20211011

তথ্য সমাজের নিঃসঙ্গতা

 প্রসূন ভট্টাচার্য

সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল দেখে বুঝতে পারছেন যে কাল মানে সোমবার ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়েছে? আচ্ছা, এটা না হয় বামপন্থীদের বিষয় বলে অচ্ছ্যুৎ। কিন্তু শুক্রবার যে জলবায়ু ধর্মঘট ছিল সেই খবরটা ঠিকঠাক পেয়েছিলেন? অতিবৃষ্টিতে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে ১৫ লক্ষ মানুষ আর বিস্তৃত জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, উত্তরবঙ্গের শিশুরা সংক্রমণে প্রাণ হারাচ্ছে, কিংবা কেবল করোনার দ্বিতীয় ঢেউতেই ভারতের আরও ১কোটি লোক কর্মহীন হয়ে গেছে, স্কুলছুটের সংখ্যা বেড়েছে, দেশের ৯৭ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে, আর ১১টি কর্পোরেট কোম্পানির আয় যা বেড়েছে তা দিয়ে গোটা দেশের মানুষকে বিনামূল্যে ভ্যাকসিন দিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো। এসব খবরের প্রায় কোনোটাই আমরা মিডিয়াতে পাইনি। অথচ খবর এখন আমাদের কাছে অনেক সহজলভ্য হয়ে গেছে। আমরা এখন নাকি ‘ইনফরমেশন সোসাইটি’ বা তথ্য সমাজে বসবাস করছি।

একটা সময় ছিল যখন খবর সংগ্রহ করে সংবাদপত্রে প্রকাশ করা ছিল রীতিমতো কঠিন কাজ। রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়' উপন্যাসে চারুলতার স্বামী ভূপতিকে মনে আছে? অনেক কষ্ট করে একটি খবরের কাগজ ছাপতে হতো তাঁকে। সিপাহী বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ঠিকঠাক খবর তো বাংলার নবজাগরণের পথিকৃৎদের কাছেও পৌঁছয়নি। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে বাংলার মানুষ চার্চিলের নীতিতে যখন না খেতে পেয়ে মরছে, তখন হঠাৎ স্টেটসম্যান পত্রিকা ব্রিটিস সরকারের বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে সেই খবর ছেপে দিয়েছিল। লন্ডনে যখন সেই খবর পৌঁছলো তখন সমালোচনার মুখে পড়ে ব্রিটিস সরকার কিছু পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছিল, নইলে পোকামাকড়ের মতো মানুষের মৃত্যু সংবাদও চাপা পড়ে ছিল। রাশিয়ায় বলশেভিক বিপ্লব কিংবা ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থানের খবরও এদেশের মানুষের কাছে পৌঁছেছিল ধীরে ধীরে, বিক্ষিপ্তভাবে, ধোঁয়াশা মেখে। কিন্তু সেসব দিন তো ইতিহাস। রেডিও, স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং সর্বশেষে ইন্টারনেট মাধ্যম এসে যাওয়ার পরে দুনিয়া তো হাতের মুঠোর মধ্যে। এখন আফগানিস্তানে তালিবানরা কাকে কীভাবে মারছে সারা দুনিয়ার মানুষ ঘরে বসে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়ে যাচ্ছি। নেটওয়ার্কড দুনিয়ায় আমেরিকায় বসা আত্মীয়ের সঙ্গে আমরা অনলাইনে ভিডিও চ্যাট করে নিতে পারছি। টিভিতে ২৪ ঘন্টা যুদ্ধ কিংবা খেলার লাইভ কভারেজ দেখতে পাচ্ছি, ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়াকে রোমাঞ্চকর সিনেমার মতো দেখছি, বাড়িতে বসে জোমাটোয় অর্ডার দিয়ে আধ ঘন্টায় খাবার আনিয়ে নিচ্ছি, প্রয়োজনে মোবাইল ফোনে অ্যাপক্যাব ডেকে নিচ্ছি, ছেলেমেয়েরা বাড়িতে বসে অনলাইনে ক্লাস করে নিচ্ছে, বাবা মা ওয়ার্ক ফ্রম হোম করে নিতে পারছে, আরও কত কি!

এই প্রবনতাটা বুঝে নিয়েই ১৯৭৩সালে সমাজবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বেল বলেছিলেন, আমরা এখন তথ্য সমাজে প্রবেশ করেছি। কৃষিভিত্তিক সমাজ, শিল্পসমাজ পেরিয়ে এই সমাজে এখন তথ্যের অবাধ বিচরণই অর্থনৈতিক কারবারের মুখ্যভিত্তি। তথ্যই শক্তি। তথ্যই আনবে মুক্তি। সেই তথ্যের সুষম বন্টনের সুযোগ খুলে গেছে। ইন্টারনেট আসার পরে সবাই বলতে লাগলেন, এটাই সত্যি। অন্যদিকে সাত ও আটের দশকেই রাষ্ট্রসংঘের ইউনেস্কোর মঞ্চ থেকে আরেকদল সতর্ক করছিলেন, দুনিয়ায় তথ্যের প্রবাহে ভারসাম্যের গুরুতর অভাব ও বৈষম্য রয়েছে এবং সেই কারণে উন্নয়নের কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ভারতসহ এশিয়া আফ্রিকা লাতিন আমেরিকার তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি এই অভিযোগই করছিল উন্নত ধনী দেশগুলির বিরুদ্ধে। কিন্তু তাদের কথা চাপা পড়ে গেলো বিশ্বায়নের ধাক্কায়।

এখন আর তথ্যের আকাল নেই, তথ্যের সমুদ্রে আমরা ভাসমান। তথ্য আদান প্রদান এতই নাকি সহজ ও সস্তা যে ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’। কিন্তু আমাদের অবস্থাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমুদ্রে ভাসমান নৌকার সেই মাঝির মতো যার কাছে এক ফোঁটা পানীয় জলও নেই। চারিদিকের অফুরান নোনা জলরাশি তাঁর তৃষ্ণা মেটানোর উপযোগী নয়। আমরাও তেমনি বিপুল তথ্যরাজির মধ্যে বসে আছি, চাই না চাই প্রতি মুহূর্তে আমাদের কাছে তথ্য এসে ভীড় করছে, কিন্তু আমাদের প্রয়োজন মেটাতে সেটা সাহায্য করছে না। বরং অপ্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে সদাব্যস্ত থাকতে থাকতে জীবনের প্রয়োজনটাকেই মাঝেমাঝে ভুলে যাচ্ছি, অবহেলা করে ফেলছি। যখন আমাদের রোজগার বাড়ানোর উপায় দরকার, ছেলেমেয়ের পড়াশোনার সুবন্দোবস্ত করা দরকার, অসুস্থ বাবা মায়ের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা দরকার, তখন আমরা ফিল্ম স্টার সাংসদ নুসরৎ জাহানের সন্তানের পিতার নাম জানতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। পুজোয় কোন তারকা কোন পুজো প্যান্ডেলের উদ্বোধন করবে তা নিয়ে ফের চর্চা শুরু হয়ে গেছে। একটা অতিবর্ষণে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের জলমগ্ন জেলাগুলিতে ১৩জন শুধু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেলো। কেন পরিকাঠামোর এই হাল, সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কী করা জরুরী, তা নিয়ে ভাবার মতো তথ্য পাচ্ছি কোথায়? মোদীর জন্মদিনের তথ্য পাচ্ছি, কিন্তু মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলানোয় কিংবা স্কুল কলেজ খোলার প্রচেষ্টায় উপেক্ষা সংক্রান্ত তথ্য কোথায়? দুয়ারে সরকারের বিজ্ঞাপন তো প্রচুর দেখলাম, কিন্তু স্বাস্থ্যসাথীর কার্ড নিয়ে বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা মিলছে কিনা সেই তথ্য কোথায়?

তথ্য প্রয়োজন মেটাবে কিনা তা অনেকটাই নির্ভর করে তথ্যের পূর্ণাঙ্গতার ওপরে, ঝিলিক মেরে উবে যাওয়া তথ্যে কাজের কাজ হয় না। ব্রেকিং নিউজ একটা আসে, চাপা পড়ে যায় আরেকটা ব্রেকিং নিউজের তলায়। তথ্য বিশ্লেষণ করে তার মূল্যায়ন করার বন্দোবস্ত না থাকলে এমন তথ্য দিয়ে লাভ নেই। যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আমরা রয়েছি এবং যারা সেই ব্যবস্থা চালাচ্ছেন, সেসবের মূল্যায়নই যদি না করতে পারলাম তাহলে আমি সিদ্ধান্ত নেবো কীভাবে! কেবল জয়ধ্বনি দেওয়ানোর জন্য আমাকে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে না তো? অবাধ তথ্যের স্রোত যে মুক্তির আশ্বাস দিয়েছিল, সেটাই আসলে বাঁধনের মতো চেপে বসছে না তো? তাহলে তো প্রতিবাদ হওয়ার কথা। তেমন প্রতিবাদ হচ্ছে কই! তথ্যের এমন শক্তিশালী নেটওয়ার্কে আমরা আছি যে চরম নিঃসঙ্গতায় ডুবে প্রতিদিন হতাশাগ্রস্ত মানুষের আত্মহত্যার খবর পাচ্ছি, মানুষের হাতে হাত রাখার মতো মানুষ খুঁজে পাচ্ছি না। কাছাকাছি আসার ছলে দূরত্বকে এতটাই বাড়িয়ে ফেলছি যে প্রতিবাদে সংগঠিত হওয়ার সুযোগগুলো দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে শিল্পভিত্তিক সমাজের রূপান্তর শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছিল সমাজের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও। ক্ষমতা ও সম্পদের মালিকানা সংক্রান্ত পরিবর্তন, সামন্ত সমাজ থেকে পুঁজিবাদী সমাজে পরিবর্তন। তথ্য সমাজ কিন্তু এখনও এই অর্থনৈতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। বরং পুঁজিবাদী সমাজ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে তথ্যের প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করছে। তাই তথ্যের হিমালয় পর্বত হাজির, তাতে বিশল্যকরণী খুঁজে পাচ্ছি না। আমি তথ্যকে ব্যবহার করছি না, তথ্যই (আসলে তথ্য সরবরাহকারীরা) আমাকে ব্যবহার করছেবাজারে গিয়ে আমি কী কিনবো, কী গান শুনবো, কাকে ভোট দেবো, সবকিছু অলক্ষ্যে কেউ নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারণ করে দিচ্ছে। নতুন ধরনের ক্রীতদাসে পরিণত হচ্ছি, যেখানে কোনো শিকল লাগে না।

তবুও, মানুষ তো শেষপর্যন্ত মানুষ, প্রশ্ন তোলার স্বভাব কি সে এত সহজে ছেড়ে দেবে? শিকল ভাঙার গান লুকিয়ে আছে মানুষের এই প্রশ্ন তোলা স্বভাবের মধ্যেই। যে যন্ত্র, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা তথ্য পাচ্ছি তার সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে তুলে তাকে যতো চিনবো, জানবো, ততই সচেতন হয়ে যাবো দাসত্ব সম্পর্কে। আর সচেতনতা ভেঙে ফেলতে পারে এই নতুন দাসত্বকে।

 গণশক্তি, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১

 

20210809

স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্টরা

 

মৌলানা হসরৎ মোহানী ও বিআর আম্বেদকর


অঞ্জন বেরা

 

মহাকাব্যিক বহুমাত্রিকতায় আমাদের ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির সংগ্রাম এক অর্থে মানবিক উত্তরণেরও গর্বিত আখ্যান। এই উত্তরণে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা আপন বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। অনপনেয় তার প্রভাব

 

মহান অক্টোবর বিপ্লব (১৯১৭) অন্যান্য উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলির মতো ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের অনুপ্রেরণার অন্যতম উৎস হলেও শুধুমাত্র অক্টোবর বিপ্লবের প্রতিবর্তক্রিয়ায় এদেশে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম হয়নি। হয়েছিল, কারণ দেশের অভ্যন্তরে জমি ছিল প্রস্তুত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর পর্বে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামও তখন নতুন পর্বে পা দিয়েছে। এই নতুন পর্বের মৌলিক বৈশিষ্ট্যই ছিল ব্যাপকতর মানুষের-শ্রমিক কৃষক, ছাত্র, যুব, মহিলা-অংশগ্রহণ। অক্টোবর বিপ্লব পরবর্তী বিশ্বে সামাজিক দ্বন্দ্বগুলির রূপান্তর-পর্বে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা তখন ঐতিহাসিকভাবেই অচল। লেনিনের নেতৃত্বে ১৯১৯ সালে গঠিত তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক ঔপনিবেশিকতবাদ অবসানের দাবিকে অগ্রাধিকার দেয় প্রত্যাশিতভাবেই। ঐতিহাসিকভাবেই ১৯২০ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা এক যুগসন্ধিক্ষণে।

 

কমিউনিস্টরাই জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে প্রথম সোচ্চার হয় ১৯২১ সালে আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ৩৬-তম অধিবেশন উপলক্ষে প্রচারিত হয়  মানবেন্দ্রনাথ রায় এবং অবনী মুখার্জি স্বাক্ষরিত ইশতেহার। শুধু ইশতেহার প্রচার নয়, এলাহাবাদে অধিবেশনে মৌলানা হসরত মোহানী এবং স্বামী কুমারানন্দ উত্থাপন করেন পূর্ণ স্বাধীনতার  প্রস্তাবসে প্রস্তাব গৃহীত হয়নি, কারণ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে ‘স্বরাজ’ অর্জন তখনও জাতীয় কংগ্রেসের সর্বোচ্চ লক্ষ্য। ১৯২২ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের গয়া অধিবেশনেও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের পক্ষ থেকে একটি বার্তা পাঠানো হয়। জাতীয় কংগ্রেসকে ‘ভারতীয় জনগণের প্রতিনিধি’ হিসেবে উল্লেখ করে কমিন্টার্ণের বার্তা ঘোষণা করে: ‘‘সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ ছাড়া ভারতীয় জনগণের স্বাভাবিক বিকাশ অর্জন অসম্ভব।’’

 


১৯২১ সালের ইশতেহার থেকে ১৯৪৬সালের নির্বাচনী ইশতেহার, কিংবা গণপরিষদে কমিউনিস্ট পার্টির প্রস্তাব-পরাধীন ভারতের প্রতিটি রাজনৈতিক বাঁকের মুখে কমিউনিস্ট পার্টি উত্থাপিত বিকল্প প্রস্তাব জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের আধুনিক ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছে।  মুক্তিকামী রাজনীতির মূল অভিমুখ থেকে কমিউনিস্টরা কখনও সরে যায়নি।

 

জাতীয় কংগ্রেস সর্বপ্রথম পূর্ণ  স্বাধীনতার (‘পূর্ণ স্বরাজ’) প্রস্তাব গ্রহণ করে ১৯২৯ সালের লাহোর অধিবেশনে। গ্রহণ করে পূর্ণ স্বাধীনতার রাজনৈতিক অর্থনৈতিক কর্মসূচী। স্বাধীনতার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক মাত্রার স্বীকৃতির সূত্রে এই কর্মসূচী অনন্য। ঔপনিবেশিক মুক্তি সংগ্রামে নতুন অধ্যায়ের সূচনাবাহী

 

কমিউনিস্ট পার্টি জন্মসূত্রেই স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মনিবেদিত বীর সন্তানদের পার্টি।  এঁদের মধ্যে ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘বার্লিন কমিটি’-তে সংগঠিত দেশান্তরী বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীরা। দেশান্তরী ভারতীয় মুজাহিররাগদর  বিপ্লবীরা। সেইসঙ্গে, দেশের মধ্যে সক্রিয় বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী (ব্রিটিশ সরকারের দলিলে যাঁরা ‘সন্ত্রাসবাদী’ চিহ্নিত), কংগ্রেসের রাডিক্যাল কর্মীদের একাংশ এবং খিলাফত ও আকালি আন্দোলনের আপোসহীন বিপ্লবীরা।

 

তেলেঙ্গানা সশস্ত্র অভ্যুত্থানে নারীসেনানীরা

রবীন্দ্রনাথ যাঁদের উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন ‘বন্দীর শৃঙ্খলচ্ছন্দে মুক্তের কে দিল পরিচয়’ সেই তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদী’ বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীদের বড় অংশই তিরিশের দশকে বন্দী থাকালেই কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করেন এবং জেল থেকে বেরিয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এঁদের মধ্যে আন্দামানে দ্বীপান্তরিত বিপ্লবীরাও ছিলেন। ছিলেন ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম বিদ্রোহে মাস্টার দা সূর্য সেনের সহযোদ্ধারা।

 

ঔপনিবেশিক জমানায় নির্যাতন ভোগের সম্ভবত কঠিনতম অভিজ্ঞতা কমিউনিস্টদেরই। প্রথম ছিল  পেশোয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ মামলা। ১৯২২ থেকে ১৯২৭সাল। কানপুর ‘কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র’ মামলা ১৯২৪-২৫ সালদেশের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় কমিউনিস্ট গ্রুপগুলি জাতীয়স্তরে সংহত হবার চেষ্টা করতেই নেমে আসে মীরাট ‘ষড়যন্ত্র’ মামলার (১৯২৯-৩৩) খাঁড়া। গোটা দেশ থেকে একযোগে ৩১ জনকে গ্রেপ্তার। ধৃতদের মধ্যে ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির ফিলিপ স্প্র্যাট, বিএফ ব্র্যাডলে এবং এইচএল হাচিনসন’ও ছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু ভারতীয় কমিউনিস্টরা নন, ব্রিটিশ কমিউনিস্টদের আত্মত্যাগও কম নয়। কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতা শুধু মুখের কথা ছিল না। মীরাট মামলা না মিটতেই দেশজুড়ে সরকারী নিষেধাজ্ঞা জারি হলো। ১৯৩৪ সালের ২৮জুলাই থেকে ১৯৪২সালের ২৩ জুলাইঔপনিবেশিক জমানার অন্তহীন নির্যাতনও কমিউনিস্ট পার্টিকে কিন্তু  জনবিচ্ছিন্ন  করতে পারেনি।

 

আজাদ হিন্দ বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সুভাষচন্দ্র বসু ও 
ঝাঁসি রানী ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সায়গল

স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকার ভিত্তি ছিল তার বৈপ্লবিক মতাদর্শ। শ্রেণী রাজনীতির মতাদর্শ। স্বাধীনতা সংগ্রামে কমিউনিস্ট পার্টির  অন্যতম মৌলিক অবদান। এই মতাদর্শই স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রমিক কৃষক শ্রমজীবী জনতার নির্ধারক ভূমিকার ওপর আলোকপাতে সক্ষম করেছে কমিউনিস্ট পার্টিকে।

 

স্বাধীনতা আন্দোলনে ও জাতীয় জীবনে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে কমিউনিস্ট পার্টির আপোসহীন ভূমিকা অনস্বীকার্য। এলাহাবাদ কংগ্রেস অধিবেশনে (১৯২১) প্রচারিত   কমিউনিস্টদের প্রথম ইশতেহারেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অপরিহার্যতা সোচ্চারে ঘোষিত হয়। ১৯২০-র দশক, ১৯৩০-র দশক, বিশেষত ১৯৪০-র দশকের মধ্যভাগ থেকে দেশভাগ পর্ব- মতাদর্শগত মৌলিকতাই কমিউনিস্ট পার্টিকে ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে সবচেয়ে নীতিনিষ্ঠ এবং অবিচল রেখেছে। স্বাধীনতার আগে থেকেই কমিউনিস্টরা যে সংঘ পরিবারের ঘোষিত শত্রু সেটা বিনা কারণে নয়।

 

জাতপাতের বিভাজন ও  বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্যের বিরোধিতা কমিউনিস্ট পার্টির মৌলিক অবস্থান। প্রতিষ্ঠা পর্ব থেকে। বহু-জাতি সমন্বিত এই দেশে জাতিসত্বার গণতান্ত্রিক আকাঙ্খার প্রতি সংবেদনশীলতা যে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্বেই অন্তর্ভূক্তিমূলক জাতীয়তাবাদের নীতিকে স্বীকৃতি দেয়, তাতে কমিউনিস্টদের ভূমিকা ভোলার নয়। ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠনের গণতান্ত্রিক দাবি কমিউনিস্ট পার্টির  অন্যতম মৌলিক দাবি।

 

তাছাড়া, ঔপনিবেশিক জমানার মদতপুষ্ট দেশীয় রাজন্যশাসিত রাজ্যগুলির সামন্ততন্ত্র-পিষ্ট জনতাকে উপমহাদেশব্যাপী স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যাপ্তি মূলস্রোতে গ্রথিত করতে কমিউনিস্টদের অবদান স্মরণীয়। এপ্রসঙ্গে  সম্ভবত  সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল নিজাম-শাসিত তেলেঙ্গানায়। জমিদারপ্রথা রদ, ভূমিসংস্কারের দাবিতে কৃষক সমাজকে সংগঠিত করায় কমিউনিস্টদের গৌরবজনক ভূমিকাও অবিস্মরণীয়। তেভাগা শুধু ফসলের ভাগের প্রশ্ন ছিল না, ছিল নতুন জীবনবোধেরও। ত্রিপুরায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠার পিছনে উপজাতি গণমুক্তি পরিষদের সাক্ষরতা অভিযানের অবদান কিংবা দুর্ভিক্ষপীড়িত বা দাঙ্গাপীড়িত মানুষের সেবায় কমিউনিস্ট কর্মীদের দরদী ভূমিকা কি ভোলা সম্ভব?

 

স্বাধীনতা সংগ্রামে আমআদমির রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসারিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান শ্রেণী ও গণসংগঠনগুলিকে পুষ্ট করা। অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (প্রতিষ্ঠা ১৯২০), সারা ভারত কৃষক সভা, নিখিল ভারত ছাত্র ফেডারেশন, নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘের (তিনটি সংগঠনেরই প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬ সালে) প্রাণশক্তি ছিল কমিউনিস্টরাই১৯৪৩ সালে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের আত্মপ্রকাশ জাতির সাংস্কৃতিক জীবনের অন্যতম মাইলফলক। এদেশে কমিউনিস্টরাই সংগঠিত করেছে লড়াকু মহিলাদের।

 

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সঙ্গে গ্রথিত করার উদ্যোগেও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল সামনের সারিতে। জাতীয় কংগ্রেসের মধ্যেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আবিসিনিয়া ও স্পেনে ফ্যাসিস্ট হামলার বিরোধিতায়, জাপ-আক্রান্ত চীনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপনে, সোভিয়েত সংহতি আন্দোলন গড়ে তোলায়, ইন্দোচীনের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থন জ্ঞাপনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত।

 

ঘটনাক্রমে কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদযাপিত হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন সাম্রাজ্যবাদী নয়া উদারবাদে মাথা বিকিয়ে দেওয়া শাসক শ্রেণীগুলি দেশ চালানোর ভার তুলে দিয়েছে ‘হিন্দুরাষ্ট্রবাদী’দের হাতে। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা এবং ঔপনিবেশিক শাসকের সঙ্গে অশুভ আঁতাতই যাদের জন্মদাগ। কর্পোরেট স্বার্থ এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির ‘নিষ্ঠুর একতা’য় আক্রান্ত  আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সার্বিক অভিজ্ঞানকমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষ উদযাপন যেন নতুন প্রেক্ষিতে অর্থবহ হয়ে উঠেছে।

 

 

20210719

বামফ্রন্ট সরকার ও জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতি



রবীন দেব

পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার পরিচালনার চৌত্রিশ বছরের (১৯৭৭-২০১১) অভিজ্ঞতা সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। নজিরবিহীন শুধু তার মেয়াদের দৈর্ঘ্যের কারণে নয়, তার বিকল্প নীতির রাজনৈতিক তাৎপর্যের সূত্রেও। বহু পদক্ষেপের ক্ষেত্রেই বামফ্রন্ট সরকার ছিল দেশের মধ্যে পথিকৃৎ। শুধু রাজ্যে নয়, সমগ্র দেশে।

বামফ্রন্ট সরকারকে অনেক সময়েই এমন পথে চলতে হয়েছে যে পথে আগে কারও পদচিহ্ন পড়েনি। পথও কুসুমাস্তীর্ণও ছিল না। বাধা এবং প্রতিকূলতা ছিল লাগাতার। ছিল আক্রমণ ষড়যন্ত্র অপপ্রচার। বামফ্রন্ট সরকারের চৌত্রিশ বছরে ২৮০৬ জন কমরেড এরাজ্যে শহীদের মৃত্যুবরণ করেছেন শ্রেণিশত্রুদের হাতে। বামফ্রন্ট সরকার পরাজিত হবার পরও শহীদ হয়েছেন ২২৮জন।

বামফ্রন্ট সরকার পরাজিত হবার দশ বছর পরও সেই সরকারের অভিজ্ঞতাগুলির প্রাসঙ্গিকতা অনস্বীকার্য। শুধু সাফল্যের অভিজ্ঞতা নয়, তার সীমাবদ্ধতা এবং দুর্বলতার অভিজ্ঞতাও। সব মিলিয়ে বুর্জোয়া-জমিদার ব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে রাজ্যস্তরে বাম-নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালনার জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকারের অবদান ও সাফল্য সমগ্র দেশে আজও বিকল্প নীতি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের দিশারি।

শুধু বিধানসভা নির্বাচন নয়, পঞ্চায়েত, পৌরসভা, লোকসভার প্রতিটি নির্বাচনে বামফ্রন্ট রাজ্যবাসীর সমর্থন পেয়েছে চৌত্রিশ বছর ধরে। দিনের হিসাবে বারো হাজার তিনশো ছিয়াশি দিন। সেই সময়পর্বে কমরেড জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আট হাজার পাঁচশো চল্লিশ দিন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন তিন হাজার আটশো ছেচল্লিশ দিন।

অনেক আত্মত্যাগের ফলশ্রুতি

বামফ্রন্ট সরকার এরাজ্যে হঠাৎ করে গঠিত হয়নি। যুক্তফ্রন্ট সরকারগুলি (১৯৬৭ এবং ১৯৬৯) স্বল্পমেয়াদি হলেও বামফ্রন্ট সরকার গঠনের ভিত্তি রচিত হয় তখনই। যুক্তফ্রন্ট সরকার পরবর্তী সময়ে স্বৈরাচার ও আধাফ্যাসিস্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই, জরুরি অবস্থার মোকাবিলা করতে গিয়ে সত্তর দশকের সেই সময় সিপিআই(এম)’র ১১০০ নেতা,কর্মী, সংগঠক শহীদ হয়েছিলেন। হাজার হাজার কর্মীকে ঘড়ছাড়া হতে হয়েছিল। গণতন্ত্রের সংগ্রাম এগিয়েছে অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে।

লক্ষণীয়, বামফ্রন্ট সর্বদা নতুন নতুন অংশের মধ্যে প্রসারিত হয়েছে। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট ছিল ছ’পার্টির কোয়ালিশন। তারপর বামফ্রন্টের শরিকের সংখ্যা বেড়েছে। এখনও বামফ্রন্ট আট দলের। সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বানের সময় বামফ্রন্টের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেস এবং আইএসএফ মিলে সংযুক্ত মোর্চা গঠিত হয়। ত্রিপুরা এবং কেরালাতেও সিপিআই(এম) নতুন নতুন শক্তির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১-র নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে জিতলেও সেই জোট টেকেনি। উলটে কংগ্রেসের নির্বাচিত বিধায়কদের দল ভাঙিয়ে তৃণমূলে আনা হয়েছে। নেত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাই তৃণমূলে শেষ কথা। মোদীর নেতৃত্বে এনডিএ-ও কার্যত ভাঙাঘর। বিজেপি এখন মোদী-সর্বস্ব। একটি গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদী সমাজ, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কখনই নিরাপদ নয়।

বামফ্রন্ট সরকার: নতুন অভিমুখ

১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের দায়িত্বভার গ্রহণের মধ্যে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রবেশ করে নতুন এক পর্বে এবং সেই সূত্রেই বদলে যেতে শুরু করে রাজ্য সরকারের অভিমুখ।

গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া: বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করেছে, তাকে প্রসারিত করেছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বামফ্রন্ট সরকার সমস্ত রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দেয়। কয়েকজন সাংবাদিকও তখন মুক্তি পান। মুক্তি পান নকশালপন্থী এবং কংগ্রেসের অনেকেও। নকশালপন্থীদের বিরুদ্ধে অন্য রাজ্যের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়। বামফ্রন্ট সরকার বিরোধীদের গণতান্ত্রিক অধিকার সুনিশ্চিত করে। ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। সরকারি কর্মচারীদের, এমনকি পুলিশ কর্মীদের সংগঠনকে স্বীকৃতি দেয়। গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ আন্দোলন বা ধর্মঘট ভাঙতে কখনও পুলিশ পাঠায়নি। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেনি। বামফ্রন্ট সরকারই দেশের মধ্যে প্রথম রাজ্যস্তরে মানবাধিকার কমিশন গঠন করে।

ভূমি সংস্কার ও গ্রামোন্নয়ন: কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে ভূমিসংস্কারে বামফ্রন্ট সরকারের অবদান অতুলনীয়। বিশ্বব্যাঙ্ক পর্যন্ত ২০০৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট’-এ ভূমিসংস্কার কর্মসূচীর প্রশংসা করে। সারা দেশের জমির মাত্র ৩% পশ্চিমবঙ্গে। অথচ গোটা দেশে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে যত জমি বণ্টিত হয়েছে তার ২২% পশ্চিমবঙ্গেই হয়েছিল। ভূমি সংস্কারের ফলেই রাজ্যে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা ৮৪শতাংশ কৃষি জমির মালিক। জাতীয় স্তরে তা ৩৪ শতাংশের সামান্য বেশি। পাট্টা পেয়ে জমির মালিক হয়েছেন কৃষক পরিবারের মহিলারাও। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৫লক্ষ ১৩হাজার নথিভুক্ত বর্গাদারের আইনি অধিকার সুরক্ষিত করেছিল বামফ্রন্ট সরকার।

ভূমি সংস্কারের উপর ভিত্তি করেই কৃষিতে সাফল্য আসে। স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ছিল খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঘাটতি রাজ্য। বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই পশ্চিমবঙ্গ খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্ত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯৭৬-৭৭সালে রাজ্যে মোট খাদ্যশস্যের উৎপাদন হত ৭৪লক্ষ মেট্রিক টন। ২০১০-১১ সালে তা দাঁড়ায় প্রায় ১৭০লক্ষ মেট্রিক টন।

ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ

প্রথম বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের পর কমরেড জ্যোতি বসু বলেছিলেন, বামফ্রন্ট সরকার শুধুমাত্র মহাকরণ থেকে কাজ করবে না। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলায় গোটা দেশকে পথ দেখিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৭৮ সালে রাজ্যে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামোন্নয়নের ভার তুলে দেওয়া হয় পঞ্চায়েতের হাতে। পঞ্চায়েত ব্যবস্থার নেতৃত্বে উঠে আসে দুর্বলতর অংশের প্রতিনিধিরা। বামফ্রন্ট সরকার নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচন করেছে। পর পর সাতবার।

বামফ্রন্ট সরকারই পঞ্চায়েতে মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে— প্রথমে ৩৩ শতাংশ, তারপর ৫০ শতাংশ। তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং ওবিসি সম্প্রদায়ের জন্য জনসংখ্যার অনুপাতে পঞ্চায়েতে আসন ও পদ সংরক্ষণ করা হয়। একই ব্যবস্থা নেওয়া হয় পৌরসভাগুলির ক্ষেত্রেও।

জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে কাজের নতুন উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল নির্বাচিত পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। ১৯৭৮ সালের শতাব্দীর ভয়ঙ্করতম বন্যার সময় ত্রাণ ও পুনর্গঠনের কাজে পঞ্চায়েতের নেতৃত্বে ব্যাপক সংখ্যায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নতুন নজির সৃষ্টি করে। রাজ্যের মন্ত্রীরাও প্রত্যক্ষভাবে উদ্বার ও ত্রাণকার্যে নেমে পড়েন।

 



বামফ্রন্ট সরকারের দুই মুখ্যমন্ত্রী: জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

পৌরব্যবস্থায় রূপান্তর: বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই নগরায়নের চাহিদায় সাড়া দিয়ে পৌরব্যবস্থার অভূতপুর্ব প্রসার ঘটানো হয়। রাজ্যে পৌরসভার সংখ্যা বেড়ে ৯২ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১২৭। শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর, আসানসোল পৌরনিগম হয় বামফ্রন্টের আমলেই। বামফ্রন্ট সরকারই পৌরসভাগুলিকে সত্যিকারের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় পরিণত করে। পৌর নির্বাচনে ১৮ বছর বয়স্কদের ভোটাধিকার প্রদান করে দেশের মধ্যে প্রথম। পৌরসভাগুলির নির্বাচন হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে এবং নিয়মিত। অথচ গত দশ বছরে নির্দিষ্ট সময়ে পৌরসভা নির্বাচন করতে রাজ্য সরকার চরম ব্যর্থ। ২০১৮ সালে মেয়াদ উত্তীর্ণ ১৭টি পৌরসভাসহ মোট ১১২টি পৌরসভার ভোট কবে হবে কেউ জানে না।


দারিদ্র হ্রাস: পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্রসীমার নিচে থাকা মানুষের সংখ্যা বামফ্রন্ট সরকারের আমলে ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ১৯৭৭-র আগে শহর-গ্রাম মিলিয়ে গড়ে ৬০ শতাংশের উপর মানুষ এরাজ্যে দারিদ্রসীমার নিচে ছিলেন। পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, ২০০৪-০৫ সালেই তা ২০.৫ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। ষষ্ঠ এবং সপ্তম বামফ্রন্টের সময়কালে রাজ্যে আর্থিক অগ্রগতির হার জাতীয় গড়ের উপরে থেকেছে। অর্থনৈতিক উন্নতির ফলেই ২০১০-১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে শিল্পপণ্যের বাজার ছিল প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার।

সংখ্যালঘু উন্নয়নে বামফ্রন্ট সরকার: সামগ্রিকভাবে শিক্ষা এবং মানব উন্নয়নের মাপকাঠিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অগ্রগতি বামফ্রন্টের আমলে। পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু বিষয়ক দপ্তরের সূত্রপাত বামফ্রন্ট আমলে। মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ, মাদ্রাসা শিক্ষাকে মাধ্যমিক শিক্ষার সমতুল্য করার কৃতিত্ব বামফ্রন্ট সরকারের। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সেই উদ্যোগ প্রশংসিত হয়। বামফ্রন্ট সরকারই মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন গঠন করে। মাদ্রাসাগুলিকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হিসাবে ঘোষণা করে। প্রতিষ্ঠা করে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়।

পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের প্রতিষ্ঠাও বামফ্রন্ট সরকারের আমলে। কর্মসূচি রূপায়ণে নিগম একদশকের উপর ধারাবাহিকভাবে দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে। তবে সরকারি ও অন্যান্য সরকারপোষিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বামফ্রন্ট সরকারই দেশে প্রথম রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের সুপারিশ মেনে ‘অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়’(ওবিসি)-এর তালিকায় বিভিন্ন মুসলিম সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করে। মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি চাকরিতে সংরক্ষণের সুবিধা সম্প্রসারণে তা ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

শিক্ষা: শিক্ষাক্ষেত্রে চরম অরাজকতার ও মাৎস্যন্যায়ের পর্বে বামফ্রন্ট সরকার রাজ্যে শাসনভার গ্রহণ করে। স্কুল শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষায় সুস্থ স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করা এবং গুণমান বৃদ্ধি করা বামফ্রন্ট সরকারের বিরাট সাফল্য। উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছিল প্রাথমিক শিক্ষায়। রাজ্যে ছয় থেকে দশ বছর বয়সি শিশুদের ৯৯.৬ শতাংশকে স্কুলে আনা সম্ভব হয়। মিড ডে মিলের আওতায় আনা গিয়েছিল ৯৬% শিশুকে। স্কুলছুটের সংখ্যাও দ্রুতহারে কমে আসছিল। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষার সুযোগ বেড়েছিল নজিরবিহীনভাবে। ১৯৭৭ সালে রাজ্যে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ২লক্ষেরও কম ছাত্র-ছাত্রী। ২০১১ সালে সাড়ে ১০ লক্ষের মতো। এদের মধ্যে ছাত্রীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।

রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে উচ্চগবেষণার সুযোগ আজ যা দেখা যায় তার প্রায় পুরোটাই গড়ে ওঠে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে। উচ্চশিক্ষায় সংখ্যালঘুদের আরও বেশি উৎসাহিত করতে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারই প্রথম সরকারি কাজকর্মে ও শিক্ষার ক্ষেত্রে সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতি দেয়।

সাক্ষরতা: ১৯৭১ সালে রাজ্যে সাক্ষরতার হার ছিল ৩৮.৮৬ শতাংশ। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৭ শতাংশ। সর্বভারতীয় হারের চেয়ে তা অনেক বেশি। সাক্ষরতার সাফল্যে ১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর বিখ্যাত ‘নোমা পুরস্কার’ পেয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। সাক্ষরতা আন্দোলন সেই সময় গণআন্দোলনের রূপ নেয়।

সংস্কৃতি: সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার স্বার্থে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও পরিকাঠামো তৈরি করতে এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে বহুত্ব ও বৈচিত্র্য বিকশিত করতে অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। বামফ্রন্ট সরকারই সাংস্কৃতিক কার্যকলাপের উপর সরকারি খবরদারি বন্ধ করে। বন্ধ করে পুলিশ দিয়ে নাটকের স্ক্রিপ্ট অনুমোদনের প্রথা।

স্বাস্থ্যক্ষেত্র: বামফ্রন্ট সরকার দায়িত্বভার গ্রহণের সময় রাজ্যে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ১৩২৬। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার। রাজ্যে ৭৩% মানুষ সরকারি হাসপাতালে আসতেন। যখন গোটা দেশে এই হার ছিল ৪০ শতাংশের মতো। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে গড় আয়ু, জন্মহার, মৃত্যুহার, প্রসূতি মৃত্যুর হার এবং শিশু মৃত্যুর হারে পশ্চিমবঙ্গ জাতীয় হারের চেয়ে অনেক এগিয়ে যায়। পঞ্চায়েত ও পৌরসভাগুলির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করায় বামফ্রন্ট জোর দেয়।

প্রসঙ্গত, করোনা অতিমারীকালে দুর্ভোগে পড়া সাধারণ মানুষের সাহায্যে বাম ছাত্র-যুব শ্রমিক মহিলা সংগঠনগুলি অনবদ্য ভূমিকা নিয়েছে। এটাই বামপন্থীদের ভূমিকা। অতিমারী মোকাবিলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের চরম ব্যর্থতার মধ্যে রেড ভলান্টিয়াররাই রাজ্যকে গৌরবান্বিত করছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য: বামফ্রন্টের আমলে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে অভূতপূর্ব হারে। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো মাত্র ১৬১৫ মেগাওয়াট। ২০১১ সালের নির্বাচনের আগে তা দাঁড়ায়, ১১,৩০০ মেগাওয়াটে। প্রায় প্রতিটি পরিবারে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়। ২০১১ সালের পর রাজ্যে একটিও নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি হয়নি।

উদ্বাস্তু কল্যাণ: কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে যথাযথ সাহায্য না পেয়ে সীমিত সাধ্যের মধ্যেই উদ্বাস্তু পুনর্বাসনে বামফ্রন্ট সরকার উল্লেখযোগ্য কাজ করেছে। উদ্বাস্তু কলোনিগুলির স্বীকৃতি এবং জমির নি:শর্ত পাট্টা প্রদানের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটে। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা পেলে সমস্যার আরও অনেক সুরাহা করা যেত। বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ের পর নতুন সরকার উদ্বাস্তু ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তরের পৃথক অস্তিত্বই তুলে দিয়েছে।

শিল্প-প্রসারে উদ্যোগ: কৃষির সাফল্যের উপর ভিতের উপর দাঁড়িয়েই রাজ্যের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত করতে শিল্পায়নের উপর নজর দেয় বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রের বৈষম্যমূলক নীতির মুখে রাজ্য সরকার নিজের উদ্যোগেই কাজ শুরু করে।

বেসরকারি পুঁজির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গড়ে তোলা হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস ন’শোর বেশি অনুসারী শিল্পেই দু’লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়। সল্টলেকে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পেও কাজের সুযোগ বেড়েছিল নানা স্তরে।

ক্ষুদ্র শিল্পে সংখ্যার বিচারে ও কর্মসংস্থানের বিচারে বামফ্রন্টের সময়েই পশ্চিমবঙ্গ দেশের সেরার শিরোপা পায়। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে রাজ্যে প্রায় ২৮ লক্ষ ক্ষুদ্র শিল্প ইউনিটে কর্মসংস্থান হয়েছিল প্রায় ৫৫ লক্ষ মানুষের। উপকৃত মানুষের সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি।

কেন্দ্রীয় সরকার ১৯৯১ সালে নয়া উদারনীতি ঘোষণার পর সার্বিকভাবে পরিস্থিতি বিচার করে বামফ্রন্ট সরকার ১৯৯৪ সালে রাজ্য সরকারের ‘শিল্পায়ন সংক্রান্ত নীতি বিবৃতি’ ঘোষণা করে। রাজ্য সরকারের লাগাতার উদ্যোগের ফলেই ১৯৯১ থেকে ২০০৮-এর মধ্যবর্তী সময়ে শিল্প বিনিয়োগের পরিমাণের মানদণ্ডে আমাদের রাজ্য উঠে আসে দেশের মধ্যে তিন নম্বর স্থানে। ২০১০ সালে শিল্পে বিনিয়োগ হয়েছিল ১৫হাজার ৫২ কোটি ২৩ লক্ষ টাকা।

আন্তরিকতার সঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দাঁড়িয়েছে স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির পাশে। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৬ সালে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৮০ হাজার। ২০১১ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ১৫লক্ষে। সদস্য সংখ্যা ১ কোটি ৫০লক্ষের উপর; যাদের মধ্যে ৯০ শতাংশই মহিলা। মহিলাদের মর্যাদা ও ক্ষমতায়নে দেশে বামফ্রন্ট সরকার অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সেই সঙ্গে ছিল ‘পশ্চিমবঙ্গ নাগরিক কর্মসংস্থান প্রকল্প’,‘উদীয়মান স্বনির্ভর কর্মসংস্থান প্রকল্প’,‘বাংলা কর্মসংস্থান প্রকল্প’-র মতন উদ্যোগগুলি।

নয়া উদারবাদ যখন কর্মসংস্থানহীন/কর্মসংকোচনকারী তথাকথিত ‘উন্নয়ন’-র মডেল চাপিয়ে দিচ্ছে তখন বামফ্রন্ট সরকারের ‘বিকল্প’ নীতির বৈশিষ্ট্য ছিল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং আয় বাড়ানোর প্রতিটি সুযোগকে কাজে লাগানো। প্রতিটি প্রকল্প রূপায়ণে কর্মদিবস সৃষ্টির প্রশ্নটিই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সামাজিক সুরক্ষা: সমাজের দুর্বলতর অংশের স্বার্থরক্ষায় বামফ্রন্ট সরকার সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করেছে অনেক আগে থেকে। বামফ্রন্ট সরকারের আগে এরকম প্রকল্প বিশেষ ছিল না। বার্ধক্য ভাতা (শুরু ১৯৭৯ সালে), প্রতিবন্ধী ভাতা (শুরু ১৯৮০সাল), আদিবাসী বার্ধক্যভাতা (একমাত্র পশ্চিমবঙ্গে দেওয়া হতো), কৃষক ভাতা, বিধবা ভাতা শুরু করা হয় রাজ্য সরকারের নিজের উদ্যোগে। এই সব প্রকল্পে পর্যায়ক্রমে টাকার পরিমাণও এবং উপভোক্তার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ভূমিহীন কৃষক, রাজ্যের বন্ধ কলকারখানা ও বন্ধ চা বাগানের শ্রমিক, অন্যান্য অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক, পরিবহণ শ্রমিক, বিড়ি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের পথিকৃৎ বামফ্রন্ট সরকারই। বামফ্রন্ট সরকার ২ কোটি ৬৪ লক্ষ গরিব মানুষকে ২টাকা কেজি দরে চাল দিত। শুধু বিপিএল নয়, এপিএল-এর দরিদ্র মানুষেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে গরিবের জন্য বাড়ি তৈরিতে পশ্চিমবঙ্গ দেশে প্রথম তিনটি রাজ্যের মধ্যে স্থান করে নেয়। সংখ্যালঘু গরিব মানুষের জন্য বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে তখন রাজ্য ছিল দ্বিতীয় স্থানে। শুধু গ্রাম নয়, শহরেও গরিব মানুষকে বসবাসের জমি দিতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছিল বামফ্রন্ট সরকার। যেমন, উদ্বাস্তুদের নিঃশর্ত জমি প্রদান; ঠিকা প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন করা, কুড়ি বছরের বেশি সময়ের উপর সরকারি জমিতে বসবাসকারীদের মাত্র ১ টাকায় ৯৯ বছরের লিজ প্রদান ইত্যাদি।

বামফ্রন্ট সরকারের সামাজিক সুরক্ষামূলক উদ্যোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ছিল দু:স্থ মেদাবী ছাত্র-ছাত্রী, বিশেষত অনগ্রসর সম্প্রদায় ও সংখ্যালঘু জন্য উদারভাবে বিভিন্ন বৃত্তি, স্কলারশিপ ও আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করা।

বামফ্রন্ট সরকারই ‘ল্যাম্পস’-র কর্মচারীদের রাজ্য বেতন কমিশনের আওতায় এনেছিল। মহিলা সমৃদ্ধি যোজনা এবং আদিবাসী মহিলা স্বশক্তিকরণ যোজনা প্রকল্প রূপায়ণে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ছিল দেশের মধ্যে প্রথম।

তবে শুধুমাত্র সহায়তা প্রকল্প মারফত কোনও সমাজ সুস্থায়ী উন্নয়নের পথে এগতে পারে না। তাই স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্য শিল্প প্রসারে জোর দেওয়া হয়। সরকারি দপ্তরগুলিতে এবং স্কুল কলেজ গ্রন্থাগার প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে শূণ্যপদ পূরণে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। স্কুল সার্ভিস কমিশন, কলেজ সার্ভিস কমিশন, মাদ্রাসা সার্ভিস কমিশন বামফ্রন্ট সরকারের তৈরি।

বামফ্রন্ট সরকার শুধু রাজ্য সরকারি কর্মচারী নয়, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী, পৌরসভা, পঞ্চায়েত, সমবায় প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের বেতন, পেনশন, পারিবারিক পেনশন, কেন্দ্রীয় হারে মহার্ঘভাতা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিল। এসবে বামফ্রন্ট সরকার কখনই কাটছাঁট করেনি।

সম্প্রীতি ও ঐক্য: ধর্মনিরপেক্ষতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও জাতিগত ঐক্যরক্ষায় দৃষ্টান্তমূলক ভূমিকা পালন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৮৪-র শিখবিরোধী দাঙ্গা এবং ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দমনে বামফ্রন্ট সরকারের ভূমিকা গোটা দেশের পশ্চিমবঙ্গের মর্যাদা বাড়িয়েছিল। সরকারের ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সংখ্যাগুরুবাদী সংকীর্ণতা রাজ্যে মাথাচাড়া দিতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক শক্তি সব সময়ই বামফ্রন্ট-বিরোধী ষড়যন্ত্রে সক্রিয়ভাবে শামিল থেকেছে। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা এবং বিজেপি’র সঙ্গে তার সার্বিক জোট রাজ্য রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়ার শক্তিগুলির নতুন সমাবেশ ঘটাতে সাহায্য করে।

দুর্নীতির পরিবেশে ব্যতিক্রমী: বিশেষত নয়া উদারবাদী পর্বে সরকারি দুর্নীতি যখন কি কেন্দ্রে, কি রাজ্যে রাজ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে, তখন বামফ্রন্ট সরকার ছিল স্পষ্টতই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। অবান্তর বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মানুষকে ভাগাভাগি করে, জনগণকে ভুল বুঝিয়ে নির্বাচনে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেনি বামফ্রন্ট।

কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাসের প্রশ্নে

বামফ্রন্ট সরকার কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের গণতান্ত্রিক পুনর্বিন্যাসের দাবি তুলে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজনৈতিক প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলির অধিকারের প্রশ্নে ধারাবাহিকভাবে উদ্যোগ নেয়। দেশের বিরোধী দল শাসিত রাজ্য সরকারগুলিকে এই প্রশ্নে সমবেত করে। সেই সব উদ্যোগের পরিণতিতেই কেন্দ্রীয় সরকার সারকারিয়া কমিশন গঠন করে। 

রাজনৈতিক পালা বদলের পর

আমরা শুধু সাফল্য নয়,বামফ্রন্ট সরকারের দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতাগুলি থেকেও শিক্ষা নেবার কথা বলি। অগ্রগতির সেটাও অপরিহার্য শর্ত।

একই সঙ্গে বিগত দশ বছর ধরে এটাও অভিজ্ঞতা যে, বামফ্রন্ট সরকারের অনুপস্থিতি আগ্রাসী নয়া উদারবাদী জমানার মুখে রাজ্যবাসীর সমস্যা-সঙ্কট বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চরম আক্রমণ নেমে এসেছে সিপিআই(এম)সহ বামপন্থীদের উপর। খুন জখম মিথ্যা মামলা চলছেই। আর বামপন্থীরা আক্রান্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই বর্ধিত মাত্রায় আক্রমণ নেমে এসেছে সাধারণ মানুষের উপর। সবচেয়ে প্রতিকূলতার সম্মুখীন গরিব ও মধ্যবিত্ত মানুষ। শ্রমজীবী মানুষ। সামাজিকভাবে পশ্চাৎপদ অংশ। ধান্দার ধনতন্ত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই। একই সঙ্গে চলছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ভয়ঙ্কর আক্রমণ জনজীবনের ওপর।

সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়ছে রাজ্য। রাজ্য সরকারের বাজার থেকে ধারের পরিমাণে দেশে রেকর্ড করেছে। কর্মহীনতা বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির উদ্যোগ না নিয়ে শুধুমাত্র কিছু সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যক্তিগত উপভোক্তা তৈরি করে ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতি রাজ্যের ভবিষ্যৎ বিকাশের সম্ভাবনাগুলিকে বিপর্যস্ত করছে। রাজ্য স্থায়ী সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। পরিকাঠামো নির্মাণে রাজ্য পিছিয়ে পড়ছে ক্রমাগত।

দুর্নীতি এখন লাগামছাড়া। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপর্যস্ত। সহায়তা প্রকল্পগুলিকে জিম্মা রেখে গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি হরণ করা হচ্ছে। রাজ্য পরিণত হচ্ছে জাতপাত সংকীর্ণ পরিচিতি সত্তা ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভয়ারণ্যে।

বল্গাহীন স্বৈরাচার যেন বিকল্পহীন-- দেখাতে চায় ক্ষমতালিপ্সু শাসক। ‘জয় বাংলা’ আর ‘সোনার বাংলা’-র মিডিয়াপুষ্ট দ্বৈরথ সেই লক্ষ্যেই। সেকারণেই গুরুত্ব বাড়ছে বিকল্পের লড়াইয়ের। অর্জিত অধিকার রক্ষার লড়াইয়ের। বামফ্রন্ট সরকারের সময়কার জনস্বার্থবাহী বিকল্প নীতির গুরুত্ব এখানেই। এরাজ্যে এবং সমগ্র দেশে।

গণশক্তি, ২০ জুন, ২০২১


নারদাকান্ডে সিবিআই-র শীতঘুম ভাঙা: অজয় দাশগুপ্ত

১৮মে, ২০২১

নারদাকান্ডে পাঁচ বছর শীতঘুমে থাকার পর খোদ প্রধানমন্ত্রী পরিচালিত সিবিআই দপ্তর আচমকা জেগে উঠেছে! ভোটে হারার প্রতিক্রিয়া কিনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনা হলো, ২০১৬ সালের ১৪ মার্চ নারদ ‘এক্স ফাইলস’-এর ভিডিও ফুটেজে সৌগত রায়, সুব্রত মুখার্জি, ববি হাকিম, শুভেন্দু অধিকারীসহ তৃণমূলের ১৬ জন সাংসদ ও বিধায়ককে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা যায়। ভিডিও ফুটেজের সত্যতা ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও একজনের বিরুদ্ধেও দলীয় স্তরে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নিযদিও ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে মমতা ব্যানার্জি নিজেই কবুল করেছিলেন, ‘‘আগে জানলে টিকিট দিতাম না।’’ কিন্তু নির্বাচনের পর তাদেরকেই আবার মন্ত্রী করেছেন এবং পরের নির্বাচনেও টিকিট দিয়েছেন। তুলনাহীন দ্বিচারিতায় উনি সবকিছুতেই ছাপিয়ে গেছেন, এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি।

এদিকে, তৃণমূল সাংসদ-বিধায়কদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য লোকসভায় গঠিত এথিক্স কমিটির কাছে নারদা স্টিং অপারেশনের টেপ জমা পড়ার ৫বছর বাদেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, একটি বৈঠকও ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়, রাজ্যসভায় এথিক্স কমিটি গঠনের বিরোধিতা করেছে স্বয়ং মোদী সরকার। এই ঘটনার পিছনে কোন বোঝাপড়ার অঙ্ক কাজ করছিল সেই রহস্য এখনও অন্ধকারে।

২০১৮সালের ১২সেপ্টেম্বর সংসদের নীতিবিষয়ক (এথিক্স) কমিটি পুনর্গঠিত করেন লোকসভার তৎকালীন অধ্যক্ষ সুমিত্রা মহাজন এবং নারদ ঘুষকান্ডের তদন্তে গত তিন বছরে একটিও মিটিং না ডেকে শীতঘুমে থাকা এই কমিটির চেয়ারম্যান আবার হন বিজেপি-র প্রবীণ নেতা লালকৃষ্ণ আদবানি। সেবছরই ১আগস্ট দিল্লিতে সংসদ ভবনে তাঁর কক্ষে গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রণাম করার ছবি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ তাঁরা ‘সৌজন্যমূলক’ আলাপচারিতায় ব্যস্ত ছিলেন, বলেও আমরা সংবাদমাধ্যমসূত্রে জানতে পেরেছিলাম! বাবরি মসজিদ ভাঙার নায়ক লালকৃষ্ণ আদবানিকেই মমতা ব্যানার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন, এটাও মিডিয়ার অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে যেতে চান! তার পিছনে কোন অঙ্ক কাজ করছিল, তা সহজেই অনুমেয়।

লোকসভা নির্বাচনের পর আদবানিহীন সংসদে নতুন করে এথিক্স কমিটি গঠিত হলেও তার বৈঠক কেন ডাকা হলো না, তার উত্তর মোদী-শাহ সরকারকে দিতে হবে। বৈঠক ডাকলেই সাংসদদের সদস্যপদ যে বাতিল করতে হবে, তার উদাহরণ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত লোকসভা দেখিয়ে দিয়েছে। সদ্য বিজেপি'তে যোগ দেওয়া, অথবা যোগ দিতে অপেক্ষমান সাংসদদের বাঁচাতে গিয়ে যে একাজ করা হচ্ছে না, এই প্রশ্ন উঠেছে।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৬এপ্রিল সিবিআই লোকসভার অধ্যক্ষের কাছে সাংসদদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানিয়ে চিঠি দিয়েছিল। মোদী সরকারই তা ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে।

এদিকে, আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে মমতা ব্যানার্জি দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন। তার অব্যবহিত পরেই সিবিআই সারদা, রোজভ্যালি এবং নারদা মামলার তদন্তকারী সমস্ত কর্মকর্তাদের বদলি করে, যারা তখনই কেস গুটিয়ে এনেছিলেন

নাটক এখনও শেষ হয়নি। নতুন অঙ্ক শুরু হয়েছে। দেখতে থাকুন।

সূত্র: 

১। আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৮এপ্রিল, ২০১৬;   ‘‘আগে জানলে টিকিট দিতাম না:

২। The Hindu, Kolkata, 16th January, 2020;  CBI transfers officers probing Saradha, Rose Valley and Narada scams


(এই চমকপ্রদ ছবিটি সমকালীন চিত্র সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম সেরা অমিত ধরের তোলা। তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।)


 

20210716

শোকবিহ্বল পূর্ণিয়ায় অজিত সরকারের দেহ উপচে পড়েছিল হলুদ অমলতাসে

জয়দীপ সরকার

তখন সবে কাজ শুরু করেছি, রাত ১১টায়। অভীকদা ফোন করে বললো, ‘‘পূর্ণিয়া চলে যাও, অজিতদা খুন হয়ে গেছেন।’’ দিনটা ছিল ১৪ই জুন।

দার্জিলিং মেইলে সাধারণ টিকিট কেটে বহুকষ্টে বারসই, সেখান থেকে কাটিহার হয়ে পূর্ণিয়ার কয়েক কিলোমিটার আগে বাস থেমে গেল। চালক বললেন, ‘পূর্ণিয়াতে আগুন জ্বলছে, বাস যাবে না।’ বাসে দেখি তাত্ত্বিক শঙ্করদাও চলেছে ছবি তুলতে। জুটি পেলাম। কয়েক কিলোমিটার হেঁটে শহরে ঢুকে দেখলাম মানুষের তেজ। একজন রিক্সাচালক কাঁদছিলেন, বললেন, ‘‘ভগবান খুন হয়ে গেলেন।’’ বোঝালাম, নিয়ে চলুন, ওনার দেহ যেখানে আছে সেখানে।

বিরাট শহর, কিন্তু সে সময় লাল ঝান্ডার দখলে। রিক্সাচালক নিজে বললেন, তিনি চামার সম্প্রদায়ের দলিত, সিপিএম নেতা অজিত সরকার সেখানকার বিধায়ক ছিলেন বহুবছর ধরে। ‘‘শহরে গুন্ডারা মাথা তুলতো না তাঁর ভয়ে, পাপ্পু যাদব জমির মালিকদের টাকা নিয়ে অজিত বাবাকে গুলি মারলো।’’

রাস্তা শুনশান। পুলিসের গাড়ি জ্বলছে একের পর এক। লাঠি নিয়ে বুকে কালো ব্যাজ লাগিয়ে নীরব স্রোত আসছে সব গলি থেকে। সবার হাতে লাঠি।উল্টে ফেলে গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিরাট বিলাসবহুল কয়েকটা গাড়ি, রিক্সাচালক বললেন, ‘‘এগুলো পাপ্পুর গাড়ি।’’

লাল পতাকা নিয়ে মিছিল কান্না, এমন দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে ভাবছিলাম, এটা পশ্চিমবাংলা না উত্তর বিহার!


শহীদ মিনার ময়দানের মতন একটা মাঠ, নিচে শোয়ানো অজিত সরকারের দেহ। একটা হলুদ অমলতাস গাছের নীচে সে দেহ উপচে পড়ছে ফুল, এই বর্ষা শুরুর বৃষ্টি ফোঁটায় ভারী হয়ে অজিতদার দেহটা ঢেকে দিচ্ছে হলুদ অমলতাস। পাটনা বিধায়ক নিবাসে গেলে এই মানুষটি ছাড়তে চাইতেন না, ‘‘ইয়ং ম্যান বসো। শ্যামনগর ভাটপাড়া এখনও টানে জানো, সুভাষদা ফোন করে খোঁজ খবর নেয়।’’ সেই বিরাট দাপুটে মানুষটা ফুলের ভারে চাপা পড়ে আছেন!

স্বতঃস্ফুর্ত বনধ। কতদিন চলবে কেউ জানে না। ক্ষিপ্ত দেহাতী মানুষরা পুলিস কর্তাদের ঘিরে বলছেন, ‘‘পুলিস চাইলে এখনই খুনীদের ধরতে পারে। হয় আপনারা ধরুন নয় আমাদের হাতে ছেড়ে দিন। আমরা শয়তানের শেকড় ছিঁড়তে চাই।’’

সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘ঢোড়াই চরিত মানস’ বইতে চিনেছিলাম পূর্ণিয়াকে। বিহারের শস্য ভান্ডারে ফসল উৎপাদকের হাতে জমির অধিকার তুলে দেওয়া, গরিব কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করায় এ তল্লাটে আপামর মানুষের কাছে অজিত সরকার তখন আপনা নেতা। বেলার দিকে দিল্লি থেকে পৌছলেন সীতারাম ইয়েচুরি, তিনি তখন দল থেকে বিহারে সিপিআই(এম)-র দায়িত্বে। শোকসভা করে পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে শেষকৃত্যে গেলেন ইয়েচুরি সহ সকলে ।

আমরা খবর পাঠাতে গেলাম পূর্ণিয়া পোষ্ট অফিসে। পোষ্টমাষ্টার রাজস্থানী, ফ্যাক্স চালিয়ে দিয়ে বললেন, ‘‘এত দূর দেশ থেকে কাজ করতে এসে আত্মীয় পেয়েছিলাম, তিনিও খুন হলেন।’’ একটা সর্বাত্মক সহানুভূতি, ভাবাবেগের স্রোত। তিনিই একটা হোটেলে নিয়ে গেলেন রাত্রে থাকার ব্যবস্থা করলেন। পরদিন পরিচিত এক বন্ধু ঘুরে দেখালেন তাৎমাটুলি, এ যেন এক অতি পরিচিত অথচ আশ্চর্য জগৎ। পাশেই লেখা লেনিননগর। বেতের দেওয়ালে আঁকা কমরেড চে। বস্তির মানুষরাই ফুল দিয়ে মালা বানিয়ে সাজান তাঁদের বন্ধু চে’কে।

আমরা ফিরছিলাম, অজিত সরকারের পরিবারের সাথে মাধবীদির সাথে কথা বলে। সীতারাম ইয়েচুরি বাংলায় বললেন, ‘‘খেয়ে যাবে না তোমরা?’’ ক্ষিদেও ছিল চরম, সীতারাম ইয়েচুরির পাশে মাঠের মাঝে বসে খাওয়া। পাতায় ভাত, ডাল এবং কাঁচা মুলো। আমার বোধে ছিল না এটাই শুরু এবং শেষ হতে পারে। কিছুটা ভাত রাখা ছিল। সীতারাম বললেন, ‘‘এটাই কমরেডরা চাঁদা তুলে নিজেদের কষ্টের টাকা দিয়ে বানিয়ে আমাদের খাওয়াচ্ছেন, আর কোন কিছু নেই।’’ একজন এসে বালতি থেকে ডাল দিলেন, একজন সযত্নে মূলোর টুকরো। আমি হতবাক, লজ্জিত। সীতারাম চেটেপুটে সব খেয়ে পাতা ফেলতে চললেন। আমিও তাই করলাম।


এখন চে’র দিন আসলেই মনে পড়ে পূর্ণিয়ার বাহুবলী মানুষদের লড়াই, অজিত সরকারকে হারানোর শোক, রক্তভেজা রাস্তা, অমলতাস আর লাল পতাকায় মোড়া নেতার শবদেহ ছুঁয়ে দেহাতী মানুষদের বুকফাটা কান্না, রহস্যময় তাৎমাটুলির মাঝে লেনিননগরে চে’র জন্মদিন আর মাঠের মাঝে বাবু হয়ে সীতারাম ইয়েচুরি আর কৃষকদের সাথে খেতে বসার এক নতুন অভিজ্ঞতা।

ছবিটা সেসময় ছোট ক্যামেরায় তোলা। তখন ডিজিটাল জীবন আসেনি।

১৪জুন, ২০২১

 



বিঃ দ্রঃ হিন্দি চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট অভিনেতা আমীর খান তাঁর ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানের একটি এপিসোডে কমরেড অজিত সরকারের ভূমিকা অনবদ্যভাবে তুলে ধরেছিলেন। কমরেড অজিত সরকারের ছেলে অমিত সরকার সেই অনুষ্ঠানে তাঁর বাবার নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনা তুলে ধরেন। মানুষের স্বার্থে কমরেড অজিত সরকারের কাজের কয়েকটি উদাহরণও তুলে ধরেছিলেন।

Courtesy: https://youtu.be/aY1M8v8KNFc



ঈশ্বর যেখানে আছেন

 


অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

God's own country অথবা ঈশ্বরের নিজের দেশ বলে বিজ্ঞাপনে দাবি করার অনেক আগে থেকেই আমার মনে হয়েছিল কেরালা ঈশ্বরের দেশ অর্থাৎ স্বর্গ।

অফিসের কাজে বেশ কয়েকবার কেরালা যেতে হয়েছে। যতবার গিয়েছি ততবার কেরালার প্রতি আমার প্রেম উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে।

কেরালা এবং কেরালাবাসীর গুণের শেষ নেই, তবু ওই রাজ্য আমাকে প্রধানত মুগ্ধ করেছে তার বর্ষণসিক্ত রূপ দেখিয়ে।

ছোটবেলা থেকেই বর্ষার ভক্ত। জমা জলে ছলাৎ ছলাৎ করতে করতে বিধান সরণি দিয়ে স্কুলে যাওয়ার যে আনন্দ শৈশবে পেয়েছি সেটি আজও লালন করছি মনের মধ্যে এবং এই বার্ধক্যের দোরগোড়ায় এসেও জমা জলের রাস্তা পেরোতে আমি সমান আনন্দ পাব এ কথা হলফ করে বলতে পারি।

বর্ষা উপভোগ করতে ছুটে গিয়েছি ডুয়ার্সে। কোনও এক বর্ষার দ্বিপ্রহরে রানাঘাট থেকে ট্রেন ধরে যাত্রা করেছি  বনগাঁ, প্রত্যক্ষ করেছি বিভূতিভূষণের সবুজ আত্মাকে। ঘন ঘোর বর্ষায় স্টিমারে অতিক্রম করেছি পদ্মা নদী, তবু, হ্যাঁ তবু কেরালার বর্ষা আমাকে সবথেকে বেশি মোহিত করেছিল।

মনে পড়ে ১৯৮৯ সাল নাগাদ অফিসের কাজে উত্তর কেরালায়  গিয়েছিলাম। সেই প্রথম খুব কাছ থেকে কেরালার গ্রাম দেখা, কাইয়ুর শহীদদের গ্রাম, যে গ্রাম এদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে ইতিহাস হয়ে আছে।

অজস্র নারকেল গাছে আচ্ছাদিত। সবুজে সবুজ। কিন্তু এই সবুজের একটা বৈশিষ্ট্য দেখলাম। মনে হয় যেন প্রতিটি গাছের পাতা কেউ ধরে ধরে পরিষ্কার করেছে। এতোটুকু ধুলোর আস্তরণ নেই।

আর হবে নাই বা কেন? কেরালায় বর্ষা আসে দেশের মধ্যে সবার আগে, আর বিদায় নেয় সবার পরে। যাকে বলে ফি বছর ডবল মনসুন।

উঠেছিলাম শহরের কাছেই একটা অতীব সস্তার হোটেলে। কিন্তু যত সস্তাই হোক, ওখানকার হোটেলে রোজ বিছানার চাদর পাল্টে দেয়, ঘরে নিয়মিত ঝাঁট পড়ে, সস্তার হোটেল বলে বাথরুমের জল উপচে ঘর ভাসিয়ে দেয় না, ঘরের দেওয়াল স্যাঁতস্যাঁতে নয়।

হোটেলের এক তলায় একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট। সাধারণ কাঠের চেয়ার টেবিল। কিন্তু একেবারে ঝাঁ চকচকে পরিষ্কার। ভোর ছটাতেই রেস্টুরেন্টের ঝাঁপ খুলে যায়। কলকাতার মত রেস্টুরেন্টে ঢুকে বলতে হয় না, ওরে কে আছিস রে, টেবিলটা পরিষ্কার কর। তারপর কেউ হয়তো এসে একটা কালো ন্যাকড়া দিয়ে এমনভাবে মুছে দিয়ে গেল, তাতে পরিষ্কার হলো না আরো নোংরা হল বোঝা দায়।

আরব দুনিয়া থেকে রোজগার করে আনা বিপুল টাকার মালিক অথবা পথের ভিখারী (সংখ্যায় খুবই কম) কেরালায় সকলেরই জামাকাপড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে আর্থিক সামর্থ্যের কোন সম্পর্ক নেই।

মনে আছে সেদিন সকাল ছটায় ঘুম ভেঙে গেল বিকট মেঘ ডাকার শব্দে।

তড়িঘড়ি উঠে দেখি তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এত বৃষ্টি যে চারদিক ঝাপসা হয়ে গেছে। থেকে থেকে দমকা হাওয়া দিচ্ছে।

এই জলের গন্ধ যেন অন্যরকম। আরব সাগরের জল বলেই কি?

সেই সঙ্গে হাওয়া বইছিল ভালো রকম। চারপাশের অজস্র নারকেল গাছ ভয়ানক রকম দুলছিল। কিন্তু না। একটা নারকেলও গাছ থেকে পড়ল  না। ভাবটা যেন, এরকম ঝড়-বৃষ্টি অনেক দেখা আছে।

এই রকম দেখতে দেখতে মনে হল একটু চা দরকার।

কিন্তু রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি লোকজন কর্মচারী কেউ নেই। একেবারে ফাঁকা। বৃষ্টির জন্য আটকা পড়েছে হয়তো।

রান্নাঘরের কাছে গিয়ে দেখি একটি ছেলে কাজ করছে।

তাকে  হিন্দিতে বোঝালাম চা কফি কিছু হবে? সে একটা অনাবিল হাসি দিয়ে মুহুর্তের মধ্যে স্টেইনলেস স্টিলের বাটিতে কফি এবং ঝাল ঝাল দেশি বিস্কুট দিয়ে গেল।

বৃষ্টি এলো আরো জাঁকিয়ে।

সেই মুহূর্তে নিজেকে পরম ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম যদি কোন কারণে মরে যেতাম তাহলে এই ধূমায়িত কফি সহযোগে এই কৈরল বর্ষার অনন্য অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়ে ধরাধাম থেকে বিদায় নিতে হতো।

সেদিন সকালবেলা খবরের কাগজ জুটলো না। একটা টেলিভিশন ছিল বটে, কিন্তু দেখলাম নিরাপত্তার কারণে প্লাগ খুলে রেখেছে। স্বাভাবিকভাবেই আমি আর চালানোর কথা বললাম না।

মোটামুটি সকাল নটা সোয়া নটা নাগাদ সকালের খিদে পাব পাব করছে, এমন সময় সেই ছেলেটি প্লেটে করে মোট চারটি ইডলি এবং সম্বার ও চাটনি দিয়ে গেল। দেবার সময় বলে গেল, স্যার, অন্য কিছু নেই। সকালে শুধু এইগুলো বানাতে পেরেছি। এটাই খেয়ে নিন।

আমি কিন্তু বেজায় খুশি। ইডলি আমার খুব প্রিয়। কিন্তু চারটে খাওয়া আমার পক্ষে একটু বেশি। তবু প্লেটের দিকে তাকিয়ে একটা চোখের খিদে হল। ইডলির প্রথম টুকরোটা হাতে নিতেই দেখি অবিশ্বাস্য রকম তুলতুলে। এ কি সত্যিই ইডলি না আরব সাগরের অতলান্ত থেকে তুলে আনা সাদা স্পঞ্জ?

আমি অবলীলায়  চারটে ইডলি যাকে বলে সাঁটিয়ে দিলাম। সে যে স্বাদে গন্ধে কি অপূর্ব তার আর কি বলবো? আমার মনে হয় ওইটি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ইডলি এবং এখনও পর্যন্ত আমি এই সিদ্ধান্তে অটল আছি।

একটু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি থামল। আমিও নিজের ঘরে গিয়ে স্নান সারলাম।

লাঞ্চ করার জন্য একতলায় সেই রেস্টুরেন্টে গেলাম। গিয়ে দেখি আশ্চর্য ব্যাপার! কোন লোকজন নেই। এমনকি রিসেপশন কাউন্টারে কেউ নেই। রান্নাঘরে ওই ছেলেটির হদিস পেলাম না।

কি করবো বুঝতে পারছিনা, বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে নিলেই হয় কিন্তু  হোটেল এরকম ফাঁকা কি করে হয়?

কিছুক্ষণ পরে অবশ্য এক মহিলাকে ঘর মুছতে দেখলাম। কিন্তু আমার কথা  কিছুই বুঝতে পারলেন না।

একরকম বেরিয়ে যাব বলে মনস্থির করেছি এমন সময় দেখি রিসেপশনে বসে থাকা সেই ভদ্রলোক দৌড়াতে দৌড়াতে আসছেন। আমাকে দেখে বললেন, চলুন। আপনাকে নিতে এসেছি।

আমি বললাম, কোথায় যাব?

তিনি আমাকে বললেন, আপনি জানেন না? আজ আমাদের হোটেল মালিকের মেয়ের বিয়ে। সবাইকে ওখানে। আপনি দুপুরে ওখানেই খাবেন।

আমি তো শুনে কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। এরকমভাবে চিনি না জানি না, নেমন্তন্ন নেই, বিয়েতে যাওয়া যায় নাকি?

সম্ভবত তা আন্দাজ করে ভদ্রলোক বললেন, মালিক নিজেই আপনাকে আসতে বলেছেন বার বার করে। বৃষ্টি না হলে নিজে এসে বলে যেতেন। আমাকে পাঠিয়েছেন আপনাকে জোর করে নিয়ে যেতে। কোন অসুবিধা নেই চলুন। হোটেলে আরো যারা আছেন সবাই চলে গেছেন এতক্ষণ। 

অবশেষে তার সঙ্গে আমি রওনা দিলাম। যাবার পথে রাস্তার ধার থেকে কিছু জুঁই ফুলের মালা কিনে নিলাম কনেকে উপহার দেবার জন্য।

দুপুরবেলা বাড়ির বড় উঠোনের মাঝখানে শামিয়ানা খাটিয়ে বিবাহ এবং খাওয়া-দাওয়ার সুবন্দোবস্ত। লম্বা কাঠের টেবিলে বিশাল বিশাল কলাপাতায় লাল নীল সবুজ হলুদ কত রকম খাবার যে খেতে দিল তার ঠিক ঠিকানা নাই। যদিও সবই নিরামিষ কিন্তু অতীব সুস্বাদু। কত রকম মিষ্টি যে খাইয়েছিল তার হিসেব নেই। একমাত্র বাঙালি মিষ্টি বানাতে পারে এই ধারণা ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল।

মাঝেমধ্যেই সেই মালিক কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার মতোই গলবস্ত্র হয়ে হাসিমুখে  সবাইকে আপ্যায়ন করছিলেন, বলছিলেন মালায়ালি ভাষাতেই। তিনি কি বলতে পারেন তা একটা আন্দাজ করে নিলাম। অর্থাৎ দেখেশুনে নিজের মনে করে খাবেন, আমার এই সামান্য আয়োজন, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যে এই আহার এবং আপ্যায়নে যারপরনাই তৃপ্ত সে কথা ইংরেজি-হিন্দী মিশিয়ে বারেবারে বলাতে উনি খুবই আনন্দিত হলেন। আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম গোটা বিয়েবাড়িতে অনেকেই আমাকে দূর থেকে দেখছেন, আমি যে একজন অ-মালায়ালি সেটা ততক্ষণে বোধহয় গোটা বিয়েবাড়িতে চাউর হয়ে গেছে, এবং আমার উপস্থিতি তাঁরা বেশ উপভোগ করছেন বুঝতে পারলাম।

অতিথিকে যে দেবতা জ্ঞানে গণ্য করা হয় একথা ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ষোলআনার উপর আঠারো আনা সত্যি। এ আমার সীমিত জীবনের অভিজ্ঞতা।

তবে ভদ্রলোক আমাকে যা বলছিলেন তার মধ্যে একটা ইংরেজি শব্দ বারে বারে কানে আসছিল। শব্দটা হল blessings.

তার মানে কি উনি আমার কাছে ওর কন্যা ও জামাতার জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করলেন?

মহা মুশকিল, আমি কি আশীর্বাদ করব?

আমার নিজেরই তখন বিয়ে হয়নি যে।

তখন দেখতে মোটেই বুড়ো ছিলাম না, তবে কি চালচলনের মধ্যে বুড়োটেপানা ছিল?

যাইহোক এই প্রসঙ্গ আর দীর্ঘায়িত করতে চাই না। এরপরে বহুবার কেরালা গিয়েছি এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছি।

তারপর এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম বুড়ো বয়সে কেরালার গ্রামে গিয়ে থাকব। যদি টাকাপয়সা রোজগার করতে পারি তবে একটা জমি কিনে বাড়ি করব অথবা ছোটখাটো ঘর কিনে নেব। আমার এই বাসনার কথা ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বলেওছিলাম।

আজ যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৭ দিন ঘরবন্দি তখন এক বন্ধুবর মুচকি হেসে জানতে চাইলেন, তাহলে তুই কেরালায় বাড়ি করছিস কবে? সব প্লান ঠিকমতো এগোচ্ছে তো!

আমি তার প্রশ্নে রীতিমতো থতমত খেয়ে গেলাম। বললাম, এই মুহূর্তে তো কেরালা যাওয়ার কথা ভাবতে পারছি না। যেভাবে করোনার সংক্রমণ ছড়াচ্ছে ওই রাজ্যে, এখন যাবার প্রশ্নই ওঠে না। ভবিষ্যতেও স্থায়ীভাবে থাকবো কিনা ভাবতে হবে। তাছাড়া আরবসাগর যেভাবে ক্ষেপে উঠেছে এবং বারে বারে কেরালার উপর হামলা চালাচ্ছে, সমুদ্রের ধারে পাকাপাকি বাস করাটা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছে না।

বন্ধুটি বলল, তাহলে কোথায় গিয়ে থাকবি? গোটা দেশেই তো করোনা। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী কেউ বাদ নেই। এমনকি আন্দামানে ছড়িয়ে পড়েছে পর্যন্ত।

তারপর একটু থেমে কি ভেবে সে বলল, তুই ভুটানে যেতে পারিস। ওখানে নাকি করোনা দুর্দান্তভাবে সামাল দিয়েছে।

আমি বললাম, ভুটানে জমির কাঠা কত করে? 

হঠাৎ গিন্নির চিৎকারে সম্বিত ফিরল: এমনিতেই তোমার শরীর ভালো নেই কার সঙ্গে ফোনে এতক্ষণ  বকবক করছ? কখন থেকে খেতে ডাকছি। এখন সোয়া দুটো বাজে। 

অগত্যা তড়িঘড়ি উঠে পড়লাম। দেখলাম ডাইনিং স্পেসের জানলা বন্ধ। বললাম, একটু খুলে দাও।

গিন্নি বললেন, বাইরে ভালো রকম বৃষ্টি হচ্ছে। 

আমি বললাম তাই নাকি? আমি কিছুমাত্র টের পাইনি!! ঘরের দরজা বন্ধ করেছিলাম বলেই হয়তো বুঝতে পারিনি। তা হোক তবু একটু খুলে দাও, একটু ঠান্ডা হাওয়া আসুক, বৃষ্টিটা দেখি। 

টেবিলে প্লেট পড়ল। জিজ্ঞাসা করলুম, আজ কি রান্না হয়েছে গো?

কেন তোমার অর্ডার মাফিক হয়েছে। তিনি জবাব দিলেন।

আমি বললুম, আহা, আমার তো মনে নেই কি রাঁধতে বলেছিলাম।

তিনি বললেন, কেন, মটর ডাল। ব্যসন দিয়ে কুমড়ো ফুল ভাজা। ঘি দিয়ে মোচার ঘন্ট। বাটা মাছের ঝাল আর আমেরচাটনি।

আমার মনটা যে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে সেটা তিনি ভালই বুঝতে পারলেন।

বাইরের দিকে তাকালাম। সবকিছু ঝাপসা। প্রবল বৃষ্টিতে বাড়ির জানালার লাগোয়া আমগাছটা দোল খাচ্ছে। কিন্তু একটা আমও পড়ছে না। ভাবটা অমন বৃষ্টি আমরা অনেক দেখেছি।

ভাতের উপর ডাল ঢেলে একটু মেখে নিয়ে কুমড়ো ফুলের বড়াতে কামড় দিলাম।

এক আশ্চর্য অনুভূতি হল। মনে হল এখানেও ঈশ্বর থাকেন! এটাও একটা স্বর্গ!!



 ###############################