20210213

তৃণমূল-বিজেপি’কে হারানোর বাস্তব পরিস্থিতি রয়েছে: সূর্য মিশ্র

 


--------------------------------------------------

পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। এবারে রাজ্যে ত্রিমুখী লড়াই। কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক দলকে পরাস্ত করার বাস্তবতা রয়েছে। বিকল্প নীতি রূপায়ণ করতে হবে। সেই বিকল্প বামপন্থী, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দিতে পারবে। গণশক্তিকে সাক্ষাৎকারে বললেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রসূন ভট্টাচার্য।

--------------------------------------------------

প্রশ্ন: রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষিত হতে চলেছে। তৃণমূল এবং বিজেপি’র বিরুদ্ধে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেস একসঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপি’র মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সীমিত করে দেখানো হচ্ছে মিডিয়াতে। আপনি কি মনে করেন, ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ওই দুই দলকে পরাস্ত করা যাবে? রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ রয়েছে?

সূর্য মিশ্র: অবশ্যই রয়েছে। কারণ, পরিস্থিতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। তা নিয়ত পরিবর্তনশীল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল এবং বিজেপি’র মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছিল। এই মেরুকরণের ফলে রাজ্যে বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জনসমর্থন ১৩ শতাংশের নিচে নেমে যায়। সেই পরিস্থিতি এখন আর নেই। এখন ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে বাধ্য। ২০১৯ সালের নির্বাচনের পরেই দেশে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা শুরু হতে দেখা গিয়েছে। তারপরে যত রাজ্যে নির্বাচন হয়েছে, বিজেপি হেরেছে অথবা অনেক কারসাজি করে কান ঘেঁষে জিতেছে। রাজস্থান, কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশ, দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জিততে পারেনি। কর্ণাটক, মধ্য প্রদেশে জনতার রায়কে উলটে দিয়ে পরে সরকার দখল করেছে। বহু টাকা খরচ করে, গোদি মিডিয়াকে ব্যবহার করে প্রচার চালিয়েও বিহারে মাত্র ০.৩ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে সরকারে এসেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে মহামারী এবং তার আগে থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অর্থনৈতিক সঙ্কট আরও তীব্র হয়েছে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং বৈষম্য আরও বেড়েছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ আন্দোলনও তীব্র হয়েছে। সরকার ফ্যাসিবাদী কায়দায় প্রতিবাদ দমনের চেষ্টা করছে। কিন্তু ধর্মঘট-হরতাল ও সর্বশেষ কেন্দ্রের কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে দিল্লিকে ঘিরে কৃষকদের অবস্থান-বিক্ষোভ এবং দেশ জুড়ে কৃষকদের আন্দোলন এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যা স্বাধীনতার পর কখনো দেখা যায়নি।

দ্বিতীয়ত, এরাজ্যে তৃণমূলের সরকারের জনবিচ্ছিন্নতাও বাড়ছে, সরকারের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভও বাড়ছে। ওরা প্রচুর টাকা খরচ করে যতই চেষ্টা করুক, সেটাকে চাপা দিতে পারছে না। ইলেকটোরাল বন্ডে বিজেপি’র পরে সবচেয়ে বেশি টাকা তো তৃণমূলই পেয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’কে ১৮টি আসনে জেতানোর পরে  ‘দিদিকে বলো’ বলে তৃণমূলের সুবিধা কিছু হয়নি, তাই ‘দুয়ারে দুয়ারে’ যেতে হয়েছে এবং ‘সমাধান’ তো দূরের কথা, তৃণমূল দলটার অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এখন তো দল প্রতিদিন ভেঙে যাচ্ছে। অন্যদিকে মহামারী ও লকডাউনের সঙ্কটের সময় থেকে মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছে বামপন্থীরা। ভিনরাজ্যে আটকে পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের সাহায্য করা, তাঁদের ঘরে ফেরানো, কোভিড নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা প্রচার, অসহায় মানুষদের কাছে সাবান, স্যানিটাইজার, খাদ্য, ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, কমিউনিটি কিচেন ও সবজি বাজার চালানো, হেল্পলাইন নম্বর দেওয়া, রক্তদান করা— এসবই বামপন্থীরা করেছে। এমনকী পুলিশের বাধা সত্ত্বেও করেছে। কেন্দ্রের কাছে মানুষের দাবি তুলে ধরে রাস্তায় নামায় আমাদের কলকাতার বুকে দু’বার গ্রেপ্তার করেছে এই সরকারের পুলিশ। মানুষ দেখেছেন, যারা সরকারে আছে তারা দরকারে নেই। আর যারা সরকারে নেই, তারা দরকারে আছে। কাজেই আমাদেরই দায়িত্ব মানুষকে বিকল্প দেওয়া। তার জন্য বিজেপি এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে বাম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সবাইকে একজোট করে ব্যাপক একটা বিকল্প তৈরির চেষ্টা চলছে। কংগ্রেসের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে কথা চলছে, ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গেও কথা হবে। বাম সহযোগী যারা, তারাও আমাদের সঙ্গেই আছে। কাজেই লড়াই ত্রিমুখী হতে বাধ্য।

প্রশ্ন: আপনারা বিকল্প নীতির কথা বলছেন। সরকার গঠন করতে পারলে রাজ্যে কোন বিকল্প রূপায়ণ করবেন? কীসে দেওয়া হবে অগ্রাধিকার?

সূর্য মিশ্র: আমাদের বিকল্পের প্রধান কথাই হলো বেকারদের কর্মসংস্থান। এটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। সরকার ও আধা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে সমস্ত শূন্যপদ এক বছরের মধ্যে পূরণ করতে হবে। কর্মসংস্থানের মূল তিনটি ক্ষেত্র কৃষি, শিল্প ও পরিষেবায় কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। চাষের খরচ কমিয়ে, কৃষকের কাছে ফসলের দাম বাড়িয়ে, গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্পে শ্রমদিবস বাড়িয়ে ও শহরে তা  সম্প্রসারিত করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। সমবায়, স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও করোনার সময়ে সংগঠিত কমিউনিটি কিচেন, সবজি বাজার ইত্যাদি স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে প্রসারিত করতে হবে। ২০১০ সালে পশ্চিমবঙ্গ অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দেশের মধ্যে প্রথম ছিল। সেগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজে অগ্রাধিকার বজায় রেখে বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকার কৃষক-শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া ও অধিকার রক্ষার পক্ষে থাকবে। শিক্ষার সর্বস্তরে গণতন্ত্রীকরণ, ভর্তি ও ফল প্রকাশে স্বচ্ছতা ও নিয়মিত পরীক্ষা সুনিশ্চিত করার ব্যবস্থা করবে। ৬ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সকলের বিনামূল্যে বাধ্যতামূলক শিক্ষার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। সমস্ত স্তরেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়াতে হবে। জনস্বাস্থ্য পরিষেবা, রোগ প্রতিষেধকমূলক ব্যবস্থা, সমস্ত স্তরে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা বাড়ানো ও উৎকর্ষ বৃদ্ধির উপর জোর দিতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের পাশাপাশি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার প্রসার বর্ধিত কাজের চাহিদার অর্ধেক পূরণ করতে পারে।

তাছাড়া সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার কোনও কেন্দ্রীয় সাহায্য ছাড়াই প্রায় ৪০ শতাংশ পরিবারকে দু’টাকা কিলো দরে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এই ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট স্তরের স্থায়ীকাজ ও আয়ের নিচে বসবাসকারী সবার জন্য গণবণ্টন ব্যবস্থাকে প্রসারিত করতে হবে। এক কথায়, সকলের জন্য খাদ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে হবে। সবরকম সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামে সরকার সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করবে। নারী ও শিশু বিকাশ, আদিবাসী-তফসিলি-সংখ্যালঘু ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বহুমুখী উদ্যোগগুলি যথেষ্ট ছিল না। উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল, সুন্দরবনে ও সমস্ত রকম আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিচারে রাজ্যের অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর এলাকাগুলিকে চিহ্নিত করে সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন পরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে।

আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি, তা বর্তমান বাস্তবতার উপরে দাঁড়িয়ে একটা বিকল্প ভাষ্যের নির্মাণ। এই ভাষ্য তৃণমূল-বিজেপি’র মধ্যেকার কটূক্তি ও অশালীন ভাষার সম্পূর্ণ বিপরীত। তৃণমূল এবং বিজেপি কী সর্বনাশ করেছে, তা আমরা মানুষকে নিশ্চয়ই বলব। কিন্তু আসল কথা হলো, আমরা বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন কী করেছি, কেরালায় কী হচ্ছে, আরও কী কী এখানে করা যায়— এই ইতিবাচক বিষয়গুলিই মানুষকে বলতে হবে, এগুলিই আমাদের বিকল্প। আমরা সরকারে থাকি বা না থাকি, এই বিকল্পের জন্যই লড়াই করি— এটাই আমাদের কাছে মুখ্য। এই বিকল্প নিয়ে আমরাই শেষ কথা বলার অধিকারী নই। মত বিনিময়ের মধ্য দিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে এবং প্রয়োগে তা পরীক্ষিত হবে।

প্রশ্ন: গত দশ বছরে রাজ্যের ঋণভার যেভাবে বেড়েছে এবং শিল্পায়ন না হওয়ার ফলে রাজ্যের রাজস্ব সংগ্রহের সুযোগ যেভাবে কমেছে, তাতে অনেকেই রাজ্যের অর্থনৈতিক হাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নতুন সরকার গঠন করলে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন কীভাবে?

মিশ্র: এটা বিকল্প রূপায়ণের জন্য সম্পদ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়। জনগণের দুর্দশা কমানোর জন্য আমরা যে বিকল্পের কথা বলছি, তার জন্য অবশ্যই সম্পদ সংগ্রহ করতে হবে। জিএসটি থাকায় রাজ্যের সরকারের এখন সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ কম, এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটা করা সম্ভব। কিন্তু রাজ্যের বেহাল অর্থনৈতিক দশা কাটানোর জন্য প্রথমেই বিজ্ঞাপনী প্রচার ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, যা বর্তমান সরকার করে চলেছে, তা বন্ধ করতে হবে। দুর্নীতির কারণে যে পরিমাণ অর্থ লুট হয়ে যাচ্ছে, তাও বন্ধ করতে হবে। তাছাড়া আমাদের স্থানীয় পরিষেবা ও উন্নয়নের জন্য স্থানীয় বিনিয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে। রাজ্য সরকার একটি নিগম গঠন করে জনসাধারণের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সমবায় এবং পঞ্চায়েত ক্ষেত্রের ছোট উদ্যোগে বিনিয়োগ করতে পারবে। এমন হলে স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগ অনেক বাড়ানো সম্ভব হবে। অতীতে আমরা ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে দেশের মধ্যে প্রথম ছিলাম এবং এক্ষেত্রে অতিরিক্ত যা সঞ্চয় হতো, তা রাজ্যের ঘাড়ে ঋণ হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া হতো। আমরা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলিকে সমবায় ব্যাঙ্ক ঋণের সঙ্গে যুক্ত করে মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ হিসাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছিলাম। এখন স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির স্বনির্ভরতা চলে গিয়েছে। আমরা যদি রাজ্যের একটি ব্যাঙ্ক তৈরি করতে পারি, তাহলে রাজ্যের উন্নয়নে ব্যাঙ্কগুলির ঋণদানে যে অনীহা, ক্রেডিট ডিপোজিট রেশিও-তে রাজ্যের প্রতি যে বঞ্চনা, তার অনেকটা সুরাহা হতে পারে। এ ছাড়াও বিত্তশালীদের থেকে সম্পদ সংগ্রহের জন্য কিছু উদ্ভাবনী প্রক্রিয়া প্রয়োগ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, বামপন্থীরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে যে, রাজ্যে গত দশ বছরে সামাজিক ক্ষেত্রে গুরুতর অবক্ষয় ঘটেছে। দুষ্কৃতী দাপটে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং নারীদের নিরাপত্তার অভাব তো আছেই। সেই সঙ্গে ধর্ম, জাত ও ভাষার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে পরিচিতিবোধের কারণে সম্প্রীতি ও ঐক্যবোধ ধাক্কা খেয়েছে। এগুলিকে সামাল দিয়ে বাংলাকে তার মূল ঐতিহ্যের ধারায় আবার ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব হবে? 

মিশ্র: জ্যোতি বসুর সেই কথাটাই বারে বারে মনে পড়ে। উনি বলেছিলেন, ‘সরকার না চাইলে দাঙ্গা হয় না’অর্থাৎ সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাই আসল কথা। সদিচ্ছা থাকলে এমনকী আইনেরও সবসময় প্রয়োজন হয় না। গত দশ বছরেও রাজ্যে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে, সরকারের সদিচ্ছা নেই। রাজ্যের শাসক দল সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিয়ে এসেছে, বাড়তে দিয়েছে, মানুষের মধ্যে ধর্ম-জাতি-ভাষার ভিত্তিতে বহুমাত্রিক মেরুকরণ করেছে। এসবের ফলে বাংলার গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির নিঃসন্দেহে ক্ষতি হয়েছে। মানুষকে সঙ্গে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংগ্রাম সেই জন্যই চালাতে হবে। সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক জগতের এব্যাপারে বিশেষ ভূমিকা নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু বর্তমান সরকার শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের নিজস্ব স্বাধীন সত্ত্বাকে খর্ব করেছে, কিনে নেওয়ার মানসিকতায় দখলদারি করেছে। সংস্কৃতি জগতে সেই পরিবেশ ও পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে শিল্পীদের সরকার নির্ভর হয়ে থাকতে হবে না। এমনকী লোকশিল্পীরাও যেন স্বাধীন সত্ত্বা বজায় রেখে তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি প্রচার করতে পারেন এবং সেভাবেই জীবনযাপন করতে পারেন। তাঁকে সরকারি প্রচার তথা শাসক দলের প্রচারের জন্য জীবন ব্যয়িত করতে হবে না। আইন-শৃঙ্খলার অবনতির জন্য এরাজ্যের শাসক দলের সঙ্গে দুষ্কৃতীযোগ ও দুষ্কৃতী নির্ভরতা নিঃসন্দেহে বড় কারণ। সেই কারণেই মহিলারা আক্রান্ত হলেও অপরাধীরা সাজা পায় না, শাসক দলের ছত্রছায়ায় থাকায় পুলিশ প্রশাসন তাদের ছোঁয় না। এই পরিস্থিতির বদল ঘটানোর জন্য আমরা পুলিশ প্রশাসন যাতে স্বাধীনভাবে আইন অনুসারে কাজ করতে পারে, তা নিশ্চিত করব। সদিচ্ছা থাকলে তা করা সম্ভব। বর্তমান সরকারের আমলে যে অফিসাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না, তাঁরা অনেকেই বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন এবং বামফ্রন্ট সরকার তাঁদের সম্মানের সঙ্গে কাজ করতে দিয়েছে। বামপন্থীদের কোনও লোক অন্যায় করলেও পার পায় না, এটা তখন অনেকবার দেখা গিয়েছে। দলদাসের পরিবর্তে প্রশাসনকে দলনিরপেক্ষ করাটাও বিকল্প।

প্রশ্ন: প্রতিহিংসার মনোভাব নিয়েই তৃণমূল সরকার অনেকগুলি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী ও নেতাদের বিরুদ্ধে। সেই সব তদন্তে কিছুই যে প্রমাণিত হয়নি, তা আমরা জানি। কিন্তু বর্তমান সরকারের সময়কালের দুর্নীতিগুলো দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য আপনাদের সরকার তৈরি হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে?

মিশ্র: তৃণমূল সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের কণ্ঠরোধ করতে বিরোধীদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে, জেলে পুরেছে, বাক স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে। বিজেপি সরকার সারা দেশে বিরোধী কণ্ঠস্বর দমন করতে যে ফ্যাসিবাদী আক্রমণ নামিয়ে এনেছে, তার আগে থেকেই এরাজ্যের সরকারি ক্ষমতাকে যথাসম্ভব ব্যবহার করে তৃণমূল সরকার সেই কাজ করছে। সরকার পরিবর্তন হলে আমাদের প্রথমেই গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার বন্দোবস্ত করতে হবে। ১৯৭৭ সালে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার আসার মতোই আমাদেরও মানুষকে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। আমরা সমস্ত মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে নেব, রাজনৈতিকভাবে বিরোধী বলে যাঁদের বন্দি করা হয়েছে, তাঁদের মুক্তি দেব। একদম পঞ্চায়েত ও পৌরসভা পর্যন্ত বিরোধীদের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি রুখতে হলে, সততা ফিরিয়ে আনতে হলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, প্রশাসনের সক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা মনে করি, মানবাধিকার কমিশন, মহিলা কমিশন, সংখ্যালঘু কমিশন, রাজ্যের নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি সব কমিশনগুলিকে তাদের স্বাধীনতা সহ সক্রিয় করে তুলতে হবে। রাজনৈতিক প্রশাসনিক শীর্ষস্তরে দুর্নীতি ঠেকাতে বামফ্রন্ট সরকার থাকাকালীন লোকায়ুক্ত তৈরি করা হয়েছিল, তারপরে তাকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। লোকায়ুক্তকে সক্রিয় করে তুলতে হবে। তবে দুর্নীতি রুখতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন জনগণের সক্রিয় নজরদারি। তার জন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণকে প্রকৃত অর্থে কার্যকরী করে জনগণের অংশগ্রহণকে বাস্তবায়িত করতে হবে। জনগণের চেয়ে ভালো নজরদারি কেউ করতে পারে না।

প্রশ্ন: আপনি যে বিকল্প রূপায়ণের কথা বলছেন এবং তার জন্য বাম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের শক্তিকে একত্রিত করছেন, নির্বাচনে তারা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়, তাহলে কী হবে? ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যদি বিধানসভায় ত্রিশঙ্কু পরিস্থিতি হয় তাহলে?

মিশ্র: আমাদের আশঙ্কা, তেমন পরিস্থিতি হলে ক্ষমতা ধরে রাখতে বিজেপি এবং তৃণমূল প্রকাশ্যেই একজোট হয়ে বসবে। ওরা যতই পরস্পরের বিরুদ্ধে কটূক্তি করুক, পরস্পর বোঝাপড়া করেই চলে। প্রধানমন্ত্রী কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি’র শাসন চেয়ে ডবল ইঞ্জিনের কথা বলে গিয়েছেন। আসলে ডবল ইঞ্জিন তো এখনই আছে, ওঁর লোকই তো রাজ্যে বসে থেকে সরকার চালাচ্ছে। যদি নির্বাচনের পরে বিকল্পকে ঠেকাতে ওরা প্রকাশ্যেই এক ইঞ্জিনে উঠে বসে, তবে সেটা রাজ্যের পক্ষে আরও বিপজ্জনক হবে। তাই তৃণমূল ও বিজেপি’কে এমন জায়গায় নামাতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ওরা সরকার গঠন করতে না পারে। এই বাস্তবতা আছে এবং সেই জন্যই ব্যাপক মানুষের সমর্থনকে বাম-গণতান্ত্রিক-ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির পক্ষে সমবেত করতে হবে।

=================

*তৃণমূল-বিজেপি’কে পরাস্ত করার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।

*তৃণমূল ও বিজেপি’কে এমন জায়গায় নামাতে হবে, যাতে কোনোভাবেই ওরা সরকার গঠন করতে না পারে।

*আমাদের বিকল্পের প্রধান কথাই হলো বেকারদের কর্মসংস্থান।

*অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার কাজে অগ্রাধিকার বজায় রেখে বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।

*সমস্ত স্তরে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা।

*গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা।

*দলনিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা।

=================

 

গণশক্তি, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১

 

 

 

শ্রেণি আক্রমণ মোকাবিলায় চাই শ্রেণি প্রত্যাঘাত

 

সীতারাম ইয়েচুরি

 

ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে শ্রেণি আগ্রাসন তীব্র করতে চাইছে বিজেপি। শোষিত শ্রেণিগুলি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের পালটা শ্রেণি আক্রমণ দিয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা করতে হবে।

=================

 কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কৃষক সংগঠনের নেতাদের ৩০ ডিসেম্বরের আলোচনাতেও অভূতপূর্ব কৃষক প্রতিবাদের মুখ্য বিষয়গুলির সমাধান হয়নি। কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে কেন্দ্রীয় সরকার সম্মত হয়নি। কিন্তু বিদ্যুৎ (সংশোধনী) বিল পর্যালোচনা ও বায়ু দূষণ আইন থেকে কৃষকদের অব্যাহতি দেবার বিষয়ে আপাতত রাজি হয়েছে। ৪জানুয়ারি আরেক দফা আলোচনা হবে বলে ঠিক হয়েছে। 

কৃষি আইন প্রত্যাহারে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকারের টানা একগুঁয়েমির জন্য এই বিরাট শান্তিপূর্ণ কৃষক প্রতিবাদের অচলাবস্থা কাটছে না। 

সমস্ত দিক থেকেই দিল্লির সীমান্তে, দিল্লিমুখী জাতীয় সড়কে কৃষকদের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তাঁরা নজরকাড়া দৃঢ়তা, প্রত্যয় দেখিয়েছেন। দিল্লির সংলগ্ন রাজ্যগুলি ছাড়াও মহারাষ্ট্র, গুজরাট, উত্তরাখণ্ডের মতো দূরের রাজ্যগুলি থেকেও কৃষকরা এসেছেন। দেশের অন্যান্য অংশে, প্রায় সব রাজ্যে, পাটনা থেকে রায়পুর, গুলবর্গা থেকে থাঞ্জাভুর কৃষকরা লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। 

এই কৃষক সংগ্রামের পাশে শ্রমিক শ্রেণি, ট্রেড ইউনিয়ন সক্রিয় সংহতি জানিয়েছে। দেশের অন্নদাতাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন সমাজের অন্য অংশের মানুষ— মহিলা, ছাত্র, যুবকরা। 

এই প্রতিবাদ আন্দোলনের দাবিগুলি সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিবোধ থাকলে যে কোনও সরকার তা গ্রহণ করে নেবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে বলা হচ্ছে এখন এই আইনগুলি প্রত্যাহার করে নিয়ে কৃষকদের, কৃষি সম্পর্কিত সমাজ, কর্পোরেট, সমস্ত অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করো, তার ভিত্তিতে নতুন আইন বানিয়ে সংসদে পদ্ধতি মেনে আলোচনা ও বিতর্ক করে তা চালু করো। এই পদক্ষেপ নিতেই প্রধানমন্ত্রী মোদী একগুঁয়ের মতো রাজি হচ্ছেন না। (বস্তুত এই রকম চাপ আসতে পেরে ভেবেই কেন্দ্রীয় সরকার সংসদের শীতকালীন অধিবেশন বাতিল করে দিয়েছে, জবাব দেওয়ার ও দায়বদ্ধতার দায়িত্ব পরিহার করেই এই কাজ তারা করেছে।) 

অসত্য প্রচার 

প্রবল শৈত্যপ্রবাহের মধ্যে এই বিরাট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন চলছে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খলভাবে। তাকে বদনাম করার জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকার বিষাক্ত অসত্য প্রচারে নেমেছে। প্রথমে তারা প্রতিবাদীদের খালিস্তানি, পাকিস্তানি, চীনের দালাল, শহুরে নকশাল, টুকরো টুকরে গ্যাঙ এইসব বলে চিহ্নিত করেছে। তারপর কুৎসা ছড়ানো হলো বিরোধী দলগুলি কৃষকদের বিপথে পরিচালিত করছে। বাস্তব সত্য হলো এই আন্দোলন পরিচালনা করছে সংযুক্ত কৃষক মোর্চা, যা দেশব্যাপী ৫০০-র বেশি সংগঠনকে নিয়ে তৈরি, কোনও রাজনৈতিক দলেরই যোগাযোগ নেই। 

প্রধানমন্ত্রী মোদী নিজে এই জাতীয় প্রচারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তিনি অভিযোগ করছেন বিরোধী দলগুলি নিজেদের নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে কৃষি সংস্কারের কথা বলে এখন বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করছেহ্যাঁ, সিপিআই(এম) সব সময়ে কৃষিতে সংস্কার দাবি করেছে। অন্য অনেক দলও করেছে। কিন্তু কী ধরনের সংস্কার? সিপিআই(এম) ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার জন্য, সমস্ত মানুষের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট শস্য উৎপাদনের লক্ষ্যে, কৃষকদের ফসলের লাভজনক মূল্য, ক্রেতাদের ন্যায়সঙ্গত দামে শস্য পাবার জন্য শক্তিশালী গণবণ্টন ব্যবস্থা চায়। চায় কৃষিক্ষেত্রের আরও উন্নতি। সেই লক্ষ্যে সিপিআই(এম) সংস্কার চায়। 

প্রধানমন্ত্রী মোদীর সংস্কার যা এই কৃষি আইনগুলিতে প্রতিফলিত হয়েছে তা উলটো। ভারতের কৃষিকে, তার বাজার ও উৎপাদিত ফসলকে বহুজাতিক কৃষি বাণিজ্যের রাঘববোয়াল, দেশি-বিদেশি কর্পোরেটের হাতে তুলে দেবার জন্য এই সংস্কার। তা ভারতের খাদ্য নিরাপত্তার গুরুতর বিপর্যয় ডেকে আনবে, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের বিপুল মজুতদারির অনুমোদন দেওয়ায় কৃত্রিম খাদ্য সঙ্কট তৈরি করে চড়া হারে মূল্য বৃদ্ধি ঘটানো হবে। গণবণ্টন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে, সাধ্যের মধ্যে দামে খাদশস্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এই আইনগুলিতে ভারতের কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংস হবে, জনগণের দুর্দশা আরও বাড়বে। এই কারণে অনেক বিরোধী ধর্মনিরপেক্ষ দল এই বিলগুলির বিরোধিতা করেছিল, কৃষক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করছে, তাদের দাবি মেনে নিতে সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছে। সরকারের কাছে দাবি, এমন সংস্কার করুন যা ভারতের জনগণের সমৃদ্ধি ও কল্যাণের কাজে লাগে, দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের অতি মুনাফার লক্ষ্যে সংস্কারের পথে হাঁটবেন না। 

স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট কি রূপায়িত হচ্ছে? 

প্রধানমন্ত্রী দাবি করছেন তাঁর সরকার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নিয়ে স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্ট রূপায়ণ করছে। সত্য হলো স্বামীনাথন কমিশন সি২+৫০ শতাংশ হারে এমএসপি নির্ধারণ করতে বলেছে। সরকার বড়জোর এ২+৫০ শতাংশ হারে এমএসপি নির্ধারণ করছে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। এ২ প্রকৃত মিটিয়ে দেওয়া খরচ (অ্যাকচুয়াল পেইড আপ কস্ট)। সি২-র মধ্যে রয়েছে নিজের জমির খাজনার মূল্য, নিজস্ব মূলধনী সম্পদের ওপরে সুদ। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এমএসপি আদৌ দেওয়া হচ্ছে না, কমিশনের অন্য সুপারিশ তো উপেক্ষা করাই হচ্ছে। 

সিপিআই(এম)’র ২০১৯-র নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে ‘কৃষি সংস্কার’ সংক্রান্ত পরিচ্ছেদে প্রথমেই বলা রয়েছে সমস্ত কৃষককে এমএসপি-তে ফসল বিক্রির আইনি অধিকার দিতে হবে। ২০১৭ থেকে সিপিআই(এম) সাংসদরা বারবার এই দাবি সংসদে উত্থাপন করেছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকার এমন আইন আনেনি। বলা হয়েছিল, এমএসপি’র অধীনে সমস্ত কৃষিপণ্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, সমস্ত কৃষককে তার পরিধিতে আনতে হবে। বর্তমানে মাত্র ৬ শতাংশ কৃষক এর আওতায় পড়েন। তাছাড়াও কার্যকরী সংগ্রহের প্রক্রিয়া ছাড়া এমএসপি অর্থহীন। সরকারি বা বেসরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা দেশজুড়ে সর্বজনীন করতে হবে। 

বিরোধী দলের রাজ্য সরকারগুলিকে আক্রমণ 

প্রধানমন্ত্রী মোদী সম্পূর্ণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বিরোধীদের রাজ্য সরকারগুলিকে বিশেষ করে কেরালার এলডিএফ সরকারকে আক্রমণ করে বলেছেন তারা কৃষকদের স্বার্থ দেখছে না অথচ কেন্দ্রীয় আইনের বিরোধিতা করছে। কেরালা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর মিথ্যাভাষণকে নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে সারা ভারত কৃষকসভা। কেরালায় ধান, তরিতরকারি, ডাল, কলা ইত্যাদিতে হেক্টরপ্রতি ভালোই ভরতুকি দেওয়া হয়। কেরালার কর্ষিত জমির ৮২শতাংশে অর্থকরী ফসল উৎপাদন হয় যার দাম পণ্য বোর্ড নিশ্চিত করে দেয়, রাজ্য সরকারের অধীনে নিলামের ব্যবস্থা রয়েছে। 

নজর ঘোরাতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ 

বিপুল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে বিজেপি তাদের রাজ্য সরকারগুলির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্র করতে উঠেপড়ে লেগেছে। উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশে জারি করা হয়েছে ‘লাভ জিহাদ’ আইন, ‘গোরক্ষা আইন’ জারি করা হয়েছে। এইসবকে ব্যবহার করা হচ্ছে হেনস্তা, হয়রানি, ও সাম্প্রদায়িক ভাবাবেগ তৈরির জন্য। মধ্য প্রদেশের উজ্জয়িনী, ইন্দোর, অন্যান্য জায়গায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনায় ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। এর বিপর্যয়কর অস্থিরতার প্রভাব পড়বে দেশে। 

নয়া উদারনীতির আগ্রাসী অভিযান 

বিশ্ব অর্থনীতি মন্দার কবলে। নয়া উদারনীতির পথে সংস্কার যে এই সঙ্কটের কোনোই সমাধান করতে পারে না, সম্পূর্ণ দেউলিয়া তা উন্মোচিত হয়েছে। ধনতন্ত্রে লুটেরা প্রবৃত্তির মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য তাই কাড়াকাড়ি তীব্রতর হয়েছে। বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার কর্পোরেটের মুনাফা সর্বোচ্চকরণের লক্ষ্যে বৃহত্তর সুযোগ করে দিতে নয়া উদারনীতির সংস্কার আগ্রাসী ভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য দরকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন নতুন এলাকা ও নতুন বাজার দখল করা। এই লক্ষ্যেই দেশি-বিদেশি কর্পোরেটদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে কৃষিকে তুলে দেবার চেষ্টায় নতুন আইনগুলি আনা হয়েছে।

ভারতের শাসক শ্রেণিগুলির শক্তিবৃদ্ধির মুখ্য এজেন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় সংস্কার রূপায়ণের কাজ করছে তারা। 

শ্রেণি প্রভাব 

বিশ্ব সঙ্কট ছাড়াও ভারতের অর্থনীতি নোটবাতিল ও পণ্য পরিষেবা কর রূপায়ণের পদ্ধতিতে ভারতের অর্থনীতি দুর্বিপাকে পড়েছে। গত কয়েক বছরে লাগাতার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির হার অধোগতিতে পড়েছে। অর্থনীতিতে মন্দা, কোভিড মহামারীর প্রভাব, অপরিকল্পিত হঠাৎ লকডাউনের প্রেক্ষিতে ভারতের শাসক শ্রেণিগুলি নিজেদের মুনাফা বজায় রাখতে, সর্বোচ্চ করতে আরও রাস্তা খুঁজছে। 

বৃহৎ বুর্জোয়ার নেতৃত্বে বুর্জোয়া-ভূস্বামী শাসক শ্রেণিগুলি নয়া উদারনীতির পথে অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের প্রয়াস চালিয়ে গেছে। জাতীয় সম্পদের লুট, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিপুল আকারে বেসরকারিকরণ, খনির মত জনগণের সম্পত্তি এবং জনপরিষেবা বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ার অঙ্গ হিসাবেই শ্রমিকদের অধিকার রদ করা হচ্ছে। 

কৃষকদের ঐতিহাসিক সংগ্রাম ভারতের শাসক শ্রেণিগুলির নেতৃত্বের মুনাফা সর্বোচ্চ করার লক্ষ্যে কৃষিতে কর্পোরেট দখলদারির ঘটনাকে স্পষ্ট ভাবে সামনে এনে দিয়েছে। 

এক নতুন শ্রেণি দ্বন্দ্ব সামনে আসছে। আন্তর্জাতিক লগ্নিপুঁজির সঙ্গে সহযোগিতায় বৃহৎ বুর্জোয়া বনাম ধনী কৃষক ও জোতদার-সহ সমগ্র কৃষকের দ্বন্দ্ব। 

দ্বিতীয়ত, শাসক শ্রেণির শরিকদের মধ্যে সংঘাতও দেখা যাচ্ছে। একদিকে বৃহৎ বুর্জোয়া, অন্যদিকে অ-বৃহৎ বুর্জোয়া, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের মধ্যে দ্বন্দ্ব। 

তৃতীয়ত, বিজেপি দেশে পূর্ণ রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করছে, তার বদলে কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তার ফলে কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলির মধ্যে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। রাজ্য সরকার পরিচালনা করে এমন কিছু আঞ্চলিক দল সংসদে বিজেপি-কে সমর্থন করত, কিছু দোদুল্যমান ছিল এবং মূলত বিজেপি-কে সমর্থনের উদ্দেশ্যে সংসদে নিরপেক্ষ থাকত। তারাও বিশেষ করে এই কৃষক সংগ্রামের সময়ে বিজেপি’র এই আধিপত্যকামী অভিযানের ফলে বিরোধিতায় বাধ্য হচ্ছে। 

শাসক শ্রেণিগুলির শরিকদের মধ্যে এই ধরনের সংঘাত কিছু সম্ভাবনা তৈরি করে যা শোষিত শ্রেণিগুলিকে ব্যবহার করতে হবে। বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি, গরিব কৃষক, খেতমজুরদের বুর্জোয়া-ভূস্বামী শ্রেণি কাঠামোর বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রাম তীব্র করার লক্ষ্যে এই সম্ভাবনাকে ব্যবহার করতে হবে। 

শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে শ্রমিক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, কৃষক ও খেতমজুরদের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পেতে থাকায়। অনেক আগেই এই কাজ শুরু হয়েছিল, ২০১৮ থেকে এইসব অংশের যৌথ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ২৬ নভেম্বর সর্বভারতীয় সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল, তা কৃষক সংগঠনগুলির ২৬-২৭ নভেম্বর দিল্লি চলো অভিযানের সঙ্গে মিশে গেছে। আগামী দিনগুলিতে সংগ্রামের এই ক্রমবর্ধমান ঐক্য নিশ্চয়ই আরও মজবুত হবে। 

একই সঙ্গে শাসক শ্রেণিগুলি শ্রেণি আক্রমণ তীব্রতর করছে, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্রতর করছে, ভারতীয় সংবিধানকে খর্ব করছে। এর ফলে বর্তমান বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের সংগ্রাম বৃদ্ধি পাওয়ার জমি তৈরি হচ্ছে। আগামী দিনগুলিতে একদিকে যৌথ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম অন্যদিকে মহিলা, ছাত্র, যুব, দলিত, আদিবাসীদের মতো জনগণের বিভিন্ন অংশের নিজস্ব দাবিদাওয়ার আন্দোলন তীব্রতর হতে বাধ্য। এই আন্দোলনগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে শ্রেণি আগ্রাসন তীব্র করতে চাইছে বিজেপি। শোষিত শ্রেণিগুলি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের পালটা শ্রেণি আক্রমণ দিয়েই তাকে চ্যালেঞ্জ ও মোকাবিলা করতে হবে।

=================

গণশক্তি, ১জানুয়ারি, ২০২১

 

 

 

20201119

বিজেপি-কে হারাতে গেলে তৃণমূলকে বিচ্ছিন্ন ও পরাস্ত করতে হবে: সীতারাম ইয়েচুরি

 


তৃণমূলের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হলে, লড়াই না করলে লাভবান হবে বিজেপি-ই। পশ্চিমবঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতির এটিই বাস্তবতা। বুধবার গণশক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বললেন সিপিআই(এম)-র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেবাশিস চক্রবর্তী। 

গণশক্তি: সদ্যসমাপ্ত বিহার নির্বাচনের শিক্ষা কী?

ইয়েচুরি: বিহার নির্বাচন থেকে অনেকগুলি কার্যকরী শিক্ষা আমরা নিতে পারি। প্রথম কথা ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সম্ভাব্য বৃহত্তম ঐক্য গঠন করা গিয়েছিল। তা বিজেপি-র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাজে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, আরজেডি-কংগ্রেস মহাগটবন্ধনের সঙ্গে বামপন্থীরা সামিল হয়েছিল। তিন বামপন্থীদলের এই যোগদান বিহারের নির্বাচনী প্রচারের চিরায়ত ধারাকে বদলে দিতে সক্ষম হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। মানুষ সাড়া দিয়েছেন। বিশেষ করে বেরোজগারীর প্রশ্নে যুবকদের সাড়া পাওয়া গেছে। তৃতীয়ত, সারা দেশই জানে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে বামপন্থীরাই সবচেয়ে জোরদার কণ্ঠ। ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াইয়ে বামপন্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। তার প্রভাব পড়েছে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে ভোট এক জায়গায় পড়েছে। আমরা প্রচারে বলেছিলাম বিজেপি-কে পরাস্ত করা বিহারের পক্ষে জরুরী, ভারতের পক্ষে জরুরী। বাস্তবে বিজেপি-জেডি(ইউ) জোট শেষ পর্যন্ত মাত্র ০.০৩ শতাংশ বেশি ভোট পেয়েছে। বিজেপি যে অপরাজেয় নয়, তা প্রমাণিত হয়েছে।

গণশক্তি: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন কয়েক মাসের মধ্যেই হবে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক বিন্যাস নিয়ে কথাবার্তা শুরুও হয়ে গেছে। সিপিআই(এম)-র রাজনৈতিক রণকৌশল কী হবে?

ইয়েচুরি: সিপিআই(এম)-র পার্টি কংগ্রেসে রাজনৈতিক রণকৌশলগত লাইন নির্ধারিত হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বিজেপি-কে পরাস্ত করা, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার থেকে তাদের অপসারণ করা। পশ্চিমবঙ্গেও প্রাথমিক লক্ষ্য বাংলা ও ভারতের স্বার্থে তাদের পরাস্ত করা। প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে এই লক্ষ্য পূরণ করা যায়।

পশ্চিমবঙ্গের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিজেপি-কে পরাস্ত করতে গেলে তৃণমূল কংগ্রেসকে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, পরাস্ত করতে হবে। তৃণমূল বাংলায় বিজেপি-কে প্রবেশের রাস্তা করে দিয়েছে। তাদের ওপরে নির্ভর করেই বিজেপি বাংলায় পা রেখেছে। তৃণমূল বিজেপি-র সঙ্গে আঁতাত করেছিল, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এনডিএ সরকারে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। বিজেপি-র বিরুদ্ধে তাদের লড়াইয়ের বিশ্বাসযোগ্যতা একেবারে শূন্য।

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে গভীর জনঅসন্তোষ রয়েছে। তৃণমূলের হিংসা ও শাসানির রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। কেউ যদি বলেন বিজেপি-কে পরাস্ত করতে তৃণমূল সহ সকলকে নিয়ে চলতে হবে তা হবে আত্মঘাতী। সেক্ষেত্রে সমস্ত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী, শাসক দলের বিরোধী ভোট বিজেপি-র কাছে চলে যাবে। এই ধরনের কৌশল বিজেপি-র জয়কেই উলটে নিশ্চিত করবে। বাংলায় প্রয়োজন বিজেপি-বিরোধী, তৃণমূল-বিরোধী সমস্ত ভোটকে সর্বোচ্চ সম্ভব এক জায়গায় জড়ো করা। এই লক্ষ্য নিয়েই চলার কথা সিপিআই(এম)-র কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গণশক্তি: কোনো কোনো মহল থেকে কথা উঠছে ‘প্রধান শত্রু’ কারা। সিপিআই(এম) তৃণমূলের বিরুদ্ধে প্রচার করায় বিজেপি-র সুবিধা হচ্ছে। কীভাবে এই প্রশ্নকে আপনি দেখছেন?

ইয়েচুরি: প্রধান শত্রু বিজেপি। সারা ভারতেই এবং বাংলায় প্রধান শত্রু বিজেপি। রণকৌশলের মুখ্য প্রশ্ন হল এই শত্রুকে আমরা কীভাবে হারাতে পারি। আমি আগেই বলেছি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াই না করলে, প্রচার না করলে শাসক-বিরোধী ভোটের একটাই রাস্তা খুলে যাবে। তা হলো ভোট চলে যাবে বিজেপি-র কাছে। যে লক্ষ্যের জন্য আমরা কাজ করব, সেই লক্ষ্যই পরাস্ত হবে। এমন কোনো কৌশল নিলে বিজেপি-ই লাভবান হবে।

বিজেপি এবং তৃণমূল উভয়েই চায় দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতার একটি ভাষ্য তৈরি হোক। হয় বিজেপি, না হয় তৃণমূল। উভয় শক্তিই এই মেরুকরণকে মদত দিচ্ছে। যাতে তৃতীয় কোনো রাজনৈতিক শক্তির জন্য জায়গা না থাকে। এই দ্বিমেরুর আখ্যানে শেষ পর্যন্ত লাভ হবে বিজেপি-র। জনগণ কোনো বিকল্প না পেলে বিজেপি-র দিকে যাবেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের নীতি জনস্বার্থবিরোধী। বিজেপি-র নীতি থেকে তা পৃথক নয়। উভয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে দিয়েই তৃতীয় এবং নির্ভরযোগ্য বিকল্প তৈরি হবে।

গণশক্তি: এমন কথাও কেউ কেউ বলছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বেশি মনোযোগ দেয়।

ইয়েচুরি: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই হবে না?  সরকার তৃণমূলের। জনগণের জীবনজীবিকা, তাঁদের ন্যায্য দাবিদাওয়ার জন্য লড়াই চলছে। মানুষের বিক্ষোভকে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করছে সিপিআই(এম) ও বামপন্থীরা। কিন্তু শুধু রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে, এটি বাজে কথা। কেন্দ্রের সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করছে সিপিআই(এম)। লকডাউনের সময়ে লড়াই কার বিরুদ্ধে হয়েছে? ২৬নভেম্বরের সাধারণ ধর্মঘট কাদের বিরুদ্ধে হচ্ছে? রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেসরকারীকরণ, শ্রম আইনে শ্রমিক-বিরোধী সংশোধনী, নয়া কৃষি আইনের বিরুদ্ধে একটানা লড়াই হচ্ছে। মোদী সরকারের গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ, সংবিধানকে ধ্বংস করার প্রয়াসের বিরুদ্ধে সিপিআই(এম) একটানা লড়াই চালাচ্ছে। কেন্দ্রের বিরুদ্ধে লড়াই হচ্ছে না বলা একেবারেই অসত্য, বিভ্রান্তিকর কথা।

বিপদের কথা আগেই বলেছি। বিজেপি এবং তৃণমূলকে আমরা এক করে দেখছি না। দেশের কোনো রাজনৈতিক দলকেই বিজেপি-র সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। বিজেপি সংবিধান ও সাধারণতন্ত্রের কাঠামোকেই ভেঙে দিতে উদ্যত। কিন্তু তৃণমূলের রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রের মোদী সরকার উভয়ের বিরুদ্ধেই সিপিআই(এম) লড়ছে।

গণশক্তি: পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার বিপদকে কীভাবে দেখছে সিপিআই(এম)? বিশেষ করে বাংলার পূর্ব ইতিহাস এবং জনবিন্যাসের প্রেক্ষিতে?

ইয়েচুরি: বাংলায় দেশভাগের সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে, অত্যন্ত বিষাদময় ও নৃশংস ইতিহাসের সাক্ষী থাকতে হয়েছে বাংলার মানুষকে। স্বাধীনতা প্রাপ্তির দিনেও গান্ধীজী কলকাতায় অনশন করছিলেন। নোয়াখালির বর্বর দাঙ্গার জন্য তিনি যেতে চেয়েছিলেন। যেতে দেওয়া হয়নি। তিনি লালকেল্লায় ত্রিবর্ণ পতাকা তুলতে যাননি, কলকাতায় অনশন করছিলেন। এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ক্ষত গভীর ভাবেই বাংলার মানুষের মনে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্টরা ও বামপন্থীরা দীর্ঘ সময় তা সংযত করে রাখতে পেরেছে, এমনকি অনেকাংশে মুছেও দিতে পেরেছে। অর্ধশতক ধরে বাংলায় আন্দোলন-সংগ্রাম, জীবনজীবিকার লড়াই, প্রগতিশীল রাজনীতি, সাংস্কৃতিক প্রবাহ সেই ক্ষত মুছতে সাহায্য করেছে। সংখ্যালঘুরা পশ্চিমবঙ্গে নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র পেয়েছেন। বাবরি মসজিদের সময়ে গোটা দেশে দাঙ্গা হলেও পশ্চিমবঙ্গে হয়নি। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বাংলায় আশ্রয় নিয়েছেন। গোটা দেশে যখন সংখ্যালঘুরা নিরাপত্তার অভাবে ভুগেছেন, তখন বাংলায় সংখ্যালঘুরা জীবনজীবিকা উন্নত করার প্রক্রিয়ায় জড়িত ছিলেন। বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তির জোর হিসাবে কাজ করেছে সাম্প্রদায়িক সংহতি। এই যে নিরাপত্তাবোধ তা কোনো সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শক্তিকে মদত দিয়ে পাওয়া যাবে না। বিজেপি চেষ্টা করছে অতীতে ফিরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক চিন্তাকে জাগিয়ে তোলার। বাংলায় ওদের প্রচারের অন্যতম উপাদানই তাই। সিপিআই(এম) দৃঢ় ভাবে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, দাঁড়িয়ে থাকবেও।

গণশক্তি: সিপিআই(এম) ও বামফ্রন্ট কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ায় যাচ্ছে। এ কি কেবল ভোট বাড়ানোর লক্ষ্যে?

ইয়েচুরি: প্রথম কথা সিপিআই(এম) কংগ্রেসের সঙ্গে নির্বাচনী বোঝাপড়ায় যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। সিপিআই(এম)-র দেশব্যাপী অবস্থানই হল ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক কাঠামো, সাধারণতন্ত্র রক্ষায় যে-সমস্ত শক্তি ইচ্ছুক, তাদের ঐক্য গড়ে তোলা। একেক রাজ্যের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তার চেহারা স্থির হবে। সিপিআই(এম) কারোর অধীনস্থ নয়, কারোকে আমাদের অধীনস্থ হতেও বলছি না। বিহারের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে বামপন্থীদের ঐক্য হয়েছে। তামিলনাডুতে আমরা ডিএমকে-র সঙ্গে ঐক্য গঠন করব। পশ্চিমবঙ্গেও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির ঐক্য গঠনের আলোচনাই চলছে। বিজেপি-বিরোধী, তৃণমূল-বিরোধী শক্তিগুলির ঐক্য গঠনের প্রয়াস নেওয়া হচ্ছে। একে শুধু কংগ্রেসের সঙ্গে ঐক্য বলে দেখা উচিত নয়। এই হল সিপিআই(এম)-র অবস্থান।

***********

গণশক্তি, ১৯ নভেম্বর, ২০২০

20201118

Soumitra Chatterjee on Jyoti Basu

 ‘‘A magnetic personality’’

(published in Frontline, Volume 27, Issue 3, January 30-February 12, 2010) 



জননেতা জ্যোতি বসুর জীবনাবসানের পর তাঁকে নিয়ে ‘ফ্রন্টলাইন’ পত্রিকার একটি সংগ্রহে রাখার মতো সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, যার প্রতিটি লেখাই পাঠককূলের কাছে রসোত্তীর্ণ বিবেচিত হবে। অনেকেরই হয়তো মনে থাকবে, এই সংখ্যাতেই জ্যোতি বসু সম্পর্কে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি অনবদ্য স্মৃতিচারণা প্রকাশিত হয়েছিল। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি করেছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক সৃহৃদশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। স্মৃতিচারণাটির একটি আকর্ষণীয় অংশের অনুবাদ এখানে তুলে ধরলাম। পুরোটা পড়তেই সবাইকে অনুরোধ করবো। 

‘‘স্নেহাংশু আচার্য ছিলেন জ্যোতি বাবুর ঘনিষ্ঠতম বন্ধুদের একজন। তাঁরা বিলেতে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছিলেন। এদিকে স্নেহাংশু আচার্য আবার সম্পর্কে আমার কাকা হন। উনি ছিলেন খুবই হাসিখুশি মানুষ। কলকাতায় একবার চলচ্চিত্র উৎসবের সময় ওনাকে দেখে আমি ছুটে গেলাম, আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উনি আমাকে কলকাতা ক্লাবে ডিনারে নিয়ে যেতে চাইলেন। কিন্তু আমি কী করে যাই, জ্যোতিবাবু, উনি তখন মুখ্যমন্ত্রী, তখনও এসে পৌঁছাননি।


আমি কাকাকে সেকথা বোঝাবার চেষ্টা করছি, সেসময় জ্যোতিবাবু এসে পৌঁছলেন। কাকা সমস্ত রকম প্রোটোকল ভেঙে তাঁকে ডেকে বললেন, ‘‘এই যে জ্যোতি, একবার এদিকে এসো।’’ জ্যোতিবাবু কাকার উচ্ছ্বাস আর হাবভাব দেখে হেসে বললেন, ‘‘আচ্ছা, আসছি, আসছি!’’ ওঁরা ছিলেন ঘনিষ্ঠতম বন্ধু। জ্যোতিবাবু যখন আমাদের কাছে এলেন, তখন কাকা আমাকে দেখিয়ে বললেন, দ্যাখো জ্যোতি, এর কোন কারণ নেই যে (তুমি এসেছো বলে) এই ছোকরাকে হাসিহাসি মুখ করে এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমি ওকে ডিনারে নিয়ে চললুম। তোমাকেও ইনভাইট করছি, কিন্তু আমি জানি, তুমি এখন যেতে পারবে না।’’ 

এটা শুনে জ্যোতিবাবু হাসতে শুরু করলেন এবং আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘‘যাও, যাও, এখানকার চেয়ে ওখানে খাবার অনেক বেশি ভালো।’’

 


“One of Jyoti Babus closest friends was Snehangshu Acharya. They studied together in England. Snehangshu Acharya was an uncle of mine. He was a very jolly man. During one of the film festivals in Calcutta, I ran into him and he immediately wanted to take me away to have dinner in Calcutta Club. But I could not leave, as Jyoti babu, who was by then the Chief Minister, had not yet arrived. 

As I was trying to explain this to my uncle, Jyoti Basu walked in. Breaking all protocol, my uncle called out to him, Hey, Jyoti come over here. Jyoti babu was smiling at his exuberance and gesturing, Yes, I'm coming, I'm coming. They were the best of friends. When he walked up to us, my uncle said, Jyoti, there is no point in this boy hanging around here with a fixed smile on his face. I'm taking him out for dinner. I would have invited you, too, but I know you cant leave now.

At which Jyoti Basu laughed and, turning to me said, Go on, the food is much better out there than here.” 

(As told to Suhrid Sankar Chattopadhyay)

 


Courtesy: 

https://frontline.thehindu.com/other/article30179261.ece

 

20201115

এখনও বিশ্বাসও করি, বামপন্থাই বিকল্প

 

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

 


ছেলেবেলার বন্ধু বেণুর কথা খুব মনে পড়ে আজকাল। এই অস্থির সময়ে ওর মুখ বেশি ভাসে চোখে। কৃষ্ণনগরে এক পাড়ায় থাকতাম। আমার ফজলু কাকার ছেলে বেণু। বেণু রহমান। বেণু হিন্দুর থেকেও বেশি হিন্দু ছিল। ওঁর নিয়মকানুন মানার ঠেলায় আমি অতিষ্ঠ হয়ে যেতাম। আবার আমায় বলত, পুলু, তুমি এ সব একটু মানো। আমি ধমক দিতাম ওকে। মনে পড়ে রূপচাঁদ জেঠুর (রূপচাঁদ তপাদার) কথা। দুর্গাপুজোয় বাড়ি গিয়ে কেন দেখা করলাম না, সে জন্য জেঠুর সে কী বকুনি! জেঠু ছিলেন খ্রিস্টান।

বাড়িতে বড়রা এলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করাই রেওয়াজ ছিল। বাবার বন্ধুরা এলেই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতাম। কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে খ্রিস্টানওসব কোনও বাছবিচার ছিল না। ছেলেবেলায় সাম্প্রদায়িকতা শব্দটা শুনিনি এমন নয়। তবে আর পাঁচটা শব্দের মতোই আমাদের কাছে সাধারণ এক শব্দ ছিল মাত্রকোনও বিশেষত্ব ছিল না। ফলে মাথায় গেঁথে যায়নি। বা গেঁথে যাওয়ার মতো পরিবেশও তৈরি করা হয়নি তখন। ছেচল্লিশের দাঙ্গায় নদীয়া জেলার কোথাওই কোনও প্রভাব পড়েনি। কৃষ্ণনগরেও না। এখন সত্যিই খুব হতাশ লাগে। আমার চেনা দেশ এখন কোন অন্ধকারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আদৌ সেই অন্ধকার কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না জানি না। আমি চেনা ছন্দে আমার দেশকে আর দেখতে পাব কি না, তা-ও জানি না।

ছেচল্লিশে আমি অনেকটাই ছোট। কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, সে সব বোঝার বয়স আমার তখনও হয়নি। কলেজে ঢুকে যাওয়ার পর আর হিন্দু-মুসলমান বলে আমাদের কাছে আলাদা কিছু ছিল না। একটা বিষয় আমায় বরাবরই খুব নাড়া দেয়, জিন্নার কল ফর পাকিস্তানমুসলমানদের অধিকাংশকে এতটা আকর্ষণ করতে পেরেছিল কেন? ভীষণভাবে মনে হয়, তখন বেশিরভাগ জমিদারই ছিলেন হিন্দু আর প্রজারা মূলত মুসলিম। ফলে নিপীড়িত হয়েছেন তাঁরাই। তখন ভেবেছিলেন, পৃথক রাষ্ট্র হলে এই সমস্যাগুলি মিটবে। পাকিস্তানে হিন্দু শাসন বা হিন্দু পীড়নের প্রশ্ন থাকবে না। কিন্তু পরে প্রমাণ হয়েছে, এই ধারণা আদপে কত ভুল। তাই আরেকবার মুক্তির লড়াই করে ৭১ সালে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হয়েছিল।

আজ আশ্চর্য হই, যে শত সহস্র উদ্বাস্তু পূর্ব বাংলা থেকে এসেছেন, তাঁদের তো মুসলমানদের উপর রাগ আছেই, কিন্তু এখন এপার বাংলার মানুষদের যেন মুসলিমদের উপর রাগ আরও বেশি। পুব বাংলা থেকে আসা মানুষদের রাগের মধ্যে অভিমানও যেমন আছে, ভালোবাসাও আছে। একসঙ্গে থাকতেন। ছেড়ে আসতে হয়েছে। সেই অনূভূতি আছে। আবার মুসলমানরা যেমন তাঁদের উপর হামলা চালিয়েছে, তেমনই রক্ষাও করেছেএমন ইতিহাসও আছে। ফলে ওপার বাংলা থেকে চলে আসা মানুষদের কাছে প্রতিক্রিয়াটি মিশ্র। কিন্তু এখনকার যে প্রজন্ম সে সব দিন দেখেনি, শুধু গল্পই শুনেছে, তাঁদের মধ্যে উগ্রতা যেন বেশি। কিংবা উগ্রতা তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।

আমাদের বাড়ির দুর্গাপুজোয় কোনও ধর্মের ভেদাভেদ ছিল না। পাড়া-প্রতিবেশী, যিনি যে ধর্মেরই হোক না কেন, আমাদের বাড়ির পুজোয় আসতেন। অংশ নিতেন। তবে একটা জিনিস খুব চোখে পড়ত, মুসলিমরা যত হিন্দুদের বাড়ি যেতেন, হিন্দুরা তত যেতেন না মুসলমানদের বাড়ি। সে দিক থেকে আমি বলব, হিন্দুরা অনেক বেশি সাম্প্রদায়িক। এখন তারই উগ্র চেহারা দেখতে পাচ্ছি। আমাদের বাড়িতে এমনিতেই ধর্মবিরোধী মনোভাব ছিল।

ভাবলে অবাক লাগে, যাঁর আমলে ২০০২ সালে গুজরাটে ভয়ঙ্কর দাঙ্গা হলো, সেই তিনিই আজ ভারতবর্ষের মসনদে। ভারতবর্ষের মানুষ এদের সহ্য করছেন। তাঁদেরই ভোট দিয়ে আবার জেতাচ্ছেন। তার একটা বড় কারণ আমার মনে হয়, মানুষ শক্তিশালী কোনও বিকল্প পাচ্ছেন না। বা বুঝে উঠতেই পারছেন না। মহামারীতে এত মানুষ আক্রান্ত, এত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, এককথায় দুঃসহনীয়। তার মধ্যেও রামের নামে চলছে রাজনীতি। মজার বিষয় হলো, যে রামের নামে মন্দির তৈরি হলো, সেই রামকে কিন্তু আমরা সকলেই ছেলেবেলা থেকে চিনি, জানি। শত সহস্র বছর ধরে রাম একইরকম জনপ্রিয়। রাম আমাদের চোখের সামনেই থাকেন। ভালোবাসা, অনুপ্রেরণার জায়গা। একটা কথা বলতে পারি। যে রাম পিতৃসত্য পালনের জন্য বনবাসে যান, সেই রাম কি এই বিপুল বৈভবের মন্দিরে থাকতেন? পিতৃসত্য পালন, বনবাস সবই যদিও কল্পকথা। এগুলি আসলে আমাদের জীবনে মূল্যবোধ তৈরি করে। মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে থাকে। কিন্তু সেই মূল্যবোধগুলো আসলে কোথায়? আমাদের সংস্কৃতিকেই আমরা অবহেলা করছি। আঁকড়ে ধরিনি ঠিকমতো।

আমার বিশ্বাস, বিকল্প কেউ হতে পারলে তা বামপন্থীরাই হতে পারেন। কিন্তু সেই দৃঢ়তা কোথায়? মানুষের মনে ভরসা তৈরি করতে পারছেন কোথায়? এই সময়েই খুব হতাশ হয়ে পড়ি। এই দেশ, এই সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, বুঝতেই পারছি না। বিশ্বজুড়েই দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটছে। সব দেশের কথা বিস্তারিত জানি না। কিন্তু প্রশাসন চোখ বুজে না থাকলে এই অনাচার হতে পারে না কোথাও। এর প্রতিকার কীভাবে, সেটাই আমার জিজ্ঞাসা।


ধর্মের প্রভাব সব দেশের সব অংশের মানুষের মধ্যেই কম-বেশি আছে। কিন্তু ভারত
, পাকিস্তান, সৌদি আরবে ধর্মের গোঁড়ামি অত্যন্ত বেশি। সৌদি আরবের একজন মানুষকে বোঝানো খুব কষ্টকর যে, মুসলমান হওয়াই জীবনের সব নয়। আবার ভারতেও হাতে গোনা কয়েক জনকেই ধর্মনিরপেক্ষতা বোঝানো যায়। অধিকাংশই বুঝতে চান না। রামকে নিয়ে এই জায়গাতেই রাজনীতি চলছে। রাম যেহেতু প্রত্যেকের কাছেই এক অনুভবের ও ভালোবাসার জায়গায় আছেন, তাই হিন্দুত্ববাদীরা রামকেই ধরেছে নিজেদের সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা পূরণের জন্য। ওঁরা জানেন, রামকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হলেও কেউ বাধা দেবেন না। কারণ অধিকাংশই মনে করেন, রাম তো আমাদের নিজের লোক। আমি তো রামেরই ভক্ত। অত্যন্ত ধুরন্ধর মতলববাজ রাজনীতিকরা এ সব করে চলেছেন। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর যেভাবে বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, তা অত্যন্ত সংগঠিতভাবে। তাদের বিরুদ্ধে দেশে কী হয়েছে? যে রাজনৈতিক দলগুলি এতে বাধা দিতে পারত, তারা কোথায় ছিল? আমি বারবার সেই প্রশ্ন তুলব। মুখে বললেই হবে না। তাদের পতাকার তলায় লোককে জমায়েত করতে পারছে?

ভারতবর্ষের প্রকৃত চেহারা তো স্কুলের পাঠ্যবই থেকে পেয়েছি আমরাহিটলারের সময়ের জার্মানির সঙ্গে অনেকেই আজকের ভারতের তুলনা টানেন। কিন্তু আমি কিছুতেই সেই তুলনা করতে পারি না। অন্তত শিল্পোন্নত দেশ জার্মানি, আর আমাদের দেশ একেবারেই বেনিয়াদের। তার মধ্যে কোনও তুলনা হয় না কি? তাদের বিশ্বজয়ের দরকার ছিল, তা না হলে মাল বেচতে পারবে না। কিন্তু তাদের কার্যকলাপ এতই অমানবিক ছিল যে, পৃথিবীর মানুষ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমাদের দেশে এখন গোসেবক-গোরক্ষক এই সব নাম দিয়ে কাণ্ডকারখানা চলছে। গোমূত্র পান করলে করোনা সেরে যাবে, থালা বাজালে, বাতি জ্বালালে করোনা চলে যাবে, এগুলো ঘৃণ্য অ্যাজেন্ডা ছাড়া আর কিছু না। এই ভারতের আছে কি থালা বাজানো ছাড়া? তার আবার জার্মানির সঙ্গে তুলনা! অন্যের পিছন ধরে চলে। আর কাগজে লেখা হয়, ভারত একটা বিশাল ব্যাপার। বিশাল শক্তিশালী দেশ। কীসের জোরে এই কথাগুলি বলা হয়? নিজের তো কোনও জোরই নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এখন চীনবিরোধী কাজ চলছে। যা বলা হচ্ছে, প্রতিটি কথা চ্যালেঞ্জ করা যায়। চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে? আমেরিকা বা অন্য দেশ পাশে এসে না দাঁড়ালে ক্ষমতা আছে যুদ্ধ করার? চীনের দ্রব্য বর্জন তো আমাদের দেশের অর্থনীতিতে আরও প্রভাব ফেলছে। চীনের জিনিস কেনা বন্ধ হলে তো আমেরিকার জিনিস কেনাও বন্ধ করা উচিত। আমি বলব, চীন অতি নরমভাবেই দেখছে গোটা বিষয়টি।

৬০ বছর ধরে কংগ্রেস দেশ চালিয়েছে। কংগ্রেসের অনেক নেতাই দক্ষিণপন্থী মনোভাবাপন্ন। প্রকাশ্যে নয় ঠিকই, গোপনে। ইতিহাস খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। আমার মতে, বামপন্থীদের মূল্যায়নেও অনেক ঘাটতি থেকে গিয়েছে। গান্ধীজীর সঙ্গে আমাদের মতের অমিল ছিল বা আছেও। কিন্তু তাঁর রাজনীতির মধ্যে যে সততা ছিল, তা অস্বীকার করার নয়। আজকের রাজনীতিকদের কজনের আছে সেই সততা? এখন তা নতুন করে ভাবাচ্ছে। বামপন্থীরা তখন বলতে পারতেন তো, গান্ধী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা। কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমাদের মতবিরোধ আছে। এইটুকু বলার জায়গা থাকবে না? গান্ধীজী কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কোনও আপস করেননি। ঘোর হিন্দু হয়েও তিনি মুসলিম-বিরোধী কাজকর্ম করেছেন, এ কথা কেউ বলতে পারবে না। ভারতবর্ষকে তিনি চিনতেন তাঁর মতো করেই। জওহরলাল নেহরুর কথাও বলতে হবে এ প্রসঙ্গে। অন্য অনেক বিষয়ে বিরক্তি থাকলেও এ কথা বলতেই হবে, নেহরুও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে কোনও আপস করেননি। আমি অন্তত সুভাষচন্দ্র বসুর থেকে বড় ধর্মনিরপেক্ষ কাউকে মনে করি না। ওঁর আইএনএ-র গঠন, কাজকর্ম দেখলে বোঝা যায়। আবার সুভাষ বসুর কাছেও ভারতের শ্রেষ্ঠ ভারতীয় কিন্তু গান্ধীই।

গান-বাজনার জগতে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের কদর কমে যাওয়াকে আমি দুর্ঘটনা বলে মনে করি। যাঁরা চর্চা করতেন, তাঁরা ব্যক্তিগত জীবনে হয় তো হিন্দু বা মুসলিম। কিন্তু আসলে তাঁরা শিল্পী। একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, নাম ভাস্কর বুয়া। তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখতে গেলেন আগ্রায়। সেখানে তো সব তাবড় তাবড় ওস্তাদরা থাকেন। তেমনই এক ওস্তাদজীর কাছে নাড়া বাঁধলেন। তো সেই ওস্তাদজী ভাস্কর বুয়াকে দিয়ে এক বছর ধরে শুধু গাড়ুতে জলই ভরাতেন। কতটা দিললাগিয়েছ, তার পরীক্ষা। কতটা ধৈর্য, কতটা সহ্যশক্তি, সে সবও পরীক্ষা করতেন। আগে দীক্ষা, তারপর শিক্ষা, তারপর পরীক্ষা। এক বছর ওভাবে ছিলেন বুয়া। একবারও ওস্তাদজী বলেননি, অমুক দিন থেকে শেখাব কিছু। একদিন বুয়া ঘর ঝাঁট দিচ্ছেন, হঠাৎ ওস্তাদজী বললেন, আমার খুব মাংস খেতে ইচ্ছে করছে। মাংস নিয়ে আয় তো। মারাঠি ব্রাহ্মণ হয়ে মাংস কিনতে যেতে হবেভেবে তো কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন ভাস্কর বুয়া। কেউ দেখলে আর রক্ষে নেই। ওস্তাদজী বললেন, তুই এটুকু করতে পারবি না। তাহলে বাড়ি চলে যা। তোর আর তালিম নিয়ে কাজ নেই। উপায় না দেখে ভাস্কর বুয়া গেলেন মাংস কিনতে। ওস্তাদজীর পায়ের সামনে রাখতেই তিনি বললেন, রান্না করতে হবে। কড়াইয়ে মাংস চাপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাস্কর বুয়ার তখন এমনই অবস্থা যে, প্রায় উনুনের উপরই পড়ে যাবেন। শেষে ওস্তাদজী বললেন, কাল থেকে তোকে তালিম দেব।

আর আজ এই যে গোরু খাওয়া নিয়ে যা চলছে, কী প্রচণ্ড রাগ হয় বলে বোঝাতে পারব না। এত সস্তায় এই হাই প্রোটিন কোথায় পাওয়া যাবে? গোটা বিশ্ব গোরু খায়। সবচেয়ে বড় কথা, কে কী খাবে না খাবেতুমি (পড়ুন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা) বলে দেওয়ার কে? গোমাংস ভক্ষণে কোনও হিন্দুর আপত্তি থাকতেই পারে। কিন্তু সেই আপত্তি অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে কেন? কে কী খাবে, তা-ও তুমি বলে দেবে! এ কোথায় নামছি আমরা! গো-মাংসের ছুতো করে মুসলমান মারা হচ্ছে। এই ছবি আগে ছিল না ভারতবর্ষের। আমাদের দেশ কী, দেশের ভিত্তি কী, সেই চেহারা তো পাঠ্যবই থেকেই জেনেছি।

মোদী যখন রামমন্দিরের ভিতপুজো করলেন, সে দিন থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা নিয়ে খুব চর্চা শুরু হয়েছে, ‘দীনদানআমি সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বচ্ছন্দ নই। লোকমুখে শোনা। পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথ সব সময়েই ভীষণ প্রাসঙ্গিক। এ কথা অস্বীকার করার নয়। আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ যদি জমিদার পরিবারের সন্তান না হতেন, জমিদারি সামলাতে রবীন্দ্রনাথকে যদি গাঁয়ে-গঞ্জে যেতে না হতো, তাহলে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথই হতেন না। যুগ-যুগ ধরে ওঁর প্রাসঙ্গিকতা বিরাজ করত না। বাংলাদেশের মানুষকে এভাবে ভালোইবাসতে পারতেন না, যদি না তিনি জমিদারি সামলাতে যেতেন। শিলাইদহে গিয়ে ওঁর চোখ খুলে যায়। শহরের ছেলে হয়ে থাকলে চিনতেন কী করে দেশকে! দেশের জল-মাটি অনুভব করতেন কী করে! ভাবলেন, এই আমার দেশ। এখানে এত সমস্যা মানুষের! ব্রাহ্মবাড়ির ছেলে হওয়ায় ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি কখনওই ছিল না রবীন্দ্রনাথের। হিন্দুদের সঙ্গে বরং অনেক অমিলই ছিল। সেই সঙ্গে অবশ্যই ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব বড় কথা। মুসোলিনির সঙ্গে দেখা করতে ইতালি চলে গিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু রোমা রোলাঁদের বকাবকিতে নিজের ভুলও বুঝেছিলেন। বিদ্যাসাগরের কথা বলব। তিনি নিজে সংস্কৃতের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত হয়েও বেদ-বেদান্তের থেকে ইংরেজি সাহিত্য, বেকন পড়ানোর উপরই জোর দিয়েছেন।

শেষে বলব, গোঁড়ামি তৈরি করতেই চালাকি করে ধর্ম আর রাজনীতি মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কে রামকে ভালোবাসল, কে রহিমকেতা কোনও ব্যাপারই হতে পারে না। তাই বারবার মনে হয়, এসবের বিকল্প হতে পারে একমাত্র বামপন্থাই।

 

গণশক্তি শারদ ২০২০