20191213

বিজেপি বদলে দিতে চাইছে প্রকৃত ভারত


মহম্মদ সেলিম

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (সিএবি) পেশ করেছে মোদী সরকার। বিলটি লোকসভায় পাশ হয়েছে। এই বিল আইনে পরিণত হলে বদলে যাবে প্রকৃত ভারত— আমাদের দেশ। আসলে লোকসভায় বিজেপি সংখ্যার জোরে পাশ করিয়েছে।

এই বিলের মাধ্যমে নাগরিকত্বকে ধর্মের ভিত্তিতে চিহ্নিত করার চেষ্টা হচ্ছে। বিজেপি তাদের ২০১৪-র নির্বাচনী ইশ্‌তেহারে বলেছিল শুধু হিন্দুদের কথা। পরে, কৌশলের অঙ্গ হিসাবে টোকেনের মত জুড়ে দেওয়া হয়েছে ইসলাম ছাড়া অন্যান্য ধর্মকে। ভারত পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছিল এক অনন্য উদাহরণ— ‘বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান’। সেই ধারণাকেই  আঘাত করা হচ্ছে। আমরা কী করে অস্বীকার করব, শিখদের একাংশ দেশ ছাড়ছেন। খ্রিস্টানদের অনেকে চলে যাচ্ছেন গোলার্ধের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে। হিন্দুদেরও অনেকে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। স্থানান্তর, দেশান্তরের প্রধান কারণ আর্থিক। কখনও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, সামাজিক কারণও থাকে।

সেখানে এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের প্রয়োজনীয়তা কী? দেশের ৯৯% যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষের  কোনও সুরাহা নেই এই বিলে। তাঁরা কাজ চান, খাবার চান, আশ্রয় চান, পরিশুদ্ধ জল চান, যথাযথ মজুরি চান, ফসলের দাম চান, সামাজিক সুরক্ষা চান, নিয়মিত ভাতা চান, কাজের নিশ্চয়তা চান। তারজন্য আন্দোলন, তারজন্য লঙ মার্চ, ৮ জানুয়ারি হবে দেশজোড়া ধর্মঘট।

এই মুহূর্তে দেশের সামনে এই সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করাই মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা। কিন্তু হতে দিচ্ছে না শাসকরা। যাদের প্রধান প্রতিভূ বিজেপি। মূল সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। প্রবল সঙ্কটের এই সময়েই নাগরিকতার মাপকাঠি ঠিক করার উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রে শুধু ধর্মকেই ভিত্তি করা হচ্ছে না, ভাষা, জাতি এমনকি কোথাও কোথাও আঞ্চলিক সঙ্কীর্ণতাকেও ভিত্তি করে তোলা হচ্ছে। এই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল সেই সব বিচ্ছিন্নতা, বিভাজনকেই তীব্রতর করতে চাইছে। বিজেপি’র উদ্দেশ্যও তাই।

এর আগে বিজেপি প্রচার করত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী।’ লোকসভায় মমতা ব্যানার্জিও আরএসএস, বিজেপি’র এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করে পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টায় মদত দিয়েছিলেন। অনুপ্রবেশের সূত্র ধরে বিজেপি প্রচার করত, একদিন নাকি আলাদা ‘বাঙালিস্তান’ তৈরি হয়ে যাবে। এখন তারা এনআরসি এনেছে। এনআরসি আসলে ‘নিউ রিফিউজি ক্রাইসিস।’ তা কিন্তু শুধু ভারত ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলিতেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অমিত শাহ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের অবস্থার উল্লেখ করে সংসদে যা বলেছেন, তাতে দু’ দেশের সম্পর্ক ক্ষুন্ন হতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈদেশিক বিষয়ে, অন্য দেশের বিষয়ে সংসদে এই কথা বলার কথা নয়। যদি আদৌ তেমন বাস্তবতা থাকে, তাহলে রীতি মাফিক বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে কতবার এই নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেছেন? কোনও উত্তর নেই।

এই বিলের নির্যাস হলো, বিজেপি-আরএসএস জনসংখ্যা আদান প্রদান করতে চাইছে। বার্তা দিতে চাইছে— প্রতিবেশী দেশগুলির হিন্দুরা আসুন। আধুনিক পৃথিবীতে এই ভাবে নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষের আদান প্রদান আদৌ সম্ভব কিনা, তা এক বিরাট প্রশ্ন। তাছাড়াও এই বার্তা সেই সব দেশের এবং আমাদের দেশের স্থায়িত্ব, রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবেশকেও বিঘ্নিত করবে। উৎসাহিত হবে কারা? প্রতিবেশী দেশগুলির মৌলবাদী শক্তিগুলি উদ্দীপ্ত হবে। তাদের দেশের সংখ্যালঘু গরিব পরিবারগুলিকে ভয় দেখিয়ে বলার সুযোগ পাবে— ‘যাও, তোমাদের জন্য তো আলাদা দেশ হয়েছে।’ আসলে এই বিভাজনের বরাবর যে লক্ষ্য থাকে,  ধর্মীয়সহ নানা ধরনের মৌলবাদীদের সেই কায়েমী স্বার্থই জেগে উঠবে— সম্পত্তি দখল, জমি দখল। আমাদের দেশে তো বটেই আশেপাশের রাষ্ট্রগুলিতেও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলিকে প্ররোচিত করে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এই নাগরিকত্ব বিল।

ভারত দীর্ঘ সময় শান্তি, জোট নিরপেক্ষতা এবং বিভিন্ন দেশের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করেছে। বেশ কিছুদিন ধরেই, বিশেষত নয়া অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োগ শুরুর পর থেকে দেশ তার সেই পথ থেকে একটু একটু করে সরেছে।

এই বিলের পিছনে রয়েছে বিজেপি’র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য। সঙ্ঘ পরিবারের বহুদিন লালিত  হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি।

লোকসভায় বিল পেশের সময় অমিত শাহ দেশভাগের প্রসঙ্গ তুলেছেন। তাঁর ইতিহাস জ্ঞান নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার কাজ নয়। কিন্তু কোনও সন্দেহ নেই দেশের ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে চাইছেন তাঁরা। বিকৃত ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি দেশে সঙ্ঘের ভাবনার অন্যতম ধারক ছিলেন। তিনি দেশভাগের শুধু সমর্থকই ছিলেন না, দেশভাগ নিশ্চিত করতে তিনি সক্রিয় ছিলেন। দেশে ‘হিন্দুত্বের’ ভাবনার উদ্গাতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার দেশভাগের পক্ষে ছিলেন। সামগ্রিকভাবে আরএসএস, হিন্দু মহাসভার মত সংগঠনগুলি মুসলিম লিগের মতই দেশভাগের পক্ষে কাজ করেছে, ব্রিটিশের মদতে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়িয়েছিল। দাঙ্গা-হাঙ্গামায় প্ররোচনা দিয়েছিল। দেশকে ভাগের চক্রান্তে এরাই তিন পান্ডা। লোকসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিক তাই বলেছেন, যা আরএসএস, তার স্বয়ংসেবকদের মাথায় ঢোকে।

কোন সময়ে দেশভাগের ব্লু প্রিন্ট? যখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হয়েছেন, দেশে বিপ্লবী শক্তি উদ্দীপিত হয়েছে। বড় বড় ধর্মঘট হচ্ছে চটকলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে। নৌবিদ্রোহ কাঁপিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাসকে। শ্রমজীবী মানুষের ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে সেই বিদ্রোহ। তার পক্ষে জেগে উঠছে সমাজের অন্যান্য অংশ। একই সময়ে তেভাগার দাবিতে কৃষক সংগ্রাম দুর্বার।

দেশ বিভক্ত হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতেই হবে, তবু এই দেশ ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’ মেনে নেয়নি। পাকিস্তান যারা চেয়েছিল, তাঁরা মেনেছিলেন। ভারতে তা একটি ঘৃণ্য ধারণা। ভারতের সংবিধানে এই দেশ ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক। বিজেপি সেই ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’-কে পুনরায় প্রয়োগ করতে চাইছে। তারা মানত জিন্না-মুসলিম লিগের সেই ধারণা। বিজেপি সেটাই নতুন করে চাপিয়ে দিতে চাইছে ভারতের উপর।

এটাই সঙ্ঘ পরিবারের লক্ষ্য। তারা  গণতন্ত্রকে মানে না। এরা গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষতাকে  পরিণত করতে চাইছে এথনিক (জাতিগত) গণতন্ত্রে। তা আমাদের সংবিধানের মূল ভাবনার বিরোধী। পৃথিবীতে জাতিগত গণতন্ত্রের উদাহরণ ইজরায়েল। যা আসলে গণতন্ত্রই নয়। ইজরায়েলের জায়নবাদী রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। আরএসএস’র প্রধানরা বরাবর ইজরায়েলের এই ভাবনার প্রশংসা করেছে। কী সেই ভাবনা? একটি জাতিগোষ্ঠীর দেশ হবে। জায়নবাদী শাসকরা বলে ইজরায়েল সব ইহুদিদের দেশ। তেমনই এখানে বলার চেষ্টা হচ্ছে যে, যে কোনও হিন্দুর রাষ্ট্র ভারত। অর্থাৎ সংখ্যাগুরুর কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে সেই মডেল চলতে পারে না। ভারত আর  ইজরায়েল এক নয়। ভারত নানা ধর্ম, জাতি, ভাষাভাষীর মানুষের মিলন ভূমি।

কিন্তু এখন একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে মহিমান্বিত করার অপপ্রয়াস চলছে। একই সঙ্গে এই ধারণা গড়ে তোলে একটি আশঙ্কা— ‘পবিত্রতা’ নষ্টের আশঙ্কা। যা অন্য ধর্ম, ভাষা, জাতির মানুষের প্রতি এক তীব্র ঘৃণার জন্ম দেয়। এই জেনোফোবিয়া গড়ে তোলারই চেষ্টা করেছে বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার। কোনও অপরাধ ঘটলেই বলার চেষ্টা হয়েছে নির্দিষ্ট কোনও অংশের মানুষ এটা করেছে। কখনও তাদের বলা হয়েছে ‘বাংলাদেশি’। কখনও বলা হয়েছে রোহিঙ্গা। কখনও পুরোপুরি একটি ধর্মের মানুষকে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়েছে। একদিকে দেখানো হচ্ছে হিন্দুদের ‘রাইট টু রিটার্ন’। অন্যদিকে নির্দিষ্ট একাংশকে ভয় দেখানো— ‘চলে যাও। পাঠিয়ে দেবো বাংলাদেশে, পাকিস্তানে।’ অন্য ধর্ম, জাতি, ভাষার মানুষকে চিহ্নিত করা হয় ‘এজেন্ট অব বায়োলজিক্যাল ডাইল্যুশন’ হিসাবে। পবিত্রতা নষ্ট করে দিচ্ছে, এমন একটা আশঙ্কা বিজেপি ছড়িয়ে দিতে চাইছে  হিটলারের জার্মানি আর ইজরায়েলের জায়নবাদী কৌশলে। এর পথ ধরেই ‘লাভ জিহাদ’, ‘ঘর ওয়াপসি’,‘ইন্টার-কাস্ট ম্যারেজ’-র বিরোধিতা এসেছে।

ভারতের ক্ষেত্রে হিন্দু আর্যদের আদিবাসী ধরে নিয়েই এই দেশকে ‘হিন্দুদের ভূমি’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। কিন্তু কে প্রকৃত আদিবাসী? এর জবাব কে দেবে? আর্যরা কারা? আর্যরা কী আদিবাসী? ইতিহাস বলছে আর্যরা বহিরাগত। আদিবাসীরাই এই দেশের আদি বাসিন্দা। তারা বহিরাগত নন। বিজেপি তা মানে না। ঐতিহাসিক, নৃতাত্বিক সেই সত্যের প্রতিষ্ঠা আটকানোর জন্যই এদের তারা বনবাসী বলে। আদিবাসী বলে না। এদের আদিবাসী বললে প্রমাণ হয়ে যায় যে, তথাকথিত ‘আর্যরা’ বাইরে থেকে এসেছে। এই হচ্ছে চালাকি। এনআরসি’তে তাই আদিবাসীরাও আশঙ্কিত। কারণ, তাদের আর নথি কোথায়?

লক্ষ্য হলো আধিপত্য কায়েমের পরিকাঠামোগত বিন্যাস। অর্থাৎ এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে থাকবে সংখ্যাগুরুর আধিপত্য এবং বাকিদের দ্বিতীয় শ্রেণি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।

নয়া অর্থনৈতিক নীতির প্রয়োগের প্রথম পর্যায়ে তার ঘোর সমর্থক তাত্ত্বিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এটি পরিকাঠামোগত সমন্বয়ের ব্যবস্থা। বেসরকারিকরণ, বিলগ্নি, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে দুর্বল করার সেই তত্ত্বের প্রভাব আজ আমরা বুঝতে পারছি। ছাঁটাই, বেকারি, কৃষি সঙ্কট, অভাব, মন্দার এই প্রভাবের কথা বামপন্থীরা বলেছিল ৯০-র দশকেই। নয়া আর্থিক নীতি, উদারনীতির পথকে তখন প্রতিক্রিয়ার শক্তি প্রবলভাবে প্রলোভনের বিষয়বস্তু করে তুলে ধরেছিল। আজ তার প্রকৃত রূপ বেরিয়ে পড়েছে। কিছু লোক প্রচুর ধনী হয়েছে। কিন্তু সিংহভাগ মানুষের অবস্থা খারাপ হয়েছে। আরও খারাপ হচ্ছে।

এবার বিজেপি চাইছে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক পরিকাঠামোগত বদল আনতেএই নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনের লক্ষ্য হলো নাগরিকত্বে বিভাজন। গ্রেডেশন করা। একদল হবে প্রেফারেবল— তারাই প্রধান, গ্রহণযোগ্য। আর এক দল হবে ব্রাত্য। মানসিক গোলামি হবে তাদের বৈশিষ্ট্য। সংখ্যাগুরুদের মধ্যে ধাপে ধাপে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হবে ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু, ব্রাত্যদের সম্পর্কে। খাওয়া, পোশাক সমস্ত প্রশ্নে তৈরি করা হবে ভীতি, তার থেকে বেশি ঘৃণা। এখনও তা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা দেখি— কোনও পাড়ায়, কোনও আবাসনে ঘর পাওয়ার ক্ষেত্রে। এবার এটাই ছড়িয়ে দেওয়া হবে সারা দেশে। এটা শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে থেমে থাকবে না। এই ধরনের বিভাজন জাতি, সংস্কৃতি, ভাষার ভিত্তিতেও ছড়িয়ে পড়বে।

উত্তর-পূর্বে এর অন্যরকম প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব পড়বে বাজারে।  বিল পেশ করতে গিয়ে অমিত শাহ বলেছেন  ইনার লাইন পারমিট ব্যবস্থা থাকবে। উত্তর পূর্বাঞ্চলের মানুষ তার বিরোধিতা করেছেন। কারণ, এতে সেখানকার পর্যটন, ব্যবসা মার খাবে। যারা কাশ্মীরের ক্ষেত্রে বললেন, ৩৭০ নং ধারা তুলে দিলে নাকি কাশ্মীরের উন্নতি হবে, বিনিয়োগ বাড়বে। জমি কিনতে পারবে। কাশ্মীরের উন্নতি হবে। তারাই উত্তর পূর্বাঞ্চলে বলছেন ইনার লাইন পারমিট চালু হবে! নাগরিকরা যেতে পারবে না। তাহলে এখানে  ‘ওয়ান নেশান-ওয়ান অ্যাক্ট’ কোথায় গেল? নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে শুধু ধর্ম, জাতি, ভাষাতেই বিভাজন ঘটানো হয়নি। দেশকে আঞ্চলিকতাতেও বিভক্ত করা হয়েছে। কে কোথায় কাঙ্ক্ষিত, কে কোথায় ব্রাত্য তার সীমানা তৈরি হচ্ছে। একাংশের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। এই জাতিগত বা ‘এথনিক ডেমোক্র্যাসি’ হলো নন সিভিক ফর্ম অব ডেমোক্র্যাটিক স্টেট। অর্থাৎ সামাজিক স্বাধীনতা থাকবে না। মানবাধিকার থাকবে না।

প্রথমে আতঙ্ক ছড়ানো হলো। প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা ছড়ালো। যে যুদ্ধ সীমান্তে ছিল, তাকে নিয়ে এল দেশের মধ্যে। প্রতিটি গ্রাম-শহর এখন যুদ্ধক্ষেত্র। অথচ সরকার গঠনের সময়ে এই বিজেপি কী বলেছিল? এরা বলেছিল, যুদ্ধ করেই পাকিস্তানকে শায়েস্তা করবে। এখন সেই যুদ্ধটা তারা নিয়ে আসছে দেশের মধ্যে। প্রতিদিন ঘৃণা, আশঙ্কা, বিভাজন নিয়ে একটি দেশের মানুষ এগবে কী করে?

আতঙ্ক, দাঙ্গা-হাঙ্গামা অনেককে দেশ ছেড়ে আসতে বাধ্য করে। সেই পরিবেশ ওরা ফিরিয়ে আনতে চাইছে। দেশভাগের সময়ে পূর্ব এবং পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে যে উদ্বাস্তু পরিবারগুলি ভারতে এসেছিলেন, তাদের সেই ক্ষতকে জাগিয়ে তুলতে চাইছে সঙ্ঘ পরিবার। অন্যদিকে নিউ রিফিউজি ক্রাইসিস তৈরি করতে চাইছে। নতুন আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে চাইছে। বাস্তবে পারবে কিনা, ঠিক নেই। আপাতত তা ভার্চুয়াল করে তুলতে চাইছে। যা ডেকে আনবে এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই আমাদের দেশের গড়ে ওঠার ভিত্তি। স্বাধীনতা সংগ্রামও বিভিন্নতার মধ্যে ঐক্যের আদর্শকে তুলে ধরেছে। ভগৎ সিং, সূর্য সেন, আসফাকউল্লাহ, রামপ্রসাদ বিসমিল, ক্ষুদিরাম বসুদের লড়াই ছিল আপসহীন।

এরাজ্যে এক জটিল পরিস্থিতি। তৃণমূল আর বিজেপি’র নকল কুস্তি আর আসল দোস্তি।  তৃণমূল কংগ্রেস কী করেছে? তারা মুখে বিরোধিতার কথা বলেছে। এনআরসি, এনপিআর, সিএবি হলো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচির অংশ। তাদের বিভাজনের রাজনীতির মোকাবিলা করতে হলে দরকার আদর্শভিত্তিক লড়াই। মমতা ব্যানার্জির রাজনীতির কোনও আদর্শ নেই। তিনি শুধু আদর্শহীনতায় ভুগেছেন তাই নয়, সুবিধাবাদেও নিমজ্জিত হয়েছেন। মমতা ব্যানার্জি ধর্মীয় বিভাজনের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছেন সমাজে। এখনও তিনি জনগণনা এবং জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার (এনপিআর)-কে গুলিয়ে দিচ্ছেন। রাজ্যে ডিটেনশান ক্যাম্পের জন্য জমি চেয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই জমি দিতে উদ্যোগী হয়েছেন। সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পেশের মত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার বিরোধিতায় নিজের দলের পুরো শক্তিকে হাজির করেননি তিনি। এই হলো বিজেপি, সঙ্ঘের সঙ্গে আপসকামিতার পরিণাম। মমতা ব্যানার্জি আসলে সঙ্ঘের রাজনীতির পরিপূরক হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি গত আট বছরে গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংস করেছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে নষ্ট করেছেন। মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসকে ছোবল মারতে চেয়েছে তৃণমূলই।

দ্বিচারিতা, আপস করে বাংলাকে রক্ষা করা যাবে না। দেশ আরো বিপন্ন হবে। আপসহীন সংগ্রামই পথ। একমাত্র বামপন্থীরাই পারে বিভিন্ন মঞ্চ, সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধ করে রাজ্যকে, দেশকে রক্ষা করতে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়েই পড়া এখন একমাত্র পথ। 

গণশক্তি, ১২ডিসেম্বর, ২০১৯ 

অনৈক্যের বাতাবরণ তৈরিই আসল উদ্দেশ্য


দেবেশ দাস

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ২০১৯ লোকসভায় পাশ হয়েছে। বিলের মূল কথা— ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর অবধি আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আগত ৬টি ধর্মাবলম্বী (হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি ও খ্রিস্টান) মানুষ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হবেন না। বাইরের দেশের কোনও নাগরিকের ভারতে ঢুকতে পাসপোর্ট লাগে, ভিসা লাগে। পাসপোর্ট-ভিসা যদি না থাকে বা থাকলেও তার সময়সীমা পেরিয়ে যায়, তবে সে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। বিলের মানে দাঁড়াচ্ছে ঐ ৬টি ধর্মের কেউ ঐ তিনটি দেশ থেকে এইভাবে ভারতে ঢুকলে তাকে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী ধরা হবে না। সে কিন্তু নাগরিক হচ্ছে না, তার ভোটাধিকার থাকছে না, এমনকি সে উদ্বাস্তুও হচ্ছে না, এখন সে শুধু বেআইনি অনুপ্রবেশকারী নয়। বিলে আছে, এই সমস্ত লোকদের সরকার নাগরিকত্ব দিতে পারে। এদেশে মোট পাঁচ বছর বাস করলে সে ভারতের নাগরিক হওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে।

তার মানে কি ঐ ৩টি দেশের উপরে-উল্লেখিত ৬টি ধর্মের সমস্ত লোক এদেশে এলে এইভাবে পাবে? ২০১৬ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে যে জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটি হয়, তার রিপোর্ট ২০১৯-এর জানুয়ারিতে বেরিয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে প্রশ্নোত্তরের সময় স্বরাষ্ট্র দফতর বলেছে যে এক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র দফতরের ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ও ১৮ জুলাই, ২০১৬ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কাজ হবে। এই বিজ্ঞপ্তিতে, কেউ যদি ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে বা সেই ধরনের নিপীড়নের ভয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে কোনও বৈধ কাগজপত্র ছাড়া আসে তাদের কথা বলা হয়েছে।  লোকসভায় সদ্য পেশ হওয়া বিলের পরিপ্রেক্ষিতে কী বিধি তৈরি হয়, তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে যদি শুধু ধর্মীয় নিপীড়নের কথাই বলা হতো, তাতেই তো যথেষ্ট ছিল। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তানে তো মুসলমানদের উপর ধর্মীয় নিপীড়ন হচ্ছে না, তারা এমনিতেই বাদ পড়ত। কিন্তু, অনেকটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো করে শুধু মুসলিম বাদ দিয়ে অন্য ধর্মগুলির নাম করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য– লিখিত পড়িত ভাবে মুসলিমদের বিচ্ছিন্ন করা ও তাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার গড়ে তোলা। এক অনৈক্যের পরিবেশ গড়ে তোলাই উদ্দেশ্য।

নাগরিক সংশোধনী বিলে ধর্মীয় নিপীড়নের কথা না বলেই মুসলিমদের বাদ রাখা হয়েছে। সংবিধান সম্মত এই কাজ? সংবিধানের ১৪নং ধারা বলছে আইনগত সমতা বা আইনগত সুরক্ষা থেকে কোনও ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যায় না। সেক্ষেত্রে আইনের মাধ্যমে কোনও একটা বিশেষ সুবিধা কোনও একটা ধর্মাবলম্বী মানুষদের বাদ দিয়ে ঘোষণা করলে তা সংবিধানের ১৪নং ধারাকে অমান্য করা হয়। স্বরাষ্ট্র দফতরের বিজ্ঞপ্তি ও এই নাগরিক সংশোধনী বিল সেটাই করছে। বিজেপি ভারতের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ তকমা মুছে ফেলতে চায়।  

এই বিল অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরে যারা বাংলাদেশ বা পাকিস্তান থেকে ধর্মীয় কারণে তাড়া খেযে এসেছেন তারা সবাই কি এবার ভারতের নাগরিক হয়ে যাবেন? হবেন না। ঐ জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির সভাতে প্রশ্নোত্তরের সময় ইনটেলিজেন্স ব্যুরো বলেছিল– কয়েক দশক আগে যারা ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে এদেশে এসেছিল বলে দাবি করছেন ও ভারতের নাগরিকত্ব চাইছেন, তাদের বেশিরভাগই দেশভাগ হওয়ার পরপর যখন ব্যাপক হারে দেশান্তর হচ্ছিল তখন এসেছে, এদের দাবি আজ মানা সম্ভব নয়। ইনটেলিজেন্স ব্যুরো আরো জানিয়েছে, যে এতদিন পর্যন্ত যতো হিন্দু ঐ তিনটি দেশ থেকে এসেছে, নাগরিকত্ব বিল অনুযায়ী, তার মধ্যে মাত্র ২৫৪৪৭ জন হিন্দু নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী (এদের অনেকে পাঞ্জাবের), এদের আবার পাসপোর্ট-ভিসা আছে, ভিসার মেয়াদটা ফুরিয়ে গিয়েছিল। তাহলে কয়েক লক্ষ বাঙালি হিন্দু যে আসামে এনআরসি’তে বাদ পড়ল, তাঁদের ভাগ্যে আর শিকে ছিড়ছে না। তবে, এবারের বিল পেশের সময়ে বলা হয়েছে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যাবে। নথিভুক্তি বা দেশীয়করণের মাধ্যমে সেই আবেদন বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন, সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

কিন্তু সম্প্রতি কেউ যদি ধর্মীয় নিপীড়নের জন্য ওদেশ থেকে এসে থাকে, তাদের ক্ষেত্রে কি হবে? জয়েন্ট পার্লামেন্টারি কমিটির রিপোর্টে স্বরাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সম্প্রতি যারা এসেছে, তাদের কাগজপত্র দেখা যেতে পারে, সেই কাগজপত্র দিয়ে যদি প্রমাণ হয় যে তারা ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার, তবে তার দাবি বিবেচনায় আসবে। প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্মীয় নিপীড়ন যদি কারোর উপর হয়ে থাকে বা তার ভয়ে যদি কেউ এদেশে এসে থাকে সে কিভাবে এটা প্রমাণ করবে যে, এটা তার উপরে হয়েছে? সে কি তাহলে পুলিশে ডায়েরি করে প্রমাণ নিয়ে আসবে? তাড়া খেযে যে আসছে, কী করে সে প্রমাণপত্রগুলি গুছিয়ে নিয়ে আসবে? জানবেই বা কী করে যে কী কী প্রমাণ নিয়ে যাওয়া দরকার। এদেশে এসেই বা জানবে কি করে যে কোথায় তাকে রিপোর্ট করতে হবে?

কোনও দেশে যদি কারো উপর ধর্মীয় নিপীড়ন হয়, নিপীড়িত মানুষজনের প্রতি সহানুভুতি, তাদের পাশে থাকা ভালো কাজ। কিন্তু, শুধু ধর্মীয় নিপীড়ন কেন? যে কোনও নিপীড়নের বিরুদ্ধেই তো থাকতে হবে। আমরা ছিলামও। পূর্ব-পাকিস্তানের উপর যখন পশ্চিম পাকিস্তান ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, ভারত যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে, দেশের মানুষ তা সমর্থন করেছিল। লাখো লাখো উদ্বাস্তু ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এই নিপীড়ন তো ধর্মীয় নিপীড়ন ছিল না। আজ বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে মুসলিম মৌলবাদী বা দাঙ্গার বিরুদ্ধে কথা বলে যদি কোনও মুসলিম নিপীড়নের মুখে পড়ে, সে মুসলিম বলে কোনো হিন্দু তাকে সমর্থন করবে না? কোনো কোনো মুসলিম বুদ্ধিজীবীকে খুন করা হয়েছে মৌলবাদের বিরুদ্ধে বলার জন্য। বাংলাভাষা বাঁচাতে যদি কোনো মুসলমানের উপর নিপীড়ন হয়, বাংলাভাষী হিন্দুরা মুখ ঘুরিয়ে থাকবে? বহু মুসলিম তো পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষা বাঁচাতে শহীদ হয়েছে। 

আর শুধু ঐ ৩টি দেশই বা কেন? শ্রীলঙ্কা থেকে যে ১ লক্ষ শরণার্থী এসেছে তাদের কি হবে? বার্মা যে হাজার হাজার বাংলাভাষীকে তাড়ানো হলো তার কিছু হবে কি? প্রতিবেশী সব দেশের কথা ভাবা হোক। প্রতিবেশী সব দেশেই কারো উপর নিপীড়ন হলে আমরা তার পাশে দাঁড়ানোই তো ভালো। ১৯৪৮ সালে প্যারিসে রাষ্ট্রসঙ্ঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলির সভায় মানবাধিকার সম্বন্ধে একটি সার্বজনীন ঘোষণায় বলা হয়েছে কোনো নিপীড়নের থেকে রক্ষা পেতে প্রত্যেকেরই অন্য দেশে আশ্রয় চাওয়া ও পাওয়ার অধিকার আছে। প্রতিবেশী সমস্ত দেশগুলির থেকে এই  আবেদন আসলে তা গ্রহণ করতে অসুবিধা নেই। শুধু মুসলিমদের বাদ দিয়ে একটা আইন চালু করে ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসাবে ভারতের যে সম্মান ছিল তার মুখ পোড়ানো কেন? মানুষে মানুষে গোলমাল লাগানোই আসল উদ্দেশ্য।

গণশক্তি, ১১ডিসেম্বর, ২০১৯



20190407

‘‘বিজেপি-তৃণমূলের কোনো মৌলিক ফারাক নেই’’: বিমান বসু


 ‘‘বিজেপি-র সঙ্গে তৃণমূলের কোনো মৌলিক ফারাক নেই। অনেকেই ভুলে যান, বিজেপি-কে এরাজ্যে হাত ধরে ডেকে এনেছে এই তৃণমূলই। তৃণমূল আরএসএস-র মতো শক্তিকেও ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে না। আরএসএস-র অনুষ্ঠানে তাদের ‘দেশপ্রেমিক’ বলে সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী!’’ গণশক্তিকে একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বললেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুতৃণমূল-বিজেপি’র মধ্যে গোপন বোঝাপড়া, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার ব্যাখ্যার পাশাপাশি এরাজ্যে বামফ্রন্টের প্রচারের অভিমুখ ও  গোটাদেশে বামপন্থীদের বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অজয় দাশগুপ্ত।



প্রশ্ন: লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বামফ্রন্টকর্মীরা মূলত কী আবেদন নিয়ে যাচ্ছেন?
বসু: এবারের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে সারাদেশে একটা মোড় ঘোরানোর মত অবস্থা তৈরি হয়েছে। যেভাবে দেশের সংবিধানের ওপর আক্রমণ শুরু হয়েছে, সংবিধানের বিশেষ বিশেষ ধারাকে তুলে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, তা আমাদের মত বহু ভাষা, বহু জাতি-বর্ণ ও বহু ধর্মের দেশে বিপজ্জনক। এটা বলছে কেন্দ্রে যারা সরকারে আছে, সেই এনডিএ-র নেতৃত্বে থাকা বিজেপি। এই বিজেপি-র প্রাণভোমরা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএস। এর অসংখ্য শাখা সংগঠন আছে, যারা নানান কায়দায় মানুষের মধ্যে এই ধরণের প্রচার করছে। আরএসএস-র প্রধান লক্ষ্যবস্তু, দেশের গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকেই পরিবর্তন করা, সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেশ চালাতে চায় তারা। এই নির্বাচনে বিজেপি আবার ক্ষমতায় এলে সেই চেষ্টা যে আরএসএস করবে, তা নিজেদের মধ্যে প্রচার করছে। কিন্তু ভারতের এই সংবিধান এবং গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামো সময়ের দ্বারা পরীক্ষিত। দেশের সংবিধানের এই ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে সুরক্ষিত রাখতে হবে। তা রক্ষা করার লক্ষ্যেই বামফ্রন্টকর্মীরা প্রচার করছেন। শুধু তাই নয়, বিজেপি-র আমলে দেশের সাধারণ মানুষের ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতির মেলবন্ধন সুরক্ষিত নয়। তাই, বিজেপি-কে পরাস্ত করতে হবে। কে কী খাবে, কে কী পরবে, এই ধরণের ফতোয়া ওরা জারি করতে চায়! মানুষের ওপর এই অগণতান্ত্রিক আক্রমণ নামিয়ে আনছেএই বিজেপি দেশের মানুষের বন্ধু নয়, দেশের মানুষের শত্রু। অবশ্যই একাংশের মানুষের তারা জিগরি দোস্ত; তারা কারা? যারা মাত্র ১শতাংশ, তাদের বন্ধু বিজেপি। ওপরতলার এই ১শতাংশের হাতে ২০১৪সালে দেশের মোট সম্পদের ৪৯শতাংশ ছিল, ২০১৮সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৩শতাংশ। এদেরই বন্ধু বিজেপি সরকার। স্বাভাবিকভাবেই, আমাদের এই মহান দেশকে সুরক্ষিত  রাখতে এবং দেশের আপামর জনগণ, শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের স্বার্থে, দেশের ঐক্য, সংহতি, সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে আমরা স্লোগান দিয়েছি: ‘বিজেপি হটাও, দেশ বাঁচাও’।

প্রশ্ন: এরাজ্যের ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট তো একইসঙ্গে ‘তৃণমূল হটাও, রাজ্য বাঁচাও’ বলছে...
বসু: হ্যাঁ, এরাজ্যে আমরা একইসঙ্গে ‘তৃণমূল হটাও, রাজ্য বাঁচাও’ স্লোগান দিয়েছি। অনেকে এটা বলতে পারেন, এটা তো লোকসভা নির্বাচন। এই রাজ্যের শাসকদলকে কেন আমরা হটানোর কথা বলছি? তার কারণ হলো, বিজেপি-কে এরাজ্যে হাত ধরে ডেকে এনেছে এই তৃণমূলই, সেকথা অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন। ১৯৯৮সালে তৃণমূল দল তৈরি হওয়ার পর অনেক অশুভ শক্তির সঙ্গেই এই দল সম্পর্ক তৈরি করেছিল, যারমধ্যে বিজেপি-ও ছিল। পরে বিজেপি-র নেতৃত্বে এনডিএ সরকার তৈরি হলে তার অংশীদার হয় তৃণমূল। তৃণমূল আরএসএস-র মতো শক্তিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখে না। আরএসএস-র মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’ পত্রিকার এক অনুষ্ঠানে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী গিয়ে বলেছিলেন, না এলে জানতাম না, এরা কতো ভালো! তাদের ‘দেশপ্রেমিক’ বলে সার্টিফিকেটও দিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেত্রী! নানাসময় বিজেপি-র গুণগানও করেছে তৃণমূল। স্বাভাবিকভাবে যে কোন চিন্তাশীল ব্যক্তিরই এই ধারণা থাকা ভালো, বিজেপি-র সঙ্গে তৃণমূলের কোনো মৌলিক ফারাক নেই। আর ২০১১ সালে সরকারে আসার পর আমরা দেখছি, এই তৃণমূল সরকার নানাভাবে মানুষের টুঁটি চিপে ধরছে, অধিকার হরণ করছে। তৃণমূলের পক্ষ থেকে লাগাতার কমিউনিস্টদের ওপর, বামপন্থীদের ওপর, যারা এই সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন, তাদেরকেই আক্রমণ করা হচ্ছে। এলাকার পর এলাকায় বামপন্থীরা বাড়িঘর ছাড়া হয়েছেন, লাগামহীন অত্যাচার, খুন চলছে। সাধারণ মানুষকে এখানে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই চালাতে হচ্ছে, জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্য লড়াই চালাতে হচ্ছেবিশেষ করে, দ্বিতীয় তৃণমূল সরকার তৈরি হওয়ার পর আমরা দেখছি, লুঠতরাজের রাজত্ব খোলাখুলি শুরু হয়ে গেছে। বেপরোয়া তোলাবাজি চলছে। গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ভূমিসংস্কারের মাধ্যমে যারা জমি পেয়েছিলেন, তফসিলী জাতি, আদিবাসী বা ধর্মের বিচারে মুসলমান মানুষ, তাঁদের অনেকের জমি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা ফসলের ন্যয্য দাম পাচ্ছেন না। সারাদেশের মতো এরাজ্যেও কৃষিসঙ্কট শুরু হয়েছে, যা বামফ্রন্ট সরকারের সময় রোখা গিয়েছিল। তৃণমূল সরকার মানুষের জীবনজীবিকার ওপরে আক্রমণ নামিয়ে আনছে, যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। সেইজন্য রাজ্যে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লড়াইকে জোরদার করতেই তৃণমূলকে পরাস্ত করার বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি এসএসসি চাকরিপ্রার্থীরা ২৯দিন ধরে অনশন করলেন। শিক্ষাক্ষেত্রের অন্যান্যরাও আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু তৃণমূল সরকার তো এরাজ্যে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি জানাচ্ছে....
বসু: হ্যাঁ, তৃণমূল সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়নের উদ্দাম প্রচার চলছেকিন্তু উন্নয়ন-এর কথা দিনরাত জপ করলেও মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত এই আমলে দিনদিন দুর্বল হচ্ছেসে এসএসকে বা এমএসকে, অথবা প্রাথমিক, মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিক হোক, অথবা মাদ্রাসায় প্রতিটি স্তরেই শিক্ষকের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। নিয়োগ হচ্ছে না। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অবস্থা। একটা জিনিস লক্ষ্য করবেন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা তো প্রতিবছর বাড়বে, কম কম হলেও বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।  বামফ্রন্ট সরকারের সময় যেখানে একবার মাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা একবছরে ৭লক্ষ থেকে লাফিয়ে ৯লক্ষে পৌঁছে গিয়েছিল, যা মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রাথমিক ফল। একটা প্রজন্মের পর দ্বিতীয় প্রজন্ম শিক্ষার আঙিনায় এলে এটা হয়। এখন যেমন তৃতীয় প্রজন্ম চলছে। তাহলে মাধ্যমিকে ছাত্রছাত্রী সংখ্যা কমবে কেন? কিন্তু এবারে কমেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা নিয়েও অনেক ঢক্কানিনাদ শোনা যায়। কিন্তু শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রগুলির মতোই এখানেও শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে না। যে সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নই করতে পারে না, সে আবার কী করে উন্নয়নের দাবি জানায়? 

প্রশ্ন: বিজেপি সভাপতি ও শীর্ষ নেতারা এসে এরাজ্যে সাম্প্রদায়িক বিভিন্ন প্রশ্ন, অনুপ্রবেশ, এনআরসি প্রভৃতি প্রসঙ্গ প্রচার করছে। প্রধানমন্ত্রীও এতদিন বিকাশের কথা বলে এখন একইভাবে এইসব সাম্প্রদায়িক প্রচারে নেমেছেন। তৃণমূলও পালটা প্রচার করছে। একদিকে, সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এবং অন্যদিকে গোপন বোঝাপড়া, এই দ্বিমুখী বিপদকে বামপন্থীরা কিভাবে মোকাবিলা করবে?
বসু: এরা শলাপরামর্শ করেই পরস্পরের বিরুদ্ধে নাম করে তোপ দাগেবিজেপি সভাপতি বা প্রধানমন্ত্রী এরাজ্যে বক্তৃতা দেওয়ার সময় তৃণমূলনেত্রীকে ‘দিদি’ ডেকে তোপ দাগেন, আবার তৃণমূলনেত্রী তাঁদের নানা নামে ডেকে পালটা বলছেন। মনে হবে ওদের মধ্যে ভীষণ বিরোধ আছে! আসলে এটাই ওদের বোঝাপড়া তৃণমূল এবং বিজেপি-র মধ্যে বোঝাপড়া থাকার কারণেই গত ৫বছরে সারদা-রোজভ্যালিসহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নেয়নি! নারদা ঘুষকান্ডের ভিডিও ফুটেজ ফরেনসিক টেস্টে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সংসদের এথিক্স কমিটির একটি বৈঠকও তিন বছরে ডাকেনি এনডিএ সরকার! কেন? অন্যদিকে, সুক্ষ্ণ সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ উভয় দলের পক্ষ থেকেই চলছে। রামনবমীকে কেন্দ্র করে হঠাৎ দুই দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেলো! গতবছর রামনবমীর দিন যেভাবে দাঙ্গা হলো অতীতে পশ্চিমবাংলায় কখনো তা হয়নি। আবার আসানসোলের ইমামের যে ভূমিকা নিয়েছিলেন, তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ইতিহাসে জ্বলজ্বল করে লেখা থাকবে। তাঁর পুত্র খুন হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি প্রতিশোধ না নিয়ে ‘আমন’ বা শান্তি বজায় রাখার কথা বলেছিলেন। রামনবমীকে কেন্দ্র করে যে হিংসার পরিবেশ সৃষ্টি হলো, এরজন্য দায়ী তৃণমূল কংগ্রেস। একইসঙ্গে বিজেপি-ও, যাকে হাতে ধরে নিয়ে এসেছে তৃণমূল। বিজেপি এরাজ্যে তাদের বিভিন্ন শাখা সংগঠনের মাধ্যমে এই ধরণের কার্যকলাপ করার সুযোগ পেয়েছে। আরএসএস-র শাখা তৃণমূলের আমলে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে পশ্চিমবাংলায়। সারাদেশে বিজেপি যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা করছে, তা এখানেও সুকৌশলে করছে। অন্যদিকে, তৃণমূলও ভিন্ন কায়দায় সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করছে। উভয় দলের পক্ষ থেকে মানুষকে সাম্প্রদায়িকভাবে বিভাজনের চেষ্টা হচ্ছে। এই দুটি দক্ষিণপন্থী দলই বামপন্থীদের শত্রু। কারণ, এতদিন ধরে বামপন্থীরা যে সমস্ত ইস্যুতে আন্দোলন করেছে, যেমন চিট ফান্ড কেলেঙ্কারিতে ক্ষতিগ্রস্তদের টাকা ফেরত, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম, বেকার যুবকদের চাকরি, শিক্ষক নিয়োগে দূর্নীতিসহ বিভিন্ন জনসাধারণের রুটিরুজির সমস্যা, তা এদের দুই দলের বিরুদ্ধেই। নির্বাচনের মুখে এসে সেসব মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। উভয়ের বিরুদ্ধেই আমাদের সম্প্রীতি রক্ষার লক্ষ্যে আমাদের মানুষের মধ্যে ঐক্য রক্ষার চেষ্টা করতে হবে।  নানারকম প্ররোচনা সত্ত্বেও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের চেষ্টায় অনেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোখা গেছে, যা পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্য।    

প্রশ্ন: এরাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপি-বিরোধী ভোট এক জায়গায় করার উদ্যোগ আপনারা নিয়েছিলেন। সেই উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয়নি। বামফ্রন্ট দুটো আসনে প্রার্থী দেয়নি। সেই দুটো আসনে বামফ্রন্টকর্মীরা কী প্রচার করবেন? 
বসু: এরাজ্যে তৃণমূল ও বিজেপি-র বিরুদ্ধে ভোট এক জায়গায় করার লক্ষ্যে আমরা কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে চেয়েছিলাম। সেই উদ্যোগ শেষপর্যন্ত সেভাবে ফলপ্রসূ হয়নি। কিন্তু দুটো আসন, মালদহ দক্ষিণ এবং বহরমপুরে বামফ্রন্ট কোনো প্রার্থী দেয়নি। এতেই বোঝা যাবে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা কী। তৃণমূল ও বিজেপিকে পরাস্ত করার লক্ষ্যেই এই দুই কেন্দ্রে কাজ করছেন বামফ্রন্টকর্মীরা। যেহেতু এই দুই কেন্দ্রে বামফ্রন্ট প্রার্থী নেই, বিজেপি ও তৃণমূলকে হারাতে সক্ষম এবং এরাজ্যে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে এমন প্রার্থীর পক্ষেই তাঁরা প্রচার করছেন। কেন্দ্রে একটি বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠনে সহায়ক শক্তিকে এই দুই এলাকায় জয়ী করার লক্ষ্যে ভোট দেবেন বামফ্রন্টকর্মীরা।

প্রশ্ন: ২০১১সালের পর থেকে এরাজ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে শাসকদলের ভয়াবহ সন্ত্রাস দেখা গেছে। লোকসভা নির্বাচনে তার পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে করছেন?
বসু: একথা ঠিক যে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় বহু জায়গায় মনোনয়নপত্রই জমা দিতে দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে বীরভূমের উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। যেখানে জেলা পরিষদের আসনেও বিরোধী দলের কাউকে প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দিতে দেওয়া হয়নি। তবে লোকসভা নির্বাচনে হুবহু তার পুনরাবৃত্তি হবে বলে আমি মনে করি না। যদি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এলাকায় এলাকায় রুটমার্চ করানো হয় এবং পোলিং স্টেশনের বাইরে মোতায়েন করা যায়, তবে ভোটারদের মধ্যে ভোটদানের পক্ষে আস্থা তৈরি করা সম্ভব হবে। অন্যদিকে, ভোট যারা লুট করে, তাদের পৃষ্ঠপোষক রাজ্য প্রশাসন, সেইসব ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আটকানো যায়, তবে মানুষ ভোট দিতে পারবেনআর জনগণের পক্ষ থেকেও নিজের ভোট নিজে দেবো এই জেদ ধরেই চলা উচিত। এক্ষেত্রে অবশ্যই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রাম জারি রাখতে জানকবুল লড়াই করা একান্ত জরুরী।     

প্রশ্ন: কেন্দ্রে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, বিকল্প সরকার গড়ে তোলার যে স্লোগান বামপন্থীরা দিয়েছে, তা কতটা সফল হবে বলে মনে করেন?
বসু: এবারের লোকসভা নির্বাচনে আমরা স্লোগান দিয়েছি, বিজেপি সরকারকে পরাস্ত করো, লোকসভায় সিপিআই(এম) ও বামপন্থীদের শক্তি বাড়াও এবং কেন্দ্রে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বিকল্প সরকার তৈরি করো। সারাদেশে এখন যে পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, বিভিন্ন রাজ্যে এবং আমাদের রাজ্যে, তাতে এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিজেপি-বিরোধী একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার তৈরির বাস্তবতা রয়েছে। বিজেপি সারাদেশে ধিক্কৃত হয়েছে, সারাদেশে বিজেপি-র আসন কিভাবে কমবে, তা ওরা উপলব্ধি করতে পারছে না। নির্বাচনের পরে এনডিএ-বিরোধী একটি সরকার তৈরির বাস্তব পরিবেশ সৃষ্টি হলে তা নিশ্চয়ই গতিবেগ পাবে  এবং বিকল্প একটি সরকার তৈরি হবে, সেই আশা রাখছি।     



20190401

নির্বাচনের পরে রাজ্য-রাজনীতিতে সৃষ্টি হবে নতুন পরিস্থিতি: সূর্য মিশ্র


সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যের মানুষও সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের মুখোমুখি। এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে কোন আবেদন নিয়ে যাচ্ছেন বামপন্থীরা? কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসকদলের মধ্যে মেরুকরণের চেষ্টা, উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক প্রচার, নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করার চেষ্টা, এসবের মোকাবিলা করে বামপন্থীরা কী তাদের বিকল্পের সংগ্রামকে শক্তিশালী করতে পারবে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে? গণশক্তিকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বিস্তারিতভাবে মতামত জানিয়েছেন সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্র। নির্বাচনের পরে এরাজ্যের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রসূন ভট্টাচার্য: 
-----------------------


প্রশ্ন: এবারের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে বামপন্থীরা কী আবেদন জানাবে? এই নির্বাচনে এরাজ্যের মানুষ কেন বামপন্থীদের সমর্থন করবেন?

মিশ্র: এই নির্বাচনে দেশের ও রাজ্যের মানুষের সামনের প্রধান বিষয়গুলির থেকে মানুষের নজর সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের কর্মসংস্থানের সমস্যা। ৪৫ বছরের মধ্যে এমন খারাপ অবস্থা হয়নি। কাজ ছিলো  যাদের তাদেরও কাজ চলে যাচ্ছে। মোদী বলেছিলেন, প্রতি বছরে দুকোটি বেকারকে কাজ দেবেন। এখানে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, বেকারী শতকরা চল্লিশ ভাগ বেকারী কমে গেছে রাজ্যে। যে যা খুশি বলছেন। কিন্তু জাতীয় নমুনা সমীক্ষার সর্বশেষ তথ্য যা সরকার চেপে রাখার চেষ্টা করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ৫বছরে ৫কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। ১কোটি ৮০লক্ষ মানুষ শিল্প ও পরিষেবার থেকে কাজ হারিয়েছেন মূলত নোটবন্দী ও জিএসটি’র কারণে এবং ধারাবাহিক শিল্পমন্দার কারণে। তার সঙ্গে প্রায় ৩কোটি ২০লক্ষ মানুষ যারা কৃষিকাজে স্থায়ীভাবে না হলেও যুক্ত ছিলেন তাঁরা কাজ হারিয়েছেন। শিল্প কৃষি দুটোতেই নজিরবিহীন সঙ্কট। ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হচ্ছে, লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত্ব কারখানার বেসরকারীকরণ করে দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়েই শূন্যপদে নিয়োগ বন্ধ করে রেখেছে। এরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আবার শিক্ষায় ইন্টার্ন নিয়োগের কথা বলেছেন যেগুলো আদৌ স্থায়ী কর্মসংস্থান নয়। কেন্দ্রীয় সরকারও রেল এবং অনেক ক্ষেত্রে এই কাজই করছে। কৃষিতে স্বাধীনতার পরে এমন সঙ্কট আসেনি। ফসলের দাম না পাওয়ায় চাষের খরচও উঠছে না, কৃষকরা আত্মহত্যা করছেন। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে ফসলের দাম দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার করেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, কৃষকদের আয় দ্বিগুন করবেন। আর মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, কৃষকদের আয় তিনগুন হয়ে গেছে। দুটোই হাস্যকর দাবি। কৃষকরা দুরবস্থার মধ্যে আছেন। ফসলবীমার নামে ৫টা কর্পোরেট সংস্থা ৭হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। অন্যদিকে এরাজ্যে অকাল বৃষ্টিতে আলুর ক্ষতি হয়েছে, আলু নিয়ে কৃষকরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। কেজি প্রতি ৭টাকার কম দাম হলে কৃষকদের লাভ হয় না, অথচ আলুচাষীরা ২-৩টাকা দাম পাচ্ছেন। সরকার সমস্যাটা স্বীকারই করতে চাইছে না। তেলেঙ্গানা সরকার রায়তবন্ধু নামে, কেন্দ্রীয় সরকার কৃষকসম্মান নামে আর এরাজ্যের সরকার কৃষকবন্ধু নামে প্রকল্প যা করেছে তাতে ফসলের দাম, বীমা, ঋণ এসবের সমাধান না করে কৃষকদের হাতে থোক টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এতে সমস্যা মিটবে না। তাছাড়াও সরকারের জনবিরোধী নীতির জন্য মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ বাড়ছে। শিক্ষা স্বাস্থ্যে সরকারের বেসরকারীকরণের জন্য মানুষের খরচ বাড়ছে, বোঝা বাড়ছে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতির ফোন পেয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী সেদেশের মোটরসাইকেলের ওপর শুল্ক তুলে নিচ্ছেন। আর আমেরিকা এখানকার ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়ামে শুল্ক চাপাচ্ছে। দেশের শিল্প পরিষেবা রক্ষায় সরকারের নজর নেই। এই সব জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে বামপন্থীরা।

এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি। কেন্দ্র ও রাজ্য দুই জায়গাতেই দুর্নীতি। ওখানে রাফালে দুর্নীতি, এখানে সারদা নারদ দুর্নীতি। ওখানে ওরা থাকলে যে এখানে এরা নিরাপদ তা এখন প্রমাণিত হয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও পাঁচ বছর হয়ে গেলো কেন্দ্রীয় সরকারের সিবিআই, ইডি কেউ সারদার নারদার আসামীদের বিরুদ্ধে কিচ্ছু করেনি, তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমরা স্পষ্টভাবে মানুষের কাছে বলছি, এই সব বিষয়ে বামপন্থীদের বিকল্প রয়েছে। আমরা যে দাবি নিয়ে ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘট করেছি, ব্রিগেডে সমাবেশ করেছি, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান এবং দিল্লির বুকে শ্রমিক, কৃষক, আশা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের নিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন করেছি, ইশতেহার প্রকাশ করে উল্লেখ করেছি, সেইসবই আমাদের বিকল্প। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্যও বাড়ছে। আদিবাসীদের এবং তফসিলি জাতির মানুষের উন্নয়ন কর্মসূচী কেন্দ্রীয় সরকার ছাঁটাই করছে, নারী ও শিশুকল্যাণে বরাদ্দ ছাঁটাই করেছে, দলিত সংখ্যালঘুদের অধিকার ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে, আর এরাজ্যে মহিলাদের নিরপত্তার হাল তো সবাই জানেন। সংখ্যালঘু দলিতদের ওপরে আক্রমণের ঘটনা বারবার দেখা যাচ্ছে সারা দেশে। আমাদের বার্তা হলো এই যে এসবের বিরুদ্ধে বামপন্থীরা বিকল্পের দাবিতে যে লড়াই আন্দোলন করছে তার কন্ঠস্বর সংসদে পৌঁছে দিতে হবে। সেটা যে করা যায় ২০০৪ সাল তার একটা দৃষ্টান্ত। সেই সময়ে সংসদে বামপন্থীরা যখন শক্তিশালী ছিলো তখন কাজের অধিকার, আদিবাসীদের অরণ্যের অধিকার, বীমা ব্যাঙ্ক বেসরকারীকরণ রোধ, খাদ্য ও শিক্ষার অধিকারের নিশ্চয়তা এসব করা গেছিলো। এখনকার পরিস্থিতি ২০০৪ সালের থেকেও কঠিন, আক্রমণ আরও তীব্র, কিন্তু এখনও বামপন্থাই বিকল্প। আমরা মানুষের কাছে বামপন্থীদের বিকল্পের লড়াইয়ের কন্ঠস্বর সংসদে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই আবেদন করবো।

প্রশ্ন: জনজীবনের সমস্যার সমাধানের জন্য যে বিষয়গুলিকে আপনারা বামপন্থীদের বিকল্প হিসাবে তুলে ধরছেন, সেই বিকল্পের জন্য বামপন্থীরা এরাজ্যে আন্দোলন সংগ্রাম কতটা করতে পেরেছে? তার কোনো প্রভাব নির্বাচনে পড়বে কি?

মিশ্র: এরাজ্যে এবং সারা দেশে এই সময়কালে যদি কেউ লড়াইয়ের ময়দানে থেকে থাকে তাহলে তা বামপন্থীরাই। আমরা নিরন্তর আন্দোলনেই আছি। গত আগস্ট মাসে সারা দেশের সঙ্গে এরাজ্যের জেলাগুলিতেও আইন অমান্য আন্দোলন হয়েছে। শত শত মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, বামপন্থী কর্মীদের বিরুদ্ধে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা দেওয়া হয়েছে। জনজীবনের দাবি নিয়ে বামপন্থী গণসংগঠনগুলি, তাদের সংগঠন বেঙ্গল প্ল্যাটফর্ম অব মাস অর্গানাইজেশন একাধিক পদযাত্রা করেছে। তারপরে ৪৮ ঘন্টার সাধারণ ধর্মঘট হয়েছে। অন্যান্য রাজ্যের সরকারগুলি যা করেনি এরাজ্যের তৃণমূল সরকার সেই আক্রমণ করেছে ধর্মঘট ভাঙতে। আইনী এবং বেআইনী পদক্ষেপ নিয়ে ধর্মঘট ভাঙতে চেষ্টা করেছে, আক্রমণের রেকর্ড তৈরি করেছে। কিন্তু মানুষের বার্তা স্পষ্ট ছিলো, ঐতিহাসিক ধর্মঘট হয়েছে। তারপরে সেই বার্তা নিয়ে ব্রিগেড সমাবেশ হয়েছে বামফ্রন্টের। ব্রিগেডের সমাবেশ প্রমাণ করেছে, বামপন্থীরাই শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করছে। নির্বাচনে নিশ্চয়ই এর প্রতিফলন ঘটবে।

প্রশ্ন: এটা কেন্দ্রের সরকার গঠনের নির্বাচন। কিন্তু এরাজ্যের রাজনীতিতে এর তাৎপর্য্য কী? বিশেষ করে বামপন্থীরা যখন কেন্দ্র ও রাজ্যের দুই শাসকদলেরই বিরোধিতার কথা বলছে, তখন এই নির্বাচন কি রাজ্য রাজনীতিতে নতুন কোনো পরিস্থিতি নিয়ে আসতে পারে?

মিশ্র: আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ২মাসের মধ্যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার হঠে যাবে, মোদী আর গদিতে থাকবেন না। কেন্দ্রে একটা বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ সরকার তৈরি হবে এবং বামপন্থীদের শক্তি সংসদে বাড়বে। এরমধ্য দিয়ে সারা দেশে মানুষের দাবির লড়াই আরও প্রসারিত হবে। এরাজ্যেও নির্বাচনের পরে তার প্রভাব পড়বে, তৃণমূল কংগ্রেস আরও দু’বছর সরকার চালাতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে। কারণ তৃণমূল দলটাই ভেঙে যাচ্ছে। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত দল ভেঙে বিজেপি’তে যোগ দিচ্ছে। আরও অনেকে ভেতরে ভেতরে যোগাযোগ রাখছে চলে যাবে বলে। কারণ যারা লুটপাটের মাধ্যমে লাভবান হয়েছেন তাঁরা আধিপত্য রাখার জন্য আনুগত্য বদলাতে চাইবে। এই অবস্থায় বর্ধিত শক্তি নিয়ে বামপন্থীদের লড়াই হবে বিজেপি যাতে মাথা তুলতে না পারে এরাজ্যে, তার জন্য নতুন পর্বের সংগ্রামের সূচনা হবে।

প্রশ্ন: কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি এবং এরাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস পরস্পরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচার করছে। এই মেরুকরণের মোকাবিলা করে কীভাবে বামফ্রন্ট নির্বাচনে লড়াই করবে?

মিশ্র: বিজেপি বলছে গণতন্ত্র আক্রান্ত। ঠিকই তো। কিন্তু গণতন্ত্র তো ২০১১ সাল থেকেই আক্রান্ত। আমরা তখন থেকেই বলছি, বিজেপি তখন কী করছিলো? বিজেপি সরকারের তো পাঁচবছর হয়ে গেলো, অথচ সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট আদেশ থাকা সত্ত্বেও চিটফান্ডে বৃহত্তর ষড়যন্ত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? কেন প্রতারকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে প্রতারিতদের টাকা ফেরৎ দেওয়া হলো না? নারদ টেপ তো ফরেনসিকে প্রমাণিত, ওটা জাল নয়। সংসদে এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আদবানি। কেন একদিনও সেই কমিটি বসতে পারলো না এটা নিয়ে? এটা বোঝাপড়া নয় তো বোঝাপড়া কাকে বলে! আর গণতন্ত্র নিয়ে বিজেপি কী বলবে, এখানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা ৩৪শতাংশ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় দেখেছি, ত্রিপুরায় বিজেপি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে প্রায় ৯৯শতাংশ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় করে। রামনবমীতেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণে দুটো দলকেই দেখো গেছে। নীতি, দুর্নীতি, সাম্প্রদায়িকতা, যে কোনো প্রশ্নে তৃণমূল এবং বিজেপি একে অপরের পরিপূরক, কোনো ফারাক নেই। এই যে সর্বশেষ মুখ্যমন্ত্রীর ভাইপো’র স্ত্রীকে নিয়ে বিমানবন্দরের ঘটনাটা ঘটলো। উনি নাকি ২কেজি সোনা নিয়ে এসেছিলেন। তা কাস্টমস সেটা আটক করলো না কেন? কাস্টমস্‌ কারা চালায়? নতুন ফেডারেল কাঠামোয় ওটাও রাজ্যের হাতে চলে এসেছে নাকি! কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু করার নেই? কাজেই বিজেপি’র প্রতিবাদ করার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। ত্রিপুরার মতো গোটা তৃণমূল দলটা যদি এখানেও বিজেপি’তে চলে যায় অবাক হওয়ার কিছুই নেই। তৃণমূলকে ভোট দেওয়া আর বিজেপি’কে ভোট দেওয়া একই ব্যপার। তাই আমরা নির্বাচনে দুটো দলের বিরোধী ভোটকে ঐক্যবদ্ধ করার আহবান জানিয়েছি।

প্রশ্ন: যেভাবে যুদ্ধোন্মাদনা এবং জাতীয়তাবাদের ভাবাবেগ জাগানো হচ্ছে তাতে জনসাধারণের রুটিরুজির সমস্যা কি নির্বাচনের মুখে এসে চাপা পড়ে যাচ্ছে? কাশ্মীরেরর ঘটনা, জওয়ানদের মৃত্যু এবং সীমান্তে সেনা কার্যকলাপ কি এরাজ্যেও ভোটদানের সময় জনসাধারণকে চালিত করবে?

মিশ্র: ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ রাজ্যে, বিশেষত রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়ের মতো বিজেপি’র শক্ত ঘাঁটিতে তাদের পরাজয়ের পরেই আমরা সিপিআই(এম)’র পক্ষ থেকে বলেছিলাম বিজেপি অপরাজেয় নয় প্রমাণিত হলো। কিন্তু তখনই সতর্ক করেছিলাম এরা আরও তুরুপের তাস বের করবে। বাস্তবে তাই করেছে। রামমন্দির ইস্যুকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। এনআরসি এবং নাগরিকত্ব বিল নিয়ে সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে দেওয়ার কথা বলে মেরুকরণের চেষ্টা করেছে। আর সেই সঙ্গে কাশ্মীর ও পাকিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি করে সারা দেশে তার ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা করেছে। আমরা এই বিষয়গুলি নিয়ে ডিসেম্বর মাসেই সতর্ক করেছিলাম। কাশ্মীরে বিজেপি পিডিপি’র সঙ্গে সরকারে ছিলো, সেই সরকারকে ভেঙে দিলো। ওখানকার মানুষের আস্থা নষ্ট করছে, তাঁদের অধিকার খর্ব করছে। পুলওয়ামায় ঘটনার জন্য দায়ী তো সরকারের গাফিলতি। বিজেপি সরকারের আমলে দেশে নিরাপত্তা রক্ষীরা বেশি সংখ্যায় প্রাণ দিয়েছে, আর সীমান্ত পার থেকে অনুপ্রবেশও বেশি সংখ্যায় হয়েছে। এই সরকার দেশের নিরাপত্তা, সংবিধান, ঐক্য সবকিছু রক্ষাতেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এখন সেগুলো থেকে নজর ঘোরাতে বায়ুসেনার কর্মী অভিনন্দনের ছবি দেখিয়ে ভোট চাইতে হচ্ছে! এতই দেউলিয়া অবস্থা বিজেপি’র। কিন্তু ওরা মানুষের প্রকৃত বিষয়গুলি থেকে নজর ঘোরাতে চাইলেও আমরা বামপন্থীরা প্রকৃত বিষয়গুলি নিয়েই প্রতিদিনের লড়াইতে আছি। এই যে ধর্মতলায় এসএসসি উত্তীর্ণ ছেলেমেয়েরা অনশনে বসে মুখ্যমন্ত্রীর তথাকথিত ‘অনশন’এর রেকর্ড ভেঙে দিলেন সেটা কী এইসব মেরুকরণ করে নজর ঘুরিয়ে আটকাতে পারলো? আলুচাষীদের বিক্ষোভকে আটকাতে পারলো? পারবে না। তবে আমরা মনে করি, স্বাধীনতার পরে সংসদীয় গণতন্ত্রের সামনে এটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে দুবার এরকম চ্যালেঞ্জ এসেছিলো। ১৯৭৭ সালে এবং ২০০৪ সালে। দুবারই দেশের নির্বাচকমন্ডলী প্রমাণ করেছেন যে সংসদীয় গণতন্ত্রের ওপরে আক্রমণ মোকাবিলায় তাঁরা সক্ষম। 

প্রশ্ন: আমাদের শেষ প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গে বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচন সহ বিভিন্ন নির্বাচনে শাসকদলের সন্ত্রাস দেখা গেছে। মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এবার অবাধে ভোট দিতে পারবেন কিনা। লোকসভা নির্বাচনে কি এর জন্য আপনারা নির্বাচন কমিশনের ওপরেই ভরসা করছেন?

মিশ্র: আমরা বারবার বলছি, নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা, নিরপেক্ষতা, কার্যকারিতা এসব নিয়ে কোনো অতিরিক্ত মোহ রাখবেন না। তার মানে এই নয় যে কমিশনে অভিযোগ জানাবেন না। অভিযোগ জানাতে হবে, লিপিবদ্ধ রাখতে হবে। সুযোগের ব্যবহার করতে হবে। অভিযোগ করে কিছু তো আদায় করা সম্ভব হয়। যেমন গতবার তো পরিচিতি পত্র ছাড়াই বুথ শ্লিপ দিয়ে ভোট দিয়েছিলো। এবার কমিশন আমাদের দাবি মেনেছে। কাজেই মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে, অধিকার রক্ষার লড়াইতে মানুষকে সংগঠিত করাটা নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমি বলতে চাইছি, যে এটা পঞ্চায়েত নির্বাচন নয়। ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় যে সব নির্বাচন এই সময়ে হয়েছে সব অবাধ হয়েছে এমন মোহ আমি রাখতে বলছি না। কিন্তু আমি বলছি, বাস্তবতা হলো, তৃণমূল ভয় পেতে শুরু করেছে। পঞ্চায়েতে ৩৪শতাংশ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতেও এমন শতাধিক পঞ্চায়েত আছে যেখানে তৃণমূল জিতেও কর্মকর্তা নির্বাচিত করতে পারছে না। তৃণমূলের হাতে তৃণমূলই আক্রান্ত। তৃণমূলের নেতাদেরই নিরাপত্তা নেই। এমনকি বিধায়কদেরও নেই। কেউ ছাড় পাচ্ছে না, নিজেদেরই হাতে আক্রান্ত হচ্ছে, বোমা ফাটছে, খুন হচ্ছে। তৃণমূলের এত দ্রুত ক্ষয় ২০১১ সালের পরে কখনো দেখা যায়নি। এই অবস্থায় প্রত্যেক বুথে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, যেখানে মানুষ লাল পতাকা তুলে ধরবেন, বামপন্থী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যাবেন। মানুষ যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে ওরা পালাবে। এটাই বাস্তবতা। কাজেই আমি বলিষ্ঠ আশাবাদে বিশ্বাসী। মানুষ শপথবদ্ধ হচ্ছেন, মরিয়া হয়ে তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন এটাই সুষ্ঠু ভোটের সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি হতে পারে। 

গণশক্তি, ১লা এপ্রিল, ২০১৯

20181215

After the culmination of a farmer's march in Kolkata, 100,000 farmers have gathered in the capital city of Delhi to protest against the agrarian crisis.

আত্মহত্যা থেকে প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের পথে কৃষকরা: এক ঐতিহাসিক সূচনা

পি সাইনাথ 

over-a-lakh-protesting-farmers-take-out-kisan-mukti-march-in-delhi-500210



ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি আর ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবিতে ২৯ এবং ৩০ নভেম্বর দিল্লির রাজপথ কাঁপিয়েছেন কৃষকরা। হাফিংটন পোস্টে প্রকাশিত সাংবাদিক পবন দহতের নেওয়া একটি সাক্ষাৎাকারে এই আন্দোলনকে ঐতিহাসিক সূচনা বলে চিহ্নিত করেছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক পি সাইনাথ। এখানে সাক্ষাৎকারটি সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করা হলো।
--------------------------------------------------------------

প্রশ্ন: ‘দিল্লি চলো’ মার্চ কীসের জন্যে?

অল ইন্ডিয়া কিষাণ সংঘর্ষ কোঅর্ডিনেশন কমিটি (এ.আই.কে.এস.সি.সি) প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টা কৃষক সংগঠনের একটি সংঘ, তাদের কেউ কেউ খুব ছোটো, কেউ কেউ খুব বড়ো। তারা একটা ডাক দিয়েছে নভেম্বরের ২৯ আর ৩০ তারিখ সংসদ ভবন যাওয়ার। এই ভাবনাটা এসেছে নাসিক মুম্বাই মার্চের পরে, যেখানে এই বছরের শুরুতে ৪০ হাজার আদিবাসী কৃষক মুম্বাই এসেছিলেন আর তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ১০ হাজার সাধারণ মানুষএকেবারে পদ্ধতিগত ভাবে কৃষকদের কোনও গুরুত্বপূর্ণ দাবিকেই সংসদ এতদিন নজর দেয়নি। স্বামীনাথন কমিশনের প্রথম রিপোর্ট জমা পড়েছিল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। আর শেষ রিপোর্ট জমা পড়েছে ২০০৬ সালের অক্টোবরে। গত ১৪ বছর ধরে কৃষকদের জাতীয় কমিশন সংসদে স্রেফ পড়ে আছে, এত বছরে সংসদ এক ঘণ্টা সময়ও বার করতে পারেনি সে বিষয়ে আলোচনার জন্যে। কিন্তু যখন কর্পোরেট সেক্টর বা জিএসটি-র মতো বিষয় আসে, যেগুলো একেবারে দায়িত্ব নিয়ে হাজার হাজার ছোটো মাঝারি সংস্থাকে ধ্বংস করছে, তখন সংসদ এক সপ্তাহের মধ্যে বিশেষ অধিবেশন ডেকে মাঝরাতে সেই বিল পাস করতে পারে। কিন্তু ১৪ বছর ধরে তাঁরা সময় পায়নি কৃষকদের জাতীয় কমিশন নিয়ে আলোচনার জন্যে.আই.কে.এস.সি.সি প্রধানত দুটি দাবি নিয়ে জোর দিচ্ছে। একটি হল ন্যূনতম সহায়ক মূল্য আর অনুদানমূলক মূল্য বিষয়ে সংসদে একটা প্রাইভেট মেম্বর বিল আনা। আর দ্বিতীয়টি হল কৃষিঋণ থেকে মুক্তির বিল। কিন্তু কৃষি সংকট একটা বড়ো বিষয়, সেটা ঠিক দুয়েকটা বিলের বিষয় নয়।

আমি মনে করি, নাসিক-মুম্বাই মার্চ একটা টার্নিং পয়েন্ট যা গোটা দেশের কৃষক ও সাধারণ মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে উৎসাহ দিয়েছে। তারপর থেকে দেশের নানা জায়গায় অন্তত কুড়িটা কৃষক মার্চ হয়েছে। এটা একটা বিস্ময়কর ঘটনা যে কৃষকেরা তাদের বিগত বিশ বছরের হতোদ্যম অবস্থা থেকে জেগে উঠছেন এই হতোদ্যম অবস্থা তাদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, জেগে উঠে তাঁরা প্রত্যক্ষ প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটছেন যেটা তাঁদের অধিকার আদায়ের দিকে নিয়ে যাবে। আমি মনে করি, এটা একটা খুবই ভালো জিনিস ঘটছে। আমি প্রস্তাব দিয়েছি, তাদের একটা দাবি হওয়া উচিত যে, সংসদকে কেবলমাত্র কৃষি সংকট নিয়ে তিন সপ্তাহের একটা বিশেষ অধিবেশন ডাকতে হবে। যেখানে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, সেখানে এই বিষয়ে সারা দেশের নজর পড়া উচিত। গোটা দেশের কৃষকদের এটা বলা দরকার যে, তাঁরা দেশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, দেশ তাদের ব্যাপারে ভাবুকযখন এ.আই.কে.এস.সি.সি আর বাকিরা কৃষক মার্চের দাবিকে সমর্থন করল তখন বিভিন্ন মধ্যবিত্ত পেশাজীবী এই বছরের অগাস্ট মাসে দিল্লিতে একসঙ্গে বসে। একটা ফোরাম তৈরি হয়েছে, নাম ‘নেশন ফর ফার্মার’।

শেষ কবে বলুন তো মধ্যবিত্ত মানুষেরা কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেছেন? নাসিক-মুম্বাই মার্চের সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হচ্ছে এর মধ্যে দিয়ে সেটা আবার শুরু হয়েছে। কৃষক এবং মজুর গণপরিসরে সাধারণ মানুষের আলোচনার মধ্যে উঠে আসছে, মধ্যবিত্ত অঙ্গনওয়ারীর মানুষের সঙ্গে কথা বলছে, কৃষক আর খেতমজুরের সঙ্গে কথা বলছে। এটা গণতন্ত্রের পক্ষে ভালো, এটা সমতার, সাম্যের পক্ষে ভালো।

প্রশ্ন: সংসদে ২১ দিনের বিশেষ অধিবেশনের দাবির ক্ষেত্রে ভাবনাটা কী?

‘নেশন ফর ফার্মার’ এর ভাবনাটা এরকম যে, সংসদে কমপক্ষে তিন সপ্তাহের একটা বিশেষ অধিবেশন প্রয়োজন কারণ তাদের অনেকগুলো বিষয়ে নজর দিতে হবে। অন্তত তিন দিন লাগবে স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টের অনুপুঙ্খ আলোচনার জন্য। কয়েক দিন লাগবে সহায়ক মূল্য আর কৃষিঋণ মুকুবের বিল দুটো পাস করতে, কারণ অনেকগুলি রাজনৈতিক দল এতে সই করেছে এই বলে যে এই বিষয়ে সমর্থন আছে ফলে তাঁরা এই দুটি বিল খুব সহজেই তাড়াতাড়ি পাস করাতে পারেন। তিন দিন ঋণ সংকট নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার জন্যে, যেটা কেবল একটা কৃষিঋণ মুকুবের থেকে অনেক বড়ো বিষয়। আমি কৃষিঋণ মুকুবের পক্ষে, কিন্তু যতক্ষণ না আপনি ঋণ ব্যবস্থাকে নতুন করে পর্যালোচনা করছেন পরের বছরে আবার কৃষকেরা এসে একই সমস্যার মুখে পড়বেন কারণ কৃষি ঋণের সুযোগকে কৃষকের দিক থেকে কৃষি ব্যবসায়ীর দিকে ঘুরয়ে দেওয়া হয়েছেছোটো এবং প্রান্তিক কৃষকের কাছে ক্ষুদ্র ঋণের নামে দিনে দিনে আরও কম টাকা যাচ্ছে। তাই তিন দিন আলোচনা হোক ঋণ সংকট আটকাতেএর আরেকটা অর্থ সরকারি ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণ করা যাবে না। নয়তো এই মানুষগুলো কোনও ঋণ পাবেন না। উলটে এদের প্রাপ্য ঋণের টাকা আবার পাঠিয়ে দেওয়া হবে বড়ো কর্পোরেট কোম্পানির কাছে। তিন দিন আলোচনা হোক কৃষিতে যে ভয়ংকর জলসংকট চলছে তাই নিয়ে, এটা কিন্তু খরার থেকেও অনেক বড়ো সমস্যা। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই দেশ এই বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কিছু ভাবছেই না। দেশে জল সংকটের ক্ষেত্রে অনেকগুলো স্থানান্তর বা হাত বদল হয়ে গেছে, যেমন জল চলে গেছে গরিবের থেকে বড়োলোকের হাতে, কৃষির থেকে শিল্পের হাতে, খাদ্য শস্যের বদলে অর্থকরী ফসলের হাতে, গ্রাম থেকে শহরের হাতে, জীবিকা থেকে লাইফস্টাইলের হাতে। জল নিয়ে একটা আইন থাকা দরকার যে এটা পণ্য বা ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটা মৌলিক মানবাধিকার। সমানাধিকার আর ন্যায়বিচারের আরও কিছু বিষয় আছে এখানে। গ্রামাঞ্চলে জলের অধিকার নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত, বিশেষত যাদের জমি নেই, যাঁরা কৃষক নন তাদেরও জলের অধিকার নিয়ে।

তিন দিন এই আলোচনায় সময় দেওয়া হোক মহিলা কৃষকদের নিয়ে, যেটা আমার মনে হয় আলোচনা না করলে কখনওই কৃষি সংকটের সমাধান হবে নাআলোচনা করতে হবে মহিলা কৃষকদের কৃষিরঅধিকার এবং স্বীকৃতি, মহিলা কৃষকদের জমির অধিকার নিয়ে, যারা কৃষিক্ষেত্রের ৬০ শতাংশের বেশি উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুক্ত। যেমন দলিত কৃষকদের জমির অধিকার, যারা জমি প্রদানের ২০ বছর পরেও পাট্টা পাচ্ছেন না, রাষ্ট্র সেই জমি দখল করছে আদানি বা অন্য কারোর নামে। সেখানে গরিব আদিবাসী কৃষক জানেনই না পাট্টার ব্যবস্থা সম্পর্কে। তাই জমির অধিকারকে নিশ্চিত করতে হবে। তিন দিন ভুমি সংস্কারের যে কাজ পড়ে আছে সেই নিয়ে আলোচনা হোকতিন দিন আলোচনা হোক যে, ২০ বছর পরে দেশে কী ধরণের কৃষির প্রয়োজন তাই নিয়ে। কর্পোরেট চালিত, কেমিক্যাল কোম্পানি নির্ভর কৃষি নাকি জনগোষ্ঠী চালিত প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র নির্ভর চাষ? খুব গুরুত্ব দিয়ে আইনসম্মত ভাবে ভাবা দরকার যে বছরের পর বছর ধরে যে নাটকীয় ভাবে কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যয় বরাদ্দ কমছে সেই বিষয়ে। কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকে রক্ষা করতে হবে এবং বাড়াতে হবে। তিন দিন আলোচনা হোক কৃষি সংকটের আক্রান্তদের বিষয়ে, বিদর্ভের বিধবা, অনন্তপুরের অনাথেরা প্রথমবার ঐতিহাসিক পদক্ষেপে এগিয়ে আসুন পার্লামেন্টের সেন্ট্রাল হলে, তাঁরা সংসদ আর দেশবাসীদের জানান যে কৃষি সংকট আসলে কী আর সেটা তাদের জীবনে কী নিয়ে এসেছে। তবেই একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের মনোভঙ্গী পাওয়া যাবে এদের সম্পর্কে। ‘নেশন ফর ফার্মার’ সংসদে একটা বিশেষ অধিবেশন চাইছে। আমাদের যা বলার তা হল, প্রত্যেকটি নাগরিক, সকলেই কৃষির সঙ্গে যুক্ত, কেবল খাবারের জন্যে নয় আমরা প্রত্যেকেই মাত্র দুতিনটি প্রজন্ম আগেই গ্রামে থাকতাম। এই পরিস্থিতিতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণির সঙ্গে এই কৃষকদের প্রাথমিক শ্রেণির যোগাযোগটা নতুন করে স্থাপন করতে হবে।

প্রশ্ন: বেশ কিছু জটিল প্রশ্ন আছে। আমাদের সংসদে কৃষি সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া আছে এমন সাংসদ খুব কম। এমনকি এই বিষয়গুলো যদি তোলাও হয়, আপনার মনে হয় সেখানে কোনও সত্যিকারের আলোচনা হবে?

তাঁরা সত্যিকারের আলোচনা করবেন কি করবেন না সেটা কোনও প্রশ্নই নয়তাঁদের সত্যিকারের আলোচনা করতে বাধ্য করা নির্ভর করছে আমাদের ওপরদেখুন আমাদের একটা বিকল্প আছে, ধরা যাক বললাম, তাঁরা সংসদে এই নিয়ে সত্যিকারের আলোচনা করলেন নাএখন বিষয়টা হল, একজন নাগরিক হিসেবে আপনি কি চান যে সাধারণ মানুষের কাজ করানোয় সংসদকে বাধ্য করতে? নাকি আপনি চান সংসদ থাকুক কেবল কর্পোরেট দুনিয়ার জন্যে? যেখানে বসে কেবল জিও আর জিএসটি-র জন্যে কাজ হবে, কেবল ডিজিটাল কোম্পানি আর নোটবন্দীর কাজ হবে?

সংসদ ভালো হবে না খারাপ হবে সেটা আমাদের ওপর নির্ভর করবে, আমাদের সমাজের ওপর, আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের ওপরআমার যেটা বলার তা হল, আমার কি এটা বলা কাজ যে ওরা আমার অধিকার রক্ষা করছে না, আমার অধিকার প্রয়োগ করতে দিচ্ছে না, তাই আমি আমার সব অধিকার ত্যাগ করলাম? এটা আমার কাছে একটা মুর্খের রাজনীতি বলে মনে হয়। আমি বলব যে সংসদ তৈরিই হয়েছে মানুষের কাজ করার জন্য ২৯ আর ৩০ তারিখে দিল্লি মার্চের একটা ভালো বিষয় হল, আমাদের সংবিধান যে মানুষের জন্য সেটা নতুন করে দাবি করা, আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র যে সাধারণ মানুষের সেটা নতুন করে দাবি করা। সংসদ মানুষের জন্যে কাজ করবে এর থেকে গণতান্ত্রিক দাবি আর কী হতে পারে?

প্রশ্ন: সারা দেশ জুড়ে কৃষকদের মধ্যে নানারকম আদর্শগত ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। আপনি কি মনে করেন যেভাবে আমাদের রাজনীতিক পরিবেশ প্রতিদিন আরও বেশি বেশি করে আঞ্চলিক হয়ে যাচ্ছে সেখানে তাঁরা এমন একটা বোঝাপড়ায় যেতে পারবে?

অবশ্যই একটা আদর্শগত ভিন্নতা আছে, নয়তো ২০০টা সংগঠন থাকত না, একটাই থাকত। সেটা আমাদের সমাজের প্রতিচ্ছবিও দেখায় – কেন ৩০ খানা রাজনৈতিক দল রয়েছে? এটা আমাদের সমাজের বিভেদ আর বর্ণ-সংকরতার প্রতিনিধিত্ব করে। তাই সেখানে আদিবাসী কৃষক আছে যাদের জন্যে ন্যূনতম সহায়ক মূল্য প্রধান ইস্যু নয়। তাদের ক্ষেত্রে একটা বিরাট পরিবর্তন হবে। আমি মনে করি না যে এই মার্চ সবকিছুর জন্যে একটা চরম উত্তর। আমি মনে করি এটা একটা শুরু, যেমন মুম্বাইতে হয়েছিল, তেমনই দিল্লিতে মধ্যবিত্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলবে। আমি কেবল এই বিষয়ে আগ্রহী যে, আমরা এই মধ্যবিত্ত পেশাদার শ্রেণি, আমাদের নিজেদের প্রাসঙ্গিক করে রাখতে পারি এই লড়াইয়ের মধ্যে, এই দাবিগুলির মধ্যে যেগুলো সাধারণ মানুষের ন্যায়সঙ্গত দাবি। আপনি একজন সাংবাদিক কিন্তু আপনি একজন মানুষ তো, একজন নাগরিকও তো।

আমি তেমন ভয়ংকর কিছু পার্থক্য দেখছি না। আমরা এমন একটা দেশে থাকি যেখানে ৭৮০ টা ভাষায় কথা বলা হয়, আর আপনি দেখছেন যে একটা প্রবণতা যেখানে সেই সব কিছু শেষ করে হিন্দি সব জায়গায় চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছেআমার কাছে ৭৮০টা ভাষা নিয়ে আমরা আশ্চর্যজনক সম্পদশালী। যদি আপনারা একটা একমাত্রিক, একরঙা সমাজ চান, যেখানে ১৩০ কোটি মানুষ বাস করে, যাদের মধ্যে কোনও রকম কোনও পার্থক্য নেই, আমি সেই পৃথিবীতে থাকতে ঘৃণা বোধ করব। আমি চাইব বৈচিত্র্য থাকুক। যাতে অনেক পার্থক্য জেগে ওঠে যেখান থেকে আপনি এসেছেন আর যেখানে আপনি আছেন তার মধ্যে। যদি আপনি জম্মু কাশ্মীরের একজন কৃষক হন, তাহলে আপনার এমন অনেক দাবির বিষয় থাকবে যা বাংলার কৃষকের থেকে আলাদা। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে যাতে যেখানে তাঁরা এক হতে পারেন। আপনি এমন কতজন কৃষককে চেনেন যারা স্বামীনাথন কমিশনের রিপোর্টের বিরোধিতা করছেন? আপনি যেখানেই যান, তাঁরা অন্তত এই বিষয়ে শুনেছে। কতজন কৃষক আছেন যাঁরা আরেকটু ভালো ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের বিরোধিতা করছেন? তাহলে, এমন কতগুলো মৌলিক বিষয় আছে যেখানে তাঁরা একসঙ্গে আসবেন, আর এর প্রক্রিয়াটা একটা ছোটো বিষয় নয়। যত আপনি এগিয়ে যাবেন, আরও আরও বেশি করে মানুষ ভাববে এই বিষয়গুলো নিয়ে। একটা স্বামীনাথন কমিশনের ধারণার জন্যেও প্রত্যেককে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

(অনুবাদ: কণিষ্ক ভট্টাচার্য)
--------

20181205

#দিদিভাই-মোদীভাই: ফ্রেন্ডশিপ আনলিমিটেড



অজয় দাশগুপ্ত   

গত ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮। পেট্রল-ডিজেলের দামে আগুন, বাজারে জিনিসপত্রের দামও একইভাবে হুহু করে বেড়েই চলেছে। স্বাভাবিকভাবেই বামপন্থী দলগুলিসহ প্রায় সমস্ত বিরোধী দল ভারত বনধ্‌-এর ডাক দিলো। তৃণমূলের অবস্থান ছিল দেখার মতো, একেবারে ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ গোছের! বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে বন্‌ধ-এ ওদের ‘না’ (যদিও বামফ্রন্ট সরকারের সময় এরাজ্যে মুড়ি-মুড়কির মতো বনধ্‌ ডাকতো তৃণমূল); কিন্তু বিজেপি-বিরোধী হিসেবে নিজেদের প্রতিপন্ন করার আপ্রাণ চেষ্টায় নাম কা ওয়াস্তে পড়ন্ত বিকেলে একটা ছোটোখাটো প্রতিবাদ মিছিল। শুধু কি তাই, বিজেপি-র কাছে নাম্বার বাড়াতে বন্‌ধ ব্যর্থ করার মরিয়া চেষ্টায় নামলো তৃণমূলী প্রশাসন, পুলিশ ও ঠ্যাঙারেবাহিনী। ভারতের কোনো রাজ্যে, এমনকি বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতেও যেটা হয়নি, সেই ‘ডায়াস-নন’ নামে সরকারী ও আধা-সরকারী কর্মচারীদের স্বার্থবিরোধী ফতোয়া জারি করলো তৃণমূল সরকার! সরকারী বাস-ট্রাম অন্যদিনের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি চালিয়ে সচল রাখার চেষ্টা। যদিও সে চেষ্টা সফল হয়নি।

সে যাইহোক, এই আনুগত্যের ফলাফল কিন্তু হাতেনাতে পেয়েছে তৃণমূল। এর দুদিনের মধ্যেই, গত ১২ই সেপ্টেম্বর সংসদের নীতিবিষয়ক (এথিক্স) কমিটি পুনর্গঠিত করলেন লোকসভার অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন এবং নারদ ঘুষকান্ডের তদন্তে গত আড়াই বছর ধরে একটিও মিটিং না ডেকে শীতঘুমে থাকা এই কমিটির চেয়ারম্যান আবার হলেন বিজেপি-র প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। গত ১লা আগস্ট দিল্লিতে সংসদ ভবনে তাঁর কক্ষে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রণাম করার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা ‘সৌজন্যমূলক’ আলাপচারিতায় ব্যস্ত ছিলেন, বলেও আমরা সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানতে পেরেছিলাম! 

আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ২০১৭সালের ২১শে নভেম্বর ভদ্রেশ্বর পৌরসভার তৃণমূল বোর্ডের চেয়ারম্যান মনোজ উপাধ্যায় খুন হলেন। এই ঘটনায় বি জে পি-র রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বললেন, ‘‘মনোজ উপাধ্যায়কে অনেকদিন ধরে চিনি। উনি দীর্ঘদিনের আর এস এস কার্যকর্তা। উনি রামনবমীর মিছিলও করেছেন।’’ এরকম আরও অনেক আর এস এস স্বয়ংসেবক তৃণমূলের মধ্যে যে কাজ করছে, তা তৃণমূলের উদ্যোগে রামনবমী, গণেশপুজো, জন্মাষ্টমীর বহর দেখলেই বোঝা যায়সদ্য দলত্যাগী, তৃণমূলের একদা ‘সেকেন্ড-ইন কম্যান্ড’ মুকুল রায় কিছুদিন আগেই সাংবাদিক সম্মেলনে খোলসা করে বলেছেন, ‘‘জন্মলগ্ন থেকেই বি জে পি-র সহযোগিতা, সাহায্য নিয়েই এগিয়েছে তৃণমূল। তৃণমূলের যে সাংগঠনিক শক্তি এত বেড়েছে তা বি জে পি-র সাহায্যেই হয়েছে।’’

এটা কোনও গোপন বিষয় নয়, সবারই জানা। তবুও তৃণমূলের নেতানেত্রীরা এবং তাদের প্রসাদপুষ্ট মিডিয়া বারবার মানুষের মধ্যে এই ধারণাই গড়ে তুলতে চায়, যে বি জে পি-র বিরুদ্ধে লড়ছে একমাত্র তৃণমূলই! এই লক্ষ্যেই বামপন্থীদের সমস্ত আন্দোলন-কর্মসূচির খবর কর্পোরেট মিডিয়া ব্ল্যাক আউট করার অঘোষিত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে ‘মহাপডাও’ বা এরাজ্যে বি পি এম ও পদযাত্রার মতো কয়েকটি ঘটনায় এটা প্রমাণিত। অথচ, এটা ঘটনা যে বি জে পি এবং তৃণমূল, এরাজ্যে এই দুই দলই কাজ করছে পরস্পরকে পুষ্ট করার লক্ষ্য নিয়ে, ‘প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা’র কৌশল অবলম্বন করে।

(২)

আসলে, পশ্চিমবাংলায় বি জে পি-আর এস এস-এর ভিত তৈরির জন্যই কংগ্রেস ভেঙে জন্ম হয়েছিল তৃণমূল নামে দলটার। তৃণমূল তৈরির আগে থেকে আজ পর্যন্ত এই দল এবং দলের সুপ্রিমোর গতি-প্রকৃতি একটু তলিয়ে বিচার করলেই সেটা সবার সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে। ঘটনাপ্রবাহ বলছে, বি জে পি-আর এস এস ‘মুখ’, আর তৃণমূল ‘মুখোশ’-এর কাজ করে চলেছে বিভিন্ন সময়। যেখানে এবং যখন ‘মুখ’ দেখিয়ে কাজ হবে না, তখন ‘মুখোশ’ দেখাও! কিছু লোকদেখানো নাটকবাজি সঙ্গে যুক্ত করো, ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার জন্য! তৃণমূলের জন্মলগ্ন থেকে ইতিহাস একটু খতিয়ে দেখলেই এটা আরও স্পষ্ট হবে। 

১৯৯২সালের ৬ই ডিসেম্বর। গোটা বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলো চারশো বছরের পুরানো বাবরি মসজিদের ইমারতকে। মমতা ব্যানার্জি তখন কংগ্রেসে, কেন্দ্রে নরসিমা রাও সরকারের মন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তখন বারবার প্রধানমন্ত্রীকে বি জে পি-আর এস এস যে বাবরি মসজিদ ভাঙতে চলেছে, তানিয়ে সতর্ক করছিলেন। ৪ঠা ডিসেম্বর বামফ্রন্ট প্রতিবাদ সমাবেশও করে কলকাতায়। সেদিনই পালটা সভা করে মমতা ব্যানার্জি বলেন, ‘‘অযোধ্যা নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ঘোরাতে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে সি পি এম। বি জে পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। এসব সি পি এম-এর ষড়যন্ত্র।’’ মসজিদ ভাঙার পর অবশ্য এনিয়ে তিনি এই সেদিন পর্যন্ত টুঁ শব্দটি করেননি। আচমকা এবছর তিনি ৬ই ডিসেম্বর মুখ খুলে নানারকম আষাঢ়ে গল্প শুনিয়েছেন!

১৯৯৬ সালে অটলবিহারী বাজপেয়ীর ১৩দিনের সরকারের পতন হলো। গঠিত হলো সংযুক্ত মোর্চার সরকার। এই সময় জাতীয় রাজনীতিতে বি জে পি যখন একেবারে কোণঠাসা, কার্যত আঞ্চলিক দলগুলি যখন বি জে পি-কে একঘরে করে দিয়েছিল, ঠিক তখনই বি জে পি-কে বাঁচাতে মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে মমতা ব্যানার্জির। কংগ্রেস ভেঙে তখন তিনি নতুন দল গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তৃণমূল তৈরি হওয়ার আগেই, ১৯৯৭ সা‌লের ডি‌সেম্বর মা‌সে, মমতা ব্যানার্জিই প্রথম বলেন, ‘‘বি‌ জে ‌পি অচ্ছুৎ নয়’’। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষদের অনেকেই তখন অবাক হয়েছিলেন। কিন্তু নতুন দল গড়ার মদতটা কোন জায়গা থেকে এসেছিল, তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয়নি। ১৯৯৮সা‌লের লোকসভা ভো‌টে জোট বাঁধ‌লেন বি‌ জে ‌পি-র স‌ঙ্গে। বি জে পি সভাপতি লালকৃষ্ণ আদবানি তখন বলেছিলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বি জে পি-র সঙ্গে তৃণমূলের এই জোট একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।’’ জ্যোতি বসু এই প্রসঙ্গে বারবার বলতেন, ‘‘তৃণমূলের সবচেয়ে বড় অপরাধ ওরা সাম্প্রদায়িক বি জে পি-কে এরাজ্যে হাত ধরে ডেকে এনেছে।’’

(৩)
১৯৯৮ সালে লোকসভা নির্বাচনের পর প্রথম এন ডি এ সরকারের রেল মন্ত্রকের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন হয়ে তৃণমূলনেত্রী ক্ষমতার অলিন্দে। ১৯৯৯ সালে আবার বি জে পি-র সঙ্গে জোট, আবার সরকারে, এবার রেলমন্ত্রী। যদিও ২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ফায়দা তোলার জন্য এন ডি এ থেকে বের হয়ে এসে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধেন। কিন্তু কলকাতা কর্পোরেশনে সেই সময়েও তাদের সঙ্গে বি জে পি-র জোট পুরোদস্তুর বহাল ছিল। তৃণমূলের সুব্রত মুখার্জি মেয়র এবং বি জে পি-র মীনাদেবী পুরোহিত ডেপুটি মেয়রবিধানসভা নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মমতা ব্যানার্জি আবার ফিরে যান এন ডি এ-তে। এবার হন কয়লামন্ত্রী। সেই সময়, ২০০১ সালের ২৪শে আগস্ট বি বি সি-র ‘হার্ডটক ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠানে করণ থাপারের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মমতা ব্যানার্জি স্পষ্ট বলেন, ‘‘বি জে পি আমাদের স্বাভাবিক মিত্র..।’’

এন ডি এ আমলেই ২০০২ সালের গোড়াতে হয় গুজরাটে সংখ্যালঘু গণহত্যা, ভারতের ইতিহাসে যা বর্বরতম ঘটনা। বিশ্বজুড়ে এর নিন্দা হয়েছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জি এই হত্যাকাণ্ডের কোনও প্রতিবাদ করেননি। তখন তাঁর প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এটা বি জে পি-র অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।’ ওই বছরই গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচনে বি জে পি আবার জয়ী হলে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ফুলের তোড়া পাঠিয়ে সবার আগে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি।

২০০৩ সা‌লে ১৫ই সেপ্টেম্বর নয়া‌দি‌ল্লি‌তে আর এস এস-এর মুখপত্র ‘পাঞ্চজন্য’-র সম্পাদক তরুণ বিজয় সম্পাদিত ‘কমিউনিস্ট টেররিজম’ নামে পুস্তক প্রকাশ অনুষ্ঠা‌নে মমতা ব্যানার্জি ব‌লেন, ‘‘কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমি আপনাদের পাশে আছি। য‌দি আপনারা আমায় ১শতাংশ সাহায্য ক‌রেন, আমরা ক‌মিউ‌নিস্ট‌দের সরা‌তে পার‌বো।’’ মমতা ব্যানার্জির আহ্বা‌নে আর এস এস স্বয়ংসেবকরা খুবই উৎসা‌হিত হয়অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহন ভাগবত, মদনদাস দেবী, এইচ ভি শেষাদ্রির মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী শীর্ষ নেতারা। তাঁদের উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘‘..আপনারাই হলেন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।’’ ‌বি‌ জে পি-র তৎকা‌লীন রাজ্যসভা সাংসদ বলবীর পুঞ্জ, ওই সভা‌তেই ব‌লেন,‘‘আমা‌দের প্রিয় মমতাদি‌দি সাক্ষাৎ দুর্গা।’’

আর এস এস-এর অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের ‘খাঁটি দেশপ্রেমিক’ বলে যে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি, তা কিন্তু স্বয়ংসেবকরা ভোলেনি। গত লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন আগে, ২০১৩সালের ৪ঠা আগস্ট ‘সঙ্ঘ পরিবার’ টুইট করে জানিয়েছিল যে মমতা সেদিন তাঁদের ‘প্রশংসায় পঞ্চমুখ’ হয়েছিলেন! মমতা ব্যানার্জির প্রতি সঙ্ঘ পরিবারের কৃতজ্ঞতা এখনও যে ম্লান হয়নি, তা ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরেও তারা জানিয়েছে।

২০০৪-র লোকসভা নির্বাচনেও বি জে পি-র সঙ্গেই ছিল তৃণমূল। ২০০৪ সা‌লে ৮ই এপ্রিল নয়া‌দি‌ল্লি‌তে বিজে‌পি নেতৃত্বাধীন এন‌ ডি এ-র লোকসভা নির্বাচ‌নের ইশ‌্‌তেহার প্রকা‌শিত হয়। প্রকাশ ক‌রেন অটলবিহারী বাজ‌পেয়ী। ইশ‌্‌তেহা‌রে রামম‌ন্দির ‌নির্মা‌ণের ইস্যু, গোহত্যা বন্ধের মতো বিষয় লেখা হ‌য়ে‌ছিল। আবার সরকা‌রে এলে কয়লাখ‌নি বেসরকারি হাতেই যা‌বে, সেকথাও বলা হয়েছিল। ‌বি‌ জে ‌পি-র এতগু‌লো লক্ষ্য উল্লেখ ক‌রা হয়ে‌ছি‌ল ওই ইশ্‌তেহার। ওইদিন মঞ্চে হা‌জির ছি‌লেন, এন‌ ডি এ-র ১১টি শ‌রিক দ‌লের মধ্যে মাত্র ৫টি দলের প্রতি‌নি‌ধি। সেই ৫জনের মধ্যে একজন হ‌লেন মমতা ব্যানা‌র্জি। সে‌দিন ইশ‌্‌তেহার প্রকা‌শিত হওয়ার আগেই সম্ম‌তি জা‌নি‌য়ে তাতে সই করে‌ছি‌লেন তি‌নি।

২০০৫ সা‌লের ৪ঠা আগস্ট সংসদে প‌শ্চিমব‌ঙ্গে ‘অনুপ্রবেশ’-এর অভিযোগ তুলে, এবিষয়ে আর এস এস-র বহুলপ্রচারিত বক্তব্যই আওড়াতে থাকেন মমতা ব্যানার্জি। আসলে তার মাধ্যমে তিনি সঙ্ঘ পরিবারকে বার্তা দিতে চাইছিলেন: ‘‘আমি তোমা‌দেরই লোক।’’

২০০৬-র বিধানসভা নির্বাচনেও তৃণমূল বি জে পি-র সঙ্গে জোট বেঁধেই এরাজ্যে লড়েছিল। নির্বাচনের পরে ওই বছরের ২৫শে ডিসেম্বর ধর্মতলায় অনশন মঞ্চে তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বামফ্রন্টবিরোধী যাবতীয় ষড়যন্ত্র, হিংসাশ্রয়ী আন্দোলনে বরাবর তৃণমূলকে মদত জুগিয়েছে বি জে পি–আর এস এস।

এমনকি, ২০০৯-র লোকসভা ভোটে এবং ২০১১সালের বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূল জোট বাঁধলেও বি জে পি-আর এস এস বামফ্রন্টকে পরাস্ত করতে তৃণমূলের হয়েই যে গোপনে কাজ করেছিল, পরে বি জে পি-আর এস এস-র নেতারা বিভিন্ন প্রকাশ্য সভায় তা বলেছেন। চরম বামপন্থী থেকে উগ্র দক্ষিণপন্থী-মাওবাদী থেকে আর এস এস-সমস্ত শক্তির তখন একটাই লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে হটানো। পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখলের পর ২০১২ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর তৃণমূল দ্বিতীয় ইউ পি এ মন্ত্রিসভা থেকে সরে যায়।

(৪)
২০১১-য় রাজ্যে তথাকথিত ‘পরিবর্তন’-র পরে মমতা ব্যানার্জিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। মোদী তখনও প্রধানমন্ত্রী হননি। তবু ‘কমিউনিস্ট’ নিধনের আহ্বানটিই যেন মমতা ব্যানার্জিকে মনে করিয়ে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রীর উদ্দেশ্যে বলেছিলেন —‘‘প্রথম রাতেই বেড়াল মেরে দিন।’’ ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ে উল্লসিত আর এস এস তাদের পশ্চিমবঙ্গ কমিটির মুখপত্র ‘স্বস্তিকা’র ২৩শে মে, ২০১১ তারিখের সম্পাদকীয়তে লেখে: ‘‘অবশেষে দুঃশাসনের অবসান।...ইহা স্বীকার করিতেই হইবে, পশ্চিমবঙ্গের মার্কসবাদী সরকার ও ক্যাডারদের অত্যাচারের প্রতিবাদে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁহারই নেতৃত্বে তৃণমূল জোটের এই বিরাট জয়।’’

২০১৩সালে হাওড়া লোকসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বি জে পি প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। দেওয়ালে বি জে পি প্রার্থীর নাম লেখাও শুরু হয়েছিল। এই অবস্থায় দিল্লিতে বি জে পি সভাপতি রাজনাথ সিংয়ের বাড়িতে হাজির তখন তৃণমূলের প্রভাবশালী সাংসদ, চিট ফান্ড মালিক কে ডি সিং। বি জে পি-র সাধারণ সম্পাদক রাজীব প্রতাপ রুডির উপস্থিতিতে আঁতাত সম্পন্নএকেবারে শেষ মুহূর্তে বি জে পি প্রার্থীর নাম প্রত্যাহার।

২০১৩সালের পঞ্চায়েত ভোটেও তৃণমূল-বি জে পি সুযোগ বুঝে আঁতাত করেছে। যেমন, পাঁশকুড়ার চৈতন্যপুর-১নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েতে বি জে পি-কে সঙ্গে নিয়েই পঞ্চায়েত গঠন করেছিল তৃণমূল। প্রধান বি জে পি-র, উপপ্রধান তৃণমূলের! মিনাখাঁ, বামনপুকুর, চৈতল—তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েতই চলেছে তৃণমূল-বি জে পি-র যৌথ বোঝাপড়ায়, একেবারে প্রকাশ্যে। উদাহরণ আরও আছে। অবশ্য, পরে বেশ কিছু জায়গায় অন্য দলের মতই বি জে পি-র পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদেরও দল ভাঙিয়েছে তৃণমূল।

সারদাসহ চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি এবং নারদ ঘুষকাণ্ডে এই দুই দলের গোপন বোঝাপড়া দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৪সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদী বিভিন্ন বক্তৃতায় চিট ফান্ড কেলেঙ্কারি নিয়ে অনেক বড় বড় কথা বলেছিলেন। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলি, যেমন সি বি আই, ই ডি, এস এফ আই ও কি করেছে? চার বছরের বেশি সময় ধরে ক্রমাগত টালবাহানা করে এই তদন্ত বিলম্বিত করে চলেছে।

মণিপুরে, ২০১৭ সালে বিধানসভা নির্বাচনের পর বি জে পি-র সরকার গড়তে সমর্থন করে একমাত্র তৃণমূল বিধায়ক টি রবীন্দ্র সিং। আস্থাভোটে বি জে পি-কে সমর্থন করার পর ওই তৃণমূল বিধায়ক বলে ‘দলের নির্দেশেই সমর্থন।’ আজ পর্যন্ত সেই বিধায়ককে তৃণমূল আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কার করেনি। 

অন্যদিকে, ত্রিপুরার ঘটনায় তৃণমূল যে আদতে বি জে পি-কেই পুষ্ট করতে কাজ করছে, তা একেবারে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ২০১৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী কংগ্রেসের ৬বিধায়ক ২০১৬ সালের জুন মাসে প্রথমে তৃণমূলে যোগ দেয়। কিন্তু এবছর এপ্রিল মাসে এই ৬বিধায়কই বি জে পি-তে যোগ দেয়। এমনকি, তৃণমূলের রাজ্যদপ্তরের সাইনবোর্ড পর্যন্ত তারা উলটে দিয়ে তাকে বি জে পি-র দপ্তরে পরিণত করেছে!

সংসদে বিভিন্ন ঘটনায় তৃণমূলের সঙ্গে বি জে পি-র গোপন বোঝাপড়া স্পষ্ট! ২০১৭ সালের ২৯শে মার্চ রাজ্যসভায় অর্থবিল পাশ করাতে তৃণমূল ওয়াক-আউট করে। রাজ্যসভায় অর্থবিলের বিরুদ্ধে তৃণমূল ভোট দিলে তা অনুমোদন হতো না, বেকায়দায় পড়তো মোদী সরকার। কিন্তু সমস্ত বিরোধী দল ভোট দিলেও তৃণমূল অধিবেশন বয়কট করে ওই বিল অনুমোদনের সুযোগ করে দেয় বি জে পি-কে। সংসদে বারেবারে বিজেপি সরকারকে সাহায্য করে চলেছে তৃণমূল। সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নে তৃণমূল কিভাবে বিজেপি-র ‘অনুগত বিরোধী’র ভূমিকা পালন করে চলেছে, তা গত ৪ঠা মার্চ, ২০১৬ ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় প্রথম পাতায় প্রকাশিত একটি সংবাদ (TMC plays 'loyal Opposition', only for PM) দেখলেই বোঝা যাবে। ঠিক বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংসদের অধিবেশনে যখন বিরোধীরা মোদী সরকারকে তুলোধোনা করছেন, তখন তৃণমূল সাংসদদের কাছে খোদ মমতা ব্যানার্জির কাছথেকে নির্দেশ আসে যে ‘অনুগত বিরোধী’র ভূমিকা পালন করতে হবে, যা শুনে এমনকি তৃণমূল সাংসদরাও বিস্মিত হয়ে যান। বিরোধী দলগুলি যখনই এককাট্টা হয়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণে নেমেছে, তখনই ছলেবলে কৌশলে তৃণমূল তা এড়িয়ে গেছে, বা বানচাল করার চেষ্টা করেছে। ‘ফেডারেল ফ্রন্ট’ তারই একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ!

নারদ ঘুষকান্ডর কথা আগেই বলা হয়েছে। নারদকাণ্ডের জেরে গঠিত লোকসভার এথিক্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন বি জে পি-র বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি‘এক্স ফাইলস’-এর ভিডিও ফুটেজে তৃণমূলের যে সব সাংসদকে দেখা গিয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখবে এই কমিটি। লোকসভায় নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার আড়াই বছর বাদেও কোনও পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার। কেন? প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে পর্যাপ্ত নথিপত্র দেওয়ার পরেও চিট ফান্ড মালিক তৃণমূল সাংসদ (বর্তমানে সাসপেন্ডেড) কে ডি সিংয়ের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না?

অথচ ইউ পি এ সরকারের আমলে যখন লোকসভার অধ্যক্ষ ছিলেন সোমনাথ চ্যাটার্জি, তখন ঘুষকান্ডে জড়িত সাংসদদের বিরুদ্ধো মাত্র ১২দিনের মধ্যে তিনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। ২০০৫সালের ১২ই ডিসেম্বর গোটা দেশ তোলপাড় হয়েছিল ১১জন সাংসদের ঘুষ নেওয়ার ক্যামেরাবন্দি দৃশ্যে। ১০জন লোকসভার ও ১জন রাজ্যসভার সদস্যকে সেদিনও এক স্টিং অপরেশনে দেখা গিয়েছিল ঘুষ নিতে। তারমধ্যে ৬ই জনই ছিল বিজেপি-র সাংসদ। ২০০৫সালের ২৪শে ডিসেম্বর মাত্র ১২দিনের মধ্যে লোকসভার ১০জন সাংসদ ও রাজ্যসভার ১জন সাংসদকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এখন আড়াই বছর আগে নারদ ঘুষকান্ডে তৃণমূল সাংসদদের ক্যামেরাবন্দী ভিডিও ফরেনসিক টেস্টে প্রমাণিত হওয়ার পরেও তাঁদের সদস্যপদ টিঁকিয়ে রেখে বিজেপি-র কী লাভ, এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই!

(৫)
২০১৬সালের বিধানসভা নির্বাচনেও যে অন্তত ১০০টা কেন্দ্রে বি জে পি প্রার্থীরা বিরোধী ভোট কেটে তৃণমূলকে সহযোগিতা করেছে, কলকাতায় এসে সেকথা বলেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উমা ভারতী। বি জে পি না থাকলে তৃণমূলের দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসা যে সহজ হতো না তা মাঝেমধ্যেই বলে থাকেন দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত বিধানসভা ভোটের আগে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে সঙ্ঘের স্বয়ংসেবকদের সভায় খোলাখুলি বলেছেন, ‘‘আমরা এখানে এমন কিছু করতে পারি না, যাতে কমিউনিস্টরা আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে।’’

তৃণমূলের নীতির কারণেই পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক শক্তির বাড়বাড়ন্ত। বি জে পি-র হিন্দুত্বের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মানুষকে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে উসকানি দিচ্ছে তৃণমূল, যাতে সংখ্যাগুরু সাম্প্রদায়িকতাই আরও পুষ্ট হচ্ছে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার আগে বামফ্রন্ট সরকারের সময় বাংলায় আর এস এস-র শাখা ছিল মাত্র ৪৭৫টি। কিন্তু গত ছয় বছরে এই উগ্র সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী সংগঠনটির শাখা পশ্চিমবঙ্গে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০০। রাজ্যে আর এস এস পরিচালিত প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা বর্তমানে ৩০৯টি। এছাড়া ১৬টিতে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক স্তরে পড়াশুনা হয়। আর এরমধ্যে ১৫টি গড়ে উঠেছে গত পাঁচ বছরে। এই তিনশোর বেশি হিন্দুত্ববাদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ৬৬হাজার ৯০ জন। ৫০০টি শিশুমন্দির ও ৫০টি বিদ্যালয়মন্দির (হাইস্কুল) প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্য নিয়ে দ্রুত এগচ্ছে আর এস এস।

গত তিন বছরে রাজ্যে খাগড়াগড় বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে ধূলাগড়, বসিরহাট, নোয়াপাড়ার মতো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা। এই সবকটি ঘটনাতেই স্পষ্ট, বি জে পি-আর এস এস-হিন্দু সংহতি সমিতির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই সাম্প্রদায়িক বিভাজনে নেমেছে তৃণমূল, যাতে ভোটের রাজনীতির ফায়দা হয়। পরস্পরকে পুষ্ট করার লক্ষ্য নিয়েই এই দুই দল এগচ্ছে। ‘রামনবমী’র মিছিলের পালটা ‘হনুমান জয়ন্তী’ করা তারই একটি উদাহরণ। এরাজ্যে প্রথম গোরক্ষকদের হাতে খুন হয়েছিল ধূপগুড়িতে, গরিব পরিবারের দুই ১৯ বছরের কিশোর। গ্রেপ্তার হলো পাঁচ-তিনজন তৃণমূলের, দুইজন আর এস এস’র.! কেশিয়াড়িতে ১৫একর জমিতে আর এস এস গোশালা করলো..গোমূত্র মেলে সেখানে....জমি দিল তৃণমূল.....গোমূত্র বিক্রিও করছে তৃণমূল.....এরাজ্যের বুকে গণতন্ত্র রক্ষা, শ্রমিকের লড়াই, কৃষকের লড়াই, ছাত্রদের ক্যাম্পাস রক্ষার লড়াই, বিভাজনের রাজনীতির ঠেকানোর লড়াই এমনকি বি জে পি’র বিরুদ্ধে লড়াই- এসবের ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বাধা তৃণমূল..মমতার বাহিনীর এই উন্মত্ত ভোটলুটের একটা উদ্দেশ্য হলো বিজেপি’কে জায়গা করে দেওয়া...প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতার মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গো, গত ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের সাক্ষাৎকারটা (নিশ্চয়ই পড়েছেন) আরেকবার পড়ে নিতে অনুরোধ করছি। ওখানে তৃণমূলের 'স্বৈরতান্ত্রিক' চরিত্র উল্লেখ করে উনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন কেন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে স্বৈরাচারের সঙ্গে হাত মেলালে বামপন্থীদের ক্ষতিই হবে। বরং বিজেপি-র বিরুদ্ধে অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে ঐক‍্যবদ্ধ প্রতিরোধে নামাটাই জরুরী কাজ এই মুহূর্তে। তৃণমূল যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতির সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাও উনি  স্পষ্টভাষায় বলেছেন।

তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের অপসারণ আর এস এস-র লক্ষ্য নয়। আর এস এস মমতা ব্যানার্জির ‘আত্মশুদ্ধি’ চায়। চায় তৃণমূল কংগ্রেসের ‘রিফর্ম’। ২০১৬ সালের অক্টোবরে হায়দরাবাদে তিনদিনের জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে এই সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৪ই জানুয়ারি ব্রিগেডের সভাতেও আর এস এস-র সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। বি জে পি এবং সর্বোপরি আর এস এস-এর হয়ে কিভাবে তৃণমূল দল কাজ করছে, আর বি জে পি-আর এস এস কিভাবে তৃণমূলকে টিকিয়ে রেখেছে, তৃণমূল যে আদতে বি‌ জে‌ পি-র ‘মু‌খোশ’ তা যত দিন যাবে, ততই আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
********
২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮

‘দুন্দুভি’ শারদ সংকলন