20180409

গড়ে তোলো মানুষের পঞ্চায়েত


মিনতি ঘোষ

মহাত্মা গান্ধী স্বপ্ন দেখেছিলেন পঞ্চজনারপঞ্চায়েত অর্থাৎ গ্রাম স্বরাজের কথা। সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে হবে নতুন ভারত গড়ার কাজ। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। পরিচালনায় কংগ্রেস দল। বারবার আ‍‌লোচনা হয় দেশ গঠনের, তার উন্নতির জন্য কোন পথে গেলে ভালো হয়। তারপর সংবিধানের নির্দেশাত্মক নীতিতেই স্থান পায় পঞ্চায়েত। আসল সমস্যাতো সেই প্রয়োগের ক্ষেত্রে। জমিদার, জোতদার, উঁচু জাতের (সংখ্যালঘু ধনী ব্যক্তিসহ) প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দখলে সমষ্টি উন্নয়ন অফিস, (বি ডি ও অফিস) পঞ্চায়েত।
অর্থ যেটুকু সরকার থেকে পাওয়া যেত ভাগাভাগি হয়ে যেত তাদের মধ্যেই। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির সামনে একটি কুয়ো অথবা টিউবওয়েল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সামান্য পাকা রাস্তা, দূরদূরান্তে প্রাইমারি অথবা হাই স্কুল। জেলায় বড়জোর একটি দুটি কলেজ। ধনীর কুয়োর/টিউবওয়েলের জলে অধিকার ছিল না সংখ্যালঘু, আদিবাসী, বাউরি, বাগদিসহ তথাকথিত নীচুজাতের। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পুকুর, খালবিল। লেখাপড়ার সুযোগও তাদের ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল অধরা স্বপ্ন। সাইকেলও বড়লোকের বাড়িতে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার চিন্তা গরিব বাড়ির মেয়েদের কমই ছিল। বসন্ত, যক্ষ্মা, কলেরা, ম্যালেরিয়া ছিল নিত্যসহচর।
একদিকে হাতে গোনা সুবিধাভোগী অপর দিকে হাড়-জিরজিরে নিরন্ন মানুষযাদের বান-বন্যা, খরা-শুখা মরশুম অর্থাৎ প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বাঁচতে হতো। স্বাধীনতার আসল স্বাদযখন সাধারণ মানুষ বুঝেছেন তখনই তাঁরা জোট বাঁধতে শুরু করেছেন। তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৭, ১৯৬৯ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র নেতৃত্বে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে। টিকল না দুটি সরকার। ১৯৭১ সালের সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। সারা দেশে জনবিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো। ঠিক আজকের মতো গণতন্ত্রকে হত্যা করা হলো, বাক্‌স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলো। আমাদের রাজ্যে এগারোশো কর্মীকে খুন করা হয়েছে। শহীদের তালিকাতে সিংহভাগই গরিব, দলিত, সংখ্যালঘু মানুষ। সীমাহীন অত্যাচারের শিকার মহিলারা।
১৯৭৭ সালে আবার নির্বাচন। এরাজ্যে সি পি আই (এম) সর্বাধিক ভোট পেয়ে গঠন কর‍‌ল বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রে জনতা সরকার।
পরিবর্তনের ভরকেন্দ্রে কিন্তু অগণিত গরিব কৃষক, মধ্যবিত্ত, মহিলা, বেকার যুবক। তাঁরা কংগ্রেস সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। সেই ভূমিহীন কৃষক যাঁরা যুক্তফ্রন্টের আমলে স্লোগান দিয়েছিলেন—‘লাঙল যার জমি তারনেতৃত্বে সারা ভারত কৃষকসভা। কৃষক রমণী ছিলেন তাঁদের সাথি।
ওপরের কথাগুলো হয়তো ‘‘ধান ভানতে শিবের গীত’’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষইতো বামফ্রন্ট সরকার গড়ল। তাঁদের দীর্ঘকালের বিশ্বাস লালঝান্ডা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। করেও ছিল। সরকার গঠনের পরই সিদ্ধান্ত করে ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে বাস্তবে কার্যকর করেছে। এতদিন গরিব মানুষের মাথার উপর কোনও ছাদ ছিল না। এবার তারা সেই নির্ভরতার জায়গাটা খুঁজে পেল। বামফ্রন্ট যার নেতৃত্বে সি পি আই (এম) তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। নির্বাচনী প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিতে চলার ফলে। মূল মিত্রকে চিনে নিতে তাই কোনও পক্ষেরই ভুল হয়নি।
ভূমিসংস্কারের সাফল্য : ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার প্রায় ১৪ লক্ষ ৪ হাজার ৯১ একরের বেশি জমিকে খাস করেছে। কৃষিযোগ্য জমি ১৩ লক্ষ ১৪ হাজার একরের বেশি। ভূমিসংস্কারের ফলে বিলি হওয়া পাট্টার ৫৫ শতাংশ তফসিলি জাতি ও আদিবাসী মানুষ পেয়েছেন। সংরক্ষিত নন অথচ সংখ্যালঘু মানুষের ৩৬.২৪ শতাংশ মানুষ জমি পেয়েছেন।
এরাজ্যে গড়ে যদিও ২৭ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষ বাস করেন।
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বলছেরাজ্যে ৫৮.৭ শতাংশ থেকে ৭২.৬ শতাংশ তফ‍‌সিলি জাতি প্রধান ব্লক রয়েছে ১২টি। বেশিরভাগই জলপাইগুড়ি, বাকিটা মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। তফসিলি উপজাতি ৪১.৩ শতাংশ থেকে ৫১.৫ শতাংশ প্রধান ৭টি ব্লক। ৩১.০ শতাংশ থেকে ৪১.৩ শতাংশ ৯টি ব্লকে। এমনভাবেই সারা রাজ্যে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় তাঁরা সীমাবদ্ধ নেই। সংখ্যালঘু মানুষের বাস সবচেয়ে বেশি মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। প্রায় ১০ কোটি মানুষের বাস পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী, সংস্কৃতিগত বৈচিত্রের মধ্যেও তাঁদের অবস্থান। একারণেই উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের নিরিখে কোনও জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে চিহ্নিত করা যায় না।
প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ১২ লক্ষের বেশি মানুষ বর্গাদার হিসাবে নথিভুক্ত হলো। বাস্তুজমি পেয়েছেন ২.৭৭ লক্ষ মানুষ।
প্রথম বামফ্রন্ট আমলে গ্রামবাংলার জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলি রূপায়িত হয়েছিল তার জন্য ছিল : ১৯৭৭২৯শে সেপ্টেম্বর : বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গ ভূমিকা (সংশোধনী) বিল গৃহীত। ১৯৭৭৭ই নভেম্বর : ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের দিনই ঘোষণা করা হলো—‘‘চাষ করবেন যিনি, ফসল নেবেন তিনি’’১৯৭৭১৮ই নভেম্বর : ‘‘বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তকরণের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে গাইড লাইন প্রকাশ করে বামফ্রন্ট সরকার। যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্ত আমূল পালটে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের চেহারা। মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে মহিলাদেরএকক পাট্টা পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৮৩৭ জন মহিলা। যৌথ পাট্টা৬ লক্ষ ৩ হাজার ৯৮৭টি পরিবার।
এটা কোনও মামুলি খতিয়ান নয়। সরকার গঠনের পর একটি সিদ্ধান্তরূপী মজবুত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দিশাকে সামনে রেখে এগিয়ে চলার শপথের নামই বামফ্রন্ট সরকার। যা আজ তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ভুলিয়ে দিতে চাইছে, যে তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল কংগ্রেসের মধ্যে থাকা হিংস্র একটি অংশকে নিয়ে। দেশি, বিদেশি বামবিরোধী শক্তি, কর্পোরেটদের একটি অংশ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক শক্তির একটি বড় অংশ ৩৪ বছরের বাম-সরকারকে হটিয়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদসহ আদর্শহীন একটি দলকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছে। গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মাঝেই ১৯৭৮ সালে বাস্তুঘুঘুর বাসা ভেঙে দিয়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন হলো। জিতলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ, অসংরক্ষিত পদে দুশোর মতো মহিলা।
একদিকে গ্রামবাংলায় এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে প্রবল ভূমিকম্পে সব ওলট পালট হয়ে গেল। ওধারেরমানুষের হাতের ক্ষমতা এধারেরঅগণিত মানুষের হাতে এসে গেল। এর মাঝেই ১৯৭৮-এর বিধ্বংসী বন্যার মুখোমুখি সরকার। পঞ্চায়েত সরকার ও মানুষের মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ করল; ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ৮১৩ জনের মৃত্যুর হাহাকারের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
পঞ্চায়েত হলো ভরসার জায়গা। তখনতো মুখ্যমন্ত্রী সাঙ্গোপাঙ্গ, মন্ত্রী, আমলাদের নিয়ে জেলা চষে বেড়াতেন না। একহাতে সব দপ্তরও সামলাতেন না। নীতি নির্ধারণ করবে মন্ত্রীসভা। তদারকি করবেন প্রশাসক।
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসুর নির্দেশ ছিলগ্রামের একজন নেংটিপরা মানুষকে আপনি বলা, থানা বা সরকারি অফিসে গেলে চেয়ারে বসতে দেওয়া। এই শ্রেণিচেতনার সাথে আজকের ফারাক সহজেই অনুমেয়।
পঞ্চায়েতের বিরাট সাফল্য তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত গ্রামবাংলার চেহারা বদলে দিয়েছে। সমবায়, ল্যাম্পস, সেচ, বিদ্যুৎ, পাশাপাশি বীজ, মিনিকিট বিতরণ, খেতে না পাওয়া মানুষের জন্য কাজের বদলে খাদ্যকর্মসূচি সহায়তা দিয়েছে গরিব মানুষকে। আজকের মতো টাকা লুট হয়নি। বখরা নিয়ে প্রকাশ্য গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামনে আসেনি। কারণ ৩৪ বছরে গ্রামের মানুষের ধারাবাহিক অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারই ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছে। দরিদ্রতম ঘরের সন্তানেরা স্কুলে গিয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্র থেকে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আজও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ আছে। ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে উন্নয়নের কোনও চোখ ধাঁধানো প্রচার ছিল না। জনগণের সরকার একটি অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অস্বাভাবিক যা তা হলো পুরানো সমস্ত সাফল্যকে নষ্ট করে অথবা নিজের বলে আত্মসাৎ করা। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক দপ্তরের অর্থ অন্য দপ্তরে খরচ করে লাগামহীন উৎসব, মেলা, খেলা, ক্লাবের মধ্যদিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করা। মস্তানবাহিনী তৈরি করে গ্রামের নব্যধনী, তোলাবাজ, সিন্ডিকেটরাজ, প্রশাসনের একটি বড় অংশকে যুক্ত করে ভোট লুট করা। নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউ দিয়ে যোগ্য চাকরি প্রার্থীরা কাজ পাচ্ছে না।
বেলাগাম একটি সরকার চলছে। ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে বি জে পি-র নেতৃত্বে চলা কেন্দ্রীয় সরকার সংগত করে চলেছে। দুটি দলই আদ্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। ধর্মীয় মেরুকরণের পৃষ্ঠপোষক। দেশের পক্ষে ভয়ংকর বিপদ বি জে পি এবং তৃণমূল।
এরাজ্যে শিল্প, কলকারখানা বন্ধ অথবা বন্ধের মুখে। নতুন কোনও শিল্প স্থাপন হয়নি। কৃষিক্ষেত্রে ভয়ংকর সংকট। নজিরবিহীনভাবে এরাজ্যে কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। সারা দেশের মধ্যে নারী নির্যাতনে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। দুকোটি আর দশলক্ষ বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি কেন্দ্র, রাজ্য সরকারের ফাঁকা আওয়াজ। ভোটের আগে ধর্মের জারক রসে এরাজ্যের মানুষকে জারিত করছে। যার সবচেয়ে বড় শিকার মহিলারা। বামফ্রন্ট সরকার মর্যাদা দিয়েছিল নারী, আদিবাসী, তফসিলিদের। নারী সুরক্ষার অন্যতম শর্ত সমাজের সব ক্ষেত্রেই সমান মর্যাদা নিয়ে মহিলাদের উপস্থিতি। লোকসভা, বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের দাবিতে প্রগতিশীল মহিলা সংগঠনগুলি আন্দোলন করে আসছে। ৭৩তম সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হয়।
তার বহু পূর্বেই এরাজ্যে মহিলা, তফসিলি, আদিবাসী পেছিয়ে পড়া এই তিন অংশের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়। ধীরে ধীরে পদাধিকারী সংরক্ষণ-এর মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। এই যুগান্তকারী পরিবর্তন কোন মামুলি বিষয় নয়। যার ফলে   পথেঘাটে, অফিসে, স্কুল কলেজে, খেতখামার, ব্যাঙ্ক, আদালত সর্বত্র মহিলাদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অসংখ্য কাজের সুযোগ সংগঠিত, অসংগঠিত ক্ষেত্রে। আই সি ডি এস, আশা, এস এস কে, এম এস কে, মিড ডে মিল থেকে বিড়ি, দড়ি, তাঁত কত যে কাজ সৃষ্টি হয়েছিল। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মধ্যদিয়ে ১ কোটি নিরক্ষর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলা উৎপাদনের কাজে যুক্ত হয়েছেন। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাঁচার প্রেরণা বামফ্রন্ট সরকার দিয়েছিল।
আজ শুধু উন্নয়নের ঢক্কানিনাদে সাধারণ মানুষ বিমূঢ়। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকার অর্থনীতির যে দৃঢ় বনিয়াদ তৈরি করে গিয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে সৌন্দর্যায়ন, উপরিকাঠামোর রং বদলমাত্র। ভেতরে পোড়া ছাই। তাই গণতন্ত্র হত্যা, বাক্‌স্বাধীনতা স্তব্ধ করে দেওয়া, হামলা, মামলা, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে জেলে পাঠানো, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দখলের রাজত্ব চলছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির আক্রমণের সাথে মানুষের মনোজগৎকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ তলানিতে। মিডিয়ার অবিরাম প্রচার সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, একটা সাময়িক উচ্ছ্বাসের মধ্যে রেখে দেওয়া আজকের কর্পোরেট মিডিয়ার মূল লক্ষ্য। চা বাগিচায় মৃত্যু মিছিল, ডিজিটাল রেশন কার্ডের নামে প্রকৃত প্রাপকের নাম বাতিল। বিধবাভাতা, বার্ধক্যভাতা পাচ্ছেন না গরিব মানুষ। ১০০ দিনের কাজ ৩২ দিনে নেমেছে। মজুরি অনিয়মিত। ইন্দিরা আবাস যোজনায় ব্যাপক দুর্নীতি। আমাদের করের টাকায় যে প্রকল্প আসছে তার নাম বদলে নিজের বলে চালানোর মতো অনৈতিক কাজ এ সরকার করে চলেছে। সর্বত্র একটি চকচকে মুখের ছবি বদলে যাচ্ছে অবিরত। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে বাধ্য করছে মকর সংক্রান্তির দিন লোকশিল্পীদের মঞ্চে এনে (সবাই প্রকৃত শিল্পী নন) সরকারের বন্দনা গাইতে। নগদ মজুরি, ব্যাঙ্কে ১০০০০০ টাকা রাখা।
সর্বত্র ব্যক্তিগত উপভোক্তা তৈরি করে চলেছে এই সরকার।
এই অবস্থা বেশিদিন চলে না। স্বৈরতন্ত্র একদিন পরাস্ত হবে‍‌ই। একনায়কতন্ত্রীদের একদিন মানুষ ছুঁড়ে ফেলে দেবেনই। কন্যাশ্রীর ২৫ হাজার টাকা, ‘সবুজসাথীরসা‍‌ইকেল, ‘খাদ্যসাথীর রেশনে পচা চাল সরবরাহ, রূপশ্রীর মধ্যদিয়ে কন্যার রূপ আর তার শেষ পরিণতি বিবাহনামক পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলার চক্রান্ত, বিউটি পার্লারের আরও বেশি অর্থ অনুমোদন, রাস্তার ধারের মদের দোকান খোলার অনুমোদন, হাজার হাজার শিলান্যাস মানুষের মস্তিষ্ককে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ঠিক-বেঠিক হারিয়ে যেতে বসেছে। ভোগবাদী পণ্য সংস্কৃতি আজ গ্রাস করছে সমগ্র সমাজকে। যে কোনও মূল্যে নিজের ভালো চাই।
আমাদের লড়াই ‘‘আমরার’’ লড়াই। আমাদের লড়াই রাজ্য বাঁচানো, দেশ বাঁচানো, শ্রমজীবী মানুষের চুরি হয়ে যাওয়া অধিকার ফেরত পাবার লড়াই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে আমাদের মূল স্লোগান ‘‘বি জে পি হটাও, দেশ বাঁচাও, তৃণমূল হটাও রাজ্য বাঁচাও’’-এর সাথে দুটি শক্তিই যে একে অপরকে সাথি করে এরাজ্যে মানুষকে বোকা বানাতে চাইছেতা বোঝানো।
আমরাই পেরেছিলামআমরা পারবএই প্রত্যয় নিয়ে আমাদের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
তথ্যসূত্র: ফিরে দেখাবুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
লুঠের পঞ্চায়েতঅধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই

গণশক্তি, ৪ঠা এপ্রিল ২০১৮

20180226

আজকের জগৎ শেঠ ও আজকের মীরজাফর


শ্যামল চক্রবর্তী

যুদ্ধে পরাজিত করে দেশ দখলের নীতি এখন বদলে গেছে। যুদ্ধে না জিতেও দেশের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো আসল ক্ষমতা। ইতিহাসের দুই চরিত্র জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী-আম্বানির তুলনা এই লেখা।

বাংলার বণিকরা জগৎ শেঠের নেতৃত্বে ইংরেজদের দিয়ে সিরাজউদ্দোল্লাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সেই সময় বাংলা ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য। এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য গড়ে উঠেছিল সুবিস্তৃত বাজার। বাংলা ছিল সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে ভালো কৃষি ব্যবস্থার অধিকারী। ফরাসি বণিকরা বাংলাকে বলতেন জান্নাতুল বিলাত’, অর্থাৎ প্রদেশগুলির স্বর্গ। মুঘল ফরমানে তৎকালীন বাংলাকে ভারতবর্ষের স্বর্গহিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় বাংলায় একটি ব্যাঙ্কিং বাণিজ্য গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এই জমিদার বণিক শ্রেণিকে বণিক রাজা বলা হতো। নবাবি দরবারে তারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়ে যায়। এই প্রভাব বলয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল জগৎ শেঠ পরিবারের। এরা পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। জগৎ শেঠ ছিল একটা উপাধি। মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ারের এক ফরমান বলে জগৎ শেঠকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বাঁ পাশের আসন গ্রহণে ক্ষমতা বা মর্যাদা দেন। নবাব যেন তার কথা উপেক্ষা না করেন সেই মর্মে ফারুখশিয়ার ফরমানও জারি করেন। পদমর্যাদায় জগৎ শেঠ নবাবের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। ২০০০ ঘোড়সওয়ার তার বাড়ি পাহারা দিতো (অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদ্দৌলা, দে ১৮৯৭ পৃঃ ১১৭)
জগৎ শেঠের উদ্দেশ্য কী ছিল? জগৎ শেঠ এবং অন্যান্য বণিকদের হাতে এত  সম্পদ জমে গিয়েছিল যে তৎকালীন সময়ে অতিরিক্ত বাজার ছিল না। তাই বাজার পাওয়ার জন্য জগৎ শেঠরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারফত দেশের অন্যত্র এবং বিদেশের সঙ্গেও বাণিজ্য করতে চাইল। কিন্তু তাদের সে আশায় বাধ সাধলেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজরা কলকাতা এবং তার চারপাশে একটি দস্তকবা মোগল বাদশাহদের অনুমতিপত্র নিয়ে এখানে বিনা শুল্কে ব্যবসা করত। তারা বিনা শুল্কে ব্যবসা করত কিন্তু বাংলার ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় শুল্ক দিতে হতো। এই অসম ব্যবস্থায়  রাজকোষের ক্ষতি হতো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও বিপন্ন হতো। সিরাজদ্দৌলার মনোগত ইচ্ছা ছিল ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু হাত-পা বাঁধা ছিল। কারণ ফরমান ছিল দিল্লির বাদশাহের।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা মোঘল বাদশাহের দেওয়া দস্তকের (বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি পত্র) অপব্যবহার করে। কোম্পানির অফিসাররা দস্তক অপব্যবহার করে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও ব্যবসা শুরু হয়।  এরফলে রাজস্বের ভীষণ ক্ষতি হয়। বিনা শুল্কে বাণিজ্য চালাতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা এটাই বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলার স্বার্থে। কিন্তু জগৎ শেঠদের চাহিদা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের নিজস্ব ব্যবসা বাণিজ্যকে প্রসারিত করা এবং সঞ্চিত ধন সম্পদের অনেক বেশি লাভজনকভাবে  ব্যবহার করা। সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে দিতে চাইছিলেন না। এজন্য তিনি দুর্গ তৈরি করতে নিষেধ করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মীরজাফরকে সিংহাসনে বসানো হয়। কারণ মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ইংরেজদের সেই সুযোগ দেবেন। ইতিহাস বলছে মীরজাফর ক্লাইভকে তার হাত ধরে সিংহাসনে বসিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। তারপর ব্যবসা বাণিজ্য সবটাই তো ইংরেজদের দখলে চলে গেল।
ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করবার অধিকার নিয়ে সিরাজদ্দৌলার মনোবেদনা থাকলেও তিনি বিনা শুল্কের অধিকার কেড়ে নিতে পারেননি। কারণ দিল্লি বাদশাহের ফরমান। তিনি চেয়েছিলেন দস্তকের অপব্যবহার রুখতে। আজ ২৫০ বছর পর আজকের জগৎ শেঠরা, আদানি, আম্বানি প্রভৃতিরা একইরকমভাবে নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে চাহিদা অনুযায়ী দেশের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছে। কাজে নিজেরা বিদেশিদের তাঁবেদার হতে চেয়েছে। জগৎ শেঠরা যেমন নিজেদের স্বার্থে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তেমন করে আদানি আম্বানিরা মোদীকে ভারতের সিংহাসনে বসিয়েছে। বিদেশি বণিকদের সুবিধার জন্য দশ হাজার পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।অপরদিকে ‘‘মেড ইন ইন্ডিয়া’’ নাম দিয়ে ভারতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত অন্তঃশুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় ভারতের মাঝারি ছোট শিল্পপতিদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন, সংকট সারা দেশজুড়ে।
সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ তৈরি করতে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরা ভারতে বিমানঘাঁটি-নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে, যৌথ বিমান মহড়া হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাজেটিক সামরিক চুক্তি করছে, যুদ্ধবাজ ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, ট্রাম্পের ড্রাম বাজাচ্ছে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে।   কর্পোরেট সংস্থাগুলো এই প্রথম একযোগে পরিকল্পনা করে নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তথাকথিত ভাইব্র্যান্ট গুজরাটে সম্মেলনে মোদীই তাদের উপযুক্ত প্রার্থী বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন মীরজাফর বসেছিল ক্ষমতায় এবং ইংরেজদের সব আবদার পূরণ করত, তেমনি মোদীও সাম্রাজ্যবাদের সব আবদার রাখার জন্য ভারতের দরজা খুলে দিয়েছে। চীনকে ঘিরে ফেলার জন্য জাপান-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে। আদানি-আম্বানি অন্যান্য কর্পোরেটদের অবাধ লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। কংগ্রেস আমলে কর্পোরেটদের আক্ষেপ ছিল যে মনমোহন সিংয়ের আমলে সংস্কারের কাজ অর্থাৎ কর্পোরেট লুটের সুযোগ করে দেওয়ার কাজ খুব শ্লথ গতিতে হচ্ছিল। মোদীকে দিয়ে সেই গতিকে ত্বরান্বিত করিয়ে নিচ্ছে। তবে একটাই পার্থক্য ভারতীয় শিল্পপতিরা নিজেদের শিল্পের বাজারও পাচ্ছে। এবং কিছু স্বাধীনভাবেও পাচ্ছে। একেবারে বিদেশিদের দারোয়ান হয়ে যায়নি। বিশ্বস্ত মোদী নিষ্ঠার সঙ্গে কর্পোরেটদের ইচ্ছাপূরণ করে চলেছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দস্তক পেল কি করে?
দেশীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দিল্লির বাদশাহের এই ফরমান বা দস্তক পাওয়ার দুটো ইতিহাস আছে। বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার এই ফরমান ইংরেজরা পেল মোগল সম্রাটদের কাছ থেকে।
১৬৪৪ সাল শাহজাহানের রাজত্বে তাঁর প্রিয় এক কন্যা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তৎকালীন ভারতীয় চিকিৎসকরা তাকে নিরাময়ে ব্যর্থ হন। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জেন Gabriel Bughton ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হোপওয়েল জাহাজের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি নবাব কন্যাকে সারিয়ে তুললেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি চাইলেন ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করবার কারখানা তৈরি করবার অনুমতি। এর আগে অনেক নিয়ন্ত্রণ রেখে ব্রিটিশদের ব্যবসা করতে হতো, তাতে লাভ হচ্ছিল না। অনুমতি পাওয়া গেল। এই সময় আবার বাউটন বাংলায় এলেন দিল্লির সম্রাটের ফরমান নিয়ে। সুলতান সুজা তখন বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত।
সম্ভবত কোন একজন বেগমের অসুখ বাউটন নিরাময় করে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ব্রিটিশদের বাংলায় স্থায়ীভাবে বাণিজ্য কারখানা করার অনুমতি দিলেন। এই সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেকগুলি কারখানা খুলে ফেলল। বছরে খুব সামান্য তিন হাজার টাকা করের ভিত্তিতে কার্যত প্রায় বিনা শুল্কে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা শুরু করলো। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুবে বাংলার নবাব ছিলেন শায়েস্তা খান। শায়েস্তা খানের চাপে জব চার্নক মাদ্রাজে (চেন্নাই) চলে গেছিলেন। কিন্তু বাংলার পরবর্তী নবাব ইব্রাহিম খানের আমন্ত্রণে জব চার্নক কলকাতায় সুতানুটিতে বসতি স্থাপন করেন। তারপর নানাভাবে হাত বদলে আলিবর্দী খান পরে তার দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলার হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেবের দৌহিত্র ফারুকশিয়ার  নিজের রাজত্বকালে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজপুতানার রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ব্রিটিশ ডাক্তার হ্যামিলটনের চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করেন। হ্যামিলটন বাংলায় ইংরেজদের পাওয়া সুবিধাকে আরও বৃদ্ধি করার আবেদন জানান আর ফারুক শিয়ারের কাছ থেকে গঙ্গার দুপারের ৩৮টি গ্রামের জায়গির লাভ করেন মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশাল তৈরি করেন। ইতিমধ্যে কলকাতা একটি বড় বন্দর নগরী হিসেবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বাদশাহ ফারুক শিয়ার জগৎ শেঠকে অপরিসীম অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন।

আদিম সঞ্চয়ের জন্য লুট
ইংরেজরা বাংলায় ঢুকেই অবাধ লুটের ব্যবস্থা করল। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের জন্য আদিম পুঁজি সংগ্রহ করা হয়েছিল ভারতসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলি লুট করে। মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে আদিম পুঁজির সঞ্চয় বলেছেন যে, উপনিবেশগুলিকে লুট করেই আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে আমেরিকার বাজারে দাস হিসাবে বিক্রি করে প্রচুর সোনা রূপা নিয়ে আসত। সেই অর্থ এবং ভারত এশিয়া-আফ্রিকার অন্যান্য উপনিবেশ থেকেও ধনসম্পদ লুট করে ইংল্যান্ড ইউরোপের শিল্পায়নের জন্য পুঁজি জোগাড় হয়। বঙ্গ প্রদেশ থেকে টাকা লুট হয়, বিনা শুল্কে ভারতের পণ্যদ্রব্য অন্যান্য উপনিবেশগুলোতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়, এছাড়া রাজস্ব আদায় করা হয় নির্মমভাবে। এর ফলে বাংলা-বিহারের বিশাল অংশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষ ৭৬- মন্বন্তর নামে পরিচিত।
জওহরলাল নেহরু, ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া (১৯৮৬ সংস্করণ, পৃঃ ২৯৭) গ্রন্থে বলেছিলেন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের প্রচার ছিল যে, মুসলমান শাসনের দুর্দশা দূর করে পলাশির যুদ্ধের পর যে ইংরেজ শাসন শুরু হলো তাতে বাংলা নাকি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। নতুন জাতীয়তাবাদী ইতিহাস দেখিয়ে দিল যে, বরং‍‌ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছিল, ক্লাইভ হেস্টিং- লুটপাটের ফলেই বাংলায় ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটেছিল (১৭৭০) তৎকালীন বাংলা বিহারের প্রায় তিনভাগের একভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছিলেন।
নেহরু আরও বলেন (ডিসকভারি ২৯৭, ২৯৮) বাংলা লুট করে তার অর্থেই আদিম সঞ্চয় হিসাবে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল এই সত্যের উন্মোচন শুরু হয়েছিল দাদাভাই নত্তরোজির ১৯০১ সালে প্রকাশিত বই (পভার্টি অ্যান্ড অল ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) এবং নতুনভাবে বিকশিত হয় রজনীপাম দত্তের ইন্ডিয়া টুডেগ্রন্থে। এই চিন্তায় নতুন অবদান রচনা করেন বিপানচন্দ্র পাল রাইজ অ্যান্ড গ্রোথ অফ ইকনমিক ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া (নিউদিল্লি, ১৯৬৬) বইটিতে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের অপব্যাখ্যা থেকে ভারতের ইতিহাসকে মুক্ত করেছেন। এখন ভারতের ইতিহাস অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
উৎসা পট্টনায়ক তাঁর এক লিখিত প্রবন্ধে বলেছেন ১৭৬০ সাল থেকে ১৮২০ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রভূত পরিমাণে অর্থ জমা হয়। সবই হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশ লুটের টাকা। এই অর্থ ইংল্যান্ডের শিল্প স্থাপনের কাজে লাগে। উৎসা পট্টনায়ক অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে একে বলেছেন বিনি পয়সার ভোজ (ভারততত্ত্ব, এন বি , সুকুমারী ভট্টাচার্য সম্মাননা গ্রন্থ)
বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন সারা দুনিয়াব্যাপী যে লুঠ হচ্ছে একেও আদিম সঞ্চয়ের মতো শোষণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমার দেশ ভারতেও এখন আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের সময়ের মতই  বেপরোয়া লুট করে মানুষকে নিঃস্ব করা হচ্ছে।
আকাশ বিক্রি হয়ে গেল। আকাশ বিক্রি হওয়ার প্রক্রিয়াতে ,৭৬,০০০ কোটি টাকা। বিদেশিদের হা‍‌তে এখনকার সময়ের দস্তক দিয়ে দিয়েছেন ভারত সরকার, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি সংস্থায় অঙ্গীভূত হওয়ার জন্য। একেই বলে বিশ্বায়ন। ভুবনগ্রামের অর্থ হলো বিনা শুল্কে অন্যদেশে বাণিজ্যের অধিকার। ভারতে ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।খনি দুর্নীতিতে আরও বেশি টাকা লুট হলো। কর্ণাটকে খনি দুর্নীতিমধ্য প্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারি, মহারাষ্ট্রের আবাসন কেচ্ছা এসবের মধ্যে দিয়ে লুট চললো অব্যাহতগতিতে। পশ্চিমবাংলাও পিছিয়ে নেই। বি জে পি-তৃণমূল পরোক্ষ আঁতাতের সুযোগে তৃণমূল সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা চিট ফান্ডের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করল।  এসব কিছু যেন আদিম পুঁজিরই মতো লুটপাট করে সংগৃহীত হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ ভিখারি হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া, জনগণের নির্ভরতা পেনশন ফান্ড শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া, নোট বন্দী করে কালো টাকা উদ্ধারের নামে ব্যাঙ্কে সব ৫০০-১০০০ টাকার পুরানো নোট বাতিল করে নতুন নোট নিতে বলা হয়। সেখানে রোদে লাইন দিতে ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মোদীর মন্তব্য ছিল কালো টাকা সন্ত্রাসবাদীরা ব্যবহার করছে। নোট বন্দির ফলে কালো টাকা তারা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল উলটো। কালো টাকা সাদা হয়ে গেল। আসলে কালো টাকাকে সাদা করে দেওয়া হলো এই প্রক্রিয়ায়। সন্ত্রাসবাদী উৎপাত কমলই না। বরং সীমান্তে হামলা বাড়লো, আমাদের সেনাবাহিনীর জীবন ক্ষয় হতে থাক‍‌ল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। এরপরে নিয়ে আসা হল জি এস টি। ছোট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জি এস টি  ব্যবসায়ীদের নিচের অংশটা  নিঃস্ব হতে শুরু করল।
সম্প্রতি মোদী সরকার লোকসভায় তাড়াহুড়ো করে এফ আর ডি আই বিল পাশ করাতে চাইছে। কর্পোরেটদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ধার দিয়েছ মন্ত্রীসভার আনুকূল্যে। সেই ধার তারা শোধ ‍‌রেনি এমনকি সুদও দেয় না। ব্যাঙ্কের টাকায় শতকরা ৮৫ ভাগ কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তদের সঞ্চিত টাকা। ফলে ব্যাঙ্কগুলোকে এখন রুগ্ দেউলিয়া করে নানা কায়দায় ব্যাঙ্কে জনগণের গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। আজকের জগৎ শেঠরা-আদানি-আম্বানি-জিন্দল-মিত্তাল-গোয়েঙ্কা কর্পোরেট নিজেরা তো বটেই সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনার হয়ে লুটের ছোট তরফ বনতে চাইছে। ফলে এখন তারা পররাষ্ট্র নীতিকেও প্রভাবিত করছে। এখন তো আর জোর করে দেশ অধিকারের দরকার হয় না। দেশের অর্থনীতি রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই তা সম্ভব। মীরজাফর নতুন মুখোশ নিয়েছে, আর জগৎ শেঠের দলও আদানি-আম্বানি চেহারা চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই নতুন জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরদের বিরুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত লড়াই ছাড়া আর কোন গতিপথ নেই। জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডে পালটে যায়।
গীতায় কৃষ্ণ বলেছিলেন দুর্বৃত্ত দমনের জন্য সৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করবো। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সম্পদ লুটপাট করে নিঃস্ব করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য জগৎ শেঠরাও বারবার জন্মগ্রহণ করছেন। জগৎ শেঠরা যুগের আদানি-আম্বানি অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। সঙ্গে সহজন্ম নিয়েছেন তখনকার মীরজাফর আজকের নরেন্দ্র মোদী। তাই এই মুহূর্তে লুটপাট চালিয়ে ভারতের আদানি, আম্বানি, মিত্তাল, জিন্দাল, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কা প্রমুখ শতকরা ভাগ মানুষের হাতে ৭৩ ভাগ সম্পদ জমা হয়েছে।
রাজদণ্ড এখন তাদেরই হাতে।

গণশক্তি, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮