20170328

রক্তাক্ত ভাঙড়ে বেআব্রু মমতার জমি মডেল

 সুদীপ্ত বসু
১৭ই জানুয়ারি


একজনের বয়স ২২, কলেজ ছাত্র। অপরজন গ্রামেরই বাসিন্দা, বয়স ২৪।
রক্তাক্ত ভাঙড় মঙ্গলবার দেখলো গ্রামবাসী, কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ভাঙতে পুলিশের গুলিতে দুই যুবকের রক্তাক্ত বুলেটবিদ্ধ দেহ। নবান্ন নির্বিকার, দায় এড়ানোর চেনা কৌশলে বহিরাগতর তত্ত্ব প্রশাসনের। যদিও মৃত দুই যুবক স্থানীয় গ্রামেরই বাসিন্দা।
একদিকে সাধারণ গরিব গ্রামবাসী, অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জির পুলিশ ও তৃণমূলের একাংশের সশস্ত্র দুষ্কৃতীবাহিনী। জ্বলছে পুলিশের গাড়ি, রাস্তা অবরোধ, গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরুদ্ধ গোটা এলাকা। পালটা গ্রামবাসীদের দিকে উড়ে আসছে ইট, টিয়ার গ্যাসের শেল। চলেছে গুলিও।


রণক্ষেত্র ভাঙড়।
প্রকল্পের নামে জমি মাফিয়া দিয়ে শাসক তৃণমূলের জোর করে জমি দখলের প্রতিবাদে, পুলিশি অত্যাচারে বিরুদ্ধে প্রতিবাদে একজোট গ্রামবাসীকে শেষ পর্যন্ত বন্দুক দিয়েই নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালালো তৃণমূল সরকার। পরিণামে পুলিশের গুলিতে মৃত্যু হলো দুই স্থানীয় বাসিন্দার।
পুলিশের গুলিতেই মঙ্গলবার শেষ বিকালে মৃত্যু হলো ২২বছরের এক তরতাজা যুবকের। পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বরূপনগর গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর মোল্লা। পুলিশের গুলিতে রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েছেন। রক্তে ভেসেছে শরীর। চিকিৎসার সময়ও মেলেনি। ২২ বছরের আলমগীর কলেজ ছাত্র। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও অনেকে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে নিয়ে আসা হয় এস এস কে এম হাসপাতালে। রাতেই সেখানে মৃত্যু হয় ২৪ বছর বয়সি যুবক মফিজুল শেখের। পোলেরহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের গাজীপুরের শেখপাড়ার বাসিন্দা এই বছর চব্বিশের যুবক।
জোর করে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে জমি মাফিয়া মারফত তৃণমূলের জমি দখল, রাতের অন্ধকারে পুলিশের অমানবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর নজির গড়েছে ভাঙড়। প্রশাসন পিছু হটেছে, পিছু হটা প্রশাসনকে অক্সিজেনজোগাতে পুলিশের দিক থেকেই গ্রামবাসীদের তাক করে বোমা ছুঁড়েছে আরাবুল বাহিনী। তাতেও ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসীকে পিছু হটাতে পারেনি প্রশাসন। সকাল থেকে চলা অবরোধ, বিক্ষোভের জেরে স্তব্ধ হয়েছে ভাঙড়, রাজারহাট লাগোয়া পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ প্রান্ত। বিকালের দিকে সেই স্তব্ধ হয়ে যাওয়া জনপদেই ঐক্যবদ্ধ গ্রামবাসী, জমিদাতা কৃষককে ছত্রভঙ্গ করতে চললো পুলিশের গুলি। মৃত্যু হলো দুজনের। আহত হলেন একাধিকজন।
রাত পর্যন্ত গুলি চালানোর ঘটনা অস্বীকারের মরিয়া চেষ্টা চালায় জেলা পুলিশ। রাতেই মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, বহিরাগতরা জড়ো হয়ে অশান্তি পাকাচ্ছে। এমনকি তাঁদের গ্রেপ্তার করার নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী। রাতেই পোলেরহাট-২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের খামারাটি, টোনা, মাছিডাঙা বিস্তীর্ণ এলাকায় সাধারণ মানুষের টহল। পুলিশ, র‌্যাফও ক্রমেই ঘিরছে ভাঙড়কে। উত্তেজনা রয়েছে রাতভর। উত্তেজনার চেহারা এমনই তৃণমূল সরকারের মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লাও ঢুকতে পারেননি নিজের বিধানসভা কেন্দ্রে। গ্রামবাসীরাই গড়েছেন ব্যারিকেড।
বরাবরের জমি আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি ভাঙড় মঙ্গলবার সকাল থেকে কেন ফেটে পড়লো প্রবল ক্ষোভ, উত্তেজনায়? কেন মুহূর্তেই তা রণক্ষেত্রে পরিণত হলো? ভাঙর-২ ও ভাঙর-১ নম্বর ব্লক জুড়েই শাসক তৃণমূলের একচেটিয়া একাধিপত্য। তৃণমূলের একাধিপত্য মানে জমি মাফিয়া, দুষ্কৃতীরাজের রমরমা তা গত সাড়ে পাঁচ বছরে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন গ্রামবাসীরা। সেই ভাঙড়ে ২০১৩ সালে পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের টোনা মৌজার নতুনহাটে ৪০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠার কথা পাওয়ার গ্রিড প্রকল্প। প্রথম থেকেই পোলেরহাটের মত তিন ফসলি, চার ফসলি জমি দিতে আপত্তি ছিল কৃষকদের। তখন ভাঙড়ে আরাবুলের একচ্ছত্র দাপট।
গ্রামবাসী, জমিদাতা কৃষকদের অন্ধকারে রেখেই পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে নোটিস ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। জমি নেওয়া হবে বলেই নোটিস দেওয়া হয়। কৃষকরাও জানেন না তাঁদের জমি দিতে হবে প্রকল্পে। সেই নোটিস দেখিয়ে তৃণমূলের নেতা আরাবুল ইসলামের বাহিনী বাইকে চেপে রাতের পর রাত হুমকি দিয়ে জোর করে ভয় দেখিয়ে কৃষকদের জমি দিতে বাধ্য করে। দীর্ঘদিন ধরেই জমছিল সেই ক্ষোভ। গ্রামবাসীদের উদ্যোগেই তৈরি হয় জমি জীবিকা বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশ রক্ষা কমিটি। সেই ক্ষোভের তুষে আগুন ধরায় জমি মাফিয়াদের হয়েই পুলিশের অত্যাচার, মিথ্যা মামলা। গত নভেম্বর মাসেই আন্দোলনকারী তিন মহিলা সহ ছয়জনকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ক্ষোভের মাত্রা আরও বাড়ে।
শান্তিপূর্ণভাবেই গত ১১ই জানুয়ারি কাশীপুর থানার খামারাটিতে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা ধরে অবরোধে শামিল হন কয়েক হাজার গ্রামবাসী, মহিলারা। অসমাপ্ত বিদ্যুৎ প্রকল্পের জমি ফেরত চেয়ে, বহুফসলি জমিতে পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্প বন্ধের দাবিতে। সেদিন কোন গন্ডগোল, উত্তেজনা ছড়ায়নি। লাওহাটি-শ্যামনগর দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার রাস্তা অবরোধ করেই চলে সেই বিক্ষোভ।  প্রশাসনের আশ্বাসে ওঠে বিক্ষোভ। যদিও তারপরেও তৃণমূলের দুষ্কৃতী বাহিনী, জমি মাফিয়াদের হুমকি চলতেই থাকে। এরই মধ্যে সোমবার রাতে আরও একটি মিথ্যা মামলায় পুলিশ গ্রেপ্তার করে সামসুর হক ওরফে কালুকে। এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ভাঙড়-২ নম্বর ব্লক জুড়েই।
আর এরপরেই ঘটে সোমবার গভীর রাতেই ভয়াবহ পুলিশি অত্যাচারের ঘটনা। রাত প্রায় দুটো নাগাদ বিরাট পুলিশ বাহিনী পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের খামারাটি, টোনা, নতুনহাট, মাছিডাঙার মতো একের পর এক গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে ঢুকে চলে পুলিশি অত্যাচার। সোমবার রাতেই এই ঘটনার জেরেই মঙ্গলবার ভোর থেকে হাজার হাজার গ্রামবাসী, কৃষক, বৃদ্ধ, এমনকি শিশুরাও নামে রাস্তায়। ভোর ছটা থেকেই শুরু হয় পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ প্রান্ত জুড়ে অবরোধ। শ্যামনগর থেকে বকডুবি পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার রাস্তার মোড়ে মোড়ে গাছের গুঁড়ি ফেলে শুরু হয় রাস্তা অবরোধ। সময় যত গড়িয়েছে বেড়েছে অবরোধকারীর সংখ্যা। দশ হাজারের বেশি মানুষ তখন রাস্তায়। চলছে অবরোধ।
সেই অবরোধ ভাঙতে আশেপাশের চারটি থানা এলাকার বিরাট পুলিশ বাহিনী ঢোকে এলাকায়।পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। দুপুরের দিকে পুলিশই চারদিক দিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। গোটা এলাকা বন্‌ধের চেহারা নেয়। সব দোকানপাট বন্ধ, রাস্তা গাছের গুঁড়ি দিয়ে আটকানো। পুলিশ জনতার চক্রব্যূহেই আটকে পড়ে। আর সেই সময়েই ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে তৃণমূলের একাংশ। পুলিশকে রক্ষা করতে মাঠে নামে তৃণমূলী দুষ্কৃতীবাহিনী। পুলিশের সামনেই তৃণমূলী বাহিনী অবরোধকারীদের দিকে প্রথমে ঢিল পরে বোমা ছোঁড়ে। পরিস্থিতি মুহূর্তেই অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অবরোধকারীরাও পালটা ইট ছুঁড়তে শুরু করেন। পুলিশ তখন নির্বিচারে মহিলা, পুরুষদের ওপর লাঠিচার্জ করতে শুরু করে। কার্যত রণক্ষেত্র তখন গোটা এলাকা। পুলিশের বাহিনীর সংখ্যাও তখন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে গ্রামবাসীদের সংখ্যা। পুলিশের তরফে কাঁদানে গ্যাসের শেল ফাটানো হয়। একের পর এক শেল ফাটানো হয়। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা পুলিশের গাড়িও ভাঙচুর শুরু করে।
এরপরেই পুলিশ কয়েক রাউন্ড গুলি চালায় জনতাকে লক্ষ্য করে। পুলিশের গুলিতেই জমিদাতা পরিবারের নিরীহ যুবক আলমগীর মোল্লার ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয়। ২২ বছরে আলমগীর কলেজ পড়ুয়া, এই ঘটনায় গ্রামবাসীদের ক্ষোভের মাত্র দ্বিগুণ হয়। পুলিশের গুলিতে চারজন আহত হন। তার মধ্যে মফিজুল শেখ নামে ২৪ বছরের আরও এক গ্রামবাসী যুবকের রাতে এস এস কে এম হাসপাতালে মৃত্যু হয়।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাতেই মুখ্যমন্ত্রী টুইট করেন যে মানুষ না চাইলে ওখানে বিদ্যুতের প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ হবে না, প্রয়োজনে প্রকল্প অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। যদিও পুলিশি অত্যাচার, গুলি চালানোর ঘটনায় মুখ খোলেননি মুখ্যমন্ত্রী। বরং মুখ খুলে সরকারের অস্বস্তি বাড়িয়েছেন তৃণমূলী মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা। তাঁর কথায়, ওখানে প্রথমে সমস্যা ছিল না, পরের দিকে জমি নিতে গিয়ে এমন কিছু ঘটনা হয় যাতে মানুষের ক্ষোভ বাড়ে।

খোদ মমতা ব্যানার্জির মন্ত্রিসভার সদস্য এই দাবি করলেও রাজ্য প্রশাসন উলটে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধং দেহী মনোভাবেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে, যা আসলে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। 

১৮ই জানুয়ারি 

শ্যামনগর থেকে কামারবাড়ি যাওয়ার ভাঙাচোরা পিচ রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা পরেও জমাট বাঁধা রক্তের দাগ স্পষ্ট। রাস্তার একেবারে মাঝবরাবরই চোখে পড়বে সেই শুকিয়ে যাওয়া তাজা রক্তের দাগ।
শুধুই কি রাস্তায়? ২২বছরের ছাত্র আলমগীর মোল্লা থেকে লরির খালাসি ২৮ বছরের মফিজুল শেখের নিথর দেহই প্রমাণ করছে পুলিশের গুলি চলেছে সামনে থেকে। একজনের লেগেছে গলায়, আরেকজনের তলপেটে। একেবারে সামনে থেকে, শরীরের পিছনের অংশে কোন আঘাত নেই। শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, রাস্তার ধারে পড়ে থাক আলমগীরের গুলিবিদ্ধ দেহ পা দিয়ে নাড়িয়ে দেখেছিল পুলিশ, গুলি খাওয়ার পরে বেঁচে নেই তো!
২২বছরে মেধাবী নিরস্ত্র ছাত্রকে কয়েক হাত দূর থেকে গলায় গুলি চালাতে হলো কেন মমতা ব্যানার্জির পুলিশবাহিনীকে? প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।
আর উত্তর? তাও মিলেছে এদিন কামারবাড়ি থেকে টোনা, নতুনহাট, মাছিডাঙার মতো একের পর এক গ্রামে, বুধবার সকালে।
প্রায় বিধ্বস্ত, বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে কাঠের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা অবরোধে শামিল নিতান্তই সাধারণ গরিব গ্রামবাসী, কৃষকরা। সবজি চাষের আঁতুরঘর ভাঙড়ের পোলেরহাট-২নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতের এই বিস্তীর্ণ এলাকা। ফুলকপি থেকে লঙ্কায় সেজে ওঠা মাঠ, সবুজ খেত ফেলে রেখে কৃষকরা রাস্তায়। মাঠের ফসল রক্ষাই যাঁদের ভুবন সেই মানুষগুলি সারা রাত গ্রাম পাহারা দিয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই ফের রাস্তায় কেন? কীসের তাগিদ? নির্মম পুলিশি অত্যাচারের ক্ষত পুষে রেখেই এককাট্টা হয়ে থাকা কেন?
মমতা ব্যানার্জির শাসনে পুলিশের মিথ্যা মামলা, পুলিশ দিয়ে হামলার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার সাক্ষী এই বাংলা। কিন্তু ভাঙড়ে মানুষ সোমবার সন্ধ্যা থেকে যে দৃশ্যের সাক্ষী থেকেছে তা যেন নজিরবিহীন।
বুধবার সকালে তখন কাশীপুর থানা কয়েক কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর মোড়ে গাছে গুঁড়ি ফেলে আটকে রাখা হয়েছে রাস্তা। পুলিশের প্রবেশ নিষেধ, জানান দিচ্ছেন গ্রামবাসীরাই। ভিড়ের মধ্যেই ছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা আবুল কালাম। জিজ্ঞাসা করতে বলে উঠলেন, কেন তা জানতে হলে গ্রামের ভিতরে আসুন। যান নার্গিস পারভিনের কাছে।
নার্সিস পারভিনের বয়স সাড়ে তিন। ডান পায়ের দুটো আঙুল ভেঙে গেছে। রক্তের দাগ লাগা সেই পিচ রাস্তা পেরিয়েই কামারবাড়িতে নার্গিস পারভিনের বাড়িতে আসা, গোটা বাড়ি যেন ধ্বংসস্তূপ। সাড়ে তিন বছরের এই শিশুকন্যা মঙ্গলবার সকালে ঘরের সামনে উঠোনে খেলনা নিয়ে বসে খেলছিল। মমতা ব্যানার্জির পুলিশবাহিনী সাড়ে তিন বছরের নার্গিসকেও আন্দোলনকারীহিসাবেই যেন দেখেছে। সটান বাড়িতে ঢুকে প্রথমে তাঁর বাবা নুর হোসেন মোল্লাকে বেধড়ক মারধর করেছে। তারপর তার মা-কে। বাড়ির সব লোককেই মারা হয়।  দরজা, জানলা, টিভি, আলমারি ভেঙে দেওয়া হয়। তারপর চোখ পড়ে নার্গিসের ওপর। আছাড় মেরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। এখনও হাঁটতে পারছে না ওই শিশু।
বুধবার সকাল মুখোমুখি নার্গিস পারভিন। অব্যক্ত যন্ত্রণা, চোখে জল। আধো  আধো ভাষায় শুধু বলে উঠতে পারলো, মেরেছে কাকুরা, আমার মা কোথায় ? মা-র কাছে যাবো খিদে পেয়েছে।
নার্গিস পারভিনের মা দিনিয়ারা বিবি মঙ্গলবার সকাল থেকে এখনও নিখোঁজ। কোনো হদিশ নেই। পুলিশ ও তৃণমূলীবাহিনী বাড়ি থেকেই টানতে টানতে তুলে নিয়ে গেছে। কোথায়? এখনও পর্যন্ত ভাঙড়বাসী জানেন না। শুধু দিনিয়ারা বিবি? এই পরিবারেরই চারজন এখনও নিখোঁজ। আবদুস সামাদ ও তাঁর দুই ভাইও নিখোঁজ। আবদুস সামাদ নার্গিসের জেঠু হন। সোমবার সকাল থেকে তাঁর খোঁজ নেই। কাঁদতেই কাঁদতেই চিৎকার করছিলেন তাঁর স্ত্রী মহিমা বিবি, ‘ মরদাটকে মারতে মারতে নিয়ে গেল, আমাদের ঘর সব ভেঙে দিয়েছে , খাওয়ারও কিছু নেই। জানেন আমার দুই মেয়ে কদিন ছিল এখানে। কাল সকালে যখন পুলিশ আর কিছু মুখে কাপড় বাঁধা লোকজন ঢুকলো সেই সময় আমার দুই মেয়ে নাতনিদের নিয়ে বাথরুমে লুকিয়ে পড়েছিল। সেখান থেকেও বার করে ওঁদের মেরেছে। বাথরুম থেকে বের করেছে মেয়েদের।
জমি দখলে মমতা ব্যানার্জির পুলিশের চেহারা কী হতে পারে তার আরও শিউরে ওঠার অভিজ্ঞতা তখনও যেন বাকি ছিল। কামারবাড়ি থেকে সোজা সেই নতুনহাটের পাওয়ার গ্রিডের প্রকল্পের দিকে যত এগনো ততই যেন সেই ববর্রতার ছবি। রাস্তার দুপাশে সিংহভাগ বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে, কল ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সোমবার মধ্যরাতে বিস্তীর্ণ এলাকাকে অন্ধকার করেই চলেছে সেই তাণ্ডব। খামারআইট গ্রামের এক মহিলার কথায়, ‘ঘরে তখন বাচ্চা নিয়ে শুয়েছিলাম। দরজায় লাথি মেরে ঢুকে ভাঙচুর চালালো পুলিশেরবাহিনী। আমার শরীরের একাধিক জায়গায় ইচ্ছা করেই ধাক্কা মারলো পুলিশ...’, শেষ করতে পারলেন না কেঁদে ফেললেন।
এক সংখ্যালঘু মহিলা তাঁর স্বামীর সামনে দাড়িয়েই যখন এই অভিযোগ করছেন, দুপুরে তখন কলকাতায় রাজ্য গোয়েন্দা পুলিশের সদর দপ্তরে মুখ্যমন্ত্রীর জরুরিবৈঠক চলছে। সি আই ডি-র একটি সূত্রেই জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী দুটি নির্দিষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। এক,গ্রামের বহিরাগতদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করতে হবে, পুরানো মামলা থাকলে তাতে গ্রেপ্তার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুলিশ নয়, বহিরাগতই গুলি চালিয়েছ সেই অবস্থানেই থাকতে হবে।
সরকার প্রশাসনের দাবি আর ভাঙড়ের বাস্তবতার আসলে যোজন ফারাক। কারা বহিরাগত? কীভাবে এত পরিকল্পিত হামলা চললো? তাও স্পষ্ট হয়েছে সেই পাওয়ার গ্রিড প্রজেক্টের মাত্র ১৫০ মিটার দূরেই। রাস্তার ওপরেই বাড়ি লোকমান মোল্লার। প্রবীণ মানুষ। সঙ্গে স্ত্রী থাকেন। ছেলে বাইরে রয়েছে। সোমবার রাতে প্রথমে সেই বাড়িতেই চড়াও হয় পুলিশ আর সঙ্গে থাকে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা। বাড়িতে ভাঙচুর চালিয়ে সেই প্রবীণ দম্পতিকে বের করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে। তাঁরাও এখনও নিখোঁজ। তারপর সেই বাড়িতেই ঘাঁটি গেড়ে চলে যাবতীয় অপারেশন। বাড়ির পিছনে আমবাগান। বুধবার দুপুরে সেখানেই দেখা গেল পড়ে রয়েছে পুলিশের একাধিক ইউনিফর্ম, টুপি। পুলিশের জাল আইডেনটিটি কার্ড, এমনকি ব্যাঙ্কের পাশবইওমিলেছে জিতেন্দ্র যাদব নামে উত্তরপ্রদেশের এক পুলিশ কর্মীর পরিচিতিপত্রও। এদিন দুপুরে তখনও ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে কয়েক জোড়া হাওয়াই চটি, মদের বোতল আর গরম পোশাক।
আর এখানেই গ্রামবসীরা প্রশ্ন তুলছেন পুলিশের সঙ্গে তাহলে কারা ছিল? অপারেশন চালাতে আসা পুলিশকে কেন ব্যাঙ্কের পাশবই সঙ্গে আনতে হয়? কেনই বা গ্রামের একটি বাড়ি দখল করে সারা রাত সেখান থেকে অপারেশন চালাতে হলো? পুলিশের সামনে দাড়িয়ে আন্দোলনকারীদের দিকে বোমা ছুঁড়লো কারা? কেন পাওয়ার গ্রিড প্রকল্পের ভিতরে গত দশ দিন ধরে ৫২জন দুষ্কৃতীকে দেখা গেল? আগে থেকেই কি তাহলে এই অপারেশনের পরিকল্পনা ছিল? মাছিডাঙার বাসিন্দা আন্দোলনকারী আনোয়ার মোল্লার কথায়, পুলিশ নিজে গাড়ি থেকে বসেই গুলি চালিয়েছে। পুলিশের গাড়িতে ঐ সব মুখোশ পরা আরাবুলের বাহিনীও ছিল। তাঁরা লোক চিনিয়ে দিচ্ছিল। পুলিশের বন্দুক থেকেই বেরিয়েছে গুলি। আমরা পুলিশমন্ত্রীরও ইস্তফা চাই।
শহর লাগোয়া এই ভাঙড় গত সাড়ে পাঁচ বছরে বারে বারে তৃণমূলের জমি নীতির মডেল সামনে এনেছে। কখনও আরাবুল, কখনও কাইজার। আর এবার সেই ভাঙড়-২নম্বর ব্লকের পোলেরহাট গ্রাম পঞ্চায়েতের স্বরূপনগর থেকে কামারবাড়ি, নতুনহাট থেকে খামারআইট- আট কিলোমিটার বিস্তীর্ণ এলাকা রক্তের বিনিময়ে, দুই যুবকের নিথর দেহের মূল্য দিয়েই প্রত্যক্ষ করলো তৃণমূলের সেই জমি মাফিয়াদের উগ্র লালসার চেহারা।
২০১৩ সালের প্রকল্প। জমি অধিগ্রহণহয়েছে। অথচ সিংহভাগ জমিদাতা, খেতমজুর ক্ষতিপূরণের অর্ধেকও পায়নি। আরাবুলের বাহিনীর দাপটে। রাতের অন্ধকারে স্রেফ বাইক নিয়ে জমি দিতে হবে এই হুমকি শুনিয়েই মমতা ব্যানার্জির দলীয়বাহিনী বেসরকারি সংস্থার হয়ে জমি কবজা নিয়েছে। শুধু নতুনহাটের ১৩ একর জমিই নয়, এই প্রকল্প সফল হলে পোলেরহাটের বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ছিল তৃণমূলী জমি মাফিয়াদের পরবর্তী টার্গেট
নির্মম জমি মডেলের সেই চেহারাই বেআব্রু হয়ে ভাঙড়ে।
আর, তার বিরুদ্ধে রক্ত ঝরিয়েই এক অনির্বাণ প্রতিরোধের দিনলিপি এখন লিখছে সেই ভাঙড়ই।

একমাসেই ১৩ধর্ষণের ঘটনা রাজ্যে


নিরাপত্তাহীনতার শিকার মহিলারা



একের পর এক ধর্ষণ! আইন শৃঙ্খলা চুলোয় দিয়ে কার্যত ধর্ষণে শীর্ষ হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ। শুধু গত এক মাসেই   রাজ্যজুড়ে প্রায় ১৩টি ধর্ষণের ঘটনা এলো সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে। অথচ মুখ্যমন্ত্রীর সেই স্বাভাবসিদ্ধ দাবি, রাজ্যে আইন শৃঙ্খলার কোনো অবনতি নেই !

রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সাল থেকেই ঘটছে সন্ত্রাস আর একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা। সেই  থেকে নারী নির্যাতন ও শ্লীলতাহানি বাদ দিলেও গত একমাসে এখনো পর্যন্ত প্রায় ১৩টি ধর্ষণের শিকার শিশু, কিশোরী থেকে গৃহবধূ। অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর বহু ক্ষেত্রেই বেরিয়ে পড়েছে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ। প্রতি ক্ষেত্রেই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যস্ত পুলিশ প্রমাণ লোপাটেরও চেষ্টা করেছে বলে স্থানীয় মানুষের বক্তব্য।

বছরের শুরুতেই এসেছে বর্ধমানের জামুরিয়াতে গৃহবধূ ও বাঁকুড়ার তালডাংড়ায় এক ৮ বছরের কিশোরীর ধর্ষিতা হওয়ার খবর। গত ৩১শে ডিসেম্বর প্রাতঃকৃত্য সারতে গিয়েছিলেন বছর ৩২-এর ওই গৃহবধূ। তাঁকে ধর্ষণ করে খুনের উদ্দেশ্যে মাথায় আঘাত করে দুষ্কৃতীরা। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। অভিযুক্তকে ধরতে পারেনি পুলিশ। গত এক বছরে শুধু জামুরিয়াতেই ঘটেছে চারটি ধর্ষণের ঘটনা। এই বছরের শুরুতেই বাঁকুড়ার তালডাংড়াতেও ঘটেছে একইভাবে এক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। সকালে শৌচকর্ম করতে গিয়ে তৃণমূল কর্মী গৌতম করের লালসার শিকার হয় ওই ৮ বছরের কিশোরী।

গত ২রা জানুয়ারি মধ্যমগ্রামের ১৭ বছরের তরুণী হাসনাবাদে তার মামার বাড়ি বেড়াতে গিয়ে আক্রাম্ত হয় দুষ্কৃতীদের হাতে। বিশ্বনাথ সর্দার নামে এক যুবককে আটক করে পুলিশ। তার দুদিন পরেই ৪ঠা জানুয়ারি আবার ধর্ষণের ঘটনা সামনে আসে বসিরহাট এলাকায়। স্বামীর অনুপস্থিতিতে ওই গৃহবধূর বাড়িতে ঢুকে তাঁকে ধর্ষণ করে তৃণমূল কর্মী টুটুন ঢালি। স্বামীর অভিযোগ পেয়ে ওই কর্মীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিনে হাওড়ার গোলাবাড়ি থানা এলাকায় পাটনার বাসিন্দা এক কিশোরীকে ধর্ষণ করে দুষ্কৃতীরা। বলাই বাহুল্য কোনো নিরাপত্তা নেই ফুটপাতবাসীদের। লেকটাউন দক্ষিণদাঁড়িতে ভি আই পি রেড সংলগ্ন এলাকায় এক নাবালিকা ফুটপাতবাসীকে ধর্ষিত হতে হয় গত ৯ই জানুয়ারি। এর পরের ঘটনা গত ১৭ই জানুয়ারি উত্তরবঙ্গের ধুপগুড়িতে। সেখানে সোনাখালিতে এক ৩২ বছরের গৃহবধূকে ধর্ষণের চেষ্টা করতে গিয়ে বাধা পায় ফুলদাস খাড়িয়া। তাকে পাল্টা আঘাত করেন ওই গৃহবধূ। দিনের পর দিন তাঁকে উত্যক্ত করতো ওই ব্যক্তি।

 ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেছে গত ২২ জানুয়ারি রাত সাড়ে দশটার লোকাল ট্রেনে। হাড়োয়ার ভাসিলা স্টেশনের মাঝামাঝি এক জায়গায় শ্লীলতাহানির পর ধর্ষণে বাধা পেয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে এক মহিলাকে নিচে ফেলে দেয় দুষ্কৃতীরা। গত ২৫ ও ২৬শে জানুয়ারি ভয়াবহভাবে ঘটে আরো ৩টি ধর্ষণের ঘটনা। বাঁকুড়ার তালডাংড়ায় ফের ধর্ষণ করে খুন। বিবরদা গ্রাম পঞ্চায়েতে এক অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ করে খুন করে একদল দুষ্কৃতী। তার দেহটি পরের দিন উদ্ধার হয়। ধুপগুড়িতে এক ছাত্রীকে মাদক খাইয়ে নেশাগ্রস্ত করে ধুপঝোড়ায় তৃণমূল নেতার রিসর্টে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয় মানুষের চাপে পড়ে এই ঘটনায় এক তৃণমূল নেতা মহম্মদ সামিম আলিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই সময়ে মেখলিগঞ্জে দুই ছাত্রীকে ডেলে নিয়ে গিয়ে একজনকে ধর্ষণ করে পুলিশ। আর এক ছাত্রী শেষ পর্যন্ত পালাতে সক্ষম হয়। এই ঘটনাতে ধরা পড়ে শুভঙ্কর রায় ও পরিতোষ রায় নামে দুই তৃণমূল কর্মী। এছাড়া জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বিধাননগরে ঝুপড়িবাসী নাবালিকাকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে শংকর সর্দার ও সমর সর্দার নামে দুই যুবক। রবিবার রাতে ধর্ষণ করে খুন করা হলো সোনারপুরের দশম শ্রেণির ছাত্রীকে। এছাড়াও রবিবার জলপাইগুড়ি লাগোয়া আদিবাসী চা শ্রমিককে ধর্ষণ করে খুন করা হলো। ভান্দিগুড়ির বাসিন্দা এই মহিলার দেহ উদ্ধার  হোগলাভিতা গ্রাম থেকে।


পরিবর্তনের পর যত দিন গিয়েছে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা সামনে এসেছে। খোদ কলকাতার বুকে পার্ক স্ট্রিটে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের ঘটনাই সূত্রপাত বলে মনে করেন অনেকেই। পরপর মধ্যমগ্রাম, কামদুনি, কাটোয়া, কাকদ্বীপের ঘটনায় এখনো শিউড়ে ওঠেন মানুষ। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বারের জন্য তৃণমূলের নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পরই গত ২৯শে মে এক মহিলাকে গাড়িতে তুলে বার বার ধর্ষণ করে নিকো পার্কের কাছে ফেলে রেখে যায় একদল দুষ্কৃতী। এই ঘটনাতেও মুখে কুলুপ আঁটে শাসক দল। ২০১৫ সালের হিসেবে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী গোটা দেশে প্রায় ৩৪৬০০ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। তার মধ্যে এই রাজ্যে ১১২৯টি। মহিলাদের ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রায় ৮২৭৪ এবং মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ ঘটেছে প্রায় ৩১১২৬টি।

গণশক্তি, ৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭                                                                



20170211

দিশাহীন, ভাঁওতাসর্বস্ব, দেউলিয়া বাজেট: সূর্য মিশ্র





শুক্রবার বিধানসভায় তৃণমূল সরকারের পেশ করা ২০১৭-১৮ সালের রাজ্য বাজেট সম্পর্কে এক প্রতিক্রিয়ায় সি পি আই (এম) পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক সূর্য মিশ্র বলেছেন:

‘‘একটা দিশাহীন, ভাঁওতাসর্বস্ব, দেউলিয়া বাজেট।

বেকার যুবক-যুবতীদের আগামীদিনে কর্মসংস্থান সম্পর্কে এই বাজেটে কোনও দিশাই দেখানো হয়নি। মুখ্যমন্ত্রী যে কর্মসংস্থান করার এত হিসেব দেন, সেসব কোথায় গেলো? এটা স্পষ্ট, ওঁর প্রতিশ্রুতির কোনও মূল্য নেই। সবই ভাঁওতা।

চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর লুটের টাকা উদ্ধার সম্পর্কেও কোনও কথা নেই এই বাজেটে।

আই সি ডি এস এবং আশা কর্মীদের ভাতা কিছুটা বাড়ানো হলেও তাঁদের অবসরের সময় এককালীন অনুদান দেওয়া এবং কাজের নিরাপত্তা সম্পর্কে, কর্মক্ষেত্রে যে আক্রমণ নেমে আসছে, সেগুলি মোকাবিলা করার কোনও কথা বলা হয়নি। ভাতা আংশিক বৃদ্ধি এই কর্মীদের ধারাবাহিক আন্দোলনের জয়। অন্যদিকে, অন্যান্য স্কিম ওয়ার্কাস বা প্রকল্পভিত্তিক কর্মীদের ভাতা বৃদ্ধি সম্পর্কে বাজেটে উচ্চবাচ্য করা হয়নি। প্যারা টিচার, এস এস কে, এম এস কে, সিভিক ভলান্টিয়ার্স ইত্যাদি কর্মীদের ভাতাবৃদ্ধি সম্পর্কে বাজেট নিশ্চুপ। বামফ্রন্ট সরকারের সময় যে সুবিধা এরা পেতেন, তা এখন পাচ্ছেন না। বামফ্রন্ট সরকার এই সমস্ত কর্মীদের কাজের নিরাপত্তা দিয়েছিল, ছাঁটাই না হওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছিল। একইসঙ্গে, নিয়মিত ভাতা বাড়ানো হচ্ছিলো। সেসব এখন হচ্ছে না।

রাজ্য সরকারী কর্মচারী, শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মচারীসহ অন্যান্য কর্মীদের যে বিপুল পরিমাণ মহার্ঘ ভাতা বকেয়া আছে, তার কী হলো? বাজেটে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
বামফ্রন্ট সরকার চলে যাওয়ার সময় রাজ্যের ওপর ঋণ ছিল ১লক্ষ ৮৬হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শুধু তৃণমূল সরকারের আমলে মাত্র ৬বছরেই ঋণ নেওয়া হচ্ছে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। বাজেটের বাইরে এবং পরিকল্পনা-বহির্ভূত যে বিপুল পরিমাণ খরচ করা হচ্ছে, তার জন্যই এইভাবে বেপরোয়া ঋণ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়ার জন্য ফসলের সহায়ক মূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিবীমা সম্পর্কে কোনও উল্লেখই নেই এই বাজেটে। বন্ধ কল-কারখানা, বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকদের জন্য কোনও কথা নেই। তফশিলী জাতি, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের কোনও দিশা দেখাতে পারেনি তৃণমূল সরকার। খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্পর্কেও কোনও বার্তা নেই।

আমরা এই বাজেটের তীব্র বিরোধিতা করছি।

শ্রমিক-কৃষক, বেকার যুবক-যুবতী, মহিলা, চিট ফান্ডে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারী, তফশিলী জাতি, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘুদের স্বার্থে, তাঁদের দাবিগুলি নিয়ে আমাদের লড়াই জারি থাকবে।’’


১০ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

রাজ্য বাজেটে মূল বিষয়গুলির উত্তর নেই, আছে অনেক বিভ্রান্তি


ড. অসীম দাশগুপ্ত

এবারের রাজ্য বাজেটে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরই উত্তর নেই, কিন্তু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা আছে। আমরা কিছু মূল বিষয় ও বিভ্রান্তির ওপর আমাদের বক্তব্য রাখছি।

১. কর্মসংস্থান
এই বাজেটে একেবারে শেষের পাতায় হঠাৎই বলা হয়েছে, এই ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে এ-রাজ্যে ১৩.২৭ লক্ষ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে (পৃঃ ৩৬)। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী সমগ্র দেশে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে ১.৫ লক্ষেরও কম। তাহলে এক‍‌টি রাজ্যে কিভাবে ১৩.২৭ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে? উত্তর নেই। এই বিষয়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হলো জানা যে, রাজ্যের কোন কোন ক্ষেত্রে (যথা, কৃষি, শিল্প, পরিষেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে) কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এই কর্মসংস্থান সৃষ্টির কোনো জেলাওয়াড়ি তথ্য আছে? পুনরায় উত্তর নেই। তাহলে এই ভিত্তিহীন এবং তথ্যহীন দাবিটি হঠাৎ বাজেটের শেষে একটা বিচ্ছিন্ন পংক্তিতে বলে বেকার যুবক-যুবতীদের মনে কেন এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলো?

২. শিল্পে বিনিয়োগ
কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অবশ্যই নির্ভর করে রাজ্যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি, এবং বিশেষ করে শিল্পের ক্ষেত্রে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের ওপর। এখানে লক্ষণীয় যে, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বে রাজ্য সরকারের প্রথম দুবছরের আর্থিক সমীক্ষারই ষষ্ঠ অধ্যায়ে ৬.৬ সারণির তথ্যাবলী অনুযায়ী, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ বছরে ২০১০ সালে যেখানে সংগঠিত শিল্পের ক্ষেত্রে ৩২২টি নতুন শিল্প সংস্থায় ১৫,০৫২ কোটি টাকা বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়ে উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়েছিল, সেখানে তৃণমূল সরকার আসার পর ২০১২ সালে নতুন চালু হওয়া শিল্প সংস্থার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ১২টিতে, এবং বাস্তবায়িত বিনিয়োগের পরিমাণও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়ায় ৩১২ কোটি টাকায়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এর ঠিক পরের বছরগুলি থেকে বর্তমান বছর পর্যন্ত রাজ্যের আর্থিক সমীক্ষায় এই সারণিটিই উধাও করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে একটি নতুন সারণি বা পরিচ্ছেদ এনে (এ-বছরে পরিচ্ছেদ ৮.৩) নির্মীয়মাণ শিল্প এবং নির্মিত শিল্প একত্রিত করে দেখানো হয়েছে, কিন্তু কত পরিমাণ বিনিয়োগ কত নির্মিত শিল্প সংস্থাতে বাস্তবায়িত হয়েছে তা কিছুতেই জানানো হচ্ছে না। এত গোপনীয়তা কেন?
উল্লেখ করা প্রয়োজন শিল্পে বাস্তবায়িত বিনিয়োগের তথ্য না থাকলে কিভাবে রাজ্যের মোট উৎপাদন বৃদ্ধির দাবি করা হচ্ছে, বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে?

৩. কর রাজস্ব আদায়
রাজ্যের কর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দাবি করা হয়েছে যে ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে ২০১০-১২ সালের তুলনায়, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণের সামান্য বেশি। কিন্তু যা বলা হয়নি, তাহলো, বামফ্রন্ট সরকারের শেষ পাঁচ বছরেও রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ১০,৮৮৮ কোটি টাকা থেকে ২১,২২৩ কোটি টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি। এটাও বলা হয়নি যে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই রাজ্যগুলিতে মূল্যযুক্ত কর (ভ্যাট) চালু হয়েছিল, যেখানে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের কমিটির নেতৃত্ব দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার, এবং যা প্রত্যেক রাজ্যেই কর রাজস্ব বৃদ্ধি ঘটিয়েছিল। এছাড়া, কর রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগ শুরু হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই। আত্মপ্রচারের তাগিদে তাও উহ্য রাখা হয়েছে এবারের বাজেট বিবৃতিতে।

৪. পরিকল্পনা ব্যয়
এই বাজেটে বলা হয়েছে রাজ্যের পরিকল্পনা খাতে ব্যয় ২০১০-১১ এর তুলনায় ২০১৬-১৭-তে ৪ গুণ বৃদ্ধি পেতে চলেছে। কিন্তু সম্পূর্ণ চিত্রটি একটু ভিন্ন। সাধারণত এরাজ্যে পরিকল্পনা ব্যয় প্রতি চার বছরের সময়ে দ্বিগুণের মতন বৃদ্ধি পায়। উদাহরণ হিসেবে, ২০০৯-১০ সালে রাজ্যে যে পরিকল্পনা ব্যয় ছিল ১২,১২১ কোটি টাকা, তা পরের চার বছরে ২০১৩-১৪ সালে প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি হয়ে দাঁড়ায় ২৪,১০৭ কোটি টাকায়। কিন্তু ঠিক তার পরের বছরেই অর্থাৎ ২০১৪-১৫ সালে রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়কে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে দেখানো হল ৪৪,০৪৪ কোটি টাকায়। এবং এখন আগাম বলা হচ্ছে ২০১৬-১৭ সালে তা বৃদ্ধি পাবে ৬ গুণ। এটা কি করে  সম্ভব হচ্ছে? আমরা জানি যে, কেন্দ্রীয় সহায়তাভিত্তিক প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ব্যয়ের একটি অংশ দেয় রাজ্য সরকার, এবং বাকিটা প্রদান করে কেন্দ্রীয় সরকার। উদাহরণ হিসেবে, যদি কোনো পরিকল্পনা ব্যয়ের ২৫% দেয় রাজ্য সরকার তাহলে বাকি ৭৫% দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় অর্থ সরকারের প্রদেয় এই অর্থ কেন্দ্রীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং রাজ্য সরকারের প্রদেয় অর্থটি  রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়ের অংশ হবে।। কিন্তু গত ২ বছর ধরে আমরা লক্ষ্য করছি যে কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া ৭৫% অর্থও রাজ্যের পরিকল্পনা ব্যয়ের ক্ষেত্রে যুক্ত করে দিয়ে এত বেশি পরিকল্পনা ব্যয় বৃদ্ধি দেখানো হচ্ছে। কিন্তু  পদ্ধতির এই পরিবর্তনের কথা রাজ্য সরকার খোলাখুলি বলছেন না কেন? খোলাখুলি না বলে, উহ্য রেখে নিজেদের কৃতিত্ব হিসেবে দেখাতে চাইছেন কেন?

৫. রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝা
এই বাজেটে বলা হয়েছে, ২০০৬-০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার যে ঋণ নিয়েছিল ১০ বছর পরে এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে ইত্যাদি। আমরা বারংবার বলেছি যে রাজ্য সরকারের ঋণের বোঝার মূল কারণ হলো, স্বল্প সঞ্চয় সংক্রান্ত ঋণ। স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্প রাজ্য সরকারের নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প। এই প্রকল্পে যে নিয়ম কেন্দ্রীয় সরকার স্থির করেছে, তাহলো কোনো একটি বছর রাজ্যের সাধারণ মানুষ স্বল্প সঞ্চয় প্রকল্পে যে অর্থ জমাবেন, তার ৮০% অর্থ বাধ্যতামূলকভাবেই রাজ্য সরকারের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে খুব চড়া সুদে। যেহেতু স্বল্প সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে এরাজ্যের স্থান হয়েছিল প্রথম, তাই কেন্দ্রের নিয়মে এই খাতে চাপানো ঋণই বড় বোঝা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর। এই ঋণের বিষয়ে রাজ্য সরকারের কোনো যোগ নেই, তাই কেন্দ্রের এই চাপানো ঋণের বিরুদ্ধে সমস্ত রাজ্যই বারংবার দাবি জানিয়েছে। ত্রয়োদশ অর্থ কমিশন বিষয়টি বিবেচনা করা দরকার বলার পরও এই ঋণের বোঝা রয়েই গেছে। এই ঋণের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এর মূলধনের অংশটি ফেরত দিতে হয় ছবছরের পর থেকে, এবং ২০ বছর ধরে। এই বিষয়টি কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির সংশ্লিষ্টসকলেই জানে, এবং তৃণমূল সরকারেরও জানা উচিত কারণ এই কেন্দ্রীয় নিয়মগুলি যখন লাগু করা হয় তখন তারাও কেন্দ্রীয় সরকারের অংশীদার। এই প্রেক্ষিতটা না বলে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার মানে হলো, হয় এই তৃণমূল সরকার এর প্রেক্ষিতটা জানে না, অথবা জানলেও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

৬. চিট ফান্ডের প্রসঙ্গ
যখন কালো টাকা উদ্ধারের কথা উত্থাপিত হয়েছে, তখন মনে রাখা উচিত, নিয়ম ভেঙে চিট ফান্ডগুলির লুট করা টাকা এবং তাদের থেকে পুনরায় ভাগ বসানো অর্থ উভয়ই হলো কালো টাকা। এই মোট কালো টাকা  উদ্ধার করে সঞ্চয়ীদের কাছে ফেরত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকদেরও (দুটি স্তরেই) শাস্তি প্রদানের বিষয়টিতে বিস্ময়করভাবে একেবারে নীরব থেকে গেছে এই রাজ্য বাজেট।

৭. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়
আই সি ডি এস প্রকল্পের ক্ষেত্রে কর্মীদের সহায়তা করার প্রসঙ্গে বলা উচিত, অসংগঠিত অন্যান্য ক্ষেত্রেও এই সমস্ত-কর্মীদের (আই সি ডি এস, অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী, শিশু শিক্ষাকেন্দ্র, মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্রের সহায়িকা ও সম্প্রসারিকা এবং অন্যান্যদেরও)  ভাতার বিষয়ে একটি নতুন প্রকল্প চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার, যেখানে সহায়তা প্রদানের পরিমাণ প্রতি ৩ বছর অন্তরই বৃদ্ধি পাবে।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি যে প্রশ্ন উঠছে, বিশেষ করে সরকারি কর্মী ও অন্যান্যদের পক্ষ থেকে, তাহলো বামফ্রন্ট সরকারের আমলে বছরে যে অন্তত দুবার মহার্ঘ ভাতা প্রদান করা হতো তার কী হলো? এছাড়া, যে রাজ্য বেতন কমিশন গঠিত হয়েছে তারাই বা কবে সুপারিশ জমা দেবে এবং রাজ্য সরকারই বা কবে সিদ্ধান্ত নেবে? এই বিষয়গুলির ওপর কোনো উত্তর নেই এই বাজেটে, এবং নেই কোনো বাজেট বরাদ্দের ইঙ্গিতও।


গণশক্তি, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

20170204

বাজেটেও জুমলা

 

সীতারাম ইয়েচুরি

বাজেটেও জুমলা। প্রধানমন্ত্রী, বি জে পি সভাপতির মতো অর্থমন্ত্রীও বাগাড়ম্বরেই মত্ত। মঙ্গলবার পেশ করা আর্থিক সমীক্ষায় স্পষ্টই বলা হয়েছে নোট বাতিলের ধাক্কায় অর্থনৈতিক বিকাশের হার কমবে। তা ৬.৫শতাংশের মতো হবে। অর্থনীতি শ্লথ অবস্থায় চলছে। আর্থিক সমীক্ষায় বলা হয়েছে বিশ্ব সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতকে তাকাতে হবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির দিকে। তার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বুধবারের বাজেট ঠিক উলটো পথে হাঁটলো। চাহিদা ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার সম্প্রসারণের বদলে সংকোচন করা হয়েছে। বাজেটের মোট আয়তনই কমে গেছে। বাজেটের মোট আয়তন গত আর্থিক বর্ষে ছিলো মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ১৩.৪শতাংশ, তা এবারে কমে হয়েছে ১২.৭ শতাংশ। রাজস্ব ব্যয় কমেছে। অরুণ জেটলি দাবি করেছেন পরিবহন-সহ পরিকাঠামোয় উন্নয়ন ঘটানো হবে, তার ফলে কর্মসংস্থান বাড়বে। অথচ প্রকৃত হিসেবে দেখা যাচ্ছে মূলধনী ব্যয় কমে গেছে। গত বছরে যা ছিলো ১.৮৬শতাংশ, এবারে রেলকে ঢুকিয়েও তা ১.৮৪শতাংশ। রেলকে বাদ দিলে মাত্র ১.৫১শতাংশ। চাহিদা কোথা থেকে বাড়বে?

অর্থনৈতিক সমীক্ষা এবং জাতীয় লেবার ব্যুরোর সমীক্ষায় দেখা গেছে শ্রমনিবিড় ৮টি ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান অন্তত ৫৫ হাজার কম কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে যদি মূলধনী ব্যয় কমে তাহলে কর্মসংস্থান আরো সংকটে পড়বে।

রেগার হিসেব দেখলেও বোঝা যাচ্ছে বরাদ্দ আদৌ বাড়েনি। মুদ্রাস্ফীতির হিসাব ধরলে রেগার বরাদ্দ যা ছিলো তা-ই রয়ে গেছে। বাগাড়ম্বরই সার, গ্রামীণ কর্মসংস্থানের এই প্রকল্পও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সরকার দাবি করছে কোষাগারীয় ঘাটতি কমিয়ে আনা হয়েছে। যদিও অর্থমন্ত্রী ভাষণে যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন আর বাজেটের নথিতে যা লেখা আছে তা পৃথক। কোষাগারীয় ঘাটতি কমেছে কীভাবে? পেট্রোপণ্যে অন্তঃশুল্ক থেকে। আন্তর্জাতিক বাজারে যখন তেলের দাম কমেছে, তখন অন্তঃশুল্কের কারণেই ভারতে তা বেড়েই চলেছে। এ থেকেই সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব আয় বাজেট অনুমানের তুলনায় কম হয়েছে। এও প্রমাণ করছে অর্থনীতিতে সংকোচন চলছে। এখন রাজস্ব ঘাটতি পূরণ করতে জনগণের ওপরে বোঝা চাপানো হচ্ছে। প্রায় ৬০হাজার কোটি টাকার বোঝা চাপানো হয়েছে।

নোট বাতিলের পূর্ণ ফলাফল এখনও বোঝা যায়নি। তা আরো প্রভাব ফেলবে। সরকার ব্যাঙ্কের জন্য মায়াকান্না কাঁদছে। ১১লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ রয়েছে কর্পোরেটের কাছে। তা আদায় করার জন্য কেন্দ্রের কোনো উদ্যোগ নেই। যাঁরা বিদেশে পালিয়েছেন শুধু তাঁদের কথা বলা হচ্ছেদেশের মধ্যে থেকেই বহাল তবিয়তে মুনাফা করে চলেছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য কী ব্যবস্থা? বরং কর্পোরেটদের জন্য রাজস্ব ছাড়ের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

সরকারের উদ্দেশ্য দেশি-বিদেশি পুঁজিকে ছাড় দেওয়া। এফ আই পি বি ছিলো বিদেশি বিনিয়োগের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য। তা তুলে দেওয়া হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় পথে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই বাড়ছিল। এখন আর বিদেশি পুঁজির জন্য কোনো নিয়ন্ত্রণই রইলো না। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বিদেশি স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। বিদেশি বেসরকারি পুঁজি এবার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও কিনবে।


সীতারাম ইয়েচুরি সি পি আই (এম)-র সাধারণ সম্পাদক 

সাধারণ মানুষের সমস্যা প্রশমনে ব্যর্থ এই কেন্দ্রীয় সরকার

ড. অসীম দাশগুপ্ত

কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। নোট বাতিলের পর এই কেন্দ্রীয় বাজেটের দিকে তাকিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু কী পাওয়া গেল এই বাজেট থেকে? আশার বাণী ছাড়া আর কিছু কি মিলবে? নাকি বাড়বে সাধারণ মানু‍‌ষের ওপর বোঝা? সেই বিশ্লেষণই রয়েছে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদের কলামে।

গণশক্তি, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

কেন্দ্রীয় বাজেট শুধুমাত্র সর্বভারতীয় স্তরে ভারত সরকারের আয় ও ব্যয়ের যান্ত্রিক হিসেব নয়। এই হিসেবের পিছনে যে লক্ষ্যগুলি আছে তা সাধারণ মানুষ জানতে চান, এবং জানতে চান স্বচ্ছতার সঙ্গে। বুঝে নিতে চান এই বাজেটের মাধ্যমে তাঁদের সমস্যাগুলির কতটুকু প্রশমন সম্ভব হবে।

এই সমস্যাগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা জ্বলন্ত হলো বেকারত্বের সমস্যা। বি জে পির নেতৃত্বে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার গত প্রায় তিন বছর ধরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, প্রতি বছর সমগ্র দেশে নতুন করে অতিরিক্ত ২ কোটি বেকার যুবক-যুবতীর কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু এই সময়কালেই কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রম মন্ত্রকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী গত তিন বছরে প্রতি বছরে বাস্তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অনেক কম৫ লক্ষেরও কম, এবং বর্তমান বছরে, বিশেষ করে এই কেন্দ্রীয় সরকারের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের পর কৃষি, অসংগঠিত শিল্প এবং ‍‍‌ছোট ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই কর্মসংস্থানের পরিমাণ আরো হ্রাসপ্রাপ্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৫ লক্ষের মতো। তাই এই কেন্দ্রীয় বাজেটে উচিত ছিল প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ২০১৬-১৭ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপযুক্ত লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা এবং সেই লক্ষ্যমাত্রাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃষি, শিল্প ও পরিষেবার ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্যমাত্রা ভেঙে ভেঙে দেখানো, এবং বাজেটে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কি কি পদক্ষেপের মাধ্যমে তা অর্জন করা সম্ভব, তাও স্বচ্ছতার স‍‌ঙ্গে বলা। কিন্তু এই বাজেটের কোথাও এই লক্ষ্যমাত্রা বা পরবর্তী পদক্ষেপগুলির উল্লেখ নেই। অর্থাৎ নোট বাতিলের মাধ্যমে বেকারত্বের এই সমস্যাটির আরও ব্যাপকভাবে সৃষ্টি করার পর তা প্রশমনের সম্বন্ধে উপলব্ধি করতেই ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকারের এই বাজেট।

এই বছরে আরেকটি বাড়তি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের কারণে। যেহেতু এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় (৮ই নভেম্বর, ২০১৬) বলা হয়েছিল এই পদক্ষেপের পিছনে প্রধান কারণ কালো টাকা উদ্ধার করা, তাই এই সিদ্ধান্তের ফলে শুধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে তাই নয়, প্রতিদিন ব্যাঙ্ক এবং এ টি এমের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়েছেন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ এবং মারাও গেছেন ১০০জনের বেশি ব্যক্তি। তাই এই বাজেটে উচিত ছিল যে, যার জন্য মানুষের এত ক্ষতি স্বীকার সেই কালো টাকার কত পরিমাণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে তা সুস্পষ্টভাবে জানানো এবং কত দিনের মধ্যে নগদ টাকার চাহিদার এবং জোগানের মধ্যে ভারসাম্য স্বাভাবিক হবে, তারও নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া। কিন্তু এই দুটি প্রশ্নেরই কোনো উত্তর পাওয়া গেল না এবারের বাজেটে।

বর্তমান এই বাজেট পেশ করার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকেই প্রত্যাশা সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, সমস্ত দরিদ্র মানুষের জন্য একটি ন্যূনতম আয়ের সংস্থানের প্রকল্পের কথা চিন্তা করা। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত এবছরের আর্থিক সমীক্ষা (২০১৭, পৃঃ ১৭৩-১৯৫)তে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অন্তত পরীক্ষামূলকভাবে এই প্রকল্প চালু করা হোক, অথবা অন্তত আলোচনার জন্য পেশ করা হোক। যেহেতু অর্থমন্ত্রকই এই সমীক্ষার দায়িত্বে থাকে, তাই অর্থমন্ত্রীর বাজেট বিবৃতিতে কোথাও এই প্রকল্পের উল্লেখ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু দেখা গেল এর কোনো উল্লেখই নেই। অর্থাৎ বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের একটি মন্ত্রকের ভিতরেই রয়েছে সমন্বয়হীনতা।

প্রতি বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে মোট ব্যয়কে পরিকল্পনা খাতে ব্যয় (অর্থাৎ নতুন প্রকল্পগুলির জন্য ব্যয়) এবং পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে (অর্থাৎ চালু প্রকল্প, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বেতন ইত্যাদি খাতে ব্যয়) আলাদা করে দেখানো হতোএবং এটাই উচিত। এবারই প্রথম দেখা গেলো পরিকল্পনা এবং পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে ব্যয়কে মিশিয়ে দেখানো হয়েছে। এরফলে শুধু নতুন প্রকল্পগুলির ব্যয়ের আলোচনার গুরুত্ব কম হয়েছে তাই নয়, বাড়তি অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে যে আগেকার বছরগুলির সঙ্গে আগামী বছরের পরিকল্পনা খাতে বাজেট বরাদ্দ সঠিকভাবে তুলনাই করা যাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এবারের বাজেটে দেখা গেল, প্রত্যেকটি মন্ত্রকের ক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ সম্পূর্ণভাবে উল্লেখ না করে কতকগুলি মন্ত্রকের বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রেই বাজেট বরাদ্দ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রেও বলা প্রয়োজন যে, কর্মসংস্থানের বিষয়ে প্রকল্প হিসেবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ যে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প, সেখানে বর্তমান বছরে যে বরাদ্দ ছিল ৪৭,৪৯৯ কোটি টাকা তার থেকে আগামী বছরে অত্যন্ত সামান্য বৃদ্ধি করে বরাদ্দ হয়েছে মাত্র ৪৮,০০০ কোটি টাকা। অন্যান্য কর্মসংস্থান প্রকল্পের ক্ষেত্রেও একইভাবে বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে অনুরূপভাবে সামান্য। অর্থাৎ বি জে পি-র আমলে যেখানে বেকারত্বের বৃদ্ধি হয়ে তীব্রভাবে, এবং বিশেষ করে বর্তমান বছরে, সেখানে এই বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিষয়টিকে গুরুত্বই দেওয়া হলো না।

এই প্রসঙ্গে অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার যে এই প্রথম রেল বাজেটকে সাধারণ কেন্দ্রীয় বাজেটের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরফলে ভারতীয় রেলের প্রত্যেকটি রাজ্যের যে সুবিধা অসুবিধা তা উল্লেখ করার কোনো জায়গাই থাকলো না এই বাজেটে।

এছাড়া, এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের করদাতাদের ছাড়ের হিসেব যেখানে মোট ২০,০০০ কোটি টাকা, সেখানে তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা হিসেবে চাপবে প্রায় ৭৫,০০০ কোটি টাকার পরোক্ষ কর। অর্থাৎ, এই বাজেটের আয় ও ব্যয়ের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে তা একত্রিত করলে আপেক্ষিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ মানুষ।


সর্বোপরি, এবারের বাজেটে কোনো উল্লেখ নেই যে, প্রতি বছর মোট কর ছাড়ের মাধ্যমে যে ৫ লক্ষ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় কম থাকছে তার একটি অংশও আদায় করা গেলে সাধারণ মানুষের স্বার্থে কর্মসংস্থানের প্রকল্পগুলির জন্য আরও পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত, এবং সকলের জন্য ন্যূনতম আয়ের প্রকল্পটিও, কিছুটা হলেও, শুরু করা যেত।

20161207

#Demonetization কালো টাকা উদ্ধার, নাকি সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা?

#Demonetization

গত ৮ই নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি ৫০০, ১০০০ টাকার নোট বাতিলের ঘোষণা করেন টেলিভিশনে। শুরু হয়ে যায় দেশজুড়ে অস্থিরতা। কোটি কোটি মানুষ ব্যাঙ্কের সামে দীর্ঘ লাইন দিতে বাধ্য হন ঘন্টার পর ঘন্টা। ৮৬শতাংশই মুদ্রাই ছিলো ওই দুই নোটে। ভারতের মতো নগদ-নির্ভর অর্থনীতিতে এই ধাক্কা  বিরাট। কার্ড, ডিজিটালের মতো অ-নগদ পদ্ধতিতে লেনদেন হয় মাত্র ৮শতাংশ। সরকারের প্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট ১৭বার নিয়ম পরিবর্তনের ঘটনাতেই। উপরন্তু পুরনো নোট বাতিল হলেও নতুন নোট জোগানে ব্যর্থতা সংকট বাড়িয়ে তুলছে।

ভারতের অর্থনীতিতে কালো টাকার দাপট অনেক দিন ধরেই। কালো টাকা উদ্ধারে কঠোর ও আন্তরিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে অবশ্যই তা সমর্থনযোগ্য। কিন্তু নোট বাতিলের এই পদ্ধতিতে কি আদৌ কালো টাকা উদ্ধার হবে, নাকি জনগণের ওপরে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক বিরাট অর্থনৈতিক দুর্দশার বোঝা?

কালো টাকা কাকে বলে?

সব টাকাই বা নোট হলো সাদা টাকা। যখন টাকা আয় বৈধভাবে করা হয় না বা আয় নিয়ে বৈধ কর দেওয়া হয় না সেটাই হয় কালো টাকা (বলা ভালো কালো সম্পদ)। শুধু প্রত্যক্ষ কর নয়, পণ্য কেনা বেচায় বৈধ কর না দিয়ে যে আয় করা হয় সেটা কালো টাকা। সরকারের প্রাপ্য বা সাধারণ মানুষের টাকা প্রতারণা করে গায়েব করা টাকা হলো কালো টাকা। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে কালো টাকার ৮০% মজুত করে বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানি যার বিরাট অংশই তারা বিদেশে পাচার করে ব্যাঙ্কে জমা রাখছে। এই কালো টাকা কোম্পানিগুলি আয় করে উৎপাদিত পণ্য কম দেখিয়ে, শ্রমের ব্যবহার বেশি দেখিয়ে বাড়তি সুযোগের রফা করে, মুনাফা কম দেখিয়ে, কর কম দিয়ে। কালো টাকা পাচারের বড় পথ হলো আমদানি রপ্তানি কারবারের লেনদেনের হিসাবে কারচুপির করা। মোদী সরকার বা তার আগের সরকার কেউ এই মুখ্য অপরাধী কর্পোরেটদের বিরুদ্ধে  কোন উদ্যোগ নেয়নি।

দেশে কত কালো টাকা আছে ?

বিভিন্ন বিশেষজ্ঞরা ও কমিটি দেশে কত কালো টাকা আছে তার অনুমান করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু বিষয়টি গোপন তার পুরো সঠিক হিসাব এখনো সম্ভব হয়নি। তবে কিছু হিসাবে বলা হচ্ছে দেশের অর্থনীতির মোট টাকার ২০%থেকে ৬৬% হলো কালো টাকা। বর্তমানে ২০১৫-১৬ সালে ভারতের জিডিপির পরিমাণ হলো আনুমানিক ১৩৬ লক্ষ কোটি টাকা। এতে কালো টাকার পরিমাণ হবে ২৭লক্ষ কোটি টাকা থেকে ৯০ লক্ষ কোটি টাকা।


এই কালো টাকা কি ৫০০ বা ১০০০টাকার নোটে মজুত করে রাখা হয়?

নগদে কালো টাকার সম্পদের মজুত আছে বড়জোর ৩-৫%। সংবাদ মাধ্যমে কেন্দ্রের তরফে দাবি করা হয়েছে নোট বাতিলে উদ্ধার হবে ৪ থেকে ৬লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ যদি সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়িতও হয় এত নিজের পিঠ নিজে চাপড়ে, বাগাড়ম্বর করেও আসলে ৯৫ থেকে ৯৭শতাংশ কালো সম্পদই এই প্রক্রিয়ার বাইরে থাকছে।
 
সব কালো টাকা বস্তায় বা বেনামি অ্যাকাউন্টে জমা রয়েছে বা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে যে প্রচার চলছে তা-ও ওই ৩-৪%র মধ্যেই। তা-ও সংগৃহীত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম ধনীদের কাছ থেকে। সরকার ১০০০টাকার নোটে কালো টাকা মজুত হয় বলে তা বাতিল করলো আবার উলটে ২হাজার টাকার নতুন নোট  চালু করলো। এর কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হলো না। কালো টাকার বড় বড় রাঘব বোয়ালদের আসলে ধরাই হলো না।

কোথায় আছে কালো টাকা ?

দেশে ও বিদেশে কালো টাকা রোধে পদক্ষেপ নিয়ে কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রকে একটি রিপোর্টও জমা আছে। ২০১২ সালে অর্থমন্ত্রকের বিশিষ্ট অফিসার ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত কমিটি ঐ রিপোর্ট পেশ করে। তাতে কমিটি জানিয়েছে, নোট বাতিল কালো টাকার সমস্যার কোন সুরাহা করবে না। বেশি কালো টাকা এতে উদ্ধার হবে না। কারণ কালো টাকা নোটে নয় মজুত আছে বেনামে সোনার বার, অলংকার, জমি, বাড়ি সহ নানা সম্পত্তিতে। সুইস ব্যাঙ্কে দেশের যাদের বিপুল টাকা জমা রয়েছে এরকম ৬৮০ জনের অ্যাকাউন্টের তালিকা রয়েছে কেন্দ্রের কাছে। উইলিকস-পানামার সংবাদপত্রে দেশের ধনীদের কার কার বিদেশে বিভিন্ন সংস্থায় শেয়ারে টাকা জমা আছে তার তালিকা প্রকাশ হয়েছে। কেন্দ্রের কাছে তার তালিকাও আছে। যেসব দেশে কর ছাড়ের সুযোগ রয়েছে সেখানে বিদেশি ব্যাঙ্কে দেশের ধনীরা  যারা টাকা জমা রেখেছেন সেই বেআইনি  টাকা উদ্ধারের উদ্যোগ নিচ্ছে না কেন্দ্র। সেসব দেশ ভারত সরকারকে সহযোগিতা করতে রাজি হলেও সে টাকা উদ্ধারের কোন পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। উলটে সে কালো টাকা সরকারের সাহায্যে ঘুরপথে দেশে চলে আসছেতাকে সরকার থেকে আবার আইনি বৈধতা দেওয়া হচ্ছে।

নোট বাতিলে জাল নোট বন্ধ হবে?

হবে না। দেশের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা এন আই এ (জাতীয় তদন্ত সংস্থা) কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটকে এ সংক্রান্ত একটি সমীক্ষার দায়িত্ব দিয়েছিল। অর্থনীতিতে কত অংশে জাল নোট ঘুরছে তার রিপোর্ট দেয় তারা। এন আই এ-র পাশাপাশি অন্য বিভিন্ন তদন্ত সংস্থা যার মধ্যে রয়েছে সি বি আই, আই বি, ডি আর আই, ‘এবং রাজ্যগুলির পুলিশের থেকে তথ্য নেওয়া হয়। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রতি ১০লক্ষ টাকার মধ্যে ২৫০টাকা মূল্যের জাল নোট থাকে। শতাংশে ০.০২৫। সরকার নিজেও সংসদে এই তথ্যই পেশ করেছে। সমীক্ষায় স্পষ্ট বলা হয়, জাল নোট বাজেয়াপ্ত করার জন্য চালু ব্যবস্থাই যথেষ্ট।
যে কোনো মানুষ বোঝেন, জাল নোটের কারবার যারা করে তাদের ধরা না গেলে নতুন নোট ফের জাল করা হবে। জাল নোটের কারবার রুখতে ১৪লক্ষ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেওয়া আজগুবি ব্যাপার।

বন্ধ হবে সন্ত্রাসবাদ?

আমরা সকলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু, সন্ত্রাসবাদীরা টাকার থলি নিয়ে ঘুরে বেড়ায় না। সন্ত্রাসবাদের জন্ম দেয় যে পরিস্থিতি, যে রাজনীতি তা থেকে নজর সরানো অনুচিত। একটি ঘটনা লক্ষ্য করুন। কাশ্মীরে নিহত দুই সন্ত্রাসবাদীর কাছে পাওয়া গিয়েছে নতুন ২০০০টাকার নোট। নোট বন্ধ বা চালু করে নয়, সন্ত্রাসবাদীদের কাছে টাকাটা যাওয়ার পথ বন্ধ হওয়া দরকার।

সরকার বলছে, বিরাট লাভের জন্য সামান্য লোকসান। একথা কি সত্যি?

এখন পর্যন্ত আমাদের কমপক্ষে ৭১জন সহনাগরিকের মৃত্যু হয়েছে নোট বাতিল ঘোষণার জেরে। পুরানো নোট নার্সিংহোমে না নেওয়ায় মৃত্যু হয়েছে শিশুর। আরেক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাবার কোলে ব্যাঙ্কের লাইনে থাকার ধকল নিতে না পেরে।
প্রধানমন্ত্রী সীমান্তে জওয়ানদের তুলনা টানছেন। বলছেন তাঁরা যদি সীমান্তে বিনিদ্র রাত কাটাতে পারেন তাহলে আমরা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়াতে পারব না কেনজওয়ানদের অনেকে কিন্তু কৃষকসন্তান। আজকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক এবং কৃষিজীবী মানুষ। কৃষকরা তাঁদের ফসল মান্ডিতে আনলেও বিক্রি হচ্ছে না। দূরের ব্যাঙ্কের শাখায় লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তাঁরা। এখন তাঁরা লাইন দিচ্ছেন সরকারি বীজ সরবরাহের দোকানে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন, রবিশস্যের চাষের কী হবে। ফসল তোলার সময়ে সঙ্কট নেমে এসেছে গ্রাম ভারতে। এই অবস্থায় জওয়ানরা খুশি থাকতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী জোয়ানদের জন্য মেকি দরদ, মেকি জাতীয়তাবাদ দেখাচ্ছেন।
বিপুল অংশের মানুষের জীবিকা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অর্থনীতির বিপুল অংশ নগদের ভরসায় চলে। পুরো থমকে গিয়েছে অর্থনীতির এই অংশের লেনদেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কম মজুরির অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মানুষরা, যারা মজুরি পান নগদে। ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের হিসেব, শ্রম নিবিড় ক্ষেত্রে এর মধ্যেই কাজ হারিয়েছেন ৪লক্ষ শ্রমিক। বস্ত্র, চামড়া, অলঙ্কারের মতো শিল্পেই কেবল ৬০লক্ষ মানুষ বেতন পাননি। বাগিচা শিল্পে তীব্র সংকটে আরো ২০লক্ষ শ্রমিক। অন্য রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া পরিযায়ী শ্রমিকরা কাজ খুইয়ে দলে দলে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষি, খুচরো ব্যবসা ও নির্মাণেই দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ যুক্ত। ক্ষতি তাদেরই সর্বাধিক।
ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘট ডাকলে যারা অর্থনীতির লোকসানের হিসেব দিতে উঠেপড়ে নামে তারা এখন চুপ। দিনের পর দিন কাজ বন্ধ হয়ে বিপুল লোকসানে তাদের চোখ বন্ধ।


প্রধানমন্ত্রীর দাবি এই পদক্ষেপ গরিবের জন্য। কথাটা কি ঠিক?

গরিবের স্বার্থে বলাটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটেমোদী সরকার তার সরকারের প্রথমার্ধ  কাটিয়েছে কেবল তথাকথিত ব্যবসা মসৃণ করারকাজে। দেশি-বিদেশি বড় পুঁজির মালিকের স্বার্থ দেখেই এতটা সময় কাটিয়েছে মোদী সরকার। এখন সরকার জোর করে সাধারণ মানুষকে ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখতে বলছে কিন্তু তা তাদের প্রয়োজনমতো তুলতে দিচ্ছে না।  সরকার বলেছিলো কালো টাকা উদ্ধার করে প্রতি অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা জমা দেবে। তা আজ তামাশার পর্যায়ে চলে গেছে। তার বদলে নিজের টাকা তুলতে গেলে হাতে লাগছে কালো কালি।
সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষ। অনেকেই সমবায় ব্যাঙ্কে তাদের টাকা রাখেন। এখন সরকার সেখানেই পুরানো নোট বদল বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে গ্রাম ভারতে লেনদেন বন্ধ হয়ে চরম সংকট নেমে এসেছে।

আসলে অতি-ধনীদের সাহায্য করা হচ্ছে

গরিবদের সাহায্য দূরের কথা, বড় ব্যবসায়ী এবং ধনীদের ঋণ মাফ করে দেওয়ার নির্দেশিকা আসলে ব্যাঙ্কে ব্যাঙ্কে পাঠিয়েছে দেশের সরকার। এই অংশের থেকে ব্যাঙ্কগুলির পাওনা ১১লক্ষ কোটি টাকার বেশি। একজন কৃষক বা ছাত্র বা ছোট দোকানদার ধার নিলে সুদসহ তা ফেরত না দিলে ব্যাঙ্ক নোটিস পাঠায়, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে, জেলেও পাঠায়। এই সরকার কোনো একজন বড় ব্যবসায়ী ঋণখেলাপিকে শাস্তি দিয়েছে? বরং, এই সময়ে বড়লোকদের ২লক্ষ কোটি টাকা ধার মকুব করে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি এই অনাদায়ী ঋণের ভারে সম্খটগ্রস্ত। এখন নোট অচলের ঘোষণার মাধ্যমে মানুষকে টাকা জমা রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে ব্যাঙ্কে। ফলে, ব্যাঙ্কে বড়লোকদের অনাদায়ী ঋণ, ধার মকুব করার লোকসান অংশত মেটানোর চেষ্টা হচ্ছে সাধারণ মানুষের এই টাকা দিয়েই। অতি-ধনী ঋণখেলাপিদের আবার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

এই সমস্যা কি সাময়িক?

লোকসানের বহর কতো সঠিক হিসেব করে ওঠা মুশকিল। কিন্তু, কিছু বেসরকারি সমীক্ষা যে হিসেব দিচ্ছে তা চমকে দেয়ার মতো। অ্যাম্বিট ক্যাপিটালের হিসেব, ২০১৬-১৭অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ভাগে মোট জাতীয় উৎপাদন ০.৫শতাংশ কমবে। সারা বছরে এই হার দাঁড়াবে ৩.৫শতাংশে। ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে বৃদ্ধির হার হবে মাত্র ৫.৮শতাংশ। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি-র হিসেব, স্বল্পমেয়াদেই লোকসানের অঙ্ক ১.২৮লক্ষ কোটি টাকা। মানে, প্রত্যেক ভারতীয়ের ১০০০টাকা করে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে গরিবদের উপর যাঁরা নগদ অর্থনীতির ওপর বেশি নির্ভর করেন।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি জানাচ্ছে, অর্থনীতি সংকোচনের ফলে যে প্রভাব পড়বে তার তুলনায় বেআইনি অর্থনীতিতে প্রভাব সামান্যই। মানে, গরিব এবং সাধারণ মানুষের ওপর বিপুল ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। অথচ, কালো টাকা উদ্ধারে প্রভাব সামান্য। দেশে মন্দা, কর্মসংস্থানের সঙ্কট দীর্ঘস্থায়ী চেহারা নিতে পারে।

মোদী এবং বি জে পি যে ব্যাপারে চুপ

দুর্নীতির সবচেয়ে জঘন্য চেহারা রাজনৈতিক দুর্নীতি। কালো টাকার মালিক, ব্যবসায়ী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের চক্র। প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে চুপ। সুপ্রিম কোর্টে বিষয়টিতে একটি মামলা চলছে। ২০১৩-তে সি বি আই দুই শিল্পগোষ্ঠী বিড়লা এবং সাহারায় তল্লাশি চালায়। কাগজপত্রে পাওয়া যায় রাজনীতিবিদদের তালিকা সঙ্গে টাকার অঙ্কের উল্লেখ। বিড়লা ২৫কোটি টাকা এবং সাহারার ৫৫কোটি টাকা দুই তালিকায় পাওয়া যায় গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীরউল্লেখ। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী কে ছিলেন? সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, আবেদন গ্রহণ করার জন্য আরো কাগজপত্র দিতে হবে।
৮ই নভেম্বর ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। কলকাতায় তারা আগেই বি জে পি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোটে কোটি টাকা জমা করে। বিহারের মতো বিভিন্ন রাজ্যে হঠাৎই বিপুল পরিমাণে জমি বা অন্য সম্পত্তি কিনেছে বি জে পি। দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নামেই এই সম্পত্তি কেনা হয়েছে। এসব কি কাকতালীয়? বাছাই করা কেউ কেউ যে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত আগাম জানতেন, তার ইঙ্গিত মিলছে। এই কারণেই যৌথ সংসদীয় কমিটি গড়ে তদন্তের দাবি জানাচ্ছে সি পি আই (এম)।

সরকার এই পদক্ষেপ নিলো কেন?

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ডেপুটি গভর্নর কে সি চক্রবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় বলেছিলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে প্রবল ব্যর্থতা থেকে চোখ ঘোরাতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেবল কালো টাকা ফেরানোয় ব্যর্থতাই নয়। তার মধ্যে রয়েছে কাজ, খাদ্য সুরক্ষায় ব্যর্থতা।
অনেকেই মনে করেন গোটা বিষয়টি বিশেষ করে কয়েকটি রাজ্যে আসন্ন ভোটের সঙ্গে জড়িত। এর আগে আর এস এস উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রচারের বিরোধিতা করলেই দেশবিরোধী বলেছে। এবার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তে প্রশ্ন তুললেই তাদের দেশদ্রোহী বলে ঘৃণা ছড়ানোর প্রচারে নামা হয়েছে। প্রচারের মাধ্যমে উন্মাদনা ছড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা যায় না।

দাবি কী

বামপন্থী দলগুলির দাবি ৫০০ ও ১০০০টাকার নোট অন্তত ৩০শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতে দেওয়া হোক। যতক্ষণ পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা যাচ্ছে না, নতুন নোটের যথেষ্ট যোগান হচ্ছে না ততদিন সাধারণ মানুষকে বৈধ লেনদেন করার অনুমতি দেওয়া হোক।
শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ও মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষকদের ঋণ মকুব করতে হবে। সমবায় ব্যাঙ্কে পূর্ণাঙ্গ লেনদেনের অনুমতি দিতে হবে। কৃষি উপকরণ কেনায় অসুবিধা দূর করতে হবে।
ব্যাঙ্কে ১১লক্ষ কোটি অনাদায়ী ঋণ বড়লোকদের থেকে আদায় করতে হবেবিদেশী ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখা আমানতকারীদের তালিকা ঘোষণা করতে হবে। করফাঁকির স্বর্গ এমন দেশগুলির সঙ্গে দ্বৈত কর রদ চুক্তি বাতিল করতে হবেসাহারা-বিড়লা তদন্তে মেলা তথ্যের পূর্ণ তদন্ত করতে হবে 
নোট বাতিলে দুর্দশার জেরে যাঁরা প্রাণ হারালেন তাঁদের পরিবারকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, যাঁদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাঁদেরও দিতে হবে ক্ষতিপূরণ।   
 

পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল ও সরকারের ভূমিকা কী?

এরাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস নিজেরাই বেআইনী চিট ফান্ডের সুবিধাভোগী বলে অভিযুক্ত। রাজ্যের প্রায় ২৫লক্ষ মানুষকে প্রতারণা করে সারদা ও অন্য কয়েকটি চিট ফান্ড যে টাকা যোগাড় করেছিল তা শাসক নেতাদের পুষ্ট করেছে বলে অভিযোগ। রাজ্য সরকার চিট ফান্ডের প্রকৃত অপরাধীদেৃর আড়াল করেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত চিট ফান্ড কেলেঙ্কারির পিছনে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের পান্ডাদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সি বি আই-কে দেওয়া সত্ত্বেও এ পর্যন্ত কিছুই হয়নি। উলটে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির ডিভিসন বেঞ্চ চিট ফান্ডের আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একজনের কমিটি গঠন করলে রাজ্য সরকার অসহযোগিতার পথ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থা ই ডি-ও কমিটি তুলে দিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়, অবশ্য এরা স্থগিতাদেশ পায়নি। নারদা কান্ডেও কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসক দলের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষণীয়। দুর্নীতি নিয়ে বাইরে মোদী সরকার বাগাড়ম্বর করলেও পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্ত শ্লথ করে উভয়ের সমঝোতাই প্রমাণ করেছে।  সংসদে, বিশেষত রাজ্যসভায় বি জে পি তৃণমূলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল এবং রাজ্যে তৃণমূল সরকারের ত্রাণকর্তা হিসাবে বি জে পি-র ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু নিজ নিজ স্বার্থের প্রশ্নে এদের মধ্যে দর কষাকষি এবং গড়াপেটার খেলা দিয়ে এরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
নোট বাতিলের ফলে তৃণমূলের দেশে ও বিদেশে থাকা কালো টাকা উদ্ধার করা যাবে এরকম মোহ পোষণ করার কোনো কারণ নেই। এই পদ্ধতিতে কালো টাকা উদ্ধার হবে না জেনেও বামপন্থীরা নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি তোলেনি। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমানোর জন্য নির্দিষ্ট পদক্ষেপ দাবি করেছে। সেই দাবিতে বামপন্থীরা দৃঢ় থাকবে। সাধারণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থরক্ষায় প্রতিবাদ ও আন্দোলন চালিয়ে যাবে বামপন্থীরা।

*********