20220712

ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষার লড়াই: সীতারাম ইয়েচুরি

 

------------------------------------------

৮ জুলাই জ্যোতি বসু স্মারক বক্তৃতায় ‘স্বাধীনতা: ৭৫’ শিরোনামে সিপিআই(এম)’র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ভাষণের সম্পাদিত বয়ান।

------------------------------------------

আমার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় তিন দশক জ্যোতি বসুর সঙ্গে কাজ করার যে সুযোগ পেয়েছি তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি এবং অনুপ্রাণিত হয়েছি। ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফেরার পর অনেকেই মনে করেছিলেন যে জ্যোতি বসু বাকিদের মতো ওকালতি পেশায় যুক্ত হবেন। কিন্তু তার বদলে তিনি আন্দোলনের ময়দানে পা রাখলেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন তিনি লক্ষ্য স্থির করে নিয়েছিলেন যে দেশে ফেরার পর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি যুক্ত হবেন এবং সেই আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সেই সময় চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে যে স্বাধীন ভারতের চরিত্র কেমন হবে। এই নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত শুরু হয়েছিল। 

প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিটি ছিল কংগ্রেসের। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ভারতের বৈচিত্রকে পূর্ণ মর্যাদা দিতে হবে এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে ভারত বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করবে। কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে কংগ্রেসের এই ধারণাকে সমর্থন করলেও দাবি তোলা হয় যে সাধারণ মানুষ যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা পাবে তাকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার রূপ দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতে হবে, তবেই ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ধারণা টিকে থাকবে। এভাবেই ভারত ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে চলবে। ভারতে বৈচিত্রের কথা মাথায় রেখে সেই সময় কমিউনিস্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে ভারত যদি সমাজতন্ত্রের দিকে, অর্থনৈতিক সমতার দিকে এগিয়ে না যায় তবে দেশের মানুষের মধ্যে ক্রমশ তৈরি হওয়া অসন্তোষ একটা সময়ে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক চিন্তাভাবনাকে ক্ষুণ্ণ করবে।

 


আর এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী মত হিসাবে উঠে আসে তৃতীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি। তাতে বলা হয় যে ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ব্যাখ্যা করতে হবে। একটি পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে ভারতে যেহেতু মুসলিমদের একটি বড়সড় জনসংখ্যা থাকে তাই একটি মুসলিম রাষ্ট্র দরকার আছে। অপর দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় যে ভারত নিজেকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে গড়ে তুলবে। কে মুসলমান আর কে হিন্দু সেই নিয়ে চরম দ্বন্দ্ব ছিল। যেমন কেরালার মোপলা মুসলিম আর আসামের সিলেটি মুসলিমের মধ্যে মিলের চেয়ে ফারাকই বেশি আছে। ভারতের হিন্দুদের ক্ষেত্রে এই বৈচিত্র আরও বেশি। এইসময়ে হিন্দুত্বের ধারণা নিয়ে আসেন সাভারকার। ইংল্যান্ডে থাকাকালীনই সাভারকার হিন্দুত্ববাদ শীর্ষক একটি লেখায় উল্লেখ করেন যে হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে হিন্দু ধর্মের সম্পর্ক নেই। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে হিন্দুত্ববাদ হলো একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। এর মাধ্যমে বলা হয় যে ভারত যাদের মাতৃভূমি পিতৃভূমি এবং পূণ্যভূমি তারাই একমাত্র এখানে থাকতে পারবে। সাভারকার উল্লেখ করেন যে মুসলমানদের পুণ্যভূমি মক্কা মদিনা এবং খ্রিস্টানদের পুণ্যভূমি জেরুসালেম। আরএসএস তৈরি হওয়ার দুবছর আগেই এই ধারণা ধীরে ধীরে প্রচার হতে থাকে। হিন্দু রাষ্ট্র এবং মুসলিম রাষ্ট্র এই দুই রাষ্ট্রের ধারণা নিয়ে মুসলিম লিগের সভাপতি মহম্মদ আলি জিন্নাহও একই কথা বলেন। সেই সময়ে সাভারকার জানান যে তাঁর সঙ্গে জিন্নার কোনও মতবিরোধ নেই। এই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতেই স্বাধীন ভারত দুই ভাগে ভাগ হয়। সেই একই কথা এখন শোনা যাচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং আরএসএস নেতাদের মুখে। তাঁদের কথায়, পাঁচ হাজার বছর ধরে ভারতে বসবাস করছে হিন্দুরা। আর ১২০০ বছর ধরে তারা পরাধীন। কারণ সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করে মুসলিমরা ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছে। তারপর ব্রিটিশরা ভারতে আসার পর সেই সময়ের লড়াইকে হিন্দু বনাম খ্রিস্টানের বলে উল্লেখ করতে চাইছে আরএসএস। আর এই সবের জন্য শিক্ষাব্যবস্থায় সিলেবাসে পরিবর্তন করা হচ্ছে। ভারতের ইতিহাসকে তারা হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করতে চাইছে, আর ভারতীয় দর্শনকে বদলে হিন্দু দর্শনের পাঠ দিতে চাইছে। এসবের কারণেই স্বাধীনতা পূর্ব ভারতের তিনটি দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্ব। 

জ্যোতি বসুর দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গির নেতা হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন যা  ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল। সেই সময় থেকেই কমিউনিস্ট এবং কংগ্রেসের মধ্যে মতাদর্শগত দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। ভারতকে গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে তৈরি করতে চাইলেও পুঁজিবাদের ওপর কংগ্রেস নির্ভরশীল ছিল, কমিউনিস্টরা তার বিরোধিতা করে। ১৯৪০ সাল নাগাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর্বে এবং স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে বিদেশ থেকে জ্যোতি বসু যখন দেশে ফেরেন তখন তাঁর এবং কয়েকজন কমিউনিস্ট সদস্যের ওপরে ওপর মুখ্য দায়িত্ব পরে তৎকালীন ভারতে কৃষকদের দুর্দশার বিরুদ্ধে দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলার। যেমন বাংলায় তেভাগা আন্দোলন, কেরালায় পুন্নাপ্রা ভায়লার, মহারাষ্ট্রে ওরলি আদিবাসীদের জমির লড়াই, আসামের সুরমা উপত্যকায়, তেলেঙ্গানায় তখন ছড়িয়ে পড়তে থাকে কৃষি আন্দোলন। এই আন্দোলনগুলিকে থেকে বলা যেতে পারে স্বাধীনতা আন্দোলনে কমিউনিস্টদের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অন্যদিকে কংগ্রেস জমিদার, জোতদারদের সাথে বোঝাপড়া করে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে আনার চেষ্টা করেছে। এই বোঝাপড়া স্বাধীনতার পরেও টিকে থাকে এবং তার পরিণাম এখনও আমাদের ভোগ করতে হচ্ছে। পুঁজিবাদের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি শেষ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে সামন্তবাদের সাথে আপস করে পুঁজিবাদ নিজেদের জমি তৈরি করতে চেয়েছে, ফলে সামন্তবাদের উচ্ছেদ হয়নি। জ্যোতি বসু বার বার বলতেন যে, এরফলে সামন্তবাদী ধারণার আধিপত্য সমাজে বজায় থাকে। যেমন ধর্মীয় চিন্তা ভাবনা এবং জাতব্যবস্থা এই দুই ধারণা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। সে পিতৃতন্ত্রের প্রশ্নে হোক বা আদিবাসী দলিতদের ওপর অত্যাচারের প্রশ্নে হোক, কমিউনিস্টদের এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়। প্রসঙ্গত, এই সব ধারণা আরএসএস’এর মনুবাদী মতাদর্শের সঙ্গে মিলে যায়, বিজেপি আরএসএস হিন্দুত্বের স্লোগানকে সামনে রেখে এইসব সামন্ততান্ত্রিক চিন্তা ভাবনাকে এখন প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। 

বিজেপি জানে যে হিন্দুরাষ্ট্র তৈরির কথা তারা বলছে তা কোনোভাবে সম্ভব নয় বর্তমান ভারতীয় সংবিধান থাকলে। হিন্দু রাষ্ট্র করতে তাদের সংবিধান বদলাতে হবে। স্বাধীনতার ৭৫ বছরে এসে আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি যখন কেন্দ্রে এমন এক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে যারা ভারতের সংবিধানকে বদলাতে চাইছে। তাকে মান্যতা দিতে চাইছে না শুধুমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র তৈরি করবে বলে। সংবিধানের চার ভিত্তি আর্থিক সার্বভৌমতা, সামাজিক ন্যায় বিচার, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো এবং ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র। এই চার স্তম্ভই আজ আক্রমণের সামনে। তিস্তা শীতলবাদের ঘটনা চোখে  আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বর্তমান ভারতের গণতন্ত্রের পরিস্থিতি। বর্তমান সরকার বলতে চাইছে যে সত্যি কথা কেউ বলতে পারবে না। সত্যি প্রকাশের জন্য সাংবাদিক জুবেইরকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। ২০১৪ সালের পর একের পর এক নতুন আইন তৈরি করে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে সরকার কেড়ে নিয়েছে। বিজেপি শাসিত রাজ্যে সরকার বলছে ভিন্নধর্মে বিবাহের আগের পুলিশ ভেরিফিকেশন করাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো সম্পূর্ণভাবে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। যে সব আইন বিজেপি সরকার তৈরি করছে তার মধ্যে দিয়ে তারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সমাজে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে যেখানে হিন্দু এবং মুসলমানরা একে অপরের সাথে খোলাখুলি মেলামেশা করতে পারবে না। সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন, আদিবাসী দলিতদের ওপর ক্রমশ আক্রমণ প্রতিদিন বেড়ে চলেছে। কর্পোরেট এবং সরকারের সখ্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত দুই বছরে আদানির সম্পদ ব্যাপক বেড়েছে। আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছি যেখানে সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। অন্যদিকে খাদ্যের দিক থেকে হোক স্বাস্থ্যের দিক থেকে হোক বা অন্য যে কোনও বিষয়ে বিভিন্ন সূচকে ভারতের স্থান ক্রমশ নিম্নমুখী।

 


স্বাধীনতার ৭৫ বছর পূর্তিতে এসে ভারত আবার সেই জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে তারা স্বাধীনতার আগে ছিল। সেই সময় যে যে বিষয়ের বিরুদ্ধে ভারতকে লড়াই করতে হয়েছে আজও সেই একই বিষয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে। কিন্তু সময় বদলানোর সাথে সাথে লড়াইয়ের চরিত্র ধরন বদলে গিয়েছে। স্বাধীনতার আগে ভারতে যে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল তা এখন আবার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না যে স্বাধীনতার রাতে মহাত্মা গান্ধী কোথায় ছিলেন। তিনি কলকাতায় ছিলেন, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন, তারপর গিয়েছিলেন নোয়াখালিতে। আরএসএসের মতাদর্শের কারণে মহাত্মা গান্ধীকে খুন হতে হয়েছে। 

জ্যোতি বসু এবং হরকিষেণ সিং সুরজিৎ উভয়েই প্রতি পদক্ষেপে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতেন। এই প্রশ্নে তাঁরা কমিউনিস্ট এবং বামপন্থী দলগুলি ছাড়াও অন্যান্য দলগুলির কাছেও সমান ভাবে গ্রহণযোগ্য ছিলেন। এই দুই নেতা দেশভাগের ক্ষত নিজেদের চোখে দেখেছেন, মরমে মরমে উপলবদ্ধি করেছেন। একজন বাংলায়, একজন পাঞ্জাবে। ভারত ভাগে আসল বিভাজিত হয়েছিল বাংলা এবং পাঞ্জাব। সেই বিভাজনের অভিজ্ঞতা না থাকলে বোঝা সম্ভব নয়, সাম্প্রদায়িকতার আগুন কীভাবে সবথেকে প্রগতিশীল বিচারধারাকে আক্রমণ করেছে। পূর্ববঙ্গের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল অগ্রসর, একইভাবে লাহোর শহর ছিল গোটা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল। ভগৎ সিং লাহোরে কাজ করেছিলেন। সুরজিৎ নিজে লাহোর থেকে অমৃতসর অবধি সাইকেল চালিয়ে আসতেন বিপ্লবের কাজে। স্যার সিকান্দার হায়াত খান অবিভক্ত পাঞ্জাবের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর কন্যা তাহিরা কমিউনিস্ট পার্টির পাঞ্জাব প্রদেশ কমিটির সদস্য ছিলেন। লাহোরে তাঁদের বাড়িতেই সাধারণত ক্যাবিনেট বৈঠক হতো, আবার কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠকও সেখানেই হতো। এমনও দিন গেছে, বাড়ির একতলায় পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠক চলছে, এবং দোতলায় কমিউনিস্ট পার্টির পিসি বৈঠক হচ্ছে। তো এমনই এক বৈঠক চলাকালীন খবর এল, পাঞ্জাব সরকারের ক্যাবিনেট বৈঠকে ঠিক হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এমন সময় তাহিরা বলেন, আপনারা চিন্তা করবেন না। আপনারা আমাদের বাড়িতেই থেকে যান। কারোর কল্পনাতেও আসা সম্ভব নয়, যে পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতেই কমিউনিস্ট পার্টির বৈঠক চলছে! দেশভাগের পরে লাহোরের সেই ঐতিহ্য একেবারেই হারিয়ে গেল। ঢাকা শহরে আবার নতুন করে প্রগতিশীল আন্দোলন দানা বাঁধছে এবং বামপন্থীরা সেখানে ভূমিকা রাখছেন। 

সুরজিৎ, জ্যোতি বসুরা বারবার বলতেন, যারা সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা করতে চান, তাঁদের সবাইকে একজোট করতে হবে। যারা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে ইচ্ছুক ছিলেন, তাঁদের সবাইকে আমরা ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলাম। আমরা এমন সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, যে সরকারের বিদেশমন্ত্রীর নাম অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর নাম লালকৃষ্ণ আদবানি। যদি প্রশ্ন করেন কেন এই সরকারকে সমর্থন করেছিলাম, তার উত্তর হলো— যে কোনও উপায়ে জরুরি অবস্থাকে রুখতেই হতো। সেই সময়কার সব কালাআইনকেও সংবিধান থেকে বাতিল করতে হতো। তাই এই সরকারকে আমরা সমর্থন করি। জ্যোতি বসু ১৯৬৭ সালে অজয় মুখার্জিকে পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী পদে বসাতে রাজি হয়েছিলেন, নিজে উপমুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, যদিও সেই সময় আমাদের বৃহত্তম সংখ্যক বিধায়ক ছিলেন। আমরা নিজেরা মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবি জানাতে পারতাম। কিন্তু ১৯৬৭ এবং ১৯৬৯- দুইবারই, বেশি বিধায়ক নিয়েও আমরা অজয় মুখার্জিকে মুখ্যমন্ত্রী হতে সাহায্য করি। কেন? কারণ তখন আমাদের মূল কাজ ছিল যে ভাবে সম্ভব কংগ্রেসকে হারানো এবং ক্ষমতা থেকে দূরে রাখা। 

মূল বিষয় হলো, প্রতি যুগেই এমন একটা সময় আসে, যখন আমাদের শ্রেণি সংগ্রাম ও বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড এগিয়ে নিয়ে যেতে আশু লক্ষ্য চিহ্নিত করতে হয়। সেই মুহূর্তের পরিস্থিতির নিরিখে আমাদের চিহ্নিত করতে হয় শত্রুকে। কোন শক্তির কিংবা ব্যক্তির বিরোধিতা করতে পারলে গণআন্দোলন ও শ্রেণি সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, তা সেই মুহূর্ত ঠিক করে দেয়। 

১৯৯৬ সালে নরসিমা রাওয়ের সরকারের ঠিক পরেই বাজপেয়ীর সরকার ক্ষমতায় এল। আমরা বললাম এদের ঠেকাতে হবে। সেই সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা বললেন, আমি সরকার গড়তে সর্ববৃহৎ দলকে ডাকবো। সেটা ছিল বিজেপি। বিজেপি ১৩দিন সরকার চালিয়েছিল। সেই সময় আমি এবং আমার সহকর্মীরা জ্যোতি বসু এবং সুরজিতের কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে আমরা সেই সময় খুবই শঙ্কিত ছিলাম। বিজেপি একবার ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে গেলে তাদের উৎখাত করা কঠিন হয়ে পড়বে। জ্যোতি বসু এবং সুরজিৎ আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, তোমরা চিন্তা কোরো না, আমরা এদের ঠিক ক্ষমতা থেকে সরিয়ে ছাড়ব। ১৩দিন পরে সংসদে আস্থা ভোট হলো, এবং ভোটে হেরে বাজপেয়ী ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেন। তারপর প্রথম ইউনাইটেড ফ্রন্ট সরকার গঠিত হলো। 

মূল বিষয় বা প্রশ্ন হচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ে দাঁড়িয়ে আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যেতে আমাদের কী প্রয়োজন সেই নিরিখেই আমাদের পথ তৈরি হবে। ১৯৭৭ সালে আমরা উপলব্ধি করেছিলাম আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করতে এমারজেন্সি এবং ইন্দিরা গান্ধীকে পরাস্ত করতে হবে। তাই আমরা এমারজেন্সির বিরোধিতা করতে প্রস্তুত সব শক্তির সঙ্গে একজোট হই। একইভাবে আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটাতে, আমাদের রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে পরাস্ত করতে হবে। তাই বিজেপি’কে পরাস্ত করতে সক্ষম এবং ইচ্ছুক সমস্ত শক্তিকে একজোট করার দিকে আমরা এগোচ্ছি। জ্যোতি বসুই খুব সম্ভবত আমাদের দেশের জোট রাজনীতির স্থপতি ছিলেন। ১৯৬৭ সালে বাংলার প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকার থেকে শুরু। তারপরে বাংলায় এবং দেশে যতগুলি যুক্তফ্রন্ট সরকার তৈরি হয়েছে, প্রত্যেকটিতে জ্যোতি বসুর ভূমিকা ছিল। 

২০০৪ সালে এনডিএ সরকারকে হারানোর জন্য বিজেপি বিরোধী জোট গঠনের প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সুরজিৎ। সেই সময়ের মূল প্রশ্ন ছিল, কিভাবে বিজেপি-কে পরস্ত করতে পারার মতো সংখ্যা একত্রিত করা যায়। বিরোধীদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ছিল— নিজের নিজের রাজ্যে যাও। বিজেপি বিরোধী শক্তিগুলিকে যতটা সম্ভব একত্রিত করো। এই ফর্মুলাতে রাজ্যস্তরে নিশ্চিত করতে হবে যে যাতে প্রতিটি রাজ্য থেকে অধিক সংখ্যক বিজেপি বিরোধী সাংসদ জিতে আসতে পারেন। তারপর আমরা দিল্লিতে বসে ভবিষ্যতের সরকার কেমন হবে সেটা নিয়ে আলোচনা করব। বাস্তবেও ঠিক এটাই হয়েছিল। ১৯৯৬ সালের যুক্তফ্রন্টও কিন্তু নির্বাচনের পরেই গঠিত হয়েছিল। একই কায়দায় ২০০৪ সালের প্রথম ইউপিএ সরকার নির্বাচনের পরে গঠিত হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকেই স্পষ্ট, ভারতে নির্বাচনের আগে দেশব্যাপী বিজেপি বিরোধী কোনও মোর্চা গঠন সম্ভব নয়। কিছু মানুষ এখন থেকেই মোদীর এবং বিজেপি’র বিকল্প জোট ইত্যাদি গড়ার কথা বলছেন। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা হলো এই ধরনের বিকল্প রাজ্যস্তরে গড়ে তুলতে হবে। যেমন তামিলনাড়ুতে হয়েছে। প্রথমে রাজ্যস্তরে করে তারপরে সেটাকে সর্বভারতীয় স্তরে তুলে আনতে হবে। 

এই মুহুর্তের গুরুত্বপূর্ণ কাজ কোনটি? আমরা পার্টি কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাম্প্রদায়িকতাকে হারাতে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির সর্বোচ্চ ঐক্য গঠন করতে হবে। আমাদের প্রাথমিক কাজ হলো বিজেপি-কে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, তাকে দুর্বল করতে হবে এবং তাকে হারাতে হবে। সেই কাজ করতে গেলে সবার আগে আমাদের পার্টির স্বাধীন শক্তির বিকাশ ঘটাতে হবে। আমাদের পার্টির সংগঠন এবং জনভিত্তি মজবুত করতে হবে। দ্বিতীয়ত বামপন্থী ঐক্য মজবুত করতে হবে। তৃতীয়ত সেই জোরের উপর দাঁড়িয়ে বাম-গণতান্ত্রিক জোট গঠন করতে হবে। এই জোট কেবলমাত্র রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামাজিক ও ন্যায়ের দাবিতে আন্দোলনরত সংস্থা এবং শক্তিগুলিকেও এরমধ্যে শামিল করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে এক জায়গায় জড়ো করতে গেলে ন্যূনতম একটা বোঝাপড়ায় আমাদের পৌঁছাতেই হবে। 

বর্তমানে আমাদের দরজায় রাষ্ট্রপতি এবং উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন কড়া নাড়ছে। এমন একজন প্রার্থী খুঁজে বের করতে হবে যাকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি সমর্থন জানাতে প্রস্তুত হবে। এই প্রার্থীকে সামনে রেখে আমরা বিজেপি’র প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক এবং আদর্শগত চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারব। এটাই মূল ইস্যু। একাধিকবার আমাদের মধ্যে প্রার্থীর নাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যাকে অধিকাংশ দল সমর্থন জানাতে রাজি হবে। বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিজেপি’র বিরুদ্ধে যতটা সম্ভব ঐক্যবদ্ধ লড়াই ছুঁড়ে দেওয়া। এই প্রাথমিক উদ্দেশ্য আমাদের পূরণ করতেই হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা বলতে পারিনা অমুকে হলুদ জামা পরেছে বা তমুকে লাল জামা পরেছে বলে আমি তাঁকে সমর্থন করব না। কিংবা সেই ব্যক্তি আগে অমুক অমুক কাজ করেছে তাই তাঁকে সমর্থন করা যাবে না। জ্যোতি বসুদের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে অজয় মুখার্জি বাংলায় কি কি করেছিলেন, কিংবা জনতা পার্টির নেতা হওয়ার আগে জগজীবন রামের ভূমিকা কী ছিল, রাজীব গান্ধীর অর্থমন্ত্রী হিসাবে ভিপি সিংয়ের ভূমিকা কী ছিল, এইসব প্রশ্ন আমরা তুলিনি, আমরা তাঁদের প্রত্যেককে সমর্থন জানিয়েছি কোনও না কোনও সময়ে। আমরা রাষ্ট্রপতি পদে ভিভি গিরিকে ভোট দিয়েছি। কিন্তু আমরা তাঁকে শর্ত দিয়েছিলাম। আপনি ব্যাঙ্ক, কয়লার রাষ্ট্রীয়করণ করুন, তাহলেই একমাত্র আপনাকে সমর্থন করব। এবং তাঁকে দিয়ে আমরা এগুলি করিয়ে নিয়েওছিলাম। 

জ্যোতিবাবু এবং সেই সময়ের নেতা যাঁদের আমরা পার্টির নবরত্ন বলে থাকি তাঁদের থেকে আমাদের শিখতে হবে, কীভাবে আশু লক্ষ্য পূরণ করে আমাদের আদর্শ এবং রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্যই নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুযায়ী রণকৌশল গ্রহণ করতে হবে। একটি শক্তি কিংবা ব্যক্তিকে সমর্থন জানানোর মাপকাঠি কেবলমাত্র এটাই। একজন ব্যক্তি অতীতে কী করেছেন, বা ভবিষ্যতে কী করতে পারেন, সেই ভাবনা থেকে বর্তমানের রাজনৈতিক পদক্ষেপ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে না। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল। ইতিহাস তাই-ই বলছে। এই সিদ্ধান্তগুলি গ্রহণ করার ফলেই আমরা এমারজেন্সিকে পরাস্ত করতে পেরেছি। আমারা মোরারজী দেশাই সরকারকে সমর্থন না করলে এমারজেন্সি সরানো যেত না। আর এমারজেন্সি না সরলে পশ্চিমবাংলায় ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার গঠিত হত কিনা তা বলা সম্ভব নয়। জ্যোতিবাবুর ২৩বছরের রেকর্ড মুখ্যমন্ত্রিত্ব, হয়ত এর কোনওটাই হতো না। আমরা কাকে সমর্থন করছি সেটা বিষয় নয়, কেন সমর্থন করছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের লক্ষ্য কী?  উপরাষ্ট্রপতি নির্বাচন আসছে। আমরা এমন একজন প্রার্থীর খোঁজ করছি, যাঁকে সামনে রেখে বৃহত্তম বিরোধী ঐক্য গঠন সম্ভব। 

ইংল্যান্ড থেকে ফেরত আসার পরে জ্যোতি বসু ব্যারিস্টারির লোভনীয় পেশার হাতছানি উপেক্ষা করে রাজনীতিতে এলেন। শেষজীবনে তিনি একবার বলেছিলেন, সীতারাম, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম সাধারণ মানুষের জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করব। আর আজকে আমি আমার মরণোত্তর দেহদান করলাম, আমি জানতাম না যে মৃত্যুর পরেও আমি জনগণের সেবায় কিছু করতে পারি। এই ধরনের মূল্যবোধ এবং চিন্তাধারা বিরল। তাঁর এই চিন্তাধারার জন্য আমরা তাঁকে সেলাম জানাই। এবং শুধুমাত্র সেলাম জানানোই নয়, আমরা প্রতি মুহূর্তে তাঁর থেকে শিক্ষা নিই, নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করি। 

আমরা বর্তমানে একটি যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর আগের যুগসন্ধিক্ষণে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছিল। এই সন্ধিক্ষণে ভারতকে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের কাঠামো রক্ষার লড়াইতে জিততে হবে। সেই ভিতের উপরে দাঁড়িয়েই আমাদের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। 

...........................................

গণশক্তি, উত্তর সম্পাদকীয়, ১০জুলাই, ২০২২

...........................................

20220711

ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো ...মমতা ব্যানার্জির ঘৃণ্য রাজনীতির পথেই চলছে মোদী সরকার

কাজ শুরু বামফ্রন্টের সময়েই, মমতার বাধাতেই প্রকল্পে কালক্ষেপ

-------------------

নিজের ওষুধই এখন তেতো মুখ্যমন্ত্রীর কাছে!

২০০৯সালের ২২ফেব্রুয়ারি ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। রয়েছেন প্রণব মুখার্জিসুভাষ চক্রবর্তীমহম্মদ সেলিম সহ আরও অনেকে। (ফাইল চিত্র)

উন্নয়ন নিয়ে মমতা ব্যানার্জির ঘৃণ্য রাজনীতির পথেই চলছে কেন্দ্রের মোদী সরকার।সোমবার কলকাতায় ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকে অবহেলা করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিকে দিয়ে সল্টলেক থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত পরিষেবার উদ্বোধন করার ঘোষণা করেছে রেল মন্ত্রক। রবিবার অবশ্য শেষ মুহূর্তে মুখ্যমন্ত্রীকে আমন্ত্রণের কথাও জানানো হয়েছে। কিন্তু ক্ষুব্ধ তৃণমূল সংকীর্ণ রাজনীতির অভিযোগ তুলে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোকে মমতা ব্যানার্জির পরিকল্পিত প্রকল্প বলে বর্ণনা শুরু করেছে।

কিন্তু তেরো বছর আগের তথ্য বলছে, বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যই হাওড়া থেকে সল্টলেক ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করেছিলেন ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সেদিন এই প্রকল্পকে ঠেকাতে মমতা ব্যানার্জি সবরকম চেষ্টা করেছিলেন, কংগ্রেস নেতৃত্ব এবং কেন্দ্রের সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করেছিলেন, রাজ্যে বসে নৈরাজ্য তৈরি করে প্রকল্পের রূপায়ণে বাধা দিয়েছেন এবং সর্বোপরি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রীর পদে বসে এবং তারপরে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদে বসে তাঁর একের পর এক পদক্ষেপে প্রকল্প রূপায়ণে বিলম্ব ঘটিয়েছেন।

সোমবার সল্টলেক থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত মেট্রোরেলের যে প্রকল্পের উদ্বোধন হবে তাকে ‘মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প’ বলে দাবি করে কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেছেন, ‘মমতা ব্যানার্জিই রেলমন্ত্রী থাকাকালীন প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাঁর প্রকল্পে তাঁকেই বাদ দিয়ে উদ্বোধন? বাংলার মানুষ এটা মেনে নেবে না।’

বিজেপি’র মতোই ইতিহাসকে নিজের মতো করে লিখছে তৃণমূল। শিলান্যাসের পরদিন, অর্থাৎ ২০০৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির সমস্ত সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংবাদে লেখা আছে যে ২২ ফেব্রুয়ারি সল্টলেক স্টেডিয়ামে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিদেশমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও। সেই সময় রেলমন্ত্রকের হাতে ছিল না প্রকল্পটি, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের যৌথ প্রকল্প ছিল এটা। সংবাদপত্রের পুরানো পাতা থেকেই দেখা যাচ্ছে, সেদিন প্রণব মুখার্জি বলেছিলেন, আমাদের মতো গরিব দেশে উন্নয়নে অনেক বাধা। টাকার অভাব, প্রযুক্তিও সবসময় থাকে না। কিন্তু তার সঙ্গে যদি আত্মকৃত বাধা এসে জোটে তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যের আর কিছু থাকে না। উন্নয়নকে সংকীর্ণ রাজনীতির বাইরে রাখতে না পারলে এগোনোর পথে অনাবশ্যক কাঁটা ছড়ানো হয়। তাতে নিজেদেরই পা ক্ষতবিক্ষত হয়।’

প্রণব মুখার্জির এই মন্তব্যের কারণ ছিল মেট্রো প্রকল্পে মমতা ব্যানার্জির বাধা। তৎকালীন বিরোধী নেত্রী ইউপিএ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগেই বলেছিলেন, ‘ঋণভারে জর্জরিত রাজ্যকে কেন্দ্র কেন এত টাকা দিচ্ছে? রাজ্য সরকারকে মদত দেওয়া বন্ধ করুন। লোকসভার ভোট চলে এসেছে, এখনও সিপিএম’কে তোয়াজ করছেন কেন?’

সেদিন দুপুরে সল্টলেকে ইস্ট ওয়েস্ট মেট্রোর শিলান্যাস অনুষ্ঠানে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের যাওয়ার পথে কালো পতাকা দেখানোর চেষ্টা করেছিল তৃণমূল কর্মীরা। আর শিলান্যাস অনুষ্ঠানে প্রণব মুখার্জির ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিকালে পার্থ চ্যাটার্জিকে সাংবাদিক বৈঠকে বসান মমতা ব্যানার্জি। দলনেত্রীর নির্দেশে সেদিন প্রণব মুখার্জিকে ‘সিপিএম’র পদলেহনকারী বাংলার এক নায়ক’ বলে সম্বোধন করেছিলেন পার্থ চ্যাটার্জি। তারপরে বলেছিলেন, ‘সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের সময় যাকে দেখা যায়নি, বাংলার মানুষের পাশে যিনি দাঁড়াননি, তাঁকে এখন কথা বলতে শোনা যাচ্ছে।’

উদ্বোধনের আগের দিনরবিবারশিয়ালদহ মেট্রো স্টেশনের ছবি।


সেই ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো নাকি এখন মমতা ব্যানার্জির প্রকল্প! ২০০৯ সালে শিলান্যাস অনুষ্ঠানের ছবি এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও প্রণব মুখার্জির নাম লেখা ফলকের ছবি এখন সোশাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শিলান্যাস মঞ্চ থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন, হাওড়া ময়দান থেকে গঙ্গার তলা দিয়ে (ভারতে নদীর তলা দিয়ে প্রথম ট্রেনলাইন) শিয়ালদহ হয়ে বিধাননগরের সেক্টর ফাইভ পর্যন্ত এই মেট্রো প্রকল্পের কাজ ২০১৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে।

হয়নি কেন? ২০২২ সালের জুলাই মাসে এসে প্রকল্পের আংশিক উদ্বোধন করতে হচ্ছে কেন স্মৃতি ইরানিকে? বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কৃতিত্বকে মমতা ব্যানার্জির ঝুলিতে ঠেলে দেওয়ার মিথ্যা রাজনৈতিক প্রচারের থেকেও ঘৃণ্য সেই কাহিনি।

শিলান্যাসের কিছুদিন পরেই কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। তারপরেই রেলমন্ত্রককে কাজে লাগিয়ে হাওড়া ও শিয়ালদহে মেট্রো স্টেশনের পরিকল্পনাকে বানচাল করতে উঠেপড়ে লাগেন তিনি। অথচ হাওড়া ও শিয়ালদহ রেল স্টেশনের সঙ্গে যাত্রাপথে সংযোগ না হলে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্পের মূল সুবিধাই নিতে পারবেন না যাত্রীরা। তাই বামফ্রন্ট সরকার সেদিন কেবলমাত্র প্রকল্পটির রূপায়ণের স্বার্থে এই কদর্য রাজনীতিকে মর্যাদার লড়াইতে নিয়ে যায়নি। বরং উন্নয়নের স্বার্থে গোটা প্রকল্পটি রেলমন্ত্রকের হাতে তুলে দিতে রাজি হয়ে যায়। ‘কেন্দ্র-রাজ্য যৌথ উদ্যোগেই হোক, অথবা রেলের মাধ্যমেই হোক, তাতে কিছু যায় আসে না। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো প্রকল্প চালু হলেই নাগরিকদের লাভ।’ ২০১১ সালের গোড়ায় বামফ্রন্ট সরকারের পরিবহণ সচিব সুমন্ত্র চৌধুরি সাংবাদিকদের একথা জানিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী প্রকল্পটি হস্তান্তরিত হয় রেলমন্ত্রকের হাতে। তারপর? কলকাতার কিছু ব্যবসায়ী, জমি মাফিয়াদের স্বার্থে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর রুটটাই পালটে ফেলে মমতা ব্যানার্জির সরকার। ইঞ্জিনিয়ার ও ভূবিজ্ঞানীদের যাবতীয় সমীক্ষার থেকে বেশি গুরুত্ব পায় তৃণমূল নেতাদের মরজি। ফলাফল? প্রকল্প ব্যয় হাজার কোটি টাকা বেড়ে গেছে, দশ বছর সময় নষ্ট হয়ে গেছে, তবুও শেষ হয়নি প্রকল্পের কাজ। বরং মধ্য কলকাতায় বাড়িতে বাড়িতে ফাটল দেখা দিচ্ছে মেট্রোর নতুন রুটের বন্দোবস্ত করতে গিয়ে।

স্থায়ী প্রকৃত উন্নয়নের জন্য প্রশাসনিক যোগ্যতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে রাজনীতি করেছেন মমতা ব্যানার্জি। এখন বিজেপি’কে সেই অপকর্মের জন্য দোষারোপ করছেন তিনি। ইউপিএ সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে বামপন্থীরা সমর্থন তুলে নেওয়ার পরেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমন্ত্রণে প্রণব মুখার্জি এসেছিলেন প্রকল্প শিলান্যাসে। লোকসভা নির্বাচনের মাত্র কয়েকমাস আগেও তাঁরা পারস্পরিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি করার বদলে উন্নয়নকে গুরুত্বের দৃষ্টিতে দেখেছিলেন। আর এখন স্মৃতি ইরানিরা সেই আচরণই মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে করছেন যা তৃণমূল করেছিল বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে। রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়কে আমন্ত্রণ জানালেও সোমবার ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর অনুষ্ঠানে তাঁরা মমতা ব্যানার্জিকে আগে থেকে আমন্ত্রণ জানাননি।

২০০৯ সালেরই আগস্ট মাসের কথা কি মমতা ব্যানার্জির মনে পড়ছে? তখন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারে সদ্য রেলমন্ত্রী পদে বসেই মমতা ব্যানার্জি টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া সম্প্রসারিত মেট্রো রেল প্রকল্পের উদ্বোধন করেছিলেন। সেদিন তিনি রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীকে পাশে বসিয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে আমন্ত্রণ জানাননি। অথচ টালিগঞ্জ থেকে গড়িয়া মেট্রো সম্প্রসারণ আদৌ রেলমন্ত্রকের একার প্রকল্পই ছিল না, ঐ সম্প্রসারণের কাজে ৩৩ শতাংশ ব্যয়বহন করেছিল পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার।

ক্ষমতায় বসে কেউ ব্যস্ত ইতিহাস থেকে নেহরুদের নাম মুছতে, কেউ ব্যস্ত বামপন্থীদের নাম মুছতে। এরা কি আদৌ অক্ষয় হয়ে থাকবে ভবিষ্যতে?

.........................

গণশক্তি, ১১ জুলাই, ২০২২

.......................... 

20220416

লুম্পেন-রাজ দিয়ে বিজেপি-বিরোধিতা? নাগপুর হাসছে!

এই শ্মশানেই দাহ করা হয়েছে হাঁসখালির নির্যাতিতাকে


দেবাশিস চক্রবর্তী

প্রমাণ? আরো প্রমাণ?

বগটুইয়ে তৃণমূল নেতা ভাদু শেখকে খুন করেছে তৃণমূল। তারপর পেট্রোলের জার নিয়ে গ্রামে ঢুকেছে দুই তৃণমূল কর্মী, একজন ধরাও পড়েছে সিবিআই-র হাতে। দশজনকে কুপিয়ে, জ্বালিয়ে মেরেছে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং জানিয়েছেন, দাপুটে তৃণমূল নেতা পুলিশকে আসতে না বলায় পুলিশ আসেনি। আমরা সকলেই যা জানতাম, মুখ্যমন্ত্রী তা অফিসিয়ালি জানিয়েছেন। তৃণমূল নেতারা আসতে না বললে রাজীব কুমাররা আসেন না, তাঁদের নিম্নতম অধস্তনরাও নড়েন না।

মার্চ-এপ্রিলে প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। প্রায় সবক’টিতেই দোষী তৃণমূল নেতা, নেতার পুত্র, নেতার ভাগ্নে, দলের কর্মী। হাঁসখালির সঙ্গে কী পার্থক্য হাথরসের? একই ভাবে দলবদ্ধ ধর্ষণ, দেহ নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, পরিবারকে এমন ভয় দেখানো যাতে কন্যার মৃত্যুতেও মুখ খুলতে পারেন না পিতা-মাতা। হাথরসের মেয়েটি দিল্লির হাসপাতালে এসেছিল, হাঁসখালি সেটিও পারেনি। ঘরেই মরে গেছে, স্রেফ যন্ত্রণায় নীল হয়ে মরে গেছে।

সিবিআই অফিসারদের ঘিরে গ্রামের মানুষ বলছেন, তৃণমূলের এই নেতা, তার পুত্র ও শাগরেদরা হেরোইনের নেশা করত, ‘মেশিন’ নিয়ে ঘুরত, এমনকি খুনও করেছে আগে।

ধার শোধ করতে না পারায় বোলপুরে সুদখোর তৃণমূল নেতা পরিচিতের মেয়েকে ধর্ষণ করে ‘ক্ষতিপূরণ’ নিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী অফিসিয়ালি জানিয়েছেন, এইসব ধর্ষণের ঘটনাকে তিনি তেমন গুরুতর কিছু বলে মনেই করেন না। অ্যাফেয়ার, অন্তঃসত্ত্বার মত বাড়তি কালি লেপে দিয়েছেন নির্যাতিতাদের শরীরে। অনায়াসে, কোনো অস্বস্তি ছাড়াই। ক্ষতবিক্ষত শরীর ঘিরে জন্তুদের উল্লাসে হাততালি দিয়েছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান।

প্রমাণ? আরো প্রমাণ?

হাঁসখালির ধর্ষিতার গ্রামে এমনই আতঙ্ক যে ধর্মীয় রীতি মেনে মেয়ের শেষ কাজটুকুও করতে পারছিলেন না মা-বাবা। কোনো পুরোহিত আসবেন না, ক্ষৌরকার আসবেন না, জিনিসপত্র কেনা যাবে না। শাসকের চাপা ফতোয়া। বামপন্থীরা না থাকলে এইটুকুও হত না।

তৃণমূল যে লুম্পেনদের দলে পরিণত হয়েছে, সঙ্গে বাংলার সমাজকে লুম্পেন-সমাজে পরিণত করছে, তার আরো প্রমাণ?

হাইকোর্টে কোন বিচারপতি কোন মামলা শুনবেন তা ঠিক করে দেবে তৃণমূল। এক বিচারপতির রায় দুর্নীতির ঢাকনা খুলছিল বলে তাঁর এজলাশের সামনে হাঙ্গামা হলো। মামলায় বাধা দেওয়া হলো। বিচারপতিরাও এখন আর হাইকোর্টের ভেতরে নিরাপদ নন।

লক্ষ্য করার আরো যে কিছু আছে!

দেশের যে দশ রাজ্যে রামনবমীর নামে দাঙ্গা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়েছে, সেই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গও রয়েছে। পরিকল্পিত ভাবে মুসলিম-বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, এই বাংলাতেও। ইসলামোফোবিয়ায় ক্রমে আক্রান্ত হচ্ছে সমাজের একটি অংশ। ঠিক তখনই বাবুল সুপ্রিয়কে জোর করেই প্রার্থী হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছেন মমতা। এমন এক কেন্দ্রে যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংখ্যালঘু-নিবিড়। বাবুল সুপ্রিয়ের মত ইসলামোফোবিক একজনকে মমতা ব্যানার্জি প্রার্থী করেছেন কোন্‌ বার্তা দিতে?

প্রমাণ? আরো প্রমাণ?

২৫ বছর, ঠিক ২৫ বছর। এই ২৫ বছরে একদিনও, একবারের জন্যও আরএসএস সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি মমতা। বিজেপি-র সঙ্গী হয়েছেন, তিনবার একসঙ্গে ভোটে লড়েছেন, বিজেপি জোটের মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী হয়েছেন—এইসব কথা সকলেরই জানা। প্রতিদিনের রাজনীতিতে বিজেপি-র সঙ্গে ঠোক্কর লাগতে পারে। কিন্তু সঙ্ঘ? সদামুখর মমতা ব্যানার্জি এই একটি প্রশ্নে রা কাড়েন না।

কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক আঁতাত স্পষ্ট হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি চুপ। সংবিধানের কাঠামো ভেতর থেকে দুর্বল করা হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জি চুপ। প্রতিষ্ঠানগুলি আক্রান্ত, এরাজ্যেও সেই একই কায়দা। জেএনইউ-তে যেমন, তেমন আলিয়াতেও।

লুম্পেন-রাজ দিয়ে বিজেপি-বিরোধিতা? নাগপুর হাসছে, মোদী হাসছেন, বাংলা এভাবে অধঃপতিত হতে থাকলে এদেশে ফ্যাসিবাদের রাস্তা পরিস্কার হয়ে যাবে।

আর পিছোনোর কোনো জায়গা নেই।

 

১৫এপ্রিল, ২০২২

20220205

উন্নয়নের নীতি কী হবে: প্রেক্ষিত আসানসোল

 অনুপ মিত্র

 

এক গভীর সঙ্কটের মধ্যে এবারের পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন ও উদারীকরণের নীতির জন্য শিল্প সমৃদ্ধ পশ্চিম বর্ধমান জেলায় একটার পর একটা শিল্প ধ্বংস হয়েছে। কয়লা খনি থেকে শুরু করে চিত্তরঞ্জন রেল কারখানা, লৌহ ইস্পাত শিল্প, কেবলস কারখানা হয় বন্ধ না হয় রুগ্‌ণ করে বন্ধ করার প্রচেষ্টায় কেন্দ্রীয় সরকার।

বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে কৃষির সাফল্যের উপর দাঁড়িয়ে শিল্পায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়েছিল। অসংখ্য নতুন ছোট-ব‍‌‍ড়ো-মাঝারি শিল্পের বিনিয়োগ হয়েছিল। পশ্চিম বর্ধমান জেলাতেও সেই সময় বহু নতুন শিল্প গড়ে উঠেছিল এবং নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাবও এসেছিল। বামফ্রন্টের সময়কালে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য ছিল ইস্কোর আধুনিকীকরণ এবং ইস্কোকে ‘সেইল’-এর সাথে অন্তর্ভুক্ত ঘটা‍‌নো। একই সাথে কুলটি কারখানাকেও ‘সেইল’-এর সাথে যুক্ত করা হয় অথচ সেই সাফল্যকে বামফ্রন্ট পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের নীতির কারণে টিকিয়ে রাখা গেল না।

 

উন্নয়ন: আজকের প্রেক্ষাপটে

 

উন্নয়নের রূপ ও স্বরূপ’ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ প্রয়াত নিরুপম সেন বলেছিলেন, ‘‘রাষ্ট্রসঙ্ঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী উন্নয়‌ন হলো মানুষের পছন্দের সম্প্রসারণ। এই সম্প্রসারণে সবচেয়ে বড়ো বাধা আমাদের আর্থিক ক্ষমতার অভাব, আমাদের দারিদ্র্য।

আমাদের মতো দে‍‌শে উন্নয়নের সুযোগকে আমরা যদি সকলের জন্য যথাসাধ্য সম্প্রসারিত করতে না পারি এবং তার অভিমুখকে আমরা যদি ঠিক করতে না পারি তাহলে উন্নয়নের প্রকৃত অর্থটি অবহেলিত হবে।’’

এই বক্তব্যই ছিল বামফ্রন্ট সরকারের নীতি।

 

আসানসোল দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে উন্নয়নের লক্ষ্যে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা

 

আসানসোল দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নের লক্ষ্যে তৎকালীন সময়ে এক ব্যাপক উন্নয়নের কর্মকাণ্ড আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। পৌরসভা, কর্পোরেশন, পঞ্চায়েত প্রভৃতি স্বশাসিত সংস্থাগুলি যে উন্নয়ন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল, বামফ্রন্ট সরকারের পরবর্তী সময়ে তাকে ধরে রাখল না বর্তমান সরকার।

আসানসোল-দুর্গাপুর অঞ্চলের পুনরুজ্জীবন ও উন্নয়ন ঘটাতে সেই সময় সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল আসানসোল-দুর্গাপুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এডিডিএ)। ১৯৮০ সালে এই সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তদানীন্তন দুর্গাপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং আসানসোল প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন এই দুই সংস্থার একত্রীকরণের মধ্য দিয়ে এডিডিএ গঠন করা হয়।

এডিডিএ’র লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিকাঠামো গঠন ও তাকে কার্যকরী করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিকল্পনা রচনা করা, রাস্তা সহ পরিকাঠামোর বিস্তার, গ্রাম-শহর যোগাযোগকারী রাস্তা নির্মাণ, উপযুক্ত পরিকাঠামো সহ বিভিন্ন শিল্পতালুক তৈরি করা, তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্র স্থাপন, কারিগরি শিক্ষা, চিকিৎসা ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য উপযুক্ত জমি ও পরিকাঠামোর ব্যবস্থা, গরিব মানুষের জন্য আবাস যোজনা, সবুজায়ন, গ্রামাঞ্চলে ক্ষুদ্র সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি বহুবিধ কর্মসূচির রূপায়ণ। বামফ্রন্টের সময়কালে এডিডিএ উপরোক্ত কাজগুলি করতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়াও এডিডিএ’র একটা বড় সাফল্য ছিল দামোদর, বরাকর ও অজয় নদের জলাধারগুলি ব্যবহার করে এই অঞ্চলে পর্যাপ্ত জল সরবরাহের ব্যবস্থা করা। এডিডিএ’র উদ্যোগে আসানসোল-দুর্গাপুর, কাঁকসা অঞ্চলে শিল্পতালুক নির্মাণ হয়েছে। বহু শ্রমিক এইসব শিল্পগুলিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। আসানসোল ইন্ডোর স্টেডিয়াম ও স্টেডিয়াম তৈরি হয়েছে।

বস্তি এলাকার বাসস্থান সমস্যার সমাধানের জন্য বাল্মীকী আম্বেদকর আবাস যোজনায় (ভিএএমবিএওয়াই) দুর্গাপুর আসানসোল রানিগঞ্জে গরিব মানুষের জন্য ঘরের সংস্থান করা হয়েছে।

এই সময়কালের মধ্যে রানিগঞ্জের মঙ্গলপুর শিল্পতালুকে জল সরবরাহের জন্য ৬ কোটি টাকার উপর ব্যয় করে ৫ এমজিডি ক্ষমতা সম্পন্ন জল প্রকল্প তৈরি হয়েছে।

শিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে কারিগরি শিক্ষা, ম্যানেজমেন্ট ও অন্যান্য বিভাগের বহু শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল এবং পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।

এই সময়কালের মধ্যে একটি বড় প্রকল্প ছিল জওহরলাল নেহরু ন্যাশনাল আরবান রিনিউল মিশন (জেএনএনইউআরএম)। এডিডিএ এই প্রকল্প রূপায়ণের দায়িত্ব পেয়ে‌ছিল। এই প্রকল্পগুলির মধ্যে ছিল জল প্রকল্প, গৃহনির্মাণ ও পরিকাঠামো উন্নয়ন, কঠিন বর্জ্য নিষ্কাষণ প্রকল্প এবং সোয়েরেজ ব্যবস্থা। এডিডিএ এই প্রকল্পগুলির সফল রূপায়ণ করে। রানিগঞ্জে বৃহত্তর জলপ্রকল্প এডিডিএ’র একটি কর্মসূচি।

 

বামফ্রন্ট সরকারের নীতি: পরিকল্পিত উন্নয়ন

বামফ্রন্ট সরকারের নীতি ছিল উন্নয়নের কাজকে আরও সংগঠিত ও পরিকল্পিতভাবে রূপায়ণ করা। গ্রামাঞ্চলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার ব্যাপক সাফল্যের মতন‍‌ই শহরাঞ্চলে পৌর প্রশাসনও ছিল সাফল্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং তা ছিল অপরিহার্য। পৌর ব্যবস্থা এবং পৌর প্রশাসনের ক্ষেত্রে ৭৪তম সংবিধান সং‍শোধনও একটি ঐতিহাসিক এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর ফলে সমগ্র দেশই পৌরসভাগুলি নাগ‍‌রিকদের নিজস্ব এবং সার্থক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সুযোগ ঘটেছে। কিন্তু এ‍‌ই আইনের বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছিল আমাদের রাজ্যেই। ১৯৯২ সালে ৭৪তম সংবিধান সংশোধন হওয়ার পর পৌর পরিচালনায় আরও গতি আনার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পৌর আইন ১৯৯৩ তৈরি হলো। পৌর প্রশাসনে নাগরিকদের অংশগ্রহণকে সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছিল। আমাদের রাজ্যে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নিয়মিত পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে লাগল। গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হলো। মৃতপ্রায় অথচ গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমস্ত অংশের মানুষের অংশগ্রহণ ঘটল। দারিদ্রসীমার নিচে বসবাসকারী নাগরিকদের জীবনমানের উন্নতির ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকারের নীতি অনুযায়ী পৌরসভাগুলি কার্যকরী ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম হলো। এছাড়াও আইন অনুযায়ী পৌরসভা কর্পোরেশন এলাকায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ওয়ার্ড কমিটি গঠন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। নাগরিকদের সুচিন্তিত মতামতের মধ্য দিয়ে ওয়ার্ড কমিটি পরিচালিত হতো এবং উন্নয়নের কাজ সংগঠিত হতো।

 

পরিকল্পিত উন্নয়নের যে বৈশিষ্ট্যগুলি অগ্রাধিকার পেল তার কয়েকটি উল্লেখ করা প্রয়োজন।

১) খসড়া উন্নয়ন পরিকল্পনা: খসড়া, উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করার জন্য পৌরসভা স্তরে একটি ডিডিপি পলিসি গ্রুপ গঠন করা হয়। এছাড়াও পৌরসভা তিনটি ডিটিজি-১ গ্রুপের দায়িত্ব পরিকাঠামো, জমির ব্যবহার ও পরিবেশ উন্নয়ন।

ডিটিজি-২ গ্রুপের দায়িত্ব সমাজ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়ে পরিকল্পনা তৈরির কাজ।

ডিটিজি-৩ গ্রুপের দায়িত্ব পৌরসভার সাংগঠনিক পরিকাঠামো, উন্নয়নের পরিকল্পনা তৈরির কাজ।

২) অ্যাকাউন্টিং রিফর্মস: বামফ্রন্ট সরকার পৌরসভাগুলিতে আর্থিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে আসতে অ্যাক্রুয়েল বেসড ডাবল এন্ট্রি ব্যবস্থা চালু করার কথা বলে। এটি একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাপনা যার সাহায্যে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাকে নানা ধরনের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুসংহতভাবে দেখা যায়।

৩) নাগরিক সনদ: ‘নাগরিক সনদ’ এ‍ই ধারণাটি প্রথম গড়ে ওঠে ১৯৯১ সালে ইংল্যান্ডে। এরপর বিভিন্ন নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশগুলিতে এই নাগরিক সনদ চালু হয়।ভারতে ১৯৯৭ সালে নাগরিক সনদ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত পরিষেবার ক্ষেত্রে প্রথম চালু হয়। নাগরিক সনদের মূল নীতিগুলি হলো — পরিষেবার মান উন্নত করা ও তাকে নির্দিষ্ট করা। নাগরিকদের কাছে পছন্দ বা বাছাইয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা, আলাপ-আ‍‌লোচনার প্রক্রিয়ায় সর্বস্তরের মানুষ‍‌কে যুক্ত করা, নাগরিক ও পৌরসভার মধ্যে বিশ্বাসযোগ্যতার পরিবেশ তৈরি করা, পৌরসভার কাজে দায়বদ্ধতা আনা এবং সর্বোপরি নাগরিকরা যাতে পৌর পরিষেবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই পান তা সুনিশ্চিত করা। এক ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে বামফ্রন্ট পরিচালিত পৌর বোর্ডগুলি এই কাজগুলি করতে পারায় বামফ্রন্ট সময়কালে পৌরসভাগুলি সত্যিকারের নাগরিকদের পৌরসভা হয়ে উঠেছিল।

 

এখন আর জনগণের অংশগ্রহণ নেই

২০১১ সালে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পর তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত রাজ্য সরকার পৌর প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধিকারের উপর হস্তক্ষেপ হানল। বামফ্রন্ট পরিচালিত পৌর বোর্ডগুলিকে নানান উপায়ে দখল করা হতে লাগল। জোর করে আইনকে উপেক্ষা করে পৌর বোর্ডগুলি চালাতে লাগল। পৌরসভা পরিচালনায় জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে উপেক্ষা করা হলো। শুরু হলো এক অরাজক অবস্থা। উন্নয়নের নামে লুটপাট চলতে লাগল।

পৌরসভাগুলির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবার পরেও নতুন করে নির্বাচন করা হলো না। পৌর আইনকে উপেক্ষা ও জলাঞ্জলি দিয়ে শাসক দলের প্রতিনিধিদের দিয়েই অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, বোর্ড অব অ্যাডমিনিস্ট্রেটর তৈরি করে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিকভাবে পৌরসভা, কর্পোরেশনগুলি আজও পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছে তারা। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে পদদলিত করা হয়েছে। বামফ্রন্ট সময়কালে নাগরিকদের সমস্ত স্বাধীনতা, মতামতের অধিকারকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

 

আসানসোলের ভোটে যে কথা সামনে আসছে

আসানসোল নগর নিগম পূর্বে এত বড় এবং এত ওয়ার্ড নিয়ে ছিল না। এখন ১০৬টি ওয়ার্ডে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৫ সালে পৌরভোটের আগে রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া ও কুলটি পৌরসভাকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে তৎকালীন আসানসোল নগর নিগমের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে রানিগঞ্জ এবং জামুড়িয়া পৌরসভা দু’টি ছিল বামফ্রন্ট পরিচালিত। দু’টি পৌরসভাই এ‍‌ই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। রানিগঞ্জ পৌরসভায় বোর্ড অব কাউন্সিলারদের জরুরি সভা ডাকা হয়। সেই সময় রানিগঞ্জ পৌরসভাকে তুলে দেবার এবং আসানসোল নগর নিগমের সঙ্গে সংযুক্তি ঘটনার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয় এবং একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। তখনও বর্ধমান জেলা ভাগ হয়নি। তৎকালীন পৌরসভার পক্ষ থেকে রানিগঞ্জ পৌরসভা তুলে দেবার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে আসানসোলে অতিরিক্ত জেলা শাসককে চিঠি পাঠানো হয়। যিনি মিউনিসিপ্যাল বিষয়টি দেখতেন। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত জেলা শাসক রানিগঞ্জ পৌরসভাকে চিঠি দিয়ে শুনানির জন্য উপস্থিত হতে চিঠি পাঠান। আমরা সেই শুনানিতে উপস্থিত থাকি এবং আমাদের বক্তব্য বলি ও রানিগঞ্জ পৌরসভা তুলে দেবার বিরোধিতা করি। পৌরসভা এবং বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে নাগরিকদের কনভেনশন, সভার মধ্য দিয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়। এমনকি রানিগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স ও রানিগঞ্জ সিটিজেন্স কাউন্সিলও তখন রানিগঞ্জ পৌরসভা তুলে দেবার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। কিন্তু কোনও কিছুকেই তোয়াক্কা না করে রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, কুলটি পৌরসভাকে তুলে দিয়ে আসানসোল নগর নিগমের সঙ্গে সংযুক্তি ঘটানো হয়। জামুড়িয়াতেও রানিগঞ্জের মতো অনুরূপ প্রতিবাদ সংগঠিত হয়।

অন্যদিকে রানিগঞ্জ জামুড়িয়ার স্বার্থে, রানিগঞ্জ জামুড়িয়াকে যুক্ত করে নতুন রানিগঞ্জ মহকুমার দাবিতে বামফ্রন্টের উদ্যোগে ২০১৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, রানিগঞ্জ শহরে একটি নাগরিক কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয় এবং রানিগঞ্জকে মহকুমা করার দাবিতে প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এবারের নগর নিগম নির্বাচনে বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে এই দাবি তোলা হয়েছে। এছাড়াও দাবি করা হয়েছে রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, কুলটিকে পুরানো পৌরসভার মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। আসন্ন নগর নিগম নির্বাচনকে সামনে রেখে পশ্চিম বর্ধমান জেলা বামফ্রন্টের পক্ষ থেকে যে নির্বাচনী ইশ্‌তেহার প্রকাশ করা হয়েছে তাতে উপরোক্ত দাবি সহ মোট একুশ দফা প্রস্তাব করা হয়েছে যা বামফ্রন্ট পৌর নিগমের নির্বাচনে নির্বাচিত হলে রূপায়ণ করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ বোর্ড গঠন করা এবং তাকে রক্ষা করা। শিল্পাঞ্চলকে বাঁচানোর জন্য চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করা। শিল্পাঞ্চল ও কৃষি অঞ্চলকে মরুভূমির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। মানুষের জীবনমানের উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া। ওয়ার্ড কমিটি গঠন করে নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করা। আসানসোল রেলপাড় অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য গাড়ুই নদীর সংস্কার করা। বার্নপুর এলাকায় হাইড্রেন সংস্কার করা। পৌর বোর্ডে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারী অফিসারদের যে মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছিল সেই মর্যাদা এবং সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া। বিরোধী কাউন্সিলরদের য‍‌থোপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া। বোরো অফিসগুলিকে যথার্থই কার্যকরী করে তোলা। অর্থ মঞ্জুর করে উন্নয়নের কাজকে গতিশীল করা। অনলাইনের মাধ্যমে ট্যাক্স প্রদান। এসসি, এসটি, ওবিসি ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুবিধে প্রদান। দালাল চক্রকে বন্ধ করা। বর্জ্য পদার্থ পরিকল্পিতভাবে উত্তোলন এবং প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা। পানীয় জলের সঙ্কট মোচন করা। বস্তি এলাকায় মানুষের পয়ঃপ্রণালী, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পাকাবাড়ি, পানীয় জল, পথবাতি, পাকা রাস্তার ব্যবস্থা করা। ক্রীড়া ও সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটানো। কুলটি, চিনাচুড়ি, রানিগঞ্জ, বার্নপুর, জামুড়িয়া, আসানসোল শহরের প্রধান সড়কগুলি সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা। রানিগঞ্জের বাইপাস রাস্তা প্রকল্প কার্যকর করা। কুলটি, জামুড়িয়া এলাকায় দমকল কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রস্তাব রাজ্য সরকারের কাছে পাঠা‍নো। পূর্বের মাইনস বোর্ড অব হেলথ-এর কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা।

করোনা পরিস্থিতিতে কোভিড বিধি মেনে এবারের নগর নির্বাচন পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৫ সালে আসানসোল কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যাপকভাবে ভোট লুট করা হয়েছিল। মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। জোর করে আসানসোল নগর নিগম নির্বাচনকে দখল করা হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা মানুষের সামনে আছে। এবারের নির্বাচনে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ভোট লুট রুখে দিয়ে মানুষ যাতে নতুন বামপন্থী পৌর বোর্ড গঠন করতে পারে সর্বত্র তারই প্রস্তুতি চলছে।

 

(গণশক্তি, ২৯জানুয়ারি, ২০২২)

 

শিলিগুড়িও আধুনিক হয়েছে বামফ্রন্টের হাত ধরেই

 অশোক ভট্টাচার্য

 

আর কয়েকদিনের মধ্যে অবশেষে শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন হতে চলেছে। অবশ্যই যদি রাজ্য নির্বাচন কমিশন বা রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। করোনার অজুহাতে নির্বাচন প্রথমে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অনেক জনমত ও নাগরিক আন্দোলনের চাপে রাজ্য সরকার ও রাজ্য নির্বাচন কমিশন ২২জানুয়ারি চারটি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনের দিন ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছিল। পরে তা পিছিয়ে দিয়ে নির্বাচনের দিন পুনঃনির্ধারণ করা হয় ১২ ফেব্রুয়ারি। যদিও করোনার প্রকোপ এখনও অব্যাহত রয়েছে।

ইতিমধ্যে বামফ্রন্ট সহ সমস্ত রাজনৈতিক দল নির্বাচনী প্রচারের কাজ অব্যাহত রেখেছে। বামফ্রন্ট সমস্ত করোনা বিধি মান্য করেই প্রচারের কাজ চালিয়ে গেলেও, তৃণমূল কংগ্রেস দল কিন্তু তা মেনে চলছে না। ইতোমধ্যে তাদের এক প্রধান নেতা করোনা বিধি না মেনে প্রচারের কাজ চালানোর ফলে নিজে যেমন অসুস্থ হয়েছেন সেই সংক্রমণে সংক্রমিত হয়েছেন তাদের দলের অনেক কর্মী ও নেতারাও। এই নিয়ে শহরের মানুষের মধ্যে অনেক প্রশ্ন উঠছে।

যে চারটি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে তার মধ্যে শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশনের নির্বাচন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ২০১৫সালে রাজ্যের সর্বশেষ পৌর কর্পোরেশনগুলির নির্বাচনে একমাত্র শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনেই বামফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে পৌরবোর্ড গঠন করেছিল। রাজ্যের বিভিন্ন পৌর কর্পোরেশন বা পৌরসভার নির্বাচনগুলিকে শাসকদল পুলিস প্রশাসনের সহযোগিতায় প্রহসনে পরিণত করেছিল। তা পারেনি কেবলমাত্র শিলিগুড়ি পৌর কর্পোরেশন নির্বাচনে। কারণ বামফ্রন্ট সেই সময় সব দল, তথা দলমত নির্বিশেষে সমস্ত ভোটদাতাদের কাছে নিজের ভোট নিজে দেওয়া, বাধা এলে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আবেদন জানিয়েছিল। মানুষ সেই আবেদনে ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছিলেন এবং নিজের ভোট নিজের পছন্দমতো প্রার্থীদের দিতে পেরেছিলেন। ফলে বামফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছিল। কিছু সংবাদমাধ্যম একেই বলেছিল শিলিগুড়ি লাইন। আর একটি বিষয় হলো নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বামফ্রন্টকে পৌরবোর্ড পরিচালনা করতে হয়েছিল বহু বাধা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে। শাসকদল নানাভাবে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছিল দলত্যাগের। হুমকি দেওয়া হয়েছিল নির্বাচিত পৌরবোর্ড ভেঙে দেবার ও জবরদখল করার। ওই পৌরবোর্ড এতো বাধার মধ্যে উন্নয়ন ও উন্নত পরিষেবা প্রদানের কাজ করেছিল সাফল্যের সাথে।

বামফ্রন্ট পরিচালিত সেই পৌরবোর্ড একদিকে উন্নয়নের ন্যায়সঙ্গত দাবি আদায়ের জন্যে যেমন লড়াই করেছিল, তেমনি লড়াই করে বহু দাবি আদায় করেছিল, আবার নিজস্ব উদ্যোগে আয় বাড়িয়ে বহু উন্নয়নমূলক কাজও করেছিল। কাজ করেছিল মানুষকে সাথে নিয়ে সৎ ও স্বচ্ছভাবে। বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল শহরের বুনিয়াদি পরিষেবা প্রদান ও পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ। সেইসব কাজ শহরের মানুষের চোখের সামনে রয়েছে। এতো বাধার মধ্যে বামফ্রন্ট শাসক দলের ও রাজ্য সরকারের চোখ রাঙানির কাছে মাথা নিচু করেনি। করেনি আত্মসমর্পণও। শিলিগুড়ির মানুষ এরজন্য গর্ববোধ করে।

এই শহরের মানুষ জানে শিলিগুড়ির উন্নয়ন ও বামফ্রন্ট সমার্থক। মানুষ দেখেছে ও তারা জানে শিলিগুড়িকে রাজ্য তথা দেশ ও বিদেশের কাছে তুলে ধরেছে বামফ্রন্টই। একটি ছোট্ট জনপদকে একটি মেট্রো শহরের দিকে নিয়ে গেছে বামফ্রন্টই। বামফ্রন্টই শিলিগুড়িকে পৌরসভা থেকে পৌর কর্পোরেশনে উন্নীত করেছে। মানুষ বিগত ৪০ বছরের মধ্যে একবারই মাত্র তৃণমূল কংগ্রেস ও কংগ্রেস জোটের পৌরবোর্ডকে নির্বাচিত হতে দেখেছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বলে তারা জোটবদ্ধভাবে সেই পৌরবোর্ডকে পরিচালনা করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। এমনকি নিজেদের অন্তর্দ্বন্দ্বে সেই পৌরবোর্ডকে তারা চার বছরের বেশি সময় অব্যাহত রাখতে বা পরিচালনা করতে হয়েছিল সম্পূর্ণ ব্যর্থ। অন্যদিকে শহরের মানুষ দেখেছে এই শহরের যাবতীয় উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে বিগত বামফ্রন্টের পৌরবোর্ড, বামফ্রন্ট পরিচালনাধীন শিলিগুড়ি—জলপাইগুড়ি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সেই সময়ের রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের উদ্যোগে। এই শহরের ঘরে ঘরে পানীয় জল সরবরাহ, প্রতিটি গৃহ থেকে জঞ্জাল সংগ্রহ করা, ওয়ার্ড ভিত্তিক জঞ্জাল সংগ্রহ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে ওয়ার্ড বর্জ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ওয়ার্ড কমিটি গঠন এসব বামফ্রন্ট পৌর বোর্ডেরই সুফল। শহরে যতো বড় বড় রাস্তা বা রাস্তা প্রশস্তকরণ, ডিভাইডার নির্মাণ, ফুটপাত, রাস্তার ধারে গাছ লাগানো, পাকা নালা নির্মাণ, জল নিকাশি ব্যবস্থার উন্নয়ন, শহরের মধ্যে যানজট জটিলতা হ্রাস করতে বামফ্রন্টই নির্মাণ করেছিল তিনটি উন্নতমানের বাইপাস, চারটি মহানন্দা সেতু, প্রায় ১৫টি সেতু নির্মাণ করা হয়েছে ফুলেশ্বরী, জোড়াপানি, পঞ্চনই, মহিষমারি নদীর ওপর। এই শহরের দুটি ফ্লাইওভারও নির্মিত হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে। তিনটি আন্ডারপাস, রাস্তার ধারে এলইডি আলো। বস্তি উন্নয়ন, পাড়ার রাস্তার উন্নয়ন, বস্তির সার্বিক উন্নয়ন তাদের জমির পাট্টা, লিজ প্রদান, দলিল দেওয়া সবই হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকারের সময়ই।

শহরের মধ্যে যানজট হ্রাস করতে শহরের বাইরে পরিবহণ নগর, তিনটি উপনগর, বিঞ্জান নগরী, ট্রাক টার্মিনাল, উন্নতমানের দুটি বাস টার্মিনাল, শ্মশানঘাটে বৈদ্যুতিক চুল্লি স্থাপন, কারবালা উন্নয়ন এসবও হয়েছে বামফ্রন্ট জমানায়। বামফ্রন্ট শিক্ষা, সংষ্কৃতি, খেলাধুলার উন্নয়নে রেখে গেছে বিরাট অবদান। এই শহরে কাঞ্চনজঙ্ঘা  ক্রীড়াঙ্গন, ইন্ডোর স্টেডিয়াম, দীনবন্ধু মঞ্চ, সুইমিং পুল, ক্রীড়াদীপ্তি সবই বামফ্রন্টের অবদান। এই শহরে অনুষ্ঠিত হয়েছে বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান। বামফ্রন্টের সময়েই হয়েছে দুটি বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, সরকারি বিজ্ঞান ও পলিটেকনিক কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, নার্সিং কলেজ। বামফ্রন্টের সময়ে পাঁচটি নতুন সংগঠিত বাজার নির্মাণ, তিনটি বাজার নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ, ডি আই ফান্ডকে পৌরসভার হাতে আনা ইত্যাদি কাজও হয়েছে। মহানন্দা নদী সংস্কার প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছিল বামফ্রন্টের সময়ে। রাজ্য তৃণমূল কংগ্রেস দলের সরকার আসবার পর তাদের পরিচালিত এসজেডিএ’র চেয়ারম্যান ও বোর্ড সদস্যরা জড়িয়ে পড়েছিল ২০০ কোটি টাকার লুট ও দুর্নীতির সাথে। আজ সেই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। বামফ্রন্ট পরিচালিত এসজেডিএ বোর্ডের কাজের সাফল্যই টি পার্ক, ফুড পার্ক, আনারস পার্ক, ড্রাই পোর্ট ইত্যাদি কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্প সমূহ। বামফ্রন্টই উদ্যোগ নিয়েছিল উত্তরায়নে ২৫একর জমির ওপর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণে বিশেষ অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোন নির্মাণের। বর্তমান রাজ্য সরকারের একজন মন্ত্রীর উদ্যোগে সেই প্রকল্পের উদ্যোগে বাতিল ও বানচাল করে দেওয়া হয়। কোয়ানটাম তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রটিও বামফ্রন্টের উদ্যোগের সুফল। বর্তমান রাজ্য সরকারের সময়ে তাও মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে।

শিলিগুড়ি শহরের সমস্ত স্বীকৃত ও অস্বীকৃত বস্তিগুলির যতো উন্নয়ন হয়েছে তা হয়েছে বামফ্রন্টের সময়তেই। কম করেও প্রায় ১০হাজার উদ্বাস্তু ও সরকারি উদ্যোগে বা পৌরসভার উদ্যোগে জমির দলিল, পাট্টা বা লিজ দলিত পেয়েছে বামফ্রন্টের উদ্যোগেই।

বামফ্রন্টের নেতৃত্বে বিগত পৌরবোর্ডের সময়ে সমস্ত ওয়ার্ডে অজস্র রাস্তাগুলিকে ম্যাস্টিকে উন্নীত করা হয়েছে। রাস্তার ধারে উন্নত পাকা নালা নির্মাণ করা হয়েছে। সমস্ত রাস্তায় এলইডি আলো লাগানো হয়েছে। নতুন অফিস ভবন ও স্বাস্থ্যভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১১টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। শ্মশানঘাটে নতুন দুটি বৈদ্যুতিক চুল্লি নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। বিদ্যাসাগর নাট্য মঞ্চ, চারটি নতুন পার্ক, নদীর ঘাট উন্নয়ন, নদী তীরের সৌন্দর্যায়ন, বিসর্জনঘাটের উন্নয়ন ইত্যাদির পরিকল্পনা ও উদ্যোগ বামফ্রন্টই নিয়েছে।

পৌর প্রশাসনে স্বচ্ছতা, সততা, দ্রুততা, দায়বদ্ধতা, বিকেন্দ্রীকরণ বামফ্রন্টেরই সাফল্য। পৌরসভা বামফ্রন্ট পরিচালনা করেছে সবসময়ই গণতান্ত্রিকভাবে। বিরোধীদেরও দেওয়া হয়েছে সমান অধিকার ও মর্যাদা। কোনোরকম রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক আচরণ করা হয়নি। শিলিগুড়িকে একটি পরিকল্পিত শহর হিসাবে গড়ে তুলতে প্রস্তুত করা হয়েছিল ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা। জমির সদ্‌ব্যবহার মানচিত্র, জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কিত পরিকল্পনা, পরিবেশে দূষণ হ্রাসের পরিকল্পনা ইত্যাদি। যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রশংসিত হয়েছিল। শিলিগুড়ির উন্নয়নে বামফ্রন্টের সাফল্যের ইতিহাস লিখে শেষ করা যাবে না।

তাই এই নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিটি মানুষের মুখে একটিই কথা, শিলিগুড়ির যাবতীয় উন্নয়ন হয়েছে বামফ্রন্ট পৌরবোর্ডের সময়েই। একমাত্র বামফ্রন্টের হাতেই শিলিগুড়ি শহর থাকতে পারে সুরক্ষিত। শিলিগুড়ি শহরের আত্মমর্যাদা ও আত্মসম্মান ধরে রাখতে পারে বামফ্রন্টই। এই কারণেই এই শহরের মানুষ পুনরায় বামফ্রন্টের পৌরবোর্ডকেই দেখতে চায়। তৃণমূল কংগ্রেস বা বিজেপি—কে ভোট দেওয়া মানে শিলিগুড়ি শহরকে আরও দশ বছর পিছিয়ে দেওয়া। অনুন্নয়ন, অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্যকে ডেকে আনা। মানুষ তা চায় না। এই শহরের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসকে দেখেছে ২০০৯ সালে। বিগত ৮মাস প্রশাসক মণ্ডলীর চেয়ারম্যান ও বোর্ডে তৃণমূলীদের মানুষ দেখেছে। সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি মানুষ চায় না। এই শহর উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র। এই শহরের বিপুল সংখ্যক মানুষ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। সাম্প্রতিক তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শাসনে তাদের দলবাজি, দাম্ভিকতা, কাটমানি মানুষ দেখেছে। এই কারনে তারা শিলিগুড়ির ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েই তৃণমূল কংগ্রস ও বিজেপি—কে চায় না। তারা তাদের সুরক্ষা নিরাপত্তা, সম্মান, আত্মমর্যাদা, শান্তি সম্প্রীতির জন্যেই চায় বামফ্রন্টকে পৌরবোর্ডে ফিরিয়ে আনতে। এই চর্চা আজ শহরের সর্বত্রই দলমত নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে চর্চিত হচ্ছে।

শিলিগুড়ির মানুষ আর একবার বামফ্রন্টের পক্ষে ইতিবাচক রায় দিয়ে ২০১৫সালের পুনরাবৃত্তির দিকে তাকিয়ে আছে। শিলিগুড়ি চায় আরও উন্নততর শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি চায় আরও বসবাস উপযোগী শহর। যেখানে গরিব, মধ্যবিত্ত ও ধনীদের মধ্যে থাকবে ভারসাম্য। পরিবেশের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখেই হবে উন্নয়ন। গরিবদের বসবাসের ক্ষেত্রে থাকবে নিশ্চয়তা। পৌরসভা হবে গরিব মধ্যবিত্ত অভিমুখী। বস্তি রেখেই হবে বস্তির উন্নয়ন। এইরকম এক পৌরসভা দিতে পারে একমাত্র বামফ্রন্টই। 

 

গণশক্তি, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২