20200909

অশোক মিত্র: অনন্য মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস

 



অজয় দাশগুপ্ত

আচমকাই সুযোগ হয়ে গিয়েছিল অশোক মিত্রের সান্নিধ্যে আসার। রাজনৈতিক জীবনের গোড়া থেকেই যাঁর বক্তৃতা ও লেখার গুণমুগ্ধ ভক্ত, তাঁর কাছে নিয়মিত যেতে হবে শুনেই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। পয়লা মে সকালে মৃদুলদা(দে) যখন ফোনে জানালেন ওঁর মৃত্যুসংবাদ, তখন একরাশ কথা ভিড় করে এলো। শুন্যতা তো বটেই!

১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি থেকে আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল ‘গণশক্তি’-র রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় লেখা ওঁর বাড়ি থেকে আনার। টানা প্রায় দু’বছর আলিপুর পার্ক রোডে সোনালী অ্যাপার্টমেন্টে প্রতি সপ্তাহে দু’বার করে যেতে হতো। সে এক বিরল অভিজ্ঞতা! প্রথমে টেলিফোন করে ওঁর সময় নিতে হতো, তারপর যথার্থই যথাসময়ে (এক মিনিট আগেও না, এক মিনিট পরেও না) পৌঁছে যেতে হতো। প্রথমে উনি টানা বলে যেতেন, যার দ্রুত নোট নিতে হতো। পরের দিন সেটা কম্পোজ করে নিয়ে গেলে তার ওপর উনি কাটাছেড়া করতেন। জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, ‘আমি প্রথমবার ভাবনাটা বলি, পরেরবার লিখি।’

গণশক্তির বানান নিয়ে ওঁর প্রশ্ন ছিল। একদিন উনি ডিকটেশন দেওয়ার সময় কোনো লেখায় ‘ইতিমধ্যে’ শব্দটি বলেছিলেন। আমাদের তখন সংসদ বাংলা অভিধান অনুসরণ করা হতো, সোমেনদা(পাল) আমাকে একদিন ওই অভিধান দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতিমধ্যে’ অশুদ্ধ প্রয়োগ, ওটা ‘ইতোমধ্যে’ হবে। আমিও তাই সেই অনুসারে ‘ইতোমধ্যে’-ই লিখেছিলাম। উনি লেখাটার কম্পোজ প্রুফ দেখার সময় আমাকে বললেন, ‘তোমরা ইতিমধ্যে-কে ইতোমধ্যে লেখো কেন?’ আমি ‘সংসদ বাংলা অভিধান’-এর কথা বলতে উনি বললেন, ‘তোমাদের প্রুফ কি বাংলা ভাষার অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকরা দেখেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘ইতিমধ্যে’ ব্যবহার করেছেন, সেটাও তাঁরা মানবেন না?’ ওঁর নোট নিতে গিয়ে রাজনীতি, অর্থনীতি তো বটেই, বাংলা ভাষায় বিভিন্ন শব্দের প্রয়োগ নিয়েও অনেককিছু শিখতে পেরেছিলাম বলে ধন্য হয়েছি। একই শব্দ একই লেখায় দু’রকম প্রয়োগ করা নিয়ে আমি প্রশ্ন করতে ওঁর সহাস্য মন্তব্য, ‘আমি দুটোই লিখি, একটা লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে গেলে আরেকটা লিখি।’

ওঁর বিশাল লাইব্রেরি কাম ড্রয়িং রুমে বসে জ্ঞানভান্ডারের বহরে নিজেকে কার্যত হারিয়ে ফেলতাম। মাঝেমাঝে টুকরো-টাক্‌রা কথাবার্তা হতো। আমার বাড়ি গড়িয়াতে জেনে বলেছিলেন, ‘ওখানে উজ্জ্বল (চ্যাটার্জি) আছে, খুবই উদ্যমী ছেলে।’

‘আমি ভদ্রলোক নই, কমিউনিস্ট’ বলে যিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন, তিনি কিন্তু ব্যক্তিগত আচারে অত্যন্ত সুভদ্র ছিলেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছি অনেকের কাছেই। প্রত্যেক অতিথিকে উনি লিফটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন, নগণ্য হলেও আমার ক্ষেত্রে কোনোদিন তার অন্যথা হয়নি। আপাতকঠিন, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের পিছনে যে একজন স্নেহশীল পিতার মনন লুকিয়ে আছে, সেটা একটা ঘটনায় টের পেয়েছিলাম। গণশক্তি থেকে ২৩০নং বাসে চেপে শেষ স্টপেজ চিড়িয়াখানায় নেমে হেঁটেই চলে যেতাম আলিপুর পার্ক রোডে। ঠিক সময়ে পৌঁছতে হবে, তাই তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে একদিন রাস্তায় আছাড় খেয়ে পড়ে গেলাম। রাস্তা খোঁড়া হচ্ছিল, চারদিকে ইটের টুকরো ছড়িয়ে পড়ে ছিল। ব্যস্‌, হাত-পা ছড়ে গেলো, রক্ত বের হচ্ছিলো। দেরি হয়ে যাবে ভেবে আমি কোনমতে ধুলে ঝেড়ে দৌড় লাগালাম। বেল টিপতে দু’মিনিট দেরি হয়ে গেছিল, দুরুদুরু বুকে অপেক্ষা করছিলাম। ‘আজ একটু দেরি হয়ে গেলো’ বলতে বলতেই উনি আমার হাত লক্ষ্য করে বললেন, ‘কী হয়েছে, ছড়ে গেছে মনে হচ্ছে!’ আমি বললাম, ‘ও কিছু না, পড়ে গিয়ে একটু লেগেছে।’ উনি আমাকে ঘরে বসিয়ে সোজা ভেতরে চলে গেলেন। তারপর একটা ক্রিম(সম্ভবত ‘ভোলিনি’ জাতীয় কিছু একটা হবে) নিয়ে এসে নিজে লাগিয়ে দিতে লাগলেন, হাতে-পায়ে। আমি তো সঙ্কোচে ‘না, না’ করতে লাগলাম। কিন্তু কার্যত ধমকে আমাকে বললেন, ‘তুমি চুপ করে বসো, নিজে নিজে মলম লাগানো যায় না।’ তারপর আমি সেদিন লিখতে পারবো কিনা, অন্যদিন আসবো কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। আমি বললাম, ‘কিছুই তো হয়নি, আমি পারবো, আপনি বলুন।’ সেদিন লেখা শেষ করে ফেরার সময় উনি মলমের টিউবটা আমাকে দিয়ে বললেন, ‘এটা নিয়ে যাও। পরে আরেকবার লাগিয়ে নেবে।’ ওঁর এই স্নেহশীল ভূমিকা দেখে আমি রীতিমত অভিভূত হয়েছিলাম সেদিন। 

ওই সময়েই আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে ‘গণশক্তি’-র নতুন ভবনের উদ্বোধন হয়। তারিখটা ১৯৯৭সালের ২রা জানুয়ারি। আমি তখন নিয়মিত ওঁর বাড়িতে যাচ্ছি। পরে আমাকে কথায় কথায় কয়েকবার বলেছিলেন, ‘তোমাদের নতুন দপ্তরে আমার যাওয়া হয়নি।’ আমি বলেছিলাম, ‘চলুন না একদিন।’ কিছুদিন বাদে উনি আমাকে একদিন বললেন, ‘তোমাদের দপ্তরের কাছেই যাচ্ছি, এনআরএস আকাদেমি হলে একটা কর্মসূচী আছে।’ আমি ওঁকে সেদিন এনআরএস আকাদেমি হল থেকে নিয়ে এসেছিলাম গণশক্তি দপ্তরে। প্রয়াত কমরেড দীপেন ঘোষ তখন আমাদের সম্পাদক। উনি আমাদের দপ্তরের সম্পাদকীয় বিভাগ দেখে বললেন, ‘আমি নিউইয়র্ক টাইমস্‌-এর দপ্তরেও গেছি, ম্যানহাটনে। ওখানেও তোমাদের মতই ব্যবস্থা, সবাই সবাইকে দেখতে পায়। কোনো ঘেরাটোপ নেই।’ 

ওঁর রবিবারের উত্তর-সম্পাদকীয় পড়ার জন্য বহু মানুষ উন্মুখ হয়ে থাকতেন। গণশক্তি-র রবিবারের প্রচারসংখ্যা বৃদ্ধির পিছনে সেটাও একটা কারণ ছিল বলে মনে হয়। পরে ওঁর রবিবারের সেই লেখা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অন্য কর্মসূচীতে যখনই দেখা হয়েছে, ডেকে কথা বলেছেন। আমায় বলতেন, ‘তোমরা সাংবাদিকরা সঙ্গে একটা ক্যামেরা নিয়ে ঘোরোনা কেন? কোনো ঘটনা ঘটলে তুমি নিজেই তার ছবি তুলে নিতে পারবে, চিত্রসাংবাদিকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না।’

অনেকেই মার্কসবাদ ও রবীন্দ্রনাথকে দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় হিসেবে দেখতে বা দেখাতে চান। অশোক মিত্র’র বিভিন্ন লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধির কথা বারেবারে উঠে এসেছে। তাঁর স্মৃতিগ্রন্থ ‘আপিলা চাপিলা’-য় একেবারে শেষে তিনি লিখেছেন: ‘‘এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে দুটি আলাদা চরিতার্থবোধ: এক রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আমার জন্ম; দুই, আমার চেতনাজুড়ে মার্কসীয় প্রজ্ঞার প্লাবিত বিভাস।’’ যারা এই পরস্পরবিরোধিতাকে উপজীব্য করে থাকেন, অশোক মিত্র যেন তাদের উদ্দেশ্যেই নিজের এবিষয়ে উপলব্ধির কথা লিখেছেন: ‘‘...নিজেকে মার্কসবাদী বলে গর্বিত প্রচার করি, মার্কসীয় বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সমাজের জিজ্ঞাসা-বিবর্তন বিশ্লেষণে নিমগ্ন হই, মার্কসীয় ধারণার প্রেক্ষিতে অর্থশাস্ত্রের গহনে শ্রেণীদ্বন্দ্বের অন্বেষণ করি। অথচ সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার অভিভূত গরিমাবোধ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় জন্মগ্রহণ করেছি বলে নিজেকে ধন্য মনে করি, তাঁর কবিতায় গানে প্রতিনিয়ত অবগাহিত হয়ে অধরার সন্ধান পাই, আমার চেতনা জুড়ে, মার্কসের পাশাপাশি সব সময়ই রবীন্দ্রনাথের আনন্দনিষ্যন্দিত উপস্থিতি।....আমরা হাসি, কাঁদি, গল্পগুজব করি, কেচ্ছা ছড়াই, গানে গুনগুনিয়ে উঠি, কলহে প্রবৃত্ত হই, সব-কিছুরই প্রকাশের পথ বাতলে দেয় রবীন্দ্রনাথ দ্বারা নির্মিত-চর্চিত, রূপমন্ডিত বাংলা ভাষা। ভাষার দার্ঢ্য এবং সেই সঙ্গে বিস্তার না থাকলে চিন্তা এলিয়ে পড়ে, যুক্তির সারণি বেপথুমান হয়, ভাবনাকে সংহত রূপ দিতে আমরা অসমর্থ হই। রবীন্দ্রনাথ-দত্ত ভাষার ভেলায় ভেসেই আমরা প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞানের স্তরের পর স্তর অতিক্রম করতে সমর্থ হই। হাটে-মাঠে-ঘাটে যখন মার্কসবাদী হিসেবে নিজের বিশ্বাসের কথা অন্যদের শোনাতে যাই, তখনো তো আমার প্রধান অবলম্বন আমার মাতৃভাষা, যা রবীন্দ্রনাথের ভাষা, রবীন্দ্রনাথ যা ভূষণে-রতনে আমাদের জন্য রচনা করে দিয়েছেন, অথচ ভূষণরত্নের ভারে প্রসাদগুণ বিমূঢ় হয়নি।...’’

কয়েক বছর আগে ‘আমার মৃত্যুর পর’ নিবন্ধেও তিনি লিখে গেছেন: "...যে-বয়সে পৌঁছেছি, মৃত্যুচিন্তা এড়ানো অসম্ভব, এবং সেজন্যই ইচ্ছাপত্র গোছের কিছু বাসনার কথা ব‍্যক্ত করছি। ধরে নিচ্ছি আমার মৃত্যুকালে তখনো কয়েকজন বন্ধু অবশিষ্ট থাকবেন। উদ্ধত সাহসের সঙ্গে আরো ধরে নিচ্ছি, তাঁরা হয়তো আমার জন্য একটি ক্ষুদ্রায়তন স্মরণসভার আয়োজন করবেন। সেই সভায়, আমার বিনীত অনুরোধ, স্মৃতিচারণ ধাঁচের বক্তৃতাদি একেবারে বাদ দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কিছু গান, একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই কিছু গান যেন গাওয়া হয়।..." (নিবন্ধ সংকলন: ‘‘সমাজ, স্মৃতি, সাহিত্য’’)।

*************

‘একুশ শতক’, জুন ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত

20200827

করোনার সংক্রমণ ও আর্থিক অধোগতি রোধ: বামপন্থী বিকল্প পথ

 

বামপন্থী বিকল্প পথ ব্যাখ্যা করছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি

ড. অসীম দাশগুপ্ত

করোনা অতিমারী এবং আর্থিক অধোগতি— এই দুই কঠিন সমস্যার মুখোমুখি আমরা দাঁড়িয়ে আছি। একই সঙ্গে, আমরা লক্ষ্য করছি, করোনা রোগের প্রতিষেধক আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থে সামগ্রিক নীতি কি হওয়া উচিত— স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদীতে— তার ওপর সংক্ষেপে এই আলোচনা। 

আর্থিক অধোগতি 

দেশের আর্থিক অধোগতি করোনার আক্রমণের আগেই শুরু হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল তথাকথিত আর্থিক উদারনীতি, যে নীতি কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গির কারণেই, বারংবার দেশের অর্থনীতিকে ছেড়ে দিতে চেয়েছে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার ওপরে এবং খর্ব করতে চেয়েছে সরকারের সামাজিক কল্যাণকর ভূমিকা। এই নীতি অনুসরণ করেই, ভুল পথে গিয়ে, প্রস্তুতিহীন ভাবে বিমুদ্রাকরণ ঘোষণা করা হয়, এবং তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষি, শিল্প এবং পরিষেবা— সর্বক্ষেত্রেই।

কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতি অর্থবর্ষে তিন মাস ধরে ধরে যে তথ্যাবলী প্রকাশিত হয়, তার ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে, গত অর্থবর্ষের (২০১৯-২০) প্রতি তিন মাসেই দেশের মোট উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়েছে এবং সর্বশেষ ত্রৈমাসিকে এই বৃদ্ধির হার হ্রাস পেয়ে হয় ৫ শতাংশ, যা বিগত ছ’বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অধোগতির অঙ্গ হিসাবে উৎপাদনের পরিমাণও হ্রাস পায়— শিল্পের ক্ষেত্রে, কৃষিতে এবং পরিষেবার (যথা ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা থেকে ঋণ প্রদান ইত্যাদি) ক্ষেত্রেও। উৎপাদন ও পরিষেবার এই সামগ্রিক অধোগতির কারণে আঘাতপ্রাপ্ত হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ, এবং ফলে হ্রাস পায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এই ক্রয়ক্ষমতার হ্রাসই আর্থিক সঙ্কটের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রকাশিত রিপোর্টে (২০১৯-২০)। এর মুখে দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় সরকার, পুনরায় তাদের শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির কারণে, সাধারণ মানুষের এই ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষা করে নজর দেয় ধনী শিল্পপতিদের সুবিধা দিতে কর্পোরেট করের হার ইত্যাদি লাঘব করতে, যাতে শিল্পপতিরা উৎসাহিত হয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করে। অর্থাৎ, যেখানে মূল সমস্যা ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের কারণে বাজারে মোট চাহিদারই অভাব, সেই চাহিদার বৃদ্ধির পথে না গিয়ে, কেবল জোগান বৃদ্ধির পথে গিয়ে সমস্যা সমাধানের উলটো দিকেই যাওয়া হয়। ফলে, সামগ্রিক আর্থিক অধোগতি রোধ করাও সম্ভব হয় না। 

করোনা অতিমারীর আঘাত 

এই আর্থিক অধোগতির মধ্যেই করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয় গত অর্থবর্ষের শেষের দিকে। চীন দেশের উহান প্রদেশে এই রোগ শুরু হলেও (এবং চীন এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সফল হলেও) ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সরকার বিষয়টিকে শুরু থেকেই গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয় এবং করোনা অতিমারীর আকার ধারণ করে গোটা বিশ্বে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে করোনা আক্রান্ত এখন ২.৩৩ কোটি অতিক্রম করেছে। আক্রান্তের নিরিখে শীর্ষে রয়েছে আমেরিকা, তারপরে ব্রাজিল, এবং তৃতীয় স্থানে ভারত (৩০লক্ষ ছাড়িয়েছে)। কিন্তু এর মধ্যে উদ্বেগের বিষয় এই যে, সর্বাপেক্ষা বেশি হারে আক্রান্তদের সংখ্যা এখন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে ভারতেই। 

এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে দেশে এবং এরাজ্যে উপলব্ধি করা হয়েছে যে, যত দিন না পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার করে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে, ততদিন নিবারণমূলক পদক্ষেপের ওপরই জোর দিতে হবে— দূরত্ববিধি রক্ষা, মুখের বন্ধনী ব্যবহার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ইত্যাদির ওপর। এর সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থা আরও ব্যাপক ও দ্রুত করা এবং তার সঙ্গে নিভৃতবাস এবং হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থাকেও কার্যকরী ভাবে সমন্বিত করা। এই পদক্ষেপগুলির অঙ্গ হিসাবে জোর দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে কিছুদিন এবং কিছু এলাকা নির্দিষ্ট করে ‘লকডাউন’ প্রক্রিয়া লাগু করার ওপর। তবে অনেক ক্ষেত্রেই এই ‘লকডাউন’ এর দিন ইত্যাদির সিদ্ধান্ত একেবারেই বিজ্ঞানসম্মত ভাবে নেওয়া হয়নি এবং স্থানীয় চাপ ইত্যাদির সঙ্গে আপস করা হয়েছে, যার একটি উদাহরণ বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত। 

কিন্তু, উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই ‘লকডাউন’গুলির কারণে প্রতিটি রাজ্যেই উৎপাদন এবং পরিষেবার ওপর বাড়তি আঘাত এসে পড়েছে, বিশেষ করে দেশের বিশাল অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলির ওপর যেখানে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ তাঁদের কর্মসংস্থান এবং উৎপাদনের জন্য নির্ভরশীল। এর ফলে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবর্ষে (২০২০-২১) আমাদের দেশের মোট উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিবর্তে হতে পারে প্রায় ৪ শতাংশ সংকোচন (-৪%) এবং কাজ হারাতে পারেন প্রায় ১৪ কোটি মানুষ। এতে সামগ্রিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন পুনরায় দেশের সেই নিচের ৮০ শতাংশ মানুষজনই। 

কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির প্রশ্ন 

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার, তাদের শ্রেণিদৃষ্টিভঙ্গি থেকে স্থির করেছে যে, দরিদ্র মানুষদের সরাসরি সহায়তা করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূলত উদ্যোগীদের ঋণ প্রদান এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপরেই জোর দেওয়া। তার মাধ্যমেই উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটলে শ্রমজীবী মানুষজনও উপকৃত হবেন। লক্ষণীয় যে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে প্রায় ২০ লক্ষ কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ প্রথমে প্রধানমন্ত্রী, পরে আরও বিস্তারিত ভাবে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, ঘোষণা করেছেন তার প্রায় ৯০ শতাংশই হলো ঋণ যা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে প্রদান করা হবে শিল্পোদ্যোগীদের। এমন কি অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী যে ১ লক্ষ কোটি টাকা কৃষির ক্ষেত্রে বরাদ্দ করার কথা বলেছেন, তা ঐ ২০ লক্ষ কোটি টাকারই অংশ এবং যা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন কৃষকদের প্রদান করা হবে বিপণন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যা উপেক্ষিত থাকছে, তা হলো, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষমতা, যার সমাধান না হলে শুধুমাত্র জোগান বৃদ্ধি করলে উৎপাদিত পণ্য তার বাজার পাবে না। 

এ ছাড়া, উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই আর্থিক অধোগতির সময়ই, সংসদে কোনও আলোচনা না করেই নির্বিচারে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার যার মধ্যে রয়েছে দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলিও। এ ছাড়া, আঘাত করা হয়েছে শ্রমিকদের কল্যাণের শ্রমআইনগুলিও। এই পদক্ষেপগুলির জন্য পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যাপক অংশের শ্রমজীবী মানুষ। 

বামপন্থী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি 

এই ক্রয়ক্ষমতার বৃদ্ধিকেই মূল লক্ষ্য হিসাবে স্থির রাখা হয়েছে বামপন্থী বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে তাই কার্যকরী দিক হলো কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে নিচের ৮০ শতাংশ পরিবারের হাতে পরিবারপিছু মাসে ৭,৫০০ টাকা সরাসরি প্রদান করা সম্ভব হয়। এ ছাড়া, বিনামূল্যে রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া, এবং করোনা প্রতিরোধে নিবারণমূলক এবং নিরাময়মূলক পদক্ষেপগুলির জন্য অতিরিক্ত অর্থপ্রদান করা এবং সাংগঠনিক পদক্ষেপগুলিও গ্রহণ করা। 

এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সামনে রেখে তাই স্বল্পমেয়াদি (আগামী ছ’মাসের জন্য) পদক্ষেপগুলি হলো— (১) দেশের নিচের ৮০ শতাংশ পরিবারের প্রত্যেকটি পরিবারের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাসে ৭,৫০০ টাকা জমা দেওয়া। এর জন্য কেন্দ্রীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ করতে হবে ৯.৩৫ লক্ষ কোটি টাকা। তারপরে (২) নিচের এই ৮০ শতাংশ পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে ভরতুকি দিয়ে বিনামূল্যে ৬ মাসের জন্য মাসে ১০ কেজি করে খাদ্যশস্য (চাল অথবা গম) রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া, যার জন্য প্রয়োজন হবে ৬ কোটি ২৪ লক্ষ টন খাদ্যশস্য (যার থেকে অনেক বেশি খাদ্যশস্য, প্রায় ৭ কোটি ৭০ লক্ষ টন, বর্তমানে মজুত আছে ভারতের খাদ্যনিগমের গুদামগুলিতে)। আর্থিক দিক থেকে এই পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজন হবে কেন্দ্রীয় বাজেটে অতিরিক্ত ১.১৭ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করা। এ ছাড়া, (৩) করোনার ক্ষেত্রে নিবারণ ও নিরাময়মূলক পদক্ষেপগুলির জন্য কেন্দ্রীয় বাজেটে বর্তমান বছরে স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বরাদ্দকে (৬৭ হাজার কোটি টাকা) দ্বিগুণ করে উন্নীত করতে হবে ১.৩৪ লক্ষ কোটি টাকাতে। অর্থাৎ, এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের জন্য বছরে কেন্দ্রীয় বাজেটে বরাদ্দ করতে হবে অতিরিক্ত মোট ১১.১৭ লক্ষ কোটি টাকা, যা হবে সমগ্র কেন্দ্রীয় বাজেটের মাত্র ৩.৮ শতাংশ। স্বল্পমেয়াদিতে এই বাড়তি অর্থ জোগাড় করতে হবে ঘাটতি বাজেটের মাধ্যমেই, এবং এর জন্য উদারনীতির চাপানো আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ও বাজেট পরিচালনা আইনকে কিছুটা অতিক্রম করতেই হবে। মনে রাখা প্রয়োজন, এই পদক্ষেপগুলির জন্য সাধারণ মানুষের আয়বৃদ্ধির ফলে যে অতিরিক্ত চাহিদার সৃষ্টি হবে, তা বর্তমানের এই চাহিদা-ঘাটতির সময়ে মঙ্গলজনক হয়ে উৎপাদনকে উৎসাহিত করে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্যকেই রক্ষা করবে, এবং এর জন্য কোনও অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধি হবে না। ফলে, উৎপাদনে অধোগতিকে রুখে দিয়ে অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি সঞ্চারই হবে। 

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী যে ১ লক্ষ কোটি টাকা কৃষির ক্ষেত্রে বরাদ্দ করার কথা বলেছেনতা ঐ ২০ লক্ষ কোটি টাকারই অংশ এবং যা অপেক্ষাকৃত সম্পন্ন কৃষকদের প্রদান করা হবে বিপণন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য। এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে যা উপেক্ষিত থাকছেতা হলোসাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষমতাযার সমাধান না হলে শুধুমাত্র জোগান বৃদ্ধি করলে উৎপাদিত পণ্য তার বাজার পাবে না।

স্বল্পমেয়াদিতে যতদিন না পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং গণব্যবহার শুরু হচ্ছে, ততদিন মূল জোর থাকবে করোনার নিবারণমূলক চিকিৎসায়, এবং তার সঙ্গে নিরাময়মূলক চিকিৎসার সমন্বয়ের ওপর। এই নিবারণমূলক চিকিৎসার ক্ষেত্রে, ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া ‘লকডাউনের’ পরিবর্তে অনেক জরুরি হবে গ্রামে এবং শহরে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা। এই কাজে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হবে চিকিৎসকের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা যাদের অধিকাংশকেই এরাজ্যে নিয়োগ করা হয়েছিল বামফ্রন্ট সরকারেরই আমলে। এঁরাই মানুষের বাড়িতে গিয়ে বোঝাবেন কি কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে তাঁদের স্বাস্থ্য নিরাপদ থাকবে তাঁদের নিজেদের হাতেই। এই ক্ষেত্রে বিশেষ সহযোগী ভূমিকা পালন করবে বাম ও প্রগতিশীল গণসংগঠনগুলি। এই বিষয়ে এরাজ্যে ইতিমধ্যেই এগিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানমঞ্চ, গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতি এবং ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলি। এরপর, এই নিবারণমূলক পদক্ষেপগুলির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন হবে প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে গ্রামাঞ্চলে ব্লক, মহকুমা এবং জেলাস্তরে হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোর উন্নয়ন করা, রোগ পরীক্ষার ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত করা এবং রোগ নিরাময়ের দিকে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া। শহরাঞ্চলেও একই ধরনের কাজ করতে হবে প্রতি ওয়ার্ডকে ভিত্তি করে পৌর হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোকে উন্নয়নের মাধ্যমে। করোনার ক্ষেত্রে জনস্বাস্থ্যের এই পদক্ষেপগুলির জন্যই এই খাতে কেন্দ্রীয় বাজেটের অর্থ দ্বিগুণ করার কথা ইতিমধ্যেই উল্লিখিত হয়েছে। 

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ 

দীর্ঘমেয়াদি স্তরটি চিহ্নিত হবে করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কার এবং তার গণব্যবহারের স্তর শুরু হওয়ার পর থেকেই। এই লক্ষ্যে এখনই প্রস্তুতির প্রয়োজন, যাতে কেন্দ্রীয় বাজেটে উপযুক্ত ভরতুকি প্রদানের জন্য বাড়তি অর্থ বরাদ্দ থাকে, এবং রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে সমন্বয় থাকে যাতে এই বিষয়ে স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে গণটিকার ব্যবস্থা সম্ভব হয়, এবং তার উপকার সমস্ত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়। 

দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও স্বল্পমেয়াদি স্তরের তিনটি পদক্ষেপকেই বেশ কিছুদিনই চালু রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের স্বার্থে শুধু করোনার আক্রমণের পূর্ণাঙ্গ মোকাবিলা সম্ভব হবে তাই নয়, আর্থিক প্রগতির চাকাটিও নিয়মিত ঘুরতে শুরু করবে যাতে সাধারণ মানুষের আয় এবং কর্মসংস্থান ধারাবাহিক ভাবেই বৃদ্ধি পাবে। দেশের মোট উৎপাদন ও আয়বৃদ্ধি হতে থাকলে রাজস্ব আদায়ও বৃদ্ধি পায়, এবং এর ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারগুলির আয়ও বৃদ্ধি পাবে, যার থেকে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে আরও বর্ধিত ব্যয়ও বহন করা সম্ভব হবে। 

সর্বশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, আর্থিক প্রগতি এবং করোনাকে প্রতিরোধ করার এই প্রক্রিয়া থেকে সর্বাপেক্ষা উপকৃত হতে পারেন আমাদের দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষজনই। তাই স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপগুলির ক্ষেত্রে, দাবি আদায় এবং পদক্ষেপগুলির কার্যকারিতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হবে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সংগঠিত এবং ধারাবাহিক আন্দোলন— গ্রামে এবং শহরে। 

গণশক্তি, ২৭ আগস্ট, ২০২০

 


 

প্যান্ডেমিক-পিকে-আঁখি এবং প্রত্যাঘাত

সুদীপ্ত বসু

শুধু ধূপগুড়িতেই গঙ্গাধর রায় সহ মোট দশজন কৃষক এখনও পর্যন্ত আত্মঘাতী হয়েছেন। পাটের চাষ প্রায় বন্ধ বিস্তীর্ণ এলাকায়। ফসলের দাম নেই, মহাজনী ঋণে জর্জরিত গরিব, প্রান্তিক কৃষকরা। আবার এই ধূপগুড়িতেই পশ্চিমবঙ্গের বুকে প্রথম গোরক্ষার নামে গুজব ছড়িয়ে দুই কিশোরকে পিটিয়ে খুন করার প্রথম ঘটনা ডুডুয়ার তীরে বারহালিয়া গ্রামে। 

আজকের বাংলার রাজনীতির ‘সাজানো সমীকরণের’ আশ্চর্য ক্যানভাস হয়ে উঠতে পারে উত্তরবঙ্গের এই কৃষি জনপদ। 

গঙ্গাধর রায়ের মাত্র তিন বিঘা জমি ছিল, অন্যের জমিতে লিজেও চাষ করতেন। তিনটি মেয়ে। ব্যাঙ্ক ও মহাজনী ঋণের চাপে শেষপর্যন্ত অসহায় আত্মসমর্পণ, আত্মঘাতী হন। জমিও আপাতত বন্ধক রয়েছে মহাজনী কারবারিদের হাতে। ধূপগুড়ি থেকে গোটা উত্তরবঙ্গে আলু যায়, সেখানেই আলু চাষি আত্মঘাতী হচ্ছেন। শুধু এই এলাকা থেকেই তিন হাজারের বেশি কৃষক পরিবারের ছেলেমেয়ে বাইরে কাজের খোঁজে। 

দারিদ্র্যের সেই উঠোনে বিহার থেকে আসা পিকে’র বাহিনী হাজির হয়েছিল। গঙ্গাধর রায়ের দাদা চিন্তামোহন রায়। গাদং এলাকায় সিপিআই(এম)’র সংগঠক। দু’বছর আগে বাবাকে হারানো তিন কন্যার অবাক চাহনি। চিন্তামোহন রায়ের পুত্র জয়ন্ত রায়। বাংলায় এমএ। ছয় বছর আগে প্রাথমিকে টেটে উত্তীর্ণ, আজও নিয়োগ হয়নি।

কর্পোরেট সংস্থা পিকে বাহিনীর মুখের ওপর জবাব শুনিয়েছিল জয়ন্ত,‘আমাদের পরিবারকে আগে জেনে আসুন, তারপর বাবাকে কিনতে আসবেন, আমরা গরিব হতে পারি কিন্তু বিক্রি হই না’। 

প্রত্যাখ্যানের পর্ব পেরিয়ে এবার প্রত্যাঘাত। ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরাই পালটা তাড়া করেছে। প্রত্যাঘাতেই লুকিয়ে আছে আগামীর অনেক সম্ভাবনার রসদ।

 

‘আমাদের মাথা বিক্রির জন্য নয়’ 

রাজনীতিতে সময় বরাবরই এক্স ফ্যাক্টর। 

কোভিড আবহ। চলতি মাসেই রাজ্যে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দেড় লক্ষে পৌঁছাতে চলেছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভয়াবহ চিত্র বেআব্রু হচ্ছে প্রতিদিন, লকডাউনের দিন ঘোষণা করতেও কার্যত নাজেহাল সরকার। রাজ্যের মত দেশেও বাড়ছে করোনা দাপট। দেড়শো দিন পেরিয়ে গেছে, দেশে ৫৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্য, প্রধানমন্ত্রী ময়ূরের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন! 

ঠিক সেই সময়তেই এরাজ্যে কেনাবেচা করতে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা শুরু করেছে মমতা ব্যানার্জির হয়ে ভাড়া খাটা প্রশান্ত কিশোরের বাহিনী। 

২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোটের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। গায়ের জোরে, অস্ত্রের মুখে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় মাইলের পর মাইল বিরোধী শূন্য। বেলাগাম দুর্নীতির উৎসমুখ। আমফান পরবর্তী ঘটনাবলি স্পষ্ট করেছে বিনা ভোটে জেতার উগ্র বাসনা কেন। গরিব, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে সামান্য ত্রিপল পেতেও টাকা দিতে হয়েছে। ক্ষোভের বৃত্ত বাড়ছে, জমি হারাচ্ছে তৃণমূল। বাজার করতে বেরোচ্ছে প্রশান্ত কিশোর অ্যান্ড কোম্পানি। 

খোদ হরিরামপুরের বিধায়কের বাড়ি পৌঁছেছে সেই ভাড়াটে বাহিনী। ঘৃণাভরে তা উড়িয়েছেন সিপিআই(এম) বিধায়ক রফিকুল ইসলাম। ঘরের দোর থেকেই বিদায় করেছেন পিকে বাহিনীকে। 

এবাংলার রাজনীতিতে এই সংস্কৃতির আমদানি হলো মমতা ব্যানার্জির হাত ধরেই। ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা মামলা রুজু করে দলবদলে চাপ দেওয়ার ঘটনা ২০১১ সাল থেকেই চলছিল। কিন্তু কোটি কোটি টাকায় ভাড়া করা একটা কর্পোরেট সংস্থাকে দিয়ে বাংলার মানুষকে ‘কিনতে ’ চাওয়ার স্পর্ধা এর আগে কেউ দেখায়নি। ‘দিদিকে বলো’ থেকে ‘বাংলার গর্ব মমতা’- কর্পোরেট প্রচার মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই এবার বাঁকা আঙুলে ঘি তোলার চেষ্টা— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন উদ্বেগজনক ছবি।  

ধূপগুড়ির সিপিআই(এম)’র প্রাক্তন বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়ের উঠোনে দাঁড়িয়েও দরদাম করেছেন প্রশান্ত কিশোরের সংস্থার বিহারের বাসিন্দা। 

—শুনুন তৃণমূলকে জেতানোর দায়িত্ব নিয়েছেন আমাদের বস, এখন বেকায়দায়। চারিদিকে দুর্নীতি, আপনি তৃণমূলে যোগ দিন,আপনাদের মতো সৎ লোকেদের প্রয়োজন তৃণমূলে। টাকা পয়সার অভাব হবে না, জেলায় ভালো পদ পাওয়া যাবে।

ছাত্র আন্দোলন থেকে জমির আন্দোলনে পরশ মাখা প্রৌঢ়ের পালটা জবাব ছিল,‘ কমিউনিস্ট পার্টি করেছিল সারাজীবন, কোনোদিন শুনিনি ভোটের জন্য কোনও দলকে একটা কর্পোরেট কোম্পানিকে ভাড়া করতে হয়। এসব এরাজ্যের সংস্কৃতি নয়, আর এই যে বলছেন তৃণমূলে সব অসৎ লোক, এটা ভুল ধারণা। তৃণমূলের মাথাই অসৎ তাই কর্মীরাও সেই পথে’। 

কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীদের শ্লাঘা বোধ হবে এমন কথোপকথনে স্বাভাবিক। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো কেন সিপিআই(এম)’কে কিনতে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে হচ্ছে? আবার করোনা পরিস্থিতিতে রাজ্যও দেশের সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে, মানুষের দাবিতে প্রতিবাদ আন্দোলনে নামলে সিপিআই(এম)’কেই হুঁশিয়ারি দিতে হচ্ছে নবান্ন থেকে?

 

বাড়ির সামনে বসে মাছের জাল বুনছেন প্রাক্তন সিপিআই(এম) বিধায়ক লক্ষীকান্ত রায়


‘করোনার ব্যর্থতা শেষে এখন দুর্নীতি’ 

গত পাঁচ মাস রাজ্যজুড়ে কোভিড পরিস্থিতিতে একের পর এক মর্মান্তিক ছবি সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। স্বাস্থ্য দপ্তর পাঁচ মাসে ঠিক কী কাজ করেছে তা নিয়ে রাজ্যবাসীর স্বাভাবিকভাবেই এখন কোনও আগ্রহ নেই। লকডাউন মানে যে রাস্তা লাল ইট দিয়ে সাদা গোল করা নয়, তা এতদিনে উনিও হয়তো টের পেয়েছেন। 

মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক তো ছাড়, খাস বিহারও এখন দৈনিক করোনা নমুনা পরীক্ষায় পশ্চিমবঙ্গকে ছাড়িয়ে গেছে। রাজ্যে গোষ্ঠী সংক্রমণের আবহে অ্যাগ্রেসিভ টেস্টিং’র জায়গায় দৈনিক নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ ভাবে কমে যাওয়া করোনা পর্বে রীতিমতো উদ্বেগজনক বলেই মনে করা হচ্ছে। কোভিড পজিটিভ হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা তিন হাজার পেরোতে চলেছে। উত্তরবঙ্গের যে জেলায় করোনা মোকাবিলার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, সেই জেলার স্বাস্থ্য আধিকারিকদের স্রেফ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে বদলি করে দেওয়া হয়েছে। ‘আলিপুরদুয়ার মডেল’ নয়, সরকার বরং নির্মল মাজি-শান্তনু সেন’দের প্রেসক্রিপশনেই আস্থা রাখছে। যার অনিবার্য পরিণাম, সংক্রমণের গতি বেপরোয়া, মৃত্যুর স্রোতকে আটকাতে না পারার ব্যর্থতা সামনে আসছে প্রতিদিন। 

সংক্রমণের এই পর্বে রাজনীতি করা যাবে না বলে দাবি করে প্রতিদিন স্রেফ দলীয় রাজনীতি করে যাচ্ছে সরকার। সংক্রমণের শঙ্কা উপেক্ষা করে দলীয় বাহিনী ত্রাণ, ক্ষতিপূরণে টাকা চুরি করে যাচ্ছে, প্রতিবাদে গ্রামবাসীরা পথে নামলে ‘করোনায় রাজনীতি ’ না করার হুশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। অথচ তথ্য বলছে লকডাউন শুরু প্রায় তিন সপ্তাহ আগেই তখই করোনা উপসর্গ নিয়ে আইসোলেশনে থাকা মানুষের সংখ্যা ৩১, ১২৫১জন নজরদারিতে, ২৯জনের লালরসের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। আর সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী মালদহের সভায় দাঁড়িয়ে বলছে, করোনা করোনা নিয়ে মাথা ঘামানো হচ্ছে, ওসবে প্যানিক করবেন না’। উলটে আবার নেতাজী ইন্ডোরে সভা করে ক্লাবগুলিতে টাকা বিলি করা হয়েছে। মধ্যপ্রদেশের সরকার কেনাবেচায় ব্যস্ত ছিল অমিত শাহ, তাই জানুয়ারি স্পষ্ট ইঙ্গিত পেলেও মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নষ্ট করা হয়েছিল। 

আর এখন আনলক পর্বে সামনে এসেছে মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিইি-ভেন্টিলেটর- কেনা নিয়েও সরকারের অন্দরেই এখন কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির খবর। কোভিড সরঞ্জাম নিয়েও দুর্নীতি! আমফানের ক্ষতিপূরণ নিয়েই দুর্নীতি! মুখ্যমন্ত্রীর সাফাইয়ের মর্মার্থ— পিএম কেয়ার ফান্ডে দুর্নীতি হতে পারলে এরাজ্যে সামান্য মাস্ক, ভেন্টিলেটর নিয়ে প্রশ্ন কেন? 

‘বাইনারি’ ঠিক হচ্ছে কীভাবে, কোন খাতে বারেবারে তা স্পষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। 


‘শীতঘুম শেষে বোঝাপড়ার সমন’ 

এর মাঝেই নতুন মোড়। আনলক পর্বে এসে দীর্ঘ শীতঘুম কাটিয়ে ফের নারদ ঘুষকাণ্ডে তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীদের সমন পাঠানো হচ্ছে, সম্পত্তির তথ্য চাওয়া হচ্ছে। এফআইআর রুজুর পরে চার বছর কেটে গেছে। তারপরেও এখনও সমনের পালা চলছে। কেউ কেউ খুশি, ‘এই তো এবার দুর্নীতিগ্রস্তরা ধরা পড়বে’। দুর্নীতিগ্রস্তদের শাস্তির আকাঙ্ক্ষা ভুল কিছু নয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় সংস্থা দৃঢ়তার সঙ্গে তদন্ত করে হাত পেতে ঘুষ নেওয়া মন্ত্রী, সাংসদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, সেই ধারণা চরম বিভ্রান্তিকর। 

কেন? ২০১৪ সালে সারদা-রোজভ্যালি সহ চিট ফান্ডকাণ্ডে সিবিআই তদন্ত শুরু হয়। ছয় বছর পরেও চার্জশিট জমা দেওয়া হয়নি। এখন বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের তদন্ত চলছে। 

তবে এর মাঝেই এবার জবাব দিতে হবে খোদ প্রধানমন্ত্রীকেই। গত ছয় বছর ধরে চিট ফান্ডকাণ্ডে অভিযুক্তদের জেলে ঢোকানোর গল্প পশ্চিমবঙ্গে এসে বার পাঁচেক শুনিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

অথচ সেন্ট্রাল ভিজিল্যান্স কমিশনের (সিভিসি) রিপোর্ট বলছে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা দেশে একাধিক দুর্নীতির মামলায়( ব্যাঙ্ক, এমনকি সরকারি দপ্তরের দুর্নীতি) জনপ্রতিনিধি ও সরকারি আধিকারিক সহ ১১০ জনের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সম্মতিটুকু পর্যন্ত আটকে রেখেছে কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ, জন-অভিযোগ মন্ত্রক। এই মন্ত্রক রয়েছে মোদীর হাতেই। 

২০১৯ সালের এপ্রিল মাস থেকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিবিআই’র আবেদন বকেয়া রয়েছে। গত বছরের এপ্রিল মাসেই সিবিআই’র তরফে তৃণমূলের তিনজন সাংসদ ও একজন মন্ত্রীর জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে মামলা ও আইনি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য আবেদন জানানো হয়। সেই  আবেদন ১৫ মাস ধরে ফেলে রেখেছে মোদী সরকার। এমনকি মমতা ব্যানার্জির ছবি দুর্নীতিকাণ্ডের আইনি প্রক্রিয়ার আবেদনও ফেলে রাখা হয়েছে। 

বিশ্বাস করবেন এই নতুন ‘সমন পর্ব’? 


সোশ্যাল মিডিয়া শাসকেরই মিডিয়া’ 

‘নয়া ভারতে মোদীর প্রতারক ভাবমূর্তি’— এই শীর্ষক সিপিআই(এম)র সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির ফেসবুক লাইভ। সেই ভার্চুয়াল বক্তৃতার শেয়ার করার মহারাষ্ট্রের সিপিআই(এম) নেত্রী শুভা সামিমের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তিনদিনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হলো। এই বক্তৃতা নাকি ফেসবুকে সামাজিক মাপকাঠির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

যদিও তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা টি রাজা সিং’র ঘৃণ্য বিষাক্ত মন্তব্য— মুসলিমদের বিশ্বাসঘাতক, রোহিঙ্গা মুসলিমদের গুলি করে মারা, দিল্লির দাঙ্গায় কপিল মিশ্রের উগ্র পোস্ট— সব কিছুই অনুমোদন দিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ‘ব্যবসা ও শাসক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্কে ক্ষতি হবে’ এই অজুহাতে! অভিযোগের তীর ফেসবুকের  ভারত, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার পাবলিক পলিসি ডিরেক্টর আঁখি দাস আবার রাজ্যের প্রাক্তন কারিগরি শিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের পুত্রবধূ। ২০১১ সালের নির্বাচনে দক্ষিণ বর্ধমান কেন্দ্রে তৃণমূল প্রার্থীর হয়ে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচার সামলেছেন আঁখি দাস নিজেই। কথিত আছে, তাঁর প্রভাবেই রবিরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় মন্ত্রীসভায় স্থান পান। ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তাঁর স্বামী দিল্লির উচ্চ পদস্থ আমলা( আরএসএস’র কট্টর সমর্থক) সৌম্য চট্টোপাধ্যায় এবং আঁখি দাস ওই কেন্দ্রের নির্বাচনী প্রচারের সময় ছিলেন বর্ধমানেই। এমনকি খোদ তাঁর ফেসবুক টাইমলাইনে কোভিডের জন্য ‘মুসলিমদের বাড়তি দায়িত্ব পালন করা উচিত’র মতো সূক্ষ বিষাক্ত প্রচারও শেয়ার করতে দেখা গেছে। তাঁর দিদিও পরিচিত মুখ, বিজেপি’র। 

বিজেপি-আরএসএস’র সখ্যতা কখনও তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় আঁখি দাসের পথে বাধা হয়নি। 

২০১১ ভোটের সময় যেভাবে তৃণমূলের প্রচার ভিডিও ভাইরাল করা হয়েছিল, যেভাবে প্রচারের সুর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাতে দলেরই বিধায়ক, মন্ত্রীর এই পুত্রবধূর ‘ভূমিকা’ গুরুত্বপূর্ণ। 

সীতারাম ইয়েচুরির বক্তৃতার লিঙ্ক শেয়ার অপরাধ, অথচ কপিল মিশ্রদের বক্তৃতা ফেসবুকে ভাইরাল করতে সময় লাগে না। খোদ ফেসবুক প্রধান নিজেই লিখেছেন মমতার প্রচারের ৩৮ ভিডিও ভাইরালের রহস্য! 

আদৌ রহস্য থাকল কিছু ? সোশ্যাল মিডিয়া আসলেই ‘শাসকেরই মিডিয়া’!


‘দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেবে মানুষকে’ 

মহামারীকে ঢাল করে যেভাবে জনগণের রুটি-রুজির ওপরে আঘাত নামিয়ে আনা হচ্ছে, যেভাবে অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ কর্পোরেটের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে তার প্রতিবাদে গোটা দেশজুড়ে এই অস্থির সময়তেই সপ্তাহ ব্যাপী সিপিআই(এম)’র প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছে। ১৬টি দাবি। স্পষ্ট বিকল্প— আয়কর দেয় না এমন পরিবারগুলিকে আগামী ছয় মাস নগদ ৭৫০০ টাকা করে দিতে হবে, বর্ধিত মজুরি সহ রেগায় ২০০দিনের কাজ। 

আবারো বলতে হচ্ছে ‘সময়’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দুত্বের উগ্র মুখ মেঘালয়ের প্রাক্তন রাজ্যপাল ফিরে এসেছেন কলকাতায়। নড়বড়ে অধিকারী পরিবার, নারদকাণ্ডের সমন পৌঁছেছে তাঁর ঠিকানাতেও। ‘পত্র-সংঘাতের’ মাঝেই রাজভবনে ‘আড্ডা’ দিয়ে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রীও।

বিচ্ছিন্ন সব ছবি? একেবারেই নয়। 

পরিকল্পিত মেরুকরণের রঙিন চিত্রনাট্য প্রস্তুত। শাসকের মরজি মতো মিডিয়ায় সাজানো হচ্ছে বাইনারি- ‘হয় তুমি তৃণমূল নয় তুমি বিজেপি’। 

আপনাকে বিভ্রান্তির চোরাবালিতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে দুই সরকার। 

উত্তর অভিন্ন— আমাদেরই সামনে আনতে হবে বিকল্প ভাষ্য। একইসঙ্গে প্রত্যাঘাত, দ্রুত এবং সরাসরি। মনে রাখতে হবে পিকে’র বাহিনী কাদা মাখা কৃষকদের তাড়া খেয়েই কিন্তু গ্রাম থেকে পালাতে বাধ্য হয়।

গণশক্তি, ২৫ আগস্ট, ২০২০

20200825

বাজার যখন সুবোধ রায়কে খুঁজে পেল

 


অশোক মিত্র

প্রচারবিমুখ মানুষটি পার্টি-অফিসের এক কোণে বসে নীরবে কাজ করে গিয়েছেন সারা জীবন। তাঁকেই নায়ক বানিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রে সেই সুবোধ রায়কে খোঁজার চেষ্টা অনর্থক।

......................................................... 


কী আর করা, এত এত বছর ধরে জড়ো হওয়া স্তূপ, স্মৃতিপটের কোনাঘুপচিতে হয়তো কয়েক হাজার কবিতার পঙক্তি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে, হঠাৎ-হঠাৎ একটি-দু’টি আচমকা মাথা ঝাঁকুনি দেয়কবে কোথায় কোনও কলেজ ম্যাগাজিনে কী বা নগণ্যতর এক পুস্তিকায় এই কাব্যপ্রয়াস চোখে পড়েছিল, এখন আর কিছুতেই মনে আনতে পারি না: ‘অনেকটা সেই সিন্ধুবুকে গর্জনেরে ছাড়ি’। রেডিয়োতে নাটক শুনে বেজায় তারিফ তারই...’ কিংবা এরই কাছাকাছি জোড়া পঙক্তিযোজন। একটি সামাজিক মন্তব্যও যেন লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়েছিল: আসলে আমাদের অশ্রদ্ধা, অথচ নকল নিয়ে দুর্দান্ত মারামারি। কলেজ ম্যাগাজিনে পেশ করা সমাজদর্শনকে কী করে যেন সম্প্রতি একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে দৃষ্টান্তিত হতে দেখলাম। 

চট্টগ্রাম বিদ্রোহের তরুণতম নায়ক সুবোধ রায়, বাড়ির সবাই ঝুঙ্কু বলে ডাকত। ১৯৩০ সাল, মাত্র চোদ্দো বছরের আদরের মাসতুতো ভাইটিকে কল্পনা দত্ত মাস্টারদার কাছে হাজির করিয়েছিলেন। কিশোরটি মুহূর্তের মধ্যে উৎসর্গীকৃত বিপ্লবী সেনানীতে রূপান্তরিত, অনেক শৌর্যের, অনেক মৃত্যুবরণের অধ্যায় পেরিয়ে বিপ্লবের প্রদীপ্ত শিখা ক্রমে স্তিমিত হয়ে এল, সুবোধ রায় ধরা পড়লেন, আন্দামানের সেলুলার কারাকক্ষে দীর্ঘ এক দশকের নির্বাসন। কারাভ্যন্তরেই যৌবনের উন্মেষ, সেই সঙ্গে কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে নিজেকে পুরোপুরি বিলীন করে দেওয়া। ছাব্বিশ বছর বয়সে মুক্তিলাভের পর মুহূর্তমাত্র দ্বিধা না করে কমিউনিস্ট পার্টির দফতরে সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে প্রবেশ। অনবচ্ছিন্ন সাড়ে ছয় দশক ধরে সুবোধ রায় পার্টির সব সময়ের সাধারণ কর্মী-ই থেকে গিয়েছিলেন। আদর্শনিষ্ঠায় নিয়ন্ত্রিত জীবন, কোনও দিন স্বার্থচিন্তা করেননি, সংসারে গুছিয়ে বসার কথা ভাবেননি, সর্বক্ষণের দলীয় কর্মী, দলীয় দফতরই দশকের পর দশক জুড়ে তাঁর আশ্রম তথা জীবনযাপনের কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর বরাবরের মন্ত্র: সম্ভোগ নয় সংবরণ। কর্মী থেকে নেতৃত্বে পৌঁছবার বাসনাবিহীন। সাধ্যের প্রত্যন্তে গিয়ে দলীয় সংগঠনের কাজে কর্তব্য সম্পাদনে প্রতিনিয়ত তাঁর অধ্যবসায়। শেষ বছরগুলি পর্যন্ত নিজের জামাকাপড় নিজে কেচেছেন, রোদে মেলেছেন, ইস্ত্রি করেছেন। যে ঘরে থাকতেন, নিজেই ঝাড়তেন, পুঁছতেন, জীবন নির্বাহের অতি সামান্য যে ক’টি উপকরণ, আশ্চর্য নিপুণতায় গুছিয়ে রাখতেন। নিজের জন্য ন্যূনতম রান্না সাধারণত নিজেই করতেন, অন্যথা মাঝেমধ্যে দলীয় কমিউনে আহার্যের সামান্য চাহিদা মেটানো। কৃচ্ছ্রসাধনায় দৃঢপ্রতিজ্ঞ, অন্তরঙ্গতর অনুরাগীরা কখনও-সখনও একটু-আধটু উপহারসাগ্রী তাঁকে পৌঁছে দিতেন, বিব্রত সুবোধ রায় বিপন্নতার সঙ্গে তা গ্রহণ করতেন, দু’দিন বাদে অনুরাগীদের মধ্যেই ফের বিলিয়ে দিতেন। 

মানুষটি বরাবর আত্মপ্রচারের বাইরে থেকেছেন। যাঁদের পছন্দ করতেন, তাঁদের কাছে ডেকে চট্টগ্রাম বিদ্রোহের রোমাঞ্চকর বিভিন্ন কাহিনি শোনাতে ভালবাসতেন। সর্বস্তরের সকলের সঙ্গে নয়, ঈষৎ নিচুতলার দলীয় কমরেডদের সঙ্গেই তাঁর নিবিড়তর সখ্য, যাঁরা দলের গাড়ি চালান, যাঁরা ঘরে ঘরে কাগজপত্র বা চা-মুড়ি পৌঁছে দেন, যাঁরা অপেক্ষাকৃত উঁচু মহলের নেতাদের নির্দেশাদি পালন করেন, ইত্যাকার কমরেডদের নানা সমস্যা মেটাতে সুবোধ রায় অহরহ ব্যস্ত। পাশাপাশি দলীয় দফতরে অনেক খুঁটিনাটি সাংগঠনিক দায়িত্বও তাঁকে সামলাতে হয়েছে। জেলা দফতরগুলির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা, বিনিময়-প্রতি-বিনিময়, কিংবা কেন্দ্রীয় দফতর বা অন্যন্য রাজ্য দফতরের সঙ্গে চিঠিপত্রের মধ্যবর্তিতায় সেতুবন্ধনের কাজ। দীর্ঘ দশকগুলি জুড়ে পার্টি অনেক ঝঞ্ঝার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, বিভিন্ন ঋতুতে মতাদর্শের অনেক টানাপোড়েন, অঢেল তর্ক-বিতর্ক, পঁয়ষট্টি বছর ধরে সুবোধ রায় অনেক ইতিহাস তৈরি হতে দেখেছেন। অনেক নেতার উত্থান দেখেছেন, তাঁদের প্রস্থানও পর্যবেক্ষণ করেছেন। দলের ভাবাদর্শ ও কর্মসূচির অবৈকল্য রক্ষায় তাঁর ইস্পাতকঠিন মানসিক দার্ঢ্য। কিন্তু কর্মী থেকে নেতাতে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রবৃত্তি তাঁর কদাপি ছিল না। দলের শৃঙ্খলা থেকে কোনও দিন বিচ্যুত হননি, কিন্তু স্পষ্টবাদিতায় তাঁর জুড়ি নেই, ছোট-মাঝারি-বড় নেতাই হোন, কিবা নেতৃত্বে তখনও পৌঁছয়নি কিন্তু পৌঁছুতে আঁকুপাকু করছেন, কারও আদর্শগত বা আচরিক স্খলন তাঁর দৃষ্টিগোচর হলে সরবে সমালোচনা করেছেন। তাঁকে তাঁকে তাই ঘাঁটাতে সাহস পেতেন না অনেকেই। দলের মধ্যে ক, খ বা গ তরতর করে সোপান বেয়ে উন্নতি ও মর্যাদার বেলাভূমিতে পৌঁছে গেছেন। সুবোধ রায় একা পড়ে থেকেছেন। তাঁর হাঁটুর বয়সিরা দ্রুততার সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বে উত্তীর্ণ হয়েছেন, দলের মধ্যে কেষ্টবিষ্টু বলে বিবেচিত হয়েছেন, তাঁরা ফরমান জারি করেছেন, দলীয় অনুশাসন মেনে সুবোধ রায় সেই ফরমান মান্য করে নিজের কর্তব্য নিঃশব্দে পালন করে গেছেন। 

এমনি করেই একটা গোটা জীবন অতিবাহন। চট্টগ্রাম বিদ্রোহের বীর যোদ্ধা, পার্টির অন্যতম প্রাচীন সদস্যদের এক জন। বহু বছর ধরে দলীয় ইতিহাস ধাপে-ধাপে সুশৃঙ্খল লিপিবদ্ধ করেছেন, কয়েক খণ্ডে যা প্রকাশিত হয়ে দেশে-বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তা হলেও দলের এক জন নিতান্ত সাধারণ কর্মী, নতুন প্রজন্মের দলীয় সদস্যরা তাঁর পরিচয় জানেন না, তাঁদের কাছে নিতান্ত হেজিপেঁজি কে এক জন বৃদ্ধ পার্টি দফতরে ঘাড় গুঁজে কর্মরত। তাঁর কোনও দাবিদাওয়া নেই, তাই তাঁর আলাদা আদর সম্ভাষণও নেই। 

নব্বই বছর বয়স অতিক্রান্ত, অবশেষে সুবোধ রায় জড়ার শিকার হলেন। রোগগ্রস্ত অবস্থায় কলকাতাস্থ একটি সরকারি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হল। তাঁর জন্য পাঁচতারা হাসপাতালের ব্যবস্থা করার প্রশ্ন ওঠে না, নিজেও সেটা অবশ্যই ঘোর অপছন্দ করতেন। হাসপাতালের একটি নিরাবরণ ঘরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি নির্জীব পড়ে রইলেন, তিনি তো কোনও নামী-দামি নেতা নন, তেমন কেউ দেখতেও আসেন না। দু’এক জন কাছের মানুষ যাঁরা আসেন, সামান্য চেতনা থাকলে তাঁদের চিনতে পারেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারেন না। এক সায়াহ্নে সুবোধ রায়ের জীবনদীপ নির্বাপন, গুটিকয়েক সংবাদপত্রে দায়সারা খবর ছাপা হল। অধিকাংশ পত্রিকার বিচারে তাঁর প্রয়াণ উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হল না। 

সুবোধ রায়ের মৃত্যুর পর ছ’বছর কেটে গেছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের কাছে অজ্ঞাত, অপ্রয়োজনীয় কাহিনি। বিশ্বায়িত ভারতবর্ষ জোর কদমে এগিয়ে চলেছে, পুরনো দিনের পাঁচালিতে কারও উৎসাহ নেই। সময়ও নেই। সুবোধ রায় স্বভাবতই নিশ্চিন্ত বিস্মৃতির অতলে অবস্থান করছিলেন। 

এমন সময় কী অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড! মুম্বইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পের এক বিত্তবান প্রযোজকের যেন কী খেয়াল চাপল, এক পরিচালকের সনির্বন্ধ অনুরোধে সাড়া দিয়ে তিনি চিটাগাং বিদ্রোহ নিয়ে একটি রংচঙে রোমান্টিক ছবি তৈরি করেছেন। ছবিটির প্রধান চরিত্র তরুণ বিপ্লবী সুবোধ রায়। চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করতে নিশ্চয়ই কয়েক শো কোটি টাকা ব্যয়িত হয়েছে। মাল্টিপ্লেক্সে-মাল্টিপ্লেক্সে মহার্ঘ টিকিট কেটে ছবিটি ব্যবস্থা হয়েছে। যেহেতু ‘চিটাগাং’ চলচ্চিত্রটির প্রযুক্তিগত চতুরালি তথা অভিনয় উৎকর্ষ নিয়ে খবরের কাগজে ভাল ভাল কথা ছাপা হয়েছে, ব্যস্ত তরুণ-তরুণীকুল সময় করে ছবিটি দেখে আসছেন। যে তারকা সুবোধ রায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন তাঁর উপর পর্যাপ্ত প্রশংসা বর্ষিত হচ্ছেআর কিছু না হোক, একটু মুখ বদলানো তো হচ্ছে। বলিউডি নর্তন-কুন্দনে ক্ষণিক যতি দিয়ে দেশপ্রেম বোধের সঙ্গে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলার উত্তেজনা।

 বেদব্রত পাইন পরিচালিত ‘চিটাগং’ ছবিতে সুবোধ রায়ের ভূমিকায় দিলজাদ হিওয়ালে।

মাল্টিপ্লেক্সের মধ্যবর্তিতায় তাঁর প্রয়াণের ছ’বছর বাদে সুবোধ রায় অতএব পুনরুজ্জীবিত হলেন। যত দিন জীবিত ছিলেন অখ্যাত হয়েই ছিলেন। খ্যাতিবিহীনতাই তাঁর পছন্দ ছিল। কিন্তু লালটলিখন এড়াবার উপায় নেই, যেহেতু কেউ কিশোরকালে বিপ্লবের পবিত্র আবেগে ভেসে গিয়ে অবিমৃশ্যকারী সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন তাঁকে চলচ্চিত্র শিল্পের বধ্যভূমিতে পৌঁছতেই হবে, মৃত্যুতেও নিস্তার নেই। তথ্য-প্রযুক্তি অধ্যুষিত পৃথিবীতে সনাতন ধ্যানধারণা অবশ্য বর্জনীয়, ব্যক্তিগত রুচি-অভিরুচিও গ্রাহ্য নয়। সুবোধ রায় এখন থেকে চলচ্চিত্রশিল্পের এক নন্দিত চরিত্র, আদি সুবোধ রায়ের সঙ্গে এই বিকিকিনি-কেন্দ্রিক সুবোধ রায়ের কতটা মিল, সে প্রশ্ন অবান্তর। মুম্বই চলচ্চিত্রশিল্প যা রচনা করেছে, তা-ই সত্য। বিশ্বায়নের এটাই জাদু। কলেজ-ম্যাগাজিনে পড়াপদ্যপংক্তিদ্বয় যা বলতে চেয়েছিল, আসলকে টেক্কা মেরে নকল এগিয়ে যাবে। আসলকে আর নকল থেকে আলাদা করে চেনা যায় না, চেনার চেষ্টাও বিধেয় নয়।

আদি অগ্রাহ্য-অগ্রহণীয়, কৃত্রিমই শ্রেয় ও বরণযোগ্য, এই প্রত্যয়ের পক্ষে আঁটোসাটো যুক্তিমালা ইতিমধ্যেই প্রস্তুত। পৃথিবীর পরিভাষা পাল্টে গেছে। পরিবেশ ও পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ অন্য রকম। চট্টগ্রাম বিপ্লব-কাহিনি যদি হালের ছেলেমেয়েদের কাছে আকর্ষণীয় করতে হয়, পরিবেশনের প্রকরণে যথাযথ নতুন বিন্যাস প্রয়োজন। সংযম, আত্মত্যাগ, পরচিকীর্যা ইত্যাদি ভারী ভারী শব্দ এখন অচল, গম্ভীর-গম্ভীর দেশপ্রেম-উদ্দীপক বক্তৃতার বন্যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অসহ্য,একটু রঙ-বেরঙে ভূষিত না-করলে ছবিটি বাজারে মার খাবে, ছবিটি মার খেলে বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাস-সচেতন হওয়ার প্রয়াসও মুখ থুবড়ে পড়বে। প্রাচীনপন্থীদের মেনে নিতে হবে এটা বিজ্ঞাপনের যুগ। বিজ্ঞাপনের সুবোধ রায় আদি ও অকৃত্রিম সুবোধ রায়ের কাছ থেকে শুধু নামটুকর জন্য ঋণী, সেই নামটিকে বিখ্যাত করতে গেলে বাজারের পছন্দ-অপছন্দদের কথাও মাথায় রাখতে হবে, মানতে হবে ক্রেতাদের কাছে যা গ্রহণীয়, তাই-ই গ্রাহ্য, অন্য সব কিছু বাতিল। 

পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাওয়া সুবোধ রায় তো আর আপত্তি জানাতে পারছেন না, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ন্যূনতম এনতার মানবাধিকার খারিজ হয়ে যায়, মানহানির ঝামেলা পোয়াতে হয় না কোনও পক্ষকেই। ইতিহাসের বিকৃতি ঘটেছে বলে নাকিকান্নাও সমান অর্থহীন, অতীতকে মাঝে মধ্যে নতুন করে বিশ্লেষণের প্রয়াস জ্ঞানচর্চার অন্যতম অঙ্গ নয় কি? সুবোধ রায়কে তাঁর জীবদ্দশায় চিনতে-জানতেন-ভালবাসতেন-গভীর শ্রদ্ধা করতেন এমন মুষ্টিমেয় যে ক’জন এখন আছেন, তাঁদের তাই মেনে নিতে হয় যখন যেমন তখন তেমন। একটি গুজব যা বলে আসছে শুনে অন্তত তাই মনে হয়। তরুণতর, তরুণতম প্রজন্মকে নাকি উৎসাহ দান করা, মাল্টিপ্লেক্স মাল্টিপ্লেক্সে ভিড় জমাও, মহার্ঘ মূল্যের টিকিট কেটে দেখে এসো, নিজেরা দেখ, বন্ধুবান্ধবদের দেখতে প্ররোচিত করো, জীবিত অবস্থায় পার্টি দফতরের এক নিভৃত কোণে তিনি যখন নীরবে নির্দেশিত করণীয় সংকল্প করে যেতেন, কারও ঠাহর হয়নি তিনি কত বড় কাজের মানুষ ছিলেন, চলচ্চিত্রটির কল্যাণে এখন তা প্রতীয়মান হচ্ছে। এই নবলব্ধ জ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে, জনে-জনে কচিকাঁচাদের ধরে নিয়ে তাদের বোঝাতে হবে। চলচ্চিত্রের দীপ্তিতে প্রজ্জলিত এই চরিত্রটি আমাদের দলভুক্ত সৈনিক ছিলেন। আমরা ফ্যালনা নই। 

প্রয়াণেও নিশ্চিন্তি নেই, সুবোধ রায় ব্যবহৃত হয়েই যাচ্ছেন। কী আর করা, বাজারের প্রয়োজন, বাজারই নাকি শেষ কথা বলে। 

সৌজন্য:

আনন্দবাজার পত্রিকা, ৫ অগ্রহায়ণ ১৪১৯ বুধবার ২১ নভেম্বর ২০১২

http://archives.anandabazar.com/archive/1121121/21edit3.html