20180701

আক্রমণ বহুমুখী গণপ্রতিরোধই একমাত্র বিকল্প


সূর্য মিশ্র

আজকের দিনে বামপন্থীদের রাজনৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বুঝতে হলে বর্তমান পরিস্থিতিকে আগে ভালো করে বুঝে নিতে হবে। একটা অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা চলেছি।  একথা শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতেই সত্য নয়, সারা দেশে এবং সারা দুনিয়ার পরিস্থিতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের দেশের শুধু বামপন্থীদের কাছেই নয়, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক সমস্ত শক্তির কাছেই এত বড় চ্যালেঞ্জ আগে কখনো আসেনি। সারা দুনিয়াতেও যারা বামপন্থার জন্য লড়ছেন, গণতন্ত্র প্রসারের জন্য লড়ছেন তাঁরাও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এমন পরিস্থিতি কখনও দেখেননি। পরিস্থিতির এই জটিলতা এবং তা কতো কঠিন তা গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করতেই হবে। তা না হলে আমরা কীসের বিরুদ্ধে লড়ছি, বেড়ালের সঙ্গে নাকি হায়নার সঙ্গে লড়ছি তা না বুঝে লড়াইয়ের জন্য নিজেদের ঠিকভাবে প্রস্তুত করতে পারবো না। বাস্তবকে ঠিকমতো বুঝে না নিলে প্রত্যাশার সঙ্গে মিলবে না, হতাশা গ্রাস করবে।
*********
অতীতে আমরা বহু আক্রমণ সন্ত্রাস দেখেছি, এরাজ্যেও দেখেছি, সারা দেশেও দেখেছি। জরুরি অবস্থা দেখেছি, পশ্চিমবঙ্গে আধা ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাস দেখেছি এবং আরও অনেক অত্যাচার দেখেছি। কিন্তু এখন যা ঘটছে তা সেসবের থেকেও অনেক বড় আক্রমণ। অনেক ব্যাপকতর এবং তীব্র। সাতের দশকে সন্ত্রাস রাজ্যের সব জেলায় ছিল না, কয়েকটি জেলায় সীমিত ছিল। এখন তা সারা রাজ্যে ব্যাপ্ত। রাজ্যের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত, নাগরিক অধিকার আক্রান্ত। পঞ্চায়েত নির্বাচনে আমরা সারা রাজ্যেই সন্ত্রাস দেখেছি। ব্যাপকতম এলাকাজুড়ে নজিরবিহীন সন্ত্রাস চলেছে। প্রায় প্রতিটি জেলায় ব্লক অফিস, মহকুমাশাসকের অফিস এমনকি জেলাশাসকের অফিসগুলিও শাসকদলের সমাজবিরোধীরা পুলিশ প্রশাসনের প্রশ্রয়ে দখল নিয়েছে। মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হয়েছে, তারপরে প্রত্যাহারের জন্য কেবল প্রার্থী নয় শিশু মহিলা সহ তাঁদের পরিবার পরিজনদের ওপর আক্রমণ হয়েছে, ভোটের দিনে ভোট লুট করতে এবং সবশেষে ভোট গণনার দিনে গণনাকেন্দ্রেও ছাপ্পা ও আক্রমণ হয়েছে। যত ভোট পড়েছে তার চেয়ে বেশি ভোট গণনা হয়েছে, জয়ী প্রার্থীকে সার্টিফিকেট দিয়ে দেওয়ার পরেও ফের গণনার নামে শাসকদলের প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। এমন আক্রমণ সন্ত্রাসের কোনও নজির আমাদের রাজ্যে তো বটেই সারা দেশের কোথাও নেই।
*********
ব্যাপক এবং তীব্র হলেও সন্ত্রাসই কিন্তু বর্তমান সময়ের একমাত্র বিষয় নয়। এমনকি মুখ্য বিষয়ও নয়। দৈহিক আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেয়ে মনোজগতে আক্রমণ মোকাবিলা করা অনেক কঠিন। মিথ্যার মোহজালে যুক্তিবাদ বাঁধা পড়লে যুক্তিহীন মেরুকরণ ও বিভাজনের রাজনীতির উত্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। বোধবুদ্ধিহীন উন্মাদনায় মেহনতি মানুষের ঐক্যকে ভেঙে ভ্রাতৃঘাতী বিদ্বেষ ও অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি করতে পারলে রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন ও সন্ত্রাসের প্রয়োজন হয় না। সাতের দশক এবং অতীতের থেকে বর্তমান পরিস্থিতি আলাদা হওয়ার অন্যতম কারণ এখন বহুমাত্রিক মেরুকরণের রাজনীতি চলছে। সারা দেশের সঙ্গে আমাদের রাজ্যেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ করা হচ্ছে ধর্মকে ব্যবহার করে। ধর্মের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনও সম্পর্ক নেই, পৃথিবীর কোনও ধর্মে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষের কথা বলা নেই। তবুও ধর্মকে বাহন করেই সাম্প্রদায়িকতা আক্রমণ হানে। সম্প্রতি কাশ্মীরে মেহবুবা মুফতির সরকারকে ফেলে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে কেন্দ্রের বি জে পি সরকার। কাশ্মীরের মানুষের বিরুদ্ধে তারা কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এই আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ আছে যে কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে এবং আগামী লোকসভা নির্বাচনের আগে দেশে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের চেষ্টা হবে। কেন্দ্রে বি জে পি সরকার আসার পরে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল সরকারের চার বছরের সময়কালে এরাজ্যে আর এস এস-এর শাখার সংখ্যা ১১গুণ বেড়েছে। এছাড়াও তাদের অজস্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন নামে বেনামে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। খোলা চোখে এদের দেখা না গেলেও সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কাজ তারা করে চলেছে। আর তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতায় নেমেছে। কে বেশি রামভক্ত তা দেখাতে রামনবমীর প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কে বেশি হনুমানভক্ত তার প্রতিযোগিতায় হনুমানজয়ন্তী পালন হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।


শুধু সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ নয়, এখন বহুমাত্রিক মেরুকরণ করা হচ্ছে মানুষের নানা সত্তাকে ঘিরে। ভাষা নিয়ে কীভাবে মেরুকরণ ঘটানো যায় তা আমাদের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই দেখিয়েছেন পাহাড়ে। সেখানে তিনিই প্রথম আগুন জ্বালান বাংলা ভাষা বাধ্যতামূলক করে চাপিয়ে দিয়ে। একইভাবে উত্তরবঙ্গে কামতাপুরী এবং রাজবংশী ভাষার স্বীকৃতির নামে উসকানি চলছে। একটাই ভাষা কিংবা উপভাষা কিন্তু সেটাকে দুটি নামে দাবি করা হচ্ছে, আর মুখ্যমন্ত্রী তাতেই প্ররোচনা দিয়ে দুটি নামেরই স্বীকৃতি দিয়েছেন। আদিবাসীদের মধ্যে আর এস এস খুবই সক্রিয় হয়ে উঠেছে, এমনকি আদিবাসীদের ভিতরের গোষ্ঠীগুলির ফারাক তুলে এনে তারা ভেদাভেদ চাগিয়ে তুলছে। সব অংশের আদিবাসীরাই ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম করেছে, কিন্তু আর এস এস সাঁওতালদের সঙ্গে মুণ্ডাদের প্রভেদ করছে। হুল তথা সাঁওতাল বিদ্রোহের সঙ্গে উলগুলান তথা মুণ্ডা বিদ্রোহের ফারাক নিয়ে রাজনীতি করছে। এক অংশের বিরুদ্ধে আরেক অংশকে লাগানোর এই কৌশল তারা উত্তর প্রদেশে দলিত এবং ও বি সি-দের নিয়েও করেছে। এরাজ্যের আসানসোলে হিন্দিভাষীদের ও বাংলাভাষীদের মধ্যে বিরোধ বাধানো হচ্ছে। এসবের ওপর ভিত্তি করে রাজনৈতিক মেরুকরণও ঘটানো হচ্ছে। ‘এখন তৃণমূলকে হটানোর মুরোদ বামপন্থীদের নেই, অতএব বি জে পি-কে লাগবে।’ এই প্রচারের মাধ্যমে বলা হচ্ছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে যারা লড়তে চাও মতাদর্শ ছেড়ে সবাই একজোট হয়ে যাও। এর বিপরীতে তৃণমূলই বাংলায় বি জে পি-কে ঠেকাতে পারবে এইরূপ আরেকটি মিথ্যার মোহজাল নির্মাণ করা সহজ।
এই সমস্ত ঘটনা ঘটছে এমন একটা সময়ে যখন সারা বিশ্ব ২০০৮ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দার হাত থেকে রেহাই পায়নি। দশবছর ধরে চলতে থাকা এই মন্দার সঙ্গে প্রায় নব্বই বছর আগের মহামন্দার তুলনা করা চলে যার প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটেছিল। এখনও মন্দার কারণে ক্রেতা নেই, শিল্পোৎপাদন প্রায় স্তব্ধ। সারা দুনিয়ায় অর্থনীতিতে বিশৃঙ্খলা, বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে। আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তি নির্বাচিত হয়েছেন, ইংল্যান্ড ব্রেক্সিটের পথে চলে যাচ্ছে। জি সেভেনের বৈঠকে বাজার দখলে রাখতে কর বসানো নিয়ে বিরোধ চরমে উঠেছে। ৮০বছর আগের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের ইতিহাসকে এই পরিস্থিতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। আমরা এখনই একথা বলতে পারি না যে আবার একটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে চলেছে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের মধ্যে যে বোঝাপড়াটা ছিল সেটা আর আগের মতো নেই, তাতে গুরুতর ফাটল দেখা দিয়েছে।
আমাদের দেশেও নরেন্দ্র মোদীর আমলে দেশজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হচ্ছে। কাজ নেই, শিল্পে, কৃষিতে সংকট চলছে, ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকরা আত্মহত্যা করছে, রেগায় কাজ কমছে, শ্রমিকের মজুরি কমছে, কাজের কোনও নিরাপত্তা নেই। মোদী সরকার আসার আগে দেশের ১শতাংশ ধনীদের হাতে দেশের ৪৯শতাংশ সম্পদ ছিল। এখন তা ৭৩শতাংশ হয়ে গেছে। সম্পদের দ্রুত কেন্দ্রীভবন ঘটছে। নীরব মোদী, বিজয় মালিয়ারা ব্যাঙ্কের ১১হাজার কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। অমিত শাহের ছেলের সম্পত্তি ১৬হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এরাজ্যে ভাইপোর সম্পত্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে চোখ ধাঁধিয়ে। সারদা নারদ কেলেঙ্কারি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের হেলদোল নেই। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠায় ক্ষোভ তীব্র হচ্ছে। গণবিক্ষোভের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেই নানা ধরনের মেরুকরণের মাধ্যমে মানুষকে ভাগ করার দরকার হয়ে পড়েছে শাসকদের। এভাবেই উগ্র দক্ষিণপন্থা সহ নানা ধরনের ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান ঘটে।
মানুষের জীবনের দুর্দশা এবং তাঁদের ক্ষোভই এই সময়ের সত্য, কিন্তু সেই সত্যকে চাপা দিতে মিথ্যার প্রচার চলছে। মনোজগতের ওপরে আক্রমণের এই প্রক্রিয়ার জন্য এটাকে পোস্ট ট্রুথ বা ‘উত্তর-সত্য’ বলা হচ্ছে। মিথ্যাকে বার বার বলো, বেশি বেশি করে বলো, বড় বড় মিথ্যা বলো, তাহলে মানুষ সেটাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করবে এবং যে বলছে সে নিজেও একসময়ে সেটাকেই সত্য বলে বিশ্বাস করা শুরু করবে। গোয়েবলসের এই তত্ত্বকেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী এবং মুখ্যমন্ত্রী অনুসরণ করে চলেছেন। মিথ্যার নির্মাণ করা হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে। তারা ক্রমাগত বি জে পি এবং তৃণমূলের মধ্যে লড়াইকে দেখিয়ে চলেছে, আর প্রচার করছে বামপন্থীরা মুছে গেছে। তৃণমূল এবং বি জে পি-র মধ্যে মেরুকরণের মিথ্যা নির্মাণের জন্য বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে বামপন্থী পরিচয় দিয়ে সঙ্ঘীরাই বলছে ‘আমি আর এস এস তথা কেন্দ্রের সরকারের ঐ বি জে পি নই, আমি বামপন্থীই আছি। কিন্তু এখন বি জে পি-র পথে হেঁটে তৃণমূলকে হটাতে হবে, তারপরে আবার আমরা বামপন্থী হয়ে বি জে পি-কে হটাবো।’ বলা বাহুল্য এটা আরেকটা বৃহদাকার মিথ্যা। উলটোদিকে আরেকপক্ষ একইসময়ে বি জে পি-র হাত থেকে বাঁচানোর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অন্যদের তৃণমূলের পাশে জড়ো করছে। এভাবে মিথ্যায় অন্ধ করে দিয়ে উন্মত্ত দাঙ্গায় শামিল করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক লড়াই করা যায় না। শুধু বাহুবলে তৃণমূলকে হারানো যাবে না, বি জে পি-কেও হটানো যাবে না। তার জন্য চাই যুক্তি-মতাদর্শ, মনোবল এবং জনবল। সেগুলি বর্জন করে আমরা বামপন্থীরা কোনও মিথ্যার উন্মত্ততার স্রোতে ভেসে যেতে পারি না।
**********

কিন্তু এতকিছুর পরেও এখনও পর্যন্ত আমরা এরাজ্যের মানুষকে কেন এই সত্য বোঝাতে পারছি না? মানুষকে সঙ্গে না নিয়ে আমরা কোনও পরিবর্তনই করতে পারবো না, তাই এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের গুরুত্ব দিয়েই ভাবতে হবে। জনগণের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে তাঁদের হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে মুক্তো তুলে আনার মতো করে তাঁদের মনের কথা তুলে আনতে হবে। এইখানেই জনগণের মধ্যে পার্টির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের প্রয়োজন। পার্টির রাজনৈতিক স্লোগান যতক্ষণ না জনগণ গ্রহণ করছে ততক্ষণ পার্টি জনগণকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিতে পারে না। আমরা গত চার বছর ধরে ‘তৃণমূল হটাও-বাংলা বাঁচাও, বি জে পি হটাও- দেশ বাঁচাও’ এই স্লোগান দিয়ে চলেছি। কিন্তু জনগণ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় শেখে। আমরা যদি বারবার সত্য কথাটা বলে যাই তাহলে একদিন জনগণ সত্যটাই বুঝবে এবং তাঁরাই বলবেন যে বামপন্থীরাই তো বরাবর সত্যিটা বলে এসেছেন। আমরা মার্কসবাদীরা প্রকৃত সত্যের ওপরে নির্ভর করেই চলি, মার্কসের ভাষায় ‘ভ্রান্ত চেতনা’র ওপরে নির্ভর করে নয়। মার্কসবাদ সর্বশক্তিমান কারণ তা সত্য। কিন্তু মানুষ অনেক সময়েই প্রকৃত সত্যকে সাময়িকভাবে বুঝতে পারেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্য বড় নাকি চাঁদ বড় তা বোঝা যায় না। আপাতভাবে ছোট ছোট তারাদের দেখে বোঝাও যায় না সেগুলি গ্রহগুলির থেকে তো বটেই এমনকি সূর্যের থেকেও বহুগুণ বড়। পৃথিবী যে সূর্যের চারিদিকে ঘুরছে সেই সত্য বলার জন্য গ্যালিলিও থেকে ব্রুনো কতজনকে কত অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিলো তা সবাই জানি। কাজেই সত্য বলার জন্য বিশেষ জ্ঞান ও দৃষ্টি লাগে এবং সত্য বলার জন্য সংগ্রাম করতে হয়। আমাদের পার্টিকেও সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য, রাজনৈতিক নেতৃত্বদানের ক্ষমতা অর্জনের জন্য মতাদর্শকে আয়ত্ত করে তার সঠিক অনুশীলন করতে হবে। শাসকের মোহজালে মানুষ আবিষ্ট হয়ে থাকলে সঠিক পথ খুঁজে পাবে না, কেবল উদভ্রান্তের মতো এদিকে ওদিকে ছুটে বেড়িয়ে হোঁচট খাবে। তাই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আমাদের নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে হবে, যা যা রাজনৈতিক অস্ত্রে নিজেদের সজ্জিত করতে হয় তাই করতে হবে। পরিস্থিতি কঠিন বলে হতাশার কোনও জায়গা নেই, বরং এই কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকেই আজকের দিনের প্রয়োজনীয় শিক্ষাকে শিখে নিতে হবে। লড়াই যদি কঠিন না হয় তাহলে সেই লড়াই করায় কৃতিত্ব কীসের!
শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বে হবে না, সাংগঠনিক নেতৃত্বও চাই। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বকে সমান তালে এগতে হবে। শুধু তত্ত্বজ্ঞানে চলবে না, তত্ত্বকে প্রয়োগ করতে হবে লড়াইয়ের ময়দানে। কার্ল মার্কস তো শুধু দুনিয়াকে ব্যাখ্যা করার কথা বলেননি, তিনি দুনিয়াকে বদলানোর কথা বলেছিলেন। তাই মানুষের আদায়যোগ্য দাবিকে তুলে ধরে লড়াই করতে হবে, রেশন কার্ড, একশো দিনের কাজের বকেয়া মজুরিসহ আদায়যোগ্য সব দাবিকে আদায় করে ছাড়তে হবে। তার জন্য পার্টির শাখাগুলিকে সক্রিয় করতে হবে। সংগ্রাম ছাড়া সংগঠন থাকে না, সংগ্রামের পথেই সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হবে। কেন এখনও সব জায়গায় বুথ সংগ্রাম কমিটি গড়ে তুলতে পারবো না? শাখার দুর্বলতার দায় কেবল শাখায় চাপিয়ে দিলে চলবে না, শাখাকে সক্রিয় করার দায়িত্ব উপরের কমিটিকে নিতে হবে। আমাদের পুরানো নেতারা বলতেন, গোরুর গাড়ির চাকা কাদায় আটকে গেলে গোরুকে শুধু খোঁচা মারলে হয় না। গাড়ি থেকে নেমে গাড়োয়ানকে কাঁধ লাগিয়ে চাকাকে ঠেলে দিতে হয়। এই কাজ উপরের কমিটির নেতাদের করতে হবে। এরজন্যই তো আমরা সংগঠনকে পুনর্গঠিত করে এরিয়া কমিটি গঠন করেছি। কমিটিগুলিতে বয়সের গড় কমানো হয়েছে। পুনর্গঠনের কাজ অত্যন্ত দ্রুততায় করতে আমরা কিছুটা এগিয়েছি। বাকি কাজও দ্রুত করতে হবে, নষ্ট করার মতো সময় আমাদের নেই।
*********

কঠিন পরিস্থিতির উল্লেখ দিয়ে এই নিবন্ধের শুরু। শেষ হবে এই পরিস্থিতির মধ্যেই থাকা চমৎকার উপাদানগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এমন চমৎকার বিপ্লবী পরিস্থিতি কবে সৃষ্টি হয়েছিল? চারিদিকে সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটতে ঘটতে মানুষের দুর্দশা চরমে পৌঁছেছে, গণবিক্ষোভের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং তা দমন করতে শাসকের আক্রমণ তীব্র হওয়ায় প্রতিরোধও তীব্র হচ্ছে। আমরা যদি বিপ্লবী হই তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে সুযোগগুলিকে দেখতে পাবো না? সন্ত্রাস আক্রমণের এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও রুপালি রেখা হলো জনগণের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের ঘটনাগুলি। ঘন কালো মেঘের গর্জনের পিছনে সেই রুপালি রেখাকে অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে। বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যে আটশোর বেশি এলাকায় আমাদের কমরেডরা মানুষকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিরোধে ছিলেন, রক্ত ঝরেছে, আমাদের অন্তত দশজন কমরেডের প্রাণ গিয়েছে তবু কেউ লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে যাননি। গত সাত বছরে এমনটা এই প্রথম। শহীদের তালিকায় চোখ রাখলেই দেখা যাবে গরিব আদিবাসী, তফসিলি জাতির মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের নামই বেশি। গরিব বলেই এই মানুষজন লড়াইয়ের সামনের সারিতে রয়েছেন। মিথ্যার নির্মাণ সত্ত্বেও মিথ্যার মোহজাল ভেঙে মানুষের প্রতিরোধের ঘটনা ঘটছে। লড়াইয়ের ময়দানে থাকা এই মানুষদের আমাদের পার্টিতে নিয়ে আসতে হবে। আর যারা পার্টিতে থেকেও লড়াইয়ের ময়দানে নেই, তাঁরা পার্টিতে কেন আছেন সেই প্রশ্ন করতে হবে। আমরা কমিউনিস্টরাই নিজেদের বুকচিরে আত্মপর্যালোচনা করে এগতে পারি। জটিল পরিস্থিতির মধ্যে সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্তের সন্ধানে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর জন্য মতাদর্শ, রাজনীতি, সংগ্রাম ও সংগঠন এই চার অস্ত্রে নিজেদের সাজিয়ে নিয়ে প্রস্তুত হতে হবে। হতাশার কোনও জায়গা নেই কমিউনিস্টদের কাছে। আক্রমণ বহুমুখী, তাই গণপ্রতিরোধই একমাত্র বিকল্প।
***********
গণশক্তি, ১লা জুলাই, ২০১৮

20180513

গর্বের পঞ্চায়েতঃ গড়েছে বামফ্রন্ট, ধ্বংস করছে তৃণমূল-২


ভূমিসংস্কারের উলটো পথে তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গে যথাসম্ভব ভূমিসংস্কারের কর্মসূচী দেশে-বিদেশে উচ্চপ্রশংসিত হলেও ক্ষমতায় এসেই উলটো পথে চলতে শুরু করে মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার। ২০১১সালের ১৮ই অক্টোবর (মেমো নম্বর-আই আর সি/৬২৪/১১) একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে তৃণমূল সরকার বলে, ‘‘ভূমিহীনদের মধ্যে মূলত কৃষিজমি বন্টনের যে ধারায় আগের ভূমিসংস্কার চলেছে, তা থেকে সরে আসতে হবে এবার।’’ আরো আগ্রাসী ভাষায় রাজ্য সরকারের জমি নীতি সুপারিশকারী কমিটি বলেছে, ‘‘জমির অবৈধ দখলদারিকে কখনো ভূমিসংস্কার বলা যায় না। বরং এটিকে জমি-ডাকাতি বলা যায়। এই জমি-ডাকাতি বন্ধ করতে সরকার যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে।’’
এর পরেই রাজ্যের গ্রামে গ্রামে সক্রিয় হয়ে ওঠে পূর্বতন জমিদার, জোতদার এবং লুকোনো জমির মালিকরা। শুরু হয়ে যায় বর্গাদার, পাট্টাদার, এমনকি রায়তি জমির মালিক গরিব কৃষকদের উচ্ছেদের ঘৃণ্য অভিযান। তবে গরিব কৃষকের প্রতিরোধের ঘটনাও ঘটছে লক্ষ্যনীয়ভাবে।

পঞ্চায়েত ঠুঁটো জগন্নাথপশ্চিমবঙ্গের সর্বস্তরের গ্রামবাসীকে যুক্ত করে অংশগ্রহণমূলক ও বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কাঠামোর যে ব্যবস্থা সারা দেশকে পথ দেখিয়েছিলো, ক্ষমতায় এসেই তা ভাঙতে শুরু করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতায় এসেই তিনি কলকাতার টাউন হলে রাজ্যের ৩৪১টি ব্লকের বিডিও, ৬৫জন এসডিও-র সঙ্গে একটি বৈঠক করেন। সভায় মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘এবার থেকে প্রতিটি জেলায় তিনটি করে কমিটি হবে। ব্লক পর্যায়ে কমিটির মাথা হবেন বিডিও-রা। মহকুমা স্তরে মহকুমাশাসক বা এসডিও-রা। জেলা পর্যায়ে কমিটির কর্তা হবেন জেলাশাসকরা। প্রতিটি পর্যায়ের কমিটিতেই সদস্য হবেন রাজ্য সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের অফিসাররা। এই কমিটিগুলিই গ্রামোন্নয়নের কাজের তদারকি ও নজরদারি করবে।’
এর ফলে গ্রাম পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদের নির্বাচিত সদস্যদের কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। উন্নয়নের কাজে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা রূপায়নের আসল ক্ষমতা চলে গেলো আমলাদের হাতে। জনগণের সঙ্গে যাদের কোন প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। ফলে ক্ষমতা হারালেন গ্রামের সাধারণ মানুষও। অথচ এতদিন গ্রাম সংসদের মাধ্যমে তাঁরা উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও রূপায়ণের কাজে রীতিমতো বিধিবদ্ধ দায়িত্ব পালন করতেন।

কৃষক আত্মহত্যার যে ঘটনার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পরিচিত ছিলো না, বাংলায় তা এখন অহরহ ঘটছে। গত ছ’বছরে রাজ্যে দেড়শোর বেশি কৃষক ফসলের দাম না পেয়ে, ঋণের চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে নিয়ে সরকার কৃষকদের এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়নি। তারা বরং খেলা মেলা উৎসবে এবং ক্লাবগুলোকে টাকা বিলোনোয় বেশি উৎসাহ দেখিয়েছে। কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। ধান, আলু, পাট থেকে পান, সরষে, ডালশস্য— রাজ্যের প্রতিটি ফসলের ক্ষেত্রে একই অবস্থা। সরকার এখন ফড়েদের থেকে ধান কিনছে, পঞ্চায়েত ও স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে ধান কেনা বন্ধ হয়ে গেছে। উৎপাদন খরচ বাড়ছে অথচ ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকরা বিপদে পড়ছেন। সারের দোকানের ঋণ, প্রতিবেশীর কাছে ঋণ, মহাজনের ঋণ নিয়ে চাপের মুখে আত্মহত্যা করছেন অনেকেই। নাবার্ডের ফোকাস পেপার, ২০১৬-১৭তে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজীবী পরিবারগুলি প্রতি মাসে গড়ে ১৯০৮টাকার ঋণ জালে জড়াচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে কৃষিতে বিপর্যয়, কখনো বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি, কখনো অনাবৃষ্টিতে, কখনো পোকার আক্রমণে। কিন্তু বাংলার কৃষকদের সামনে এখন বীমার ক্ষতিপূরণের সুযোগ নেই। শস্যবিমার বিধি ব্যবস্থাকে লাটে তুলে দিয়ে কৃষকদের আরও বেশি করে আত্মহত্যার মুখে ঠেলে দিয়েছে তৃণমূল সরকার।

ভোটের নামে প্রহসন চালিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল সরকার। বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে যে পঞ্চায়েত ভোট কার্যত উৎসবের পরিবেশে হতো, সেই ভোটই এখন রীতিমতো প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মমতা ব্যানার্জির শাসনে পরপর দু’টি পঞ্চায়েত নির্বাচনই বেপরোয়া সন্ত্রাস, বিরোধী প্রার্থী খুন, ভোট-লুট, আদালতের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি বিশৃঙ্খলার জন্য ইতিহাসে কলঙ্কিত হয়ে থাকবে।
তৃণমূল আমলে প্রথম পঞ্চায়েত নির্বাচন ২০১৩-র জুলাইয়ে। রাজ্যে মোট ৪৮,৮০০টি পঞ্চায়েত আসন। নির্বাচনের আগেই, আতঙ্ক সৃষ্টি করে ৫,৩৫৬টি আসন দখল করেছিলো তৃণমূলতারপরেও যেগুলিতে নির্বাচন হয়েছিল, সেগুলিতেও জিততে দেদার ছাপ্পা, ভোট লুঠ, বিরোধীদের মেরে বের করে দেওয়া, বেপরোয়া বুথ দখল চালায় শাসকদল। গণনার সময়েও চলে ব্যাপক জালিয়াতি ও বলপ্রয়োগ। তবুও বামফ্রন্ট জয়ী হয়েছিলো ১৫,৫৯৩টি আসনে। শতাংশের বিচারে ৩২% কেন্দ্রীয় বাহিনী এনে (???) যথাসম্ভব সুষ্ঠু নির্বাচন করাতে গিয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ বাধার মুখে পড়েছিলেন তৎকালীন রাজ্য নির্বাচন কমিশনার মীরা পান্ডে। প্রতিটি পদক্ষেপে তাঁকে আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়েছিলো। আদালতের লড়াইয়ে জিতলেও, ভোটের দিন কিন্তু শাসকের সশস্ত্র দুষ্কৃতী বাহিনীর তান্ডব আটকাতে ব্যর্থ হন তিনি।

বেআইনী দখলদারি-র নির্লজ্জ অভিযানে নজির গড়লো তৃণমূল। তীব্র সন্ত্রাস আর আক্রমণ চালিয়েও ২০১৩সালে জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর এবং মুর্শিদাবাদে তৃণমূল জিততে পারেনি। একইভাবে বহু পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পঞ্চায়েতেও বিরোধীদের জয় হয়েছিলো। কিন্তু তাতে কি! নির্বাচনের পরে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে শুরু হয় নতুন খেলা। দল ভাঙিয়ে পঞ্চায়েতের তিন স্তরেই দখলদারি শুরু হয়। যেখানে বামপন্থীরা পঞ্চায়েত গঠন করেছিলো, অঙ্ক কষে সেখানে খুনও করা হয়েছে। সভাপতি হিসাবে কাজ শুরুর আগেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে উত্তর ২৪পরগণার হাসনাবাদ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম গাজিকে। এরপর সেই সমিতি দখলও করে শাসকদলফরাক্কায় খুন হন পঞ্চায়েত সমিতির নির্বাচিত সদস্য হাসমত শেখ। পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হলদিয়া পৌরসভায় সন্ত্রাস চালিয়ে, কাউন্সিলারদের অপহরণ করে ১৫মাসের মধ্যেই দখল করে নেয় তৃণমূল।
তৃণমূলের দখলের সবচেয়ে বড়ো উদাহরণ মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদএই জেলায় ২৬টির মধ্যে একমাত্র সাগরদিঘি পঞ্চায়েত সমিতিতে জয়ী হয়েছিলো তৃণমূল। এখন তৃণমূলের দখলে ১৮টি পঞ্চায়েত সমিতি! আর জেলা পরিষদ? মোট ৭০টি আসনের মধ্যে তৃণমূল জয়ী হয়েছিল মাত্র ১টি আসনে। বাকি সবই ছিল বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের হাতে। এখন নানা কৌশলে মোট ৪৩ জনকে ভাঙিয়ে মুর্শিদাবাদ জেলা পরিষদ চালাচ্ছে তৃণমূল! ভয় দেখিয়ে দল ভাঙিয়ে দখলদারির এই ফরমুলা সারা রাজ্যেই চালু করেছে মমতার দল।

মুখে গামছা-বাঁধা ‘উন্নয়ন’ দেখছে এখন গ্রামাঞ্চল! তৃণমূলের আমলে দ্বিতীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের (২০১৮) সন্ত্রাস অতীতের সব নজির ছাড়ালো। আগেরবার ভোট লুঠ, নির্বাচনের পর সন্ত্রাস চালিয়ে বোর্ড দখলে নজির গড়েছিলো তৃণমূল। এবার একেবারে মনোনয়ন পর্ব থেকেই গ্রামবাংলায় মুখে গামছা-বাঁধা সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা রাস্তায় নেমে পড়েছে। মনোনয়ন পেশের কেন্দ্রগুলি ঘিরে রেখেছে মুখ্যমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তৈরি পুলিশ-তৃণমূলের যৌথ বাহিনী। প্রার্থীকে খুন, জখম, অপহরণ, সন্ত্রাস চালিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করানো— সবই হয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের অসহায় চোখের সামনে! বিরোধীদের আবেদনের ভিত্তিতে বারেবারে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে হাইকোর্টকে। শাসকের সশস্ত্র গুন্ডাদের মার খেয়ে, রক্ত ঝরিয়ে তবু বিরোধী দলের কিছু প্রার্থী মনোনয়ন পেশ করতে সক্ষম হয়েছেন। অনুব্রত মন্ডল নামে মুখ্যমন্ত্রীর স্নেহধন্য দুষ্কৃতী-নেতার কথায়, ‘মমতা ব্যানার্জির উন্নয়ন আজ রাস্তায় দাঁড়িয়ে। সবই হচ্ছে সেই কারণে।’ গ্রামাঞ্চলের রাস্তায় রাস্তায় প্রকাশ্য দিনের আলোয় গামছায় মুখ ঢাকা এমন ‘উন্নয়ন’ সারা দেশে সত্যিই বেনজির!

দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠেছে তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতগুলি। সাধারণ মানুষকে হটিয়ে পঞ্চায়েতগুলি দখল করেছে অর্থলোলুপ কিছু তোলাবাজ। সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, যে কোন সরকারি প্রকল্পের সুযোগ পেতে তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষমতাশালী নেতাদের এখন ‘কমিশন’, ‘তোলা’ দিতে হয়। পঞ্চায়েতের কাজের আগেই ১০থেকে ১৫শতাংশ টাকা শাসকদলের নেতাদের পকেটে তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ঠিকাদাররা।                      নীতি-আদর্শহীন তৃণমূল মূলত ধান্দা-নির্ভর একটি দল। তাই পঞ্চায়েতগুলিও এখন তাদের কাছে হয়ে উঠেছে টাকা কামানোর ক্ষেত্র। একশ’ দিনের কাজ, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা ইত্যাদি প্রকল্পে চলছে দেদার চুরি। বার্ধক্য ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, আদিবাসী বা তফসিলী মানুষের হকের টাকা ‘পাইয়ে দেওয়ার’ নাম করে কাটমানি খাচ্ছে তৃণমূল নেতারা। মানুষের ভুরিভুরি অভিযোগ জমা পড়লেও কোন প্রতিকার করছে না তৃণমূল সরকার।

গণশক্তি, ১৩ই মে, ২০১৮ 

গর্বের পঞ্চায়েতঃ গড়েছে বামফ্রন্ট, ধ্বংস করছে তৃণমূল-১


১৯৭৮সালে ঐতিহাসিক নির্বাচন। আইন সংশোধন করে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে এই বছরেই প্রথম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন করে বামফ্রন্ট সরকার। কংগ্রেস আমলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে রাখা হয়েছিলো। চলতি ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা বামফ্রন্টের সৃষ্টি। আগে নামে পঞ্চায়েত থাকলেও গ্রামের উন্নয়নের পরিবর্তে তা ছিলো শোষণের হাতিয়ার। আগে সরকারি কর্মসূচীর সুযোগ সুবিধা গ্রামের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছতো না। এসব কর্মসূচীর সঙ্গে গ্রামের গরিব মানুষ জড়িতও থাকতেন না। ১৯৭৮সালে নবগঠিত পঞ্চায়েতের ৫৬হাজার নির্বাচিত প্রতিনিধি গ্রামবাংলায় নতুন প্রাণের ছন্দ সৃষ্টি করেন। পঞ্চায়েত হয়ে ওঠে গ্রামের গরিবের বন্ধু। গরিব মানুষ পঞ্চায়েতের কাজকর্মে সক্রিয় অংশ নিতে শুরু করেন। গ্রামের মানুষের যথাসম্ভব উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয় পঞ্চায়েতী ব্যবস্থা। সারা দেশে পঞ্চায়েতী ব্যবস্থার মডেল হয়ে দাঁড়ায় পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত। পরে কেন্দ্রীয় আইনও এরাজ্যের অনুকরণেই তৈরি হয়।
নজিরবিহীন গণউদ্যোগ। ১৯৭৮সালে পঞ্চায়েত নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই বিধ্বংসী বন্যায় বিপর্যস্ত হয় এরাজ্যের গ্রামাঞ্চল। কোনরকম অতীত অভিজ্ঞতা ছাড়াই সর্বস্তরের মানুষের বেনজির উদ্যোগ গড়ে এই সর্বনাশা বন্যার মোকাবিলা করে পঞ্চায়েত উদ্ধার, ত্রাণ ও পুননির্মাণের কাজে পঞ্চায়েতের সম্মিলিত অভিযান জনমানসে গভীর রেখাপাত করে
১৯৭৮-৭৯সালের ভয়াল বন্যা এবং ১৯৮১-৮২সালের প্রচন্ড খরায় কৃষি উৎপাদনে দারুণ বিঘ্ন ঘটে। ৫৫০কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়। বাস্তু ও কৃষিজমির প্রচুর ক্ষতি হয়। বামফ্রন্ট সরকারের পরিচালনায় পঞ্চায়েত শুরু করে পুননির্মাণের অভিযান। ১৯৭৮থেকে প্রথম চার বছরে পঞ্চায়েত ‘কাজের বদলে খাদ্য’ কর্মসূচী অনুযায়ী ১৪লক্ষ শ্রমদিবস সৃষ্টি করে। কৃষি বিভাগের উন্নত জাতের বীজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ও নতুন ফসলের চাষে কৃষকদের সাহায্য করতে মিনিকিট বিতরণ প্রকল্প পঞ্চায়েত সমিতির মাধ্যমে রূপায়িত হয়। পঞ্চায়েতের সুপারিশে মাছচাষিদের ঋণ দেয় সরকার। পানীয় জল সরবরাহ, নার্সারি, হোমিওপ্যাথিক ডিসপেনসারি, বাস্তুহারাদের জন্য বসতবাড়ি, স্কুলবাড়ি, ভূমিহীন কৃষিশ্রমিকদের জন্য বাড়ি, বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র ইত্যাদি প্রকল্প রূপায়িত হয়
অবাধ ও নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচনসারা দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গই একমাত্র রাজ্য, যেখানে নির্দিষ্ট পাঁচ বছর অন্তর ত্রিস্তর পঞ্চায়েতেই নির্বাচন হয়েছে বামফ্রন্ট সরকারের সময়েভোট হয়েছে টানা সাতবার— ১৯৭৮সালে প্রথম, ১৯৮৩সালে দ্বিতীয়, ১৯৮৮সালে তৃতীয়, ১৯৯৩সালে চতুর্থ, ১৯৯৮সালে পঞ্চম, ২০০৩সালে ষষ্ঠ এবং ২০০৮সালে সপ্তম বার।
ভোটদানের সময় নির্বাচকমন্ডলীর ব্যাপকতম অংশগ্রহণ ঘটতো, গড়ে ৮৫-৯০শতাংশ ভোটদাতা ভোট দিতেন বামফ্রন্ট সরকারই দেশের মধ্যে প্রথম এরাজ্যে ১৮বছরে ভোটাধিকার চালু করেছিলো পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের নির্বাচনে।
প্রতিবারই এই বিশাল নির্বাচনে ভোটদান, গণনা ও ফল ঘোষণার কাজ সারা রাজ্যে সম্পন্ন হয়েছে সুষ্ঠুভাবে। সবটাই মানুষের চোখের সামনে। এটাই ছিলো অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অন্যতম গ্যারান্টি।
মহিলা, তফসিলী ও আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ ১৯৯৩সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে চালু হয়েছিলো। সারা দেশে পশ্চিমবঙ্গেই প্রথম। পরে সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনী করে সারা দেশে এই আসন সংরক্ষণ চালু হয়।
দুর্বলতর মানুষকে উন্নয়নের মূলস্রোতে যুক্ত করতেই সব পঞ্চায়েতে তফসিলী জাতি, আদিবাসী, এবং মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণের এই পদক্ষেপসংশ্লিষ্ট পঞ্চায়েত এলাকায় মোট জনসংখ্যার সঙ্গে তফসিলী জাতি ও আদিবাসীদের জনসংখ্যার অনুপাতের ভিত্তিতেই আসন সংরক্ষণের সংখ্যা ঠিক হতে থাকে। এক-তৃতীয়াংশ আসন (তফসিলী জাতি ও আদিবাসী আসন-সহ) মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হয়। পর্যায়ক্রমে তা আবর্তিত হয়। ১৯৯৮সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় থেকে প্রত্যেক পঞ্চায়েত স্তরে সভাপতি ও সহসভাপতির পদগুলিও তফসিলী জাতি, আদিবাসী, এবং মহিলাদের জন্য একইভাবে সংরক্ষিত।
বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ পঞ্চায়েত নির্বাচনে (২০০৮) তিনটি স্তরে সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন মোট ৫১,৪৯৯জন। এর মধ্যে মহিলারা নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯,৮১২টি আসনে। অর্থাৎ ৩৮.৪৭%আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন মহিলারা, যদিও সংরক্ষণ ছিলো ৩৩%। পাশাপাশি, জেলা পরিষদে সংখ্যালঘু সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ২১.৩২%। তফসিলী জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন ৩৩.৫০%। পঞ্চায়েত সমিতিতে সংখ্যালঘু সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ২১.৯৩% এবং তফসিলী জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন ৩৪.৩৪%। গ্রাম পঞ্চায়েতে সংখ্যালঘু সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ২৩.২৮% এবং তফসিলী জাতি ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন ৩৪.৭৮%। সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত পৌরসভায় মহিলাদের জন্য ন্যূনতম ৫০শতাংশ আসন সংরক্ষণের আইনও তৈরি করেছিলো। 
গ্রামের মানুষের হাতেই ক্ষমতাযথাসম্ভব ভূমিসংস্কারের কর্মসূচী এবং বিকেন্দ্রীভূত স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে আসলে তৃণমূল স্তরে গণতন্ত্রেরই বিকাশ ঘটিয়েছিলো বামফ্রন্ট। একাজে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ছিলো হাতিয়ার। ভূমিসংস্কার কর্মসূচী পরিচালিত হয়েছিলো তিনটি পথে। বেনামী ও সিলিং বহির্ভূত জমি উদ্ধার, ভূমিহীনদের মধ্যে জমি বন্টন এবং বর্গাদারদের অধিকারের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা।
সারা দেশে ভূমিসংস্কার থেকে উপকৃত পরিবারগুলির শতকরা ৫৩.২ভাগই পশ্চিমবঙ্গের। ৩১শে মার্চ, ২০০৬পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে ২৯লক্ষ ৮২হাজার একর বেনামী ও সিলিং বহির্ভূত জমি উদ্ধার করা হয়েছে। জমির পাট্টা দেওয়া হয়েছে মোট ২৮লক্ষ ৪৯হাজার জনকে। এরাজ্যে যত পরিবারকে খাস জমি বন্টন করা হয়েছে তার ৫৬শতাংশই তফসিলী জাতি ও আদিবাসী পরিবার। ভূমি ও ভূমিসংস্কার দপ্তরের ২০০৮সালের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, বন্টিত জমির ৩৬.২৪শতাংশ পাট্টা পেয়েছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। নজর করার মতো তথ্য, গোটা দেশে যত জমি এভাবে পুনর্বন্টিত হয়েছে, তার শতকরা ২২ভাগ পশ্চিমবঙ্গের। যদিও গোটা দেশের মোট কৃষিজমির শতকরা মাত্র ৩ভাগ রয়েছে এরাজ্যে।
এই জমি উদ্ধার এবং বন্টনের ফলে পশ্চিমবঙ্গে জমির মালিকানার চরিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বদল এসেছিলো। গোটা দেশের গড় হিসেবে যখন শতকরা ১৫জনের হাতে ৬০শতাংশ কৃষিজমি অর্থাৎ ধনী কৃষকদেরই একচেটিয়া আধিপত্য, তখন পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে রয়েছে ৮৪শতাংশ জমির মালিকানা।  গ্রামাঞ্চলে দরিদ্র মহিলাদের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে যৌথ পাট্টাও বন্টন করেছে বামফ্রন্ট সরকার। রাজ্যে যৌথ পাট্টার অধিকারী ৬,০৩,৯৮৭টি পরিবার। অর্থাৎপরিবারের জমিতে মহিলা-পুরুষের সমান অধিকার।  পাশাপাশি, ২০১১সালের সেপ্টেম্বরের হিসেব, রাজ্যের ১লক্ষ ৬২হাজারেরও বেশি মহিলা একাই জমির মালিক। রাজ্যে বন্টিত জমির প্রায় ৩০শতাংশে মহিলাদের অধিকার রয়েছে।
বর্গাদারদের অধিকারও সুনিশ্চিত করেছিলো বামফ্রন্ট। ১৯৭৮সালে অপারেশন বর্গা চালু হয়। ১৫লক্ষেরও বেশি বর্গাদারের মেয়াদী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়গোটা দেশে আর কোথাও একাজ হয়নি। বর্গা নথিভুক্তদের মধ্যে শতকরা ৪১.৯২ভাগ তফসিলী জাতি ও আদিবাসী পরিবার।
ভূমিসম্পর্কের পরিবর্তন এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে। ভূমিসংস্কার একদিকে কৃষক-সহ গ্রামীণ গরিবের আর্থিক ক্ষমতা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকে।
ফলনে রেকর্ড গড়ে গ্রামবাংলা। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সফল রূপায়ণ এবং যথাসম্ভব ভূমিসংস্কারের কারণে উদ্দীপ্ত কৃষকরা এরাজ্যের কৃষি উৎপাদনে নজির গড়েন। খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঘাটতি রাজ্য থেকে বাড়তি রাজ্যে পরিণত হয় পশ্চিমবঙ্গ। গড় শস্যনিবিড়তার সূচকের নিরিখে পাঞ্জাবের ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে পশ্চিমবঙ্গ। ২০১০সালে পশ্চিমবঙ্গে শস্যচাষের নিবিড়তা ছিলো ১৯২শতাংশ।
ভূমিসংস্কার এরাজ্যে একদিকে উৎপাদন বাড়িয়েছে, আবার গ্রামীণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়িয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিবের হাতে জমি যাওয়ায় তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। তাঁদের সম্মিলিত চাহিদার ফলাফল হিসেবে এরাজ্যে গ্রামাঞ্চলে বিপুল বাজার তৈরি হয়।
পঞ্চায়েতের ক্ষমতা বাড়াতে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকারের সময়েই। গ্রামীণ উন্নয়নের প্রায় সব ক্ষেত্রেই পঞ্চায়েতকে যুক্ত করা হয়। দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচী, পরিবেশ, উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ের কাজ পঞ্চায়েতগুলিই করতে থাকে। ক্ষুদ্র সেচ, প্রথাবহির্ভূত শিক্ষা, পানীয় জল সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য ও রোগ নিবারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতগুলির ভূমিকা পরিপূরকের। গণবন্টন ব্যবস্থা, দুর্বলতর অংশের মানুষের মধ্যে জমি বন্টনের মতো ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতের সুপারিশকে সামনে রেখে কাজ করে সরকারি দপ্তরগুলি।
বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের সমস্ত নথিভুক্ত ভোটারকে নিয়ে গ্রামসংসদ গঠন করা হয়। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচীতে সব মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গ্রামসংসদ স্তরে গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গঠিত হয়। পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদ স্তরে ব্লক সংসদজেলা সংসদ গঠন করা হয়। জেলা পরিষদ ও পঞ্চায়েত সমিতি স্তরে স্থায়ী সমিতি ও গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে উপসমিতিগুলিকে আরো বেশি দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রতিটি স্তরের সংশ্লিষ্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি ও সাব কমিটিতে বিরোধী দলের নেতা বা নেত্রী পদাধিকার বলে সদস্য হন। পঞ্চায়েতের কাজে আরো গতি আনার জন্য সরকারের দেয় অর্থ সরাসরি পঞ্চায়েতের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হতে থাকে। সমস্ত স্তরেই সরকারি নিয়মমতো হিসেবপত্র পরীক্ষা করার ব্যবস্থা হয়।
সম্পদ সংগ্রহের অধিকার। বামফ্রন্টের সময়েই এলাকার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নিজস্ব সম্পদ সংগ্রহ করার অধিকার দেওয়া হয় পঞ্চায়েতগুলিকে। পঞ্চায়েতের সংগৃহীত সম্পদ নিজস্ব এলাকার উন্নয়নেই খরচ হয়। যেসব কাজ সরকারি প্রকল্পে করা সম্ভব নয়, অথচ স্থানীয়ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, তা এই টাকায় করা হতে থাকে। এর ফলে গ্রামীণ উন্নয়নের কাজ ত্বরান্বিত হয়। গ্রামবাংলার জীবনে নতুন ছন্দ আনে পঞ্চায়েত।
জনস্বাস্থ্য ও শিশুশিক্ষা কর্মসূচী রূপায়ণেও পঞ্চায়েতগুলি গ্রামীণ জীবনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো। রাজ্যের সমস্ত গ্রামীণ পরিবার, ছাত্র-শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে স্বাস্থ্যবিধিসম্পন্ন আধুনিক শৌচাগারের সুবিধা দিতে সব জেলাতেই সার্বিক স্বাস্থ্যবিধান প্রকল্প চালু করা হয়। প্রকল্পের সাফল্যের কারণে বহু গ্রাম পঞ্চায়েত ও পঞ্চায়েত সমিতি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘নির্মল গ্রাম পুরস্কার’ পায়। শিশুশিক্ষা কর্মসূচী পঞ্চায়েতগুলিতে চালু হয় ১৯৯৭-৯৮সাল থেকেবিভিন্ন গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ৯থেকে ১৩বছরের বালক-বালিকা, যারা নানা কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নানা কারণে যেতে পারে না, তাদের জন্য খোলা হয় শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। খোলা হয় মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র।
খেতমজুরদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড বা ভবিষ্যনিধি প্রকল্প চালু হয়েছিলো ১৯৯৮সালে। পশ্চিমবঙ্গের ১৮থেকে ৫০বছর বয়সী খেতমজুররা মাসে ১০টাকা করে জমা দিয়ে এই প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করাতে পারতেন। প্রত্যেক নথিভুক্ত কৃষিশ্রমিকের জমা টাকার সমপরিমাণ টাকা রাজ্য সরকার দিতো। মোট জমার ওপর সুদ সংশ্লিষ্ট খেতমজুরের পাশবইতে নথিভুক্ত থাকতো। এই প্রকল্পের কাজও দেখাশোনা করতো পঞ্চায়েত১৯৮০-৮১সালে সারা ভারতে সর্বপ্রথম এরাজ্যে কৃষকদের বার্ধক্যভাতা চালু হয়। পেনশনভোগীর মৃত্যুর পরে তাঁর বিধবা পত্নীও পেনশন পেতে থাকেন।
দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণে জোর দিয়েছিলো বামফ্রন্ট সরকার। ১৯৯৩সালে অনুষ্ঠিত রাজ্যের চতুর্থ পঞ্চায়েত নির্বাচনের পর থেকেই ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের সদস্য, পদাধিকারী ও কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়কল্যানীতে অবস্থিত রাজ্য পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন সংস্থায় এঁদের নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। পরে প্রতিটি জেলায় তৈরি করা হয় প্রশিক্ষক দল।
আত্মমর্যাদা ও অধিকার চেতনার বিকাশ ঘটিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের ত্রিস্তর পঞ্চায়েত।  শুধু গ্রামোন্নয়নের ক্ষেত্রেই নয়, গ্রামের মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদা ও অধিকার চেতনার বিকাশ ঘটানোর কাজেও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে পঞ্চায়েতআগে জনগণ সরকারের কাছে করুণাপ্রার্থী হিসেবে করুণাভিক্ষা করতেন। তাঁরা ক্রমশ বুঝেছেন, রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস তাঁরাই। আত্মমর্যাদায় বলীয়ান গ্রামবাসীরা ক্রমশ বুঝেছেন, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি হাতিয়ার।
প্রশংসা সকলের মুখে। ১৯৯৩সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত সম্পর্কে জনগণের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে একটি সমীক্ষা করেছিলো দিল্লির ইনস্টিটিউট অব সোসাল সায়েন্স। ১৯৯৬সালে প্রকাশিত ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল পঞ্চায়েত ইলেকশনস-১৯৯৩-এ স্টাডি ইন পার্টিসিপেশন’ শিরোনামের রিপোর্টে তারা জানিয়েছিলো, ‘‘...বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ মানুষই বলেন, পঞ্চায়েত ভূমিহীনদের জমি দিয়েছে, গরিব মানুষের অবস্থার উন্নতি ঘটিয়েছে, বর্গাদারদের অধিকার সুরক্ষিত করেছে, খেতমজুরদের মজুরি বৃদ্ধি করেছে, রাস্তাঘাট নলকূপ ইত্যাদি গ্রামীণ পরিকাঠামো গড়ে তুলেছে, সর্বোপরি জনগণকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে।’’
২০০৭সালে প্রকাশিত ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভের ৬১তম রাউন্ডের রিপোর্ট জানিয়েছে, ১৯৭৩-৭৪সালে সারা দেশে গ্রামবাসীদের ৫৬.৪শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতেন। পশ্চিমবঙ্গে তখন এই হার ছিলো ৭৩.২শতাংশ।
কেন্দ্রীয় সরকারের রিপোর্টই জানিয়েছে, ১৯৭৩সাল থেকে ২০০৫-এর মার্চের মধ্যে সারা দেশে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমার বিচারে প্রথম দু’টি রাজ্যের নাম পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা। পশ্চিমবঙ্গে ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াইয়েরই ফল এই সাফল্য।

গণশক্তি, ১৩ই মে, ২০১৮

20180409

গড়ে তোলো মানুষের পঞ্চায়েত


মিনতি ঘোষ

মহাত্মা গান্ধী স্বপ্ন দেখেছিলেন পঞ্চজনারপঞ্চায়েত অর্থাৎ গ্রাম স্বরাজের কথা। সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে হবে নতুন ভারত গড়ার কাজ। দেশ স্বাধীন হয়েছে ১৯৪৭ সালে। পরিচালনায় কংগ্রেস দল। বারবার আ‍‌লোচনা হয় দেশ গঠনের, তার উন্নতির জন্য কোন পথে গেলে ভালো হয়। তারপর সংবিধানের নির্দেশাত্মক নীতিতেই স্থান পায় পঞ্চায়েত। আসল সমস্যাতো সেই প্রয়োগের ক্ষেত্রে। জমিদার, জোতদার, উঁচু জাতের (সংখ্যালঘু ধনী ব্যক্তিসহ) প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের দখলে সমষ্টি উন্নয়ন অফিস, (বি ডি ও অফিস) পঞ্চায়েত।
অর্থ যেটুকু সরকার থেকে পাওয়া যেত ভাগাভাগি হয়ে যেত তাদের মধ্যেই। পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়ির সামনে একটি কুয়ো অথবা টিউবওয়েল, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সামান্য পাকা রাস্তা, দূরদূরান্তে প্রাইমারি অথবা হাই স্কুল। জেলায় বড়জোর একটি দুটি কলেজ। ধনীর কুয়োর/টিউবওয়েলের জলে অধিকার ছিল না সংখ্যালঘু, আদিবাসী, বাউরি, বাগদিসহ তথাকথিত নীচুজাতের। তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পুকুর, খালবিল। লেখাপড়ার সুযোগও তাদের ছিল না। বিদ্যুৎ ছিল অধরা স্বপ্ন। সাইকেলও বড়লোকের বাড়িতে। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার চিন্তা গরিব বাড়ির মেয়েদের কমই ছিল। বসন্ত, যক্ষ্মা, কলেরা, ম্যালেরিয়া ছিল নিত্যসহচর।
একদিকে হাতে গোনা সুবিধাভোগী অপর দিকে হাড়-জিরজিরে নিরন্ন মানুষযাদের বান-বন্যা, খরা-শুখা মরশুম অর্থাৎ প্রকৃতির উপর নির্ভর করে বাঁচতে হতো। স্বাধীনতার আসল স্বাদযখন সাধারণ মানুষ বুঝেছেন তখনই তাঁরা জোট বাঁধতে শুরু করেছেন। তার প্রমাণ মেলে ১৯৬৭, ১৯৬৯ কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র নেতৃত্বে দুটি যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে। টিকল না দুটি সরকার। ১৯৭১ সালের সি পি আই (এম) নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের সরকার গড়তে দেওয়া হয়নি। সারা দেশে জনবিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রবল আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হলো। ঠিক আজকের মতো গণতন্ত্রকে হত্যা করা হলো, বাক্‌স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হলো। আমাদের রাজ্যে এগারোশো কর্মীকে খুন করা হয়েছে। শহীদের তালিকাতে সিংহভাগই গরিব, দলিত, সংখ্যালঘু মানুষ। সীমাহীন অত্যাচারের শিকার মহিলারা।
১৯৭৭ সালে আবার নির্বাচন। এরাজ্যে সি পি আই (এম) সর্বাধিক ভোট পেয়ে গঠন কর‍‌ল বামফ্রন্ট সরকার। কেন্দ্রে জনতা সরকার।
পরিবর্তনের ভরকেন্দ্রে কিন্তু অগণিত গরিব কৃষক, মধ্যবিত্ত, মহিলা, বেকার যুবক। তাঁরা কংগ্রেস সরকারের অপশাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন। সেই ভূমিহীন কৃষক যাঁরা যুক্তফ্রন্টের আমলে স্লোগান দিয়েছিলেন—‘লাঙল যার জমি তারনেতৃত্বে সারা ভারত কৃষকসভা। কৃষক রমণী ছিলেন তাঁদের সাথি।
ওপরের কথাগুলো হয়তো ‘‘ধান ভানতে শিবের গীত’’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু মানুষইতো বামফ্রন্ট সরকার গড়ল। তাঁদের দীর্ঘকালের বিশ্বাস লালঝান্ডা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। করেও ছিল। সরকার গঠনের পরই সিদ্ধান্ত করে ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে বাস্তবে কার্যকর করেছে। এতদিন গরিব মানুষের মাথার উপর কোনও ছাদ ছিল না। এবার তারা সেই নির্ভরতার জায়গাটা খুঁজে পেল। বামফ্রন্ট যার নেতৃত্বে সি পি আই (এম) তাঁদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেনি। নির্বাচনী প্রতিটি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গিতে চলার ফলে। মূল মিত্রকে চিনে নিতে তাই কোনও পক্ষেরই ভুল হয়নি।
ভূমিসংস্কারের সাফল্য : ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকার প্রায় ১৪ লক্ষ ৪ হাজার ৯১ একরের বেশি জমিকে খাস করেছে। কৃষিযোগ্য জমি ১৩ লক্ষ ১৪ হাজার একরের বেশি। ভূমিসংস্কারের ফলে বিলি হওয়া পাট্টার ৫৫ শতাংশ তফসিলি জাতি ও আদিবাসী মানুষ পেয়েছেন। সংরক্ষিত নন অথচ সংখ্যালঘু মানুষের ৩৬.২৪ শতাংশ মানুষ জমি পেয়েছেন।
এরাজ্যে গড়ে যদিও ২৭ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষ বাস করেন।
মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বলছেরাজ্যে ৫৮.৭ শতাংশ থেকে ৭২.৬ শতাংশ তফ‍‌সিলি জাতি প্রধান ব্লক রয়েছে ১২টি। বেশিরভাগই জলপাইগুড়ি, বাকিটা মালদহ, দক্ষিণ ২৪ পরগনা। তফসিলি উপজাতি ৪১.৩ শতাংশ থেকে ৫১.৫ শতাংশ প্রধান ৭টি ব্লক। ৩১.০ শতাংশ থেকে ৪১.৩ শতাংশ ৯টি ব্লকে। এমনভাবেই সারা রাজ্যে কোনও নির্দিষ্ট এলাকায় তাঁরা সীমাবদ্ধ নেই। সংখ্যালঘু মানুষের বাস সবচেয়ে বেশি মুর্শিদাবাদ ও মালদহে। প্রায় ১০ কোটি মানুষের বাস পশ্চিমবঙ্গে। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষাভাষী, সংস্কৃতিগত বৈচিত্রের মধ্যেও তাঁদের অবস্থান। একারণেই উন্নয়ন বা অনুন্নয়নের নিরিখে কোনও জনগোষ্ঠীর উন্নয়নকে চিহ্নিত করা যায় না।
প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ১২ লক্ষের বেশি মানুষ বর্গাদার হিসাবে নথিভুক্ত হলো। বাস্তুজমি পেয়েছেন ২.৭৭ লক্ষ মানুষ।
প্রথম বামফ্রন্ট আমলে গ্রামবাংলার জন্য যে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলি রূপায়িত হয়েছিল তার জন্য ছিল : ১৯৭৭২৯শে সেপ্টেম্বর : বিধানসভায় পশ্চিমবঙ্গ ভূমিকা (সংশোধনী) বিল গৃহীত। ১৯৭৭৭ই নভেম্বর : ঐতিহাসিক নভেম্বর বিপ্লবের দিনই ঘোষণা করা হলো—‘‘চাষ করবেন যিনি, ফসল নেবেন তিনি’’১৯৭৭১৮ই নভেম্বর : ‘‘বর্গাদারদের নাম নথিভুক্তকরণের আইনগত ভিত্তি সম্পর্কে গাইড লাইন প্রকাশ করে বামফ্রন্ট সরকার। যুগান্তকারী এই সিদ্ধান্ত আমূল পালটে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের চেহারা। মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে মহিলাদেরএকক পাট্টা পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬২ হাজার ৮৩৭ জন মহিলা। যৌথ পাট্টা৬ লক্ষ ৩ হাজার ৯৮৭টি পরিবার।
এটা কোনও মামুলি খতিয়ান নয়। সরকার গঠনের পর একটি সিদ্ধান্তরূপী মজবুত ভিতের উপর দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দিশাকে সামনে রেখে এগিয়ে চলার শপথের নামই বামফ্রন্ট সরকার। যা আজ তৃণমূল কংগ্রেস সরকার ভুলিয়ে দিতে চাইছে, যে তৃণমূলের জন্ম হয়েছিল কংগ্রেসের মধ্যে থাকা হিংস্র একটি অংশকে নিয়ে। দেশি, বিদেশি বামবিরোধী শক্তি, কর্পোরেটদের একটি অংশ এবং দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসনিক শক্তির একটি বড় অংশ ৩৪ বছরের বাম-সরকারকে হটিয়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতাবাদসহ আদর্শহীন একটি দলকে সরকার গঠনে সাহায্য করেছে। গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের মাঝেই ১৯৭৮ সালে বাস্তুঘুঘুর বাসা ভেঙে দিয়ে পঞ্চায়েত নির্বাচন হলো। জিতলেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে গরিব, নিম্নবিত্ত মানুষ, অসংরক্ষিত পদে দুশোর মতো মহিলা।
একদিকে গ্রামবাংলায় এই নির্বাচনের মধ্যদিয়ে প্রবল ভূমিকম্পে সব ওলট পালট হয়ে গেল। ওধারেরমানুষের হাতের ক্ষমতা এধারেরঅগণিত মানুষের হাতে এসে গেল। এর মাঝেই ১৯৭৮-এর বিধ্বংসী বন্যার মুখোমুখি সরকার। পঞ্চায়েত সরকার ও মানুষের মাঝে সেতু বন্ধনের কাজ করল; ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ৮১৩ জনের মৃত্যুর হাহাকারের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।
পঞ্চায়েত হলো ভরসার জায়গা। তখনতো মুখ্যমন্ত্রী সাঙ্গোপাঙ্গ, মন্ত্রী, আমলাদের নিয়ে জেলা চষে বেড়াতেন না। একহাতে সব দপ্তরও সামলাতেন না। নীতি নির্ধারণ করবে মন্ত্রীসভা। তদারকি করবেন প্রশাসক।
প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় জ্যোতি বসুর নির্দেশ ছিলগ্রামের একজন নেংটিপরা মানুষকে আপনি বলা, থানা বা সরকারি অফিসে গেলে চেয়ারে বসতে দেওয়া। এই শ্রেণিচেতনার সাথে আজকের ফারাক সহজেই অনুমেয়।
পঞ্চায়েতের বিরাট সাফল্য তুলে ধরা সম্ভব নয়। ভূমিসংস্কার ও পঞ্চায়েত গ্রামবাংলার চেহারা বদলে দিয়েছে। সমবায়, ল্যাম্পস, সেচ, বিদ্যুৎ, পাশাপাশি বীজ, মিনিকিট বিতরণ, খেতে না পাওয়া মানুষের জন্য কাজের বদলে খাদ্যকর্মসূচি সহায়তা দিয়েছে গরিব মানুষকে। আজকের মতো টাকা লুট হয়নি। বখরা নিয়ে প্রকাশ্য গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব সামনে আসেনি। কারণ ৩৪ বছরে গ্রামের মানুষের ধারাবাহিক অর্থনীতির পরিবর্তনের ফলে ৪০ হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারই ধাপে ধাপে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছে। দরিদ্রতম ঘরের সন্তানেরা স্কুলে গিয়েছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্র থেকে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। আজও সেই ধারা অক্ষুণ্ণ আছে। ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর্মসূচির ভিত্তিতে উন্নয়নের কোনও চোখ ধাঁধানো প্রচার ছিল না। জনগণের সরকার একটি অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাজ করেছে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অস্বাভাবিক যা তা হলো পুরানো সমস্ত সাফল্যকে নষ্ট করে অথবা নিজের বলে আত্মসাৎ করা। সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এক দপ্তরের অর্থ অন্য দপ্তরে খরচ করে লাগামহীন উৎসব, মেলা, খেলা, ক্লাবের মধ্যদিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করা। মস্তানবাহিনী তৈরি করে গ্রামের নব্যধনী, তোলাবাজ, সিন্ডিকেটরাজ, প্রশাসনের একটি বড় অংশকে যুক্ত করে ভোট লুট করা। নিয়মনীতি বহির্ভূতভাবে নিয়োগ হচ্ছে। কিন্তু ইন্টারভিউ দিয়ে যোগ্য চাকরি প্রার্থীরা কাজ পাচ্ছে না।
বেলাগাম একটি সরকার চলছে। ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে বি জে পি-র নেতৃত্বে চলা কেন্দ্রীয় সরকার সংগত করে চলেছে। দুটি দলই আদ্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত। ধর্মীয় মেরুকরণের পৃষ্ঠপোষক। দেশের পক্ষে ভয়ংকর বিপদ বি জে পি এবং তৃণমূল।
এরাজ্যে শিল্প, কলকারখানা বন্ধ অথবা বন্ধের মুখে। নতুন কোনও শিল্প স্থাপন হয়নি। কৃষিক্ষেত্রে ভয়ংকর সংকট। নজিরবিহীনভাবে এরাজ্যে কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। সারা দেশের মধ্যে নারী নির্যাতনে শীর্ষে পশ্চিমবঙ্গ। দুকোটি আর দশলক্ষ বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি কেন্দ্র, রাজ্য সরকারের ফাঁকা আওয়াজ। ভোটের আগে ধর্মের জারক রসে এরাজ্যের মানুষকে জারিত করছে। যার সবচেয়ে বড় শিকার মহিলারা। বামফ্রন্ট সরকার মর্যাদা দিয়েছিল নারী, আদিবাসী, তফসিলিদের। নারী সুরক্ষার অন্যতম শর্ত সমাজের সব ক্ষেত্রেই সমান মর্যাদা নিয়ে মহিলাদের উপস্থিতি। লোকসভা, বিধানসভায় এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের দাবিতে প্রগতিশীল মহিলা সংগঠনগুলি আন্দোলন করে আসছে। ৭৩তম সংবিধান সংশোধনের মধ্য দিয়ে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হয়।
তার বহু পূর্বেই এরাজ্যে মহিলা, তফসিলি, আদিবাসী পেছিয়ে পড়া এই তিন অংশের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করা হয়। ধীরে ধীরে পদাধিকারী সংরক্ষণ-এর মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রশাসনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে বামফ্রন্ট সরকার। এই যুগান্তকারী পরিবর্তন কোন মামুলি বিষয় নয়। যার ফলে   পথেঘাটে, অফিসে, স্কুল কলেজে, খেতখামার, ব্যাঙ্ক, আদালত সর্বত্র মহিলাদের স্বচ্ছন্দ বিচরণ। অসংখ্য কাজের সুযোগ সংগঠিত, অসংগঠিত ক্ষেত্রে। আই সি ডি এস, আশা, এস এস কে, এম এস কে, মিড ডে মিল থেকে বিড়ি, দড়ি, তাঁত কত যে কাজ সৃষ্টি হয়েছিল। স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মধ্যদিয়ে ১ কোটি নিরক্ষর অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মহিলা উৎপাদনের কাজে যুক্ত হয়েছেন। নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাঁচার প্রেরণা বামফ্রন্ট সরকার দিয়েছিল।
আজ শুধু উন্নয়নের ঢক্কানিনাদে সাধারণ মানুষ বিমূঢ়। ৩৪ বছরে বামফ্রন্ট সরকার অর্থনীতির যে দৃঢ় বনিয়াদ তৈরি করে গিয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে সৌন্দর্যায়ন, উপরিকাঠামোর রং বদলমাত্র। ভেতরে পোড়া ছাই। তাই গণতন্ত্র হত্যা, বাক্‌স্বাধীনতা স্তব্ধ করে দেওয়া, হামলা, মামলা, মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে জেলে পাঠানো, প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে দখলের রাজত্ব চলছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে নয়া উদারবাদী অর্থনীতির আক্রমণের সাথে মানুষের মনোজগৎকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। নীতি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ তলানিতে। মিডিয়ার অবিরাম প্রচার সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করা, একটা সাময়িক উচ্ছ্বাসের মধ্যে রেখে দেওয়া আজকের কর্পোরেট মিডিয়ার মূল লক্ষ্য। চা বাগিচায় মৃত্যু মিছিল, ডিজিটাল রেশন কার্ডের নামে প্রকৃত প্রাপকের নাম বাতিল। বিধবাভাতা, বার্ধক্যভাতা পাচ্ছেন না গরিব মানুষ। ১০০ দিনের কাজ ৩২ দিনে নেমেছে। মজুরি অনিয়মিত। ইন্দিরা আবাস যোজনায় ব্যাপক দুর্নীতি। আমাদের করের টাকায় যে প্রকল্প আসছে তার নাম বদলে নিজের বলে চালানোর মতো অনৈতিক কাজ এ সরকার করে চলেছে। সর্বত্র একটি চকচকে মুখের ছবি বদলে যাচ্ছে অবিরত। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরকে বাধ্য করছে মকর সংক্রান্তির দিন লোকশিল্পীদের মঞ্চে এনে (সবাই প্রকৃত শিল্পী নন) সরকারের বন্দনা গাইতে। নগদ মজুরি, ব্যাঙ্কে ১০০০০০ টাকা রাখা।
সর্বত্র ব্যক্তিগত উপভোক্তা তৈরি করে চলেছে এই সরকার।
এই অবস্থা বেশিদিন চলে না। স্বৈরতন্ত্র একদিন পরাস্ত হবে‍‌ই। একনায়কতন্ত্রীদের একদিন মানুষ ছুঁড়ে ফেলে দেবেনই। কন্যাশ্রীর ২৫ হাজার টাকা, ‘সবুজসাথীরসা‍‌ইকেল, ‘খাদ্যসাথীর রেশনে পচা চাল সরবরাহ, রূপশ্রীর মধ্যদিয়ে কন্যার রূপ আর তার শেষ পরিণতি বিবাহনামক পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলার চক্রান্ত, বিউটি পার্লারের আরও বেশি অর্থ অনুমোদন, রাস্তার ধারের মদের দোকান খোলার অনুমোদন, হাজার হাজার শিলান্যাস মানুষের মস্তিষ্ককে এলোমেলো করে দিচ্ছে। ঠিক-বেঠিক হারিয়ে যেতে বসেছে। ভোগবাদী পণ্য সংস্কৃতি আজ গ্রাস করছে সমগ্র সমাজকে। যে কোনও মূল্যে নিজের ভালো চাই।
আমাদের লড়াই ‘‘আমরার’’ লড়াই। আমাদের লড়াই রাজ্য বাঁচানো, দেশ বাঁচানো, শ্রমজীবী মানুষের চুরি হয়ে যাওয়া অধিকার ফেরত পাবার লড়াই। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে আমাদের মূল স্লোগান ‘‘বি জে পি হটাও, দেশ বাঁচাও, তৃণমূল হটাও রাজ্য বাঁচাও’’-এর সাথে দুটি শক্তিই যে একে অপরকে সাথি করে এরাজ্যে মানুষকে বোকা বানাতে চাইছেতা বোঝানো।
আমরাই পেরেছিলামআমরা পারবএই প্রত্যয় নিয়ে আমাদের পঞ্চায়েত নির্বাচনে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন ঘটাতে হবে।
তথ্যসূত্র: ফিরে দেখাবুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
লুঠের পঞ্চায়েতঅধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই

গণশক্তি, ৪ঠা এপ্রিল ২০১৮

20180226

আজকের জগৎ শেঠ ও আজকের মীরজাফর


শ্যামল চক্রবর্তী

যুদ্ধে পরাজিত করে দেশ দখলের নীতি এখন বদলে গেছে। যুদ্ধে না জিতেও দেশের অর্থনীতি রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণই হলো আসল ক্ষমতা। ইতিহাসের দুই চরিত্র জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদী-আম্বানির তুলনা এই লেখা।

বাংলার বণিকরা জগৎ শেঠের নেতৃত্বে ইংরেজদের দিয়ে সিরাজউদ্দোল্লাকে পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা দখলের সুযোগ করে দিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে সেই সময় বাংলা ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ রাজ্য। এর ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য গড়ে উঠেছিল সুবিস্তৃত বাজার। বাংলা ছিল সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে ভালো কৃষি ব্যবস্থার অধিকারী। ফরাসি বণিকরা বাংলাকে বলতেন জান্নাতুল বিলাত’, অর্থাৎ প্রদেশগুলির স্বর্গ। মুঘল ফরমানে তৎকালীন বাংলাকে ভারতবর্ষের স্বর্গহিসাবে অভিহিত করা হয়েছে।
নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁর সময় বাংলায় একটি ব্যাঙ্কিং বাণিজ্য গোষ্ঠীর উত্থান হয়। এই জমিদার বণিক শ্রেণিকে বণিক রাজা বলা হতো। নবাবি দরবারে তারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন রাজনৈতিক জোট তৈরি হয়ে যায়। এই প্রভাব বলয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল জগৎ শেঠ পরিবারের। এরা পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন। জগৎ শেঠ ছিল একটা উপাধি। মুঘল সম্রাট ফারুখশিয়ারের এক ফরমান বলে জগৎ শেঠকে বাংলার নবাবের সিংহাসনে বাঁ পাশের আসন গ্রহণে ক্ষমতা বা মর্যাদা দেন। নবাব যেন তার কথা উপেক্ষা না করেন সেই মর্মে ফারুখশিয়ার ফরমানও জারি করেন। পদমর্যাদায় জগৎ শেঠ নবাবের প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠেছিল। ২০০০ ঘোড়সওয়ার তার বাড়ি পাহারা দিতো (অক্ষয়কুমার মৈত্র, সিরাজদ্দৌলা, দে ১৮৯৭ পৃঃ ১১৭)
জগৎ শেঠের উদ্দেশ্য কী ছিল? জগৎ শেঠ এবং অন্যান্য বণিকদের হাতে এত  সম্পদ জমে গিয়েছিল যে তৎকালীন সময়ে অতিরিক্ত বাজার ছিল না। তাই বাজার পাওয়ার জন্য জগৎ শেঠরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মারফত দেশের অন্যত্র এবং বিদেশের সঙ্গেও বাণিজ্য করতে চাইল। কিন্তু তাদের সে আশায় বাধ সাধলেন সিরাজদ্দৌলা। ইংরেজরা কলকাতা এবং তার চারপাশে একটি দস্তকবা মোগল বাদশাহদের অনুমতিপত্র নিয়ে এখানে বিনা শুল্কে ব্যবসা করত। তারা বিনা শুল্কে ব্যবসা করত কিন্তু বাংলার ক্ষুদ্র শিল্প ব্যবসায় শুল্ক দিতে হতো। এই অসম ব্যবস্থায়  রাজকোষের ক্ষতি হতো এবং গ্রামীণ অর্থনীতিও বিপন্ন হতো। সিরাজদ্দৌলার মনোগত ইচ্ছা ছিল ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু হাত-পা বাঁধা ছিল। কারণ ফরমান ছিল দিল্লির বাদশাহের।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা মোঘল বাদশাহের দেওয়া দস্তকের (বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার অনুমতি পত্র) অপব্যবহার করে। কোম্পানির অফিসাররা দস্তক অপব্যবহার করে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনকে দিয়েও ব্যবসা শুরু হয়।  এরফলে রাজস্বের ভীষণ ক্ষতি হয়। বিনা শুল্কে বাণিজ্য চালাতে থাকে। সিরাজদ্দৌলা এটাই বন্ধ করতে চেয়েছিলেন বাংলার স্বার্থে। কিন্তু জগৎ শেঠদের চাহিদা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে সহযোগিতা করে তাদের নিজস্ব ব্যবসা বাণিজ্যকে প্রসারিত করা এবং সঞ্চিত ধন সম্পদের অনেক বেশি লাভজনকভাবে  ব্যবহার করা। সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করতে দিতে চাইছিলেন না। এজন্য তিনি দুর্গ তৈরি করতে নিষেধ করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মীরজাফরকে সিংহাসনে বসানো হয়। কারণ মীরজাফর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি ইংরেজদের সেই সুযোগ দেবেন। ইতিহাস বলছে মীরজাফর ক্লাইভকে তার হাত ধরে সিংহাসনে বসিয়ে দিতে অনুরোধ করেন। তারপর ব্যবসা বাণিজ্য সবটাই তো ইংরেজদের দখলে চলে গেল।
ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাণিজ্য করবার অধিকার নিয়ে সিরাজদ্দৌলার মনোবেদনা থাকলেও তিনি বিনা শুল্কের অধিকার কেড়ে নিতে পারেননি। কারণ দিল্লি বাদশাহের ফরমান। তিনি চেয়েছিলেন দস্তকের অপব্যবহার রুখতে। আজ ২৫০ বছর পর আজকের জগৎ শেঠরা, আদানি, আম্বানি প্রভৃতিরা একইরকমভাবে নিজেদের ব্যবসার স্বার্থে চাহিদা অনুযায়ী দেশের দরজা হাট করে খুলে দিয়েছে। কাজে নিজেরা বিদেশিদের তাঁবেদার হতে চেয়েছে। জগৎ শেঠরা যেমন নিজেদের স্বার্থে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসিয়েছিল তেমন করে আদানি আম্বানিরা মোদীকে ভারতের সিংহাসনে বসিয়েছে। বিদেশি বণিকদের সুবিধার জন্য দশ হাজার পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।অপরদিকে ‘‘মেড ইন ইন্ডিয়া’’ নাম দিয়ে ভারতের উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীতে অতিরিক্ত অন্তঃশুল্ক চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় ভারতের মাঝারি ছোট শিল্পপতিদের ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন, সংকট সারা দেশজুড়ে।
সিরাজদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ তৈরি করতে বাধা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরা ভারতে বিমানঘাঁটি-নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে দিচ্ছে, যৌথ বিমান মহড়া হচ্ছে, আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাজেটিক সামরিক চুক্তি করছে, যুদ্ধবাজ ইজরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, ট্রাম্পের ড্রাম বাজাচ্ছে, বিদেশি সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনারে পরিণত হয়েছে।   কর্পোরেট সংস্থাগুলো এই প্রথম একযোগে পরিকল্পনা করে নরেন্দ্র মোদীকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তথাকথিত ভাইব্র্যান্ট গুজরাটে সম্মেলনে মোদীই তাদের উপযুক্ত প্রার্থী বলে ঘোষণা করা হয়। যেমন মীরজাফর বসেছিল ক্ষমতায় এবং ইংরেজদের সব আবদার পূরণ করত, তেমনি মোদীও সাম্রাজ্যবাদের সব আবদার রাখার জন্য ভারতের দরজা খুলে দিয়েছে। চীনকে ঘিরে ফেলার জন্য জাপান-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলছে। আদানি-আম্বানি অন্যান্য কর্পোরেটদের অবাধ লুটের সুযোগ করে দিয়েছে। কংগ্রেস আমলে কর্পোরেটদের আক্ষেপ ছিল যে মনমোহন সিংয়ের আমলে সংস্কারের কাজ অর্থাৎ কর্পোরেট লুটের সুযোগ করে দেওয়ার কাজ খুব শ্লথ গতিতে হচ্ছিল। মোদীকে দিয়ে সেই গতিকে ত্বরান্বিত করিয়ে নিচ্ছে। তবে একটাই পার্থক্য ভারতীয় শিল্পপতিরা নিজেদের শিল্পের বাজারও পাচ্ছে। এবং কিছু স্বাধীনভাবেও পাচ্ছে। একেবারে বিদেশিদের দারোয়ান হয়ে যায়নি। বিশ্বস্ত মোদী নিষ্ঠার সঙ্গে কর্পোরেটদের ইচ্ছাপূরণ করে চলেছেন।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দস্তক পেল কি করে?
দেশীয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে দিল্লির বাদশাহের এই ফরমান বা দস্তক পাওয়ার দুটো ইতিহাস আছে। বাংলায় বিনা শুল্কে বাণিজ্য করার এই ফরমান ইংরেজরা পেল মোগল সম্রাটদের কাছ থেকে।
১৬৪৪ সাল শাহজাহানের রাজত্বে তাঁর প্রিয় এক কন্যা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। তৎকালীন ভারতীয় চিকিৎসকরা তাকে নিরাময়ে ব্যর্থ হন। সেই সময় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সার্জেন Gabriel Bughton ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হোপওয়েল জাহাজের চিকিৎসক ছিলেন। তিনি নবাব কন্যাকে সারিয়ে তুললেন। পুরস্কার হিসেবে তিনি চাইলেন ইংরেজদের বিনা শুল্কে বাংলায় বাণিজ্য করবার কারখানা তৈরি করবার অনুমতি। এর আগে অনেক নিয়ন্ত্রণ রেখে ব্রিটিশদের ব্যবসা করতে হতো, তাতে লাভ হচ্ছিল না। অনুমতি পাওয়া গেল। এই সময় আবার বাউটন বাংলায় এলেন দিল্লির সম্রাটের ফরমান নিয়ে। সুলতান সুজা তখন বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত।
সম্ভবত কোন একজন বেগমের অসুখ বাউটন নিরাময় করে দিলেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ তিনি ব্রিটিশদের বাংলায় স্থায়ীভাবে বাণিজ্য কারখানা করার অনুমতি দিলেন। এই সুযোগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অনেকগুলি কারখানা খুলে ফেলল। বছরে খুব সামান্য তিন হাজার টাকা করের ভিত্তিতে কার্যত প্রায় বিনা শুল্কে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যবসা শুরু করলো। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বকালে সুবে বাংলার নবাব ছিলেন শায়েস্তা খান। শায়েস্তা খানের চাপে জব চার্নক মাদ্রাজে (চেন্নাই) চলে গেছিলেন। কিন্তু বাংলার পরবর্তী নবাব ইব্রাহিম খানের আমন্ত্রণে জব চার্নক কলকাতায় সুতানুটিতে বসতি স্থাপন করেন। তারপর নানাভাবে হাত বদলে আলিবর্দী খান পরে তার দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলার হাতে বাংলার শাসন ক্ষমতা যায়। কিন্তু ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেবের দৌহিত্র ফারুকশিয়ার  নিজের রাজত্বকালে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এর ফলে রাজপুতানার রাজকন্যার সঙ্গে তাঁর প্রস্তাবিত বিয়ে ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি ব্রিটিশ ডাক্তার হ্যামিলটনের চিকিৎসায় আরোগ্য লাভ করেন। হ্যামিলটন বাংলায় ইংরেজদের পাওয়া সুবিধাকে আরও বৃদ্ধি করার আবেদন জানান আর ফারুক শিয়ারের কাছ থেকে গঙ্গার দুপারের ৩৮টি গ্রামের জায়গির লাভ করেন মুর্শিদাবাদে একটি টাঁকশাল তৈরি করেন। ইতিমধ্যে কলকাতা একটি বড় বন্দর নগরী হিসেবে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে এই বাদশাহ ফারুক শিয়ার জগৎ শেঠকে অপরিসীম অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে বাংলায় পাঠিয়েছিলেন।

আদিম সঞ্চয়ের জন্য লুট
ইংরেজরা বাংলায় ঢুকেই অবাধ লুটের ব্যবস্থা করল। ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের জন্য আদিম পুঁজি সংগ্রহ করা হয়েছিল ভারতসহ অন্যান্য উপনিবেশগুলি লুট করে। মার্কস তাঁর ক্যাপিটাল গ্রন্থে আদিম পুঁজির সঞ্চয় বলেছেন যে, উপনিবেশগুলিকে লুট করেই আফ্রিকা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে আমেরিকার বাজারে দাস হিসাবে বিক্রি করে প্রচুর সোনা রূপা নিয়ে আসত। সেই অর্থ এবং ভারত এশিয়া-আফ্রিকার অন্যান্য উপনিবেশ থেকেও ধনসম্পদ লুট করে ইংল্যান্ড ইউরোপের শিল্পায়নের জন্য পুঁজি জোগাড় হয়। বঙ্গ প্রদেশ থেকে টাকা লুট হয়, বিনা শুল্কে ভারতের পণ্যদ্রব্য অন্যান্য উপনিবেশগুলোতে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা হয়, এছাড়া রাজস্ব আদায় করা হয় নির্মমভাবে। এর ফলে বাংলা-বিহারের বিশাল অংশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। এই দুর্ভিক্ষ ৭৬- মন্বন্তর নামে পরিচিত।
জওহরলাল নেহরু, ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া (১৯৮৬ সংস্করণ, পৃঃ ২৯৭) গ্রন্থে বলেছিলেন, ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের প্রচার ছিল যে, মুসলমান শাসনের দুর্দশা দূর করে পলাশির যুদ্ধের পর যে ইংরেজ শাসন শুরু হলো তাতে বাংলা নাকি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। নতুন জাতীয়তাবাদী ইতিহাস দেখিয়ে দিল যে, বরং‍‌ বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে ছিল, ক্লাইভ হেস্টিং- লুটপাটের ফলেই বাংলায় ভয়াবহ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর ঘটেছিল (১৭৭০) তৎকালীন বাংলা বিহারের প্রায় তিনভাগের একভাগ মানুষ দুর্ভিক্ষ পীড়িত হয়েছিলেন।
নেহরু আরও বলেন (ডিসকভারি ২৯৭, ২৯৮) বাংলা লুট করে তার অর্থেই আদিম সঞ্চয় হিসাবে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল এই সত্যের উন্মোচন শুরু হয়েছিল দাদাভাই নত্তরোজির ১৯০১ সালে প্রকাশিত বই (পভার্টি অ্যান্ড অল ব্রিটিশ রুল ইন ইন্ডিয়া) এবং নতুনভাবে বিকশিত হয় রজনীপাম দত্তের ইন্ডিয়া টুডেগ্রন্থে। এই চিন্তায় নতুন অবদান রচনা করেন বিপানচন্দ্র পাল রাইজ অ্যান্ড গ্রোথ অফ ইকনমিক ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া (নিউদিল্লি, ১৯৬৬) বইটিতে। মার্কসবাদী ঐতিহাসিকরা ইতিহাসের অপব্যাখ্যা থেকে ভারতের ইতিহাসকে মুক্ত করেছেন। এখন ভারতের ইতিহাস অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
উৎসা পট্টনায়ক তাঁর এক লিখিত প্রবন্ধে বলেছেন ১৭৬০ সাল থেকে ১৮২০ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে প্রভূত পরিমাণে অর্থ জমা হয়। সবই হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন উপনিবেশ লুটের টাকা। এই অর্থ ইংল্যান্ডের শিল্প স্থাপনের কাজে লাগে। উৎসা পট্টনায়ক অর্থনীতিবিদদের উদ্ধৃত করে একে বলেছেন বিনি পয়সার ভোজ (ভারততত্ত্ব, এন বি , সুকুমারী ভট্টাচার্য সম্মাননা গ্রন্থ)
বিশ্বায়নের প্রভাবে এখন সারা দুনিয়াব্যাপী যে লুঠ হচ্ছে একেও আদিম সঞ্চয়ের মতো শোষণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমার দেশ ভারতেও এখন আদিম পুঁজি সঞ্চয়ের সময়ের মতই  বেপরোয়া লুট করে মানুষকে নিঃস্ব করা হচ্ছে।
আকাশ বিক্রি হয়ে গেল। আকাশ বিক্রি হওয়ার প্রক্রিয়াতে ,৭৬,০০০ কোটি টাকা। বিদেশিদের হা‍‌তে এখনকার সময়ের দস্তক দিয়ে দিয়েছেন ভারত সরকার, কিন্তু বাণিজ্য চুক্তি সংস্থায় অঙ্গীভূত হওয়ার জন্য। একেই বলে বিশ্বায়ন। ভুবনগ্রামের অর্থ হলো বিনা শুল্কে অন্যদেশে বাণিজ্যের অধিকার। ভারতে ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি পণ্যের উপর আমদানি শুল্ক তুলে দিয়েছে।খনি দুর্নীতিতে আরও বেশি টাকা লুট হলো। কর্ণাটকে খনি দুর্নীতিমধ্য প্রদেশের ব্যাপম কেলেঙ্কারি, মহারাষ্ট্রের আবাসন কেচ্ছা এসবের মধ্যে দিয়ে লুট চললো অব্যাহতগতিতে। পশ্চিমবাংলাও পিছিয়ে নেই। বি জে পি-তৃণমূল পরোক্ষ আঁতাতের সুযোগে তৃণমূল সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা চিট ফান্ডের মাধ্যমে কয়েক লক্ষ মানুষের সঞ্চিত অর্থ হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করল।  এসব কিছু যেন আদিম পুঁজিরই মতো লুটপাট করে সংগৃহীত হচ্ছে। অন্যদিকে মানুষ ভিখারি হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া, জনগণের নির্ভরতা পেনশন ফান্ড শেয়ার বাজারে ফাটকা খেলার জন্য ছেড়ে দেওয়া, নোট বন্দী করে কালো টাকা উদ্ধারের নামে ব্যাঙ্কে সব ৫০০-১০০০ টাকার পুরানো নোট বাতিল করে নতুন নোট নিতে বলা হয়। সেখানে রোদে লাইন দিতে ১০০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। মোদীর মন্তব্য ছিল কালো টাকা সন্ত্রাসবাদীরা ব্যবহার করছে। নোট বন্দির ফলে কালো টাকা তারা ব্যবহার করতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেল উলটো। কালো টাকা সাদা হয়ে গেল। আসলে কালো টাকাকে সাদা করে দেওয়া হলো এই প্রক্রিয়ায়। সন্ত্রাসবাদী উৎপাত কমলই না। বরং সীমান্তে হামলা বাড়লো, আমাদের সেনাবাহিনীর জীবন ক্ষয় হতে থাক‍‌ল। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। এরপরে নিয়ে আসা হল জি এস টি। ছোট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জি এস টি  ব্যবসায়ীদের নিচের অংশটা  নিঃস্ব হতে শুরু করল।
সম্প্রতি মোদী সরকার লোকসভায় তাড়াহুড়ো করে এফ আর ডি আই বিল পাশ করাতে চাইছে। কর্পোরেটদের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ধার দিয়েছ মন্ত্রীসভার আনুকূল্যে। সেই ধার তারা শোধ ‍‌রেনি এমনকি সুদও দেয় না। ব্যাঙ্কের টাকায় শতকরা ৮৫ ভাগ কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, উচ্চ মধ্যবিত্তদের সঞ্চিত টাকা। ফলে ব্যাঙ্কগুলোকে এখন রুগ্ দেউলিয়া করে নানা কায়দায় ব্যাঙ্কে জনগণের গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করার চেষ্টা হচ্ছে। আজকের জগৎ শেঠরা-আদানি-আম্বানি-জিন্দল-মিত্তাল-গোয়েঙ্কা কর্পোরেট নিজেরা তো বটেই সাম্রাজ্যবাদীদের জুনিয়র পার্টনার হয়ে লুটের ছোট তরফ বনতে চাইছে। ফলে এখন তারা পররাষ্ট্র নীতিকেও প্রভাবিত করছে। এখন তো আর জোর করে দেশ অধিকারের দরকার হয় না। দেশের অর্থনীতি রাজনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকলেই তা সম্ভব। মীরজাফর নতুন মুখোশ নিয়েছে, আর জগৎ শেঠের দলও আদানি-আম্বানি চেহারা চরিত্র নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে।
এই নতুন জগৎ শেঠ এবং মীরজাফরদের বিরুদ্ধে আমাদের চূড়ান্ত লড়াই ছাড়া আর কোন গতিপথ নেই। জন্যই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী রাজদণ্ডে পালটে যায়।
গীতায় কৃষ্ণ বলেছিলেন দুর্বৃত্ত দমনের জন্য সৎ ব্যক্তিদের রক্ষা করার জন্য আমি যুগে যুগে জন্মগ্রহণ করবো। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সম্পদ লুটপাট করে নিঃস্ব করে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর জন্য জগৎ শেঠরাও বারবার জন্মগ্রহণ করছেন। জগৎ শেঠরা যুগের আদানি-আম্বানি অবতার রূপে জন্মগ্রহণ করেছেন। সঙ্গে সহজন্ম নিয়েছেন তখনকার মীরজাফর আজকের নরেন্দ্র মোদী। তাই এই মুহূর্তে লুটপাট চালিয়ে ভারতের আদানি, আম্বানি, মিত্তাল, জিন্দাল, টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কা প্রমুখ শতকরা ভাগ মানুষের হাতে ৭৩ ভাগ সম্পদ জমা হয়েছে।
রাজদণ্ড এখন তাদেরই হাতে।

গণশক্তি, ৬ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৮