20220205

শিলিগুড়িও আধুনিক হয়েছে বামফ্রন্টের হাত ধরেই

 অশোক ভট্টাচার্য

 

আর কয়েকদিনের মধ্যে অবশেষে শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন হতে চলেছে। অবশ্যই যদি রাজ্য নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। করোনার অজুহাতে নির্বাচন প্রথমে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেক জনমত ও নাগরিক আন্দোলনের চাপে রাজ্য সরকার ও রাজ্য নির্বাচন কমিশন ২২জানুয়ারি চারটি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। পরে তা পিছিয়ে দিয়ে নির্বাচনের দিন পুনঃনির্ধারণ করা হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। যদিও করোনার প্রকোপ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

ইতিমধ্যে বামফ্রন্ট সহ সমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারের কাজ অব্যাহত রেখেছে। বামফ্রন্ট সমস্ত করোনা বিধি মান্য করেই প্রচারের কাজ চালিয়ে গেলেও, তৃণমূল কংগ্রেস দল কিন্তু তা মেনে চলছে না। ইতোমধ্যে তাদের এক প্রধান নেতা করোনা বিধি না মেনে প্রচারের কাজ চালানোর ফলে নিজে যেমন অসুস্থ হয়েছেন সেই সংক্রমণে সংক্রমিত হয়েছেন তাদের দলের অনেক কর্মী ও নেতারাও। এই নিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঠছে।

যে চারটি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে তার মধ্যে শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৫সালে রাজ্যের সর্বশেষ পৌর কর্পোরেশনগুলির নির্বাচনে একমাত্র শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনেই বামফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে পৌরবোর্ড গঠন করেছিল। রাজ্যের বিভিন্ন পৌর কর্পোরেশন বা পৌরসভার নির্বাচনগুলিকে শাসকদল পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রহসনে পরিণত করেছিল। তা পারেনি কেবলমাত্র শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনে। কারণ বামফ্রন্ট সেই সময় সব দল, তথা দলমত নির্বিশেষে সমস্ত ভোটদাতাদের কাছে নিজের ভোট নিজে দেওয়া, বাধা এলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আবেদন জানিয়েছিল। মানুষ সেই আবেদনে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছিলেন এবং নিজের ভোট নিজের পছন্দমতো প্রার্থীদের দিতে পেরেছিলেন। ফলে বামফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছিল। কিছু সংবাদমাধ্যম একেই বলেছিল শিলিগুড়ি লাইন। আর একটি বিষয় হলো নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বামফ্রন্টকে পৌরবোর্ড পরিচালনা করতে হয়েছিল বহু বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে। শাসকদল নানাভাবে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল দলত্যাগের। হুমকি দেওয়া হয়েছিল নির্বাচিত পৌরবোর্ড ভেঙে দেবার ও জবরদখল করার। ওই পৌরবোর্ড এতো বাধার মধ্যে উন্নয়ন ও উন্নত পরিষেবা প্রদানের কাজ করেছিল সাফল্যের সাথে।

বামফ্রন্ট পরিচালিত সেই পৌরবোর্ড একদিকে উন্নয়নের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের জন্যে যেমন লড়াই করেছিল, তেমনি লড়াই করে বহু দাবি আদায় করেছিল, আবার নিজস্ব উদ্যোগে আয় বাড়িয়ে বহু উন্নয়নমূলক কাজও করেছিল। কাজ করেছিল মানুষকে সাথে নিয়ে সৎ ও স্বচ্ছভাবে। বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল শহরের বুনিয়াদি পরিষেবা প্রদান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ। সেইসব কাজ শহরের মানুষের চোখের সামনে রয়েছে। এতো বাধার মধ্যে বামফ্রন্ট শাসক দলের ও রাজ্য সরকারের চোখ রাঙানির কাছে মাথা নিচু করেনি। করেনি আত্মসমর্পণও। শিলিগুড়ির মানুষ এরজন্য গর্ববোধ করে।

এই শহরের মানুষ জানে শিলিগুড়ির উন্নয়ন ও বামফ্রন্ট সমার্থক। মানুষ দেখেছে ও তারা জানে শিলিগুড়িকে রাজ্য তথা দেশ ও বিদেশের কাছে তুলে ধরেছে বামফ্রন্টই। একটি ছোট্ট জনপদকে একটি মেট্রো শহরের দিকে নিয়ে গেছে বামফ্রন্টই। বামফ্রন্টই শিলিগুড়িকে পৌরসভা থেকে পৌর কর্পোরেশনে উন্নীত করেছে। মানুষ বিগত ৪০ বছরের মধ্যে একবারই মাত্র তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস জোটের পৌরবোর্ডকে নির্বাচিত হতে দেখেছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বলে তারা জোটবদ্ধভাবে সেই পৌরবোর্ডকে পরিচালনা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে সেই পৌরবোর্ডকে তারা চার বছরের বেশি সময় অব্যাহত রাখতে বা পরিচালনা করতে হয়েছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অন্যদিকে শহরের মানুষ দেখেছে এই শহরের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে বিগত বামফ্রন্টের পৌরবোর্ড, বামফ্রন্ট পরিচালনাধীন শিলিগুড়ি—জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সেই সময়ের রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের উদ্যোগে। এই শহরের ঘরে ঘরে পানীয় জল সরবরাহ, প্রতিটি গৃহ থেকে জঞ্জাল সংগ্রহ করা, ওয়ার্ড ভিত্তিক জঞ্জাল সংগ্রহ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে ওয়ার্ড বর্জ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ওয়ার্ড কমিটি গঠন এসব বামফ্রন্ট পৌর বোর্ডেরই সুফল। শহরে যতো বড় বড় রাস্তা বা রাস্তা প্রশস্তকরণ, ডিভাইডার নির্মাণ, ফুটপাত, রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, পাকা নালা নির্মাণ, জল নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন, শহরের মধ্যে যানজট জটিলতা হ্রাস করতে বামফ্রন্টই নির্মাণ করেছিল তিনটি উন্নতমানের বাইপাস, চারটি মহানন্দা সেতু, প্রায় ১৫টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে ফুলেশ্বরী, জোড়াপানি, পঞ্চনই, মহিষমারি নদীর ওপর। এই শহরের দুটি ফ্লাইওভারও নির্মিত হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে। তিনটি আন্ডারপাস, রাস্তার ধারে এলইডি আলো। বস্তি উন্নয়ন, পাড়ার রাস্তার উন্নয়ন, বস্তির সার্বিক উন্নয়ন তাদের জমির পাট্টা, লিজ প্রদান, দলিল দেওয়া সবই হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকারের সময়ই।

শহরের মধ্যে যানজট হ্রাস করতে শহরের বাইরে পরিবহণ নগর, তিনটি উপনগর, বিঞ্জান নগরী, ট্রাক টার্মিনাল, উন্নতমানের দুটি বাস টার্মিনাল, শ্মশানঘাটে বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন, কারবালা উন্নয়ন এসবও হয়েছে বামফ্রন্ট জমানায়। বামফ্রন্ট শিক্ষা, সংষ্কৃতি, খেলাধুলার উন্নয়নে রেখে গেছে বিরাট অবদান। এই শহরে কাঞ্চনজঙ্ঘা  ক্রীড়াঙ্গন, ইন্ডোর স্টেডিয়াম, দীনবন্ধু মঞ্চ, সুইমিং পুল, ক্রীড়াদীপ্তি সবই বামফ্রন্টের অবদান। এই শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান। বামফ্রন্টের সময়েই হয়েছে দুটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান ও পলিটেকনিক কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং কলেজ। বামফ্রন্টের সময়ে পাঁচটি নতুন সংগঠিত বাজার নির্মাণ, তিনটি বাজার নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, ডি আই ফান্ডকে পৌরসভার হাতে আনা ইত্যাদি কাজও হয়েছে। মহানন্দা নদী সংস্কার প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছিল বামফ্রন্টের সময়ে। রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেস দলের সরকার আসবার পর তাদের পরিচালিত এসজেডিএ’র চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যরা জড়িয়ে পড়েছিল ২০০ কোটি টাকার লুট ও দুর্নীতির সাথে। আজ সেই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বামফ্রন্ট পরিচালিত এসজেডিএ বোর্ডের কাজের সাফল্যই টি পার্ক, ফুড পার্ক, আনারস পার্ক, ড্রাই পোর্ট ইত্যাদি কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প সমূহ। বামফ্রন্টই উদ্যোগ নিয়েছিল উত্তরায়নে ২৫একর জমির ওপর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণে বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোন নির্মাণের। বর্তমান রাজ্য সরকারের একজন মন্ত্রীর উদ্যোগে সেই প্রকল্পের উদ্যোগে বাতিল ও বানচাল করে দেওয়া হয়। কোয়ানটাম তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রটিও বামফ্রন্টের উদ্যোগের সুফল। বর্তমান রাজ্য সরকারের সময়ে তাও মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে।

শিলিগুড়ি শহরের সমস্ত স্বীকৃত ও অস্বীকৃত বস্তিগুলির যতো উন্নয়ন হয়েছে তা হয়েছে বামফ্রন্টের সময়তেই। কম করেও প্রায় ১০হাজার উদ্বাস্তু ও সরকারি উদ্যোগে বা পৌরসভার উদ্যোগে জমির দলিল, পাট্টা বা লিজ দলিত পেয়েছে বামফ্রন্টের উদ্যোগেই।

বামফ্রন্টের নেতৃত্বে বিগত পৌরবোর্ডের সময়ে সমস্ত ওয়ার্ডে অজস্র রাস্তাগুলিকে ম্যাস্টিকে উন্নীত করা হয়েছে। রাস্তার ধারে উন্নত পাকা নালা নির্মাণ করা হয়েছে। সমস্ত রাস্তায় এলইডি আলো লাগানো হয়েছে। নতুন অফিস ভবন ও স্বাস্থ্যভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। শ্মশানঘাটে নতুন দুটি বৈদ্যুতিক চুল্লি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। বিদ্যাসাগর নাট্য মঞ্চ, চারটি নতুন পার্ক, নদীর ঘাট উন্নয়ন, নদী তীরের সৌন্দর্যায়ন, বিসর্জনঘাটের উন্নয়ন ইত্যাদির পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বামফ্রন্টই নিয়েছে।

পৌর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, সততা, দ্রুততা, দায়বদ্ধতা, বিকেন্দ্রীকরণ বামফ্রন্টেরই সাফল্য। পৌরসভা বামফ্রন্ট পরিচালনা করেছে সবসময়ই গণতান্ত্রিকভাবে। বিরোধীদেরও দেওয়া হয়েছে সমান অধিকার ও মর্যাদা। কোনোরকম রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হয়নি। শিলিগুড়িকে একটি পরিকল্পিত শহর হিসাবে গড়ে তুলতে প্রস্তুত করা হয়েছিল ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। জমির সদ্‌ব্যবহার মানচিত্র, জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কিত পরিকল্পনা, পরিবেশে দূষণ হ্রাসের পরিকল্পনা ইত্যাদি। যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হয়েছিল। শিলিগুড়ির উন্নয়নে বামফ্রন্টের সাফল্যের ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না।

তাই এই নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিটি মানুষের মুখে একটিই কথা, শিলিগুড়ির যাবতীয় উন্নয়ন হয়েছে বামফ্রন্ট পৌরবোর্ডের সময়েই। একমাত্র বামফ্রন্টের হাতেই শিলিগুড়ি শহর থাকতে পারে সুরক্ষিত। শিলিগুড়ি শহরের আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মান ধরে রাখতে পারে বামফ্রন্টই। এই কারণেই এই শহরের মানুষ পুনরায় বামফ্রন্টের পৌরবোর্ডকেই দেখতে চায়। তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপি—কে ভোট দেওয়া মানে শিলিগুড়ি শহরকে আরও দশ বছর পিছিয়ে দেওয়া। অনুন্নয়ন, অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্যকে ডেকে আনা। মানুষ তা চায় না। এই শহরের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে দেখেছে ২০০৯ সালে। বিগত ৮মাস প্রশাসক মণ্ডলীর চেয়ারম্যান ও বোর্ডে তৃণমূলীদের মানুষ দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি মানুষ চায় না। এই শহর উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। এই শহরের বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। সাম্প্রতিক তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনে তাদের দলবাজি, দাম্ভিকতা, কাটমানি মানুষ দেখেছে। এই কারনে তারা শিলিগুড়ির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তৃণমূল কংগ্রস ও বিজেপি—কে চায় না। তারা তাদের সুরক্ষা নিরাপত্তা, সম্মান, আত্মমর্যাদা, শান্তি সম্প্রীতির জন্যেই চায় বামফ্রন্টকে পৌরবোর্ডে ফিরিয়ে আনতে। এই চর্চা আজ শহরের সর্বত্রই দলমত নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে চর্চিত হচ্ছে।

শিলিগুড়ির মানুষ আর একবার বামফ্রন্টের পক্ষে ইতিবাচক রায় দিয়ে ২০১৫সালের পুনরাবৃত্তির দিকে তাকিয়ে আছে। শিলিগুড়ি চায় আরও উন্নততর শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি চায় আরও বসবাস উপযোগী শহর। যেখানে গরিব, মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে থাকবে ভারসাম্য। পরিবেশের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখেই হবে উন্নয়ন। গরিবদের বসবাসের ক্ষেত্রে থাকবে নিশ্চয়তা। পৌরসভা হবে গরিব মধ্যবিত্ত অভিমুখী। বস্তি রেখেই হবে বস্তির উন্নয়ন। এইরকম এক পৌরসভা দিতে পারে একমাত্র বামফ্রন্টই। 

 

গণশক্তি, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

 

20211205

রাত জাগা প্রত্যয়ের কাছে সেদিন হেরেছিল উন্মাদনা

 

সুদীপ্ত বসু

 

রাত জাগা সুরু সেই রবিবার থেকেই।

গার্ডেনরিচ-মেটিয়াবুরুজ থেকে খিদিরপুর, এন্টালি, ট্যাংরা, তিলজলা, পার্কসার্কাস, বেনিয়াপুকুর, বেলগাছিয়া। কোথাও ত্রিপল খাটিয়ে কোথাও বা পার্টি অফিসেই ক্যাম্প করে রাতের শহরের গলি, বড় রাস্তা, মহল্লার দখল নিয়েছিল লাল ঝান্ডার কর্মী,সংগঠকরা।

সেদিন শুক্রবার (৪ঠা ডিসেম্বর)। করসেবকরা তখন অযোধ্যামুখী।

অন্যদিকে শহীদ মিনারে তখন বামফ্রন্টের জনসভা। জ্যোতি বসুর বার্তা, ‘আমরা কোন মধ্যযুগে আছি তা আত্মসমীক্ষা করা দরকার। রামের নামে মানুষ খুন চলতে পারে না। সাধু সন্তরা ধ্যান করুন, উপাসনা করুন, অসুবিধা নেই, কিন্তু দেশ চালাবেন এটা হতে পারে নাস্পষ্ট বার্তা। সেই জনসভা থেকে বামফ্রন্ট কর্মী ও রাজ্যের মানুষের কাছে আবেদন কোনভাবেই এবাংলার সম্প্রীতির ঐতিহ্য দুষ্কৃতীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না, তা যে কোন মূল্যে রক্ষা করতে হবে।

সেদিনই শহরের অন্যপ্রান্তে তখন চলছে কংগ্রেসের সভা। মমতা ব্যানার্জি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। রাম মন্দির, বাবরি মসজিদ নিয়ে কোন শব্দ নেই সেই সভায়। বরং সি পি এম ক্যাডার নামিয়ে এসব উত্তেজনা ছড়াচ্ছে, ওসব কিছু হবেনা এসব বলে ৬ই ডিসেম্বরের আগে সেই সভা থেকে সি পি আই(এম)র বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আন্দোলন গড়ার ডাক দেন মমতা ব্যানার্জি।

 

মন্বন্তর থেকে খাদ্য আন্দোলন, জমির আন্দোলনে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া শহর, এমনকি ১৯৮৪ সালে শিখ বিরোধী দাঙ্গাও  রুখে দেওয়া কলকাতা তখন এক অজানা শঙ্কা ঠেকানোর প্রস্তুতিতে।

    ৬ই ডিসেম্বর,দুপুর ১:৫৫মিনিট, সৌধের গম্বুজ ভেঙে ফেললো কয়েক হাজার করসেবক। তার মাত্র দুমাস পরে কলকাতায় এসে উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যান সিং বলেছিলেন, ভগবানের আশীর্বাদ ছাড়া এটা সম্ভব ছিলো না।যদি আমরা ঠিকাদার নিয়োগ করতাম এই সৌধ ভাঙার জন্য তাহলেও কমপক্ষে দেড় মাস সময় লাগতো ভাঙতেবর্বরতার উচ্ছ্বাস!

      দুপুর থেকেই সেই ধ্বংসলীলার ছবি ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশ জুড়ে। উত্তেজনা, আশঙ্কা বাড়তে থাকে প্রতি সেকেন্ডে। কালক্ষেপ করেনি তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। সন্ধ্যা থেকেই রাস্তায় নামেন বামফ্রন্ট কর্মীরা। একের পর এক খবর আসতে শুরু করে। তাতে গুজবও ছিল। এন্টালিতে বোমা পড়েছে, গার্ডেনরিচে হামলা শুরু হয়েছে, খিদিরপুরে, ট্যাংরায় প্রকাশ্যে বাড়তে শুরু করেছে দুষ্কৃতীদের জমায়েত।

২৫ বছর আগের এক সকালে সতর্কবার্তা গিয়েছিল এই শহর থেকেই। না শোনার মাশুল আজও গুনছে বৃহত্ত গণতন্ত্র।

 


দিনরাতের প্রহরী, কঠোর সরকার...

 

   পরেরদিনই বন্‌ধ ডাকে রাজ্য বামফ্রন্ট।  ৮ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয়ভাবে দেশজুড়ে বন্‌ধ ডাকে বামপন্থী দলগুলি। তাতেও সমর্থন জানায় রাজ্য বামফ্রন্ট। টানা ৪৮ ঘণ্টা বন্‌ধ আসলে দুষ্কৃতী, দাঙ্গাবাজদের স্বাভাবিক গতিবিধি ঠেকাতেই। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তখন পুলিশের পাশাপা‍‌শি আধা সামরিকবাহিনী মোতায়েন করা হয় কলকাতার ৩৫টি থানা এলাকায়। হাওড়া, বর্ধমানেও বেশ কিছু জায়গায় কারফিউ জারি করা হয়।

৬ই ডিসেম্বর রাতেই জ্যোতি বসুর আবেদন, ‘হাঙ্গামা বাধানোর চেষ্টা হলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি। তবে শুধু প্রশাসন নয়, মানুষকেই ঐতিহ্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে হবে। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সারা রাত ছিলেন রাইটার্স বিল্ডিংয়ে।

এই ঐতিহ্যের সাক্ষী বাংলার মাটি।

ওদিকে তখন বন্দর এলাকার বটতলা, মুদিয়ালি, ফতেপুর, কাচ্চি সড়ক, ধানখেতি, কাশ্যপ পাড়ায় উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। ৬ই ডিসেম্বর রাতে হরিমোহন ঘোষ কলেজের সামনে পার্টি অফিসেই হল ক্যাম্প। সারা রাত জেগে সি পি আই (এ‌ম) কর্মীরা। তখন একটাই থানা মেটিয়াবুরুজ।

সেদিনের সেই টানা ছয়দিনের অভিজ্ঞতা এখনও উজ্জ্বল লড়তে থাকা প্রতিটি চেতনায়। নাহ! এর জন্য ব্রাহ্মণ সম্মেলন, ইমাম ভাতা বা পুজো কমিটিকে ভিক্ষার দান দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি

ততক্ষণে বেশ কিছু জায়গায় লুটপাট শুরু হয়ে গেছে, বাড়িঘর ভাঙচুরও হয়েছে। বন্দর এলাকায় বটতলা, মুদিয়ালি, ফতেপুর, কাচ্চি সড়ক, ধানখেতি, কাশ্যপ পাড়ায় উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। মুসলিম মহল্লা, হিন্দু এলাকায় পালা দিয়ে ছুটছেন সি পি আই (এম) কর্মীরা। দাঙ্গা বাধানো সহজ, কিন্তু উন্মত্ত জনতাকে শান্ত রেখে অশান্তি এড়ানো কঠিনতম কাজ। সেই কাজেই তখন হাত লাগিয়েছেন সি পি আই (এম) সহ বামপন্থীরা। জারি হয়েছে ১৪৪ ধারা।যদিও সেনাবাহিনী সামান্য দেরিতে আসা নিয়ে তখন ক্ষোভও তৈরি হয়।

৭ই ডিসেম্বর থেকে মিছিলও শুরু হয় বিভিন্ন এলাকায়, গলির ভিতরে। দুপুরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু মহাকরণে জানান, হাওড়া, আসানসোল, বারাকপুর থেকে গন্ডগোলের খবর আসছে। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। আরও সেনা মোতায়েন করছি, কেন্দ্রের সঙ্গে কথা হয়েছে। ততক্ষণে রাজাবাজার, গার্ডেনরিচ, বেনিয়াপুকুর, কড়েয়া, জোড়াসাঁকো থানা এলাকায় সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে। কাশীপুর, চিৎপুর, একবালপুর, ওয়াটগঞ্জ, আমহার্স্ট স্ট্রিট, হেস্টিংস থানা এলাকাতেও চলছে টহল।

এসব নিছকই তথ্য নয়। একটা আস্ত ইতিহাস।

ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াইয়ে একটা রাজ্য সরকারের ইস্পাতদৃঢ়তার সেই ইতিহাস।

৭ই ডিসেম্বরের সফল, সর্বাত্মক বন্‌ধের পরে ১০ই ডিসেম্বর ছিল মহামিছিল। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায়। দাঙ্গার কবলে পড়া এন্টালি, তপসিয়ার পায়ে হেঁটে ঘুরছেন বিমান বসু।

আরও একটি তাৎপর্যের ঘটনা হল, সেই সময় লাগাতার কয়েকদিন কার্ফু থাকায়, বেশ কিছু এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি হওয়ায় গরিব বস্তিবাসী এলাকায় ঘরে মজুত খাবারে টান পড়ে। সি পি আই (এম) কর্মীরা একদিকে এলাকা পাহারা অন্যদিকে ক্যাম্প করে খিচুড়ি রান্না করে গরিব বস্তিবাসী, আক্রান্তদের ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন। ঘরে আটকে থাকা শিশু, বৃদ্ধদের জন্য ওষুধের ব্যবস্থাও করেছিলেন তাঁরা।

সম্প্রীতি রক্ষার সেই লড়াই তখন এক অন্য উচ্চতার স্তরে যা মানুষের হৃদয়ে আজও যত্ন করেই রাখা।

 


 

তবু জেগে আছে বুক বেঁধে...

 

উত্তর কলকাতার বেলগাছিয়া। অনায়াসে দাঙ্গার আগুনে ছারখার হতে পারতোসে সময় বেলগাছিয়া মুসলিম বস্তি, কুন্ডু লেন, রেলওয়ে কলোনী মিলিয়ে লক্ষাধিক মানুষের বাস ছিল। তার মধ্যে প্রায় চল্লিশ হাজার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। কিন্তু দাঙ্গার আগুন স্পর্শ করতে পারেনি এই জনপদ। মন্দির, মসজিদের দেওয়ালে একটা আঁচড় পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। পার্টি, গনসংগঠন, শান্তি কমিটি, বস্তি ফেডারেশন তখন অক্লান্ত উদ্যমে ময়দানে, প্রায় এক সপ্তাহ ঘুম নেই যেন কারও। উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা ছিল বেলগাছিয়া আমন কমিটির। কারফিউ জারি হওয়ার ফলে দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে সি পি আই (এম) কর্মীরা তখন চাল, ডাল, মুড়ি কিনে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন।

এমনকি এই সু‍‌যোগে যাতে জিনিসপত্রের দাম যাতে বাড়তে না পারে তার জন্যও নেমেছিলেন সি পি আই (এম) কর্মীরা। জিনিস মজুত করে দাম বাড়ানোর ফাটকাকারবারীদের কৌশল ব্যর্থ করেছিল সেই লাল ঝান্ডাই। শুধু তাই নয় প্রবীনদের স্মৃতির পাতায় এখনও যেন রোদের উঁকিঝুঁকি। শুধু পাড়ায় পাড়ায় নজরদারি নয় বেলগাছিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজ যাতে নির্বিঘ্নে কোয়ার্টারে ঝিলে স্নান করতে পারেন সে দিকেও নজর রাখতে হয়েছে।

দাঙ্গার আগুন এখানে নিভেছিল ঐতিহ্যের পরশে।

ট্যাংরার মতো উত্তেজনা প্রবণ এলাকায় এক অনন্য দৃশ্য হিন্দুস্থান গ্যাস মোড়, প্রভুরাম, সরকার লেন, পেমেন্টাল গার্ডেন লেনে রাস্তার মোড়ে দুধারে দাঁড়িয়ে উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজন।পতাকা ছাড়াই। কোন পক্ষ থেকে যেন কেউ উত্তেজনা ছড়াতে না পারে। মুসমিল সম্প্রদায়ের মানুষ রক্ষা করেছেন হিন্দু গৃহবধূকে, মুসলিম শিশুর দুধ যোগাড় করেছে হিন্দু পরিবার, মন্দির মসজিদে উড়েছে শান্তি শ্বেতপতাকা।

এই দৃশ্যেরও সাক্ষী ছিল কলকাতা!!

১৫ই ডিসেম্বর কলকাতা ও হাওড়ার সিংহভাগ এলাকা থেকে উঠলো কারফিউ। মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় তিন হাজারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী জ্যো‍‌তি বসুর কঠোরতম বার্তা, ‘‘পুলিশকে বলেছি হাঙ্গামাকারীরা কোন দল দেখার দরকার নেই। দলমতনির্বিশেষে সব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে হবে। এব্যাপারে আমরা সবাই সাহায্য করবো। কংগ্রেসকেও বলছি আপনারাও সাহায্য করুন। কারণ যারা হাঙ্গামা করছে তাদের রাজ‍‌নৈতিক পরিচ‌য়ের কোনো দরকার নেই, ওরা অপরাধী।’’

এই দৃঢ়তা দেখানোর জন্য কলজে দরকার। কোনো দুর্নীতিতে ফেঁসে গিয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মুখাভিনয় করতে হয়নি বামপন্থীদের।

গণশক্তির পাতায় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বিপ্লব দাশ্গুপ্তের উত্তর সম্পাদকীয়, ‘১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার প্রতিরোধের ক্লাইম্যাক্স হল সেই সত্তর হাজার মানুষের দীর্ঘ মহামিছিল যার পর সাম্প্রদায়িক শক্তি আর ফনা তুলতে পারেনি। আগামী ১৫ই ডিসেম্বরের মহামিছিল হোক আরও বড় আসুক হিন্দু, মুসলিম, শিখ সব অন্য সব মানুষ। মিছিলের জনতরঙ্গে, অসংখ্য মানুষের নিঃশব্দ ঘৃণার বীজ অগ্নি নিঃশ্বাসে পুড়ে যাক ওই অভিশপ্ত, ভয়ঙ্কর দাঙ্গার স্বপ্ন।

১৫ই ডিসেম্বর গোটা দেশ দেখেছিল এক ঐতিহাসিক মহামিছিল।

তৎকালীন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান শৈলেন দাশগুপ্তের আহ্বান, ‘অগ্নি পরীক্ষার মুখোমুখি আমরা, আমাদের উত্তীর্ণ হতেই হবে।

ইতিহাস সাক্ষী সেই পরীক্ষায় আমরা উত্তীর্ণ হয়েছিলাম।

সময়ের ব্যবধানে আবার আমরা, আমাদের রাজ্য দেশ পরীক্ষার মুখে। উত্তীর্ণ হতেই হবে।

 


সেদিন কেন ব্যবস্থা নিলেন না সৌধ রক্ষার...

লিবেরহান কমিশনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে জ্যোতি বসু বলেছিলেন ‘...বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দুদিন আগে আমি প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে বলেছিলাম, চারদিক দিয়ে উদ্বেগজনক সব খবর আসছে। করসেবকরা প্রস্তুতি শুরু করে দিয়ে। তবে উনি আমায় বলেন, কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক আছে, সেখানে পরিস্থিতি আলোচনা করে তবে কেন্দ্রের তরফে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। মসজিদের কাঠামো মাটিতে মিশে গেলো, মানুষ দেখল তা। জানা গেছে বেশ কয়েকজন বি জে পি শীর্ষনেতা ঘটনাস্থলে ছিলেন। এখন তাঁদের কয়েকজন বি জে পি সরকারের মন্ত্রিসভাতেও রয়েছেন। এরপরে যখন হরকিষেন সিং সুরজিৎ আর আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম তখন জিজ্ঞাসা করি, কেন মসজিদ রক্ষায় কোন ব্যবস্থা নিলেন না। উনি শুধু বললেন, আমি কী করে একজন মুখ্যমন্ত্রীকে (উত্তরপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী কল্যান সিং) অবিশ্বাস করবো। উনি আমায় কথা দিয়েছেন সেরকম কিছু হবে না।

হয়েছিল ঠিক উল্টো।

 

দ্য মোস্ট সিভিলাইজড মেট্রোপলিস...

জীবনের জন্য আকুতি কী তীব্র হতে পারে, কী হৃদয়স্পর্শী হতে পারে তাঁর এক ছবিতেই তা দেখেছিল গোটা দেশ।বারান্দায় দাড়িয়ে নিজের দুই সন্তান, স্ত্রীর প্রানভিক্ষার আর্তি,চোখে মুখে আতঙ্ক- ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার প্রতীক হয়ে দাড়িয়েছিল সেই একটি ছবি-ই। কুতুবুদ্দিন আনসারি। আশ্রয় পেয়েছিল এই পশ্চিমবঙ্গেই, নিজের জন্মভূমি ছেড়ে এসেছিলেন এই শহরেই।২০১২ সালে গুজরাট নির্বাচনে প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। হাত ধরে স্পষ্ট বলেছিলেন, ‘আপনারা আক্রান্তকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গ যেন এমনই থাকে, তা যেন গুজরাট না হয়

১৯৯৯ সাল।মুম্বাইতে বি জে পি-আর এস এস বাহিনীর মুখে আক্রান্ত বলিউডের কিংবদন্তী দিলীপ কুমার। এদেশের বুকে কমিউনিস্ট বিরোধী বলেই পরিচিত দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা পর্যন্ত ১৩ই জুলাই সম্পাদকীয় লিখল: ‘Dilip says he may be forced to abandon Mumbai and live else-where. If he wants to live in the most civilised metropolis in the country he come to Calcutta..’ অর্থাৎ স্টেটসম্যানের মত কাগজও লিখতে বাধ্য হয়েছিল উগ্র হিন্দুত্ববাদী শক্তির আস্ফালন থেকে যদি রক্ষা পেতে হয় তবে পশ্চিমবঙ্গই আদর্শ আশ্রয়স্থল। তখন রাজ্য বামফ্রন্ট সরকার।

এই ঐতিহ্য-ই আমাদের গর্ব।আমাদের শ্লাঘা বোধ। তা রক্ষা করাই সময়ের ডাক।

 

আজকের প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা...

সেই ঐতিহ্যের মাটিতেই গো-রক্ষার নামে ধূপগুড়িতে ১৯ বছর বয়সী দুই কিশোরকে পিটিয়ে খুন করা হয়েছিল। রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাটের মত এরাজ্যেও গো-রক্ষার ব্যানারে মানুষ খুন। ধূপগুড়ির ঘটনায় গ্রেপ্তার হয় তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য সহ মোট ছয় জন। এই ঘটনায় মোট ৬জন গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এস এসর চারজন, তৃণমূলের ২জন। ক্রমেই প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার এক মডেল হয়ে উঠছে বাংলা।

ইতিহাসের পাতায় লেপ্টে থাকা সাম্প্রদায়িক অশান্তি ঠেকানোর বামপন্থীদের এই ভূমিকার পাশেই আজকের বসিরহাট থেকে ধূলাগড় হয়ে ক্যানিং। রাজ্যে তৃণমূল সরকার। প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার কৌশলী রাজনীতি নিয়ে যে সাম্প্রদায়িকতার ভয়াবহতাকে রোখা যায় না তা স্পষ্ট হচ্ছে বারেবারে।

খাস কলকাতা বন্দর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তিনজনকেই। তিনজনেই তৃণমূলের সক্রিয় কর্মী,  একজন আবার  হরিমোহন ঘোষ কলেজের তৃণমূলী ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তিনজনে বিরুদ্ধেই ছিল মারাত্মক অভিযোগ- পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আই এস আই-র এজেন্ট হিসাবে কাজ করার।

আবার, গত দুবছরে শারদোৎসবের পরে বিসর্জন ও মহরমের ঘটনাকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক শক্তির উসকানিতে রাজ্যের কয়েকটি জায়গায় রীতিমত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, কোথাও কোথাও তা সংঘর্ষের চেহারা নেয়। যেমন নৈহাটির হাজিনগর। ২০১৫ সালে এই ঘটনাতেও পুলিশ বাধ্য হয় এক কাউন্সিলর তৃণমূলের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করতে। যদিও রাজ্যের এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর ফোনে দুর্বল মামলা রুজু করে তাদেরও ছেড়েও দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল যখন বি জে পি-কে রাজনৈতিকভাবে অচ্ছুৎবলেছিলো, তখন কংগ্রেসের ভিতরে থেকেও মমতা ব্যানার্জি বি জে পি-কে অচ্ছুৎ বলতে চাননি। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল তৈরির পরেই হাত মিলিয়েছিলেন বি জে পি-র সঙ্গে।২০০৩ সা‌লে ১৫ই সেপ্টেম্বর নয়া‌দি‌ল্লি‌তে আর এস এস-এর মুখপত্র পাঞ্চজন্য’-কমিউনিস্ট টেররিজমনামে সংকলন প্রকাশ অনুষ্ঠা‌নে মমতা ব্যানার্জিট সগর্ব ঘোষনা , ‘‘ক‌মিউনিস্ট‌দের বিরু‌দ্ধে আপনা‌দের লড়াই‌য়ে আমরা আ‌ছি। য‌দি আপনারা আমায় ১শতাংশ সাহায্য ক‌রেন, আমরা ক‌মিউনি স্ট‌দের সরা‌তে পার‌বো..আপনারাই হলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।‌বি‌ জে পি-র তৎকা‌লীন রাজ্যসভা সাংসদ বলবীর পুঞ্জ প্রত্যুত্তরে ব‌লেছিলেন,‘‘আমা‌দের প্রিয় মমতাদি‌দি সাক্ষাৎ দুর্গা

২০১১ সালে তৃণমূল সরকারে এসেছে। এর মাঝে শাসকদল হিসাবেই  ৬ই ডিসেম্বর গান্ধীমূর্তির সামনে সভা করেন মমতা ব্যানার্জি। ৬ই ডিসেম্বরের সভা অথচ বাবরি মসজিদ ধ্বংস, আর এস এস এবং বি জে পি-র ভূমিকা অনুচ্চারিত রেখে দেওয়া- সম্ভবত এদেশের বুকে মমতা ব্যানার্জিই তা করে দেখাতে পেরেছেন। বাজপেয়ী অসাম্প্রদায়িক লোক/আদবানী কট্টর লোকআদবানী ভালো লোক/মোদী খারাপ লোকমোদী ভালো লোক/অমিত শাখারাপ লোকখবরের কাগজের পাতায় মমতা ব্যানার্জির বি জে পিবিরোধী অবস্থানের চেহারা এটাই।

শাসকদলের সন্ত্রাস, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত বিরোধী দল মূলত সি পি আই (এম)। সি পি আই(এম)-কে এলাকা ছাড়া করা হচ্ছে, একইসঙ্গে এরাজ্যে আর এস এস-র এলাকা বাড়ছে। সঙ্ঘের শাখার সংখ্যা গত পাঁচ বছরে এরাজ্যে বেড়েছে ১৫৭শতাংশ! নাগপুর থেকেও এসেছে অভিনন্দন বার্তা, পশ্চিমবঙ্গ ক্রমেই সম্ভাবনাময়হয়ে উঠছে! বীরভূম থেকে পূর্ব মেদিনীপুর, আলিপুরদুয়ার থেকে নদীয়া, হুগলী- সি পি আই (এম) বিরোধী সন্ত্রাসের জমি-ই মোহন ভগবতদের আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিচ্ছে।

তৃণমূলেরই প্রাক্তন সাংসদ কৃষ্ণা বসুর লেখা অ্যান আউটসাইডার ইন পলিটিক্স-এ মমতা ব্যানার্জি সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মুখোশ বেআব্রু হয়েছে। গুজরাট দাঙ্গা আমার সামনে এক ব্যক্তিগত সঙ্কট তৈরি করে দেয়...কিন্তু আমার দলে আমি ছিলাম একা। এই প্রশ্নে মমতার দুমুখো আচরণে আমি হতাশ ছিলাম..ওকে সবাই ধর্মনিরপেক্ষ ও মুসলিম দরদী বলেই জানত। কিন্তু গুজরাট সঙ্কটের তাৎপর্য ও কেন বুঝতে পারছিল না বা বুঝতে চাইছিলো না, তা আমার কাছে ছিল রহস্য

সেই রহস্য আজ বেআব্রু হয়েছে।

                          ****************************

 

বারেবারে জ্যোতি বসু বলেছেন, তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অপরাধ এরাজ্যে বি জে পিকে নিয়ে আসা

নাগপুরে আর এস এসর প্রধান দপ্তর কেশবভবন থেকে যেমন দেশের ইতিহাস বদলে দেওয়া যাবেনা তেমনি হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিট থেকে এরাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইকেও চোখ রাঙিয়ে থামিয়ে দেওয়া যাবে না।

 

 

 

 

20211011

তথ্য সমাজের নিঃসঙ্গতা

 প্রসূন ভট্টাচার্য

সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল দেখে বুঝতে পারছেন যে কাল মানে সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়েছে? আচ্ছা, এটা না হয় বামপন্থীদের বিষয় বলে অচ্ছ্যুৎ। কিন্তু শুক্রবার যে জলবায়ু ধর্মঘট ছিল সেই খবরটা ঠিকঠাক পেয়েছিলেন? অতিবৃষ্টিতে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ১৫ লক্ষ মানুষ আর বিস্তৃত জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, উত্তরবঙ্গের শিশুরা সংক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে, কিংবা কেবল করোনার দ্বিতীয় ঢেউতেই ভারতের আরও ১কোটি লোক কর্মহীন হয়ে গেছে, স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়েছে, দেশের ৯৭ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে, আর ১১টি কর্পোরেট কোম্পানির আয় যা বেড়েছে তা দিয়ে গোটা দেশের মানুষকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। এসব খবরের প্রায় কোনোটাই আমরা মিডিয়াতে পাইনি। অথচ খবর এখন আমাদের কাছে অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে। আমরা এখন নাকি ‘ইনফরমেশন সোসাইটি’ বা তথ্য সমাজে বসবাস করছি।

একটা সময় ছিল যখন খবর সংগ্রহ করে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা ছিল রীতিমতো কঠিন কাজ। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়' উপন্যাসে চারুলতার স্বামী ভূপতিকে মনে আছে? অনেক কষ্ট করে একটি খবরের কাগজ ছাপতে হতো তাঁকে। সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ঠিকঠাক খবর তো বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎদের কাছেও পৌঁছয়নি। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে বাংলার মানুষ চার্চিলের নীতিতে যখন না খেতে পেয়ে মরছে, তখন হঠাৎ স্টেটসম্যান পত্রিকা ব্রিটিস সরকারের বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে সেই খবর ছেপে দিয়েছিল। লন্ডনে যখন সেই খবর পৌঁছলো তখন সমালোচনার মুখে পড়ে ব্রিটিস সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল, নইলে পোকামাকড়ের মতো মানুষের মৃত্যু সংবাদও চাপা পড়ে ছিল। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব কিংবা ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানের খবরও এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছেছিল ধীরে ধীরে, বিক্ষিপ্তভাবে, ধোঁয়াশা মেখে। কিন্তু সেসব দিন তো ইতিহাস। রেডিও, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং সর্বশেষে ইন্টারনেট মাধ্যম এসে যাওয়ার পরে দুনিয়া তো হাতের মুঠোর মধ্যে। এখন আফগানিস্তানে তালিবানরা কাকে কীভাবে মারছে সারা দুনিয়ার মানুষ ঘরে বসে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে যাচ্ছি। নেটওয়ার্কড দুনিয়ায় আমেরিকায় বসা আত্মীয়ের সঙ্গে আমরা অনলাইনে ভিডিও চ্যাট করে নিতে পারছি। টিভিতে ২৪ ঘন্টা যুদ্ধ কিংবা খেলার লাইভ কভারেজ দেখতে পাচ্ছি, ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়াকে রোমাঞ্চকর সিনেমার মতো দেখছি, বাড়িতে বসে জোমাটোয় অর্ডার দিয়ে আধ ঘন্টায় খাবার আনিয়ে নিচ্ছি, প্রয়োজনে মোবাইল ফোনে অ্যাপক্যাব ডেকে নিচ্ছি, ছেলেমেয়েরা বাড়িতে বসে অনলাইনে ক্লাস করে নিচ্ছে, বাবা মা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে নিতে পারছে, আরও কত কি!

এই প্রবনতাটা বুঝে নিয়েই ১৯৭৩সালে সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেল বলেছিলেন, আমরা এখন তথ্য সমাজে প্রবেশ করেছি। কৃষিভিত্তিক সমাজ, শিল্পসমাজ পেরিয়ে এই সমাজে এখন তথ্যের অবাধ বিচরণই অর্থনৈতিক কারবারের মুখ্যভিত্তি। তথ্যই শক্তি। তথ্যই আনবে মুক্তি। সেই তথ্যের সুষম বন্টনের সুযোগ খুলে গেছে। ইন্টারনেট আসার পরে সবাই বলতে লাগলেন, এটাই সত্যি। অন্যদিকে সাত ও আটের দশকেই রাষ্ট্রসংঘের ইউনেস্কোর মঞ্চ থেকে আরেকদল সতর্ক করছিলেন, দুনিয়ায় তথ্যের প্রবাহে ভারসাম্যের গুরুতর অভাব ও বৈষম্য রয়েছে এবং সেই কারণে উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ভারতসহ এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এই অভিযোগই করছিল উন্নত ধনী দেশগুলির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের কথা চাপা পড়ে গেলো বিশ্বায়নের ধাক্কায়।

এখন আর তথ্যের আকাল নেই, তথ্যের সমুদ্রে আমরা ভাসমান। তথ্য আদান প্রদান এতই নাকি সহজ ও সস্তা যে ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’। কিন্তু আমাদের অবস্থাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রে ভাসমান নৌকার সেই মাঝির মতো যার কাছে এক ফোঁটা পানীয় জলও নেই। চারিদিকের অফুরান নোনা জলরাশি তাঁর তৃষ্ণা মেটানোর উপযোগী নয়। আমরাও তেমনি বিপুল তথ্যরাজির মধ্যে বসে আছি, চাই না চাই প্রতি মুহূর্তে আমাদের কাছে তথ্য এসে ভীড় করছে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন মেটাতে সেটা সাহায্য করছে না। বরং অপ্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে সদাব্যস্ত থাকতে থাকতে জীবনের প্রয়োজনটাকেই মাঝেমাঝে ভুলে যাচ্ছি, অবহেলা করে ফেলছি। যখন আমাদের রোজগার বাড়ানোর উপায় দরকার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সুবন্দোবস্ত করা দরকার, অসুস্থ বাবা মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার, তখন আমরা ফিল্ম স্টার সাংসদ নুসরৎ জাহানের সন্তানের পিতার নাম জানতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। পুজোয় কোন তারকা কোন পুজো প্যান্ডেলের উদ্বোধন করবে তা নিয়ে ফের চর্চা শুরু হয়ে গেছে। একটা অতিবর্ষণে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের জলমগ্ন জেলাগুলিতে ১৩জন শুধু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেলো। কেন পরিকাঠামোর এই হাল, সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কী করা জরুরী, তা নিয়ে ভাবার মতো তথ্য পাচ্ছি কোথায়? মোদীর জন্মদিনের তথ্য পাচ্ছি, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলানোয় কিংবা স্কুল কলেজ খোলার প্রচেষ্টায় উপেক্ষা সংক্রান্ত তথ্য কোথায়? দুয়ারে সরকারের বিজ্ঞাপন তো প্রচুর দেখলাম, কিন্তু স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড নিয়ে বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা মিলছে কিনা সেই তথ্য কোথায়?

তথ্য প্রয়োজন মেটাবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করে তথ্যের পূর্ণাঙ্গতার ওপরে, ঝিলিক মেরে উবে যাওয়া তথ্যে কাজের কাজ হয় না। ব্রেকিং নিউজ একটা আসে, চাপা পড়ে যায় আরেকটা ব্রেকিং নিউজের তলায়। তথ্য বিশ্লেষণ করে তার মূল্যায়ন করার বন্দোবস্ত না থাকলে এমন তথ্য দিয়ে লাভ নেই। যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমরা রয়েছি এবং যারা সেই ব্যবস্থা চালাচ্ছেন, সেসবের মূল্যায়নই যদি না করতে পারলাম তাহলে আমি সিদ্ধান্ত নেবো কীভাবে! কেবল জয়ধ্বনি দেওয়ানোর জন্য আমাকে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে না তো? অবাধ তথ্যের স্রোত যে মুক্তির আশ্বাস দিয়েছিল, সেটাই আসলে বাঁধনের মতো চেপে বসছে না তো? তাহলে তো প্রতিবাদ হওয়ার কথা। তেমন প্রতিবাদ হচ্ছে কই! তথ্যের এমন শক্তিশালী নেটওয়ার্কে আমরা আছি যে চরম নিঃসঙ্গতায় ডুবে প্রতিদিন হতাশাগ্রস্ত মানুষের আত্মহত্যার খবর পাচ্ছি, মানুষের হাতে হাত রাখার মতো মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। কাছাকাছি আসার ছলে দূরত্বকে এতটাই বাড়িয়ে ফেলছি যে প্রতিবাদে সংগঠিত হওয়ার সুযোগগুলো দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজের রূপান্তর শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছিল সমাজের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও। ক্ষমতা ও সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত পরিবর্তন, সামন্ত সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে পরিবর্তন। তথ্য সমাজ কিন্তু এখনও এই অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। বরং পুঁজিবাদী সমাজ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই তথ্যের হিমালয় পর্বত হাজির, তাতে বিশল্যকরণী খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তথ্যকে ব্যবহার করছি না, তথ্যই (আসলে তথ্য সরবরাহকারীরা) আমাকে ব্যবহার করছেবাজারে গিয়ে আমি কী কিনবো, কী গান শুনবো, কাকে ভোট দেবো, সবকিছু অলক্ষ্যে কেউ নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে দিচ্ছে। নতুন ধরনের ক্রীতদাসে পরিণত হচ্ছি, যেখানে কোনো শিকল লাগে না।

তবুও, মানুষ তো শেষপর্যন্ত মানুষ, প্রশ্ন তোলার স্বভাব কি সে এত সহজে ছেড়ে দেবে? শিকল ভাঙার গান লুকিয়ে আছে মানুষের এই প্রশ্ন তোলা স্বভাবের মধ্যেই। যে যন্ত্র, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা তথ্য পাচ্ছি তার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে তুলে তাকে যতো চিনবো, জানবো, ততই সচেতন হয়ে যাবো দাসত্ব সম্পর্কে। আর সচেতনতা ভেঙে ফেলতে পারে এই নতুন দাসত্বকে।

 গণশক্তি, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

 

20210809

স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টরা

 

মৌলানা হসরৎ মোহানী ও বিআর আম্বেদকর


অঞ্জন বেরা

 

মহাকাব্যিক বহুমাত্রিকতায় আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির সংগ্রাম এক অর্থে মানবিক উত্তরণেরও গর্বিত আখ্যান। এই উত্তরণে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। অনপনেয় তার প্রভাব

 

মহান অক্টোবর বিপ্লব (১৯১৭) অন্যান্য উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলির মতো ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হলেও শুধুমাত্র অক্টোবর বিপ্লবের প্রতিবর্তক্রিয়ায় এদেশে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়নি। হয়েছিল, কারণ দেশের অভ্যন্তরে জমি ছিল প্রস্তুত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামও তখন নতুন পর্বে পা দিয়েছে। এই নতুন পর্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই ছিল ব্যাপকতর মানুষের-শ্রমিক কৃষক, ছাত্র, যুব, মহিলা-অংশগ্রহণ। অক্টোবর বিপ্লব পরবর্তী বিশ্বে সামাজিক দ্বন্দ্বগুলির রূপান্তর-পর্বে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা তখন ঐতিহাসিকভাবেই অচল। লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে গঠিত তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিকতবাদ অবসানের দাবিকে অগ্রাধিকার দেয় প্রত্যাশিতভাবেই। ঐতিহাসিকভাবেই ১৯২০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা এক যুগসন্ধিক্ষণে।

 

কমিউনিস্টরাই জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে প্রথম সোচ্চার হয় ১৯২১ সালে আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ৩৬-তম অধিবেশন উপলক্ষে প্রচারিত হয়  মানবেন্দ্রনাথ রায় এবং অবনী মুখার্জি স্বাক্ষরিত ইশতেহার। শুধু ইশতেহার প্রচার নয়, এলাহাবাদে অধিবেশনে মৌলানা হসরত মোহানী এবং স্বামী কুমারানন্দ উত্থাপন করেন পূর্ণ স্বাধীনতার  প্রস্তাবসে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি, কারণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ‘স্বরাজ’ অর্জন তখনও জাতীয় কংগ্রেসের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। ১৯২২ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনেও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ থেকে একটি বার্তা পাঠানো হয়। জাতীয় কংগ্রেসকে ‘ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধি’ হিসেবে উল্লেখ করে কমিন্টার্ণের বার্তা ঘোষণা করে: ‘‘সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ছাড়া ভারতীয় জনগণের স্বাভাবিক বিকাশ অর্জন অসম্ভব।’’

 


১৯২১ সালের ইশতেহার থেকে ১৯৪৬সালের নির্বাচনী ইশতেহার, কিংবা গণপরিষদে কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব-পরাধীন ভারতের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকের মুখে কমিউনিস্ট পার্টি উত্থাপিত বিকল্প প্রস্তাব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের আধুনিক ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে।  মুক্তিকামী রাজনীতির মূল অভিমুখ থেকে কমিউনিস্টরা কখনও সরে যায়নি।

 

জাতীয় কংগ্রেস সর্বপ্রথম পূর্ণ  স্বাধীনতার (‘পূর্ণ স্বরাজ’) প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে। গ্রহণ করে পূর্ণ স্বাধীনতার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মসূচী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মাত্রার স্বীকৃতির সূত্রে এই কর্মসূচী অনন্য। ঔপনিবেশিক মুক্তি সংগ্রামে নতুন অধ্যায়ের সূচনাবাহী

 

কমিউনিস্ট পার্টি জন্মসূত্রেই স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিবেদিত বীর সন্তানদের পার্টি।  এঁদের মধ্যে ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘বার্লিন কমিটি’-তে সংগঠিত দেশান্তরী বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা। দেশান্তরী ভারতীয় মুজাহিররাগদর  বিপ্লবীরা। সেইসঙ্গে, দেশের মধ্যে সক্রিয় বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী (ব্রিটিশ সরকারের দলিলে যাঁরা ‘সন্ত্রাসবাদী’ চিহ্নিত), কংগ্রেসের রাডিক্যাল কর্মীদের একাংশ এবং খিলাফত ও আকালি আন্দোলনের আপোসহীন বিপ্লবীরা।

 

তেলেঙ্গানা সশস্ত্র অভ্যুত্থানে নারীসেনানীরা

রবীন্দ্রনাথ যাঁদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন ‘বন্দীর শৃঙ্খলচ্ছন্দে মুক্তের কে দিল পরিচয়’ সেই তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীদের বড় অংশই তিরিশের দশকে বন্দী থাকালেই কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করেন এবং জেল থেকে বেরিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত বিপ্লবীরাও ছিলেন। ছিলেন ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম বিদ্রোহে মাস্টার দা সূর্য সেনের সহযোদ্ধারা।

 

ঔপনিবেশিক জমানায় নির্যাতন ভোগের সম্ভবত কঠিনতম অভিজ্ঞতা কমিউনিস্টদেরই। প্রথম ছিল  পেশোয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ মামলা। ১৯২২ থেকে ১৯২৭সাল। কানপুর ‘কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র’ মামলা ১৯২৪-২৫ সালদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় কমিউনিস্ট গ্রুপগুলি জাতীয়স্তরে সংহত হবার চেষ্টা করতেই নেমে আসে মীরাট ‘ষড়যন্ত্র’ মামলার (১৯২৯-৩৩) খাঁড়া। গোটা দেশ থেকে একযোগে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার। ধৃতদের মধ্যে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির ফিলিপ স্প্র্যাট, বিএফ ব্র্যাডলে এবং এইচএল হাচিনসন’ও ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু ভারতীয় কমিউনিস্টরা নন, ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের আত্মত্যাগও কম নয়। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতা শুধু মুখের কথা ছিল না। মীরাট মামলা না মিটতেই দেশজুড়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। ১৯৩৪ সালের ২৮জুলাই থেকে ১৯৪২সালের ২৩ জুলাইঔপনিবেশিক জমানার অন্তহীন নির্যাতনও কমিউনিস্ট পার্টিকে কিন্তু  জনবিচ্ছিন্ন  করতে পারেনি।

 

আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু ও 
ঝাঁসি রানী ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সায়গল

স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার ভিত্তি ছিল তার বৈপ্লবিক মতাদর্শ। শ্রেণী রাজনীতির মতাদর্শ। স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির  অন্যতম মৌলিক অবদান। এই মতাদর্শই স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনতার নির্ধারক ভূমিকার ওপর আলোকপাতে সক্ষম করেছে কমিউনিস্ট পার্টিকে।

 

স্বাধীনতা আন্দোলনে ও জাতীয় জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে কমিউনিস্ট পার্টির আপোসহীন ভূমিকা অনস্বীকার্য। এলাহাবাদ কংগ্রেস অধিবেশনে (১৯২১) প্রচারিত   কমিউনিস্টদের প্রথম ইশতেহারেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অপরিহার্যতা সোচ্চারে ঘোষিত হয়। ১৯২০-র দশক, ১৯৩০-র দশক, বিশেষত ১৯৪০-র দশকের মধ্যভাগ থেকে দেশভাগ পর্ব- মতাদর্শগত মৌলিকতাই কমিউনিস্ট পার্টিকে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে সবচেয়ে নীতিনিষ্ঠ এবং অবিচল রেখেছে। স্বাধীনতার আগে থেকেই কমিউনিস্টরা যে সংঘ পরিবারের ঘোষিত শত্রু সেটা বিনা কারণে নয়।

 

জাতপাতের বিভাজন ও  বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধিতা কমিউনিস্ট পার্টির মৌলিক অবস্থান। প্রতিষ্ঠা পর্ব থেকে। বহু-জাতি সমন্বিত এই দেশে জাতিসত্বার গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার প্রতি সংবেদনশীলতা যে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্বেই অন্তর্ভূক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের নীতিকে স্বীকৃতি দেয়, তাতে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ভোলার নয়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের গণতান্ত্রিক দাবি কমিউনিস্ট পার্টির  অন্যতম মৌলিক দাবি।

 

তাছাড়া, ঔপনিবেশিক জমানার মদতপুষ্ট দেশীয় রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলির সামন্ততন্ত্র-পিষ্ট জনতাকে উপমহাদেশব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যাপ্তি মূলস্রোতে গ্রথিত করতে কমিউনিস্টদের অবদান স্মরণীয়। এপ্রসঙ্গে  সম্ভবত  সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল নিজাম-শাসিত তেলেঙ্গানায়। জমিদারপ্রথা রদ, ভূমিসংস্কারের দাবিতে কৃষক সমাজকে সংগঠিত করায় কমিউনিস্টদের গৌরবজনক ভূমিকাও অবিস্মরণীয়। তেভাগা শুধু ফসলের ভাগের প্রশ্ন ছিল না, ছিল নতুন জীবনবোধেরও। ত্রিপুরায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার পিছনে উপজাতি গণমুক্তি পরিষদের সাক্ষরতা অভিযানের অবদান কিংবা দুর্ভিক্ষপীড়িত বা দাঙ্গাপীড়িত মানুষের সেবায় কমিউনিস্ট কর্মীদের দরদী ভূমিকা কি ভোলা সম্ভব?

 

স্বাধীনতা সংগ্রামে আমআদমির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসারিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান শ্রেণী ও গণসংগঠনগুলিকে পুষ্ট করা। অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (প্রতিষ্ঠা ১৯২০), সারা ভারত কৃষক সভা, নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন, নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের (তিনটি সংগঠনেরই প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬ সালে) প্রাণশক্তি ছিল কমিউনিস্টরাই১৯৪৩ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের আত্মপ্রকাশ জাতির সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম মাইলফলক। এদেশে কমিউনিস্টরাই সংগঠিত করেছে লড়াকু মহিলাদের।

 

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে গ্রথিত করার উদ্যোগেও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সামনের সারিতে। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আবিসিনিয়া ও স্পেনে ফ্যাসিস্ট হামলার বিরোধিতায়, জাপ-আক্রান্ত চীনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপনে, সোভিয়েত সংহতি আন্দোলন গড়ে তোলায়, ইন্দোচীনের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন জ্ঞাপনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত।

 

ঘটনাক্রমে কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন সাম্রাজ্যবাদী নয়া উদারবাদে মাথা বিকিয়ে দেওয়া শাসক শ্রেণীগুলি দেশ চালানোর ভার তুলে দিয়েছে ‘হিন্দুরাষ্ট্রবাদী’দের হাতে। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা এবং ঔপনিবেশিক শাসকের সঙ্গে অশুভ আঁতাতই যাদের জন্মদাগ। কর্পোরেট স্বার্থ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির ‘নিষ্ঠুর একতা’য় আক্রান্ত  আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সার্বিক অভিজ্ঞানকমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদযাপন যেন নতুন প্রেক্ষিতে অর্থবহ হয়ে উঠেছে।