20170211

দিশাহীন, ভাঁওতাসর্বস্ব, দেউলিয়া বাজেট: সূর্য মিশ্র





শুক্রবার বিধানসভায় তৃণমূল সরকারের পেশ করা ২০১৭-১৮ সালের রাজ্য বাজেট সম্পর্কে এক প্রতিক্রিয়ায় সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেছেন:

‘‘একটা দিশাহীন, ভাঁওতাসর্বস্ব, দেউলিয়া বাজেট।

বেকার যুবক-যুবতীদের আগামীদিনে কর্মসংস্থান সম্পর্কে এই বাজেটে কোনও দিশাই দেখানো হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী যে কর্মসংস্থান করার এত হিসেব দেন, সেসব কোথায় গেলো? এটা স্পষ্ট, ওঁর প্রতিশ্রুতির কোনও মূল্য নেই। সবই ভাঁওতা।

চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর লুটের টাকা উদ্ধার সম্পর্কেও কোনও কথা নেই এই বাজেটে।

আই সি ডি এস এবং আশা কর্মীদের ভাতা কিছুটা বাড়ানো হলেও তাঁদের অবসরের সময় এককালীন অনুদান দেওয়া এবং কাজের নিরাপত্তা সম্পর্কে, কর্মক্ষেত্রে যে আক্রমণ নেমে আসছে, সেগুলি মোকাবিলা করার কোনও কথা বলা হয়নি। ভাতা আংশিক বৃদ্ধি এই কর্মীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের জয়। অন্যদিকে, অন্যান্য স্কিম ওয়ার্কাস বা প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি সম্পর্কে বাজেটে উচ্চবাচ্য করা হয়নি। প্যারা টিচার, এস এস কে, এম এস কে, সিভিক ভলান্টিয়ার্স ইত্যাদি কর্মীদের ভাতাবৃদ্ধি সম্পর্কে বাজেট নিশ্চুপ। বামফ্রন্ট সরকারের সময় যে সুবিধা এরা পেতেন, তা এখন পাচ্ছেন না। বামফ্রন্ট সরকার এই সমস্ত কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা দিয়েছিল, ছাঁটাই না হওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। একইসঙ্গে, নিয়মিত ভাতা বাড়ানো হচ্ছিলো। সেসব এখন হচ্ছে না।

রাজ্য সরকারী কর্মচারী, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারীসহ অন্যান্য কর্মীদের যে বিপুল পরিমাণ মহার্ঘ ভাতা বকেয়া আছে, তার কী হলো? বাজেটে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
বামফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ার সময় রাজ্যের ওপর ঋণ ছিল ১লক্ষ ৮৬হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শুধু তৃণমূল সরকারের আমলে মাত্র ৬বছরেই ঋণ নেওয়া হচ্ছে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। বাজেটের বাইরে এবং পরিকল্পনা-বহির্ভূত যে বিপুল পরিমাণ খরচ করা হচ্ছে, তার জন্যই এইভাবে বেপরোয়া ঋণ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য ফসলের সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিবীমা সম্পর্কে কোনও উল্লেখই নেই এই বাজেটে। বন্ধ কল-কারখানা, বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য কোনও কথা নেই। তফশিলী জাতি, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের কোনও দিশা দেখাতে পারেনি তৃণমূল সরকার। খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্পর্কেও কোনও বার্তা নেই।

আমরা এই বাজেটের তীব্র বিরোধিতা করছি।

শ্রমিক-কৃষক, বেকার যুবক-যুবতী, মহিলা, চিট ফান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী, তফশিলী জাতি, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের স্বার্থে, তাঁদের দাবিগুলি নিয়ে আমাদের লড়াই জারি থাকবে।’’


১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

রাজ্য বাজেটে মূল বিষয়গুলির উত্তর নেই, আছে অনেক বিভ্রান্তি


ড. অসীম দাশগুপ্ত

এবারের রাজ্য বাজেটে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরই উত্তর নেই, কিন্তু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা আছে। আমরা কিছু মূল বিষয় ও বিভ্রান্তির ওপর আমাদের বক্তব্য রাখছি।

১. কর্মসংস্থান
এই বাজেটে একেবারে শেষের পাতায় হঠাৎই বলা হয়েছে, এই ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে এ-রাজ্যে ১৩.২৭ লক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে (পৃঃ ৩৬)। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী সমগ্র দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১.৫ লক্ষেরও কম। তাহলে এক‍‌টি রাজ্যে কিভাবে ১৩.২৭ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? উত্তর নেই। এই বিষয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হলো জানা যে, রাজ্যের কোন কোন ক্ষেত্রে (যথা, কৃষি, শিল্প, পরিষেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে) কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো জেলাওয়াড়ি তথ্য আছে? পুনরায় উত্তর নেই। তাহলে এই ভিত্তিহীন এবং তথ্যহীন দাবিটি হঠাৎ বাজেটের শেষে একটা বিচ্ছিন্ন পংক্তিতে বলে বেকার যুবক-যুবতীদের মনে কেন এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলো?

২. শিল্পে বিনিয়োগ
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অবশ্যই নির্ভর করে রাজ্যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি, এবং বিশেষ করে শিল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের ওপর। এখানে লক্ষণীয় যে, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাজ্য সরকারের প্রথম দুবছরের আর্থিক সমীক্ষারই ষষ্ঠ অধ্যায়ে ৬.৬ সারণির তথ্যাবলী অনুযায়ী, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরে ২০১০ সালে যেখানে সংগঠিত শিল্পের ক্ষেত্রে ৩২২টি নতুন শিল্প সংস্থায় ১৫,০৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়েছিল, সেখানে তৃণমূল সরকার আসার পর ২০১২ সালে নতুন চালু হওয়া শিল্প সংস্থার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১২টিতে, এবং বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ৩১২ কোটি টাকায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এর ঠিক পরের বছরগুলি থেকে বর্তমান বছর পর্যন্ত রাজ্যের আর্থিক সমীক্ষায় এই সারণিটিই উধাও করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে একটি নতুন সারণি বা পরিচ্ছেদ এনে (এ-বছরে পরিচ্ছেদ ৮.৩) নির্মীয়মাণ শিল্প এবং নির্মিত শিল্প একত্রিত করে দেখানো হয়েছে, কিন্তু কত পরিমাণ বিনিয়োগ কত নির্মিত শিল্প সংস্থাতে বাস্তবায়িত হয়েছে তা কিছুতেই জানানো হচ্ছে না। এত গোপনীয়তা কেন?
উল্লেখ করা প্রয়োজন শিল্পে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের তথ্য না থাকলে কিভাবে রাজ্যের মোট উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে?

৩. কর রাজস্ব আদায়
রাজ্যের কর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে যে ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে ২০১০-১২ সালের তুলনায়, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণের সামান্য বেশি। কিন্তু যা বলা হয়নি, তাহলো, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ পাঁচ বছরেও রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ১০,৮৮৮ কোটি টাকা থেকে ২১,২২৩ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি। এটাও বলা হয়নি যে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই রাজ্যগুলিতে মূল্যযুক্ত কর (ভ্যাট) চালু হয়েছিল, যেখানে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার, এবং যা প্রত্যেক রাজ্যেই কর রাজস্ব বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। এছাড়া, কর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ শুরু হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই। আত্মপ্রচারের তাগিদে তাও উহ্য রাখা হয়েছে এবারের বাজেট বিবৃতিতে।

৪. পরিকল্পনা ব্যয়
এই বাজেটে বলা হয়েছে রাজ্যের পরিকল্পনা খাতে ব্যয় ২০১০-১১ এর তুলনায় ২০১৬-১৭-তে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেতে চলেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ চিত্রটি একটু ভিন্ন। সাধারণত এরাজ্যে পরিকল্পনা ব্যয় প্রতি চার বছরের সময়ে দ্বিগুণের মতন বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে, ২০০৯-১০ সালে রাজ্যে যে পরিকল্পনা ব্যয় ছিল ১২,১২১ কোটি টাকা, তা পরের চার বছরে ২০১৩-১৪ সালে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ২৪,১০৭ কোটি টাকায়। কিন্তু ঠিক তার পরের বছরেই অর্থাৎ ২০১৪-১৫ সালে রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে দেখানো হল ৪৪,০৪৪ কোটি টাকায়। এবং এখন আগাম বলা হচ্ছে ২০১৬-১৭ সালে তা বৃদ্ধি পাবে ৬ গুণ। এটা কি করে  সম্ভব হচ্ছে? আমরা জানি যে, কেন্দ্রীয় সহায়তাভিত্তিক প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ব্যয়ের একটি অংশ দেয় রাজ্য সরকার, এবং বাকিটা প্রদান করে কেন্দ্রীয় সরকার। উদাহরণ হিসেবে, যদি কোনো পরিকল্পনা ব্যয়ের ২৫% দেয় রাজ্য সরকার তাহলে বাকি ৭৫% দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অর্থ সরকারের প্রদেয় এই অর্থ কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং রাজ্য সরকারের প্রদেয় অর্থটি  রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়ের অংশ হবে।। কিন্তু গত ২ বছর ধরে আমরা লক্ষ্য করছি যে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ৭৫% অর্থও রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়ের ক্ষেত্রে যুক্ত করে দিয়ে এত বেশি পরিকল্পনা ব্যয় বৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু  পদ্ধতির এই পরিবর্তনের কথা রাজ্য সরকার খোলাখুলি বলছেন না কেন? খোলাখুলি না বলে, উহ্য রেখে নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে দেখাতে চাইছেন কেন?

৫. রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝা
এই বাজেটে বলা হয়েছে, ২০০৬-০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার যে ঋণ নিয়েছিল ১০ বছর পরে এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে ইত্যাদি। আমরা বারংবার বলেছি যে রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝার মূল কারণ হলো, স্বল্প সঞ্চয় সংক্রান্ত ঋণ। স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্প রাজ্য সরকারের নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প। এই প্রকল্পে যে নিয়ম কেন্দ্রীয় সরকার স্থির করেছে, তাহলো কোনো একটি বছর রাজ্যের সাধারণ মানুষ স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে যে অর্থ জমাবেন, তার ৮০% অর্থ বাধ্যতামূলকভাবেই রাজ্য সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে খুব চড়া সুদে। যেহেতু স্বল্প সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এরাজ্যের স্থান হয়েছিল প্রথম, তাই কেন্দ্রের নিয়মে এই খাতে চাপানো ঋণই বড় বোঝা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর। এই ঋণের বিষয়ে রাজ্য সরকারের কোনো যোগ নেই, তাই কেন্দ্রের এই চাপানো ঋণের বিরুদ্ধে সমস্ত রাজ্যই বারংবার দাবি জানিয়েছে। ত্রয়োদশ অর্থ কমিশন বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার বলার পরও এই ঋণের বোঝা রয়েই গেছে। এই ঋণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর মূলধনের অংশটি ফেরত দিতে হয় ছবছরের পর থেকে, এবং ২০ বছর ধরে। এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির সংশ্লিষ্টসকলেই জানে, এবং তৃণমূল সরকারেরও জানা উচিত কারণ এই কেন্দ্রীয় নিয়মগুলি যখন লাগু করা হয় তখন তারাও কেন্দ্রীয় সরকারের অংশীদার। এই প্রেক্ষিতটা না বলে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার মানে হলো, হয় এই তৃণমূল সরকার এর প্রেক্ষিতটা জানে না, অথবা জানলেও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

৬. চিট ফান্ডের প্রসঙ্গ
যখন কালো টাকা উদ্ধারের কথা উত্থাপিত হয়েছে, তখন মনে রাখা উচিত, নিয়ম ভেঙে চিট ফান্ডগুলির লুট করা টাকা এবং তাদের থেকে পুনরায় ভাগ বসানো অর্থ উভয়ই হলো কালো টাকা। এই মোট কালো টাকা  উদ্ধার করে সঞ্চয়ীদের কাছে ফেরত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকদেরও (দুটি স্তরেই) শাস্তি প্রদানের বিষয়টিতে বিস্ময়করভাবে একেবারে নীরব থেকে গেছে এই রাজ্য বাজেট।

৭. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়
আই সি ডি এস প্রকল্পের ক্ষেত্রে কর্মীদের সহায়তা করার প্রসঙ্গে বলা উচিত, অসংগঠিত অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সমস্ত-কর্মীদের (আই সি ডি এস, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের সহায়িকা ও সম্প্রসারিকা এবং অন্যান্যদেরও)  ভাতার বিষয়ে একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার, যেখানে সহায়তা প্রদানের পরিমাণ প্রতি ৩ বছর অন্তরই বৃদ্ধি পাবে।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি যে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে সরকারি কর্মী ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে, তাহলো বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বছরে যে অন্তত দুবার মহার্ঘ ভাতা প্রদান করা হতো তার কী হলো? এছাড়া, যে রাজ্য বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে তারাই বা কবে সুপারিশ জমা দেবে এবং রাজ্য সরকারই বা কবে সিদ্ধান্ত নেবে? এই বিষয়গুলির ওপর কোনো উত্তর নেই এই বাজেটে, এবং নেই কোনো বাজেট বরাদ্দের ইঙ্গিতও।


গণশক্তি, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

20170204

বাজেটেও জুমলা

 

সীতারাম ইয়েচুরি

বাজেটেও জুমলা। প্রধানমন্ত্রী, বি জে পি সভাপতির মতো অর্থমন্ত্রীও বাগাড়ম্বরেই মত্ত। মঙ্গলবার পেশ করা আর্থিক সমীক্ষায় স্পষ্টই বলা হয়েছে নোট বাতিলের ধাক্কায় অর্থনৈতিক বিকাশের হার কমবে। তা ৬.৫শতাংশের মতো হবে। অর্থনীতি শ্লথ অবস্থায় চলছে। আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে বিশ্ব সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে তাকাতে হবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির দিকে। তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বুধবারের বাজেট ঠিক উলটো পথে হাঁটলো। চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণের বদলে সংকোচন করা হয়েছে। বাজেটের মোট আয়তনই কমে গেছে। বাজেটের মোট আয়তন গত আর্থিক বর্ষে ছিলো মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১৩.৪শতাংশ, তা এবারে কমে হয়েছে ১২.৭ শতাংশ। রাজস্ব ব্যয় কমেছে। অরুণ জেটলি দাবি করেছেন পরিবহন-সহ পরিকাঠামোয় উন্নয়ন ঘটানো হবে, তার ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে। অথচ প্রকৃত হিসেবে দেখা যাচ্ছে মূলধনী ব্যয় কমে গেছে। গত বছরে যা ছিলো ১.৮৬শতাংশ, এবারে রেলকে ঢুকিয়েও তা ১.৮৪শতাংশ। রেলকে বাদ দিলে মাত্র ১.৫১শতাংশ। চাহিদা কোথা থেকে বাড়বে?

অর্থনৈতিক সমীক্ষা এবং জাতীয় লেবার ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে শ্রমনিবিড় ৮টি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান অন্তত ৫৫ হাজার কম কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে যদি মূলধনী ব্যয় কমে তাহলে কর্মসংস্থান আরো সংকটে পড়বে।

রেগার হিসেব দেখলেও বোঝা যাচ্ছে বরাদ্দ আদৌ বাড়েনি। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরলে রেগার বরাদ্দ যা ছিলো তা-ই রয়ে গেছে। বাগাড়ম্বরই সার, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই প্রকল্পও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সরকার দাবি করছে কোষাগারীয় ঘাটতি কমিয়ে আনা হয়েছে। যদিও অর্থমন্ত্রী ভাষণে যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন আর বাজেটের নথিতে যা লেখা আছে তা পৃথক। কোষাগারীয় ঘাটতি কমেছে কীভাবে? পেট্রোপণ্যে অন্তঃশুল্ক থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমেছে, তখন অন্তঃশুল্কের কারণেই ভারতে তা বেড়েই চলেছে। এ থেকেই সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আয় বাজেট অনুমানের তুলনায় কম হয়েছে। এও প্রমাণ করছে অর্থনীতিতে সংকোচন চলছে। এখন রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে জনগণের ওপরে বোঝা চাপানো হচ্ছে। প্রায় ৬০হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপানো হয়েছে।

নোট বাতিলের পূর্ণ ফলাফল এখনও বোঝা যায়নি। তা আরো প্রভাব ফেলবে। সরকার ব্যাঙ্কের জন্য মায়াকান্না কাঁদছে। ১১লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ রয়েছে কর্পোরেটের কাছে। তা আদায় করার জন্য কেন্দ্রের কোনো উদ্যোগ নেই। যাঁরা বিদেশে পালিয়েছেন শুধু তাঁদের কথা বলা হচ্ছেদেশের মধ্যে থেকেই বহাল তবিয়তে মুনাফা করে চলেছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা? বরং কর্পোরেটদের জন্য রাজস্ব ছাড়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের উদ্দেশ্য দেশি-বিদেশি পুঁজিকে ছাড় দেওয়া। এফ আই পি বি ছিলো বিদেশি বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। তা তুলে দেওয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় পথে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছিল। এখন আর বিদেশি পুঁজির জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণই রইলো না। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বিদেশি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিদেশি বেসরকারি পুঁজি এবার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও কিনবে।


সীতারাম ইয়েচুরি সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক 

সাধারণ মানুষের সমস্যা প্রশমনে ব্যর্থ এই কেন্দ্রীয় সরকার

ড. অসীম দাশগুপ্ত

কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। নোট বাতিলের পর এই কেন্দ্রীয় বাজেটের দিকে তাকিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু কী পাওয়া গেল এই বাজেট থেকে? আশার বাণী ছাড়া আর কিছু কি মিলবে? নাকি বাড়বে সাধারণ মানু‍‌ষের ওপর বোঝা? সেই বিশ্লেষণই রয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের কলামে।

গণশক্তি, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

কেন্দ্রীয় বাজেট শুধুমাত্র সর্বভারতীয় স্তরে ভারত সরকারের আয় ও ব্যয়ের যান্ত্রিক হিসেব নয়। এই হিসেবের পিছনে যে লক্ষ্যগুলি আছে তা সাধারণ মানুষ জানতে চান, এবং জানতে চান স্বচ্ছতার সঙ্গে। বুঝে নিতে চান এই বাজেটের মাধ্যমে তাঁদের সমস্যাগুলির কতটুকু প্রশমন সম্ভব হবে।

এই সমস্যাগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জ্বলন্ত হলো বেকারত্বের সমস্যা। বি জে পির নেতৃত্বে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গত প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, প্রতি বছর সমগ্র দেশে নতুন করে অতিরিক্ত ২ কোটি বেকার যুবক-যুবতীর কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু এই সময়কালেই কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছরে প্রতি বছরে বাস্তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অনেক কম৫ লক্ষেরও কম, এবং বর্তমান বছরে, বিশেষ করে এই কেন্দ্রীয় সরকারের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের পর কৃষি, অসংগঠিত শিল্প এবং ‍‍‌ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই কর্মসংস্থানের পরিমাণ আরো হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৫ লক্ষের মতো। তাই এই কেন্দ্রীয় বাজেটে উচিত ছিল প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ২০১৬-১৭ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযুক্ত লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা এবং সেই লক্ষ্যমাত্রাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃষি, শিল্প ও পরিষেবার ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যমাত্রা ভেঙে ভেঙে দেখানো, এবং বাজেটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কি কি পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব, তাও স্বচ্ছতার স‍‌ঙ্গে বলা। কিন্তু এই বাজেটের কোথাও এই লক্ষ্যমাত্রা বা পরবর্তী পদক্ষেপগুলির উল্লেখ নেই। অর্থাৎ নোট বাতিলের মাধ্যমে বেকারত্বের এই সমস্যাটির আরও ব্যাপকভাবে সৃষ্টি করার পর তা প্রশমনের সম্বন্ধে উপলব্ধি করতেই ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকারের এই বাজেট।

এই বছরে আরেকটি বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে। যেহেতু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় (৮ই নভেম্বর, ২০১৬) বলা হয়েছিল এই পদক্ষেপের পিছনে প্রধান কারণ কালো টাকা উদ্ধার করা, তাই এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে তাই নয়, প্রতিদিন ব্যাঙ্ক এবং এ টি এমের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়েছেন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এবং মারাও গেছেন ১০০জনের বেশি ব্যক্তি। তাই এই বাজেটে উচিত ছিল যে, যার জন্য মানুষের এত ক্ষতি স্বীকার সেই কালো টাকার কত পরিমাণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং কত দিনের মধ্যে নগদ টাকার চাহিদার এবং জোগানের মধ্যে ভারসাম্য স্বাভাবিক হবে, তারও নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া। কিন্তু এই দুটি প্রশ্নেরই কোনো উত্তর পাওয়া গেল না এবারের বাজেটে।

বর্তমান এই বাজেট পেশ করার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকেই প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, সমস্ত দরিদ্র মানুষের জন্য একটি ন্যূনতম আয়ের সংস্থানের প্রকল্পের কথা চিন্তা করা। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত এবছরের আর্থিক সমীক্ষা (২০১৭, পৃঃ ১৭৩-১৯৫)তে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প চালু করা হোক, অথবা অন্তত আলোচনার জন্য পেশ করা হোক। যেহেতু অর্থমন্ত্রকই এই সমীক্ষার দায়িত্বে থাকে, তাই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বিবৃতিতে কোথাও এই প্রকল্পের উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দেখা গেল এর কোনো উল্লেখই নেই। অর্থাৎ বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একটি মন্ত্রকের ভিতরেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা।

প্রতি বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে মোট ব্যয়কে পরিকল্পনা খাতে ব্যয় (অর্থাৎ নতুন প্রকল্পগুলির জন্য ব্যয়) এবং পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে (অর্থাৎ চালু প্রকল্প, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেতন ইত্যাদি খাতে ব্যয়) আলাদা করে দেখানো হতোএবং এটাই উচিত। এবারই প্রথম দেখা গেলো পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে ব্যয়কে মিশিয়ে দেখানো হয়েছে। এরফলে শুধু নতুন প্রকল্পগুলির ব্যয়ের আলোচনার গুরুত্ব কম হয়েছে তাই নয়, বাড়তি অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে যে আগেকার বছরগুলির সঙ্গে আগামী বছরের পরিকল্পনা খাতে বাজেট বরাদ্দ সঠিকভাবে তুলনাই করা যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এবারের বাজেটে দেখা গেল, প্রত্যেকটি মন্ত্রকের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ সম্পূর্ণভাবে উল্লেখ না করে কতকগুলি মন্ত্রকের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই বাজেট বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও বলা প্রয়োজন যে, কর্মসংস্থানের বিষয়ে প্রকল্প হিসেবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প, সেখানে বর্তমান বছরে যে বরাদ্দ ছিল ৪৭,৪৯৯ কোটি টাকা তার থেকে আগামী বছরে অত্যন্ত সামান্য বৃদ্ধি করে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪৮,০০০ কোটি টাকা। অন্যান্য কর্মসংস্থান প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একইভাবে বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে অনুরূপভাবে সামান্য। অর্থাৎ বি জে পি-র আমলে যেখানে বেকারত্বের বৃদ্ধি হয়ে তীব্রভাবে, এবং বিশেষ করে বর্তমান বছরে, সেখানে এই বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিষয়টিকে গুরুত্বই দেওয়া হলো না।

এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার যে এই প্রথম রেল বাজেটকে সাধারণ কেন্দ্রীয় বাজেটের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরফলে ভারতীয় রেলের প্রত্যেকটি রাজ্যের যে সুবিধা অসুবিধা তা উল্লেখ করার কোনো জায়গাই থাকলো না এই বাজেটে।

এছাড়া, এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের করদাতাদের ছাড়ের হিসেব যেখানে মোট ২০,০০০ কোটি টাকা, সেখানে তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে চাপবে প্রায় ৭৫,০০০ কোটি টাকার পরোক্ষ কর। অর্থাৎ, এই বাজেটের আয় ও ব্যয়ের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা একত্রিত করলে আপেক্ষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ মানুষ।


সর্বোপরি, এবারের বাজেটে কোনো উল্লেখ নেই যে, প্রতি বছর মোট কর ছাড়ের মাধ্যমে যে ৫ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম থাকছে তার একটি অংশও আদায় করা গেলে সাধারণ মানুষের স্বার্থে কর্মসংস্থানের প্রকল্পগুলির জন্য আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত, এবং সকলের জন্য ন্যূনতম আয়ের প্রকল্পটিও, কিছুটা হলেও, শুরু করা যেত।

20161207

#Demonetization কালো টাকা উদ্ধার, নাকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা?

#Demonetization

গত ৮ই নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘোষণা করেন টেলিভিশনে। শুরু হয়ে যায় দেশজুড়ে অস্থিরতা। কোটি কোটি মানুষ ব্যাঙ্কের সামে দীর্ঘ লাইন দিতে বাধ্য হন ঘন্টার পর ঘন্টা। ৮৬শতাংশই মুদ্রাই ছিলো ওই দুই নোটে। ভারতের মতো নগদ-নির্ভর অর্থনীতিতে এই ধাক্কা  বিরাট। কার্ড, ডিজিটালের মতো অ-নগদ পদ্ধতিতে লেনদেন হয় মাত্র ৮শতাংশ। সরকারের প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট ১৭বার নিয়ম পরিবর্তনের ঘটনাতেই। উপরন্তু পুরনো নোট বাতিল হলেও নতুন নোট জোগানে ব্যর্থতা সংকট বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতের অর্থনীতিতে কালো টাকার দাপট অনেক দিন ধরেই। কালো টাকা উদ্ধারে কঠোর ও আন্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবশ্যই তা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু নোট বাতিলের এই পদ্ধতিতে কি আদৌ কালো টাকা উদ্ধার হবে, নাকি জনগণের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক বিরাট অর্থনৈতিক দুর্দশার বোঝা?

কালো টাকা কাকে বলে?

সব টাকাই বা নোট হলো সাদা টাকা। যখন টাকা আয় বৈধভাবে করা হয় না বা আয় নিয়ে বৈধ কর দেওয়া হয় না সেটাই হয় কালো টাকা (বলা ভালো কালো সম্পদ)। শুধু প্রত্যক্ষ কর নয়, পণ্য কেনা বেচায় বৈধ কর না দিয়ে যে আয় করা হয় সেটা কালো টাকা। সরকারের প্রাপ্য বা সাধারণ মানুষের টাকা প্রতারণা করে গায়েব করা টাকা হলো কালো টাকা। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে কালো টাকার ৮০% মজুত করে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি যার বিরাট অংশই তারা বিদেশে পাচার করে ব্যাঙ্কে জমা রাখছে। এই কালো টাকা কোম্পানিগুলি আয় করে উৎপাদিত পণ্য কম দেখিয়ে, শ্রমের ব্যবহার বেশি দেখিয়ে বাড়তি সুযোগের রফা করে, মুনাফা কম দেখিয়ে, কর কম দিয়ে। কালো টাকা পাচারের বড় পথ হলো আমদানি রপ্তানি কারবারের লেনদেনের হিসাবে কারচুপির করা। মোদী সরকার বা তার আগের সরকার কেউ এই মুখ্য অপরাধী কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে  কোন উদ্যোগ নেয়নি।

দেশে কত কালো টাকা আছে ?

বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা ও কমিটি দেশে কত কালো টাকা আছে তার অনুমান করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু বিষয়টি গোপন তার পুরো সঠিক হিসাব এখনো সম্ভব হয়নি। তবে কিছু হিসাবে বলা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির মোট টাকার ২০%থেকে ৬৬% হলো কালো টাকা। বর্তমানে ২০১৫-১৬ সালে ভারতের জিডিপির পরিমাণ হলো আনুমানিক ১৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। এতে কালো টাকার পরিমাণ হবে ২৭লক্ষ কোটি টাকা থেকে ৯০ লক্ষ কোটি টাকা।


এই কালো টাকা কি ৫০০ বা ১০০০টাকার নোটে মজুত করে রাখা হয়?

নগদে কালো টাকার সম্পদের মজুত আছে বড়জোর ৩-৫%। সংবাদ মাধ্যমে কেন্দ্রের তরফে দাবি করা হয়েছে নোট বাতিলে উদ্ধার হবে ৪ থেকে ৬লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ যদি সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িতও হয় এত নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে, বাগাড়ম্বর করেও আসলে ৯৫ থেকে ৯৭শতাংশ কালো সম্পদই এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে।
 
সব কালো টাকা বস্তায় বা বেনামি অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে যে প্রচার চলছে তা-ও ওই ৩-৪%র মধ্যেই। তা-ও সংগৃহীত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম ধনীদের কাছ থেকে। সরকার ১০০০টাকার নোটে কালো টাকা মজুত হয় বলে তা বাতিল করলো আবার উলটে ২হাজার টাকার নতুন নোট  চালু করলো। এর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হলো না। কালো টাকার বড় বড় রাঘব বোয়ালদের আসলে ধরাই হলো না।

কোথায় আছে কালো টাকা ?

দেশে ও বিদেশে কালো টাকা রোধে পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রকে একটি রিপোর্টও জমা আছে। ২০১২ সালে অর্থমন্ত্রকের বিশিষ্ট অফিসার ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটি ঐ রিপোর্ট পেশ করে। তাতে কমিটি জানিয়েছে, নোট বাতিল কালো টাকার সমস্যার কোন সুরাহা করবে না। বেশি কালো টাকা এতে উদ্ধার হবে না। কারণ কালো টাকা নোটে নয় মজুত আছে বেনামে সোনার বার, অলংকার, জমি, বাড়ি সহ নানা সম্পত্তিতে। সুইস ব্যাঙ্কে দেশের যাদের বিপুল টাকা জমা রয়েছে এরকম ৬৮০ জনের অ্যাকাউন্টের তালিকা রয়েছে কেন্দ্রের কাছে। উইলিকস-পানামার সংবাদপত্রে দেশের ধনীদের কার কার বিদেশে বিভিন্ন সংস্থায় শেয়ারে টাকা জমা আছে তার তালিকা প্রকাশ হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে তার তালিকাও আছে। যেসব দেশে কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে সেখানে বিদেশি ব্যাঙ্কে দেশের ধনীরা  যারা টাকা জমা রেখেছেন সেই বেআইনি  টাকা উদ্ধারের উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন্দ্র। সেসব দেশ ভারত সরকারকে সহযোগিতা করতে রাজি হলেও সে টাকা উদ্ধারের কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। উলটে সে কালো টাকা সরকারের সাহায্যে ঘুরপথে দেশে চলে আসছেতাকে সরকার থেকে আবার আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

নোট বাতিলে জাল নোট বন্ধ হবে?

হবে না। দেশের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা এন আই এ (জাতীয় তদন্ত সংস্থা) কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটকে এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিল। অর্থনীতিতে কত অংশে জাল নোট ঘুরছে তার রিপোর্ট দেয় তারা। এন আই এ-র পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা যার মধ্যে রয়েছে সি বি আই, আই বি, ডি আর আই, ‘এবং রাজ্যগুলির পুলিশের থেকে তথ্য নেওয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতি ১০লক্ষ টাকার মধ্যে ২৫০টাকা মূল্যের জাল নোট থাকে। শতাংশে ০.০২৫। সরকার নিজেও সংসদে এই তথ্যই পেশ করেছে। সমীক্ষায় স্পষ্ট বলা হয়, জাল নোট বাজেয়াপ্ত করার জন্য চালু ব্যবস্থাই যথেষ্ট।
যে কোনো মানুষ বোঝেন, জাল নোটের কারবার যারা করে তাদের ধরা না গেলে নতুন নোট ফের জাল করা হবে। জাল নোটের কারবার রুখতে ১৪লক্ষ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেওয়া আজগুবি ব্যাপার।

বন্ধ হবে সন্ত্রাসবাদ?

আমরা সকলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু, সন্ত্রাসবাদীরা টাকার থলি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না। সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় যে পরিস্থিতি, যে রাজনীতি তা থেকে নজর সরানো অনুচিত। একটি ঘটনা লক্ষ্য করুন। কাশ্মীরে নিহত দুই সন্ত্রাসবাদীর কাছে পাওয়া গিয়েছে নতুন ২০০০টাকার নোট। নোট বন্ধ বা চালু করে নয়, সন্ত্রাসবাদীদের কাছে টাকাটা যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়া দরকার।

সরকার বলছে, বিরাট লাভের জন্য সামান্য লোকসান। একথা কি সত্যি?

এখন পর্যন্ত আমাদের কমপক্ষে ৭১জন সহনাগরিকের মৃত্যু হয়েছে নোট বাতিল ঘোষণার জেরে। পুরানো নোট নার্সিংহোমে না নেওয়ায় মৃত্যু হয়েছে শিশুর। আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাবার কোলে ব্যাঙ্কের লাইনে থাকার ধকল নিতে না পেরে।
প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে জওয়ানদের তুলনা টানছেন। বলছেন তাঁরা যদি সীমান্তে বিনিদ্র রাত কাটাতে পারেন তাহলে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে পারব না কেনজওয়ানদের অনেকে কিন্তু কৃষকসন্তান। আজকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং কৃষিজীবী মানুষ। কৃষকরা তাঁদের ফসল মান্ডিতে আনলেও বিক্রি হচ্ছে না। দূরের ব্যাঙ্কের শাখায় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা। এখন তাঁরা লাইন দিচ্ছেন সরকারি বীজ সরবরাহের দোকানে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন, রবিশস্যের চাষের কী হবে। ফসল তোলার সময়ে সঙ্কট নেমে এসেছে গ্রাম ভারতে। এই অবস্থায় জওয়ানরা খুশি থাকতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী জোয়ানদের জন্য মেকি দরদ, মেকি জাতীয়তাবাদ দেখাচ্ছেন।
বিপুল অংশের মানুষের জীবিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির বিপুল অংশ নগদের ভরসায় চলে। পুরো থমকে গিয়েছে অর্থনীতির এই অংশের লেনদেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কম মজুরির অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষরা, যারা মজুরি পান নগদে। ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের হিসেব, শ্রম নিবিড় ক্ষেত্রে এর মধ্যেই কাজ হারিয়েছেন ৪লক্ষ শ্রমিক। বস্ত্র, চামড়া, অলঙ্কারের মতো শিল্পেই কেবল ৬০লক্ষ মানুষ বেতন পাননি। বাগিচা শিল্পে তীব্র সংকটে আরো ২০লক্ষ শ্রমিক। অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ খুইয়ে দলে দলে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি, খুচরো ব্যবসা ও নির্মাণেই দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ যুক্ত। ক্ষতি তাদেরই সর্বাধিক।
ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘট ডাকলে যারা অর্থনীতির লোকসানের হিসেব দিতে উঠেপড়ে নামে তারা এখন চুপ। দিনের পর দিন কাজ বন্ধ হয়ে বিপুল লোকসানে তাদের চোখ বন্ধ।


প্রধানমন্ত্রীর দাবি এই পদক্ষেপ গরিবের জন্য। কথাটা কি ঠিক?

গরিবের স্বার্থে বলাটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটেমোদী সরকার তার সরকারের প্রথমার্ধ  কাটিয়েছে কেবল তথাকথিত ব্যবসা মসৃণ করারকাজে। দেশি-বিদেশি বড় পুঁজির মালিকের স্বার্থ দেখেই এতটা সময় কাটিয়েছে মোদী সরকার। এখন সরকার জোর করে সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখতে বলছে কিন্তু তা তাদের প্রয়োজনমতো তুলতে দিচ্ছে না।  সরকার বলেছিলো কালো টাকা উদ্ধার করে প্রতি অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেবে। তা আজ তামাশার পর্যায়ে চলে গেছে। তার বদলে নিজের টাকা তুলতে গেলে হাতে লাগছে কালো কালি।
সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। অনেকেই সমবায় ব্যাঙ্কে তাদের টাকা রাখেন। এখন সরকার সেখানেই পুরানো নোট বদল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গ্রাম ভারতে লেনদেন বন্ধ হয়ে চরম সংকট নেমে এসেছে।

আসলে অতি-ধনীদের সাহায্য করা হচ্ছে

গরিবদের সাহায্য দূরের কথা, বড় ব্যবসায়ী এবং ধনীদের ঋণ মাফ করে দেওয়ার নির্দেশিকা আসলে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছে দেশের সরকার। এই অংশের থেকে ব্যাঙ্কগুলির পাওনা ১১লক্ষ কোটি টাকার বেশি। একজন কৃষক বা ছাত্র বা ছোট দোকানদার ধার নিলে সুদসহ তা ফেরত না দিলে ব্যাঙ্ক নোটিস পাঠায়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, জেলেও পাঠায়। এই সরকার কোনো একজন বড় ব্যবসায়ী ঋণখেলাপিকে শাস্তি দিয়েছে? বরং, এই সময়ে বড়লোকদের ২লক্ষ কোটি টাকা ধার মকুব করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি এই অনাদায়ী ঋণের ভারে সম্খটগ্রস্ত। এখন নোট অচলের ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে টাকা জমা রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে ব্যাঙ্কে। ফলে, ব্যাঙ্কে বড়লোকদের অনাদায়ী ঋণ, ধার মকুব করার লোকসান অংশত মেটানোর চেষ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষের এই টাকা দিয়েই। অতি-ধনী ঋণখেলাপিদের আবার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

এই সমস্যা কি সাময়িক?

লোকসানের বহর কতো সঠিক হিসেব করে ওঠা মুশকিল। কিন্তু, কিছু বেসরকারি সমীক্ষা যে হিসেব দিচ্ছে তা চমকে দেয়ার মতো। অ্যাম্বিট ক্যাপিটালের হিসেব, ২০১৬-১৭অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ভাগে মোট জাতীয় উৎপাদন ০.৫শতাংশ কমবে। সারা বছরে এই হার দাঁড়াবে ৩.৫শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বৃদ্ধির হার হবে মাত্র ৫.৮শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি-র হিসেব, স্বল্পমেয়াদেই লোকসানের অঙ্ক ১.২৮লক্ষ কোটি টাকা। মানে, প্রত্যেক ভারতীয়ের ১০০০টাকা করে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে গরিবদের উপর যাঁরা নগদ অর্থনীতির ওপর বেশি নির্ভর করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি জানাচ্ছে, অর্থনীতি সংকোচনের ফলে যে প্রভাব পড়বে তার তুলনায় বেআইনি অর্থনীতিতে প্রভাব সামান্যই। মানে, গরিব এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিপুল ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। অথচ, কালো টাকা উদ্ধারে প্রভাব সামান্য। দেশে মন্দা, কর্মসংস্থানের সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী চেহারা নিতে পারে।

মোদী এবং বি জে পি যে ব্যাপারে চুপ

দুর্নীতির সবচেয়ে জঘন্য চেহারা রাজনৈতিক দুর্নীতি। কালো টাকার মালিক, ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের চক্র। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে চুপ। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টিতে একটি মামলা চলছে। ২০১৩-তে সি বি আই দুই শিল্পগোষ্ঠী বিড়লা এবং সাহারায় তল্লাশি চালায়। কাগজপত্রে পাওয়া যায় রাজনীতিবিদদের তালিকা সঙ্গে টাকার অঙ্কের উল্লেখ। বিড়লা ২৫কোটি টাকা এবং সাহারার ৫৫কোটি টাকা দুই তালিকায় পাওয়া যায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীরউল্লেখ। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আবেদন গ্রহণ করার জন্য আরো কাগজপত্র দিতে হবে।
৮ই নভেম্বর ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। কলকাতায় তারা আগেই বি জে পি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোটে কোটি টাকা জমা করে। বিহারের মতো বিভিন্ন রাজ্যে হঠাৎই বিপুল পরিমাণে জমি বা অন্য সম্পত্তি কিনেছে বি জে পি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নামেই এই সম্পত্তি কেনা হয়েছে। এসব কি কাকতালীয়? বাছাই করা কেউ কেউ যে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত আগাম জানতেন, তার ইঙ্গিত মিলছে। এই কারণেই যৌথ সংসদীয় কমিটি গড়ে তদন্তের দাবি জানাচ্ছে সি পি আই (এম)।

সরকার এই পদক্ষেপ নিলো কেন?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর কে সি চক্রবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় বলেছিলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে প্রবল ব্যর্থতা থেকে চোখ ঘোরাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেবল কালো টাকা ফেরানোয় ব্যর্থতাই নয়। তার মধ্যে রয়েছে কাজ, খাদ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা।
অনেকেই মনে করেন গোটা বিষয়টি বিশেষ করে কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন ভোটের সঙ্গে জড়িত। এর আগে আর এস এস উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বিরোধিতা করলেই দেশবিরোধী বলেছে। এবার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুললেই তাদের দেশদ্রোহী বলে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচারে নামা হয়েছে। প্রচারের মাধ্যমে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।

দাবি কী

বামপন্থী দলগুলির দাবি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোট অন্তত ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে দেওয়া হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা যাচ্ছে না, নতুন নোটের যথেষ্ট যোগান হচ্ছে না ততদিন সাধারণ মানুষকে বৈধ লেনদেন করার অনুমতি দেওয়া হোক।
শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের ঋণ মকুব করতে হবে। সমবায় ব্যাঙ্কে পূর্ণাঙ্গ লেনদেনের অনুমতি দিতে হবে। কৃষি উপকরণ কেনায় অসুবিধা দূর করতে হবে।
ব্যাঙ্কে ১১লক্ষ কোটি অনাদায়ী ঋণ বড়লোকদের থেকে আদায় করতে হবেবিদেশী ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখা আমানতকারীদের তালিকা ঘোষণা করতে হবে। করফাঁকির স্বর্গ এমন দেশগুলির সঙ্গে দ্বৈত কর রদ চুক্তি বাতিল করতে হবেসাহারা-বিড়লা তদন্তে মেলা তথ্যের পূর্ণ তদন্ত করতে হবে 
নোট বাতিলে দুর্দশার জেরে যাঁরা প্রাণ হারালেন তাঁদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাঁদেরও দিতে হবে ক্ষতিপূরণ।   
 

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ও সরকারের ভূমিকা কী?

এরাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস নিজেরাই বেআইনী চিট ফান্ডের সুবিধাভোগী বলে অভিযুক্ত। রাজ্যের প্রায় ২৫লক্ষ মানুষকে প্রতারণা করে সারদা ও অন্য কয়েকটি চিট ফান্ড যে টাকা যোগাড় করেছিল তা শাসক নেতাদের পুষ্ট করেছে বলে অভিযোগ। রাজ্য সরকার চিট ফান্ডের প্রকৃত অপরাধীদেৃর আড়াল করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পান্ডাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সি বি আই-কে দেওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। উলটে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিসন বেঞ্চ চিট ফান্ডের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একজনের কমিটি গঠন করলে রাজ্য সরকার অসহযোগিতার পথ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থা ই ডি-ও কমিটি তুলে দিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়, অবশ্য এরা স্থগিতাদেশ পায়নি। নারদা কান্ডেও কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। দুর্নীতি নিয়ে বাইরে মোদী সরকার বাগাড়ম্বর করলেও পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্ত শ্লথ করে উভয়ের সমঝোতাই প্রমাণ করেছে।  সংসদে, বিশেষত রাজ্যসভায় বি জে পি তৃণমূলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল এবং রাজ্যে তৃণমূল সরকারের ত্রাণকর্তা হিসাবে বি জে পি-র ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিজ নিজ স্বার্থের প্রশ্নে এদের মধ্যে দর কষাকষি এবং গড়াপেটার খেলা দিয়ে এরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
নোট বাতিলের ফলে তৃণমূলের দেশে ও বিদেশে থাকা কালো টাকা উদ্ধার করা যাবে এরকম মোহ পোষণ করার কোনো কারণ নেই। এই পদ্ধতিতে কালো টাকা উদ্ধার হবে না জেনেও বামপন্থীরা নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তোলেনি। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ দাবি করেছে। সেই দাবিতে বামপন্থীরা দৃঢ় থাকবে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষায় প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাবে বামপন্থীরা।

********* 

20161101

বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পায়ন কর্মসূচী — দু-চার কথা

স্বপন সিনহা

বিগত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট পরাজিত হওয়ার ফলে ৩৪ বছর পর বামবিরোধীরা রাজ্য প্রশাসনের ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। এই পরিবর্তনে নিশ্চয় আশা করা হয়েছিল নতুন সরকার জনগণের ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে সুষ্ঠুভাবে সরকার পরিচালনা করবে এবং বিরোধীরা গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে সচেষ্ট থাকবে।

যে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বামফ্রন্ট সরকারের সময় বিশেষ করে শেষের কয়েক বছর বর্তমান শাসকদল বিরোধীপক্ষে থাকাকালীন সংঘটিত করে সেই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি যে বামপন্থীরা করবে না এটা সাধারণ উপলব্ধি। বামফ্রন্ট মানুষের সেই বিশ্বাসের প্রতি যথাযথ মর্যাদা অবশ্যই রাখতে পেরেছে। কিন্তু বর্তমান শাসকদল? মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এই যে নির্লজ্জ দলবাজি, ব্যাপক দুর্নীতি, চরম অগণতান্ত্রিক আচরণ, সীমাহীন ঔদ্ধত্য অপদার্থতা এবং শুধুমাত্র আত্মপ্রচারের ঢাক পেটানো ছাড়া উল্লেখ করার মতো একটা কাজও তারা করে দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে নতুন শিল্প গড়ার ক্ষেত্রে নিজেদের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে তারা প্রচার চালাতে চেষ্টা করছে যে, ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট শিল্পের ব্যাপারে কিছুই করেনি। সেই কারণে বাকি রাজ্য শিল্পের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। বামফ্রন্ট বিরোধী মহল থেকে প্রধানত দুটি বিষয় আগেও তোলা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। প্রথমত, নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বামফ্রন্ট শিল্পায়নের শোরগোল তোলে কিন্ত কার্যত কিছুই করেনি। দ্বিতীয়ত, বামফ্রন্ট একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের উদার অর্থনৈতিক নীতি শিল্পনীতির বিরোধিতা করেছে অন্যদিকে সেই একই নীতিই তারা পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর করেছে। সেই কারণে বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যারা সেই সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন তাদের অবগতির প্রয়োজনে প্রসঙ্গে কিছু আলোচনার উদ্দেশ্যে বর্তমান প্রবন্ধের অবতারণা।

মানবজীবনের মহত্তম লক্ষ্য মার্কসবাদ-লেনিনবাদ তথা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শ দেশের মাটিতে প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার অনুপ্রেরণা থেকেই মার্কসবাদীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া। তাদের প্রতিটি পদ‍‌ক্ষেপ, প্রতিটি কর্মসূচী মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য। ইতিহাসের গতিশীল অনুধাবন প্রক্রিয়া আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে মার্কসবাদ কোন কাল্পনিক ধারণা নয়। এটি বিজ্ঞান এবং গতিশীল বিজ্ঞান। প্রতিটি দেশকালের বাস্তব অবস্থা বিচার বিশ্লেষণ করেই তার প্রয়োগ করতে হয় মার্কসবাদীরা সেই সৃজনশীল কাজেই নিয়োজিত। তারা জানে গোটা ভারতে এক ধরনের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডল বিরাজ করলে পশ্চিমবাংলা তার থেকে খুব বেশি আলাদাভাবে কাজ করতে পারে না। সারা দেশে গঙ্গার জল যদি দূষিত হয়, যদি হরিদ্বার, বারাণসী এবং পাটনার ঘাটে ঘোলা জল বয়ে যায় তাহলে কি কলকাতার বাবুঘাটে ফিলটার ওয়াটার পাওয়া সম্ভব? যেটা করা যেতে পারে তা হলো ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি ছড়িয়ে জলকে খানিকটা পরিশুদ্ধ করা এবং সমগ্র গঙ্গাকে দূষণমুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা। এই রূঢ় বাস্তবকে সামনে রেখেই বামপন্থীরা বিভিন্নভাবে তাদের কার্যক্রমকে পরিচালিত করতে সচেষ্ট থেকে‍‌ছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সর্বনাশা উদার অর্থনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম সংগঠিত করা অন্যদিকে রাজ্যে যেটুকু সম্ভব শিল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ। এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির অবকাশটা কোথায়? একে স্ববিরোধিতা বলে না। এটাই হচ্ছে স্বাভাবিক যুক্তিসঙ্গত প্রক্রিয়া।

৩৪ বছর ধরে বামফ্রন্ট এরাজ্যে সরকার পরিচালনা করেছে। মামুলী ধরনের বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সরকার ছিল না এটা। লক্ষ মানুষের ঘাম, রক্ত, অশ্রু এবং সহস্র শহীদের আত্মত্যাগ আর অসংখ্য আন্দোলন সংগ্রামের ফসল এই বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট এক নীতি আদর্শভিত্তিক কর্মসূচী সংগ্রামের এক সুনির্দিষ্ট রূপ। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকার তার পরিকল্পনা, তার বাজেটের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থেকেই বামফ্রন্ট। গ্যাটচুক্তির প্রধান সারমর্মই রাষ্ট্রের ভূমিকা খর্ব করা। গ্যাট পরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বলতে এতদিন যা বোঝাতো তা আর প্রাসঙ্গিক রইলো না। শিল্প-বাণিজ্য তথা স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে এই পর্যায়ে দারুণভাবে আঘাত হানার চেষ্টা হয়েছে যা প্রতিহত করার বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা কংগ্রেস থেকে বি জে পি-জোট কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ছিল না। বিদেশী ঋণের শর্তাবলীর কারণে নির্বিচারে আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেশীয় বাজারে বিদেশী পণ্যের ব্যাপক প্রবেশের পথ খুলে দেওয়া হয়। এরফলে বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান অর্থাৎ বাণিজ্যঘাটতি বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, অনুসৃত এই নয়া উদারনীতি অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে বিদেশী বহুজাতিকদের সাম‍‌নে দেশীয় শিল্প সংস্থাগুলিকে এক অসমান প্রতিযোগিতার মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফলে সামগ্রিকভাবে ধ্বংসের মুখে দাঁড়ায় দেশীয় শিল্প। এই রকম এক পরিস্থিতিতে সাংবিধানিক সীমাবদ্ধ নিয়ে সঙ্কটজর্জরিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে রাজ্য সরকার তার শিল্পায়ন কর্মসূচী রূপায়ণের চেষ্টা করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন ওঠে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সাথে রাজ্য সরকার গৃহীত নীতির পার্থক্যটা কোথায়?

এটা সকলেরই জানা যে, এরাজ্যে বামফ্রন্ট সরকারকে অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতা নিয়ে এক নির্দিষ্ট আর্থিক কাঠামোর মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রীয় নীতিগুলি খাতায় কলমে থাকলেও রাজ্যগুলি প্রয়োজনীয় ক্ষমতা পায়নি। এছাড়া কেন্দ্রীয় সরকার তার নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থেই দীর্ঘদিন ধরে এক বৈরী মনোভাব নেওয়ায় এরাজ্য বিশেষ অসুবিধা ভোগ করেছে। এছাড়া পশ্চিমবাংলার ভয়াবহ বেকারসমস্যা এবং তার সমাধানে কেন্দ্রের অসহযোগিতা এবং শত সহস্র বাধানিষেধের কথাও কারও অজানা নয়। তা সত্ত্বেও এই বাস্তব অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে তুলে কর্মসংস্থানের সু‍‌যোগ সম্ভাবনা সৃষ্টির যথাসাধ্য আন্তরিক প্রয়াস রাখার সাথে সাথে বামফ্রন্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, যেহেতু দেশের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক সমন্বয়ের মূল ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে, সেইজন্য তাদের নীতি হলো অর্থনীতি পরিকল্পনায় আমূল পরিবর্তন আনার জন্য কেন্দ্রের কাছে দাবি জানানো, কেন্দ্রীয় সরকার পরিকল্পনা রচয়িতাদের কাছে তাদের বিকল্পনীতিগুলি উপস্থিত করা এবং জনসাধারণের চরম দুর্দশা লাঘব করার প্রচেষ্টা চালানো। সাথে সাথে তারা এও বলে যে, সেই কারণে তারা কখনওই একটা নেতিবাচক অবস্থান নিতে পারে না এবং যেহেতু পশ্চিমবাংলায় একটা বামপন্থী সরকার রাজ্যশাসন করছে সেহেতু বেসরকারী পুঁজি এরাজ্যে লগ্নি হবে না এটাও হতে পারে না।
সাতের দশকে ভারতের অর্থনীতি একটার পর একটা সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। দারিদ্র্য, বেকারী জনসাধারণের দুর্দশা সীমাহীনভাবে বেড়েছে। জরুরী অবস্থাকালে কোন না কোন সময়ে লে-অফ, ছাঁটাই, লক আউটের দরুন পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ কাজ হারায়। সরকারী ব্যয় হ্রাসের নামে কেন্দ্র রাজ্যগুলিতে হাজার হাজার সরকারী কর্মচারীকে চাকরি থেকে অপসারণ বরখাস্ত করা হয়। ইন্দিরা গান্ধীর বিশ দফা কর্মসূচীতে গ্রামীণ কর্মসংস্থান স্কিমের বিজ্ঞপ্তি সত্ত্বেও গ্রামীণ বেকারী দুর্দশা হু হু করে বেড়ে চলে। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা চল্লিশ লক্ষ অতিক্রম করে যায়। এরাজ্যে ৭০ থেকে ৭৭ এক অন্ধকারময় পর্যায়, যাকে বলা হয় সাতের দশকের কালো দিন। সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে সমস্ত রকম গণতান্ত্রিক আন্দোলনের টুঁটি টিপে এরা‍‌জ্যে কায়েম হয় এক আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস। খাদ্যের প্রশ্নে রাজ্য পরিণত হয় ঘাটতি রাজ্যে। লোডশেডিং মানুষের কাছে হয়ে উঠেছিলো এক ভয়াবহ বিভীষিকা। শিক্ষার কথা উল্লেখ না করাই ভালো।

সন্ত্রাসের সেই বীভৎসতাকে ছুঁড়েফেলে এবং জরুরী অবস্থার কালোরাত্রির অবসানে দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী কংগ্রেসের একচেটিয়া ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে জনজাগরণের তরঙ্গশীর্ষে ১৯৭৭ সালের জুন মাসে পশ্চিমবাংলায় বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচীতে বলা হয় — ‘বামপন্থী‍‌ ফ্রন্টের সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী রাজনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থের সেবা করবে, তাঁদের জীবনযাত্রার মান সংরক্ষণ উন্নয়নে সহায়তা করবে ত্রিশ বছরের কংগ্রেসী অপশাসনে তাঁরা যে চরম দুরবস্থার মধ্যে পড়েছেন তার কিছুটা উপশমের ব্যবস্থা করতে প্রয়াস রাখবে।নিজেদের এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যথাযোগ্য ভূমিকা পালনে বামফ্রন্ট আন্তরিক প্রয়াস রাখতে সচেষ্ট থেকেছে। মানুষের জন্য স্বর্গরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি তারা কখনোই দেয়নি। বরং মানুষের দুঃখ-কষ্ট খানিকটা প্রশমনে কার্যকরী ভূমিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে দুর্বলতার কথা স্বীকার করতে বামপন্থীরা ছিল দ্বিধাহীন। নিজেদের কর্মতৎপরতাকে আরও গতিশীল করে মানুষের প্রত্যাশার যোগ্য হয়ে উঠতে হবে এটাই ছিল বামপন্থীদের অঙ্গীকার।

 এরাজ্যের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? নিঃসন্দেহে বেকার সমস্যা। বামফ্রন্ট বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিলো যে, কৃষির অগ্রগতির সাথে সাথে শিল্পের অগ্রগতি ঘটাতে না পারলে রাজ্যের সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়। ৭৭ সালে ক্ষমতায় এসে বামফ্রন্ট দেখতে পায় তাদের হাতে বিনিয়োগের উপযোগী পুঁজি নেই। কিন্তু গ্রামে আছে প্রচুর জমি আর অফুরন্ত শ্রমশক্তি (অর্থাৎ বেকার বাহিনী) এরাজ্যে যে সম্ভাবনাময় বিপুল পরিমাণ শ্রমশক্তি বেকার অবস্থায় পড়ে রয়েছে, তাদের জন্য অর্থবহ কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা দরকার। সেই কারণে কৃষি, ক্ষুদ্রায়তন শিল্পক্ষেত্র এবং গ্রামোন্নয়নের মতো জায়গাগুলিতে প্রথমে নজর দেওয়া হয়। শহরের ক্ষেত্রে এই প্রকল্প নেওয়ায় অসুবিধেটা দেখা দেয় এই যে, এখানে যদি বা শ্রমশক্তির সরবরাহ যথেষ্ট কিন্তু জমি নেই আর পুঁজির অভাব তো আছেই। সেই কারণে শহরে ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের পাশাপাশি বৃহৎ ভারী ‍‌শিল্পের দিকে নজর দেওয়া হয়। বিষয়টি পুরোপুরি কেন্দ্রীয় এক্তিয়ারে এবং এক্ষেত্রে বিনিয়োগের উপযোগী পুঁজি পশ্চিমবাংলা কেন, কোন রাজ্য সরকারেরই নেই। সেই কারণে এইসব ক্ষেত্রে লগ্নি করার জন্য কেন্দ্রকে বারবার অনুরোধ জানানো হয়। হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস, সল্টলেক ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স, বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে কেন্দ্রীয় টালবাহানার কথা তো আজ ইতিহাস।

দ্বিতীয় বামফ্রন্ট সরকার আসার পরে কেন্দ্র রাজ্যের এই দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নেয়। প্রথম পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থনৈতিক বৈষম্য বাধাদানের হাতিয়ার অবলম্বন করে যাতে এই মন্ত্রীসভাকে বিপাকে ফেলা যায় এবং জনগণের সাথে তার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়।

এই অবস্থায় প্রশ্ন ছিল, এই শ্রেণী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কি কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে? অথবা কেন্দ্রীয় সরকারের এই পরিকল্পনাকে সফল হতে দেওয়া হবে এবং ক্রমবর্ধমান বেকারীর সামনে এরাজ্য শিল্পের দিক থেকে মরুভূমি হয়ে যাবে। এই পটভূমিকাতেই এরাজ্যে যৌথ ব্যক্তি উদ্যোগের শিল্প সম্পর্কিত বিষয়ের বিচার-বিবেচনা জরুরী হয়ে পড়ে।

এটা বামফ্রন্টের ঘোষিত নীতি যে, বেসরকারী ক্ষেত্রের ওপর সব সময় সরকারী ক্ষেত্রের প্রাধান্য থাকবে। একই সাথে এই প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল কেন্দ্র পশ্চিমবাংলার সংগ্রাম। একটানা কেন্দ্র এটা দেখাতে চেষ্টা করে যে যতদিন বামফ্রন্ট সরকার থাকবে ততদিন এখানে শিল্পের অগ্রগতি হবে না এবং কংগ্রেস এরাজ্যে ক্ষমতায় ফিরে না আসা পর্যন্ত কর্মসংস্থান বাড়ানোর সব আশা শিকেয় তুলে রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে যুবমানসের জীবনযন্ত্রণার প্রতি যথার্থ অনুভূতি সহমর্মিতার উপলব্ধি নিয়ে এবং আত্মমর্যাদাবোধ সংগ্রামী মানসিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এরাজ্যে শিল্প গড়ার উদ্যোগকে দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

অতীতের দিকে তাকালে আমরা দেখি শিল্প গড়ার সুযোগসুবিধা এবং অনুকূল পরিস্থিতির কারণেই ইংরেজ আমলে বিদেশী শিল্পপতিরা এখানে শিল্প গড়তে এগিয়ে আসে। পরিকাঠামো বলে বিশেষ কিছুই তখন এখানে ছিলো না। তা সত্ত্বেও চা, চট, ইঞ্জিনিয়ারিং, কেমিক্যালস প্রভৃতি শিল্প কলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সরকার সমগ্র পূর্বাঞ্চলকেই অবহেলা করায় এখানকার শিল্পের ওপর দারুণ আঘাত পড়ে। তারওপর মাশুল সমীকরণ নীতি, শিল্প লাইসেন্স প্রথা, কেন্দ্রীয় বিনিয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরূপ আচরণকে কাজে লাগিয়ে এখানকার শিল্প সম্ভাবনাকে একেবারে বিপর্যয়ের মু‍‌খে ঠেলে দেওয়া হয়। ১৯৭২-৭৭ সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে কংগ্রেস সরকার রাজ্যের অর্থনীতিকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গিয়ে শিল্প সম্ভাবনার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দেয়।

এমত পরিস্থিতিতে ১৯৭৭ সালে রাজ্য সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করায় পশ্চিমবাংলার অর্থনীতিতে তার প্রতিফলন ঘটে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, সামাজিক বনসৃজন, শিক্ষার প্রসার, সাক্ষরতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পরিলক্ষিত হয়। দেশের শতকরা সত্তর ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তাই কৃষির উন্নতি ছাড়া শিল্পের বিকাশ ঘটানো সম্ভন নয়। আমূল ভূমি সংস্কার কর্মসূচীর সাফল্য এক্ষেত্রে এক নতুন দিশা নিয়ে আসে। গ্রামীণ অর্থনীতির এই পরিবর্তনের ফলে গ্রাম থেকে শহরে আসার প্রবণতা কম‍‌তে থাকে। গ্রামীণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় রাজ্যে শিল্পপণ্যের এক বাজার তৈরি হয়। ফলে হাজার প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে এখানে শিল্পায়নের এক শক্তিশালী বুনিয়াদ গড়ে ওঠে। শিল্পের প্রাথমিক প্রয়োজন বিদ্যুৎ। ১৯৭৬-৭৭ সালে অর্থাৎ কংগ্রেস শাসনের শেষ বছর রাজ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ক্ষমতা ছিল ১৬২৫ মেগাওয়াট। বামফ্রন্ট আমলে ১৯৮৫-৮৬ সালে যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৫৩ মেগাওয়াট। অর্থাৎ মাত্র বছরে অতিরিক্ত ১৭২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতা পশ্চিমবাংলার বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। কংগ্রেস শাসনে ১৯৭০-৭১ থেকে ১৯৭৬-৭৭ সালের মধ্যে রাজ্যে বাড়তি বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয় মাত্র ৯৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বামফ্রন্ট সরকারের দেওয়া বক্রেশ্বর, সাগরদিঘি সহ প্রায় ৬০০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর অনু‍‌মোদন লাভে ব্যর্থ হয়। প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার ষষ্ঠ সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী যোজনায় বিদ্যুৎখাতে যোজনা কমিশনের বরাদ্দ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ছিল সবচেয়ে কম। ফলে কেন্দ্রের লাগাতার বঞ্চনার বিরুদ্ধে, পশ্চিমবাংলার আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প। রক্ত দিয়ে বক্রেশ্বর গড়ার সংকল্প তো আর এমনি এমনি আসেনি। ১৯৮৫ সালে কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটিকে প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রাজ্য সরকারের প্রকল্প হিসেবে অনুমোদন দেয়। পরবর্তীকালে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদন সাপেক্ষে এটি সপ্তম যোজনায় রাজ্যের প্রকল্প হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এমনকি ১৯৮৬ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর সাথে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ‍‌ঘোষণাও করেন যে, মাস তিনেকের মধ্যেই বক্রেশ্বর প্রকল্প ছাড়পত্র পাবে। কিন্তু তারপরেই কেন্দ্রীয় সরকার ভোলবদল করে। ১৯৮৭ সালের ২৯শে অক্টোবর কেন্দ্রীয় শক্তিমন্ত্রী টেলেক্স বার্তায় রাজ্য সরকারকে জানায় যে, প্রকল্পের জন্য সোভিয়েত ঋণ পাওয়ার প্রাকশর্ত হলো প্রকল্পটিকে কেন্দ্রীয় ক্ষেত্রে রূপায়িত করতে হবে। অথচ কিছুদিন বাদে ভারতে অবস্থিত সোভিয়েত রাষ্ট্রদূত জ্যোতি বসুর সাথে দেখা করে জানালেন যে, এসব ভুল কথা। উনি বলেন, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। সোভিয়েত সরকারের পক্ষ থেকে এরকম কোন শর্ত দেওয়া হয়নি। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তখন কেন্দ্রকে জানানো হয় যে, সোভিয়েত ঋণ পশ্চিমবাংলাকে না দিলে সেটা হবে চরম অবিচার। কিন্তু বামফ্রন্ট সরকারকে সমস্তরকমভাবে অপদস্থ করতে তখন কেন্দ্র মরিয়া। ফলে এক রকম বাধ্য হয়ে নিজস্ব উদ্যোগেই বক্রেশ্বর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। ১৯৮৮ ২৮শে সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির শিলান্যাস করতে গিয়ে জ্যোতি বসু ঘোষণা করেন — ‘বক্রেশ্বর প্রকল্পের রূপায়ণের সাথে জড়িয়ে আছে এরাজ্যের আত্মমর্যাদার প্রশ্ন। কেন্দ্রীয় সরকারের অবহেলা অবিচারের সমুচিত জবাব এরাজ্যের মানুষ প্রকল্পটির সার্থক রূপায়ণের মধ্যে দিয়েই দেবে।

এরপর ১৯৯১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। আন্তর্জাতিক ফিনান্স পুঁজির চাপে অন্যান্য বিষয়ের সাথে শিল্প লাইসেন্স প্রথা বাতিল মাশুল সমীকরণ নীতি শিথিল করা হয়। বিশ্বব্যাঙ্ক-আই এম এফ নির্দেশিত উদার অর্থনৈতিক নীতির প্রধান প্রতিপাদ্য বেসরকারীকরণ। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফলে প্রথমে রুগ্ অলাভজনক এমনকি লাভজনক সংস্থার শেয়ার বিক্রি অগ্রাধিকার তালিকায় চলে আসে। কেন্দ্রের এই উদার অর্থনীতির তীব্র বিরোধিতা করে বামফ্রন্ট। কারণ এই নীতির দরুণ আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রকে প্রধান ভূমিকায় রেখে শিল্প বিকাশের যে ভিত্তি গড়ে উঠেছিল তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নির্বিচারে বিদেশী পুঁজি প্রযুক্তি আমাদানির ফলে দেশীয় শিল্প এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে দুর্বল হবে এবং আমাদের আর্থিক স্বয়ংভরতা বিপন্ন হয়ে পড়বে।

বামফ্রন্টের স্পষ্ট বক্তব্য দেশের স্বনির্ভরতার স্বার্থে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র শক্তিশালী হোক। কিন্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় একটা অঙ্গরাজ্যে সরকারে এসে তো কেউ তাদের নীতিকে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক শিল্পনীতির আওতায় থেকেই তাদের কাজ করতে হয়। স্বাধীনতার প্রথম পর্যায়ে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকালে কেন্দ্রের কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র ছিল অগ্রাধিকার তালিকায় (commanding light of economy) সেই সময় রাজ্যের ক্ষেত্রেও সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা নেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু কেন্দ্রের গৃহীত উদার অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারের কাছে ব্যক্তিপুঁজির বিকল্প আর কিছু রইলো না। এই রূঢ় বাস্তবকে কি ইচ্ছে করলেই অস্বীকার করা যায়? কেন্দ্রীয় সরকারের নয়া অর্থনীতি গ্রহণের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় উন্নয়ন পর্ষদের সভায় রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই নীতির শুধু বিরোধিতাই করা হয়নি বিকল্প প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল। এর মাধ্যমে এক নতুন বিকল্প আর্থ-সামাজিক নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা যা দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করবে এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে অটুটু রাখবে, তা তুলে ধরার চেষ্টা হয়। এই বিকল্প নীতি যদি কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ কর‍‌তো তাহলে তার পটভূমিতে জাঁকিয়ে আমাদের রাজ্যে শিল্পায়নের বিষয়টি অন্যভাবে ভাবা যেতে পারতো। যেহেতু তা হয়নি সেই কারণে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ বিশেষ ছিল না। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেয় সরকারী বিনিয়োগ কমিয়ে বিদেশী বিনিয়োগের ঢালাও ব্যবস্থা করা হবে। তাহলে রাজ্য সরকার কী করবে? শুধু নীতিগত অবস্থানের কথা বলে হাত গুটিয়েবসে থাকবে? সেটাতো মূর্খের আচরণ। রাজ্যকে উদ্যোগ নিতেই হয় এবং কেন্দ্রীয় নীতির বাইরেও খুব একটা যাওয়া যায় না। মনে রাখা দরকার, কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে এই নীতিগ্রহণ বাধ্যতামূলক ছিল না। সদিচ্ছা ‍‌নৈতিক বল থাকলেই তারা অন্য পক্ষ নিতে পারতেন। সে বিকল্প প্রস্তাব বামপন্থীরা দিয়েও ছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার ইচ্ছে করলেই কেন্দ্রীয় নীতিকে উপেক্ষা করতে পারতো না।

এই বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে রাজ্যের শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে রাজ্য সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। যেহেতু বড় মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার কোনও স্বাধীন নীতি ঘোষণা করতে পারে না, সেই কারণে ১৯৯৪ সালে সরকারের পক্ষ থেকে বিধানসভায় শিল্পায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে এক নীতি-বিবৃতি (Policy statement on Industrial development) পেশ করা হয়। এতে বলা হয় — () রাজ্য সরকার উপযুক্ত ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধাজনক শর্তে বৈদেশিক পুঁজি প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাবে। () রাজ্য সরকার সামাজিক ন্যায়বিচার ভারসাম্যমূলক অগ্রগতির ক্ষেত্রে সরকারী সরকার অধিগৃহীত ক্ষেত্রগুলিকে প্রধান চালিকাশক্তি মনে করে। রাজ্য সরকার এটাও স্বীকার করে যে, কয়েকটি কারণে অগ্রগতির স্বার্থে বেসরকারী উদ্যোগেরও গুরুত্ব ভূমিকা থাকবে। যেমন, প্রধান প্রধান শিল্পে বিদ্যুৎ পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারী উদ্যোগের এক তাৎপর্যময় ভূমিকা আছে বিশেষ করে মূল্যায়নের রাশ টেনে রাখার ক্ষেত্রে। তা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণের স্বার্থে এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব আর্থিক সীমাবদ্ধতার দরুণ রাজ্য সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারী বিনিয়োগকে স্বাগত জানাবে। () সরকারী বেসরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি রাজ্য সরকার যৌথ সহযোগী উদ্যোগগুলিকে অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ক্ষেত্রে মূলধন সংগ্রহ করা এবং অন্যান্য কিছু বিশেষ কাজে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বলে মনে করে। () শিল্পের পরিকাঠামোর উন্নয়ন ক্রম অগ্রগতিশিল্পের অগ্রগতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করে রাজ্য বর্তমানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। আগামী দশ বছরে অতিরিক্ত পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে। সরকারী, বেসরকারী, যৌথ উদ্যোগেই এটা করা সম্ভব। এছাড়া রাস্তা যোগা‍‌যোগ ব্যবস্থা শিল্পবিকাশ কেন্দ্রগুলির উন্নয়ন ঘটানো হবে। () সামাজিক পরিকাঠামো যথা উপনগরী নির্মাণ, আবাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জল সরবরাহ, হোটেল নির্মাণ, উন্নতমানের স্কুল-কলেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে। কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্প্রসারণের উপর জোর দিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা উন্নতমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থা‍‌পনের জন্য বেসরকারী যৌথ উদ্যোগকে উৎসাহিত করার প্রয়াস জারি থাকবে।

এই শিল্প সংক্রান্ত নীতি-বিবৃতিঘোষণার সাথে সাথে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয় যে, এরাজ্যে শ্রমজীবী মানুষ বহু সংগ্রাম আত্মত্যাগের মাধ্যমে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বারে বারে এই সরকারের ওপর তাদের গভীর আস্থার প্রমাণ রেখেছে। এরাজ্যের স্বার্থবিরোধী কোন শিল্প প্রকল্প কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকার কোনরকম সহায়তা করবে না। বামফ্রন্ট চায় শ্রমজীবী মানুষ শিল্প উদ্যোগী উভয়েই তাদের অধিকার কর্তব্য দুটি বিষয়েই সমান গুরুত্ব আরোপ করুন যাতে করে এখানে একটা শিল্পের অনুকূল বাতাবরণ গড়ে ওঠে।

বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে বামফ্রন্টের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে জ্যোতি বসু বলেন — ‘বিকল্প ব্যবস্থার ভিত্তি হওয়া উচিত স্বনির্ভরতা, অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানো, আমাদের দেশে প্রচুর প্রাকৃতিক মানবিক সম্পদ রয়েছে যার অনেকটাই এখনও অব্যবহৃত। এখন দেখতে হবে সাধারণ মানুষের কৃষি শিল্পপণ্যের প্রয়োজন মেটানো সামাজিকভাবে উপযুক্ত উৎপাদন সৃষ্টি কতোটা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে হতে পারে আর কতোটা বিদেশী বাণিজ্যের মাধ্যমে হতে পারে। স্বনির্ভরতা মানে বিদেশী বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া নয়। বরং যে সব ক্ষেত্রে তুলনামূলক সুবিধা ( গতিশীল সুবিধা) আছে সেক্ষেত্রে অবশ্যই বাণিজ্য করতে হবে। অর্থাৎ শক্তি আত্মমর্যাদার অবস্থান থেকেই বাণিজ্য করতে হবে (মার্কসবাদী পথ, ফেব্রুয়া‍‌রি-১৯৯২) বামফ্রন্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানায়, বিদেশী পুঁজির ক্ষেত্রে ‍‌নির্বিচার প্রবেশের পরিবর্তে জাতীয় অগ্রাধিকার, সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা এবং সামগ্রিক সুবিধা অসুবিধা মনে রেখে নির্দিষ্ট ক্ষেত্র বিশেষেই এই পুঁজি গ্রহণ যুক্তিযুক্ত। সমগ্র পরিপ্রেক্ষিত পর্যালোচনা করে বামফ্রন্ট সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এরাজ্যে উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর, কর্মসংস্থান অভিমুখী এবং কৃষিভিত্তিক এই ধরনের শিল্পায়নেই গুরুত্ব দেওয়া হবে। রাজ্যের মানুষের চাহিদার কথা মাথায় রেখে পেট্রোরসায়ন, ইলেকট্রনিক্স, তথ্য প্রযুক্তি, খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি শিল্প স্থাপনের কাজ থাকবে অগ্রাধিকার তালিকায়। রাজ্যের চিরাচরিত শিল্পগুলি রক্ষা করা এবং আধুনিকীকরণ সম্প্রসারণ কর্মসূচীর মাধ্যমে সেগুলির বিকাশ ঘটাতে সব ধরনের প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।

বঞ্চনার বিরুদ্ধে আত্মমর্যাদার প্রতীক বক্রেশ্বর মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে রাজ্য আজ লোডশেডিংয়ের রক্তচক্ষু থেকে প্রায় মুক্ত। পরবর্তী পর্যায়ে প্রশাসনিক গাফিলতিতে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালসকে কেন্দ্র করে বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক কর্মযজ্ঞ জারি রয়েছে। নন্দীগ্রামকে আর এক হলদিয়ায় পরিণত করার বামফ্রন্টের আন্তরিক সদিচ্ছাকে কায়েমী স্বার্থবাদীরা সর্বশক্তি দিয়ে বানচাল করতে সফল হয়ে‍‌ছে। সিঙ্গুরকে কেন্দ্র করে এক বিশাল শিল্পনগরী গড়ার উদ্যোগ প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার মুখে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বামফ্রন্টের শিল্পায়ন কর্মসূচীকেঠেকিয়ে রাখা যায়নি। ১৯৯১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সংগঠিত শিল্পের ক্ষেত্রে ২৫৩১টি সংস্থায় বাস্তবায়িত হয়েছিলো ৬৫,৬৮৬ কোটি টাকার বিনিয়োগ। এরফলে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় তিন লক্ষ (‍ এবং পরোক্ষভাবে এর দ্বিগুণ) লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। সেক্টর ফাইভের তথ্য প্রযুক্তি শিল্প মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ছোট বড় অসংখ্য শিল্প পরিকল্পনা বামফ্রন্টের উদ্যোগে নেওয়া হয়েছে যার বেশ কয়েকটি বর্তমান সরকারের অবিমৃষ্যকারিতায় বাস্তবায়িত হতে পারছে না সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ইনফোসিস।

 তা সত্ত্বেও এটা স্বীকার করতেই হবে যে, শিল্পায়ন প্রসঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক কুৎসা-অপপ্রচার মোকাবিলায় আমাদের ব্যর্থতা থেকেই গিয়েছে। যে কারণে জনগণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশকে শত্রুরা সাময়িকভাবে ‍‌লেও আমাদের বিরোধী শিবিরে টেনে‍‌ নিতে পেরেছে। সঠিক তথ্য যুক্তির আলোকে সেই মানুষকে আমাদের দিকে নিয়ে আসতেই হবে। প্রয়াত জ্যোতি বসু একটা কথা প্রায় বলতেন, মনে রাখা দরকার মানুষ যেমন ইতিহাস গড়ে আবার মানুষই ভুল করে। ফরাসী বিপ্লব থেকে রুশ বিপ্লব সম্পাদন করেছিল মানুষ। আবার মানুষের হাত ধরেই এসেছিল ফ্যাসিবাদ। প্রতিক্রিয়ার প্রচারের সামনে অনেক সময় দেখা যায় প্রগতির বক্তব্য পিছিয়ে পড়ে। গণেশ দুধ খাচ্ছে, এই হুজুগে লক্ষ লক্ষ মানুষ সেদিন দেশজুড়ে গ্লাস বা ঘটি ভর্তি দুধ নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কিন্তু সচেতন বিজ্ঞান কর্মীরা যখন থিওরি অব সারফেস টেনশনঅনুসরণ করে এই গুজবের অসারতা প্রমাণ করতে সচেষ্ট হয়, তখন কিন্তু খুব বেশি মানুষ তাদের ডাকে সাড়া দেয় না। এক্ষেত্রে বুজরুকি বনাম বিজ্ঞানের দ্বন্দ্বে বিজ্ঞান সাময়িকভাবে হলেও পিছু হটে। সুতরাং মানুষের সাথে নিরন্তর সম্পর্ক রাখা এবং তাদের বিচার বি‍‌শ্লেষণেরউদ্দেশ্যে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমস্ত বিষয়গুলো তুলে ধরা প্রতিটি বামপন্থী কর্মীর অবশ্য কর্তব্য। কাজটা কঠিন। সেই কারণে দায়িত্বও বেশি। আমাদের তা পালন করতেই হবে।

[সহায়তা গ্রহণ : বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্তের বাজেট ভাষণ]