতো। প্রথমে উনি টানা বলে যেতেন, যার দ্রুত নোট নিতে হতো। পরের দিন সেটা কম্পোজ করে নিয়ে গেলে তার ওপর উনি কাটাছেড়া করতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘আমি প্রথমবার ভাবনাটা বলি, পরেরবার লিখি।’

গণশক্তির বানান নিয়ে ওঁর প্রশ্ন ছিল। একদিন উনি ডিকটেশন দেওয়ার সময় কোনো লেখায় ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি বলেছিলেন। আমাদের তখন সংসদ বাংলা অভিধান অনুসরণ করা হতো, সোমেনদা(পাল) আমাকে একদিন ওই অভিধান দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে’ অশুদ্ধ প্রয়োগ, ওটা ‘ইতোমধ্যে’ হবে। আমিও তাই সেই অনুসারে ‘ইতোমধ্যে’-ই লিখেছিলাম। উনি লেখাটার কম্পোজ প্রুফ দেখার সময় আমাকে বললেন, ‘তোমরা ইতিমধ্যে-কে ইতোমধ্যে লেখো কেন?’ আমি ‘সংসদ বাংলা অভিধান’-এর কথা বলতে উনি বললেন, ‘তোমাদের প্রুফ কি বাংলা ভাষার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকরা দেখেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইতিমধ্যে’ ব্যবহার করেছেন, সেটাও তাঁরা মানবেন না?’ ওঁর নোট নিতে গিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি তো বটেই, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগ নিয়েও অনেককিছু শিখতে পেরেছিলাম বলে ধন্য হয়েছি। একই শব্দ একই লেখায় দু’রকম প্রয়োগ করা নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে ওঁর সহাস্য মন্তব্য, ‘আমি দুটোই লিখি, একটা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আরেকটা লিখি।’

ওঁর বিশাল লাইব্রেরি কাম ড্রয়িং রুমে বসে জ্ঞানভান্ডারের বহরে নিজেকে কার্যত হারিয়ে ফেলতাম। মাঝেমাঝে টুকরো-টাক্‌রা কথাবার্তা হতো। আমার বাড়ি গড়িয়াতে জেনে বলেছিলেন, ‘ওখানে উজ্জ্বল (চ্যাটার্জি) আছে, খুবই উদ্যমী ছেলে।’

‘আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট’ বলে যিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তিনি কিন্তু ব্যক্তিগত আচারে অত্যন্ত সুভদ্র ছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি অনেকের কাছেই। প্রত্যেক অতিথিকে উনি লিফটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, নগণ্য হলেও আমার ক্ষেত্রে কোনোদিন তার অন্যথা হয়নি। আপাতকঠিন, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পিছনে যে একজন স্নেহশীল পিতার মনন লুকিয়ে আছে, সেটা একটা ঘটনায় টের পেয়েছিলাম। গণশক্তি থেকে ২৩০নং বাসে চেপে শেষ স্টপেজ চিড়িয়াখানায় নেমে হেঁটেই চলে যেতাম আলিপুর পার্ক রোডে। ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে একদিন রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। রাস্তা খোঁড়া হচ্ছিল, চারদিকে ইটের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ছিল। ব্যস্‌, হাত-পা ছড়ে গেলো, রক্ত বের হচ্ছিলো। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমি কোনমতে ধুলে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। বেল টিপতে দু’মিনিট দেরি হয়ে গেছিল, দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছিলাম। ‘আজ একটু দেরি হয়ে গেলো’ বলতে বলতেই উনি আমার হাত লক্ষ্য করে বললেন, ‘কী হয়েছে, ছড়ে গেছে মনে হচ্ছে!’ আমি বললাম, ‘ও কিছু না, পড়ে গিয়ে একটু লেগেছে।’ উনি আমাকে ঘরে বসিয়ে সোজা ভেতরে চলে গেলেন। তারপর একটা ক্রিম(সম্ভবত ‘ভোলিনি’ জাতীয় কিছু একটা হবে) নিয়ে এসে নিজে লাগিয়ে দিতে লাগলেন, হাতে-পায়ে। আমি তো সঙ্কোচে ‘না, না’ করতে লাগলাম। কিন্তু কার্যত ধমকে আমাকে বললেন, ‘তুমি চুপ করে বসো, নিজে নিজে মলম লাগানো যায় না।’ তারপর আমি সেদিন লিখতে পারবো কিনা, অন্যদিন আসবো কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘কিছুই তো হয়নি, আমি পারবো, আপনি বলুন।’ সেদিন লেখা শেষ করে ফেরার সময় উনি মলমের টিউবটা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও। পরে আরেকবার লাগিয়ে নেবে।’ ওঁর এই স্নেহশীল ভূমিকা দেখে আমি রীতিমত অভিভূত হয়েছিলাম সেদিন। 

ওই সময়েই আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ‘গণশক্তি’-র নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। তারিখটা ১৯৯৭সালের ২রা জানুয়ারি। আমি তখন নিয়মিত ওঁর বাড়িতে যাচ্ছি। পরে আমাকে কথায় কথায় কয়েকবার বলেছিলেন, ‘তোমাদের নতুন দপ্তরে আমার যাওয়া হয়নি।’ আমি বলেছিলাম, ‘চলুন না একদিন।’ কিছুদিন বাদে উনি আমাকে একদিন বললেন, ‘তোমাদের দপ্তরের কাছেই যাচ্ছি, এনআরএস আকাদেমি হলে একটা কর্মসূচী আছে।’ আমি ওঁকে সেদিন এনআরএস আকাদেমি হল থেকে নিয়ে এসেছিলাম গণশক্তি দপ্তরে। প্রয়াত কমরেড দীপেন ঘোষ তখন আমাদের সম্পাদক। উনি আমাদের দপ্তরের সম্পাদকীয় বিভাগ দেখে বললেন, ‘আমি নিউইয়র্ক টাইমস্‌-এর দপ্তরেও গেছি, ম্যানহাটনে। ওখানেও তোমাদের মতই ব্যবস্থা, সবাই সবাইকে দেখতে পায়। কোনো ঘেরাটোপ নেই।’ 

ওঁর রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় পড়ার জন্য বহু মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকতেন। গণশক্তি-র রবিবারের প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে সেটাও একটা কারণ ছিল বলে মনে হয়। পরে ওঁর রবিবারের সেই লেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য কর্মসূচীতে যখনই দেখা হয়েছে, ডেকে কথা বলেছেন। আমায় বলতেন, ‘তোমরা সাংবাদিকরা সঙ্গে একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘোরোনা কেন? কোনো ঘটনা ঘটলে তুমি নিজেই তার ছবি তুলে নিতে পারবে, চিত্রসাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।’

অনেকেই মার্কসবাদ ও রবীন্দ্রনাথকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখতে বা দেখাতে চান। অশোক মিত্র’র বিভিন্ন লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির কথা বারেবারে উঠে এসেছে। তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ ‘আপিলা চাপিলা’-য় একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন: ‘‘এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে দুটি আলাদা চরিতার্থবোধ: এক রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমার জন্ম; দুই, আমার চেতনাজুড়ে মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস।’’ যারা এই পরস্পরবিরোধিতাকে উপজীব্য করে থাকেন, অশোক মিত্র যেন তাদের উদ্দেশ্যেই নিজের এবিষয়ে উপলব্ধির কথা লিখেছেন: ‘‘...নিজেকে মার্কসবাদী বলে গর্বিত প্রচার করি, মার্কসীয় বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজের জিজ্ঞাসা-বিবর্তন বিশ্লেষণে নিমগ্ন হই, মার্কসীয় ধারণার প্রেক্ষিতে অর্থশাস্ত্রের গহনে শ্রেণীদ্বন্দ্বের অন্বেষণ করি। অথচ সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার অভিভূত গরিমাবোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় জন্মগ্রহণ করেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি, তাঁর কবিতায় গানে প্রতিনিয়ত অবগাহিত হয়ে অধরার সন্ধান পাই, আমার চেতনা জুড়ে, মার্কসের পাশাপাশি সব সময়ই রবীন্দ্রনাথের আনন্দনিষ্যন্দিত উপস্থিতি।....আমরা হাসি, কাঁদি, গল্পগুজব করি, কেচ্ছা ছড়াই, গানে গুনগুনিয়ে উঠি, কলহে প্রবৃত্ত হই, সব-কিছুরই প্রকাশের পথ বাতলে দেয় রবীন্দ্রনাথ দ্বারা নির্মিত-চর্চিত, রূপমন্ডিত বাংলা ভাষা। ভাষার দার্ঢ্য এবং সেই সঙ্গে বিস্তার না থাকলে চিন্তা এলিয়ে পড়ে, যুক্তির সারণি বেপথুমান হয়, ভাবনাকে সংহত রূপ দিতে আমরা অসমর্থ হই। রবীন্দ্রনাথ-দত্ত ভাষার ভেলায় ভেসেই আমরা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞানের স্তরের পর স্তর অতিক্রম করতে সমর্থ হই। হাটে-মাঠে-ঘাটে যখন মার্কসবাদী হিসেবে নিজের বিশ্বাসের কথা অন্যদের শোনাতে যাই, তখনো তো আমার প্রধান অবলম্বন আমার মাতৃভাষা, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষা, রবীন্দ্রনাথ যা ভূষণে-রতনে আমাদের জন্য রচনা করে দিয়েছেন, অথচ ভূষণরত্নের ভারে প্রসাদগুণ বিমূঢ় হয়নি।...’’

কয়েক বছর আগে ‘আমার মৃত্যুর পর’ নিবন্ধেও তিনি লিখে গেছেন: "...যে-বয়সে পৌঁছেছি, মৃত্যুচিন্তা এড়ানো অসম্ভব, এবং সেজন্যই ইচ্ছাপত্র গোছের কিছু বাসনার কথা ব‍্যক্ত করছি। ধরে নিচ্ছি আমার মৃত্যুকালে তখনো কয়েকজন বন্ধু অবশিষ্ট থাকবেন। উদ্ধত সাহসের সঙ্গে আরো ধরে নিচ্ছি, তাঁরা হয়তো আমার জন্য একটি ক্ষুদ্রায়তন স্মরণসভার আয়োজন করবেন। সেই সভায়, আমার বিনীত অনুরোধ, স্মৃতিচারণ ধাঁচের বক্তৃতাদি একেবারে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান, একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই কিছু গান যেন গাওয়া হয়।..." (নিবন্ধ সংকলন: ‘‘সমাজ, স্মৃতি, সাহিত্য’’)।

*************

‘একুশ শতক’, জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত