20180226

মূল আর্থিক সমস্যাগু‍‌লির প্রশমনে ব্যর্থ এই কেন্দ্রীয় বাজেট

ড. অসীম দাশগুপ্ত

মোদী সরকারের বাজেট পেশ হয়েছে সংসদে। এই বাজেট প্রস্তাবে জনগণের জন্য প্রতিশ্রুতির শেষ নেই। কিন্তু বাস্তবের জমিতে বাজেট প্রস্তাবের সঙ্গে মিলবে কি এইসব প্রতিশ্রুতি? মূল আর্থিক সমস্যা সমাধানের কি কোনও দিশা আছে এই বাজেটে? সেইসব বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই দুটি লেখায়।
এই কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করা হলো এমন একটি সময়ে যখন সমগ্র দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ রয়েছেন গভীর উদ্বেগের মধ্যে। আর্থিক দিক থেকে উদ্বেগের মূল কারণগুলি হলো বেকারত্ব এবং মূল্যবৃদ্ধিদীর্ঘদিন ধরে এই সমস্যাগুলি অপ্রশমিত থাকার কারণে স্বার্থান্বেষীমহল পরিস্থিতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করে চলেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যেই ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে ধর্মের নামে এবং সরাসরি হিংস্রতা দিয়ে গণতন্ত্রের উপর আক্রমণ করে সর্বভারতীয় স্তরে এবং এ রাজ্যের ক্ষেত্রেও।
এছাড়া, সাম্প্রতিককালে অতিরিক্ত আঘাত এসেছে নোট বাতিলের পদক্ষেপের কারণে, পণ্য পরিষেবা করের বিভ্রান্তিকর রূপায়ণের ফলে এবং সর্বশেষে এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্কে রাখা সঞ্চয়ের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কায়।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই বাজেটের অবস্থান
পূর্বেকার তিনটি বছরে প্রতি বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে যে অতিরিক্ত দুকোটি কর্মসংস্থানের আশা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা অর্জিত না হওয়ায় এবছরের বাজেটে সামগ্রিকভাবে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা না রেখে, সেচের সম্প্রসারণ, বিপণনের পরিকাঠামোর উন্নয়ন ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে। এই প্রে‍‌ক্ষিতে এটা সতর্কতার লক্ষ্যনীয় যে, গ্রামাঞ্চলে পরিকাঠামো নির্মাণে যেখানে জাতীয় কর্মনিশ্চয়তা প্রকল্পের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে সেখানে এই খাতে সংশোধিত বাজেট বরাদ্দ বর্তমান বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকার থেকে বৃদ্ধি না করে একই অর্থা‍‌ঙ্কে স্থির রাখা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ শতাংশ হারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটলে প্রকৃত অর্থে এই বরাদ্দ ১০ শতাংশ হ্রাস প্রাপ্ত হয়ে যাবে। এছাড়া প্রায় ৪,৮০০ কোটি টাকা গতবছর থেকেই বকেয়া রয়ে গেছে।
এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে কৃষির সঙ্গে সবজি ইত্যাদি চাষের গুরুত্ব দেওয়ার পর, এটা জানা সত্ত্বেও যে এর প্রত্যেকটির ক্ষেত্রে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সঙ্গে জমির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে, এবং তাই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থে ভূমিসংস্কারের ওপর। কিন্তু এই ভূমিসংস্কারের বিষয়ে শ্রেণিস্বার্থের কারণে সম্পূর্ণভাবেই নীরব থেকেছে এই বাজেটের প্রস্তাবগুলি। কেবলমাত্র জোর দেওয়া হয়েছে বাজার ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং পরিকাঠামোর উন্নতির ওপর। এর ফলে এই উন্নতির সামগ্রিক সুযোগ এবং কর্মসংস্থানের সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকবেন গরিব কৃষকরা। অথচ এদের স্বার্থে আয় বৃদ্ধি করার কথাই তো এই বাজেটের মাধ্যমে প্রচার করার চেষ্টা হয়েছে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও অসংগঠিত শিল্পের গুরুত্বের কথা বলা হলেও, এক্ষেত্রে ঠিক কতটা কর্মসংস্থান হতে পারে তার কোনও লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়নি।
মূল্যবৃদ্ধি
মূল্যবৃদ্ধি, বিশেষ করে খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে মূল্যমানকে সাধারণ কৃষক এবং সাধারণ ক্রেতাদের স্বার্থে একটি স্তরে ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত ভরতুকির ভিত্তিতে গণবণ্টন ব্যবস্থা গুরুত্বের কথা অবশ্যই সকলের জানা আছে। একথা জানা সত্ত্বেও এই বাজেটে তার লক্ষ্যে কোনও নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা বলা হলো না, এবং সমস্ত বিষয়টি পুনরায় বাজার ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া হলো এই বাজেটে। এবং এর সমর্থনে কোনও যুক্তিই উল্লেখ করা হয়নি এই বাজেটে।
রাজস্ব সংগ্রহ
এটা লক্ষ্যণীয় যে, এই  কেন্দ্রীয় বাজেটটি হলো পরিষেবা কর (জি এস টি) লাগু করার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় বাজেট। যেহেতু জি এস টি লাগু করার ক্ষেত্রে রাজ্যের অর্থমন্ত্রীদের কমিটির যে সুপারিশ ‍ ছিল অপেক্ষাকৃত সরল ব্যবস্থার, তা মানা হয়নি এবং কর প্রদানের ক্ষেত্রেও থেকেছে জটিলতা, তাই কিভাবে এই কাঠামো আরও সরল করা যায় সাধারণ ব্যবসায়ী, সাধারণ ক্রেতা এবং রাজ্যগুলির স্বার্থে সেই বিষয়ে উল্লেখ করা অবশ্যই প্রয়োজন ছিল এই বাজেটে। অথচ তা করা হলো না।
অন্যদিকে, নোট বাতিলের পর কালো টাকা উদ্ধারের ক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত কি নির্দিষ্ট সাফল্য পাওয়া গেল এবং ভবিষ্যতে এব্যাপারে কি চিন্তা করা হয়েছে তাও উল্লেখ করা হলো না।
এফ আর ডি আই বিল
এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে অনাদায়ী ঋণ উদ্ধারের নাম করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে সাধারণ মানুষের আমানতের উপর সমস্ত গ্যারান্টি তুলে দেওয়ার কথা বলে’, এই বিলটি শুধু সাধারণ সঞ্চ‌য়ীদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করেছে তাই নয়।  এর ফলে সামগ্রিক ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা, এবং আর্থিক ব্যবস্থার অস্থিরতার সৃষ্টি করার কারণ হয়েছে। এর ফলে শুরু হতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতিতেই নতুন এবং ব্যাপক মন্দার সংকট। এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে স্বচ্ছ মনোভাব ব্যক্ত করার সুযোগ ছিল এই বাজেটে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এই বাজেটে এ ব্যাপারে তাদের বক্তব্য রাখতে পুনরায় ব্যর্থ হলো।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রে পুনরায় আঘাত
এমনকি লাভজনক ক্ষেত্রগুলিতেও পুনরায় জোর দেওয়া হলো বিলগ্নীকরণের। এবং এখানে নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত বিমাসংস্থাগুলির উপরও নামানো হলো নতুন ধরনের আঘাত। একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বিমা সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে ঠিক তখনই এই বিলগ্নীকরণ নতুন করে সংকটের কারণ সৃষ্টি হলো, যার থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন পুনরায় সাধারণ মানুষই।
****
তাই এই বাজেটে শুধু দেশের সাধারণ মানুষের মূল সমস্যাগুলি বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, জি এস টি-র জটিলতা তা অপ্রশমিত থাকছে তাই নয় —  নতুন ধরনের আঘাত সাধারণ মানুষের সঞ্চয় এবং বিমা ব্যবস্থার বিলগ্নীকরণের মাধ্যমে ব্যাপকতর সংকটের উৎস মুখ খুলে দিচ্ছে। যেহেতু বাজেটের উপস্থাপনাটি আপাত দৃষ্টিতে মসৃণ, তাই আমাদের সতর্ক থাকার কারণও জরুরি। এই ব্যাপারে এই বাজেটের মূল ক্ষতিকারক দিকগুলি সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাখ্যা করা উচিত এবং তার ভিত্তিতে অবশ্যই প্রয়োজন হবে ব্যাপকভাবে গণবিক্ষোভ ও গণপ্রতিরোধের কর্মসূচির।


গণশক্তি, ২রা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

জেটলির শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট: ভাবনা ও দুর্ভাবনা


রতন খাসনবিশ

আগামীকাল লোকসভায় পেশ হতে চলেছে কেন্দ্রীয় বাজেট। লোকসভা নির্বাচনের আগে এটাই শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। তাই ভোটের কথা মাথায় রেখেই জেটলি পেশ করবেন এই বাজেট। কিন্তু আয়কর ফাঁকি দেওয়া সম্পদশালীদের আঘাত করার সাধ্য নেই এই সরকারের। বাজেট পেশের ২৪ ঘণ্টা আগে সম্ভাব্য প্রস্তাব বিশ্লেষণ করেছেন লেখক।
১লা ফেব্রুয়ারি লোকসভায় অরুণ জেটলি পেশ করবেন ২০১৮-১৯ সালের কেন্দ্রীয় বাজেট। লোকসভা ভোটের আগে এটা হলো জেটলির শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট। অন্যদিকে এটি হলো জি এস টি চালু হবার পর প্রথম বাজেট। পরোক্ষ কর  এখন আর কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে নেই। অর্থ হলো, কেন্দ্রীয় সরকার কোন পণ্যের ওপর কী হারে উৎপাদন শুল্ক চাপাবে, কোথাও শুল্ক কমবে কিনা, শুল্ক বেড়ে যাবার সম্ভাবনাই বা কোথায় আছে বাজেটের আগের কয়েকদিন যা নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে, এ বাজেট নিয়ে সে সব ঘটবে না। কেন্দ্রীয় শুল্ক এখন জি এস টি-র আওতায়। কেন্দ্রীয় বাজেটে তার লম্বা ফিরিস্তি আর থাকবে না। মন্ত্রীর বাজেট ভাষণ তাই ছোট হবে, ফিনান্স বিলের আকার কৃশ হবে। কেন্দ্রীয় সরকার এই জি এস টি-র জমানাতেও অবশ্য আমদানি শুল্কে হেরফের করতে পারে, হেরফের হতে পারে রপ্তানি শুল্কেও। কিন্তু সে সবেও আবার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তৈরি করা সীমার মধ্যেই থেকে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে। চালু শুল্কে বড় ধরনের রদবদল ঘটানো সম্ভব নয় এসব ক্ষেত্রে। তাই বাজেটে কোনও চমক থাকবে না এই অংশেও। থেকে যাচ্ছে আয়কর ব্যক্তিগত আয়কর আর কোম্পানি কর যা আদায় করার অধিকার এখনও আছে কেন্দ্রীয় সরকারেরই। এদেশে যারা এখন বছরের শেষে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন, তাঁদের অর্ধেক কোনও কর দেন না, শুধু রিটার্নটা জমা দিয়ে নিরাপদ থাকার চেষ্টা করেন। রিটার্ন যা  দেওয়া হয় তার হিসাবে, এ দেশে মাত্র ৩০,০০০ করদাতা আছে বার্ষিক আয় এক কোটি টাকার ওপরে। যারা আয়কর দেয়, তাদের ৯০ শতাংশের কাছ থেকে তাই পাওয়া যায় আয়করের মাত্র ২৩ শতাংশ। এই স্তরের করদাতাদের অধিকাংশই সংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করেন, যেখানে উৎস থেকেই আয়কর আদায় করা হয়। সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরে কর আদায়ের ব্যবস্থাটা এখনও এদেশে তেমন পাকাপোক্ত নয়। ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জেটলি খুব কড়া কোনও ব্যবস্থা নিয়ে মৌচাকে ঢিল ছুঁড়বেন, এটা আশা করা যায় না। বরং অবস্থার চাপে সংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মধ্যবিত্তকে সুখী করতে মোদী সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে আয়কর ছাড়ের সামান্য ব্যবস্থা থাকতে পারে। এক্ষেত্রেও চমকের সুযোগ কম। জেটলির সমস্যা হলো জি এস টি লাগু হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের পরোক্ষ কর বাবদ আয় কমেছে। কমার কথাই ছিল। পণ্যের ওপর মাশুল বাড়ালে মাশুল আদায় বেশি হয়, এই নির্বোধের যুক্তিতে প্রথম দিকে জি এস টি কাউন্সিল এখন ১৭৮টি পণ্যে ২৮ শতাংশ মাশুলের দায় চাপিয়েছিল, যেগুলি অতিরিক্ত কর ভারে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। গত নভেম্বরে জি এস টি হারে ব্যাপক অদলবদল করে এই ১৭৮টি পণ্যে কর হার ২৮ শতাংশ থেকে  ১৮ শতাংশে নামানো হয়েছে। এছাড়াও কর হার কমানো হয়েছে দুশোর বেশি পণ্যে। চড়া হারে জি এস টি লাগু করায় কর আদায় প্রথমে কমেছে। কর হার কমানোর পর আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। তৎসত্ত্বেও, বাজারের যা অবস্থা, তাতে জি এস টি থেকে বিশাল কিছু আয়ের আশা নেই। কর হার কমানোর পর ডিসেম্বরে ৮৬,৭০৩ কোটি টাকা জি এস টি আদায় হয়েছে। অঙ্কটি নভেম্বরের চেয়ে বেশি, তবে অনুমান করা হচ্ছে, বাজার চাঙ্গা না হলে  এর বেশি জি এস টি আদায় হবে না। কর হার কমিয়েও জি এস টি অর্থাৎ পরোক্ষ কর থেকে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। রাজস্ব বাড়াবার তাগিদ তীব্র। প্রত্যক্ষ কর, অর্থাৎ আয়কর আদায় বাড়াতেই হবে। জেটলি তাই ব্যক্তিগত আয়করে খুব বেশি ছাড় দেবার পক্ষপাতী থাকবেন না। যারা অল্প আয়কর দেন, সংখ্যায় যারা ১.৫৬ কোটি আয়করদাতার নব্বই শতাংশ তাদের জন্য আয়করে  কিছু ছাড় পাওয়া যেতে পারে ভোটের রাজনীতির চাপে। তার বাইরে কোনও কিছুই থাকবে না। ব্যক্তিগত আয় যাঁরা লুকিয়ে রাখেন, ছাপান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতিওয়ালা দিল্লিশ্বর তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রযা কডিকাল পদক্ষেপ নেবেন না। নেবেন না কারণ তিনি তাঁদেরই লোক। তাহলে সফেদ ভারত’, ‘না খায়েঙ্গেনা খাওয়ায়েঙ্গের থেকের রাজনীতির কী হলো? স্পষ্ট বলাই ভালো। ওটা ছিল গদি দখলের জন্য জরুরি কথা। এদেশে বছরে ১ কোটি টাকার বেশি উপার্জন করেন, এমন নাগরিকের সংখ্যা ৩০,০০০ এর অনেক বেশি। তারা বেশ বহাল তবিয়তে আছেন মোদীর জমানা‌য়। নোট বাতিল আর জি এস টি দিয়ে কী হলো? নোট বাতিল ছিল একটা নির্বোধের চমক সৃষ্টির চেষ্টা, ভারতীয় নোট’-এর ওপর আপামর ভারতবাসীর আস্থা কমানোই যার একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী অবদান। আর জি এস টি? জি এস টি কোনও সোনার হাঁস নয় যাকে চাঙ্গা রাখলে বেশি ডিম অর্থাৎ বেশি পরোক্ষ কর আদায় হবে। এদেশে উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে অসংগঠিত ক্ষেত্র থেকে। জি এস টি সেটাকেই জখম করে দিয়েছে। সরকারি রাজস্ব বাড়ে অর্থনীতি চাঙ্গা থাকলে। গত চার বছরে সেটাই সবচেয়ে বেশি জখম করেছে মোদী সরকার। শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সরকারি রাজস্ব আদায় অভূতপূর্ব উন্নতির আশা জেটলি অন্তত করছেন না। জি এস টি থেকে, ডিসেম্বরে যা আদায় হয়েছে সেটার আসে পাশে‍‌ই থাকবে এর পরের আদায়গুলি। ব্যক্তিগত আয়‌কর থেকে আয় বাড়বে না। কোম্পানি কর-এ আদায় কী বাড়বে? বাড়ার আশা কম। কোম্পানিগুলি ইতিমধ্যেই হাত তুলে বসে আছে। তাদের কথা, যে কথাটা একদম খাঁটি কথা, তা হলো, বাজারের অবস্থা একেবারেই ভালো না। বেসরকারি উদ্যোগপতিরা ভরসা করে লগ্নি করতেই চাইছে না। নতুন লগ্নি হচ্ছে কিনা সেটা বোঝার একটা সহজ মাপকাঠি হলো কারখানায় নতুন যন্ত্রপাতি বসছে কিনা, নতুন কারখানা তৈরি হচ্ছে কিনা এবং একই সাথে ব্যাঙ্কের দরজায় সেই উদ্যোগপতিদের দেখা মিল‍‌ছে কিনা যারা নতুন প্রকল্পের জন্য ঋণ চায় (টাকা চেয়ে দেদার ধান্দায়‌ যারা ঘোরাফেরা করে তারা নয়)। চিদাম্বরম দাবি করেছেন এবং তাঁর দাবির পিছনে তথ্যের জোর আছে, নতুন কারখানা তৈরি, নতুন যন্ত্রাংশ বসানোর জন্য বিনিয়োগ, ‘মেক ইন ইন্ডিয়ার ধামাকা সত্ত্বেও একেবারে তলা‍নিতে এসে ঠেকেছে। জি ডি পি-র তুলনায় নতুন ল‍‌গ্নি কত, তার হিসাব পাওয়া যায় কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থা (সি এস ও) থেকে। ২০১১-১২ সালে এই জি ডি পি-র তুলনায় লগ্নি ছিল জি ডি পি-র ৩৪.৩ শতাংশ। ২০১৬-১৭ সালে এই অংশটি নেমে দাঁড়িয়ে ছিল ২৭ শতাংশে, ১৭-১৮ সালে সূচকটির সম্ভাব্য অঙ্ক হলো ২৬.৪ শতাংশ। তথ্য বলছে মেক ইন ইন্ডিয়াফ্লপ করেছে। কারখানার নতুন যন্ত্রাংশ বৃদ্ধির শতাংশটি ২০১৪-১৫ সালের এপ্রিল-জুনে ছিল ৩২.২ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এর হিসাবে অঙ্কটি নেমে দাঁড়িয়েছে ২৮.৯ শতাংশে। নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নেই। সুদের হার কমিয়েও ব্যাঙ্ক তার সংগ্রহ করা আমানত বিনিয়োগের রাস্তা পাচ্ছে না। ২০১৪-১৫ সালের এপ্রিল-জুনের হিসাবে ব্যাঙ্ক ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১২.৯ শতাংশ। ২০১৭-১৮ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর-এর ত্রৈমাসিক হিসাবে ঋণ বৃদ্ধির অঙ্কটি নেমে দাঁড়িয়েছে ৬.৫ শতাংশে। মনে রাখতে হবে, ইতিমধ্যে ব্যাঙ্কে তিনবার সুদের হার কমানো হয়েছে, বিনিয়োগকারীদের উৎসাহ দেবার জন্য। উদ্যোগপতিরা তাকিয়েও দেখেনি। আসলে, বাজার না থাকলে টাকার জোগান  বাড়িয়ে যে লাভ হয় না, পানাগাড়িয়ার মতো পরামর্শদাতারা এই মৌ‍লিক সত্যটাই বুঝতে চান নাহারভাট’-কে হার্ডওয়ার্কদিয়ে ঠেকাবার নির্বোধ যুক্তি আর কাজ করছে না। হার্ডওয়ার্ক হবে কোথায়। অর্ডার কই? সমস্যাটা আসলে বাজার না বাড়ার সমস্যা। বাজার কেন বাড়ছে না, সেই কথাটা ভাবতে হবে মোদী-জেটলিকে। এই অপ্রিয় সত্যটি ইতিমধ্যেই তাঁদের বুঝতে হয়েছে যে বিদেশি প্রত্যক্ষ লগ্নি যা আসছে, যেখানে নতুন কারখানা হচ্ছে তা তাদের বিনিয়োগে যাচ্ছে চালু কারখানা কিনতে কিংবা তার অংশীদারিত্ব বাড়াবে। তাদের বিনিয়োগ থেকে নতুন কর্মসৃষ্টির আশা নেই। সেটাই হবার কথা। শিল্পে বিনিয়োগকারীরা এই খবর রাখে যে স্রেফ বাজারের অভাবে এদেশের চালু কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ অলস হয়ে থাকে, বিনিয়োগ করলে নতুন কারখানা হয়, তারা ভাবে চালু কারখানা কিনবেই। ফলত এই বিনিয়োগ থেকে নতুন কর্মসৃষ্টি হবে না। কারিগরিতে যদি কিছু বিনিয়োগ হ‌য়, সে বিনিয়োগ কর্ম ধ্বংস করবে শ্রমিক ছাঁটাই করে; যারা ছাঁটাই হবে না তাদের একই সময়ে বেশি কাজ করতে হবে, মজুরি বৃদ্ধির কথাই উঠবে না কাজ বাঁচানোর তাগিদে।
মজুরি বাড়ছে না, কারখানা উৎপাদনে অবস্থা খারাপ। অথচ ডিভিডেন্ট থেকে আয় বাড়ছে ক্রমাগত। ডিভিডেন্ট বাড়ছে কেন, উৎপাদনের হাল যেখানে খারাপ। ডিভিডেন্ট বাড়ছে কারণ সংগঠিত ক্ষেত্রে মজুরি বাড়ছে না, উৎপাদনের একক প্রতি শ্রমিকের প্রাপ্ত ক্রমশ কমছে। অঙ্কের নিয়মেই উলটোদিকে তাই মুনাফা বাড়ছে। কোম্পানিগুলির ডিভিডেন্ট বাড়ছে এর ফলে। বাজারে অর্ডার কমছে, উৎপাদনের হাল খারাপ। মালিকদের তাতে লোকসান নেই। নতুন বিনিয়োগে তারা সতর্ক। কিন্তু পুরানো বিনিয়োগে ডিভিডেন্ট তারা বাড়িয়ে নিচ্ছে শ্রমিকের হিস্যা ক্রমাগত কমিয়ে এনে। ডিভিডেন্ট এতটাই ভালো যে অরুণ জেটলি তার আয় বাড়ানোর সমস্যা কিছুটা মেটাতে পারেন ডিভিডেন্ট বণ্টনের ওপর যে কর সংস্থাগুলিকে গুনতে হয় তা তুলে নিয়ে বরং ডিভিডেন্টকেই করের আওতা‌য় এনে। ছোট এবং মাঝারি শিল্পে কোম্পানি কর কমাতে হয়েছে সব বছর। ঝিমিয়ে পড়া বিনিয়োগে গতি সঞ্চার করার জন্য এবার সম্ভবত বড় শিল্পে (কোম্পানি কর) কমবে। যে আয় ডিভিডেন্ট হিসাবে বণ্টন করা হয় তাতে কর বসিয়ে সম্ভবত কিছুটা পুষিয়ে নেবার চেষ্টা করবেন অরুণ জেটলি। আয় আসতে পারে শেয়ার বাজারে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের ওপর কর ছাড়ে কোপ বসিয়েও। সেনসেক্স ৩৬ হাজার ছাড়িয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের পরিমাণ এখন অনেকটাই বেড়েছে। সেখানে কর বসিয়ে আয়ের রাস্তা খোলার চেষ্টা করতে পারেন অরুণ জেটলি।
তবে ও রাস্তাতেও বিপদ কম নয়। সেনসেক্স এতটা বাড়ার কারণ কী? উৎপাদন তো অর্ডারের অভাবে ঝিমিয়ে আছে। অন্যদিকে শেয়ার বাজার এত চা‌ঙ্গা কেন? কারণটা খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। গার্হস্থ্য সঞ্চয়ের যে অংশটা ব্যাঙ্কে দীর্ঘমেয়াদি আমানতে জমা পড়ছে, ব্যাঙ্কে সুদের হার ক্রমাগত কমিয়ে তার একটা বড় অংশকে ঠেলা হয়েছে মিউচুয়াল ফান্ডে। ২০১৬ সালে বাজারে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ ছিল ৩৫,৭০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সা‍‌লে তা ১ লক্ষ ৭ হাজার কোটিতে পৌঁছেছে। টাকাটা এসেছে মধ্যবিত্তর গার্হস্থ্য সঞ্চয় থেকেযার স্বাভাবিক ঠিকানা এখন আর ব্যাঙ্ক-পেমেন্ট অফিস নয়। এই টাকা শেয়ার বাজারে ঢুকে বাড়িয়েছে শেয়ারের দাম যে শেয়ার দামের সঙ্গে উৎপাদন ক্ষেত্রের আর কোনও সম্পর্কই নেই। য‍‌দি দেখা যায় ‍‌ডিভিডেন্ট-এর ওপর কর বসে আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের রাস্তা বন্ধ করে এই ফান্ডগুলি থেকে আয়ের অঙ্ক সেই ব্যাঙ্ক পোস্ট অফিসের সুদের কাছাকাছি এসে যাচ্ছে, তাহলে মিউচুয়াল ফান্ডে টাকার জোগান কমবে, শেয়ার বাজারে চাহিদা কমবে এবং উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কহীন এই শেয়ার মূল্য বুদবুদের মতোই ফে‍‌টে যাবে। সে সম্ভাবনা প্রবল, কেন না শেয়ার বাজার চাঙ্গা থাকছে গার্হস্থ্য সঞ্চয় টেনে আর সেটা হয়েছে ব্যাঙ্কে সুদের হার কমিয়ে ঋণ সস্তা করার সরকারি পদক্ষেপের ফলশ্রুতিতে। জেটলি বিলক্ষণ জানেন, শেয়ার বাজার এতটা ফু‍‌‍‌লে ওঠা স্বাভাবিক নয়। এর পর আবার শেয়ারের ডিভিডেন্ট-এ কর বসালে আর দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের রাস্তা বন্ধ করলে মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগ কমবে, ধস নামবে সেনসেক্সে। ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করতে গিয়ে এতোটা ঝুঁকি নেবেন কি জেটলি?
জেটলি সম্ভবত সতর্ক থাকবেন আয়কর, কোম্পানিকর, ডিভিডেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধনী লাভের ওপর কর বসাতে। খরচ কমানোর চেষ্টা তিনি অবশ্যই করবেন। তবে এ বাজেট যেহেতু ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট, যেখানে ভোট আছে সেখানে সরকারি টাকা ঢালতে বিশেষ কার্পণ্য করবেন না। দরকার হলে রাজকোষ ঘাটতি বাড়াবেন তিনি। বেসরকারি বিনিয়োগ যেহেতু কিছুতেই চাঙ্গা হচ্ছে না সুদের হার এতোটা কমানোর পরও, সম্ভবত সরকারি বিনিয়োগ বাড়াবেন তিনি বিনিয়োগ চাঙ্গা করতে। রাজকোষ ঘাটতি বাড়ানোর আর সরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগ বাড়ানো, আর সেই বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যে কার্য সংস্থান থেকে ন্যূনতম চাহিদা আসতে পারে এবং তার ফলে কারখানাগুলো উৎপাদনের নতুন অর্ডার পেয়ে বেসরকারি বি‍‌নিয়োগে উৎসাহী হবে পানাগড়িয়া মার্কা বাজার মৌলবাদীরা এসব একেবারেই পছন্দ করেন না। মোদী-জেটলি গত চার বছর শুনেছেন এই বাজার মৌলবাদীদের কথা। নিজেরাও যাঁরা বাজার মৌলবাদের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী মোদীর মেক ইন ইন্ডিয়াএসেছিল এই পথ ধরেই। তবে ভোটে যাবার আগে এটা তারা বুঝছেন যে, এসবে ভোট পাওয়া যাবে না। ভোটের কথা মাথায় রেখে এ বাজেটে সরকারি রাজস্ব কম থাকলেও খরচ ছাঁটাই করবে না। সরকারি বিনিয়োগ বাড়াবে বেসরকারি লগ্নির অভাব পূরণ করার জন্য। নতুন অর্থবর্ষে যে রেকর্ড পরিমাণ বিনিয়োগের সম্ভাবনা আছে মূলধনী খাতে, ইতিমধ্যেই তার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে; রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার কর্তাদের দিয়ে ইতিমধ্যেই ২৫০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করানো হয়েছে।
পকৌড়া ভেজে ভা‍‌লো উপায় করার রাস্তা দেখিয়েছিলেন মোদী‍‌, এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যেমন চপের দোকান করে দশতলা বাড়ির মালিক হবার পথ দেখিয়েছেন। ভারতবাসী এসব কথা যে ভালোভাবে নেবে না সেটা সম্ভবত উপলব্ধি করছেন জেটলি। রাজকোষে ঘাটতি বাড়াবার ঝুঁকি নিয়েই তিনি মূলধনী খাতে বরাদ্দ বাড়াবেন যাতে সরকারি উদ্যোগে কিছু নিয়োগ সৃষ্টি হয় এবং তার হাত ধরে চাহিদা  বেড়ে বাজার কিছুটা চাঙ্গা হয়। কর্মসংস্থানে কতটা গতি আসবে এর ফলে সেটা বলা শক্ত; শেষ বেলায় তাড়াহুড়ো করে এসব করে ভোটে তার সুফল পাওয়া যাবে কিনা সেটাও প্রশ্ন। কিন্তু সে যাই হোক, বছরে দুকোটি নতুন কাজের ধাপ্পা থেকে মুখরক্ষার একটা রাস্তা খুলতে পারে মূলধনী খাতে বিনিয়োগের বহু পরিচিত কেইনসীয় পথে পা বাড়ালে। জেটলির বাজেট এই পথে হাঁটলে অবাক হবো না।
রাজস্ব আদায়ে সমস্যা সত্ত্বেও জেটলিকে কৃষি এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে  হবে ভোটের আগের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে। এদেশের অর্ধেক ভোটাররা এখনও মূলত কৃষিনির্ভর। আর কৃষির অবস্থা মোটেই ভালো নয়। মোদী ভোটে জেতার আগে বলেছিলেন ২০১৫-১৬ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে কৃষকের আয় ডবল করে দেবেন তিনি। হিসাব কষে বছরে ১০ শতাংশ হারে বাড়াতে হবে কৃষির আয় ঐ লক্ষ্য পূরণের জন্য। তথ্য এই যে ২০১১-১২ থেকে ২০১৫-১৬ সালের মধ্যে কৃষিতে আয় হয়েছে ১.৩৬ শতাংশ। অভাবী থেকে মহাজনী ঋণ কোনোটারই বিদায় জোটেনি প্রায় ভারতে। সঙ্গে জুটেছে ফসল নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, বেড়েছে আত্মহত্যা। গত চার বছরে মোদী সরকার প্রায় কিছুই করে উঠতে পারেনি কৃষির এই সমস্যা মেটাতে। সেচের জন্য গত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৭,৩৭৭ কোটি টাকা, আর ফসল বিমার জন্য ৯০০০ কোটি টাকা। কৃষিতে মোট বরাদ্দ ছিল ৫১,০২৬ কোটি টাকা। প্রয়োজনের তুলনায় এটা যৎসামান্য। এ বছর এই দুই খাতেই সম্ভবত বরাদ্দ বাড়বে। সেটা ভালো কথা। তবে সমস্যাটা শুধু বরাদ্দ বাড়ানোর নয়। একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। ফসল বিমার ক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে বিমা কোম্পানিগুলি সংগ্রহ করেছিল ২১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। বিপর্যস্ত কৃষকরা দাবি করেছিলেন ৪২৭০ কোটি টাকা। বিমা কোম্পানিগুলির থেকে পাওয়া গেছে মাত্র ৭১৪ কোটি টাকা। কৃষি এখন লুটের জায়গা। প্রয়োজনে কড়া নীতি। যে সরকার ক্ষমতায় আসে সেই সরকার কারও জন্য কড়া নীতি আর কারও জন্য নরমনীতি আনে। যেটা এতদিনে স্পষ্ট। কৃষকের খুব বেশি আশা করার কিছু নেই, এই সরকারের কাছ থেকে। বাজেট বরাদ্দ যাই হোক না কেন।
সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বিষয়ের ওপর আক্রমণ নেমেছে ব্যাপকভাবে। ডিভিডেন্ট আয় কিছু বাড়ছে, মজুরি যদিও ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকছে। কৃষকের সার ‍-বীজ- সেচ বাজার নির্ভর। বাজার আবার এমনই যে এমনকি বিমার টাকা চাইলে বিমা কোম্পানিগুলো টাকা আটকে বসে থাকে সেই কৃষকের যে ইয়েস স্যার’, ‘নো ম্যাডাম’-এর পাঠ নেয়নি। বাজেটে কতটা কী করবেন অরুণ জেটলি?


গণশক্তি, ৩১শে জানুয়ারি, ২০১৮

20180210

নরেন্দ্র মোদী সরকারের নীতি বদলের দাবিতে ২০শে ফেব্রুয়ারি আইন অমান্য ও জেলভরো

অনাদি সাহু

মোদী সরকারের জনবিরোধী দেশবিরোধী নীতির প্রতিবাদে শ্রমজীবী মানুষের লাগাতার লড়াই চলছে। আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলাতে আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি নিয়েছে শ্রমিকশ্রেণি শিল্পভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলি। তারই পরিপ্রেক্ষিতে আলোচনা করেছেন লেখক।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী দেশবিরোধী নীতির প্রতিবাদে, গত ২০১৫ এবং ২০১৬ সালের দেশব্যাপী সফল ধর্মঘটের পর, আরও বড় লড়াইয়ের পথে দেশের শ্রমিকশ্রেণি শিল্পভিত্তিক শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলির পক্ষ থেকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে দেশব্যাপী আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

আমাদের রাজ্যে, আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবাংলার সমস্ত‍‌ জেলাতে আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচি, রাজ্যের সমস্ত কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন, ব্যাঙ্ক, বিমা, বি এস এন এল-সহ শিল্পভিত্তিক ফেডারেশনগুলি এবং ১২ই জুলাই কমিটি এই কর্মসূচিতে শামিল হবেন। কলকাতায় রানি রাসমণি রোডে ঐদিন দুপুরে জমায়েত আইন অমান্য কর্মসূচি পালিত হবে। রাজ্যে জোরকদমে তার প্রস্তুতি চলছে।

এই কর্মসূচির ১২ দফা দাবিগুলি হলো :
‍‌ মূল্যবৃদ্ধি রোধ, সর্বজনীন রেশন ব্যবস্থা বিভিন্ন পণ্যদ্রব্যের ফাটকা ব্যবসা বন্ধ।বেকার সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ।শ্রমআইন সঠিকভাবে লাগু করতে হবে শ্রমআইন ভঙ্গকারী মালিকদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে।সমস্ত শ্রমিকদের জন্য সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০০ টাকা (মাসিক) দিতে হবে এবং তা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সূচকের সাথে যুক্ত করতে হবে।প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষের জন্য মাসিক পেনশন ন্যূনতম ,০০০ টাকা করতে হবে।স্থায়ী কাজে ঠিকাশ্রমিক নিয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং সমকাজে সমবেতন দিতে হবে।বোনাস এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডের ক্ষেত্রে মজুরি/বেতনের পরিমাণের উপর সর্বোচ্চ সীমা যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা তুলে দিতে হবে, গ্র্যাচুইটি আইন সংশোধন করে গ্র্যাচুইটির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে।শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমআইন সংশোধন করা চলবে না।রেল, প্রতিরক্ষা এবং বিমা ক্ষেত্রে ‍‌(FDI) বিদেশি পুঁজি‍‌ বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে।আবেদনের ৪৫ দিনের মধ্যে ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন দিতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারকে আই এল কনভেনশনের ৮৭ ৯৮ নম্বর ধারাকে অনুমোদন দিতে হবে।রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের শেয়ার বিক্রি করা চলবে না। রাজ্যে অবস্থিত কেন্দ্রীয় সংস্থা, কয়লাখনি, বেঙ্গল কেমিক্যাল, অ্যালয় স্টিল, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ, বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সাঁতরাগাছি প্রেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলি বেসরকারিকরণ করা চলবে না।

গত সাড়ে তিন বছর পূর্বে নরেন্দ্র মোদী  সবকা সাথ সবকা বিকাশএবং আচ্ছে দিনে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠন করে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের স্বার্থে, একের পর এক বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করে চরম বিশ্বাসঘাতকতার পথ গ্রহণ করেছে। দেশ জাতীয় স্বার্থবিরোধী ঘৃণ্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে তার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারে পরিণত হওয়ার জঘন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছে। ফলে দেশের আর্থিক পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটেছে। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষকের ফসলের লাভজনক দাম না দেওয়া, নোটবন্দি, জি এস টি, এফ আর ডি আই বিলের মতো জাতীয় স্বার্থবিরোধী‍‌ সিদ্ধান্ত দেশের মানুষের জীবনে চরম অনিশ্চয়তার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় সরকার বৃহৎ শিল্পপতিদের ঋণখেলাপিদের আড়াল করতে চাইছে। প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা বকেয়া ঋণের ৮৫ শতাংশই বৃহৎ শিল্পপতিগোষ্ঠীর। নরেন্দ্র মোদী সরকার গত বছরে লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকার এই ঋণখেলাপিদের টাকা মকুব করেছে। শিল্পপতি গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করতে এফ আর ডি আই বিলের মাধ্যমে সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ আত্মসাৎ করতে চাইছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক, বিমা, বি এস এন এল, প্রতিরক্ষা, রেল, বিমানবন্দর, য়লাখনির বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ কর্মহীন হবে। রাজ্যে বেঙ্গল কেমিক্যাল, অ্যালয় স্টিল, ব্রিজ অ্যান্ড রুফ, বার্ন স্ট্যান্ডার্ড সাঁতরাগাছি প্রেসের মতো সংস্থাগুলিকে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত পুনরায় হাজার হাজার মানুষের কর্মহীনতার বিপদ দেখা দিয়েছে এবং রাজ্যকে শিল্পশূন্য করার পরিস্থিতি‍‌ তৈরি করছে।

মূল্যবৃদ্ধি রোধ : মূল্যবৃদ্ধি রোধের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পালন না করে, পেট্রোপণ্যের উপর উচ্চহারে সেস বসিয়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী খাদ্যপণ্য, তেল, চাল, ডাল, শাকসবজি, সমস্ত পণ্য-সামগ্রীর দাম গত সাড়ে তিন বছরে বহুগুণ বাড়তে ইন্ধন জুগিয়েছে। অথচ চাষিরা ফসলের দাম পাননি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সমস্ত ক্ষেত্রে লাগামছাড়াভাবে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটেছে।

বেকার সমস্যা প্রসঙ্গে : বছরে কোটি বেকারের কাজ, যে নির্বাচনী ভাঁওতা ছিল তা ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদী বুঝিয়ে দিয়েছেন। পর পর ৪টি বাজেটের পর ২০১৭-১৮ সালের বাজেটও হয়ে গেল। কিন্তু সরকার উদাসীন। আমাদের দেশের প্রতি জন মানুষের মধ্যে জন ৩৫ বছরের নিচে, তাদের জন্য প্রতি মাসে ১০ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান প্রয়োজন। পর পর ৫টি বাজেট হয়ে গেছে, কিন্তু বেকার যুবকরা সেই অন্ধকারে থেকে গেল। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৮টি শ্রমনিবিড় ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল .৩১ লক্ষ, ২০১৫ সালে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছিল .৫৫ লক্ষ মাত্র, আর ২০১৬ সালের শেষে ডিমনিটাইজেশনের ধাক্কায়, সারা দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ নতুন করে কর্মহীন হয়েছিলেন। জানুয়ারি, ২০১৬ থেকে এপ্রিল, ২০১৭ পর্যন্ত দেশব্যাপী ১৫ লক্ষ মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছিলেন নোটবন্দির কারণে (Centre for monitoring Indian Economy).

রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র বেসরকারিকরণ : নয়া উদারনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বেসরকারিকরণ, ১৯৯১ সাল থেকেই ইউ পি সরকারের সময় তা ছিল কিছুটা ধীরে ধীরে। অতীতে পূর্বতন অটল‍‌বিহারী বাজপেয়ীর বি জে পি সরকার এই নামেই একটা দপ্তর খুলে বসেছিল, আর বর্তমান বি জে পি সরকার ক্ষমতায় এসেই নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে পরিকল্পনা পর্ষদ তু‍‌‍‌লে দিয়ে ‍‌এন আই টি আই আয়োগ ‍‌(National Institution for Transforming India) তৈরি করেছে। এর কাজ হচ্ছে, দেশের জনগণের যে সম্পত্তি যাকে আমরা বলি রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র, সেগুলিকে ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে দ্রুত হাত বদ‍‌লের ব্যবস্থা করাপ্রতিরক্ষা, ইস্পাত, রেল, বিদ্যুৎ, ব্যাঙ্ক, বিমা, ওষুধ, বিমানসংস্থা, বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর, ভারী ইঞ্জিনিয়ােরিং শিল্প, নির্মাণ শিল্প, কয়লাখনি, পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্র ইত্যাদির আগেই অনেকগুলি বেসরকারিকরণ শেয়ার বিক্রি চলছে। নরেন্দ্র মোদীর সরকারকে তাই এই দেশবিরোধী কাজকে আড়াল করতে এখন জাতীয়তাবাদে স্বঘোষিত দেশপ্রেমিক সাজতে হচ্ছে।



১৮,০০০ টাকার ন্যূনতম মজুরি, সমকাজে সমবেতন, অস্থায়ী ঠিকাশ্রমিকদের স্থায়ীকরণ, স্কিম-ওয়ার্কার্সদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই:
আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং উদার অর্থনীতির আক্রমণের মধ্যে, শ্রমিকদের প্রচলিত সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত করার মালিকশ্রেণি এবং কেন্দ্রীয় রাজ্য সরকারগুলির চক্রান্তে লক্ষ লক্ষ অস্থায়ী ঠিকাশ্রমিকদের অবস্থাও করুণ, এদের না আছে ন্যূনতম মজুরি, না আছে সামাজিক সুরক্ষা। প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা কাজ করেও এরা পরিবারের সকলের মুখে সামান্য দুমুঠো ভাত, ডাল, সবজি তুলে দিতে পারছেন না। স্কিম ওয়ার্কার্সদের অবস্থা আরও কঠিন।

তাই ২০১৬ সাল থেকে দেশের কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি এদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ১৮,০০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে, তার সাথে ন্যূনতম বেতনকে ভোগ্যপণ্যের মূল্যসূচকের সাথে যুক্ত করারও দাবি করছে।

সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা : উদার অর্থনীতির আক্রমণের পরিণতিতে দেশের  সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন কমছে। বর্তমানে দেশের সংগঠিত ক্ষেত্রের এক ক্ষুদ্র অংশের শ্রমজীবী মানুষের জন্য কিছু সামাজিক সুরক্ষা চালু আছে পি এফ, এস আই, গ্র্যাচুয়িটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, পেনশন ইত্যাদি। যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের শ্রমজীবী মানুষ অবশ্য সেই সুযোগ পান না। অপরদিকে দেশের ৯৩ শতাংশ অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য কার্যত কোনও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই, অথচ দেশের জি ডি পি- ৬০ শতাংশ হলো এঁদের অবদান। সেই তাঁরাই আজ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। পশ্চিমবাংলা, কেরালা, ত্রিপুরার মতো রাজ্যে অবশ্য কিছু কিছু অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের জন্য প্রকল্প আছে। নির্মাণ, বিড়ি, খনি, সিমেন্ট শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকদের জন্য আইনগতভাবে কিছু ব্যবস্থা থাকলেও এই শিল্পগুলির সাথে যুক্ত অধিকাংশ শ্রমিকরা প্রাপ্য সুযোগগুলি পান না।

দেশি-বিদেশি বৃহৎ কর্পোরেটগুলিকে এবং পুঁজিপতিদের খুশি করতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় বাজেটে সামাজিক ক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ ব্যাপক ছাঁটাই করা হয়েছে। গরিবদের জন্য চালু বিভিন্ন স্কিমগুলিকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষার দাবিতে আন্দোলন তাই আরও তীব্রতর করতে হবে।

শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রমআইন সংশোধনের বিরুদ্ধে : কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর একের পর এক শ্রমআইন সংশোধন করে চলেছে, দেশের মালিকদের স্বার্থে ৪৪টি শ্রমআইন সংশোধন করে ৪টি লেবার কোড তৈরি করার পরিকল্পনা করা হয়ে‍‌‍‌ছে, পার্লামেন্টে একের পর এক  বিল পেশ করা হচ্ছে, ইতিমধ্যে ক্ষুদ্র-শিল্প সংস্থাআইনসংশোধন করে বলা হয়েছে ৪০জন পর্যন্ত শ্রমিক নিযুক্ত আছে এমন সংস্থাগুলি সবই ছোট সংস্থা হিসাবে গণ্য হবে, এবং ফ্যাক্টরি অ্যাক্টের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এই আইনের ফলে ফ্যাক্টরি অ্যাক্ট, বোনাস অ্যাক্ট, মিনিমাম ওয়েজ অ্যাক্ট, প্ল্যানটেশন লেবার অ্যাক্টসহ ১৬টি প্রধান প্রধান শ্রমআইনের সুযোগ সুবিধা থেকে কারখানা শ্রমিকরা অর্থাৎ দেশের সংগঠিত ক্ষেত্রের ৮০ শতাংশ শ্রমিককে শ্রমআইনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চক্রান্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ইতিমধ্যেই দেশের মালিকদের সন্তুষ্ট করতে অ্যাপ্রেন্টিস অ্যাক্টের সংশোধন করা হয়েছে।

শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, বি জে পি পরিচালিত সমস্ত রাজ্য সরকারগুলিও একের পর এক শ্রমআইন সংশোধন করে মালিকদের স্বার্থ পুষ্ট করে চলেছে, শ্রমিকবিরোধী এবং মালিকদের স্বার্থ পুষ্ট করতে এমন সরকার স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের শ্রমিকশ্রেণি প্রত্যক্ষ করেনি। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে মিথ্যা প্রচার চলছে। শিল্পে বিনিয়োগের স্বার্থে শ্রমআইন সংশোধনের নাম করে বি জে পি শ্রমিকশ্রেণির অর্জিত মৌলিক অধিকার লুণ্ঠনের চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। শ্রমিকদের মজুরি হ্রাস, কাজের ঘণ্টা বৃদ্ধি, হায়ার অ্যান্ড ফায়ার নীতিতে ছাঁটাই, স্থায়ী কাজে অস্থায়ী শ্রমিক নিয়োগকে মদত দিচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করে, সমকাজে সমবেতন না দেওয়ার মতো অপরাধ কেন্দ্রীয় সরকার করছে। শিল্পক্ষেত্রে একটা মধ্যযুগী বর্বর ব্যবস্থা চালু করে সমগ্র শ্রমিকশ্রেণিকে দাসশ্রমি‍‌কে পরিণত করতে চাইছে। সাম্রাজ্যবাদী লগ্নিপুঁজির স্বার্থে, বি জে পি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘ এই ঘৃণ্য চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে। এদের অন্তরে হিন্দুত্ববাদ মনুবাদের মতো মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন আর মুখে Digital India, Skill India Make in India, Start up India, ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ ‘আচ্ছে দিনের’, মুখোশও।

কেন্দ্রীয় বাজেট প্রসঙ্গে : গত ১লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ নরেন্দ্র মোদী সরকারের পঞ্চম বাজেট পেশ করা হয়েছে। এই বাজেটে অনেক গোলাপি প্রতিশ্রুতি থাকলেও, শ্রমিকশ্রেণিকে উপেক্ষা করা হয়েছে পেট্রোল-ডিজেলের উপর সেসের হার কমানো, মূল্যবৃদ্ধি রোধ, কালো টাকা উদ্ধার, লাভজনক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের বেসরকারিকরণ বন্ধ, স্কিম ওয়ার্কার্সদের কাজের স্থায়ীকরণ, ন্যূনতম মজুরি প্রদান, কাজের নিরাপত্তা, শ্রমআইন সংশোধন বন্ধ করা শ্রমিকশ্রেণি জনগণের সমস্ত দাবিই উপেক্ষিত থেকে গেছে।

প্রধানমন্ত্রীর গ্রাম সড়ক যোজনাতেও কো‍‍‌নও অর্থ বরাদ্দ হয়নি (,০০০ কোটি টাকা) প্রধানমন্ত্রীর আবাস যোজনায় গরিব মানুষের জন্য কোনও বরাদ্দ বাড়েনি, উলটে কমেছে কেবলমাত্র মিড ডে মিলে ৫০০ কোটি টাকা বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কর্মসংস্থান প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ,৮০১ কোটি টাকা। কৃষকদের সমস্যা সমাধানের প্রশ্নেও প্রতিশ্রুতি ছাড়া সদর্থক কোনও পদক্ষেপ নেই। শ্রমিক সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের দাবি, শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০০ টাকা, সকলের জন্য পি এফ, পেনশন, মেডিক্যাল বেনিফিটসহ সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা, সমকাজে সমবেতন প্রদান, কন্ট্রাক্ট লেবারদের স্থায়ীকরণ, তাদের আইনগত সুযোগ-সুবিধা প্রদান, লক্ষ লক্ষ স্কিম ওয়ার্কার্সদের ভাতা বৃদ্ধি, তাদের কাজের স্থায়ীকরণ ইত্যাদি সমস্ত বিষয়গুলিকে  কেন্দ্রীয় সরকার উপেক্ষা করেছে। একটা  অমানবিক মনোভাব নিয়ে এই সরকার চলছে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে এবং এই লড়াইকে নীতি পরিবর্তনের লড়াইতে পরিণত করতে হবে। গত ৮ই আগস্ট, ২০১৭ ‍‌দিল্লিতে অনুষ্ঠিত যৌথ জাতীয় কনভেনশন, -১১ই নভেম্বর, ২০১৭ দিল্লির সংসদ ভবনের সামনে পার্লামেন্ট স্ট্রিটে, ১২ দফা দাবিতে ৩দিন ব্যাপী ঐতিহাসিক  ধরনার পর সারা দেশের সাথে আমাদের রাজ্যে আগামী ২০শে ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবাংলায় প্রতিটি জেলায় আইন অমান্য জেলভরো কর্মসূচিকে সফল করে নরেন্দ্র মোদী সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সংগঠিত করতে হবে।


আগামী দিনে দেশব্যাপী আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার প্রস্তুতিতে শ্রমিকশ্রেণি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।